সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

ধর্ম বিশ্বাস,না বিজ্ঞান?


শ্রীল এ,সি ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের সঙ্গে মাইক রবিনসনের কথোপকথন ১৯৭৬,আগষ্ট,লন্ডন
মাইক রবিনসনঃ- হ্যাঁ, ঠিক আছে, কিন্তু আমরা যদি মনে করি যে মানুষের আত্মা নেই.....
শ্রীল প্রভুপাদঃ তা হলে আপনাকে বিশ্লেষণ করতে হবে জীবন্ত দেহ এবং মৃতদেহের মধ্যে কি পার্থক্যতা আমি প্রথমেই বিশ্লেষণ করেছিজীবনীশক্তি আত্মা যখনই দেহ থেকে চলে যায়, তখন সব চাইতে সুন্দর শরীরেরও কোন মূল্য থাকে নাযখন আর কেউ সেটি চায় না, তখন তা ফেলে দেওয়া হয়কিন্তু এখন আমি যদি আপনার চুল স্পর্শ করি , তা হলে আপনি রেগে যাবেনসেটিই হচ্ছে জীবন্ত শরীরে আত্মা রয়েছে,মৃত শরীরে আত্মা নেইযে মুহুুর্তে আত্মা দেহটি ছেড়ে চলে যায়, তখন আর দেহটির কোন গুরুত্ব থাকে না তখন তা অর্থহীন হয়ে যায়সেটি বোঝা খুবই সহজকিন্তু তথাকথিত সমস্ত বড় বড় বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিকদের সেটি বোঝার মতো বুদ্ধি নেইআধুনিক সমাজ অত্যন্ত জঘন্য অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, এখন এমন একটা মানুষ নেই যার প্রকৃত মস্তিস্ক রয়েছে
মাইক রবিনসনঃ- আপনি কি সেই সমস্ত বৈজ্ঞানিকদের কথা বলছেন, যারা জীবনের পারমার্থিক দিকটা বুঝতে পারে না?
শ্রীল প্রভুপাদঃ- হ্যাঁ, প্রকৃত বিজ্ঞান মানে জড় এবং চেতন, সব কিছু সম্বন্ধীয় বিজ্ঞান
মাইক রবিনসনঃ- কিন্তু আপনি পূর্বে তো একজন রসায়নবি ছিলেন, তাই নয় কি?
শ্রীল প্রভুপাদঃ হ্যাঁ , প্রথম জীবনে আমি একজন রসায়নবি ছিলামতবে একজন রসায়নবি হতে খুব একটা বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন হয় নাসাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন যে কোন মানুষ তা হতে পারে
মাইক রবিনসনঃ- তা হলে বলতে হয় আধুনিক বৈজ্ঞানিকেরা স্থুল বুদ্ধিসম্পন্ন হলেও বিজ্ঞানের গুরুত্ব রয়েছে
শ্রীল প্রভুপাদঃ- জড় বিজ্ঞানের গুরুত্ব ততটুকুই-তার পূর্ণ গুরুত্ব নেই
মাইক রবিনসনঃ- ও আচ্ছাকয়েক মিনিট আগে যখন আমাদের মধ্যে মতভেদ হচ্ছিল তখন আপনি বলেছিলেন,“ শাস্ত্রের উদ্ধৃতি

দেওয়ার প্রয়োজন নেই; এটি সাধারণ জ্ঞানের বিষয়তা হলে আপনাদের এই ধর্মে শাস্ত্রের কি উপযোগিতা? তা কতটা গুরুপূর্ণ?
শ্রীল প্রভুপাদঃ- আমাদের ধর্ম একটি বিজ্ঞানআমি যখন বলি যে , একটি শিশু বালকে পরিণত হয়, সেটি বিজ্ঞান, তা ধর্ম নয়প্রতিটি শিশুই বালকে পরিণত হয়এখানে ধর্মের কি কথা? আর একটি মানুষ যখন মারা যায় তখন তার দেহটি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যায়এখানে ধর্মের কি প্রশ্ন উঠতে পারে? এটি বিজ্ঞানআপনি খ্রীস্টান, হিন্দু অথবা মুসলমান যাই হোন, আপনার  আত্মীয়ের যখন মৃত্যু হয়, তখন আপনি বলতে পারেন না, “আমরা খ্রীস্টান-আমি বিশ্বাস করি,তার মৃত্যু হয়নি”-সেটি হয় না আপনি হিন্দু,মুসলমান, খ্রীস্টান যাই হোন ,তার মৃত্যু হয়েছেদেহটির গুরুত্ব ততক্ষণ যতক্ষণ তাতে আত্মা আছেআত্মা যখন তাতে থাকে না, তখন সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে যায়এই বিজ্ঞান সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্যতার ভিত্তিতেই আমরা মানুষকে শিক্ষা দিতে চেষ্টা করছি
মাইক রবিনসনঃ- আমি যদি আপনার বক্তব্য ঠিক মতো বুঝে থাকি, তা হলে আমার মনে হয় আপনি শুদ্ধ বিজ্ঞানের ভিত্তিতে মানুষকে শিক্ষা দিচ্ছেনসেখানে ধর্মের অবকাশ কোথায়?
শ্রীল প্রভুপাদঃ-ধর্মও হল বিজ্ঞান, মানুষ ভ্রান্তিবশত ধর্মকে একটি বিশ্বাস বলে মনে করছে-“আমি বিশ্বাস করি এটি আমার ধর্ম”(জনৈক ভক্তকে) অভিধানে ধর্ম কথাটা খুজে বের কর
শিষ্যঃ- ধর্মের সংজ্ঞা দিয়ে অভিধানে বলা হয়েছে,“অলৌকিক শক্তি অথবা পরিচালককে স্বীকার করা , বিশেষ করে এক সবিশেষ ভগবানের বশ্যতা স্বীকার করা এবং উপযুক্ত মনোভাবের দ্বারা সেই স্বীকৃতিকে কার্যকর  করা
শ্রীল প্রভুপাদঃ- হ্যাঁ, ধর্ম মানে হচ্ছে পরম নিয়ন্তার নির্দেশ পালন করাতা হলে আপনি খ্রিস্টান হতে পারেন বা আমি হিন্দু হতে পারি, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে নাআমাদের দুজনকেই স্বীকার করতে হবে যে, একজন পরম নিয়ন্তা রয়েছেন-সেটিই হচ্ছে ধর্মএমন নয় যে,“আমি বিশ্বাস করি পশুর আত্মা নেইসেটি ধর্ম নয়সেটি সব চাইতে অবিজ্ঞানসম্মত উক্তিধর্ম মানে পরম নিয়ন্তা সম্বন্ধে বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান,-পরমেশ্বরকে জানা এবং তাঁর নির্দেশ পালন করাসেটিই হচ্ছে ধর্মরাষ্ট্রে স নাগরিক হচ্ছেন তিনি, যিনি সরকারকে জানেন এবং সরকারের আইন মেনে চলেন; আর অস নাগরিক হচ্ছেন তিনি যিনি সরকারকে মানেন নাএইভাবে সরকারকে অস্বীকার করলে আপনি অস নাগরিক হয়ে যান,তখন আপনি অর্ধামিক; আর আপনি যদি স নাগরিক হন, তা হলে আপনি ধার্মিক
মাইক রবিনসনঃ- জীবনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আপনার কি বিশ্বাস? আমরা কেন বেঁচে আছি?
শ্রীল প্রভুপাদঃ- জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে আনন্দ উপভোগ করাকিন্তু এখন সকলে জীবনের এক অবাস্তব স্তরে রয়েছে এবং তাই আনন্দ উপভোগের পরিবর্তে তারা দুঃখ-ভোগ করছে- সর্বত্র আমরা দেখতে পাই জীবন সংগ্রাম।  সকলেই সংগ্রামে রতকিন্তু পরিণামে কি তারা আনন্দ উপভোগ করে? তারা শুধু দুঃখভোগ করতে করতেই মারা যায়তাই জীবনের উদ্দেশ্য যদিও আনন্দ উপভোগ করা, কিন্তু বর্তমানে তাদের জীবন আনন্দময় নয়কিন্তু আপনি যদি জীবনে চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত হন, তা হলে আপনি আনন্দ উপভোগ করতে পারেন
মাইক রবিণসনঃ- আপনি কি দয়া করে আমাকে বলবেন পারমার্থিক জীবনের স্তরগুলি কি কি? একজন নতুন ভক্তকে কিভাবে পারমার্থিক জীবনে অগ্রসর হতে হয়?
শ্রীল প্রভুপাদঃ- প্রথম স্তর হচ্ছে জিজ্ঞাসু স্তরসেই স্তরে মানুষ প্রশ্ন করে,“কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন কি? সেই সম্বন্ধে আমি একটু পড়াশুনা করে দেখি!এই স্তরকে বলা হয় শ্রদ্ধাসেটি হচ্ছে শুরুতারপর সে যদি ঐকান্তিক হয়, তা হলে  যাঁরা এই জ্ঞানের অনুশীলন করেন, তাঁদের সঙ্গ করেতারপর সে নিজেই মনে করেআমিও ওদের মতো একজন হই না কেন?” তারপর সে যখন তাঁদের মতো হয়,তখন তার সমস্ত অনর্থ দূর  হয়ে যায়তখন বিশ্বাস সুদৃঢ় হয় এবং কৃষ্ণভাবনামৃতের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায়এই সমস্ত ভক্তরা সিনেমা দেখতে যায় না কেন? এরা মাছ- মাংস খায় না কেন? কারণ তাদের রুচির পরিবর্তন হয়েছেএখন এই সমস্ত জিনিস তারা ঘৃণা করেএই ভাবে ধীরে ধীরে প্রগতি হয়প্রথমে শ্রদ্ধা, তার পর সাধুসঙ্গ তারপর অনর্থ-নিবৃত্তি, তারপর নিষ্ঠা,তারপর রুচি,তারপর ভগব-উপলব্ধি এবং অবশেষে ভগব -প্রেমসেটিই যোগের পূর্ণতাসেটিই সর্বোত্তম ধর্মএটি আমার বিশ্বাস বা আপনার বিশ্বাস জাতীয় কতগুলি অন্ধসংস্কার নয়সেগুলি ধর্ম নয়, সেগুলি প্রতারণাপ্রকৃত ধর্ম হচ্ছে সেই ধর্ম যা ভগবানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক গড়ে তোলেসেটিই ধর্মের পূর্ণতা
মাইক রবিনসনঃ- আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদআপনার সঙ্গে কথা বলে আমি খুব আনন্দ পেয়েছি
শ্রীল প্রভুপাদঃ- হরে কৃষ্ণ!
 http://www.iskconbd.org/
0 comments

আত্মতত্ত্ব জ্ঞান (৩য় পর্ব) :



পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছে ভগবান, যার থেকে সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হয়েছে । যিনি সমস্ত বিশ্ববহ্মান্ডের পালন করেন এবং সংহারের কাড়ন হন, তিনিই হচ্ছেন ভগবান। যাহার মধ্যে সমগ্র ঐশ্বর্য, বীর্য, যশ, শ্রী,
জ্ঞান ও বৈরাগ্য এই ছয়টি গুন পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান থাকে, তাকে ভগবান বলা হয়। ভগবান সাকার; তার রূপ রয়েছে, তবে তা জড় নয়, অপ্রাকৃত। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ, তিনি নিত্য, জ্ঞান ও আনন্দময় মূর্তিবিশিষ্ট ।
যোগী চার প্রকার – কর্মযোগী, জ্ঞানযোগী, ধ্যানযোগী ও ভক্তিযোগী। জ্ঞানযোগী নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা করেন । অষ্টাঙ্গ যোগী বা ধ্যানযোগী ধ্যানের মাধ্যমে পরমাত্মার উপাসনা করে থাকেন। ভক্তিযোগ অবলম্বনকারী ভগবানের ভক্তরাই ভগবানের উপাসনা করে।
ভগবানের অস্তিত্বের প্রমাণ লাভ করবার জন্য আমাদের শাস্ত্রের সাহায্য গ্রহণ করতে হবে । শাস্ত্র থেকে আমরা বুঝতে পারব যে ভগবান আছেন । ভগবান হচ্ছেন তিনি যিনি এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের কারন । সৃষ্টির পেছনে কারও না কারও হাত আছেন । যিনি বুদ্ধি প্রদান করেছেন, এই সমস্ত উপাদান প্রদান করেছেন এবং যিনি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন, তিনিই হচ্ছেন ভগবান। ভগবানের সাথে জীবের সম্পর্ক হচ্ছে নিত্যপ্রভু ও নিত্যদাস । জড়জগৎ ভগবানের অনুৎকৃষ্টা বহিরঙ্গা শক্তি থেকে উৎপন্ন ।
amit sarkar shuvo
0 comments

আত্মতত্ত্ব জ্ঞান :২য় পর্ব



আত্মা শরীরের হৃদ্দেশে অবস্থান করে । দেহে আত্মার অবস্থানের লক্ষন হচ্ছে দেহে পরিব্যাপ্ত চেতনা। আত্মা দেহ হতে নিষ্ণ্ক্রান্ত হলে দেহ একটি অচেতন , পচনশীল, জড়পীণ্ডে পরিনত হয়।
এই জড় জগৎ এ ৮৪ লক্ষ প্রকারের জীব যোনি রয়েছে। এদের মধ্যে কীটপতঙ্গ ১১ লক্ষ, জলচর ৯ লক্ষ, উদ্ভিদ ২০ লক্ষ, পশু ৩০ লক্ষ, পাখি ১০ লক্ষ এবং মানুষের মধ্যে রয়েছে ৪ লক্ষ প্রজাতি ।
জীবাত্মা যে শরীরের মধ্যে অবস্হান করে সেই শরীর কৌমার থেকে যৌবন, যৌবন হতে বার্ধক্য অবস্হায় ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হতে থকে। কিন্তু দেহস্ত আত্মার কোন পরিবর্তন হয় না । ঠিক যেমন পুরানো কাপড় পরিত্যাগকরে নতূন কাপড় পরিধান করা হয়,ঠিক তেমনি জীবাত্মা অব্যবহারযোগ্য জরাজীর্ণ শরীর ত্যাগ করে তার কর্ম এবং বাসনা অনুযায়ী নতুন শরীর গ্রহন করে। আত্মার এই নতুন শরীর ধারনকে বলা হয় পূনজম্ম ।
জীবের চরম লক্ষ্য হচ্ছে – পরমেশ্বর ভগবানের সংগে তার হারানো সম্পকর্কে পুনঃস্থাপন করে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হওয়া, কৃষ্ণপ্রেম লাভ করা । সর্ব আনন্দের উৎস হচ্ছেন স
চ্চিদানন্দময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ । জীব যে নিত্য আনন্দ লাভের আশা করছে, তার জন্য তাকে পরম পুরুষ ভগবানর সাথে তার নিত্য, অবিচ্ছেদ্য, প্রেমময় সম্পর্কের পুনঃস্থাপন করতে হবে।
যা অল্প সময়ের মধ্যে পাওয়া যায় কিন্তু ক্ষনস্থায়ী কিন্তু অন্তিমে দুঃখজনক তাকে প্রেয় বলে। আর যা লাভ করা পরিশ্রম সাপেক্ষ, কিন্তু চিরস্থায়ী ও সুখজনক তাকে শ্রেয় বলে। জীবনের প্রকৃত শ্রেয় হচ্ছে নিজের সরূপ প্রাপ্ত হয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণারবিন্দে অহৈতুকী ভক্তিভাবে তার সেবায় নিযুক্ত হওয়া ।
জীবের দুঃখের মূল কারন কৃষ্ণবিস্মৃতি। জীব যখন কৃষ্ণের সংগে তার নিত্য সম্পর্কের কথা ভূলে যায়, তখন তার নিত্য সরূপ চিন্ময় আত্মা, এ বিষয়ে বিস্মৃতির ফলে এবং এই দেহকে আত্মবুদ্ধি করার ফলে এ জগতে জীব প্রতিনিয়ত দুঃখে জর্জরিত হয় ।

সংগ্রহ : জাগ্রত চেতনা ( ইসকন )

0 comments

শ্রীমতী রাধারাণীর জন্মলীলারহস্য



লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিমান পুরুষ। যেহেতু কৃষ্ণ শক্তিমান পুরুষ , তাই তাঁর থেকে অনন্ত শক্তি প্রকাশিত হয়েছে, যেমন - সৃষ্টিশক্তি, লীলাশক্তি, ইচ্ছাশক্তি, জীবশক্তি, মায়াশক্তি, বৈকুণ্ঠে ভূ, শ্রী যোগমায়া আদি ষোড়শ শক্তি, তা ছাড়া অন্তরঙ্গা শক্তি ইত্যাদি। চিন্ময় জগত গোলোকের সমস্ত কার্যকলাপ শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা সম্পন্ন হয়।

এই অন্তরঙ্গা শক্তি তিন ভাগে বিভক্ত --সন্ধিনী, সম্বিৎ ও হ্লাদিনী।

সন্ধিনী শক্তির সাহায্যে সমস্ত চিৎ-জগৎ প্রকাশিত হয়েছে সম্বিৎ শক্তি বা জ্ঞান শক্তির দ্বারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে জানতে পারেন কৃষ্ণভক্তেরা এই শক্তির সাহায্যে শ্রীকৃষ্ণকে জানতে পারেন। আর হ্লাদিনী শক্তির দ্বারা শ্রীকৃষ্ণ দিব্য আনন্দ আস্বাদন করেন এবং ভক্তরা এই হ্লাদিনী শক্তির কৃপায় কৃষ্ণপ্রেমের সমুদ্রে অবগাহন করেন। এই হ্লাদিনী শক্তির প্রতিমূর্তি হচ্ছেন শ্রীমতি রাধা ঠাকুরানী।


                             ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে শ্রীমতি রাধারাণীর জন্মলীলা সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে--অপ্রাকৃত বৃন্দাবন-ধামে মাধ্বীতলায় আসীন রত্ন-সিংহাসনে কৃষ্ণচন্দ্র একা বসে আছেন। তখন তিনি লীলাবিলাস করতে ইচ্ছা করায়, সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর বাম অঙ্গ থেকে হ্লাদিনী শক্তি শ্রীমতি রাধারানী প্রকটিত হন। শ্রীমতি রাধিকাই হচ্ছে আদি শক্তি। তাঁর গাত্রবর্ণ তপ্তসোনার মহো এবং সমগ্র অঙ্গসৌষ্ঠব নানা রকম রত্ন অলংকারে বি

ভুষিতা। তিনি নানা লীলা বিলাসের দ্বারা শ্রীকৃষ্ণের সন্তোষ বিধান করেছিলেন। আরও অধিকভাবে শ্রীকৃষ্ণের আনন্দ বিধানের জন্য তিনি নিজের অঙ্গ থেকে অসংখ্য গোপিকাদের প্রকাশ করেন। এই সমস্ত ব্রজাঙ্গনারা রূপে-গুণে সর্বোত্তমা ছিলেন। সুতরাং শ্রীমতি রাধারাণী ও তাঁর কায়ব্যুহ গোপিকাদের মায়াবদ্ধ জীবদের মতো জন্মগ্রহণ করতে হয়নি। তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তির প্রকাশ। তাঁরা গোলোকে শাশ্বতকাল ধরে অবস্থান করছেন এবং শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে লীলা বিলাস করে কৃষ্ণপ্রেম আস্বাধন করছেন। ব্রহ্মার দিবসের মধ্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন ভৌম বৃন্দাবনে বা এই জড় জগতের মধ্যে প্রকাশিত বৃন্দাবনে অবতরণ করেন, তখন তাঁর লীলায় অংশ গ্রহণ করবার জন্য তাঁর হ্লাদিনী শক্তি শ্রীমতি রাধারানী ও তাঁর কায়ব্যুহ সখীরা যদিও তাঁদের শাশ্বত চিন্ময় রূপ নিয়ে আবির্ভূত হন, তবুও আমাদের দৃষ্টিতে আমরা দেখতে পাই যে, তাঁরা যেন জন্মলীলা প্রকট করেছেন।
যেহেতু আমরা মায়াবদ্ধ জীব, তাই আমাদের কৃপা করবার জন্য তাঁরা আমাদের মতো জন্মলীলা পরিগ্রহ করেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁদের জন্ম ও কর্ম সবই দিব্য বা অপ্রাকৃত।
পদ্ম পুরাণের উত্তর খণ্ডে শিব-পার্বতী সংবাদে ভৌম বৃন্দাবনে শ্রীমতী রাধারাণীর জন্ম সম্বন্ধে আমরা জানতে পাই যে-

বৃন্দাবনে বৃষভানু রাজা নামে এক পরম ভক্ত বাস করতেন। তাঁর কীর্তিদা সুন্দরী নামে এক পতিপ্রাণা স্ত্রী ছিল। তাঁরই গর্ভে ভাদ্রমাসে শুক্লাষ্টমী তিথিতে মধ্যাহ্নে শুভক্ষণে শ্রীমতী রাধারাণী জন্মগ্রহণ করেন। কন্যারত্ন দর্শনে সমগ্র বৃন্দাবন দিব্যানন্দে মগ্ন হলেন। কন্যার রূপে সকলে মুগ্ধ হলেও তাঁর চোখ নিমীলিত ছিল বলে সকলেই মনে করল কন্যাটি অন্ধ হয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। রাধারাণীর চোখ মুদ্রিত হয়ে থাকার কারণ হচ্ছে- একদিন গোলোকে কৃষ্ণ রাধারাণীকে জ্ঞাপন করলেন যে, তিনি অতি শীঘ্রই পৃথিবীতে অবতরণ করবেন। সুতরাং রাধারাণী যেন সেখানে অবতরণ করেন, কেননা সেখানে উভয়ের মাধ্যে বিচিত্র মাধুর্য লীলা বিলাস হবে।কৃষ্ণের কথা শুনে রাধারানী বললেন যে, যদি তাঁকে পৃথিবীতে অবতরণ করতে হয়, তা হলে পর পুরুষের মুখ দর্শন করতে হবে। কিন্তু রাধারানী শ্রীকৃষ্ণের রূপমাধুরী ছাড়া অন্য কিছুই দর্শন করেন না। তাই তাঁর পক্ষে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করা কি করে সম্ভব ? রাধারাণীর যুক্তিসংগত কথা শুনে কৃষ্ণ বললেন যে, সেই জন্য তাঁর চিন্তার কোন ও কারন নেই। রাধারানী সব সময় কৃষ্ণকেই দেখতে পাবেন। এভাবেই আশ্বস্ত হয়ে , তবেই হরিপ্রিয়া রাধারানী মর্ত্যলোকে অবতীর্ণ হতে রাজি হয়েছিলেন।

প্রকৃতপক্ষে ভৌম জগতের বৃন্দাবন-ধাম আর চিন্ময় জগতের সর্বোচ্চলোক গোলোক বৃন্দাবনের মধ্যে কোন ও পার্থক্য নেই। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছাতেই চিন্ময় গোলোক বৃন্দাবন এই জড় জগতে প্রকাশিত হয়েছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন এই জড় জগতে অবতরণ করতে চান, তখন তিনি তাঁর নিত্য পার্ষদবৃন্দ ও চিন্ময় ধামসহ অবতরণ করেন।

মায়াবদ্ধ জীবেরা এই জড় জগতের অন্তর্গত বৃন্দাবন, নবদ্বীপ আদি ধামগুলি যে চিন্ময় তা উপলব্ধি করতে পারে না। তাদের কাছে এই চিন্ময় ধামগুলি জড় রাজ্যেরই অন্তর্গত এক-একটি অঞ্চল বলে মনে হয়। ধাম যেহেতু ভগবানের চিন্ময় রাজ্য,তাই বদ্ধ জীব ধামকে কলুষিত করতে পারে না। যারা ধামে এসে পাপকর্ম চরিতার্থ করে, প্রকৃতপক্ষে তাদের কার্যকলাপ ধামের উপরে মায়া রচিত আবরণের জালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সদ্গুরুর কৃপায় মায়ার আবরণ উন্মোচন হলে, তবেই ধামের চিন্ময় স্বরূপের দর্শন ও উপলব্ধি সম্ভব হয়।

এদিকে রাধিকার শুভ জন্ম-মহোৎসব উপলক্ষ্যে আমন্ত্রিত হয়ে স্ত্রী ও পুত্রসহ নন্দ মহারাজ বৃষভানু রাজার রাজপুরীতে এসে উপস্থিত হন। তাঁরা পরস্পরে আনন্দে কোলাকুলি করছিলেন,তখন এক ফাঁকে কৃষ্ণ অন্তঃপুরে রাধার পালঙ্কের কাছে এসে তাঁর চোখ খুলে কৃষ্ণের দিকে তাকালেন। এভাবেই উভয়ে উভয়কে দর্শন করে দিব্য আনন্দে নিমগ্ন হন।

ইত্যবসরে বৃষভানু রাজা অন্তঃপুরে প্রবেশ করে দেখলেন, রাধিকা চোখ উন্মীলিত করে কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে আছে, তখন তিনি আনন্দের আতিশয্যে উভয়কে কোলে তুলে নিলেন এবং বুঝতে পারলেন যে, কৃষ্ণই রাধাকে চক্ষুদান করেছেন। রাধার চক্ষু উন্মীলনের খবর পাওয়া মাত্রই সমগ্র ব্রজবাসীরা আনন্দে উৎফুল্ল হয়েছিলেন।


তথ্যসূত্র http://www.iskconbd.org/bn/
0 comments

মহাজন উপদেশ : শ্রীব্রহ্মা

গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুর নাভীপদ্ম থেকে ব্রহ্মার জম্ম । শ্বেত-বরাহ করে ইনি জম্মগ্রহন করেন । ব্রহ্মাই সৃষ্টির আদি জীব । পদ্ম-উপরি উপবিষ্ট ব্রহ্মার চারটি মস্তক । অনন্তকোটি ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে। প্রতি ব্রহ্মাণ্ডেই ব্রহ্মা রয়েছ
েন। শাস্ত্রে বর্ণিত আছে, বিশমাথা, পঞ্চাশ মাথা, শত মাথা, সহস্র মাথা ও লক্ষ মাথা রয়েছে । ব্রহ্মাণ্ড সমূহও ছোট বড় আকৃতির। আমাদের ব্রহ্মাণ্ডটি সবচেয়ে ছোট । আমাদের ব্রহ্মার চরটি মস্তক ।
সৃষ্টির সমস্ত জীব হতে ব্রহ্মা বয়োবৃদ্ধ ও জ্ঞানবৃদ্ধ । প্রথমে চিন্তা করলেন, “আমি কোথা হতে এলাম । কেউ তো কোথাও নেই, কেবল আমি একা ।” ভাবলেন এই পদ্মের নাল বেয়ে নিচে নামবেন কিনা। শেষ পর্যন্ত তিনি ধ্যানস্থ হয়ে তার সৃষ্টির উৎস সম্বন্ধে সন্ধিৎসু হলেন ।
বহু বর্ষ পরে ভগবান শ্রীহরি দর্শন দান করলেন । ভগবান বললেন, হে ব্রহ্মা এই দেখো চৌদ্দ ভুবন । সমস্ত ভুবন জীবে পরিপূর্ণ কর । ভগবান শ্রীব্রহ্মার মধ্যে সৃষ্টিশক্তি সঞ্চার করলেন । ব্রহ্মা ভগবানের শক্ত্যাবেশ অবতার । সৃষ্টিকার্যে তিনি নিয়োজিত । ব্রহ্মা নিজ অঙ্গ হতে মুনি ঋষি এবং মরীচি প্রমুখ প্রজাপতির সৃষ্টি করলেন । তিনি কাউকে তপস্যা আচরণের নির্দেশ দিলেন, কাউকে বা সাংসারিক কার্যে নিয়োজিত করলেন ।
তারপর ব্রহ্মা চিন্তা করলেন আর নিজের থেকে এভাবে সৃষ্টি না করে, নারী-পুরুষের মাধ্যমে সংসার সৃষ্টি হোক । তার সংকল্প অনুসারে মানস পুত্ররূপে মনু ও মনুর অর্ধাঙ্গিনী-রূপে শতরূপাকে সৃষ্টি করলেন । তা৺রা মিলিত হয়ে প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ নামে দুই পুত্র এবং আকুতি, প্রসুতি ও দেবহুতি নামে তিন কন্যার জম্ম দেন । তা৺দেরকে উপযুক্ত পাত্র-পাত্রীর হাতে সমর্পণ করা হয় । ক্রমে ক্রমে ব্রহ্মার দ্বারাই সৃষ্টিকার্য ব্যাপকভাবে পরিচালিত হতে লাগল।
সৃষ্টি করবার জন্য ভগবান ব্রহ্মাকে রজোগুণ দিয়েছিলেন । রজোগুণের মধ্যে রয়েছে সংকল্প, আগ্রহ ও প্রচেষ্টা । চতুর্মুখ ব্রহ্মা রজোগুণের প্রভাবে স্থাবর, জঙ্গম, খেচর, ভূচর, জলচর, উভয়চর প্রাণী প্রজাতির সৃষ্টি করলেন । নয় লক্ষ রকমের জলজ প্রাণী, কুড়ি লক্ষ রকমের গাছপালা, এগার লক্ষ রকমের কীটপতঙ্গ, দশ লক্ষ রকমের পাখী, ত্রিশ লক্ষ রকমের গাছপালা পশু এবং চার লক্ষ রকমের মানুষ প্রজাতি সৃষ্টি করলেন ।
একদিন ব্রহ্মা অহংকার বশতঃ মনে করলেন, ‘ আমিই সবকিছু করেছি । আমিই সমগ্র মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা । আমিই ব্রহ্মাণ্ডের মালিক ।’
শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত আছে দ্বারকাতে শ্রীকৃষ্ণ শ্রীব্রহ্মাকে আহ্বান করলেন । ব্রহ্মা এসে পৌঁছালে কৃষ্ণের দ্বারপালগণ জিজ্ঞাসে করেন, ‘আপনি কোন ব্রহ্মা ।’ ব্রহ্মা তখন বিস্মিত হয়ে বললেন, চতুর্মুখ ব্রহ্মা । তারপর সভাকক্ষে প্রবেশ করে দেখলেন বহু বহু ব্রহ্মাণ্ড থেকে আগত অসংখ্য ব্রহ্মা সেখানে উপস্থিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণকে প্রণতি নিবেদন করেছেন । আমাদের চতুর্মুখ ব্রহ্মা নিজেকে সবচেয়ে ছোট বলে অনুভব করলেন । শ্রীকৃষ্ণ প্রত্যেক ব্রহ্মার সঙ্গে কুশল-বার্তা জিজ্ঞাসা করে একে একে তাদের বিদায় দিলেন । তখন চর্তুমখ ব্রহ্মার বিষণ্ণ মুখ দর্শন করে শ্রীকৃষ্ণ বললেন, হে ব্রহ্মা, বলুন আপনার কি অভিপ্রায় ?
ব্রহ্মা বললেন, আমি বড় অভিমানী, আমি মনে করেছি আমি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি । কিন্তু সেই মোহ আমার দুর হয়েছে, আমার চেয়েও অসংখ্য কোটি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি রয়েছেন, তা আমি এখন বুঝতে পারলাম । আমার এই চৌদ্দ-ভুবন বিশিষ্ট ব্রহ্মাণ্ড ছাড়াও আরও অনন্তকোটি ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে- এবার আমার সেই বুদ্ধি জম্মেছে । হে ভগবান, এখন আমি বুঝেছি যে, আমিই সবার চেয়ে ক্ষুদ্র, আমার চিন্তাধারা অতি তুচ্ছ । আপনি দয়া করে আমার সমস্ত অভিমান ও অহংকার দুর করুন এবং আমাকে আপনার চরণে শুদ্ধ-ভক্তি প্রদান করুন ।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন, হে ব্রহ্মা, অভিমান অহংকার যাতে না হয় সেজন্য এখানে আহ্বান করেছি, এখন আপনার মঙ্গল হোক । তারপর ব্রহ্মা শ্রীকৃষ্ণকে প্রণতি নিবেদন করে আপন স্থান সত্যলোকে গমন করলেন ।
একসময় নারদমুনি মন্দাকিনীর তটে তপস্যা করছিলেন । কিন্তু তিনি দৈববাণী শুনতে পেলেন- ‘শ্রীহরি যদি আরাধিত না হন, তবে তপস্যার কি দরকার ? শ্রী হরি যদি আরাদিত হন তবে তপস্যারই কি দরকার ? ’ দৈববাণী শুনে নারদ শ্রীহরি স্মরণ করছিলেন, তখন পিতৃদেব ব্রহ্মাকে দেখতে পেলেন । ব্রহ্মাকে প্রণতি নিবেদন করে জলপূর্ণ নয়নে নারদ বললেন, এই দৈববাণীর অর্থ কি ?
ব্রহ্মা বললেন হে বৎস ! যদি ব্যক্তি ভক্তি সহকারে শ্রীহরির আরাধনা করেন, তবে সেই ব্যক্তির তীর্থভ্রমণ, তপস্যার প্রয়োজন নেই । ভারতবর্ষে কৃষ্ণ-মন্ত্র-উপাসক জীবন্মুক্ত ব্যক্তির তপস্যার প্রয়োজন হয় না । হে নারদ, শ্রীকৃষ্ণ নাম-মন্ত্র গ্রহণ মাত্রেই তার বংশের শত পুরুষ ও বন্ধুবান্ধবরা ও অনায়াসে পবিত্র হয় । শ্রীকৃষ্ণ সেবা থেকে অন্য কোন ধর্ম বড় নয়, অন্যকোন তপস্যা শ্রেয় নয় । কৃষ্ণ-সেবা পরায়ণ ব্যক্তিদের তপস্যার পরিশ্রম অনাবশ্যক । হে পুত্র, কৃষ্ণ-মন্ত্রে ব্রতী ব্যক্তিই মহা পবিত্র । তার তীর্থস্থান, তার অনশন, তার বেদ অধ্যয়ন বিড়ম্বনা মাত্র । হে বৎস, আগুন পবিত্র, নির্মল জল পবিত্র, ভারতবর্ষ পবিত্র এবং তীর্থস্বরূপ তুলসী-পত্র পরম পবিত্র । কিন্তু কৃষ্ণনাম পরায়ণ, কৃষ্ণ-সেবা পরায়ণ ব্যক্তি অবলীলা ক্রমে পবিত্র করেন, আর এরাও সাদরে কৃষ্ণভক্ত ব্যক্তির স্পর্শ বাঞ্ছা করেন । বসুন্ধরা হরিভক্তের পদধূলি দ্বারা তৎক্ষণাৎ পবিত্র হন । হে নারদ, জানবে যে, ব্রহ্মাণ্ডে শ্রীকৃষ্ণ-সেবক অপেক্ষা কোন বস্তু বা কোনও ব্যক্তি অধিক পবিত্র নয় ।
যে ব্যক্তি প্রতিদিন শ্রীকৃষ্ণ পূজা করে এবং শ্রীকৃষ্ণ-চরণামৃত ও মহা-প্রসাদ গ্রহণ করে, সেই মহা পবিত্র । হে নারদ, কৃষ্ণ ভক্ত যে বংশে জম্মগ্রহন করে সেই বংশ পবিত্র হয় । জগতে যে ব্যক্তি কৃষ্ণ-ভজনা করে না, তার তপস্যা, তার কর্মপ্রচেষ্টা তার পরিশ্রম বৃথা । গঙ্গা জল যেমন মদের ভাণ্ডকে পবিত্র করতে পারে না, সেরকম বৈদিক কর্মকাণ্ডীয় যজ্ঞ, উপবাস, তপস্যা, ব্রত, দান, শুভকর্ম- এসবই অভক্ত ব্যক্তিকে পবিত্র করতে পারে না । শ্রীকৃষ্ণে যে ভক্তিপরায়ন নয়, সেই ব্যক্তি যদি তীর্থে স্নান করতে যান তবে তীর্থ বিচলিত হন । বসুন্ধরা অভক্তের ভারে দুঃখে কম্পিত হয়ে থাকেন ।
হে বৎস, শ্রীকৃষ্ণের কথাই বেদ-শাস্ত্রের সারবস্তু । যে মহাত্মা স্বপ্নে ও জাগরণে শ্রীকৃষ্ণের চিন্তা করেন , তিনি নিষ্পাপ হয়ে জগৎকে পবিত্র করেন , ভগবানের সুদর্শন চক্র সেই আত্মাকে সুরক্ষিত করেন । শ্রীকৃষ্ণের নিরন্তর স্মরণকারী ভক্ত অপেক্ষা আত্মা, প্রাণ, দেহ, লক্ষ্মী, সরস্বতী, আমি, শিব তার কাছে কিছুই পবিত্র নয় । পরম-প্রভু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন ভক্ত-গত প্রাণ এবং ভক্ত-গন হচ্ছেন কৃষ্ণ-গত প্রাণ । ভক্ত শ্রীকৃষ্ণকে ধ্যান করেন, শ্রীকৃষ্ণ ভক্তের ধ্যান করেন ।
হে নারদ, যারা ব্রাহ্মণ অথচ কৃষ্ণ ভক্ত নয়, তারা ধর্মভ্রষ্ট পতিত জীব । কৃষ্ণভক্ত-হীন ব্রাহ্মণ অপেক্ষা স্বধর্মাচারশীল চণ্ডাল, স্লেচ্ছ এমনকি কুকুর-শুকুরেরাও ভালো । হে নারদ, ধর্মহীন ব্রাহ্মণেরা যা আহার্যরূপে গ্রহণ করা উচিত নয়, সেইগুলিও তারা ভক্ষণ করে । প্রতিদিন বিপরীত ধর্মাচার দ্বারা পতিত হয়ে চণ্ডাল অপেক্ষাও অধম হয় ।
নারদমুনি প্রশ্ন করলেন, হে পিতা, ব্রাহ্মণদের স্বধর্ম কি ? তাদের ভক্ষ্য বস্তু কি ?
ব্রহ্মা বললেন, হে পুত্র, ব্রাহ্মণদের নিরন্তর কৃষ্ণ-সেবন করাই স্বধর্ম । এই জন অন্যান্য লোকেরা ব্রাহ্মণকে সশ্রদ্ধ সম্মান জ্ঞাপন করে থাকে, ব্রাহ্মণের উচ্ছিষ্ট ও পদ-ধৌত জল পান করে থাকে । ব্রাহ্মণরা প্রতিদিন শ্রীকৃষ্ণকে ভোগ নিবেদন করেন এবং শ্রীকৃষ্ণ-প্রসাদই তাদের আহার্য বস্তু ।
নারদমুনি প্রশ্ন করলেন, হে পিতা, ব্রাহ্মণেরা যদি প্রত্যহ কৃষ্ণ-প্রসাদ না গ্রহণ করে অন্য কোন খাদ্য গ্রহণ করে তবে দোষ কি ?
ব্রহ্মা বললেন, পণ্ডিতেরা সেই খাদ্য কে অখাদ্য বলে বর্ণনা করেছেন । সেই অন্ন বিষ্টা সম, সেই পানীয় মূত্র-সম হয় । কোল ভিন্ন স্লেচ্ছ চণ্ডালেরা ভগবানকে অনিবেদিত অন্ন, রক্তমাংস জাতীয় অমেধ্য বস্তু ভক্ষণ করে থাকে, কিন্তু ব্রাহ্মণ যদি সেই বস্তু ভক্ষণ করে তবে চণ্ডাল-ধম বলে গণ্য হয় ।





হে নারদ, এখন আমি তোমাকে যে নির্দেশ দিতে ইচ্ছা করছি, তা হল এই যে, কৃষ্ণভক্ত শিবকে গুরু-রূপে গ্রহণ করে অচিরেই কৃষ্ণদাস্য ভক্তি লাভ কর । তোমার এরকম নির্জনে বসে তপস্যা করার দরকার নেই । শ্রীকৃষ্ণ-ভক্তিই দুঃখময় সংসার-সমুদ্র উত্তীর্ণ হবার নৌকা স্বরূপ । গুরুদেব সেখানে কর্ণধার স্বরূপ । হে নারদ, তুমি যে দৈব বাণী শুনেছিলে, দেবী সরস্বতীই তোমার উদ্দেশ্যে এই কথা বলে প্রস্থান করেছেন ।
শ্রীব্রহ্মা যখন নারদকে এই সমস্ত কথা বলছিলেন, তখন ব্রহ্মার পুত্র সনৎকুমার বললেন, হে পিতা , আমি কোন কথা বুঝতে পারিনি, দয়া করে আমাকে পুনরায় বলুন । শ্রীকৃষ্ণকে যে আরাধনা করেছে তার আর তপস্যা করা অনর্থক এবং যে শ্রীকৃষ্ণকে আরাধনা করেনি তারও তপস্যা ব্যর্থ হয়, যদি এই দুইজনই তপস্যা-রহিত হয়, তবে তপস্যার স্থান কি ধরনের লোকের প্রতি নির্দিষ্ট থাকল ?
ব্রহ্মা বললেন, হে বুদ্ধিমান, তোমাকে পুত্ররূপে পেয়ে আমার জীবন ধন্য । ‘আরাধিত’ কথাটিতে আ অর্থ বিশেষরূপে ‘রাধিত’ শব্দটি প্রাপ্তবাচক হয় । অতএব যিনি শ্রীহরিকে প্রাপ্ত হয়েছেন, তপস্যার প্রয়োজন নেই । কোনও মুঢ় ব্যক্তি, যখন শ্রীকৃষ্ণ বিমুখ, তার তীর্থ, দান, তপস্যা, পুণ্য, ব্রত তাকে পবিত্র করতে পারে না ।
সনৎকুমার জানতে চাইলেন, হে পিতা, কোন ধরনের ব্যক্তি তপস্যা করবে ?
ব্রহ্মা বললেন, যে ব্যক্তি মূঢ়তম কিংবা যে ব্যক্তি সর্বোৎকৃষ্ট ভক্তিলাভ করেছে, এই উভয় ব্যক্তিই সুখী । তাদের তপস্যা করার দরকার নেই । কিন্তু মধ্যম লোকেরাই তপস্যা করার অধিকারী হয়ে থাকে । মধ্যম ব্যক্তিরা যারা গৃহস্থ সাধক, সংসারে ব্যাপৃত থেকে পূর্ব কর্মের ফলভোগী হয়ে অভীস্পিত শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্ম পাওয়ার বাসনায় তারা তপস্যা করে ।
সনৎকুমার প্রশ্ন করলেন, হে পিতা, কি রকম তপস্যা করবে ?
ব্রহ্মা বললেন, শ্রীকৃষ্ণের সেবা, ধ্যান, নাম জপ-কীর্তন, চরণামৃত ও মহা-প্রসাদ সেবন করাই সকলের বাঞ্ছিত শ্রেষ্ঠ ধর্ম ।
-হে পিতা, অধিকাংশ লোকেরই তা হলে শ্রীকৃষ্ণ-ভক্তিমূলক তপস্যার প্রয়োজন আছে । তবুও আমার জানতে ইচ্ছে করে যে, সংসারে সব লোক কৃষ্ণ-ভজন করে না কেন ?
-হে বৎস যার বুদ্ধি পূর্বজম্মকৃত কর্মদোষে মন্দ হয়েছে এবং অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে গুরু-রূপে গ্রহণ করেছে, তারা তমোগুণের অধীন হয়ে থাকে । তার ফলে তারা ত্রিগুণের অতীত ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জানতে পারে না, এমনকি জানতে আগ্রহ ও থাকে না । সংসারে সেই সব লোক তাই কৃষ্ণ-ভজন করবে না ।
-হে পিতা তাহলে সংসারের সেই সব কৃষ্ণ-বিমুখদের কিভাবে সদ্গতি হবে ?
- হে পুত্র, অজ্ঞানে বা সজ্ঞানে, সাধুসঙ্গ-ক্রমে কিংবা সৌভাগ্যক্রমে কেউ যদি অপ্রসাদভোজী না হয়ে কৃষ্ণপ্রসাদভোজী হয়, তা হলে, তার হৃদয়ে সমস্ত পাপ ক্ষয় হবে, সে দেহত্যাগের পর দিব্যরথে করে গোলোক কিংবা উৎকৃষ্ট কোনও গ্রহলোকে স্বেচ্ছামতো গমন করতে সমর্থ হবে ।
সংগ্রহ : মহাজন উপদেশ ( ইসকন্ ) 
by অমিত সরকার শুভ
0 comments

মহাজন উপদেশ : শ্রীশিব

একসময়, স্বর্গের মন্দাকিনীর তীরে শ্রীনারদমুনি মহাদেবের কাছে শ্রীকৃষ্ণমন্ত্র লাভ করলেন । তারপর নারদ ও মহাদেব শিব একস্থানে এসে পৌছলেন যেখানে পার্বতীদেবী, কার্ত্তিক ও গনেশ বসেছিলেন । সেখানে মহাকাল, নন্দী, বীরভদ্র,
সিদ্ধ মহর্ষিগণ ও সনকাদি মুনিগণ এসে বসলেন ।বাক্যালাপে প্রসঙ্গ ক্রমে নারদমুনি মহাদেবকে বললেন, হে ভগবান, যে জ্ঞান কর্মফলচক্রে আবদ্ধ করায় না, যে জ্ঞান সর্ববেদের সার, সেই বিষয়ে আমার প্রতি প্রসন্ন হয়ে আমাকে বলুন ।
মহাদেব বললেন, হে নারদ, পঞ্চরাত্র নামে এক অনুপম জ্ঞান পূর্বে গোলকে বিরজার তটে পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ ব্রহ্মাকে প্রদান করেছিলেন , তারপর নিরাময় ব্রহ্মালোকে ব্রহ্মা আমাকে সে জ্ঞান প্রদান করেন , সেই সর্ব-অভিষ্ট সর্বজ্ঞানপ্রদ প্রবিত্র জ্ঞান আমি তোমাকে দান করছি, পরে তুমি ব্যাসদেবকে প্রদান করবে । আর সেই ব্যাসদেব পরে তার পু্ত্র শুকদেবকে দান করবে ।
হে নারদ, এই জ্ঞান সবার আদি, সর্ববেদের সার, অতি মনোহর । জগৎ সংসারে যত মত আছে, যত কর্ম আছে, যত মন্ত্র আছে, যত কর্মচক্র আছে – সেই সমস্ত কিছুর সারাৎসার, সর্বকর্মচক্রের মুক্তির পন্থা হচ্ছে একমাত্র পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মসেবা । নিখিল মহাবিশ্বে একমাত্র শ্রীকৃষ্ণই বিদ্যমান । আর অন্য সমস্ত কিছুই তার প্রয়োজন সিদ্ধির জন্যই উৎপন্ন হয়েছে । বিশ্বের সবাই তার মায়ায় মোহিত । এক কৃষ্ণ তার অনন্ত রূপ, তার অনন্ত গুন, তার অনন্ত কীর্তি এবং তার অনন্ত জ্ঞান ।
হে নারদ, তার সৃষ্ট জড় বিচিত্র বিশ্বও অনন্ত । এই বিশ্বের সব জায়গা ক্ষুদ্র, বৃহৎ, মধ্যম নানা জাতীয় জীবে পরিপূর্ণ । সেই জীবগুলো কর্মশীল । কর্মের ফলস্বরূপ তারা সুখ দুঃখ ভোগ করছে ।
সর্বান্তরাত্মা ভগবান প্রত্যেক জীবের সাক্ষীরূপে বিদ্যমান । জীবের বুদ্ধি আছে । সেই বুদ্ধিশক্তি নিদ্রা, তন্দ্রা, দয়া, শ্রদ্ধা, তুষ্টি, পুষ্টি, হ্মমা, হ্মুধা, লজ্জা, তৃষ্ণা, ইচ্ছা, শান্তি, চিনতা, জরা, জড়া প্রভৃতি নাম ধারন করে । অনুচরেরা যেমন রাজার অনুগামী হয়, সেই রকম এই সব শক্তি জীবের অনুগামী হয়ে থাকে । চিন্তা ও জরা সর্বদা জীবের শোভা ও পুষ্টির ব্যাঘাত করে । ব্রহ্মাণ্ডমধ্যে জীব যে স্থুল দেহ ধারন করে কর্ম করছে সেই দেহটি পাঞ্চভৌতিক অর্থাৎ মাটি, জল, আগুন, বাতাস ও আকাশ দিয়ে তৈরি । এই দেহ ধ্বংস হলে দেহটি পঞ্চভূতের মধ্যে মিশে যায় । প্রায় জীবই এই জগৎ সংসারে ভ্রান্তিবশে মায়ামোহিত হয়ে রোদন করতে থাকে । কিন্তু যারা সাধু ব্যক্তি, তারা নিত্য সত্য অভয়প্রদ এবং জম্মমৃত্যুজরা-অপহারী শ্রীকৃষ্ণের চরণকমল সেবা করেন ।
হে নারদ, এই বিশ্ব স্বপ্নের মতো অনিত্য । অতএব এতে বিমোহিত না হয়ে আনন্দের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্ম ভজনা করো । এই হচ্ছে প্রথম জ্ঞান ।
এবার দ্বিতীয় জ্ঞানের কথা শ্রবণ করো । জ্ঞানী ব্যক্তিরা মুক্তির বাসনা করেন । সাধু পণ্ডিত ব্যক্তিদের পরমামুক্তি সততই বাঞ্ছিত । কিন্তু সমস্ত মুক্তি শ্রীকৃষ্ণভক্তির কাছে অত্যন্ত তু্চ্ছ বিষয় । মুক্তি কৃষ্ণভক্তির ষোলভাগের একভাগও আকর্ষনীয় নয় । কৃষ্ণভক্ত-সংসর্গের ফলে কারও হৃদয়ে ঐকান্তিক কৃষ্ণভক্তি জাগ্রত হয় ।
মাঠের মাঝে বৃক্ষের বীজ যেমন অঙ্কুরিত হয় জল পেলে, তেমনই হৃদয় মধ্যে ভক্তিবৃক্ষের অঙ্কুর প্রকাশিত হয় ভক্তসঙ্গ পেলে । ভক্তসঙ্গে কৃষ্ণকথা আলাপে ভক্তি জাগ্রত হয় । আবার রৌদ্র মধ্যে অঙ্কুর যেমন শুকিয়ে যায়, তেমনি অভক্তজনের সঙ্গে সর্বদা সংলাপে ভক্তি শুষ্কতা প্রাপ্ত হয় । এই জন্যে বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা সর্বদা ভক্তজনের সাথে আলাপ করেন ।
হে নারদ, সোনা যেমন নিকৃষ্ট ধাতুর সংযোগে মলিনতা প্রাপ্ত হয়, তেমনি সৎ ব্যক্তিও সংসারের দুর্বুদ্ধি লোকের সংস্পর্শে মন্দ হয়ে যায় ।এজন্য সর্বদা নিরন্তর ভক্তিপূর্বক শ্রীকৃষ্ণভজনে যুক্ত থাকাই কর্তব্য । ভক্তিপূর্বক কৃষ্ণভক্ত বৈষ্ণবের কাছ থেকে তার কৃষ্ণমন্ত্র গ্রহন করা উচিত । কখনও অভক্ত অবৈষ্ণবের কাছ থেকে নয় । সংসারে যারা কৃষ্ণনিন্দুক, কৃষ্ণবিমুখ, কৃষ্ণভক্ত নিন্দুক, তারা অশুচি ও পাপিষ্ঠ । কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষিত ব্যক্তি শত পুরুষ সহ নিজেকে উদ্ধার করে ।
by অমিত সরকার শুভ
0 comments

শ্রীভগবানকে নারদের অভিশাপ


লীলাময় ভাগবান শ্রীহরি একাধিকবার অভিশাপের শিকার হন। এক কল্পে জলন্ধর দৈত্যের উপদ্রবে দেবতারা নাজেহাল। তখন শিব গেলেন যুদ্ধ করতে। তিনিও জলন্ধরকে পরাজিত করতে পারেননি। কারণ জলন্ধরের স্ত্রী
ছিল সতী সাধ্বী নারী। তখন শ্রীহরি ছল করে জলন্ধরের স্ত্রীর সতীধর্ম নষ্ট করেন। সেই নারী যখন ভগবানের ছলনা বুঝতে পারলেন, তিনি তখন ভগবানকে অভিশাপ দেন।
আরেকবার শঙ্খচূড় নামক অসুরও তাঁর স্ত্রী তুলসীর জন্য অবধ্য ছিলেন। দেবলোকের মঙ্গলের জন্য তিনি তুলসীর সতীত্ব হরণ করেন। তুলসী ছিলেন ভগবদ্ভক্ত। কিন্তু ভগবানের ছলনা বুঝতে পেরে তিনিও শ্রী হরিকে পাষাণ রূপ প্রাপ্তের জন্য অভিশপ্ত করেন। ভগবান তা-ই শিরোধার্য করে নারায়ণ শিলাতে পরিণত হলেন। উপরন্তু, তুলসীর ভগবদ্ভক্তির মাহাত্ম্যের জন্য তিনি জন্মে জন্মে শ্রীভগবানের শ্রীচরণ কমলে স্থান পান।
কিন্তু যদি শোনা যায় যে, দেবর্ষি নারদ ভগবানকে অভিশাপ দিয়েছেন! তাহলে চমকে উঠতে হয়। কিন্তু ঘটনা তাই। নারদ দক্ষ কর্তৃক ‘যাযাবর’ বৃত্তির অভিশাপ পেয়েছিলেন। হিমালয়ের গঙ্গার তীরে এক মনোরম আশ্রম দেখে নারদের ভালো লাগল। তিনি পর্বত-নদী-কান্তারের অনবদ্য দৃশ্য অবলোকন করে রমাকান্ত ভগবানের শ্রীচরণে অনুরাগ জন্মাল। শ্রীচরণ স্মরণ হওয়াতেই তিনি শাপমুক্ত হলেন। তারপর সেই মনোমুগ্ধকর আশ্রমে তিনি সমাধিস্থ হলেন।
নারদের এই সমাধি দেখে ইন্দ্রের ভয় হল। তিনি ভাবলেন, নারদ হয়তো তপোবলে তাঁর ইন্দ্রত্ব (স্বর্গের রাজপদ) কেঁড়ে নেবেন। ইন্দ্র কামদেবকে আদেশ করলেন, “যাও! তোমার সঙ্গী-সাথী নিয়ে দেবর্ষি নারদের সমাধি ভঙ্গ করো।” মীন কেতু কামদেব “যথা আজ্ঞা” বলে তাঁর আদেশ পালনের জন্য তৎপর হলেন।
মদন সেই আশ্রমে বসন্ত সৃষ্টি করলেন। নানা রঙের ফুল ফুটল । কোকিল গান গাইল । ভ্রমর গুঞ্জন করল। শীতল মৃদু -মন্দ সুগন্ধি বাতাস বইল । উর্বশী, রম্ভা প্রমূখ অপ্সরাগণ নানা ভঙ্গিতে শরীর আন্দোলিত করে নৃত্য পরিবেশন করল। চির যুবতী দেব ললনাদের লাস্যময়ী দেহ - বল্লরী আন্দোলিত হল। কামকলায় নিপুণ অপ্সরাদের ছলা-কলায় নারদের সমাধি ভঙ্গ হল না। তখন তারা অভিশাপের ভয় পেল। সকলে দেবর্ষি নারদের চরণে ক্ষমা প্রার্থনা করল। নারদ সকলকে ক্ষমা করে দিলেন।
দেবর্ষি নারদের এই ঘটনায় খুব অহঙ্কার হল। তিনি কৈলাসে গিয়ে শিবকে বেশ গর্বের সঙ্গে এই ঘটনা বর্ণনা করলেন। শিব বললেন, আপনি এটা যেভাবে আমাকে বর্ণনা করলেন, তা কখনও ভগবান শ্রীহরিকে বলবেন না। কিন্তু নারদের শিবের উপদেশ ভালো লাগল না। তিনি বীণায় হরি গুণগান করতে করতে ক্ষীরসমুদ্রে গেলেন, যেখানে শ্রীহরি নারায়ণ রূপে বাস করেন।
নারায়ণ দেবর্ষি নারদকে আপ্যায়ন করে বসিয়ে কুশল বিনিময় করলেন। দেবর্ষি নারদ হল শ্রী ভগবানের পরম ভক্ত। কিন্তু ভগবান তো অন্তর্যামী। তবুও গর্বের সঙ্গে নারদ কামদেবের পরাজয়ের ঘটনা নারায়ণকে বললেন। নারায়ণ বললেন, “তোমাকে স্মরণ করলেই অন্যের কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ দূরীভূত হয়ে যায়। তো কামদেব পরাজিত হয়েছেÑ এটা আর এমন কি কথা? একথা শুনে নারদের আরও অহঙ্কার বৃদ্ধি পেল। তারপর নারদ বিদায় নিলেন। তখন শ্রীনারায়ণ অপূর্ব এক লীলা করলেন। তিনি ভক্ত নারদের মঙ্গলের জন্য তাঁর মায়াশক্তিকে নির্দেশ দিলেন নারদকে মোহিত করতে।
নারদ দেখলেন এক অপূর্ব নগর, যেখানে সুন্দর সব নর-নারী বাস করছে। সবাই যে মদন আর রতি। সেই নগরের রাজা শিলানিধি। বিশাল তাঁর সামরিক সজ্জা। প্রচুর ভোগৈশ্বর্যে পরিপূর্ণ সেই নগর। নারদ পুরবাসীদের কাছে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন যে, রাজকন্যা বিশ্বমোহিনীর স্বয়ম্বরা হবে। সেই উপলক্ষে বহু রাজা রাজবাড়িতে সমাগত। নারদও তামাসা দেখতে গেলেন। রাজা শিলানিধি নারদকে পাদ্যার্ঘ্য দিয়ে পূজা করলেন। তারপর রাজকন্যাকে দেখিয়ে এর দোষ-গুণ বিচার করতে বললেন। নারদ বিশ্ববিমোহিনীর অপরূপ সৌন্দর্য্যে মোহিত হয়ে গেলেন। রাজাকে শুধু বললেন, এই কন্যা সুলক্ষণা। আর মনে মনে নারদ চিন্তা করলেন, এই কন্যার পাণি গ্রহণ যে করবে সে ত্রিলোকে পূজিত হবে। তাকে কেউ পরাজিত করতে পারবে না। অতএব, এই কন্যাকে পাওয়ার জন্য নারদ চিন্তা করতে করতে বাইরে এলেন। নারদ এতটাই মোহগ্রস্ত হলেন যে, তিনি স্বয়ং শ্রীহরিকে স্মরণ করলেন। ভগবানকে স্মরণ মাত্রই তিনি উপস্থিত হলেন। নারদ বললেন, “ভগবান, এই কন্যাকে আমার চাই-ই চাই। আর সেজন্য তোমার রূপ আমাকে দাও।” ভগবান বললেন, “তথাস্তু”।
যথাসময়ে স্বয়ম্বর সভা শুরু হল। শিব তাঁর দুইজন অনুচরকে নারদের কাণ্ড পর্যবেক্ষণ করতে ব্রাহ্মণের বেশে পাঠিয়েছিলেন। ভগবান স্বয়ং-ও রাজবেশ ধারণ করে উপস্থিত। বিশ্ববিমোহিনী নারদের দিকে দৃষ্টিপাতই করলেন না। স্বয়ং ভগবানকে বরমাল্যে বরণ করলেন। এই দৃশ্য দেখে নারদ ক্রোধে থর থর করে কাঁপতে লাগলেন। এদিকে রাজবেশধারী ভগবান বিশ্ববিমোহিনীকে নিয়ে চলে গেলেন। নারদের অস্থির মতি লক্ষ্য করে শিবের অনুচর বলল, “ঠাকুর, দর্পণে একবার নিজের মুখটা দেখ।” নারদ তখন স্থির জলে নিজ প্রতিবিম্ব দেখে আঁতকে উঠলেন। আরে! এ-তো বাদরের মুখ। নারদ ক্রোধে জ্বলে উঠলেন। নারদ অহর্নিশি যাঁর নাম গুণগান করে, সেই পরমেশ্বর কিনা নারদকে ছলনা করলেন! তিনি তক্ষুণি বৈকুণ্ঠের দিকে ছুটলেন। পথেই শ্রী ভগবানের দর্শন পেলেন। সঙ্গে ল²ী এবং বিশ্ববিমোহিনী। নারদ ক্রোধে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “তুমি পরের ভালো দেখতে পার না। তুমি হিংসুক! কপট! সমুদ্র মন্থনে উৎপন্ন বিষ তুমি সরলমতি শিবকে পান করিয়েছিলে। আর কৌস্তভমণি ও ল²ীকে নিয়ে তুমি বৈকুণ্ঠে চলে গেলে। তোমার মতো কুটিল স্বভাব ও স্বার্থপর আর দ্বিতীয় কেউ নেই। তোমাকে শাসন করার কেউ নেই। তাই যা ইচ্ছা তা-ই কর। আমি তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি, যে বিরহে আমি জ্বলছি, সেই বিরহে তুমিও কাতর হবে। আর যে মর্কট মুখ আমাকে দিয়ে ছলনা করেছ, সেই বাঁদরই তোমার সহায়তাকারী বন্ধু হবে। শ্রীভগবান ভক্তের অভিশাপ মাথা পেতে নিলেন। আর তখনই নারদের উপর আরোপিত মায়াজাল অপসারিত করলেন। নারদ সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখলেন, ল²ী বা বিশ্ববিমোহিনী কেউ কোথাও নেই। নারদ অপরাধ বুঝতে পেয়ে শ্রীভগবানের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করলেন। ভগবান বললেন, “তুমি শ্রীশঙ্করের শরণ নাও, তাহলে শান্তি পাবে। যাও, আমি রাম অবতারে পৃথিবীতে লীলা করবো। সীতা বিরহে কাতর হব এবং বানর সেনার সাহায্যে সীতা উদ্ধার করব। তুমি আমার পরম ভক্ত, তোমার অভিশাপের মর্যাদা আমি রাখব। তোমাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যই তোমার অহঙ্কার চুর্ণ করার জন্যই আমি মায়ার দ্বারা তোমাকে মোহাচ্ছন্ন করেছিলাম।”
(উৎস: রামচরিত মানস)
 লিখেছেন -শ্রী গৌরকিশোর দাস ব্রহ্মচারী
সংগ্রহে - অমিত সরকার শুভ
0 comments

“Varieties of Religious Experience”



Sir William James কে আমরা হয়তো অনেকেই চিনি; একজন নামকরা বিজ্ঞানীতিনি ঈশ্বর বলে কিছু মানতেন নাকিন্তু, যারা মানতেন তাঁদের সম্বন্ধে তাঁর বিশেষ দরদ ছিলকারণ, তিনি দেখেছেন যে পৃথিবীর কোটি কোটি লোক ঈশ্বর মানেতিনি অনেক ঈশ্বর বিশ্বাসী সাধারন লোকের সাথে মিলে মিশে তাদের মনের ভাব জেনে একটা বই লিখেছিলেন- “Varieties of Religious Experience”

এই বইটিতে তিনি বিজ্ঞানীদের সতর্ক করে দিয়েছেন এই কথা বলে যে; “ঈশ্বর বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই- একথা কখনোই মানুষের কাছে প্রচার করবেন নাকারণ, ঈশ্বর বিশ্বাস মানুষকে যা দিতে পারে; আপনারা কিছুতেই তা দিতে পারেন নাঈশ্বর নেই এইকথা মানব সমাজে বলার কোন অধিকারই আপনার নেইএকটি ব্যাধিগ্রস্ত ছেলের মা যখন ঠাকুর মন্দিরে ডুকে কিছুক্ষন পরে বেরিয়ে এলো; তখন দেখা গেল, তার দুঃখভারাকান্ত মুখে উজ্জ্বলতার ছাপ পড়েছেসে যেন তার মনের বাথা কাউকে জানিয়ে এলো এবং যাকে জানালো সে তার কথা শুনেছে এবং তার ছেলেকে ভালও করে দিবেব্যাধিগ্রস্ত সন্তানের মায়ের মনের এ পরিবর্তন কোন বিজ্ঞানী আনতে পারবে না

আজ পর্যন্ত কোন Laboratory তে এমন কোন যন্ত্র বা Chemical আবিস্কার হয় নি, এমন কোন অংকের ফরমুলা বা equation নেইকাজেই যতদিন না আপনারা সে ধরনের কিছু আবিস্কার করতে পারছেন, ততদিন তাকে বিশ্বাস করতে দেন যে, ভগবান আছেন
তার এ বিশ্বাসটুকু কেড়ে নেবার আপনার কি অধিকার আছে???

[পুনশ্চঃ নাস্তিকতার আবরণ পরে বিজ্ঞানের হাওয়ায় গাঁ ভাসিয়ে মানবের চৈতন্যকে অস্বীকার করা এবং মানব চেতনার ক্রমবিকাশ, ব্যাপকতা ও বিশালতাকে উপেক্ষা করা একটি ক্ষতিকারক দুর্গতিপূর্ণ বিপ্লবএটা একটা বিশাল বড় বোকামিহিন্দু জাতির যে আধ্যাত্মিক ধাত, সেই ধাতে আমাদের পূর্বপুরুষ সহস্র বছর ধরে সাধনা করে আসছে; আমরা যেন তা থেকে বিচ্যুত না হইবিজ্ঞানের চর্চা আমরা অবশ্যই করবো, তবে আমাদের ধর্মীয় চেতনাকে বিসর্জন দিয়ে নয়তবেই সর্বনাশ হতে পারবে নামঙ্গল আসবেই।]

@joy ray
0 comments

"গুড়পুকুরের মেলা ও বিশ্বকর্মা পূজা"- ডা. সুব্রত ঘোষ


সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলাসম্ভবত দ্বাদশ শতকের প্রথমদিকে এই মেলার সূচনাএই মেলার ইতিহাস ও উৎপত্তি সম্পর্কে কয়েকটি কিংবদন্তী প্রচলিত আছেগুড়পুকুর মূলত সাতক্ষীরা জেলার অন্তর্গত একটি ঐতিহাসিক স্থানসাতক্ষীরা এক সময় সুন্দরবনের মতোই বনবেষ্ঠিত ছিলবন কেটে বসত করার ফলে এখন বন অনেকটাই সংকীর্ণ হয়ে পড়েছেএইসব এলাকার একটি নাম পাওয়া যায় বুড়নঅর্থাৎ ওই অঞ্চল যে জলাভমি ছিল, তার প্রমাণ এই নাম থেকেই পাওয়া যাচ্ছেমনসা মঙ্গল’ -এর বেহুলা লখিন্দরের কাহিনীও এই অঞ্চলকে স্পর্শ করেছেবেহুলা যখন সর্পদষ্ট মৃত স্বামীর লাশ কলার ভেলায় করে জলপথে যাচ্ছিলেন, পথিমধ্যে যে ঘাটে তাঁর দেখা হয়েছিল গোদা পাটনির সঙ্গে, সেই গোদা পাটনির নামে গড়ে ওঠে গোদাঘাটনামে একটি গ্রামতার এক মাইল দূরে আরেকটি জায়গার নাম হরো রেহুলার ঝোড়সর্পসঙ্কুল সাতক্ষীরায় বেহুলা লখিন্দরের কাহিনী নিয়ে প্রতি বছরই মনসা পূজাঅনুষ্ঠিত হয়এসব এলাকায় প্রতি বছরই সর্পদংশনে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়এখানকার অধিবাসীদের বিশ্বাস, সর্পদেবঅ মনসাকে পূজা করলে সাপের উপদ্রব থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শেষ তারিখে গুড়পুকুরের ধারে যে বিশাল বটবৃক্ষ ছিল, তার বাঁধানো চাতালে মনসা পূজা হয়সেই উপলক্ষে হয় গুড়পুকুরের মেলাগুড়পুকুরের সেই প্রাচীন বটবৃক্ষটি এখন আর নেইতদস্থলে একটি নতুন বটগাছ রোপণ করা হয়েছেগুড়পুকুর কেন নামকরণ করা হয়েছে, এ নিয়েও একাধিক কিংবদন্তী প্রচলিত রয়েছেগুড়পুকুর নামক এই পুকুরে নাকি একসময় মোটেই পানি থাকত নাতখন স্থানীয় কেউ স্বপ্ন দেখেন, ওই পুকুরে একশ ভাড় গুড় ঢাললে পানি উঠবে এবং কখনো শুকাবে নাস্বপ্ন অনুযায়ী পুকুরে গুনে গুনে একশ ভাড় গুড় ঢালা হলোআর অমনি পুকুরের তলদেশ থেকে পানি উঠে পুকুরটি কানায় কানায় ভরে গেলোপলাশপোল এলাকার প্রবীণদের কাছ থেকে আর এক রকম কিংবদন্তী শোনা যায়এখানকার অত্যন্ত প্রবীণ পরিবারদের অন্যতম খান চৌধুরী পরিবারএই পরিবারের পূর্বপুরুষেরা ব্রহ্মণ ছিলেন এবং তারা ছিলেন গৌর বর্ণের অধিকারীউত্তরাধিকার সূত্রে গৌরবর্ণের অধিকারী ছিলেন তারাওগৌরবর্ণের অধিকারী খান চৌধুরীরা ওই পুকুরের মালিক বিধায় পুকুরের নাম হয়েছে গুড়পুকুরগৌড়লোক মুখে ঘুরতে ঘুরতে গুড়েরূপান্তরিত হয়েছে বলে মনে করা হয়গুড়পুকুরের মেলাটা মূলত মনসা পূজা’ -কে কেন্দ্র করেই কারো কারো মতে ওটা হবে বিশ্বকর্মা পূজাপঞ্জিকা অনুযায়ী ভাদ্রের শেষ তারিখে বিশ্বকর্মা পূজা হওয়াই সঙ্গতকেননা মনসা পূজা হয় শ্রাবণ সংক্রান্তিতে অর্থাৎ শ্রাবণের শেষ তারিখেগুড়পুকুরের মেলার স্থানীয় উচ্চারণ গুড়পুকুরির মিলাসাতক্ষীরা জেলার সবচেয়ে বড় ও উল্লেখযোগ্য এই মেলাভাদ্র মাসের শেষ তারিখে মনসা পূজা উপলক্ষে গুড়পুকুর থেকে ইটাগাছা-কামাননগর পর্যন্ত বিশাল এলাকা জুড়ে মেলা বসেমূল মেলা এক দিনের হলেও তা একমাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়এই মেলার অন্যতম প্রদান বৈশিষ্ট হলো, বিভিন্ন প্রজাতির আম-জাম-লিচু-কাঠালের কলম ও চারার ব্যাপক সমারোহএছাড়া আরও অনেক ফল-ফলারীর চারাও উঠে এখানেকলমের চারার দোকানগুলো বসে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়েআরও একটি ুজুনস আমদানি হয় এখানেআম-জাম-সেগুন গাছের আসবাবপত্র তৈরীর কাঠ ও তৈরী আসবাবপত্রএই কাঠ বিশেষকরে সুন্দবন এলাকা থেকে আসেআগে কাঠের তৈরী আসবাবপত্র এই মেলায় আসত নদীপথেএগুলো আসত ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল প্রভৃতি অঞ্চল থেকেতখন সাতক্ষীরার প্রাণ-সায়ার খালে প্রাণের ¯্রােত বইতএখন সে খাল শুকিয়ে যাওয়ায় সেসব পণ্যের আমদানির একমাত্র মাধ্যম স্থলপথমেলার বিশেষ একটি আকর্ষন ছিল বিনোদনমূলক ব্যবস্থাএগুলোর মধ্যে নাগরদোলা, যাদু, পুতুলনাচ, মৃত্যুকূপ, সার্কাস, যাত্রাগান উল্লেখযোগ্য

মূল শহরের কোলহল থেকে একটু দূরে সাতক্ষীরা-কালিগঞ্জ সড়কে পলাশপোল স্কুলের উত্তর-পশ্চিম কোণের বটতলায় গুড়পুকুরের ঠিক পাশেই সংরক্ষিত জায়গায় প্রায় তিনশ বছরের ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলা মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের মনসা পূজাকে কেন্দ্র করে হলেও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক মিলনমেলায় পরিনত হয়ে ওঠেআগেকার দিনে মেলা উপলক্ষে আত্মীয়-স্বপন চলে আসত সাতক্ষীরায়বাড়ি বাড়ি পড়ে যেত সাজ সাজ রবঈদ, দূর্গাপূজা কিংবা অন্যান্য অনেক উল্লেখযোগ্য পার্বনকে ছাপিয়ে এ মেলাই হয়ে উঠত সকলের মিলন মেলা- প্রাণের উৎসবেবিভিন্ন ব্যবসায়ীরাও সারা বছর প্রস্তুতি নিত এই মেলাকে ঘিরেকাঠের মিস্ত্রীরা এই মেলাকে ঘিরে সারাবছর ধরে তৈরী করত কাঠের আসবাবপত্র, কামার রা সারা বছর গায়ের ঘাম ঝরাত এই মেলাকে উপলক্ষ করেইআবাল বৃদ্ধবনিতা সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকত এই মেলার জন্যকোন এক সময় কলকাতা, লন্ডন প্রভৃতি শহরসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও ব্যবসায়ীরা আসত এই মেলায় অংশগ্রহনের জন্যবর্তমানে মেলার মূলস্থানের আশেপাশে স্থায়ী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, শহরের প্রধান প্রধান সড়কের ফুটপাত বেদখল হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে মেলাটি তার জৌলুস হারিয়ে ফেলেছেএই সব ছোটখাট সমস্যাকে অতিক্রম করে মেলার চূড়ান্ত সমাধি রচিত হয় ২০০২ সালেস্থানীয় প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী শক্তিরা আগে থেকেই মেলাটি বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করে আসছিল২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর এরই অংশ হিসেবে মাত্র ১১ মিনিটের মধ্যে একটি সিনেমা হলে শো ও স্টেডিয়ামে সার্কাস চলাকালীন দুইটি শক্তিশালী বোমার বিষ্ফোরণ ঘটায়বোমা হামলায় ৩ জন নিহত হয়আহত হয় নারী-শিশুসহ কয়েক শতাধিক মানুষঅনেকেই পঙ্গু হয়ে এখনো সেই হামলার দুর্বিষহ স্মৃতি বহন করে বেড়াচ্ছেবর্বর এই হামলার পর থেকে মেলাটি এক প্রকার বন্ধই হয়ে যায়পূজা আর দায়সারাভাবে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়েই সাতক্ষীরার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী মেলাটি পালিত হতে থাকেমেলার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মেলাটি বিশেষ কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তঃধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধের মিলনমেলায় পরিণত হতোগুড়পুকুরের মেলা কেবল একটি পূজা নয় মাত্র সাতক্ষীরাবাসীয় চিরায়ত ঐতিহ্যের ধারক ও বাহকব্যাক্তি-স্থান-কাল-পাত্রকে ছাড়িয়ে এ মেলার আবেদন সার্বজনীনআমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয় স্থানীয় জেলা প্রশাসন এবারে মাসব্যাপী জাকজমকভাবে মেলাটি আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেগুড়পুকুরের মেলা আগের জৌলুসে ফিরে আসুক এটাই কাম্য

বারমাসে তের পার্বনের অন্যতম প্রধান পূজা বিশ্বকর্মাবিষ্ণু পুরাণ মতে বিশ্বকর্মা একজন দেবশিল্পীবেদে পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বকর্মা বলা হয়েছেতাঁর পিতার নাম প্রভাষপ্রভাষ হচ্ছেন অষ্ট বসুর মধ্যে সপ্তম বসুঅষ্টবসু মানে আটজন গণদেবতাতাঁর হলেনঃ ধর, ধ্রুব, সোম, অনিল, অনল, প্রত্যুষ, প্রভাষ ও দ্যুএই অষ্টবসু দক্ষরাজার কন্যা বসুর পুত্রধর্মের ঔরসে বসু ভার্য্যার গর্ভের সন্তানতবে শাস্ত্রে নয় শ্রেণী গণদেবতার উল্লেখ রয়েছেঃ ১. আদিত্য ১২ জন, ২. ডবশ্বদেব ১০ জন, ৩. বসু ৮ জন, ৪. তুষিত ৩৬ জন, ৫. আভাশ্বর. ৬৪ জন, ৬. অনিল ৪৯ জন, ৭. মহারাজিক ২২০ জন, ৮. সাধ্য ১২ জন ও ৯. রুদ্র ১১ জননয় শ্রেণীর গণদেবতা সকলেই শিবের অনুচরএই নয় শ্রেণীর গণদেবতার নেতা হচ্ছেন গনেশগণদেবতারা গণপর্বত কৈলাসে বসবাস করেনবিশ্বকর্মার মাতার নাম যোগসিদ্ধাযোগসিদ্ধা হচ্ছেন দেবগুরু বৃহস্পতির বোনবৃহস্পতি ও শুক্র দুই ভাইব্রহ্মা তনয় কশ্যপ ঋষির ঔরসে অদিতির গর্ভের সন্তান বৃহস্পতি এবং কশ্যপ ঋষির ঔরসে দিতির গর্ভের সন্তান শুক্রবৃহস্পতি দেবতাদের গুরু এবং শুক্র অসুরদের গুরুদেবতা ও অসুর কোন পৃথক জাতি নয়মহাভারত ও পুরাণ মতে তারা একই পিতার ঔরসজাত সন্তানকশ্যপের অপর পতœী দনুর গর্ভজাত সন্তান দানবদেবতাদের সন্তান প্রসব একটি জ্যোতি মাত্রএই জ্যোতি নাভি স্পর্শ হলেই সঙ্গে সঙ্গে সন্তান প্রসব হয়আর তৎকালীন ব্রাহ্মনদের সন্তান হতে সময় লাগত একমাস এবং ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের সন্তান প্রসব হতে সময় ক্ষেপন হয় ১০ মাস ১০ দিনতবে ব্রাহ্মনদের বর্তশান সন্তান প্রসব প্রক্রিয়া ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের অনুরূপঋকবেদে উল্লেখ আছে যে, বিশ্বকর্মা সর্বদর্শী ভগবানতাঁর চক্ষু, মুখমন্ডল, বাহু ও পদদ্বয় সর্বদিক ব্যাপিয়া রয়েছেবাহু ও পদদ্বয়ের সাহায্যে তিনি স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল অর্থাৎ ত্রিভবন নির্মাণ করেছেনবিশ্বকর্মা শিল্প সমূহের প্রকাশক, অলংকারের ¯্রষ্টা এবং দেবতাদের বিমান ও রথ নির্মাতাতাঁর অশেষ কৃপায় মানবজাতি শিল্প কলায় পারদর্শিতা লাভ করেছেউপবেদ, স্থাপত্যবেদ এর রচয়িতা এবং চতুঃষষ্ঠী কলার অধিষ্ঠাতা হচ্ছেন বিশ্বকর্মাতিনি প্রাসাদ, ভবন, উদ্যান প্রভৃতির শিল্প প্রজাপতিবিশ্বকর্মা কেবল দেবশিল্পীউ নন, দেবতার অস্ত্রাদিও প্রস্তুত করেছেনসকল আগ্নেয়াস্ত্র তাঁরই নির্মিতমহাভারত মতে তিনি শিল্পের শ্রেষ্ঠকর্তা, সহ¯্র শিল্পের আবিস্কারক এবং সর্বপ্রকার কারুকার্য নির্মাতাপুরাণ অনুসাওে বিশ্বকর্মা রাক্ষসপুরী লঙ্কা নগরীর নির্মাতানল নামধারী বানর বিশ্বকর্মার পুত্রত্রেতাযুগের অবতার রামচন্দ্র সমুদ্রের সেতু বন্ধান নির্মাণকালে বিশ্বকর্মা নল বানরকে সৃষ্টি করেছিলেনপুরাণের কল্পনা অনুসারে নলের জন্মকালে বিশ্বকর্মাও বানর ছিলেনপরবর্তীকালে বিশ্বকর্মার যে মূর্তিটি পরিচিত হয়েছে, সেটি ছিল হস্তীবাহনপক্ষান্তরে হরপ্পা সংস্কৃতির শীলমোহরে হাতীর চিহ্ন বহুবারই পাওয়া গিয়েছেবিশ্বকর্মা দেবতাদের পুস্পক রথের নির্মাতা, আগ্নেয়াস্ত্রের ¯্রষ্টা, শ্রীবিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, শিবের ত্রিশূল, লক্ষ্মীর কোষাধ্যক্ষ কুবেরের কুবের পাশ, কার্তিক বল, পঞ্চপানডবের ইন্দ্রপ্রস্থ নগরী তৈরী এবং শ্রী ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ জগন্নাথের বিগ্রহ নির্মাতা সহ¯্র শিল্প বিদ্যার অধিকারী বিশ্বকর্মা যবিষ্ঠ বা অগ্নিরূপে কথিততাঁর হস্তীবাহন মূর্তির হাতে মশালও রয়েছে হাতুরীর সঙ্গে

বিশ্বকর্মা সৃষ্টিশক্তির রূপক নামতিনি ধাতা, বিশ্ব দ্রষ্টা ও প্রজাপতিতিনি পিতা, সর্বজ্ঞ দেবতাদের নাম দাতা এবং মর্ত্যজীবের অনধিগম্যবিশ্বকর্মা সর্বমেধ যজ্ঞে নিজেকে নিজের কাছে বলি দিয়েছেনতিনি বাচস্পতি, মনোজব, বদান্য, কল্যাণ কর্মা ও বিধাতাকোন এক পুরাণ মতে বিশ্বকর্মা বৈদিক ত্বষ্টা দেবতাদের কর্মশক্তিও আত্মসাৎ করেছিলেনএইজন্য তিনি ত্বষ্টা নামেও অভিহিতবৈদিক দেবতা ত্বষ্টার বিভিন্ন গুণ ছিলত্বষ্টা, বিশ্বকর্মা এবং বিস্মৃতনামা হরপ্পীয় শিল্প দেবতা একাকার হয়ে মিলেমিশে গিয়েছেবিশ্বকর্মা নিজের কন্যা সজ্ঞাকে সূর্য্যরে সঙ্গে বিবাহ দেনেরামায়ণ ও মহাভারত মতে সূর্য হচ্ছে কশ্যপ ঋষির ঔরসে অদিতির গর্ভের সন্তানঅদিতির নাম অনুসারে সূর্যের আরেক নাম আদিত্যসজ্ঞা সূর্য্যরে প্রখর তাপ সহ্য করতে পারেন নাই, তাই সজ্ঞার পিতা বিশ্বকর্মা শান চক্র স্থাপন করে সূর্য্যওে উজ্জ্বলতার এক অষ্টমাংশ কর্তন করেনএই কর্তিত অংশ পৃথিবীর উপর পতিত হলে উক্ত অংশের দ্বারা বিশ্বকর্মা দেবতাদের বিভিন্ন অস্ত্র তৈরী করে দিয়েছেনবিশ্বকর্মা পূজা ভাদ্র সংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হয়ভাদ্র সংক্রান্তিতেই কেন তার পূজা করা হয় এ সম্পর্কে বৃহৎ সংহিতাতে উল্লেখ রয়েছে, গ্রীষ্মের শেষে সূর্য মেঘ রচনা করে কর্মের মাধ্যমে বিশ্বের কর্ম অর্থাৎ কৃষি সংরক্ষণ করেনতাই তিনি হচ্ছেন বিশ্বকর্মাভাদ্র মাসের শেষের দিকে বর্ষা শেষ হয়ে যায়তখন কৃষি কর্মের পূর্ণতা হয় এবং তখন কৃষকেরা ফসলের জন্য প্রতিক্ষা করেনতাই সেই কর্ম ক্ষান্তিতে অর্থাৎ ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে তাঁকে পূজা করে কৃতজ্ঞতা নিবেদন করেনএমতাবস্থায় দেখা যায়, বিশ্বকর্মা শুধু শ্রমিকের নয়, কৃষকদেরও উপাস্য দেবতাবিশ্বকর্মা শুধু দেবশিল্পী নন, তিনি মর্ত্যবাসী মানবদেরও শিল্প প্রজাপতিতাঁর আশীর্বাদে মর্ত্যবাসীগণ শিল্পকাজে যথেষ্ট পারদর্শী হয়েছেনতিনি বর্তমান শ্রীলংকা নগরীর নির্মাতা এবং পঞ্চপান্ডবের প্রসাদও নির্মাণ করেছেনতাই দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তারূপে আখ্যায়িত করা হয়েছেঋকবেদেও বিশ্বকর্মাকে সর্বদর্শী ভগবান বলা হয়েছে

(তথ্যসূত্রঃ হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থাবলী)

লেখকঃ কলামিস্ট, সংগঠক, চিকিৎসক ও সমাজকর্মী
0 comments

"সনাতন ধর্ম, মানব ধর্ম"

-->
হিন্দু ধর্ম মানবের ধর্ম। হিন্দু নামটা আমাদের দেওয়া নয়, পরের দেওয়া নাম। সংস্কৃতে এ শব্দটি নেই, কিন্তু এই নামটা আমরাও ছাড়তে পারি না। একেবারে চামড়ার সাথে মিশে গেছে। যেমন, একটি মানুষের নাম ঢেমনা। ঢেমনা মানে একটি লতার শেকড়। কিন্তু, নাম একবার হয়ে গেছে, তাই মানুষ তার নাম ঢেমনাই বলতে হবে। তেমনি, আমাদের ধর্মের নামও থাকবে হিন্দু। কিন্তু, হিন্দু আমাদের নাম নয়। এর একটি সুন্দর নাম আছে। নামটি হল “সনাতন ধর্ম”।

সনাতন মানে চিরস্থায়ী, চিরকালের ধর্ম। আসল নামটা হল মনুষ্যত্ব- এটাই মূল ধর্ম। মূল তত্ত্বটাই “মানবধর্ম”। প্রাচীন নাম সনাতন ধর্ম- মানব মাত্রেই এটা ধর্ম। আর এ জন্যই এই ধর্মে “conversion” নেই। ধর্মে কখনো convert করা যায় না। আপনার মধ্যে যদি মনুষ্যত্ব না থাকে, তবে আপনাকে মনুষ্যত্ব দেবার চেষ্টা করতে হবে। কি করে দেব? উপদেশ আর আদর্শ। আমি নিজে মানুষ হয়ে আপনার সাথে মেলামেশা করতে করতে আপনি আমাকে দেখে মানুষ হয়ে যাবেন। এই জন্যই হিন্দু ধর্মে convert করার কোন চেষ্টাই করা হয় নি। যেটা মানব ধর্ম, সেখানে আবার conversion কিসের? আপনি মানুষ আপনাকে অপর ধর্মে নেবার কোন অর্থ হয় না। যে মনুষ্যত্ব অর্জন করে নি, তাকে মনুষ্যত্ব দেবার চেষ্টা করা যায়; মানুষকে মনুষ্যপদ বাচ্য করে তোলবার চেষ্টা করা যায়। 

তবে হ্যাঁ, শুধুমাত্র  উপদেশ দিয়ে মানুষ গড়া কষ্টকর। চুরি করো না, মিথ্যা বলো না, হিংসা করো না, মানুষ হও, মানুষ হওয়া উচিত- ইত্যাদি উপদেশের সাথে একটি পরম আদর্শের যোগ করে দিতে হয়- যার কাছে যেতে হলে, যার কৃপা পেতে হলে আগে মানুষ হওয়া দরকার। যে চোর, সে তার অনুগ্রহ পায় না। যে মিথ্যাবাদী, তিনি তাকে শাস্তি দেন। এ ভাবে একটি বড় জিনিসের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়। যেমন, মানুষকে ভাল করার জন্য পুলিশের ভয়, রাজার ভয়, জেলখানার ভয়- ইত্যাদি ব্যবস্থা সমাজকে রাখতে হয়েছে। তেমনি, মানুষকে মানুষ করার জন্য ভয়, ভালোবাসা, প্রেম, প্রীতি ইত্যাদি মিলিয়ে ঈশ্বরের সাথে একটা সম্পর্ক রাখতে হয়। অর্থাৎ মনুষ্যত্বের সাথে দেবত্বের আলো দেওয়া প্রয়োজন। লক্ষ্যটা মনুষ্যত্ব পর্যন্তই থাকবে না, আরও উপরে লক্ষ্যটি রাখতে হবে, তবেই ঠিক ঠিক মনুষ্যত্ব লাভ হবে।
আর তবেই, সার্থক হবে “মানবধর্ম”, সার্থক হবে “সনাতন ধর্ম”।
(সহায়ক গ্রন্থ : মানবধর্ম, ডঃ মহানামব্রত ব্রক্ষচারী) 

0 comments

"গর্বের সাথে বলুন আমি হিন্দু"

-->
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন , '' ধর্ম হল সেটাই , যা পশুকে মানুষে এবং মানুষকে দেবতায় পরিণত করে''
এর অর্থ হল , - ধর্ম ' হল একটি বিকাশের প্রক্রিয়া পাশবিক মানুষের আনন্দ শুধু শরীরগত শরীরের সুখ বা ইন্দ্রিয়চরিতার্থতা ছাড়া সে আর কিছুই বোঝেনা
আর একটু উন্নত হলে মানুষ মানসিক আনন্দলাভের অধিকারী হয় , তখন সে সাহিত্য রস , শিল্পের রস অনুভব করতে পারে এটাকে মানবীয় স্তর বলা যায়
আরও উন্নত অবস্থায় মানুষ ঈশ্বরীয় আনন্দে বিভোর হয় , ধ্যানাবস্থায় শান্তির অপূর্ব পরিবেশ অনুভব করতে পারে ; যাকে বলা যায় দৈবী স্তর
এভাবে উন্নত হতে হতে মানুষ যখন দেহ , মন ইন্দ্রিয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে তখনই সে লাভ করে শাশ্বত জ্ঞান বা সনাতন সত্য
সে অনুভব করে সে ক্ষুদ্র নয় সে দেহ নয় , মন নয় এমনকি চিন্তা চেতনাও নয় , সে আত্মা সে এক অনন্ত , অখণ্ড অস্তিত্ব
মানুষ তখন তার ক্ষুদ্রতার খোলস পরিত্যাগ করে অনন্ত ' আমিত্বে ' লীন হয়ে যায়
' নির্গচ্ছতি জগজ্জালাৎ পিঞ্জরাদিব কেশরী ' -- সিংহ যেমন পিঞ্জর ভেঙ্গে ফেলে বেরিয়ে যায় ঠিক তেমনি সে এই জগৎ-জাল ভেদ করে মুক্ত হয়ে যায় ধর্মের চরম লক্ষ্য হল মুক্তি ধর্ম হল এই রূপান্তরের প্রক্রিয়া , যা পশুকে মানুষে , মানুষকে দেবতায় এবং দেবতাকে ঈশ্বরে বিকশিত করে

ঋষিদের আবিষ্কৃত এই সত্যলাভের পথই সনাতন ধর্ম
0 comments

সনাতন আর্য্যধর্ম ও বিবর্তনবাদ

বিবর্তনবাদ-মানব তথা প্রাণীজগতের উদ্ভবের নতুনতত্ত্ব। যা গড়ে ওঠে মূলতঃ ধর্মের বিরুদ্ধ কিছু মতবাদ নিয়েই। হিফেসটাস, সিসেরা, প্লুটার্ক, কোপার্নিকাস, জি ব্রুনো, গ্যালিলিও প্রভৃতিরা সূচনা করেন সূর্য ও পৃথিবী কেন্দ্রীক বিরোধিতা, যা বাইবেলকে সরাসরি বিরোধিতা করে। ফলে পরবর্তীতে ডারউইন যখন তার বিবর্তনবাদ তত্ত্ব প্রকাশ করেন, তা স্বভাবতই ধর্মগ্রন্থের বর্ণনার বিরোধী দিক হিসেবে গৃহীত
হয় ১৯৫৯ সালে তার Origin of species by means of Natural selection এবং ১৮৭১ সালে Decent of man বই দ্বারা তার তত্বটিকে তিনি স্পষ্ট করেন। যদিও তখন থেকেই তা ধর্মের বিরুদ্ধে ছাড়িয়ে যায় প্রধানত ১৮৬০ সালের ৩০ জন ডারুইনবাদ নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্কের জন্য যার আয়োজন করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Association for the Advancement of science পক্ষে বিবর্তনবাদী T.H. Haxli বিপক্ষে বিশপ Wilberforce ১৯২৭ সালের জানুয়ারীতে মামলা হয়, যা নিষ্পত্তি হয় ৬০ এর দশকে যেখানে বিবর্তনবাদ পড়ানোর পাশাপাশি বাইবেলীয় সৃষ্টিতত্ত্ব পড়ানোর ও সিদ্ধান্ত হয়। তবে প্রকৃত সেতুবন্ধনটি কেউ খোঁজার চেষ্টাও করেনি। তুলনামূলক ভাবে দেখা যায় যে বিবর্তনবাদ অনুসারে প্রথমে জলজ জীব হিসেবে ছোট কনিকা বা জেলির ন্যায় কোষের উদ্ভব হয়। এর কিছু কিছু সাগরের নীচে মৃত বা জীবিত জমে শ্যাওলা জাতীয় উদ্ভিদের জন্ম দেয়, যা দেখে সমুদ্রের নীচের বৃক্ষরাজির উদ্ভব। ক্রমান্বয়ে ম্যানগ্রোভ জাতীয় বৃক্ষ এবং স'লজ বৃক্ষ। আবার ঐ জেলী গুলোই ক্রমান্বয়ে মৎস্যজাতীয় প্রাণীতে পরিনত হয়। ছোট মাছ থেকে বড় মাছ। মৎস্য জাতীয় জলজ প্রাণী থেকে উভচর প্রাণীর উদ্ভব যেমনঃ ব্যাঙ, কচ্ছপ। তার থেকে উদ্ভব সরীসৃপ প্রাণীর যেমনঃ সাপ, টিকটিকি ডাইনোসোর বা কিংবা পেঙ্গুইন, এমু, উটপাখি প্রভৃতি পাখির, যা পরবর্তীতে পূর্ণ পাখিতে রুপান-রিত হয়। আবার, সরীসৃপ থেকে স-ন্যপায়ী বৃহদাকার প্রানীর উদ্ভব হয় শূকর, বাঘ, হাতি, তৃণভোজী বৃহদাকার বিলুপ্ত প্রাণী সমূহের এরই একটা অংশ এ্যাপ জাতীয় উপধারা যেখানে গরিল, বানর শিম্পাজী প্রভৃতি অন-ভূক্ত। এরই ধারায় আদিম মানুষ ক্রমান্বয়ে সভ্য মানুষ। পক্ষান-রে সনাতন ধর্মের বা আর্য্যমতের শাস্ত্র শতপথও তৈত্তিরীয় সংহিতা কিংবা বায়ু পুরাণ বা সৌরপুরাণও তাই বলে। মুলতঃ আর্যশাস্ত্র সমূহ বিবর্তনবাদের সমর্থন বা ইঙ্গিত পূর্বেই দিয়েছিল।
পূর্বোক্ত বিবর্তনবাদের ধারা বিবরণীতে ৫টি ধরণ দেখতে পাই যার সাথে শাস্ত্র সমুহের অবতারের সামঞ্জস্য মেলে। যেমন:
১.জলজ প্রাণী (মৎস্য জাতীয়)--------মৎস্য অবতার (মাছ)
২.উভচর প্রাণী (কচ্ছপ, ব্যাঙ, প্রভৃতি)-কূর্ম অবতার (কচ্ছপ)
৩.স্থলজ প্রাণী (শূকর, গরু, সিংহ প্রভৃতি)-----বরাহ অবতার (শূকর)
৪.এ্যাপজাতীয় প্রাণী (শিম্পাজী বা বন্যদশার মানুষ)--------- নৃসিংহ অবতার
৫.মানবজাতি (বর্বরদশা) ------------------ বামন অবতার
৬.মানবজাতি (সভ্যতা)-------রাম অবতার ও তৎপরবর্তীগণ

অর্থাৎ জলজ প্রাণীদেরকে সঠিক পথের নির্দেশনা দিতে পরমপিতাকে বা ভগবানকে মৎস্যজাতীয় প্রাণী হয়েই জন্মাতে হয়েছে। কারণ মানুষের কথা তো আর মাছে বোঝে না। এভাবেই উভচর প্রাণীর উদ্ভব হলে তিনি কচছপ জাতীয় প্রাণী হয়েই জন্মগ্রহন করেন। এক্ষেত্রে মূল বিষয় হল তিনি উভচর প্রাণীদের জন্য আসেন। পরে স্থলজ প্রাণী সমূহের উদ্ভব হলে তিনি তাদেরকে ও উদ্ধার করতে অবতীর্ণ হন শূকররুপী স্থলজ জীববেশে। পরবর্তীতে যখন স্তন্যপায়ী বা এ্যাপজাতীয় প্রানীর উদ্ভব হয়, তখন থেকে বনমানুষ পর্যন্ত তাদেরকে স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে দেখা হয় না। অর্থাৎ দেখতে ক্রমান্বয়ে মানুষের মত হলেও পশুপ্রবৃত্তি বিদ্যমান ছিল তাদের খাদ্যাভ্যাস বাসস্থান, যৌনক্রিয়া প্রভৃতিতে। ঠিক এরই স্বয়ম্ভু যেন অর্ধেক নর(মানুষ)+ অর্ধেক সিংহ(পশু)=নৃসিংহরূপ। পরবর্তীতে সভ্য মানুষের মধ্যে বিভিন্ন অবতারের আর্বিভাব।
যাহোক, এখানে দুটি বিতর্ক আসতে পারে।
১। এগুলো কাল্পনিকও তো হতে পারে!
২। আর সত্য হলেও ভগবান কেন শুধু মাছ, কচ্ছপ ও শূকর হয়ে জন্মাবেন, অন্য কোন জলজ, উভচর বা স্থলজ প্রানী কেন হলেন না।
প্রথমত, কাল্পনিকতার প্রশ্নটি আসবে বিবর্তনবাদীদের পক্ষ থেকে। কিন্ত ভেবেছেন কি, একটা সূত্র ধরে জেলী থেকে সভ্য মানুষ পর্যন্ত যে ক্রম তা কি নিছকই কল্পনা নয়। আর দ্বিতীয়ত এখানে জলজ প্রাণীগুলোর অধিপতি হিসেবে মৎস্য অবতারকে, উভচর প্রাণীর অধিপতি হিসেবে কূর্ম অবতারকে এবং স্থলজ প্রাণীর অধিপতি হিসেবে শূকরকে দেখানো হয়েছে। তৎপর মানুষের পূর্বরূপ বা এ্যাপজাতীয় রূপের কল্পনায় নৃসিংহ অবতার। যার অবয়ব মানুষের মত হলেও সিংহের মত হিংস্র পশুবৃত্তি সম্পন্ন রূপের প্রকাশ। তাহলে কি পাখি, সাপ, ডাইনোসর, প্রভৃতির ভিতর অবতারের আবশ্যকতা ছিল না। অবশ্যই ছিল। গীতা অনুসারে পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ আরও বৈজ্ঞানিকভাবে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে যখন যখন ধর্মের গ্লানি হবে তখন তখনই তিনি আসতে পারেন, অর্থাৎ তার সংখ্যা অর্নিণেয়। আবার উল্লেখ করেছেন, যে যেভাবে তার ভজনা করেন, সেইভাবে তিনি তা গ্রহন করেন। অর্থাৎ তা শুধু মানুষ নয়, পাখি, মাছ, পশু সহ সমগ্র প্রাণীজগতের জন্য প্রযোজ্য। সব চেয়ে বড় প্রশ্ন তাহলে পৃথিবীর আদি মাতা-পিতা মনু বা শতরুপার স্থান কোথায়? ধর্ম তো বলে তারাই আদি পিতা এবং আদি মাতা। মিথ্যা নয়। আমরা মনুর পুত্র বলেই মনু+ষ্ণ = মানব জাতি বলে অভিহিত।
নৃ-তাত্ত্বিক গবেষণা বলে প্রত্যেক নৃ-তাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী যা একই গোষ্ঠীর ধারাকে বজায় রেখে চলে বা এখনও চলেছে তাদের মধ্যে Headman বা গোষ্ঠী প্রধান বলে একজন থাকেন যিনি সব নিয়ন্ত্রন করেন। অনেক ক্ষেত্রে কোন কোন গোষ্ঠী প্রধানকে নিয়ে বা তার প্রভাবকে নিয়ে বহুদিন মুখে মুখে গল্প প্রচলিত থাকে। তৈরী হয় মিথ। যাকে তারা তাদের গোষ্ঠীর উৎপত্তির নেতা স্বরপ ধরে নেয় এবং তাকে তদ্রুপ সম্মানও করে। ঠিক তেমনিই ভারতীয় আর্য্যসমাজের প্রথম রূপকার ভগবান মনু। এর অর্থ এই নয় যে, তার কোন পিতা-মাতা ছিল না। আবার তার যোগ্য সহধর্মিনী ছিলেন মা শতরূপা। তাই মনু রচিত মনুসংহিতা আজও আর্য সংস্কার সমুহের প্রধান নিদের্শক গ্রন্থ । এখন কথা হচ্ছে, আধুনিক ‘ব’ কলম শিক্ষিতরা যেটা হরহামেশাই বলে থাকেন যে, হয়তো দশাবতারের কল্পনা বিবর্তনবাদ তত্ত্বকে অনুসরণ করেই করা হয়েছে। অর্থাৎ তত্ত্ব আগে, শাস্ত্র পরে তৈরী হয়েছে । কিন্ত না, বিবর্তনবাদ তত্ত্ব শুরুই হয় মাত্র ১৫১ বছর পূর্বে। মূলত তার কয়েক হাজার পূর্বেই বিবর্তনবাদের অস্তিত্ব বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন আর্য্যঋষিরা, কিন্ত আধ্যাত্মিক চিন্তার প্রাধান্যের কারণে এর রূপটি ছিল অন্যরকম। পদ্মপুরানের বর্ননায় এসব প্রাণীর সংখ্যাও
নির্দিষ্ট। যুগে যুগে বিভিন্ন অবতার ভগবান বা পুরুষোত্তমেরা এসবের যুগোপযোগী বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে গেছেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে প্রশ্ন করা হয়েছিল-"Theory of evolution কি ?" ঠাকুর বললেন-"From the fine to the gross and from the gross to the fine. এই যে being এর ক্রমবিবর্তন একেই evolution বলে। অর্থাৎ Being এর external becoming কে evolution বলে । এই evolution চলছে beyond and environment যে Stimulus দিচ্ছে being এর উপর তার দরুন জীব তার evolution কে Control, Manipulate, profitably manage করতে চেষ্টা করছে সৃষ্টির আদি থেকে। কারন এই পরিবেশে তাকে দিচেছ পদে-পদে আঘাত। এর ফলে হচ্ছে জীবের further progress towards struggle করার জন্য তাদের শরীর ও মনের একটা পরিবর্তন আসছে, যার ফলে বেঁচে থাকতে থাকতেই তাদের Appearance এর একটা palpable পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এ পরিবর্তন পরিস্কার হয়ে ফুটে উঠেছে তাদের Descendants দের ভিতর দিয়ে। কোন particular environment কে manage করতে হলে শারীরিক বিধানের ভিতর যে যে পরিবর্তন দরকার সেখানে তেমন পরিবর্তন সবটাই দেখা দিয়েছে এবং মনের পরিবর্তন এসেছে ঐ অনুপাতে। পূবর্তন যারা
struggle করে করে মারা গেল হয়তো তাদের জীবন environment কে control করতে তেমনভাবে সক্ষম হলো না। তারা তাদের ঐ মনের অবস্থা নিয়ে জন্মান Descendants হয়ে। Science ঐ আগের টুকু স্বীকার করে। কিন্ত বর্ণাশ্রমধর্মী আর্যেরা জন্মান্তরবাদ স্বীকার করে ঐ জিনিষটাকে আরও ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। এই ক্রমপরিবর্তনের ধারা চলতে চলতে এক স্তরে এ্যাপমেন এ পৌঁছেছে। এরপর থেকেই মানুষের সৃষ্টি। এমনকি এখনও অনেক অনেক এ্যাপমেন এর মত মুখ দেখা যায় । গায়ে লোমও ঠিক পশুর মতন। সৃষ্টি একই সময় হয়নি বলে এবং এখনও সমানভাবে চলছে বলে জীবের মধ্যে কতগুলো মানুষ অবস্থায় এসে পৌছে গেছে, কতক মানুষ অবস্থার দিকে চলছে, কতক Embryonic stage-এ এখনও আছে। মানুষ আমরা আস্তে আস্তে এই evolution এর ফলে superior man এ পরিবর্তিত হচ্ছি।" এত সহজে, ধারাবাহিকভাবে এবং সংক্ষিপ্ত পরিসরে Theory of evolution ডারুইনের বইতে বটেই, নৃবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে কোন পাঠ্যবইয়ে বা নৃবৈজ্ঞানিক বইয়ে আমি পাইনি। সবচেয়ে বিস্ময়কর কথা হচ্ছে ঠাকুর তিনটি ধাপ স্পষ্ট করেছেন। Apeman>>>Man>>>Superior Man যার শেষ স্তরটি বিবর্তনবাদীদের ধারনায় এখনও এসেছে কিনা সন্দেহ। কাল্পনিক Super man বা Alien কে যদিও কেউ কেউ কল্পনা করে থাকেন। তবে যেহেতু পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, আচরণগত প্রভৃতি বিভিন্ন পরিবর্তন দ্বারা বিবর্তনের ধারা ক্রমবহমান। তাই Super man এর পরিপূর্ণ রূপ পাওয়া যায় না। অর্থাৎ খাদ্যভ্যাসে কি পরিবর্তন আসবে? পরিবেশে কি পরিবর্তন আসবে? কিংবা পোশাক বা আচরণে কি পরিবর্তন আসবে? ঠাকুর কিন্তু Super man হওয়ার ক্ষেত্রে অনেকগুলো সূচক স্পষ্ট করেই গেছেন। যেমন খাদ্যের দিক থেকে যদি দেখা হয়, তবে একটি পর্যায় লক্ষ্যনীয় - কাঁচা মাছ-মাংস আহার >>> সিদ্ধ মাছ-মাংস আহার>>>রান্না মাছ-মাংস আহার>>>নিরামিষ আহার। বর্তমানে যা ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে খাদ্যমান ও পুষ্টিগুনের কারণে, ধর্মীয় কারণ তো আছেই। আবার এই বিবর্তনের ধারাকেও ঠাকুর সর্বদা চলমান বলেছেন, যা বিবর্তনবাদের মূলকথা। কিন্ত বিবর্তনবাদ নিজেই জেলী থেমে মানুষে যেন থেমে গেছে। অর্থাৎ ধর্মীয় ব্যাখ্যায় যেমন মানুষকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, বিবর্তনবাদীরাও তার বাইরের বিবর্তন যেন ব্যাখ্যা করতে অসমর্থ। ঠাকুর প্রথম নৃবিজ্ঞানী যিনি মানুষের পরেও বিবর্তন সম্ভব এবং তা কিভাবে তার ব্যাখ্যা করে গেছেন। ঠাকুরের মতে, বিবর্তন সর্বদা উন্নতিমূখী হবে। তার মতে, "Revolution এর মধ্যে evolution নাও
থাকতে পারে। হয়তো প্লাবিত করে দিল কিন্ত কেন্দ্রে আকৃষ্ট করল না। কিন্ত বিবর্তিত হতে গেলে সুকেন্দ্রিক হওয়াই চাই।" অর্থাৎ পূর্বে থেকে Headman কে মেনে যেমন গোষ্ঠীগুলো টিকে ছিল, সেখানে Headman গোষ্ঠীর সবকিছুর নিয়ন্তা ছিলেন। সেখানে বর্তমানে আধুনিক তথা অত্যাধুনিক যুগে গোষ্ঠীর সংকীর্ণতা পেরিয়ে মানুষ বহুজাতিক সংমিশ্রনে কিংবা বিশ্বায়নের একজন সদস্য। তাই তার বিবর্তনের জন্য তেমনই একজন Headman প্রয়োজন যার মধ্যে আছে দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, মহাকাশ বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র, ব্যবসায় শিক্ষা, অর্থনীতি, কৃষি-শিল্প, যৌন শাস্ত্র, স্বাস্থ্য ও সদাচার সূত্র তথা জীবনের বাঁচা-বাড়ার লওয়াজিমার সকল দিক। এমন ব্যক্তিই হতে পারে বর্তমান বিশ্বায়িত সমাজের মানুষের জন্য যোগ্যতম আদর্শ বা Headman। আর এভাবেই তো গড়ে উঠে সমাজ ক্রমবিবর্তনের পথে। তাই শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র এসব অবতারবাদকে বিবর্তনবাদের উদাহরণ হিসেবেই দেখেছেন এবং সুন্দরভাবে সমাজের বিবর্তনের সংজ্ঞায়ন করেছেন,“ এক আদেশে চলে যারা, তাদের নিয়ে সমাজ গড়
   লিখেছেন-মাদল দেব বর্মন
0 comments
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger