সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রাম



হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– ত্রেতা যুগে আবির্ভুত বিষ্ণুর তিন অবতারের শেষ অবতার এবং বিষ্ণুর দশ অবতারের মধ্যে সপ্তম অবতার। ইক্ষ্বাকুবংশীয়  রাজা দশরথের ঔরসে ও তাঁর অন্যতমা পত্নী কৈশল্যার গর্ভে রাম জন্মগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য রাজা দশরথের তিন স্ত্রী ছিল। এঁরা হলেন কৌশল্যা, কৈকেয়ী, সুমিত্রা। লক্ষণ ও শত্রুঘ্ন ছিলেন সুমিত্রার যমজ পুত্র এবং কৈকেয়ীর সন্তান ছিলেন ভরত। রামের জীবনচরিত রামের জন্মের আগেই রচনা করেছিলেন বাল্মীকি নামক এক ঋষি। এই গ্রন্থটিই রামায়ণ নামে খ্যাত।

এঁর বাহুদ্বয় ছিল আজানুলম্বিত, স্কন্ধ অতি উন্নত, গ্রীবাদেশ রেখাত্রয়ে অঙ্কিত, বক্ষস্থল অতি বিশাল, মস্তক সুগঠিত, ললাট অতি সুন্দর, স্কন্ধবক্ষসন্ধি দৃঢ়, চোয়াল, মোটা, চক্ষু আকর্ণবিস্তৃত ও বর্ণ শ্যামল। [প্রথম সর্গ। বালখণ্ড। বাল্মীকি রামায়ণ]

বিশ্বামিত্র মুনি রাক্ষসদের হাত থেকে যজ্ঞ রক্ষার জন্য দশরথের কাছে অনুরোধ করে, রাম ও লক্ষ্মণকে তাঁর আশ্রমে নিয়ে যান। সে সময় রামের বয়স ছিল চৌদ্দ বৎসর। রাম ও লক্ষণ সম্মিলিতভাবে তাড়কা ও অন্যান্য  রাক্ষসদের হত্যা করেন। বিশ্বামিত্র রামের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে, তাঁকে বলা ও অতিবলা বিদ্যাসহ কিছু দিব্যাস্ত্র দান করেন। সেখান থেকে বিশ্বামিত্র রাম-লক্ষ্মণকে নিয়ে মিথিলা নগরীর পথে অগ্রসর হন। পথে গৌতম মুনির অভিশাপে অহল্যা রামের স্পর্শে শাপমুক্ত হন। মিথিলায় এঁরা জনকরাজার আতিথ্য গ্রহণ করেন। সেখানে বিশ্বামিত্রের পরামর্শে রাম জনকের হরধনু ভেঙে, তাঁর কন্যা সীতাকে লাভ করেন। এবং একই আসরে সীতার কনিষ্ঠা ভগ্নী উর্মিলার সাথে লক্ষ্মণের বিবাহ হয়। সেই সময়  বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম জীবিত ছিলেন। অহঙ্কারবশত ইনি রামকে যুদ্ধে আহ্বান করেন এবং এই যুদ্ধে পরশুরাম পরাজিত হন।
                 [একোনবিংশ সর্গ। বালখণ্ড।  বাল্মীকি রামায়ণ]

কিছুদিন পর দশরথ রামকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করতে অগ্রসর হলে, দশরথের দ্বিতীয়া স্ত্রী কৈকেয়ী ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। ইনি তাঁর দাসী মন্থরার পরামর্শে দশরথের এক পূর্ব প্রতিজ্ঞা স্মরণ করিয়ে রামকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করতে বাধা দেন। ফলে কৈকেয়ীর পুত্র ভরত যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হন। পক্ষান্তরে রামের চৌদ্দ বৎসরের বনবাস হয়। এই বনবাসে সীতা ও লক্ষণ তাঁর অনুগামী হন।  
               [প্রথম সর্গ। বালখণ্ড। বাল্মীকি রামায়ণ]

রাম বনবাসে রওনা হয়ে নিষাদরাজের সাহায্যে গঙ্গানদী অতিক্রম করে প্রয়াগের কাছে ভরতদ্বাজ মুনির আতিথ্য গ্রহণ করেন। পরে মুনির পরামর্শে ইনি চিত্রকূট পর্বতের দণ্ডকারণ্যে বাস করতে থাকেন। উল্লেখ্য রামের বনে যাওয়ার কিছুদিন পর তাঁর পিতা তাঁর শোকে মৃত্যুবরণ করেন। ভরত রাজ্যলোভ ত্যাগ করে রামকে ফিরিয়ে আনার জন্য দণ্ডকারণ্যে উপস্থিত হলে, রাম পিতৃসত্য রক্ষার জন্য সে আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর ভরত রামের প্রতীক স্বরূপ তাঁর জুতো নিয়ে যান এবং নন্দীগ্রামে থেকে রামের প্রতিনিধি হিসাবে রাজত্ব করতে থাকেন।
               [প্রথম সর্গ। বালখণ্ড। বাল্মীকি রামায়ণ]

এরপর ইনি চিত্রকূট ত্যাগ করে দণ্ডকারণ্যে আসেন। এখানে তিনি বিরাধ নামক এক রাক্ষসকে হত্যা করেন। এরপর ইনি শরভঙ্গ, সূতীক্ষ্ণ, অগস্ত্য এবং ইধ্মবাহের সাথে দেখা করেন। অগস্ত্য তাঁকে বৈষ্ণবধনু, ব্রহ্মাস্ত্র ও অক্ষয়তূণ দান করেন। এরপর মুনির পরামর্শে ইনি গোদাবরী নদীর তীরে পঞ্চবটী নামক বনে কুটির নির্মাণ করে বাস করতে থাকেন। এই সময় এই বনের অধিকর্তী ছিলেন রাবণ বিধবা বোন শূর্পনখা। রামের রূপে মুগ্ধ হয়ে, শূর্পনখা তাঁকে প্রণয় নিবেদন করলে, রাম তা প্রত্যাখ্যান করেন। কোনো কোনো মতে, শূর্পনখা রামের কাছে সাড়া না পেয়ে লক্ষণের কাছেও অনুরূপ নিবেদন করেছিলেন। ব্যর্থ শূর্পনখা এরপর সীতাকে গ্রাস করার চেষ্টা করলে, রামের নির্দেশে লক্ষ্মণ তার নাক ও কান কেটে দেন। এরপর শূর্পনখার অধীনস্থ সেনাপতি খর ও দুষণ রাম-লক্ষ্মণকে আক্রমণ করলে, এঁরা উভয় সেনাপতিকে হত্যা করেন। এরপর রাম-লক্ষণ একত্রে সমগ্র পঞ্চবটী বন রাক্ষসমুক্ত করেন। শূর্পনখা এরপর লঙ্কায় গিয়ে রাবণকে সকল বিষয় অবগত করান এবং সীতার রূপলাবণ্য বর্ণনা করে রাবণকে উত্তেজিত করে তোলেন। রাবণ সীতা লাভের আশায় এবং বোনের অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণ করার জন্য পঞ্চবটীতে আসেন। এরপর তাড়কা রাক্ষসীর পুত্র মারীচের  সাহায্যে ইনি সীতাকে অপহরণ করেন।

এদিকে রাম-লক্ষণ কুটিরে ফিরে এসে সীতাকে না দেখতে পেয়ে, তাঁর অনুসন্ধানে বের হলেন। পথে জটায়ু পাখির মুখে সব শুনে, খুঁজতে খুঁজতে অগ্রসর হলেন। পথে এঁরা মস্তকবিহীন প্রেতকে (কবন্ধ) হত্যা করলে, কবন্ধের আত্মা সীতার খোঁজ করার জন্য রাজা সুগ্রীবের সাহায্য গ্রহণ করতে বললেন। এরপর এঁরা সুগ্রীবের উদ্দেশ্যে ঋষমূকপর্বতে আসেন এবং বানরদের কাছ থেকে সীতার অলঙ্কার পান। সেখানে কিষিন্ধ্যার অধিপতি সুগ্রীবের সাথে রামের সখ্যতা স্থাপিত হয়। সুগ্রীব অবশ্য রামের কাছে একটি শর্ত রাখেন। শর্তটি হলো- সুগ্রীবের ভাই বালীকে হত্যা করে, কিষিন্ধ্যারাজ্য সুগ্রীবের হাতে ন্যস্ত করলে, ইনি রামকে সাহায্য করবেন। রাম শর্তানুসারে বালীকে হত্যা করে, সুগ্রীবের হাতে রাজ্য প্রদান করেন।

এরপর রাম হনুমানকে সীতার সংবাদ আনার জন্য লঙ্কায় পাঠান। হনুমান লঙ্কায় পৌঁছে অশোকবন তছনছ করেন এবং লঙ্কা দগ্ধ করে সীতার সংবাদ রামকে পৌঁছে দেন। এরপর রাম বানর সৈন্যদের সহায়তায় সমুদ্রের উপর সেঁতু নির্মাণ করে লঙ্কায় উপস্থিত হন। এই সময় রাবণের কনিষ্ঠ ভাই বিভীষণ রামের পক্ষে যোগ দেন।
যুদ্ধে রাবণের পুত্র ইন্দ্রজিৎ অসাধারণ বিক্রম প্রদর্শন করেন। প্রথমে ইনি রাম-লক্ষণকে নাগপাশে বন্দী করেন। কিন্তু গরুড়ের সাহায্যে এই বন্ধন থেকে উভয়ই মুক্তি লাভ করেন। এরপর রাবণ-পক্ষের ধূম্রাক্ষ, বজ্রদংশ, অকল্পন ও প্রহস্ত সেনাপতিরা নিহত হলে, রাবণ কুম্ভকর্ণকে অকালে জাগিয়ে তোলেন। যুদ্ধে কুম্ভকর্ণ নিহত হন। এরপর বিভীষণের সাহায্যে লক্ষণ অন্যায়ভাবে নিরস্ত্র অবস্থায় নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ইন্দ্রজিৎকে হত্যা করেন। পুত্র-শোকাতুর রাম শক্তিশেল দ্বারা লক্ষণকে আঘাত করলে, লক্ষণ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যান। পরে হনুমান দ্বারা সংগৃহীত বিশল্যকরণী দ্বারা লক্ষ্মণ জীবন ফিরে পান। এরপর রাম-রাবণের প্রচণ্ড যুদ্ধের পর ইনি রাবণকে হত্যা করতে সক্ষম হন।

এরপর সীতাকে উদ্ধার করে, বিভীষণকে লঙ্কার রাজপদে আসীন করে অযোধ্যার ইনি পথে রওনা দেন। এই সময় বন্দিনী সীতার সতীত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, সীতা অগ্নি পরীক্ষা দিয়ে প্রমাণ করলেন যে, তিনি সতী। এরপর রাম চৌদ্দ বৎসর পর সীতা ও লক্ষণসহ অযোধ্যাতে প্রবেশ করলেন। ভরত রামের হাতে রাজ্য ফিরিয়ে দিলে, তিনি রাজত্ব শুরু করেন। কিছুদিন রাজত্ব করার পর সীতার সতীত্ব নিয়ে পুনরায় প্রজাদের ভিতর গুঞ্জন শুরু হলে, রাম সীতাকে বাল্মীকির তপোবনে নির্বাসন দেন। আর তাঁর তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে সাথে লক্ষণকে প্রেরণ করলেন। এই সময় সীতা গর্ভবতী ছিলেন। এই আশ্রমে সীতা যমজ সন্তান প্রসব করেন। বাল্মীকি এই দুই পুত্রের নাম দেন লব ও কুশ।

সীতাকে নির্বাসন দেওয়ার কিছুদিন পর রাম অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেন। বাল্মীকি উক্ত যজ্ঞস্থলে লব-কুশকে নিয়ে উপস্থিত হন। উক্ত আসরে লব-কুশ রামায়ণের গান করেন। এই গান শুনে রাম মুগ্ধ হন এবং খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে, লব-কুশ তাঁরই পুত্র। বাল্মীকির কাছ থেকে সমুদয় জেনে এবং বাল্মীকির অনুরোধে সীতাকে ফিরে আসার অনুমতি দিলেন। এরপরও প্রজাদের সামনে সীতার সতীত্ব পরীক্ষার কথা পুনরায় উত্থাপিত হলে, সীতা ব্যথিত হয়ে মাতা বসুমতীর কাছে, তাঁর কোলে স্থান দেবার জন্য অনুরোধ করলেন। সেই সময় পৃথিবী দ্বিবিভঙ্গত হলে- সীতা তাঁর মধ্যে প্রবেশ করেন।

এরপর থেকে সীতার অবর্তমানে রাম অত্যন্ত বিষণ্ণচিত্তে দিন কাটাতে লাগলেন। এমনি একদিন কালপুরুষ রামের সাথে গোপনে দেখা করতে এলে, তাঁদের গোপন আলোচনার প্রহরী হিসাবে লক্ষণকে নিযুক্ত করলেন। কালপুরুষের আজ্ঞানুসারে রাম প্রতিজ্ঞা করলেন– যদি তাঁদের এই গোপন আলোচনা কেউ গোপনে শোনে, দেখে বা একত্রে দুজনকে আলোচনারত অবস্থায় পর্যবেক্ষণ করে তবে সে রামের বধ্য হবে বা ত্যাগ করতে হবে। ঘটনাক্রমে এই আলোচনা চলাকালে, দুর্বাসা মুনি উপস্থিত হয়ে রামের সাক্ষাৎ প্রার্থনা করলেন। লক্ষণ তাঁকে বাধা দিলে, দুর্বাসা তাঁকে অভিশাপ দিতে উদ্যত হন। পরে লক্ষ্মণ রামের সামনে উপস্থিত হয়ে, দুর্বাসার আগমন বার্তা জানালেন। ফলে সত্য রক্ষার্থে ইনি লক্ষ্মণকে ত্যাগ করলেন। লক্ষণকে ত্যাগ করার পর ইনি আরো বেশি শোকাতুর হয়ে পড়েন। এরপর ইনি তাঁর পুত্র কুশকে কোশলের রাজা ও লবকে উত্তর কোশলের রাজা করে গৃহত্যাগ করেন। রাজ্য ছেড়ে ইনি সরযুনদীর তীরে যোগালম্বন করেন এবং সেই অবস্থাতেই ইনি মৃত্যুবরণ করেন।

#অমিত সরকার শুভ

1 comments

সমন্তপঞ্চকোপাখ্যান


ঋষিগণ কহিলেন, "হে সূতনন্দন! আমরা ভারতের অনুক্রমণিকা শুনিলাম, এক্ষণে সমন্তপঞ্চক নামক যে তীর্থের উল্লেখ করিয়াছ, তাহার যাহা কিছু বর্ণনীয় আছে সমুদয় শ্রবণ করাইয়া আমাদিগকে চরিতার্থ কর।" ঋষিদিগের এইরূপ প্রার্থনাবাক্যে সন্তুষ্ট হইয়া অতি শিষ্টপ্রকৃতি সৌতি কহিতে লাগিলেন, হে ব্রাহ্মণগণ! আমি আপনাদিগের সম্মুখে সমন্তপঞ্চক তীর্থের বৃত্তান্ত ও অন্যান্য কথা প্রসঙ্গক্রমে সমুদয় কীর্ত্তন করিতেছি, অবধান করুন।

অদ্বিতীয় বীর পরশুরাম ত্রেতা ও দ্বাপর যুগের সন্ধিতে পিতৃবধ-বার্ত্তা শ্রবণ করিয়া ক্রোধপরায়ণ হইয়া এই পৃথিবীকে একবিংশতিবার নিঃক্ষৎত্রিয়া করেন। তিনি স্ববিক্রম-প্রভাবে নিঃশেষে ক্ষৎত্রিয়কুল উৎসন্ন করিয়া সেই সমস্তপঞ্চকে শোণিতময় পঞ্চহ্রদ প্রস্তুত করেন। শুনিয়াছি, তিনি রোষপরবশ হইয়া সেই হ্রদের রুধির দ্বারা পিতৃলোকের তর্পণ করিয়াছিলেন। অনন্তর ঋচীক প্রভৃতি পিতৃগণ তথায় আগমন করিয়া পরশুরামকে কহিলেন, "হে মহাভাগ রাম! তোমার এরূপ অবিচলিত পিতৃভক্তি ও অসাধারণ বিক্রম দর্শনে আমরা অত্যন্ত প্রীত হইয়াছি, এক্ষণে তুমি আপনার অভিলষিত বর প্রার্থনা কর।

" রাম কহিলেন, "হে পিতৃগণ! যদি প্রসন্ন হইয়া ইচ্ছানুরূপ বর প্রদানে অনুগ্রহ করেন, তাহা হইলে ক্রোধে অধীর হইয়া ক্ষৎত্রিয়বংশ ধ্বংস করিয়া যে পাপরাশি সঞ্চয় করিয়াছি, সেই সকল পাপ হইতে যাহাতে মুক্ত হই এবং এই শোণিতময় পঞ্চহ্রদ অদ্যাবধি পৃথিবীতে তীর্থস্থান বলিয়া যাহাতে প্রখ্যাত হয়, এরূপ বর প্রদান করুন।"পিতৃগণ 'তথাস্তু' বলিয়া পরশুরামের অভিমত বর প্রদানপূর্ব্বক সেইরূপ অধ্যাবসায় হইতে তাঁহাকে ক্ষান্ত হইতে আদেশ করিলেন। তিনিও তদবধি ক্ষৎত্রিয়দিগের উপর আর কোনরূপ অত্যাচার করিলেন না।


সেই শোণিতময় পঞ্চহ্রদের সন্নিধানে যে সকল প্রদেশ আছে, তাহাকেই পরম পবিত্র সমন্তপঞ্চক তীর্থ বলিয়া নির্দ্দেশ করা হয়। কারণ, পণ্ডিতেরা কহেন, যে দেশ যে কোন বিশেষ চিহ্নে চিহ্নিত, তাহা তন্নামেই প্রখ্যাত হইয়া থাকে। ঐ সমন্তপঞ্চক তীর্থে কলি ও দ্বাপরের অন্তরে কুরু ও পাণ্ডবসৈন্যের ঘোরতর সংগ্রাম হইয়াছিল। অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা যুদ্ধার্থে ভূদোষবর্জ্জিত সেই পুণ্যক্ষেত্রে সমবেত ও নিহত হয়। হে ব্রাহ্মণগণ! ইহাই তাহার যথার্থ ব্যুৎপত্তিলভ্য অর্থ। সেই তীর্থ অতি পবিত্র ও রমণীয়। হে ধর্ম্মপরায়ণ মহর্ষিগণ! ত্রিলোকে ঐ দেশ যেরূপ বিখ্যাত, তাহা আপনাদের সমক্ষে কহিলাম।

অক্ষৌহিণী-পরিমাণ

ঋষিগণ কহিলেন, "হে সুতনন্দন! তুমি যে অক্ষৌহিণী শব্দের উল্লেখ করিলে, আমরা তাহার অর্থ শুনিতে ইচ্ছা করি। কারণ, তুমি সকলই জান, অতত্রব কত নর, কত হস্তী, কত অশ্ব ও কত রথে এক অক্ষৌহিণী হয়, তাহা সপ্রমাণ করিয়া বল।" সৌতি কহিলেন,– এক রথ, এক হস্তী, পঞ্চ পদাতি ও তিন অশ্ব, ইহাতে একটি পত্তি হয়। তিন পত্তিতে এক সেনামুখ, তিন সেনামুখে এক গুল্ম, তিন গুল্মে এক গণ, তিন গণে এক বাহিনী, তিন বাহিনীতে এক পৃতনা, তিন পৃতনায় এক চমু, তিন চমূতে এক অনীকিনী, দশ অনীকিনীতে এক অক্ষৌহিণী হয়। এক অক্ষৌহিণীতে একবিংশতি সহস্র অষ্টশত ও সপ্ততি-সংখ্যক রথ ও তৎসংখ্যক গজ, একলক্ষ নয় সহস্র তিন শত পঞ্চাশ জন পদাতি এবং পঞ্চষষ্টি সহস্র ছয় শত দশ অশ্ব থাকে।

আমি যে অক্ষৌহিণী শব্দের উল্লেখ করিলাম, সংখ্যাতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতেরা তাহার এইরূপ নিরূপণ করিয়াছেন [এক অক্ষৌহিণীমাণ– ১ লক্ষ ৯ হাজার ৫০ পদাতি, ৬৫ হাজার ৬ শত ১০ অশ্ব, ২১ হাজার ৮ শত ৭০ হস্তী, ২১ হাজার ৮ শত ৭০ রথ। মোট সৈন্যসংখ্যা ২ লক্ষ ১৮ হাজার ৭ শত]। সমন্তপঞ্চক তীর্থে কুরু ও পাণ্ডবদিগের এইরূপ অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা একত্র সমাগত হইয়াছিল। সেই সেনা কৌরবদিগকে উপলক্ষ্য করিয়া কালের অদ্ভুত ও অচিন্তনীয় শক্তিসহকারে তথায় মৃত্যুমুখে নিপতিত হয়। তন্মধ্যে পরমাস্ত্রবেত্তা ভীষ্ম দশ দিবস যুদ্ধ করেন, দ্রোণ পাঁচ দিন কৌরবসেনা রক্ষা করিয়াছিলেন। পরবলপীড়ক কর্ণ দুই দিবস ও শল্য অর্দ্ধদিবস মাত্র যুদ্ধ করেন। তৎপরে ভীমসেন ও দুর্য্যোধনের গদাযুদ্ধ আরম্ভ হয়, তাহাও দিবসার্দ্ধ মাত্র। অনন্তর দিবসের অবসানে ও নিশার আগমন হইলে অশ্বত্থামা, কৃতবর্ম্মা ও কৃপাচার্য্য সকলে একমত অবলম্বন করিয়া অসঙ্কুচিতচিত্তে সুখপ্রসুপ্ত যুধিষ্ঠিরের সৈন্যগণকে সংহার করিলেন।
0 comments

সঙ্ক্ষেপে সম্পূর্ন মহাভারত


হে শৌনক! আপনার যজ্ঞে যে ভারতাখ্য ইতিহাস কহিব, বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন জনমেজয়ের সর্পসত্রকালে তাহা কীর্ত্তন করিয়াছিলেন। এই গ্রন্থের আরম্ভে পৌষ্য, পোলোম ও আস্তীকপর্ব্বে মহানুভব ভূপালদিগের বিচিত্র চরিত্র সম্যক্‌রূপে বর্ণিত আছে। ইহা বহুবিধ উপাখ্যান ও অনেকানেক লৌকিক আচার-ব্যবহারে পরিপূর্ণ। যাদৃশ মোক্ষার্থীরা একমাত্র পারত্রিক শুভসঙ্কল্পে বৈরাগ্য অবলম্বন করেন, তাদৃশ বিজ্ঞেরা মঙ্গললাভ প্রত্যাশায় এই পবিত্র ইতিহাসের আশ্রয় লইয়া থাকেন।

যেমন সমস্ত জ্ঞাতব্য বস্তুমধ্যে আত্মা ও সকল প্রিয়বস্তুমধ্যে প্রাণ শ্রেষ্ঠ পদার্থ, সেইরূপ এই গ্রন্থ সর্ব্বশাস্ত্র অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। যেমন অন্নপান ব্যতীত জীবনধারণের আর উপায় নাই, সেইরূপ এই ইতিহাস যে সকল সুললিত কথা প্রতিপন্ন করিতেছে, তদ্ব্যতিরিক্ত ভূমণ্ডলে আর কথা নাই। যেমন সৎকুলোদ্ভব প্রভুকে প্রভুপরায়ণ ভৃত্যগণ অভ্যুদয়বাসনায় উপাসনা করে, সেইরূপ বুধগণ বিবিধ জ্ঞানলাভের অভিলাষে এই ভারতসংহিতার সেবা করিয়া থাকেন। যেমন স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণ কি লৌকিক, কি বৈদিক সকল বাক্যকেই অধিকার করিয়া আছে, সেইরূপ এই অদ্ভুত ইতিহাসে বহুবিষয়ে শুভকরী বুদ্ধিবৃত্তি সমর্পিত হইয়াছে।

হে ঋষিগণ! এক্ষণে বেদপ্রতিপাদ্য, সনাতন ধর্ম্মে অলঙ্কৃত, অনুভূতপূর্ব্ব বিষয়ের মীমাংসাসহকৃত, সুচারুরূপে বিরচিত ভারতের পর্ব্বসংগ্রহ বলিতেছি, আপনারা অবধান করুন। প্রথম অনুক্রমণিকা-পর্ব্ব, দ্বিতীয় সংগ্রহ-পর্ব্ব, পরে পোষ্য ও পৌলোম পর্ব্ব, আস্তীক ও বংশাবতরণ-পর্ব্ব, তৎপরে পরমাশ্চর্য্য সম্ভবপর্ব্ব, তাহা শ্রবণ করিলে শরীর রোমাঞ্চিত হয়। তৎপরে জতুগৃহ-দাহ, তৎপরে হিড়িম্ববধ, তৎপরে বকবধ, তৎপরে চৈত্ররথ-পর্ব্ব, তৎপরে দেবী পাঞ্চালীর স্বয়ংবর-বৃত্তান্ত, তৎপরে বিবাহ, তৎপরে বিদুরাগমন ও রাজ্যলাভ-পর্ব্ব, তৎপরে অর্জ্জুনের অরণ্যবাস, তৎপরে সুভদ্রাহরণ, তৎপরে যৌতুকাহরণপর্ব্ব, তৎপরে খাণ্ডবদাহ ও ময়দানবদর্শন, তৎপরে সভাপর্ব্ব, তৎপরে মন্ত্রপর্ব্ব, তৎপরে জরাসন্ধবধ, তৎপরে দিগ্বিজয়-পর্ব্ব, দিগ্বিজয়ের পর যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় মহাযজ্ঞ, তৎপরে অর্ঘ্যাভিহরণ, তৎপরে শিশুপালবধ, তৎপরে দ্যূত ও অনুদ্যূত-পর্ব্ব, তৎপরে অরণ্য, তৎপরে কির্ম্মীর-বধ, তৎপরে অর্জ্জুনের অভিগমন ও তৎপরে মহাদেব ও অর্জ্জুনের যুদ্ধ, ইহাকে কিরাতপর্ব্ব বলিয়া নির্দ্দেশ করা হয়।

তৎপরে ইন্দ্রলোকাভিগমন, তৎপরে নলোপাখ্যান, ইহা শ্রবণ করিলে অশ্রুপাত হয়। তৎপরে যুধিষ্ঠিরের তীর্থযাত্রা-পর্ব্ব, তৎপরে যক্ষযুদ্ধ, তৎপরে নিবাতকবচযুদ্ধ-পর্ব্ব, তৎপরে অজগর-পর্ব্ব, তৎপরে মার্কণ্ডেয়-সমস্যা, তৎপরে দ্রৌপদী ও সত্যভামা-সংবাদ, তৎপরে ঘোষযাত্রা, তৎপরে মৃগস্বপ্নোদ্ভব-পর্ব্ব, তৎপরে ব্রীহিদ্রৌণিক-উপাখ্যান-পর্ব্ব, তৎপরে ঐন্দ্রদ্যুম্ন, তৎপরে দ্রৌপদীহরণ, তৎপরে জয়দ্রথ-বিমোক্ষণ, তৎপরে রামচন্দ্রোপখ্যান, তৎপরে পতিব্রতা সাবিত্রীর অদ্ভুত মহাত্ম্যবর্ণন, তৎপরে কুণ্ডলা-হরণ, তৎপরে আরণেয়, তৎপরে বিরাট-পর্ব্ব, তৎপরে পাণ্ডবদিগের প্রবেশ ও সময় প্রতিপালন, তৎপরে কীচকবধ, তৎপরে গোগ্রহণ, তৎপরে অভিমন্যুর সহিত উত্তরার বিবাহ, তৎপরে উদ্‌যোগ, তৎপরে সঞ্জয়াগমন-পর্ব্ব, অনন্তর ধৃতরাষ্ট্রের চিন্তামূলক প্রজাগর-পর্ব্ব, পরে সনৎসুজাত-পর্ব্ব, তৎপরে যানসন্ধি-পর্ব্ব, তৎপরে কৃষ্ণের গমন, তৎপরে মাতলীয় উপাখ্যান ও গালবচরিত, তৎপরে সাবিত্রীর উপাখ্যান, বামদেবোপাখ্যান, বৈণ্যোপাখ্যান ও জামদগ্ন্যোপাখ্যান,

তৎপরে ষোড়শরাজিক-পর্ব্ব, তৎপরে কৃষ্ণের সভাপ্রবেশ, তৎপরে বিদুলাপুল্র-শাসন, তৎপরে সৈন্যোদ্‌যোগ ও শ্বেতোপাখ্যান-পর্ব্ব, তৎপরে মন্ত্রনিশ্চয় করিয়া কার্য্যচিন্তন, তৎপরে সেনাপতি-নিয়োগোপাখ্যান, তৎপরে শ্বেত ও বাসুদেব-সংবাদ, তৎপরে মহাত্মা কর্ণের বিবাদ, তৎপরে কুরুপাণ্ডব-সেনানির্যাণ, তৎপরে রথী ও অতিরথ-সংখ্যা-পর্ব্ব, অনন্তর অমর্ষবিবর্দ্ধন উলুকদূতের আগমন, তৎপরে অম্বোপাখ্যান, তৎপরে অদ্ভুত ভীষ্মভিষেক-পর্ব্ব, তৎপরে জম্বুদ্বীপনির্ম্মাণ-পর্ব্ব, তৎপরে ভূমিপর্ব্ব, তৎপরে দ্বীপবিস্তার-কথন-পর্ব্ব, তৎপরে ভগবদ্‌গীতা-পর্ব্ব, অনন্তর ভীষ্মবধ, তৎপরে দ্রোণাভিষেক, তৎপরে সংসপ্তক-সৈন্যবধ, তৎপরে অভিমন্যুবধ-পর্ব্ব, তৎপরে প্রতিজ্ঞা, তৎপরে জয়দ্রথবধ-পর্ব্ব, তৎপরে ঘটোৎকচবধ, তৎপরে পরমাশ্চর্য্য দ্রোণবধ-পর্ব্ব, তৎপরে নারায়ণাস্ত্রপ্রয়োগ-পর্ব্ব।

অনন্তর কর্ণপর্ব্ব, তৎপরে শল্যপর্ব্ব, তৎপরে হ্রদপ্রবেশ ও গদাযুদ্ধ-পর্ব্ব, অনন্তর সারস্বত ও তীর্থবংশানুকীর্ত্তন-পর্ব্ব, তদনন্তর অতি বীভৎস সৌপ্তিক-পর্ব্ব, অনন্তর দারুণ ঐষীক-পর্ব্ব, তৎপরে জলপ্রদানিক-পর্ব্ব, তৎপরে স্ত্রীবিলাপ-পর্ব্ব, তৎপরে ঔর্দ্ধ্বদেহিক পর্ব্ব, তৎপরে ব্রাহ্মণরূপী চার্বাক রাক্ষসের বধপর্ব্ব, তৎপরে ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের অভিষেক-পর্ব্ব, তৎপরে গৃহপ্রবিভাগ-পর্ব্ব, অনন্তর শান্তিপর্ব্ব, এই পর্ব্বে রাজধর্ম্ম, আপদ্ধর্ম্ম ও মোক্ষধর্ম্ম কথিত আছে। তৎপরে শুকপ্রশ্নাভিগমন, তৎপরে ব্র্হ্মপ্রশ্নানুশাসন, তৎপরে দুর্ব্বাসার প্রাদুর্ভাব ও মায়াসংবাদ-পর্ব্ব, অনন্তর অনুশাসন-পর্ব্ব, অনন্তর ভীষ্মের স্বর্গারোহণপর্ব্ব, তৎপরে সর্বপাপপ্রণাশক আশ্বমেধিক-পর্ব্ব, তৎপরে অধ্যাত্মবিদ্যাবিষয়ক অনুগীতা-পর্ব্ব, তৎপরে আশ্রমবাসিক-পর্ব্ব, তৎপর পুৎত্রদর্শন-পর্ব্ব, তৎপরে নারদাগমন-পর্ব্ব, তৎপরে অতি ভীষণ মৌষল-পর্ব্ব, তৎপরে মহাপ্রস্থানিক-পর্ব্ব, তৎপরে স্বর্গারোহণিক-পর্ব্ব, অনন্তর খিলনামক হরিবংশ-পর্ব্ব; এই পর্ব্বে বিষ্ণু-পর্ব্ব, শিশুচর্য্যা, কংসবধ ও অতি অদ্ভুত ভবিষ্য-পর্ব্ব কথিত আছে। এই শত-পর্ব্ব মহাত্মা ব্যাসদেব কহিয়াছিলেন এবং নৈমিষারণ্যে যথাক্রমে লোমহর্ষণপুৎত্র সৌতি অষ্টাদশপর্ব্ব কীর্ত্তন করেন। সঙ্ক্ষেপে এই মহাভারতের পর্ব্বসংগ্রহ কহিলাম।



আদিপর্ব্ব–শ্লোকসংখ্যা:
পৌষ্য, পৌলোম, আস্তীক, আদিবংশাবতরণ, সম্ভব, জতুগৃহ, হিড়িম্ব ও বকবধ, চৈত্ররথ, দ্রৌপদীর স্বয়ংবর, বৈবাহিক, বিদুরাগমন, রাজ্যলাভ, অর্জ্জুনের বনবাস, সুভদ্রাহরণ, যৌতুকানয়ন, খাণ্ডবদাহ, ময়দানবদর্শন এই সকল আদিপর্ব্বের অন্তর্গত। পৌষ্য-পর্ব্বে উতঙ্কের মাহাত্ম্য ও পৌলোমপর্ব্বে ভৃগুবংশবিস্তার কথিত আছে। আস্তীকপর্ব্বে সর্পকুল ও গরুড়ের সম্ভব, ক্ষীরসমুদ্রমন্থন, উচ্চৈঃশ্রবার জন্ম, রাজা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞানুষ্ঠান ও মহাত্মা ভরতবংশীয়দিগের চরিত্র কীর্ত্তিত আছে। সম্ভবপর্ব্বে অনেকানেক ভূপতিদিগের উৎপত্তি, অনেকানেক বীরপুরুষ ও মহর্ষি দ্বৈপায়নের জন্মবৃত্তান্ত এবং দেবতাদিগের অংশাবতরণ বর্ণিত আছে। দৈত্য, দানব, যক্ষ, সর্প, গন্ধর্ব্ব, পক্ষী ও অন্যান্য প্রাণীদিগের সমুদ্ভব; যাঁহার নামের অনুরূপে লোকে ভারতকুল বলিয়া প্রখ্যাত হইয়াছে, মহর্ষি কণ্বের আশ্রমে দুষ্মন্তের ঔরসে শকুন্তলার গর্ভে সেই ভরতের জন্মলাভ।

শান্তনুর আবাসে গঙ্গার গর্ভে বসুদিগের পুনর্জ্জন্ম ও তাঁহাদিগের স্বর্গে আরোহণ এবং তেজোংশের সম্পাত, ভীষ্মের সম্ভব এবং তাঁহার রাজ্যপরিত্যাগ ও ব্রহ্মচর্য্যব্রতধারণ, প্রতিজ্ঞাপালন এবং ভ্রাতা চিত্রাঙ্গদের রক্ষা, চিত্রাঙ্গদের মৃত্যু হইলে কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিচিত্রবীর্য্যের রক্ষাবিধান ও তাঁহার রাজ্যাধিকার, অণীমাণ্ডব্যের অভিশাপে ধর্ম্মের নরলোকের অংশে সম্ভব ও বরদানপ্রভাবে কৃষ্ণদ্বৈপায়নের ঔরসে উৎপত্তি, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও পাণ্ডবদিগের সম্ভব, বারণাবতপ্রস্থানে দুর্য্যোধনের মন্ত্রণা, পাণ্ডবদিগের প্রতি ধার্ত্তরাষ্ট্রদিগের কূটপ্রেরণ, ধীমান্ ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের হিতসাধন করিবার নিমিত্ত পথিমধ্যে তাঁহাকে ম্লেচ্ছ ভাষায় বিদুরের অশেষ উপদেশ, বিদুরের পরামর্শক্রমে অতি গোপনে সুরঙ্গনির্ম্মাণ, রাত্রিকালে পঞ্চপুৎত্রের সহিত নিদ্রিতা নিষাদীকে জতুগৃহে পুরোচন নামক ম্লেচ্ছের সহিত দাহ,

নিবিড় অরণ্যে পাণ্ডবদিগের হিড়িম্বদর্শন, মহাবল ভীমসেন হইতে হিড়িম্বের বধসাধন ও ঘটোৎকচের উৎপত্তি, মহাপ্রভাব মহর্ষি ব্যাসদেবের সন্দর্শন ও তাঁহার অনুমতিক্রমে একচক্রা নগরীতে এক ব্রাহ্মণের আবাসে ছদ্মবেশে বাস, বকবধে পুরবাসীদিগের বিস্ময়, দ্রৌপদী ও ধৃষ্টদ্যুম্নের জন্ম, ব্রাহ্মণ-সন্নিধানে দ্রৌপদীর জন্মবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শ্রবণপূর্ব্বক স্বয়ংবর-সভাদিদৃক্ষা [দর্শনেচ্ছা]- ক্রান্তচিত্ত হইয়া ব্যাসের আদেশে ও রমণীরত্নলাভের অভিলাষে পাঞ্চালদেশে পঞ্চপাণ্ডবদিগের গমন, গঙ্গাতীরে গন্ধর্ব্বরাজ অঙ্গারপর্ণকে পরাজয় করিয়া অর্জ্জুনের তাঁহার সহিত পরমসখ্যভাব-সংস্থাপন ও তৎসমীপে তপতী, বশিষ্ঠ ও ঔর্ব্বের রমণীয় উপাখ্যান শ্রবণ ও ভ্রাতৃগণের সহিত অর্জ্জুনের পাঞ্চালদেশে গমন, তথায় সমাগত অসংখ্য ভূপাল সমক্ষে লক্ষ্যভেদপূর্ব্বক ধনঞ্জয়ের দ্রৌপদী লাভ, ভীম ও অর্জ্জুন কর্ত্তৃক যুদ্ধে ক্রুদ্ধ রাজগণের সহিত শল্য ও কর্ণের পরাজয়,

মহামতি অতি-শিষ্টপ্রকৃতি কৃষ্ণ ও বলরামের ভীমার্জ্জুনের সেইরূপ অপ্রমেয় ও অমানুষ-সাহস সন্দর্শনে পাণ্ডব বোধে তাঁহাদিগের সহিত সমাগত হইবার বাসনায় পরশুরামের গৃহপ্রবেশ, পঞ্চভ্রাতার এক ভার্য্যা হইবে বলিয়া দ্রুপদের বিমর্ষ, এইস্থলে পরমাশ্চর্য্য পঞ্চেন্দ্রের উপাখ্যানের উল্লেখ, পাঞ্চালীর দৈববিহিত অমানুষ বিবাহ, পাণ্ডবদিগের প্রতি ধৃতরাষ্ট্র কর্ত্তৃক বিদুরপ্রেরণ, বিদুরের গমন ও কৃষ্ণের সন্দর্শন, পাণ্ডবদিগের খাণ্ডবপ্রস্থে বাস ও রাজ্যার্দ্ধের অধিকার, নারদের আদেশে পঞ্চপাণ্ডবের দ্রৌপদীবিষয়ক নিয়মসংস্থাপন, সুন্দোপসুন্দের ইতিহাস, অনন্তর দ্রৌপদীর সহিত একান্তে উপবিষ্ট যুধিষ্ঠিরের সন্নিকৃষ্ট হইয়া অর্জ্জুনের অস্ত্রগ্রহণ ও ব্রাহ্মণের গোধন আহরণপূর্ব্বক প্রতিজ্ঞা প্রতিপালন জন্য অরণ্যবাস এবং তৎকালে উলুপীনাম্নী নাগকন্যার সহিত পথিমধ্যে অর্জ্জুনের সমাগম, পুণ্যতীর্থে গমন ও বভ্রুবাহনের জন্ম

এবং তথায় তপস্বী ব্রাহ্মণের অভিসম্পাতে গ্রাহ [কুম্ভীর] যোনিপ্রাপ্ত পঞ্চ অপ্সরার শাপমোচন, প্রভাস-তীর্থে কৃষ্ণের সহিত অর্জ্জুনের সাক্ষাৎকারলাভ, কৃষ্ণের অভিমতে দ্বারকায় অর্জ্জুনের সুভদ্রাপ্রাপ্তি, যৌতুক-প্রদানের নিমিত্ত খাণ্ডবপ্রস্থে কৃষ্ণ প্রস্থিত হইলে পর সুভদ্রার গর্ভে অভিমন্যুর জন্ম, দ্রৌপদী-পুৎত্রের উৎপত্তি-কীর্ত্তন, যমুনায় জলবিহারার্থে গমন করিলে কৃষ্ণার্জ্জুনের চক্র ও ধনুলাভ, খাণ্ডবদাহ, প্রদীপ্ত অনলমধ্য হইতে ময়দানব ও ভুজঙ্গের পরিত্রাণ, মন্দপালনামা মহর্ষির ঔরসে শাঙ্গীর গর্ভে সুতোৎপত্তি, আদিপর্ব্বে এই সকল বর্ণিত আছে। বেদব্যাস এই পর্ব্বে দুই শত সপ্তবিংশতিসংখ্যক অধ্যায় কহিয়াছেন, তাহাতে অষ্ট সহস্র অষ্ট শত ও চতুরশীতি শ্লোক রচনা করেন।


সভাপর্ব্ব– শ্লোকসংখ্যা:
অনন্তর বহুবৃত্তান্তযুক্ত দ্বিতীয় সভাপর্ব্ব আরম্ভ হইতেছে। পাণ্ডবদিগের সভা-নির্ম্মাণ, কিঙ্কর-দর্শন, দেবর্ষি নারদ কর্ত্তৃক ইন্দ্র প্রভৃতি লোকপালগণের সভাবর্ণন, রাজসূয়-মহাযজ্ঞের আরম্ভ, জরাসন্ধ-বধ, গিরিব্রজে নিরুদ্ধ রাজগণের কৃষ্ণ কর্ত্তৃক বিমোচন, পাণ্ডবদিগের দিগ্বিজয়, ভূপালদিগের রাজসূয়যজ্ঞে আগমন যজ্ঞে অর্ঘ্যদানপ্রসঙ্গে শিশুপালের সহিত বিবাদ ও তাহার বধ, পাণ্ডবদিগের রাজসূয়যজ্ঞে তাদৃশ সমৃদ্ধি সন্দর্শন করিয়া দুর্য্যোধনের বিষাদ ও ঈর্ষা, ভীমকর্ত্তৃক সভামধ্যে দুর্য্যোধনের প্রতি উপহাস ও তাহার ক্রোধ, তন্নিবন্ধন দ্যুতক্রীড়া, ধূর্ত্ত শকুনি-কর্ত্তৃক দ্যূতক্রীড়ায় যুধিষ্ঠিরের পরাজয়, দ্যূতার্ণবমগ্না দুঃখিতা দ্রৌপদীর ধৃতরাষ্ট্র কর্ত্তৃক উদ্ধার, দ্রৌপদীকে বিপদ্ হইতে উত্তীর্ণা দেখিয়া দুর্য্যোধনের পুনর্ব্বার পাণ্ডবদিগের সহিত দ্যূতারম্ভ, দ্যূতে পরাজয় করিয়া তৎকর্ত্তৃক পাণ্ডবদিগের বনপ্রেরণ, মহর্ষি বেদব্যাস সভাপর্ব্বে এই সকল বর্ণন করিয়াছেন। এই পর্ব্বে অষ্টসপ্ততি অধ্যায় এবং দ্বিসহস্র পঞ্চশত একাদশ শ্লোক আছে।



বনপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা:
অনন্তর অরণ্য নামক তৃতীয় পর্ব্ব। মহাত্মা পাণ্ডবগণ বনপ্রস্থান করিলে পৌরজন কর্ত্তৃক ধীমান্ যুধিষ্ঠিরের অনুগমন, ওষধি ও ব্রাহ্মণগণের ভরণপোষণের নিমিত্ত ধৌম্য মুনির উপদেশ-ক্রমে যুধিষ্ঠিরের সূর্য্যারাধনা, সূর্য্যের অনুগ্রহে অন্নলাভ, ধৃতরাষ্ট্র কর্ত্তৃক হিতবাদী বিদুরের পরিত্যাগ, বিদুরের পাণ্ডবসমীপে গমন ও ধৃতরাষ্ট্রের আদেশে পুনর্ব্বার তাঁহার নিকটে আগমন, কর্ণের উত্তেজনায় বনবাসী পাণ্ডবদিগকে বিনাশ করিবার নিমিত্ত দুর্ম্মতি দুর্য্যোধনের মন্ত্রণা, তাহার দুষ্ট অভিসন্ধি জানিতে পারিয়া ব্যাসের আগমন, ব্যাস কর্ত্তৃক দুর্য্যোধনের বনগমন-প্রতিষেধ, সুরভির উপাখ্যান, মৈত্রেয়ের আগমন, ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি মৈত্রেয়ের উপদেশ, মৈত্রেয় কর্ত্তৃক রাজা দুর্য্যোধনের প্রতি শাপপ্রদান, ভীম কর্ত্তৃক যুদ্ধে কির্ম্মীর রাক্ষস-বধ, শকুনি ছল প্রকাশ করিয়া দ্যূতে পাণ্ডবদিগকে পরাজয় করিয়াছে শুনিয়া পাঞ্চাল ও বৃষ্ণিবংশীয়দিগের আগমন, কৃষ্ণ অতিশয় রোষাবেশ প্রকাশ করিলে অর্জ্জুনের সান্ত্বনাবাক্য, কৃষ্ণের নিকট দ্রৌপদীর বিলাপ, দুঃখার্ত্তা দ্রৌপদীকে বাসুদেবের আশ্বাসদান, সৌভপতি শাল্বের বধ, সপুৎত্রা সুভদ্রাকে কৃষ্ণ কর্ত্তৃক দ্বারকায় আনয়ন, ধৃষ্টদ্যুম্নকর্ত্তৃক দ্রৌপদীর সন্তানগণকে পাঞ্চালনগর-প্রাপণ, রমণীয় দ্বৈতবনে পাণ্ডবদিগের প্রবেশ,

দ্রৌপদী ও ভীমসেনের সহিত দ্বৈতবনে যুধিষ্ঠিরের কথোপকথন, পাণ্ডবদিগের সমীপে ব্যাসের আগমন, যুধিষ্ঠিরের ব্যাসদেব হইতে প্রতিস্মৃতিনামক বিদ্যালাভ, ব্যাস প্রতিগত হইলে পাণ্ডবদিগের কাম্যকবনে গমন, অমিততেজা অর্জ্জুনের অস্ত্রলাভপ্রত্যাশায় প্রবাসে গমন ও কিরাতরূপী দেবদেব মহাদেবের সহিত যুদ্ধ, ইন্দ্রাদি লোকপালের দর্শন ও অস্ত্রলাভ, অস্ত্রশিক্ষার্থে অর্জ্জুনের ইন্দ্রলোকে গমন, পাণ্ডববৃত্তান্ত শ্রবণে ধৃতরাষ্ট্রের বলবতী চিন্তা, মহানুভব মহর্ষি বৃহদশ্বের সন্দর্শন, দুঃখার্ত্ত যুধিষ্ঠিরের বিলাপ, ধর্ম্মসঙ্গত ও করুণরসাশ্রিত নলোপাখ্যান,

যুধিষ্ঠিরের বৃহদশ্ব হইতে অক্ষহৃদয় নামক বিদ্যালাভ, পাণ্ডবদিগের নিকট স্বর্গ হইতে লোমশ ঋষির আগমন, লোমশ কর্ত্তৃক বনবাসগত মহাত্মা পাণ্ডবদিগের নিকট স্বর্গবাসী অর্জ্জুনের বৃত্তান্ত-কথন, অর্জ্জুনের অনুসন্ধানার্থ পাণ্ডবদিগের তীর্থাভিগমন, তীর্থের ফলপ্রাপ্তি ও পাবনত্ব-কীর্ত্তন, দেবর্ষি নারদের পুলস্ত্যতীর্থযাত্রা, পাণ্ডবদিগের তীর্থযাত্রা, গয়াসুরের যজ্ঞবর্ণন, অগস্ত্যের উপাখ্যান ও বাতাপি ভক্ষণ, অপত্যোৎপাদনের নিমিত্ত মহর্ষির লোপামুদ্রা-পরিগ্রহ, কৌমার ব্রহ্মচারী ঋষ্যশৃঙ্গের চরিত কীর্ত্তন, প্রভূত-পরাক্রম পরশুরামের চরিত্রবর্ণন, কার্ত্তবীর্য্য ও হৈহয়দিগের বধ, প্রভাসতীর্থে পাণ্ডবদিগের সহিত বৃষ্ণিবংশীয়দিগের সমাগম, সুকন্যার উপাখ্যান,

শর্য্যাতি রাজার যজ্ঞে চ্যবনমুনি কর্ত্তৃক অশ্বিনীকুমারের সোমপান, অশ্বিনীকুমার কর্ত্তৃক চ্যবনের যৌবন-প্রতিপাদন, মান্ধাতার উপাখ্যান, জন্তু-নামক রাজপুৎত্রের উপাখ্যান, শত পুৎত্রের অভিলাষে সোমক রাজার জন্তু-নামক পুৎত্রের শিরশ্ছোদন, যজ্ঞানুষ্ঠান ও অভীষ্ট-ফললাভ, শ্যেনকপোতীয় উপাখ্যান, শিবি রাজার প্রতি ইন্দ্র ও অগ্নির ধর্ম্ম-জিজ্ঞাসা, অষ্টাবক্রোপাখ্যান, জনক-যজ্ঞে মহর্ষি অষ্টাবক্রের সহিত বরুণাত্মজ নৈয়ায়িক বন্দীর বিবাদ, মহাত্মা অষ্টাবক্র কর্ত্তৃক বিবাদে বন্দীর পরাজয় ও সাগরের অভ্যন্তরগত পিতার উদ্ধার, মহাত্মা যবক্রীত ও রৈভ্যের উপাখ্যান, গন্ধমাদনযাত্রা ও নারায়ণাশ্রমে বাস,

পুষ্পানয়নার্থ দ্রৌপদী কর্ত্তৃক ভীমসেনের নিয়োগ, পথিমধ্যে গমন করিতে করিতে ভীমসেনের সহিত কদলীবনে হনূমানের সন্দর্শন, কুসুমাবচয়ন করিবার নিমিত্ত সরোবরে অবগাহন, তথায় অতি ভীষণ রাক্ষসগণ ও মণিমান্ প্রভৃতি মহাবীর্য্য যক্ষদিগের সহিত যুদ্ধ, জটাসুর-নামক রাক্ষস-বধ, তথায় রাজর্ষি বৃষপর্ব্বার আগমন, আর্ষ্টিষেণের আশ্রমে পাণ্ডবদিগের গমন ও অবস্থান, দ্রৌপদী কর্ত্তৃক ভীমসেনের উৎসাহদান, ভীমের কৈলাস-পর্ব্বতে আরোহণ ও মণিমান্ প্রমুখ যক্ষদিগের সহিত ঘোরতর যুদ্ধ, পাণ্ডবদিগের সহিত বৈশ্রবণের সমাগম, দিব্যাস্ত্র প্রাপ্ত হইয়া ভ্রাতৃগণের সহিত অর্জ্জুনের সমাগম,

হিরণ্যপুরবাসী নিবাতকবচগণ ও পুলোমপুৎত্র কালকেয়দিগের সহিত অর্জ্জুনের যুদ্ধবর্ণন, তৎকর্ত্তৃক কালকেয়দিগের রাজার প্রাণসংহার, ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সন্নিধানে অর্জ্জুনের অস্ত্র-সন্দর্শনের উদ্যম, দেবর্ষি নারদের তদ্বিষয়ে প্রতিষেধ, গন্ধমাদন হইতে পাণ্ডবদিগের অবরোহণ, গহনবনে ভুজগেন্দ্র কর্ত্তৃক মহাবল ভীম-গ্রহণ, প্রশ্নোত্তর প্রদানপূর্ব্বক যুধিষ্ঠিরের ভীমমোক্ষণ, মহাত্মা পাণ্ডবদিগের কাম্যকবনে পুনরাগমন, তথায় পাণ্ডবদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিবার প্রত্যাশায় পুনর্ব্বার বাসুদেবের আগমন, মার্কণ্ডেয়সমস্যা, পৃথু রাজার উপাখ্যান, সরস্বতী ও মহর্ষি তার্ক্ষ্যের সংবাদ, মৎস্যোপাখ্যান, ইন্দ্রদ্যুম্নোপাখ্যান, ধুন্ধুমারোপাখ্যান,

পতিব্রতোপাখ্যান, অঙ্গিরা ঋষির উপাখ্যান, দ্রৌপদী ও সত্যভামাসংবাদ, পাণ্ডবদিগের দ্বৈতবনে পুনরাগমন, ঘোষযাত্রা, গন্ধর্ব্ব কর্ত্তৃক দুর্য্যোধন বন্ধন ও অর্জ্জুন কর্ত্তৃক বিমোচন, ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের মৃগস্বপ্ন-সন্দর্শন, রমণীয় কাম্যকবনে পুনর্গমন, অতি বিস্তীর্ণ ব্রীহিদ্রৌণি কোপাখ্যান, মহর্ষি দুর্ব্বাসার উপাখ্যান, আশ্রমের অভ্যন্তর হইতে জয়দ্রথ কর্ত্তৃক দ্রৌপদী-হরণ, মহাবল ভীমের বায়ুবেগে গমন ও জয়দ্রথের পঞ্চশিখীকরণ, বহুবিস্তার রামায়ণ উপাখ্যান, রামচন্দ্র কর্ত্তৃক রাবণের বধ, সাবিত্রীর উপাখ্যান, কুণ্ডলদ্বয় দান দ্বারা ইন্দ্রের হস্ত হইতে কর্ণের অব্যাহতি, পরিতুষ্ট ইন্দ্র কর্ত্তৃক একপুরুষঘাতিনী শক্তিপ্রদান, আরণেয়-উপাখ্যান ও ধর্ম্মের সপুৎত্রানুশাসন, বরলাভ করিয়া পাণ্ডবদিগের পশ্চিমদিকে গমন, তৃতীয় আরণ্যক-পর্ব্বে এই সকল কীর্ত্তিত আছে। ইহাতে দুই শত একোনসপ্ততি অধ্যায় ও একাদশ সহস্র ছয় শত ও চতুঃষষ্টি শ্লোক আছে।


বিরাটপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা:
অতঃপর বহু বিস্তৃত বিরাটপর্ব্ব শুনুন। পাণ্ডবগণ বিরাটনগরে প্রবেশ করিয়া শ্মশানে অতি প্রকাণ্ড শমীবৃক্ষ নিরীক্ষণপূর্ব্বক তাঁহাদের সমুদয় অস্ত্র তাহাতে সংস্থাপন করিলেন ও অতি প্রচ্ছন্নভাবে নগরে প্রবেশ করিয়া বিরাট-রাজপ্রাসাদে বাস করিতে লাগিলেন। দুরাত্মা কীচক কামোন্মত্ত হইয়া দ্রৌপদীর নিমিত্ত আপনার অভিমত অভিলাষ প্রকাশ করিলে ভীমসেন তাহার প্রাণসংহার করেন। রাজা দুর্য্যোধন পাণ্ডবদিগের অন্বেষণার্থ চতুর্দ্দিকে অতি সুচতুর চরসমূহ প্রেরণ করিলেন, কিন্তু তাহারা মহাত্মা পাণ্ডবদিগের অনুসন্ধান করিতে পারিল না।

প্রথমতঃ ত্রিগর্ত্তেরা বিরাট-রাজার গোপন অপহরণ করে, তদুপলক্ষ্যে তাহাদিগের সহিত বিরাটের যুদ্ধ হয়। শত্রুপক্ষ বিরাট রাজাকে পরাজিত ও বন্ধন করিয়া লইয়া যাইতেছিল। ইত্যবসরে ভীমসেন স্ববিক্রমপ্রভাবে তাঁহাকে মুক্ত করেন, পাণ্ডবেরা বিরাটের অপহৃত গোধন প্রত্যাহরণ করেন। অনন্তর কৌরবগণ তাঁহার গোধন হরণ করিলে অর্জ্জুন বাহুবলে নিখিল কৌরবগণকে যুদ্ধে পরাভূত করিয়া বিরাটের গোধন উদ্ধার করেন। বিরাট সুভদ্রাগর্ভসম্ভূত অভিমন্যুকে উদ্দেশ করিয়া দুহিতা উত্তরাকে সম্প্রদান করিলে অর্জ্জুন তাঁহাকে প্রতিগ্রহ করেন। বেদবেত্তা মহর্ষি বেদব্যাস বিরাট-নামক চতুর্থ পর্ব্বে এই সকল কীর্ত্তন করিয়াছেন এবং ইহাতে সপ্তষষ্টি অধ্যায়, দুই সহস্র ও পঞ্চাশৎ শ্লোক আছে।


উদ্‌যোগপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা:
তৎপরে উদ্‌যোগ-নামক পর্ব্ব শ্রবণ করুন। পাণ্ডবেরা জিগীষা-পরবশ হইয়া উপপ্লব্য-নামক স্থানে অবস্থান করিলে দুর্য্যোধন ও অর্জ্জুন কৃষ্ণের সন্নিকটে উপস্থিত হইলেন। "তুমি এই যুদ্ধে আমাদিগের সাহায্য কর", তৎসন্নিধানে উভয়ে এইরূপ প্রার্থনা করিলে মহামতি কৃষ্ণ কহিলেন, "আমি এক পক্ষে এক অক্ষৌহিণী সেনা প্রদান করিব ও অন্য পক্ষে আমি একাকী থাকিব; কিন্তু কোনরূপে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইব না ও অকপটে তাহাদিগের মন্ত্রী হইব। এক্ষণে তোমরা অন্যতরের কে কি ইচ্ছা কর, বল।"

অনভিজ্ঞ দুর্য্যোধন সৈন্য প্রার্থনা করিলেন ও অর্জ্জুন তাঁহাকে মন্ত্রিত্ব স্বীকার করিতে অনুরোধ করিলেন। পাণ্ডবদিগের সহায়তা করিবার নিমিত্ত সমাগত মদ্ররাজকে পথিমধ্যে দুর্য্যোধন বহুবিধ উপহার প্রদান করিয়া 'তুমি আমার সাহায্য কর', এইরূপ প্রার্থনা করিলেন। শল্য তাহাতে সম্মত হইয়া পাণ্ডবদিগের নিকট গমন করিলেন। তথায় যুধিষ্ঠিরের নিকট দেবরাজ ইন্দ্রের বৃত্রাসুরবিজয় বৃত্তান্ত বর্ণন করেন। পাণ্ডবেরা কৌরবসমীপে পুরোহিত প্রেরণ করিলেন। প্রবল-প্রতাপ মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পুরোহিতের কথা শ্রবণ করিয়া শান্তি-স্থাপন প্রত্যাশায় সঞ্জয়কে দূতস্বরূপে পাণ্ডবদিগের নিকট পাঠাইলেন। কৃষ্ণ ও পাণ্ডবদিগের বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া অতিবলবতী চিন্তায় ধৃতরাষ্ট্রের নিদ্রাচ্ছেদ হইল।

বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে বিবিধ হিতবাক্য শ্রবণ করান। মহর্ষি সনৎসুজাত রাজাকে শোকসন্তপ্ত দেখিয়া অতি উৎকৃষ্ট বেদশাস্ত্র শুনাইলেন। প্রভাত-সময়ে সভামণ্ডপে উপস্থিত হইয়া সঞ্জয় বাসুদেব ও অর্জ্জুনের অভিন্নত্ব কীর্ত্তন করেন। মহামতি কৃষ্ণ কৃপাপরায়ণ হইয়া সন্ধি বাসনায় হস্তিনাপুরে গমন করিয়াছিলেন। কিন্তু রাজা দুর্য্যোধন, উভয়পক্ষের হিতাকাঙ্ক্ষী তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করিলেন। অনন্তর দম্ভোদ্ভবের উপাখ্যান, মহাত্মা মাতলির বরান্বেষণ, মহর্ষি গালবের চরিত, বিদুলার স্বপুৎত্রানুশাসন বর্ণিত আছে। কৃষ্ণ কর্ণ ও দুর্য্যোধনের নিতান্ত মন্দ অভিসন্ধি জানিতে পারিয়া সমস্ত রাজাদিগকে স্বীয় যোগেশ্বরত্ব দর্শন করাইলেন। কর্ণকে রথে আরোহণ করাইয়া তাঁহার সহিত কৃষ্ণ পরামর্শ করিয়াছিলেন, কিন্তু কর্ণ অহঙ্কার-পরতন্ত্র হইয়া তাঁহার মন্ত্রণা গ্রহণ করিল না। তিনি হস্তিনাপুর হইতে উপপ্লব্যে আগমন করিয়া পাণ্ডবদিগের নিকট সমুদয় বৃত্তান্ত-বর্ণন করিলেন। তাঁহারা কৃষ্ণের কথা শুনিয়া হিতাহিত বিবেচনাপূর্ব্বক যুদ্ধ-সজ্জা করিতে লাগিলেন। অনন্তর হস্তিনাপুর হইতে সংগ্রামবাসনায় হস্তী, অশ্ব, রথ, পদাতি এই সমুদয় ক্রমশঃ নির্গত হইতে লাগিল।

রাজা দুর্য্যোধন যুদ্ধের পূর্ব্বদিবস পাণ্ডবদিগের নিকট উলুক-নামক দূত প্রেরণ করেন। রথী ও অতিরথ-সংখ্যা, অন্বোপাখ্যান, বহুবৃত্তান্ত-সংযুক্ত সন্ধিবিগ্রহ বিশিষ্ট উদ্‌যোগপর্ব্বে এই সকল কথিত হইল। ইহাতে শত ও ষড়শীতি অধ্যায় আছে। মহর্ষি এই পর্ব্বে ষট্‌সহস্র ষট্‌শত ও অষ্টনবতি শ্লোক রচনা করিয়াছেন।


ভীষ্মপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা:
অতঃপর পরমাশ্চর্য্য ভীষ্মপর্ব্ব। ইহাতে সঞ্জয় জম্বুদ্বীপ নির্ম্মাণ বর্ণনা করেন। যুধিষ্ঠিরের সেনাগণ অত্যন্ত বিষণ্ণ হয়। দশ দিবস অতি ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হইয়াছিল। মহামতি বাসুদেব মুক্তিপ্রতিপাদক বহুবিধ যুক্তি প্রদর্শন করিয়া, অর্জ্জুনের মোহজনিত বিষাদ নিরাকরণ করেন। যুধিষ্ঠিরের হিতাভিলাষী মনস্বী কৃষ্ণ সত্বর রথ হইতে লম্ফপ্রদানপূর্ব্বক প্রতোদ [কশা বা চাবুক] হস্তে লইয়া নিঃশঙ্কচিত্তে ভীষ্মকে সংহার করিতে ধাবমান হইয়াছিলেন এবং সকল ধনুর্দ্ধারিশ্রেষ্ঠ অর্জ্জুনকে বাক্যরূপ অসি দ্বারা আঘাত করেন। অর্জ্জুন শিখণ্ডীকে সম্মুখে রাখিয়া শাণিত শরে ভীষ্মকে রথ হইতে ভূতলে পতিত করিয়াছিলেন। ভীষ্ম শরশয্যায় শয়ান হইলেন। অতি বিস্তৃত ভারতের ষষ্ঠ পর্ব্ব সমাখ্যাত হইল। ইহাতে শত ও সপ্তদশ অধ্যায় নির্দ্দিষ্ট আছে। বেদবেত্তা ব্যাসদেব ভীষ্মপর্ব্বে পঞ্চ সহস্র, অষ্টশত ও চতুরশীতি শ্লোক রচনা করিয়াছেন।


দ্রোণপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা:

অনন্তর বাহুবৃত্তান্তানুগত অতি বিচিত্র দ্রোণপর্ব্ব আরম্ভ হইতেছে। প্রবল-প্রতাপ দ্রোণাচার্য্য সেনাপতিপদে অভিষিক্ত হইয়া দুর্য্যোধনের প্রীতিবর্দ্ধনের নিমিত্ত "ধীমান্ যুধিষ্ঠিরকে যুদ্ধে বন্দী করিব," এইরূপ অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। সংসপ্তকগণ অর্জ্জুনকে সমরাঙ্গন হইতে অর্পসৃত করিয়াছিলেন। শত্রুতুল্য পরাক্রমশালী মহারাজ ভগদত্ত সুপ্রতীক নামক হস্তীর সহিত অর্জ্জুন কর্তৃক নিহত হন। জয়দ্রথ প্রভৃতি সপ্তরথী অপ্রাপ্তযৌবন একাকী বালক অভিমন্যুর প্রাণদণ্ড করিয়াছিলেন। অর্জ্জুন অভিমন্যু-বধে ক্রোধে অধীর হইয়া সপ্ত অক্ষৌহিণী সৈন্যের সহিত জয়দ্রথকে বিনষ্ট করিলেন।

মহাবাহু ভীম ও মহারথ সাত্যকি রাজা যুধিষ্ঠিরের অনুমতিক্রমে অর্জ্জুনের অন্বেষণের নিমিত্ত অতি দুর্দ্ধর্ষ কৌরব-সেনামধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। হতাবশিষ্ট সংসপ্তকগণ যুদ্ধে নিঃশেষ হয়। অলম্বুষ, শ্রুতায়ুঃ,মহাবীর জরাসন্ধ, সৌমদত্তি, বিরাট, মহারথ দ্রপদ ও ঘটোৎকচাদি অন্যান্য বীরগণের নিধনের বিষয় দ্রোণপর্ব্বে কথিত আছে। সমরে দ্রোণাচার্য্য হত হইলে, অশ্বত্থামা ক্রোধান্ধ হইয়া যে ভীষণ নারায়ণাস্ত্র প্রয়োগ করিয়াছিলেন, তাহাও এই পর্ব্বে বর্ণিত আছে। এই পর্ব্বে অত্যুৎকৃষ্ট রুদ্রমাহাত্ম্য, বেদব্যাসের আগমন এবং কৃষ্ণার্জ্জুনের মাহাত্ম্য অভিহিত হইয়াছে। এই মহাভারতের সপ্তম পর্ব্বের বিষয় কথিত হইল। এই দ্রোণপর্ব্বে যে যে বীরপুরুষদিগের কথা নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে, তাঁহারা প্রায় সকলই নিধন-প্রাপ্ত হয়েন। তত্ত্বদর্শী মহামুনি পরাশরাত্মজ এই পর্ব্বে এক শত সপ্ততি অধ্যায় ও অষ্ট সহস্র নব শত নব শ্লোকের সংখ্যা করিয়াছেন।



কর্ণপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা:
অতঃপর কর্ণপর্ব্বের কথা লিখিত হইতেছে। এই পর্ব্বে ধীমান্ শল্যের সারথ্যকার্য্যে নিয়োগ, ত্রিপুরনিপাতনবৃত্তান্ত, গমনকালে কর্ণ ও শল্যের পরস্পর বিবাদ, কর্ণতিরস্কারার্থ শল্য কর্ত্তৃক হংসকাকীয়োপাখ্যান-কথন, মহাপ্রভাব দ্রোণাত্মজ কর্ত্তৃক পাণ্ড্যের নিধন, দণ্ডসেন ও দণ্ডের বধ, সর্ব্বধনুর্দ্ধরগণসমক্ষে কর্ণের সহিত দ্বৈরথযুদ্ধে যুধিষ্ঠিরের প্রাণসংশয়, যুধিষ্ঠির ও অর্জ্জুনের পরস্পর ক্রোধ, কৃষ্ণ কর্ত্তৃক অনুনয়বাক্য দ্বারা অর্জ্জুনের ক্রোধশান্তিকরণ, ভীমসেন কর্ত্তৃক যুদ্ধে দুঃশাসনের বক্ষঃস্থল-বিদারণপূর্ব্বক রক্তপান এবং অর্জ্জুনের সহিত দ্বৈরথ-যুদ্ধে কর্ণের নিপাত; এই সমস্ত বর্ণিত আছে। ভারতের অষ্টম পর্ব্ব নির্দ্দিষ্ট হইল। এই কর্ণপর্ব্বে একোনসপ্ততি অধ্যায় ও চারি সহস্র নয় শত চতুঃষষ্টি শ্লোক কীর্ত্তিত আছে।


শল্যপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা:

অতঃপর বিচিত্র শল্যপর্ব্বের বিষয় কথিত হইতেছে। কুরুসৈন্য বীরশূন্য হইলে, মদ্রাধিরাজ শল্য সৈনাপত্যকার্য্যে নিযুক্ত হইলেন। শল্যপর্ব্বে যাবতীয় রথযুদ্ধ ও প্রধান প্রধান কৌরবদিগের বধ বর্ণিত আছে। এই পর্ব্বে মহাত্মা যুধিষ্ঠির কর্ত্তৃক শল্যের বধ ও সহদেব কর্ত্তৃক শকুনির বিনাশ কথিত আছে। দুর্য্যোধন অল্পমাত্রাবিশিষ্ট সৈন্য দেখিয়া দ্বৈপায়নহ্রদে প্রবেশপূর্ব্বক জলস্তম্ভ [নিশ্চল জলমধ্যে লুক্কায়িত ব্যক্তির বাহির হইতে অনুসন্ধান না পাইবার কৌশল] করিয়া তথায় অবস্থান করিতে লাগিলেন। ব্যাধেরা হ্রদমধ্যে দুর্য্যোধনের আত্মগোপন-বৃত্তান্ত ভীমকে বলিয়া দিল।

মহামানী দুর্য্যোধন ধীমান্ যুধিষ্ঠিরের তিরস্কারবাক্য সহ্য করিতে না পারিয়া হ্রদ হইতে উত্থিত হইলেন ও ভীমের সহিত গদাযুদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। সংগ্রামসময়ে বলরাম আসিয়া উপস্থিত হইলেন। এই পর্ব্বে সরস্বতী ও অন্যান্য তীর্থ-সমুদয়ের পবিত্রতা কীর্ত্তন ও তুমুল গদাযুদ্ধবর্ণন আছে। যুদ্ধে বৃকোদর ভয়ানক গদাঘাতে দুর্য্যোধনের ঊরুদ্বয় ভগ্ন করিলেন। ভারতের নবম পর্ব্ব নির্দ্দিষ্ট হইল। এই পর্ব্বে নানাবৃত্তান্তযুক্ত একোনষষ্টি অধ্যায় কথিত আছে। এক্ষণে শ্লোকসংখ্যা কথিত হইতেছে। কুরুবংশযশঃকীর্ত্তক মহামুনি বেদব্যাস এই পর্ব্বে তিন সহস্র দুই শত বিংশতি শ্লোকের সংখ্যা করিয়া গিয়াছেন।


সৌপ্তিকপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
অনন্তর দারুণ সৌপ্তিকপর্ব্বের কথা লিখিত হইতেছে। পাণ্ডবেরা সংগ্রামক্ষেত্র হইতে শিবিরে গমন করিলে, সায়ংকালে কৃতবর্ম্মা, কৃপাচার্য্য ও অশ্বত্থামা রুধিরাক্তকলেবর ভগ্নোরুযুগল অভিমানী রাজা দুর্য্যোধনের সমীপে সমুপস্থিত হইয়া দেখিলেন, মহারাজ রণক্ষেত্রে পতিত আছেন। মহাক্রোধ দ্রোণাত্মজ প্রতিজ্ঞা করিলেন, "ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতি পাঞ্চালদিগকে ও অমাত্যসহিত পাণ্ডবগণকে বিনষ্ট না করিয়া বর্ম্মত্যাগ করিব না।" রাজাকে এইরূপ কহিয়া তিন জনেই সেস্থান হইতে অপক্রান্ত হইয়া প্রকাণ্ড বটবৃক্ষের তলে উপবিষ্ট হইলেন। ঐস্থানে অশ্বত্থামা রাত্রিকালে পেচককে বহুসংখ্যক কাক নষ্ট করিতে দেখিয়া পিতৃনিধন-বৃত্তান্ত স্মরণপূর্ব্বক ক্রোধান্ধ হইয়া নিদ্রাতুর পাঞ্চালদিগের বধে সপ্রতিজ্ঞ হইলেন। এইরূপ স্থির করিয়া শিবিরদ্বারে গমনপূর্ব্বক দেখিলেন যে, একটা বিকটমূর্ত্তি ভয়ঙ্কর রাক্ষস আকাশ পর্য্যন্ত ব্যাপিয়া রহিয়াছে।

অশ্বত্থামা অস্ত্র ত্যাগ করিতে লাগিলেন, কিন্তু রাক্ষসের কিছুতেই কিছু হইল না। তখন তিনি দেবাদিদেব মহাদেবকে প্রসন্ন করিয়া, কৃতবর্ম্মা ও কৃপাচার্য্যের সহায়তায়, সুষুপ্ত ধৃষ্টদ্যুম্ল প্রভৃতি পাঞ্চালগণকে ও সপরিবার দ্রৌপদীর পুৎত্রগণকে বিনাশ করিলেন। কেবল কৃঞ্চবলে যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চভ্রাতা ও ধনুর্দ্ধর সাত্যকি রক্ষা পাইলেন, আর সকলেই বিনষ্ট হইল। ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথি যুধিষ্ঠিরাদিকে সমাচার দিল যে "অশ্বত্থামা প্রসুপ্ত পাঞ্চালদিগকে বধ করিয়াছে।" দ্রৌপদী পুৎত্র, পিতা, ও ভ্রাতাগণের নিধনবার্ত্তা শ্রবণ করিয়া নিতান্ত অধীরার ন্যায় অনশন সঙ্কল্প করিয়া স্বামিগণের নিকট উপবিষ্টা হইলেন। মহাবলপরাক্রান্ত ভীম দ্রৌপদীর মনস্তুষ্টি-করণার্থ ক্রোধান্বিত হইয়া গদা গ্রহণপুরঃসর অশ্বত্থামার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন।

অশ্বত্থামা ভীমভয়াক্রান্ত হইয়া সক্রোধে "অদ্য আমি মেদিনী পাণ্ডববিহীনা করিব" এই বলিয়া অস্ত্র ত্যাগ করিলেন। কৃষ্ণ "এমন করিও না" এই বলিয়া অশ্বত্থামাকে নিবারণ করিলেন। অর্জ্জুন পাপাত্মা অশ্বত্থামাকে অনিষ্টাচরণে অভিনিবিষ্ট দেখিয়া স্বকীয় অস্ত্র দ্বারা অশ্বত্থামার অস্ত্রচ্ছেদন করিলেন এবং অশ্বত্থামা ও ব্যাসাদি পরস্পরের প্রতি শাপ প্রদান করিলেন। পাণ্ডবগণ মহারথ দ্রোণাত্মজের নিকট হইতে মণি গ্রহণ করিয়া সানন্দে দ্রৌপদীকে প্রদান করিলেন। ভারতের দশম সৌপ্তিকপর্ব্ব নির্দ্দিষ্ট হইল। ব্রহ্মবাদী মহাত্মা উত্তমতেজা বেদব্যাস এই পর্ব্বে অষ্টাদশ অধ্যায় ও অষ্ট শত সপ্ততি শ্লোকের সংখ্যা করিয়াছেন। ঐষীকপর্ব্ব এই পর্ব্বের অন্তর্গত।


স্ত্রীপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
এক্ষণে করুণরসোদ্ধেধক স্ত্রীপর্ব্বের বিষয় কথিত হইতেছে। এই পর্ব্বে পুৎত্রশোকার্ত্ত প্রজ্ঞাচক্ষু রাজা ধৃতরাষ্ট্র ভীমসেনকে সংহার করিতে সঙ্কল্প করিয়া লৌহময়ী ভীমপ্রতিমূর্ত্তি ভগ্ন করেন। বিদুর মোক্ষোপদেশক হেতুবাদ দ্বারা পুৎত্রশোকাভিসন্তপ্ত রাজা ধৃতরাষ্ট্রের সাংসারিকমোহনিবারণ ও তাঁহাকে আশ্বাস প্রদান করেন। শোকার্ত্ত ধৃতরাষ্ট্র অন্তঃপুরমহিলাগণের সহিত রণস্থলদর্শনার্থ গমন করেন। অতঃপর বীরবনিতাগণের করুণস্বরে রোদন এবং গান্ধারী ও ধৃতরাষ্ট্রের ক্রোধ ও মোহ।

তৎপর ক্ষৎত্রিয়পত্নীগণ সমরে অপরাঙ্মুখ নিহত পিতা, ভ্রাতা ও পুৎত্রগণকে দেখিলেন। কৃষ্ণ পুৎত্র-পৌৎত্রশোকাকুলা গান্ধারীর ক্রোধোপশমন করেন। সর্ব্ব-ধর্ম্মজ্ঞশ্রেষ্ঠ, মহাপ্রাজ্ঞ, রাজা যুধিষ্ঠির শাস্ত্রানুসারে নৃপতিগণের শরীর দাহ করাইলেন। ভূপতিগণের উদকক্রিয়া [তর্পণাদি] আরব্ধ হইলে কুন্তী কর্ণকে আপনার গূঢ়োৎপন্ন পুৎত্র বলিয়া স্বীকার ও প্রকাশ করেন। মহর্ষি বেদব্যাস এই একাদশ পর্ব্ব রচনা করিয়াছেন। এই পর্ব্ব শ্রবণ কিংবা পাঠ করিলে সহৃদয় জনের হৃদয় শোকাকুল ও নয়ন অশ্রুজলে পরিপূর্ণ হয়। এই পর্ব্বে বেদব্যাস সপ্তবিংশতি অধ্যায় ও সপ্তশত পঞ্চসপ্ততি শ্লোকের সংখ্যা করিয়া গিয়াছেন।


শান্তিপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
অতঃপর ধীশক্তিবর্দ্ধক শান্তিপর্ব্বে কথা লিখিত হইতেছে। এই পর্ব্বে ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির পিতৃগণ, ভ্রাতৃগণ, পুৎত্র, সন্বন্ধী ও মাতুলগণকে বধ করাইয়া সাতিশয়, নির্ব্বণ্ণ হইলেন। শরশয্যাশায়ী ভীষ্মদেব রাজা যুধিষ্ঠিরকে রাজধর্ম্মোপদেশ প্রদান করেন। ঐ সমস্ত ধর্ম্মের যথার্থ-জ্ঞান দ্বারা লোকে সর্ব্বজ্ঞতা লাভ করে। ইহাতে বিচিত্র মোক্ষধর্ম্মের কথাও সবিস্তারে কথিত আছে। মহাভারতের দ্বাদশ পর্ব্ব নির্দ্দিষ্ট হইল। হে তপোধনগণ! এই শান্তিপর্ব্বে মহামুনি বেদব্যাস ত্রিশত ঊনচত্বারিংশৎ অধ্যায় ও চতুর্দ্দশ সহস্র সপ্ত শত সপ্ত শ্লোক রচনা করিয়াছেন।


অনুশাসনপর্ব্ব –শ্লোকসংখ্যা
ইহার পর অত্যুৎকৃষ্ট অনুশাসনপর্ব্ব। এই পর্ব্বে ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির ভাগীরথীপুৎত্র ভীষ্মদেবের নিকট ধর্ম্মনিশ্চয় শ্রবণ করিয়া বিগতশোক ও স্থিরচিত্ত হইলেন। এই পর্ব্বে ধর্ম্মার্থ-সম্বন্ধ ব্যবহার সমুদয়-কথন, বিবিধ দানের বিবিধ প্রকার ফলনির্দ্দেশ, সৎপাত্র ও অসৎপাত্রের বিশেষ বিবেচনা, দানবিধানকথন, আচার-বিনির্ণয়, সত্যের স্বরূপ-কথন, গোগণের ও ব্রাহ্মণগণের মহত্বকীর্ত্তন, দেশ কালানুযায়ী-ধর্ম্মরহস্য-কথন ও ভীষ্মের অমরলোকসম্প্রাপ্তি কীর্ত্তিত আছে। ধর্ম্মনির্ণায়ক নানা-বৃত্তান্ত-সঙ্কলিত অনুশাসনাভিধান মহাভারতের ত্রয়োদশ পর্ব্ব নির্দ্দিষ্ট হইল। এই অনুশাসনপর্ব্বে মুনিসত্তম পরাশরাত্মজ একশত ষট্‌চত্বারিংশৎ অধ্যায় ও অষ্ট সহস্র শ্লোক নির্ণয় করিয়াছেন।


অশ্বমেধপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা

অতঃপর আশ্বমেধিক-নামক চতুর্দ্দশ পর্ব্বের বিষয় কথিত হইতেছে। এই পর্ব্বে সংবর্ত্তমুনি ও মরুত্ত রাজার আখ্যান, যুধিষ্ঠিরের হিমালয়স্থিত সুবর্ণস্তূপ-সম্প্রাপ্তি ও পরীক্ষিতের জন্ম বৃত্তান্ত বর্ণিত আছে। পরীক্ষিৎ অশ্বত্থামার অস্ত্রানলে দগ্ধ হইয়াছিলেন; কৃষ্ণ তাঁহাকে জীবিত প্রদান করেন। অত্যুৎকৃষ্ট যজ্ঞ-তুরঙ্গরক্ষার্থ তৎপশ্চাদগামী অর্জ্জুনের নানাদেশে ক্রোধনরাজ-পুৎত্রগণের সহিত সংগ্রাম, চিত্রাঙ্গদার গর্ভে সমুদ্ভুত স্বসুত বভ্রুবাহনের সহিত যুদ্ধে ধনঞ্জয়ের জীবন-সংশয়। মহান্ অশ্বমেধযজ্ঞের সমাপ্তির পর নকুলের বৃত্তান্ত। এই পরমাদ্ভুত আশ্বমেধিক পর্ব্বের বিষয় কথিত হইল। এই পর্ব্বে অশেষ-তত্ত্ববিৎ ভগবান্ পরাশরসূনু ত্র্যধিক শত অধ্যায় ও তিন সহস্র তিন শত বিংশতি শ্লোকের সংখ্যা করিয়াছেন।


আশ্রমবাসিকপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা

অনন্তর আশ্রমবাসাখ্য পঞ্চদশ পর্ব্ব। এই পর্ব্বে রাজা ধৃতরাষ্ট্র রাজ্যত্যাগ করিয়া গান্ধারী ও বিদুরের সহিত অরণ্যানী [মহাবন] প্রবেশ করিলেন। গুরুশুশ্রূষায় একান্ত অনুরক্তা, সাধ্বী কুন্তীও ধৃতরাষ্ট্রকে বনে গমন করিতে দেখিয়া পুৎত্ররাজ্য পরিত্যাগকরতঃ তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। রাজা ধৃতরাষ্ট্র সমরে নিহত লোকান্তরগত পুৎত্র-পৌৎত্র এবং অন্যান্য ক্ষৎত্রিয় বীরপুরুষগণকে পুনরাগত দেখিলেন। তিনি মহামুনি বেদব্যাসের প্রসাদে এই আশ্চর্য্য ব্যাপার দর্শন করিয়া অবশেষে শোক পরিত্যাগপূর্ব্বক পরমসিদ্ধি লাভ করিলেন।

বিদুর ও জিতেন্দ্রিয় গবলগণ-নন্দন সঞ্জয় অমাত্যের সহিত ধর্ম্মপথ অবলম্বন করিয়া চরমে সদ্‌গতি প্রাপ্ত হইলেন। ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির তপোধন নারদকে সন্দর্শন করিলেন এবং তৎপ্রমুখাৎ যদুকুলধ্বংসের কথা অবগত হইলেন। এই অত্যদ্ভুত আশ্রমবাসাখ্য পর্ব্বের বিষয় কথিত হইল। মহামুনি বেদব্যাস এই পর্ব্বে দ্বিচত্বারিংশৎ অধ্যায় ও এক সহস্র পঞ্চশত ষট্‌শ্লোকের সংখ্যা করিয়াছেন।


মৌষলপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
হে তপোধনগণ! অতঃপর দারুণ মৌষল-পর্ব্ব জানিবেন। এই পর্ব্বে লবণ-সমুদ্র-সমীপে ব্রহ্মশাপগ্রস্ত পুরুষসিংহ যাদবগণ আপানে [মদ্যপান – দলবদ্ধ হইয়া যেখানে মদ্যপান করা হয়] –মদ্যপান দ্বারা মত্ত হইয়া দারুণ দৈবদুর্ব্বিপাকবশতঃ এরকা [শরতূণ –শরকাঠি] রূপ বজ্র দ্বারা পরস্পর আঘাত করেন। কৃষ্ণ ও বলভদ্র উভয়ে আপনাদিগের কুলক্ষয় করিয়া পরিশেষে আপনারাও সর্ব্বসংহর্ত্তা সমুপস্থিত কালের করাল কবলে নিপতিত হয়েন। নরোত্তম অর্জ্জুন দ্বারবতী নগরীতে আগমনপূর্ব্বক ঐ নগরীকে যাদবশূন্য নিরীক্ষণ করিয়া বিষাদসাগরে নিমগ্ন হইলেন।

তিনি নরশ্রেষ্ঠ মাতুল বসুদেবের সংস্কার করিলেন এবং তৎপরে কৃষ্ণ ও বলরামের সংস্কার করিয়া পরিশেষে অন্যান্য প্রধান প্রধান বৃষ্ণিগণেরও সংস্কার করিলেন। অনন্তর তিনি দ্বারকা হইতে বৃদ্ধ ও বালকগণকে লইয়া গমন করিতে করিতে ঘোরতর আপৎকালে গাণ্ডীবের প্রভাবক্ষয় ও দিব্যাস্ত্র সমুদয়ের অপ্রসন্নতা দেখিলেন। তৎপরে তিনি যাদবমহিলাগণের নাশ ও প্রভুত্বের অনিত্যতা দর্শনে সাতিশয় নির্ব্বেদ-প্রাপ্ত হইয়া ব্যাসোপদেশে যুধিষ্ঠিরের নিকট গমন করিয়া সন্ন্যাসধর্ম্মগ্রহণের বাসনা করিলেন। ষোড়শ-সংখ্যক মৌষলপর্ব্ব কীর্ত্তিত হইল। তত্ত্ববিৎ পরাশরাত্মজ এই পর্ব্বে আট অধ্যায় ও তিনশত বিংশতি শ্লোক গণনা করিয়াছেন।


মহাপ্রাস্থানিকপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
‌‌ তদনন্তর মহাপ্রাস্থানিক-নামক সপ্তদশ পর্ব্বের বিষয় লিখিত হইতেছে। এই পর্ব্বে পুরুষশ্রেষ্ঠ পাণ্ডবগণ স্বকীয় রাজ্য পরিত্যাগপূর্ব্বক দ্রৌপদী দেবীকে সমভিব্যাহারে লইয়া মহাপ্রস্থানে প্রস্থিত হইলেন। তাঁহারা লোহিত্যার্ণবের কূলে অগ্নিসন্দর্শন পাইলেন। অর্জ্জুন মহানুভব অগ্নি কর্ত্তৃক আদিষ্ট হইয়া তাঁহাকে পূজা করিয়া অত্যুৎকৃষ্ট গাণ্ডীবধনু প্রদান করিলেন। যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণ ও দ্রৌপদীকে নিপতিত ও নিহত দেখিয়া তাঁহাদিগের প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপও না করিয়া সমস্ত মায়ামোহ পরিত্যাগপূর্ব্বক প্রস্থান করিলেন। মহাপ্রাস্থানিকাখ্য সপ্তদশ পর্ব কথিত হইল। এই পর্ব্বে অশেষতত্ত্বজ্ঞ ভগবান্ পরাশরনন্দন তিন অধ্যায় ও তিন শত বিংশতি শ্লোক নির্দ্ধারিত করিয়াছেন।


স্বর্গরোহণপর্ব্ব – শ্লোকসংখ্যা
অনন্তর আশ্চর্য্য অলৌকিক স্বর্গপর্ব্ব জানিবেন। এই পর্ব্বে দয়ার্দ্রাচিত্ত মহাপ্রাজ্ঞ ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির দেবলোক হইতে আগত দৈবরথে কুক্কুর ত্যাগ করিয়া আরোহণে সম্মত হইলেন না। ধর্ম্ম স্বয়ং যুধিষ্ঠিরের ধর্ম্মে অবিচলিত অনুরাগ বুঝিতে পারিয়া কুক্কুররূপ পরিত্যাগপূর্ব্বক দর্শন দিলেন। পরম্‌-ধার্ম্মিক যুধিষ্ঠির ধর্ম্মের সহিত একরথে উপবিষ্ট হইয়া স্বর্গে গমন করিলেন। দেবদূত ছল করিয়া নরক দর্শন করাইলেন। পরমধার্মিকাগ্রগণ্য যুধিষ্ঠির তৎস্থানস্থিত নির্দেশানুবর্ত্তী ভ্রাতৃগণের করুণ-রসোদ্দীপক ক্রন্দনধ্বনি শ্রবণ করিলেন। ধর্ম্ম ও দেবরাজ ইন্দ্র তাঁহার মনোদুঃখ নিবারণ করেন। তৎপরে ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির সুরদীর্ঘিকায় [স্বর্গনদী–গঙ্গা] স্নান করিয়া মানুষ-কলেবর পরিত্যাগপূর্ব্বক স্বর্গে নিজ ধর্ম্মার্জ্জিত স্থান পাইয়া ইন্দ্রাদি দেবগণ কর্ত্তৃক পরম সমাদৃত হইয়া পরমানন্দে কালযাপন করিতে লাগিলেন। হে তপোধনগণ! অশেষধীশক্তিসম্পন্ন নামাতত্ত্বদর্শী মহর্ষি বেদব্যাস এই অষ্টাদশ পর্ব্ব রচনা এবং ইহাতে পাঁচ অধ্যায় ও দুই শত নব শ্লোকের সংখ্যা করিয়া গিয়াছেন।


হরিবংশ – শ্লোকসংখ্যা
এইরূপে অষ্টাদশ পর্ব্ব সবিস্তারে উক্ত হইল। ইহার পর হরিবংশ ও ভবিষ্যপর্ব্ব কথিত আছে। মহর্ষি হরিবংশে দ্বাদশ সহস্র শ্লোকসংখ্যা করিয়াছেন। মহাভারতের পর্ব্বসংগ্রহ নির্দ্দিষ্ট হইল।


পর্ব্বসংগ্রহ-প্রশংসা:
যুদ্ধ করিবার নিমিত্ত অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা আসিয়াছিল। সেই ঘোর সংগ্রাম অষ্টাদশ দিবস ব্যাপিয়া হয়।
যে দ্বিজ অঙ্গ ও উপনিষদের সহিত চারি বেদ উত্তমরূপে অধ্যায়ন করিয়াছেন, কিন্তু মহাভারতাখ্যান জানেন না, তাঁহাকে বিচক্ষণ বলিতে পারা যায় না। অপরিমিত-ধীশক্তিমান্ বেদব্যাস এই ভারতকে অর্থশাস্ত্র, ধর্ম্মশাস্ত্র ও কামশাস্ত্রস্বরূপ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। যেমন পরম সুমধুর পুংস্কোকিলের কলরব শ্রবণ করিয়া কর্কশ কাকধ্বনি শ্রবণ করিতে ইচ্ছা হয় না, সেইরূপ এই আখ্যান শ্রবণ করিলে অন্যশাস্ত্র-শ্রবণে রুচি থাকে না। যেমন পঞ্চভূত হইতে ত্রিবিধ লোকের উৎপত্তি হয়, সেইরূপ এই সর্ব্বোৎকৃষ্ট ইতিহাস হইতে কবিগণের বুদ্ধি উৎপন্ন হয়।

হে বিপ্রোত্তমগণ! যেমন জরায়ুজাদি চতুর্ব্বিধ শরীরী অন্তরীক্ষের [আকাশতলের সমগ্র সৃষ্টির] অন্তর্গত, সেইরূপ যাবতীয় পুরাণ এই আখ্যানের অন্তর্ভূত। যেমন বিচিত্রা মানসিক ক্রিয়া সমস্ত ইন্দ্রিয়গণের আশ্রয়, সেইরূপ এই ইতিহাস যাবতীয় দানাধ্যয়নাদি ক্রিয়া ও শমদমাদি গুণের আশ্রয়। যেমন আহার বিনা শরীরীর শরীর ধারণের উপায়ান্তর নাই, সেইরূপ এই সুললিত ইতিহাসান্তর্গত কথা ব্যতিরেকে ভূমণ্ডলে অন্য কথা নাই। যেমন সমুন্নতি-প্রেপসু ভূত্যগণ সদ্‌বংশজ প্রভুর আরাধনা করে, সেইরূপ কবিবরাগ্রগণ্যগণ এই বিচিত্র ইতিহাসের উপাসনা করিয়া থাকেন। যেমন অন্যান্য আশ্রমাপেক্ষা গৃহস্থাশ্রম উৎকৃষ্ট, সেইরূপ এই কাব্য অন্যান্য কবিকৃতকাব্য অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।

হে মহর্ষিগণ! তোমাদিগের ধর্ম্মে মতি হউক। কারণ, লোকান্তরগত জনের ধর্ম্মই অদ্বিতীয় বন্ধু। অর্থ ও স্ত্রী সাতিশয়ানুরাগপূর্ব্বক সেবিত হইলেও কখন স্থির ও আত্মীয় হয় না। যে ব্যক্তি কৃষ্ণদ্বৈপায়নের ওষ্ঠবিনির্গত অপ্রমেয় পরমপবিত্র পাপনাশক মঙ্গলবিধায়ক পাঠ্যমান ভারত শ্রবণ করে, তাহার পুষ্করজলে স্নান করিবার প্রয়োজন কি? ব্রাহ্মণ দিবাভাগে নিরঙ্কুশ ইন্দ্রিয়গণ-প্রভাবে যে পাপরাশি সঞ্চয় করেন, সন্ধ্যাকালে মহাভারত পাঠ দ্বারা সেই সকল পাপপুঞ্জ হইতে মুক্ত হয়েন; আর নিশাকালে কর্ম্ম, মন ও বাক্য দ্বারা যে সকল পাপ সঞ্চয় করেন, প্রাতঃকালে মহাভারত পাঠ করিয়া সেই সমস্ত পাপ হইতে মুক্ত হয়েন।

যে ব্যক্তি বেদজ্ঞ ও বহুশ্রুত ব্রাহ্মণকে কনকমণ্ডিত শত গো-দান করে, আর যে ব্যক্তি পরম পবিত্র ভারত-কথা প্রত্যহ শ্রবণ করে, এই দুইজনের তুল্য ফললাভ হয়। যেমন অর্ণবপোতাদি দ্বারা সুবিস্তীর্ণ অগাধ-জলধি অনায়াসে পার হওয়া যায়, সেইরূপ অগ্রে পর্ব্বসংগ্রহশ্রবণ দ্বারা অত্যুৎকৃষ্ট মহার্থযুক্ত উপাখ্যান সুখবোধ্য হয় জানিবেন।




.....................পর্ব্বসংগ্রহাধ্যায় সমাপ্ত।.............................
0 comments

কর্ণ



হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– সূর্যদেবতার ঔরসে ও কুন্তী দেবীর গর্ভে এঁর জন্ম হয়েছিল। একবার মহর্ষি দুর্বাসা কুন্তীর গৃহে অতিথি হিসাবে আসেন। কুন্তীর অতিথি সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে- দুর্বাসা কুন্তীকে একটি মন্ত্র দান করেন। এই মন্ত্রের দ্বারা ইনি যে দেবতাকে স্মরণ করবেন, সেই দেবতাই এসে কুন্তীকে সংগম দ্বারা পরিতৃপ্ত করে পুত্র দান করবেন। কৌতুহলবশতঃ কুমারী অবস্থাতেই একবার কুন্তী সূর্য দেবতাকে ডেকে বসেন এবং সূর্যদেবের সাথে মিলনের ফলে ইনি গর্ভবতী হয়ে পড়েন। যথা সময়ে ইনি একটি পুত্র সন্তান লাভ করলে, লোকলজ্জার ভয়ে সেই পুত্রকে একটি পাত্রে রেখে জলে ভাসিয়ে দেন। এই পুত্রের নামই কর্ণ। সূতবংশীয় অধিরথ ও তাঁর স্ত্রী রাধা কর্ণকে জল থেকে উদ্ধার করে প্রতিপালন করেন। রাধার পুত্র হিসাবে কেউ কেউ তাঁকে রাধেয় নামে ডাকতো। এই দম্পতি কর্ণের নাম রেখেছিলেন বসুষেণ।

ইনি অন্যান্য দেশের রাজপুত্রদের সাথে দ্রোণাচার্যের অস্ত্রশিক্ষা করেন। অস্ত্রশিক্ষা শেষে ইনি অর্জুনের সকল অস্ত্রকৌশল দেখান এবং অর্জুনকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে আহ্বান করেন। কর্ণের পরিচয় অজ্ঞাত থাকায় অর্জুন এই আহ্বানে সাড়া দেন নাই। কর্ণের এরূপ বীরত্বের পরিচয় পেয়ে দুর্যোধন তাঁর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে অঙ্গরাজ্যের রাজপদে অভিষিক্ত করেন। এরপর দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় ইনি লক্ষ্যভেদের চেষ্টা করলে— দ্রৌপদী ঘোষণা দেন যে, সূতপুত্রের গলায় মালা দেবেন না। সে কারণে ইনি এই প্রতিযোগিতা থেকে বিরত থাকেন। অর্জুন লক্ষ্যভেদে দ্রৌপদী লাভ করলে— অন্যান্য রাজন্যবর্গের সাথে ইনি পাণ্ডবদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এবং অর্জুনের কাছে পরাস্ত হন। ইনি দ্রোণাচার্যের কাছে ব্রহ্মাস্ত্র বিদ্যা শিখতে চাইলে, সূতপুত্র বলে দ্রোণাচার্য তাঁকে শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।

এরপর ইনি পরশুরামের কাছে গিয়ে ব্রাহ্মণ পরিচয়ে এই বিদ্যালাভ করেন। একদিন পরশুরাম এঁর কোলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলেন। এমন সময় অলর্ক নামক একটি কীট কর্ণের উরু বিদীর্ণ করে। গুরুর ঘুম ভেঙে যাবার ভয়ে ইনি যন্ত্রণা সহ্য করতে থাকলেন। একসময় পরশুরাম ঘুম ভেঙে উঠে সকল বিষয় দেখে এবং কর্ণের কষ্ট সহিষ্ণুতা লক্ষ্য করে তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানতে চাইলেন। অবশেষে কর্ণ ব্রাহ্মণ নয় জেনে এবং গুরুকে প্রতারণা করার জন্য অভিশাপ দিয়ে বললেন যে, কপট উপায়ে ব্রহ্মাস্ত্র লাভের জন্য, কার্যকালে কর্ণ এই অস্ত্রের কথা ভুলে যাবেন। আর একবার ইনি এক ব্রাহ্মণের হোম ধেনু হত্যা করার জন্য, উক্ত  ব্রাহ্মণ তাঁকে অভিশাপ দিয়ে বলেন যে,— যুদ্ধকালে এঁর মহাভয় উপস্থিত হবে, পৃথিবী তাঁর রথের চাকা গ্রাস করবে এবং কোন এক বিশেষ প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করতে সচেষ্ট হলে তাঁর হাতেই কর্ণের মৃত্যু হবে।

পরশুরামের কাছে অস্ত্রশিক্ষা সমাপ্ত করে ইনি কলিঙ্গরাজের কন্যার স্বয়ংবর সভায় উপস্থিত হন। সেখানে কলিঙ্গরাজ জরাসন্ধের সাথে যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে জরাসন্ধ সন্তুষ্ট হয়ে কর্ণকে মালিনীনগর দান করেন। কর্ণ দুর্যোধনের পরামর্শদাতাদের অন্যতম ছিলেন। পাণ্ডবদের জতুগৃহ দাহে ইনি পরামর্শ দিয়েছিলেন। পাণ্ডবদের বনবাসকালীন সময়ে দ্বৈতবনে অবস্থানের সময় শকুনি ও কর্ণের পরামর্শে দুর্যোধন পাণ্ডবদের দুর্দশা দেখতে যান। সেখানে গন্ধর্বরাজের কাছে দুর্যোধন পরাজিত ও বন্দী হলে কর্ণ তাদের উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন। অবশেষে অর্জুন তাদের রক্ষা করেছিলেন। দুর্যোধনের বৈষ্ণবযজ্ঞকালে ইনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, অর্জুনকে হত্যা না করা পর্যন্ত পাদ-প্রক্ষালন বা জল গ্রহণ করবেন না। আসুরব্রত অবলম্বন করে ইনি আবার প্রতিজ্ঞা করেন যে অর্জুন নিহত না হওয়া পর্যন্ত, এঁর কাছে কেউ কোন কিছু প্রার্থনা করলে তাকে তিনি বিমুখ করবেন না।

কর্ণের দানশীলতা পরীক্ষা করার জন্য কৃষ্ণ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে এসে আহার করার জন্য তাঁর ছেলে বৃষকেতুর মাংস চান। কর্ণ তাঁর পুত্রকে হত্যা করে কৃষ্ণকে আহার করতে দেন। কৃষ্ণ কর্ণের এই ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে এই সন্তানের জীবন দান করেন। এই ব্রত পালনের সময় অর্জুনের পিতা ইন্দ্র ব্রাহ্মণবেশ ধারণ করিয়া অর্জুনের জন্য তাঁর কুণ্ডলদ্বয় ও কবচ প্রার্থনা করেন। কর্ণের পিতা সূর্য এ বিষয়ে কর্ণকে পূর্বেই সতর্ক করে দিলেও সত্য রক্ষার্থে কর্ণ তা ইন্দ্রকে দান করেন। তবে সূর্যের পরামর্শে অর্জুনকে হত্যা করার জন্য ইন্দ্রের কাছ থেকে একাগ্নি বাণ প্রার্থনা করেন। ইন্দ্র এই অস্ত্র একবার মাত্র ব্যবহারের সূযোগ দেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চতুর্দশ দিবসে কর্ণ ঘটোৎকচ বধে এই অস্ত্র প্রয়োগ করেছিলেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে কৃষ্ণ তাঁর জন্ম পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন যে- পাণ্ডবদের সে অগ্রজ। সুতরাং সে কারণে কর্ণের উচিৎ এই যুদ্ধ পরিহার করে পাণ্ডবদের সাথে ভাই হিসাবে মিলে যাওয়া। কর্ণ এই  প্রস্তাবে রাজি হলে- অগ্রজ হিসাবে যুধিষ্ঠীরের পরিবর্তে কর্ণই রাজা হতেন। কর্ণ রাজি হননি বেশ কয়েকটি কারণে-
ক। কুন্তি তাঁকে পরিত্যাগ করলে যাঁরা তাঁকে পিতামাতা হিসাবে পরিচয় দিয়েছিলেন, তাঁদের সে পরিচয়েই পরিচিত থাকতে চেয়েছিলেন।
খ। দুর্যোধন তাঁকে রাজ্যদান করে সম্মান দিয়েছিলেন এবং তাঁর ভরসাতেই দুর্যোধন এই যুদ্ধে অগ্রসর হয়েছেন। সুতরাং কর্ণ সেখান থেকে ফিরে দুর্যোধনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবেন না। যুধিষ্ঠির যাতে এই ঘটনা জানতে না পারে সেরূপ অনুরোধ করে কৃষ্ণকে জানান যে- যুধিষ্ঠির জানলে তিনি অগ্রজ হিসাবে কর্ণকে রাজ্যদান করবেন, আর সে রাজ্য কর্ণ দুর্যোধনকে দান করবেন।

কর্ণের মাতাপিতা (কুন্তী ও সূর্য) কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু কর্ণ তা অগ্রাহ্য করেছিলেন। তবে প্রতিজ্ঞা করে বলেছিলেন অর্জুন ছাড়া অন্য কোন পাণ্ডবকে তিনি হত্যা করবেন না। যুদ্ধের প্রারম্ভে ভীষ্ম কবচ-কুণ্ডল হীন কর্ণকে নীচ ও গর্বিত বলেছিলেন এবং পশুরাম কর্তৃক অভিশপ্ত বলে ভীষ্ম তাঁকে অবজ্ঞা করেছিলেন। সেই কারণে ইনি প্রতিজ্ঞা করে বলেছিলেন যে ভীষ্ম জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় অস্ত্র ধারণ করবেন না। ভীষ্ম শরশয্যায় অবস্থানকালে কর্ণকে তাঁর জন্মবৃত্তান্ত অবগত করিয়ে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে নিষেধ করলে- কর্ণ দুর্যোধনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে বলে তা অগ্রাহ্য করেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিনে কর্ণ অপর ছয়জন মহারথের সাথে মিলিত হয়ে অর্জুন-পুত্র অভিমন্যুকে হত্যা করতে সাহায্য করেন। যুদ্ধের চতুর্দশ দিনে অর্জুনের জন্য রক্ষিত ইন্দ্র-প্রদত্ত একাঘ্নী বাণ নিক্ষেপে ইনি ঘটোত্কচকে হত্যা করেন।  যুদ্ধের ষোড়শ দিনে দ্রোণের মৃত্যুর পর ইনি কৌরব-সেনাপতি পদে অভিষিক্ত হন। অর্জুন ছাড়া অপর পাণ্ডবেরা তাঁর কাছে পরাজিত হলেও প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হবে বলে- কাউকেই ইনি হত্যা করেননি। পরশুরাম ও ব্রাহ্মণের অভিশাপের কারণে ইনি হীনবল অবস্থায়, অর্জুন অঞ্জলিক বাণে কর্ণের শিরশ্ছেদ করেন।

কর্ণের স্ত্রীর নাম ছিল পদ্মাবতী। তাঁর তিনজন সন্তানের নাম জানা যায়। এরাঁ হলেন -বৃষসেন, বৃষকেতু, চিত্রসেন। ইনি অঙ্গরাজ্যের অধিপতি ছিলেন বলে- এঁর অন্যান্য নাম ছিল- অঙ্গরাজ, অঙ্গাধিপ, অঙ্গাধিপতি, অঙ্গাধীশ, অঙ্গাধীশ্বর। সূর্যের পুত্র হিসাবে তাঁর নাম ছিল- অরুণাত্মজ, অর্কতনয়, অর্কনন্দন, অর্কপুত্র, অর্কসূত, অর্কসূনু।  
0 comments

গীতা জয়ন্তী:

গীতা জয়ন্তী (আপডেট)
এই তিথিতেই পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা বীর অর্জুনকে ৫১৫০ (৩১৩৮ খ্রীঃপূঃ নভেম্বর ০২ তারিখ শুক্রবার) বছর আগে কুরুক্ষেত্র (৬০ কিঃমিঃ) নামক স্থানে ভগবদ্গীতার জ্ঞান দান করেছিলেন । তাই এই মহিমা মণ্ডিত তিথিকে গীতা জয়ন্তী তিথি বলা হয় ।
গীতা সর্ম্পকে কিছু বহিরঙ্গা জ্ঞান
১। গীতা হচ্ছে সমস্ত শাস্ত্রের সারতিসার এমনকি গীতায় এমন কিছু আছে যা অন্যান্য কোন শাস্ত্রে পাওয়া যায় না । যেমন – ৫ম পুরুষার্থ
২। মহাভারতের ভীষ্মপর্বের ২৫ থেকে ৪২ নং অধ্যায়ের এই ১৮ টি অধ্যায় হল ভগবদগীতা বা গীতোপনিষদ ।
৩। গীতায় আছে ৭০০ শ্লোক (কেউ বলে ৭৪৫ শ্লোক) আছে । তার মধ্যে ধৃতরাষ্ট্র বলেন ১টি শ্লোক, সঞ্জয় বলেন ৪০টি শ্লোক, অর্জুন বলেন ৮৫টি শ্লোক, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন ৫৭৪টি শ্লোক । আর পুরো গীতায় ৯৫৮০ টি সংস্কৃত শব্দ আছে ।
৪। গীতার ১৮টি অধ্যায়ের মধ্যে প্রথম ৬টি অধ্যায়কে বলে কর্মষটক, মাঝখানের ৬টি অধ্যায়কে বলে ভক্তিষটক, আর বাকি ৬টি অধ্যায়কে বলে জ্ঞানষটক ।
৫। গীতা পড়লে ৫টি জিনিষ সর্ম্পকে জানা যায় – ঈশ্বর, জীব, প্রকৃতি, কাল ও কর্ম ।
৬। যদিও গীতার জ্ঞান ৫০০০ বছর আগে বলেছিল কিন্তু ভগবান চতুর্থ অধ্যায় বলেছেন এই জ্ঞান তিনি এর আগেও বলেছেন, মহাভারতের শান্তিপর্বে (৩৪৮/৫২-৫২) গীতার ইতিহাস উল্লেখ আছে । তার মানে গীতা প্রথমে বলা হয় ১২,০৪,০০,০০০ বছর আগে, মানব সমাজে এই জ্ঞান প্রায় ২০,০০,০০০ বছর ধরে বর্তমান, কিন্তু কালের বিবর্তনে তা হারিয়ে গেলে পুনরায় আবার তা অর্জুনকে দেন ।
৭। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মাত্র ৪০ মিনিটে এই গীতার জ্ঞান দেন ।
৮। গীতার মাহাত্ম্য অনেকে করে গেছেন তার মধ্যে শ্রীশঙ্করাচার্য, স্কন্দপুরাণ থেকে শ্রীল ব্যাসদেব, শ্রীবৈষ্ণবীয় তন্ত্রসারে গীতা মাহাত্ম্য আর আছে পদ্মপুরাণে দেবাদিদেব শিব কর্তৃক ১৮টি অধ্যায়ের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন ।
৯। গীতাতে অর্জুনের ২০টি নাম আর কৃষ্ণের ৩৩টি নামের উল্লেখ করা হয়েছে ।
১০। গীতাতে মাং এবং মামেব কথাটি বেশি আছে, যোগ শব্দটি আছে ৭৮ বার, যোগী আছে ২৮ বার আর যুক্ত আছে ৪৯ বার ।
১১। গীতার ২য় অধ্যায়কে বলা হয় গীতার সারাংশ ।
১২। ভগবান যখন বিশ্বরূপ দেখান তখন কাল থেমে যায় ।
১৩। ভগবান শুধু যুদ্ধের আগেই গীতা বলেনি ১৮ দিন যুদ্ধের মাঝখানেও গীতা বলেছে ।
১৪। গীতায় অর্জুন ১৬টি প্রশ্ন করে আর কৃষ্ণ তার উত্তর দেন, কৃষ্ণ তা ৫৭৪টি শ্লোকের মাধ্যমে উত্তর দেন ।
১৫। পুরো গীতার সারমর্ম মাত্র ৪টি শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে, ১০ অধ্যায়ের ৮ থেকে ১১ নং শ্লোক ।
১৬। পুরো গীতায় অর্জুন ৪৫ নামে কৃষ্ণকে সম্বধোন করছেন, আর কৃষ্ণ অর্জুনকে ২১টি নামে সম্বধোন করেছেন ।
১৭। গীতার ৫ম অধ্যায় ১৩ থেকে ১৬ নং শ্লোকে তিনজন কর্তার কথা বলা হয়েছে ।
১৮। গীতায় ৩টি গুণ, ৩টি দুঃখ আর ৪টি আমাদের প্রধান সমস্যার কথা বলেছে ।
১৯। ত্রিশ্লোকী গীতার জ্ঞান ঃ যা বেদ ও বেদান্তের সার, ১৫ অধ্যায়ের ১৬ থেকে ১৮ নং শ্লোক ।
২০। গীতায় ২৬টি গুণের কথা বলা হয়েছে আর ৬টি আসুরিক প্রবৃত্তির কথা বলা হয়েছে ।
২১। নরকের ৩টি দ্বারের কথা বলা হয়েছে (কাম, ক্রোধ ও লোভ)
২২। গীতার ১৮ অধ্যায় ব্রাক্ষ্মনের ৯টি গুণ, ক্ষত্রিয়ের ৭টি গুণ, বৈশ্যের ৩টি গুণ আর শুদ্রের ১টি গুণ ।
২৩। ৩টি কর্মের প্রেরণা আর ৩টি কর্মের আশ্রয়ের কথা বলা আছে ।
২৪। বেদান্ত শাস্ত্রের সিধান্ত অনুসারে কর্মসমূহের সিদ্ধির উদ্দেশ্যে ৫টি নির্দিষ্ট কারণ কথা বলা হয়েছে ।
২৫। গুণ অনুসারে ৩ প্রকারের ত্যাগের কথা বলা হয়েছে ।
২৬। ৩ প্রকারের আহার, যজ্ঞ, তপস্যা, শ্রদ্ধা, পূজা ও দানের কথা বলা হয়েছে ।
২৭। ২টি স্বভাবের জীবের কথা বলা হয়েছে ।
২৮। ২ প্রকার জীবের কথা বলা হয়েছে ।
২৯। ১৮টি আত্মজ্ঞানের সাধনার গুনের কথা বলা হয়েছে ।
৩০। ব্রক্ষ্ম উপলব্ধির ৫টি স্তরের কথা বলা হয়েছে ।
৩১। ভক্তদের ৩৬ টি গুণের কথা বলা হয়েছে ।
৩২। গীতায় ২৫ জন সৃষ্টের কথা বলা হয়েছে যারা স্থাবর, জঙ্গম ও সমস্ত প্রজাদের সৃষ্টি করেছেন ।
৩৩। গীতায় নারীর ৭টি গুণের কথা বলা হয়েছে ।
৩৪। ৪ প্রকার সুকৃতিবান ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে । আর ৪ প্রকার দুষ্কৃতিবানের কথা বলা হয়েছে ।
৩৫। জড়া প্রকৃতির ৮টি উপাদানের কথা বলা হয়েছে ।
(সংক্ষিপ্ত)
Courtesy By: Susanta Banda
1 comments

প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের সেই মর্মান্তিক কাহিনী

বন্ধুরা আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরব প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের সেই মর্মান্তিক কাহিনী।


নালন্দা ভারতের বিহার রাজ্যে অবস্থিত একটি প্রাচীন উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র। প্রাচীন নালন্দা মহাবিহার বিহারের রাজধানী পাটনা শহর থেকে ৫৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ছিল। খ্রিষ্টীয় ৪২৭ অব্দ থেকে ১১৯৭ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে নালন্দা ছিল একটি প্রসিদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র। এই মহাবিহারকে "ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অন্যতম" বলে মনে করা হয়। এখানকার কয়েকটি সৌধ মৌর্য সম্রাট অশোক নির্মাণ করেছিলেন। গুপ্ত সম্রাটরাও এখানকার কয়েকটি মঠের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, গুপ্ত সম্রাট শক্রাদিত্যের (অপর নাম কুমারগুপ্ত, রাজত্বকাল ৪১৫-৫৫) রাজত্বকালে নালন্দা মহাবিহারের বিকাশলাভ ঘটে। পরবর্তীকালে বৌদ্ধ সম্রাট হর্ষবর্ধন ওপাল সম্রাটগণও এই মহাবিহারের পৃষ্ঠপোষক হয়েছিলেন।১৪ হেক্টর আয়তনের মহাবিহার চত্বরটি ছিল লাল ইঁটে নির্মিত। খ্যাতির মধ্যগগনে থাকাকালীন অবস্থায় চীন, গ্রিস ও পারস্য থেকেও শিক্ষার্থীরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আসতেন বলে জানা যায়।

১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কি মুসলমান আক্রমণকারী বখতিয়ার খিলজি নালন্দা মহাবিহার লুণ্ঠন ও ধ্বংস করেন। এই ঘটনা ভারতে বৌদ্ধধর্মের পতনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে বিবেচিত হয়। ২০০৬ সালে ভারত, চীন,সিঙ্গাপুর, জাপান ও অন্যান্য কয়েকটি রাষ্ট্র যৌথভাবে এই সুপ্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়টির পুনরুজ্জীবনের প্রকল্প গ্রহণ করে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম স্থির হয়েছে নালন্দা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। এটি প্রাচীন নালন্দা মহাবিহারের ধ্বংসাবশেষের নিকট নির্মিত হবে।

"নালন্দা" শব্দটির অর্থ "দানে অকৃপণ"।
চীনা তীর্থযাত্রী সন্ন্যাসী হিউয়েন সাঙ নালন্দা নামের বিবিধ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তাঁর একটি মত হল, এই নামটি স্থানীয় আম্রকুঞ্জের মধ্যবর্তী পুষ্করিণীতে বসবাসকারী একটি নাগের নাম থেকে উদ্ভুত। কিন্তু যে মতটি তিনি গ্রহণ করেছেন, সেটি হল,শাক্যমুনি বুদ্ধ একদা এখানে অবস্থান করে "অবিরত ভিক্ষাপ্রদান" করতেন; সেই থেকেই এই নামের উদ্ভব।
সারিপুত্তর মৃত্যু হয়েছিল "নালক" নামে এক গ্রামে। কোনো কোনো গবেষক এই গ্রামটিকেই "নালন্দা" নামে অভিহিত করেন।

নালন্দা পৃথিবীর প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি এবং এটি ইতিহাসের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও একটি। এর স্বর্ণযুগে ১০,০০০ এর অধিক শিক্ষার্থী এবং ২,০০০ শিক্ষক এখানে জ্ঞান চর্চা করত। একটি প্রধান ফটক এবং সুউচ্চ দেয়ালঘেরা বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপত্যের একটি মাস্টারপিস হিসেবে সুপরিচিত ছিল।বিশ্ববিদ্যালয়ে আটটি ভিন্ন ভিন্ন চত্বর(compound) এবং দশটি মন্দির ছিল; ছিল ধ্যান করার কক্ষ এবং শ্রেনীকক্ষ। প্রাঙ্গনে ছিল কতগুলো দীঘি ও উদ্যান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারটি ছিল একটি নয়তলা ভবন যেখানে পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হত অত্যন্ত সতর্কতার সাথেধর্মের পাশাপাশি বেদ _উপনিশদ, বিতর্ক, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, সাহিত্য, গণিত, জ্যোতিষ বিদ্যা, শিল্প কলা, চিকিৎসাশাস্ত্র সহ তৎকালীন সর্বোচ্চ শিক্ষা ব্যাবস্থার উপযোগী আরো বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে নিয়মিত পাঠ দান চলত এখানে।। তৎকালীন জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল শাখাতেই চর্চার সুযোগ থাকায় সুদূর কোরিয়া, জাপান, চীন, তিব্বত,ইন্দোনেশিয়া, পারস্য এবং তুরস্ক থেকে জ্ঞানী ও জ্ঞান পিপাসুরা এখানে ভীড় করতেন। চীনের ট্যাং রাজবংশের রাজত্বকালে চৈনিক পরিব্রাজক জুয়ানঝাং ৭তম শতাব্দিতে নালন্দার বিস্তারিত বর্ণনা লিখে রেখে গেছেন।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার ধর্ম গুঞ্জ বা ধর্মগঞ্জ সেই সময়ে বৌদ্ধজ্ঞানের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ভান্ডার হিসাবে সুপরিচিত ছিল। পাঠাগারে ছিল শত শত হাজার হাজার পুঁথি,। পাঠাগারের মূল ভবন ছিল তিনটি যার প্রত্যেকটি প্রায় নয়তলা ভবনের সমান উঁচু; ভবনগুলো রত্নসাগর, রত্নদধি ও রত্নরঞ্জক নামে পরিচিত ছিল।
নালন্দার লাইব্রেরী

শত শত বছর ধরে অবদান রেখে আসা একটি সভ্য, উন্নত জাতি তৈরী ও জ্ঞান উৎপাদনকারী নিরীহ এই প্রতিষ্ঠানটি ১১৯৩ খ্রষ্টাব্দে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী আক্রমন করে ধ্বংস করে ফেলেন। তার আক্রমনের বর্বরতা এত ভয়াবহ আকারে ছিল এ সম্পর্কে পারস্য ইতিহাসবিদ মিনহাজ তাঁর “তাবাকাতে নাসিরি” গ্রন্থে লিখেছেন “হাজার হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষুকে আগুনে পুড়িয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে সেখানে ইসলাম প্রচারের চেষ্টা করেন খিলজী” এরপর আগুন লাগিয়ে দেন লাইব্রেরীর ভবন গুলোতে। লাইব্রেরীতে বইয়ের পরিমান এত বেশী ছিল যে কয়েক মাস সময় লেগেছিল সেই মহা মূল্যবান বই গুলো পুড়ে ছাই ভষ্ম হতে(জনশ্রুতি আছে ছয় মাস) খিলজী শুধু নালন্দাকে পুড়িয়ে ছাই করেন নি, একই সাথে পুড়িয়ে ছাই করেছেন একটি জাতির সভ্যতা, ইতিহাস, প্রাচীন জ্ঞান বিজ্ঞানের অমূল্য বই যা থেকে আমরা জানতে পারতাম সে যুগের ভারত বর্ষের শিক্ষার অবকাঠামো, তৎকালীন সামাজিক-সাংষ্কৃতিক অবস্থা ও প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি সম্পর্কে। জাতি হিসাবেও হয়তো আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে সহস্র বছর।

সেদিন তার ধারালো তরবারির নিষ্ঠুর আঘাতে ফিনকি দিয়ে ছোটা রক্ত বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া নিরস্ত্র মানুষের আর্ত চিৎকারে ও জীবন্ত মানুষ পোড়া গন্ধের সাথে বাতাসে ভেসে আসা বাচঁতে চাওয়া ঝলসানো সাধারণ মানুষ গুলোর করুণ আর্তনাদে স্তব্ধ হয়েছিল একটি সভ্য জাতির অগ্রযাত্রা।খিলজীর এই পাশবিক নিষ্ঠুর বর্বরতাও পরিচিতি পায় এক শ্রেণীর ধর্মান্ধদের চোখে ধর্মীয় বিজয় হিসাবে! আর আমাদের পাঠ্য পুস্তক গুলোতে এই নির্মম, নিষ্ঠুর বখতিয়ার খলজিকে নায়ক হিসেবে দেখান হয়। ভাবতেই অবাক লাগে কিভাবে ইতিহাস্কে বিকৃত করা হয়। চেষ্টা করা হয়্য নালন্দার ইট কাঠ পাথরের চাপা কান্না আর আহাকার যেন আমাদের কানে না পৌছাতে পারে।

কিছু কিছু স্থাপনা এখনো টিকে আছে, যেমন নিকটবর্তী সূর্য মন্দির যা একটি হিন্দু মন্দির। মোট ১৫,০০০ বর্গ মিটার এলাকায় খননকার্য চলানো হয়েছে, অবশ্য যদি জুয়ানঝাংয়েরহিসাব সঠিক হয় তাহলে মাত্র ১০% জায়গায় এখন পর্যন্ত খননকার্য চালানো হয়েছে।
নালন্দায় এখন কেউ বাস করে না, নিকটবর্তী জনবসতি বড়গাঁও নামক গ্রামে।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রায় সকল ধর্ম গ্রন্থের সংগ্রহ শালা। বিশেষ করে বেদ আর উপনিষদের উপর আলোচনা, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ গুলো অত্যন্ত সতর্কতা ও যত্নের সাথে সংরক্ষন করা হয়। এই পুস্তক গুলো ধ্বংসের ফলে পরবর্তীতে হিন্দু ধর্মে নানা কু প্রথা- আচার স্থান পায়। যার প্রভাব এখন রয়ে গেছে হিন্দু ধর্মে।

নালন্দায় ধর্মীয় বিজয় সফল হলেও লজ্জিত হয় মানবতা, পরাজিত হয় সভ্যতা, শৃঙ্খলিত হয় শিক্ষা।
এভাবে উগ্র ধর্মীয় উন্মাদনা, আক্রোশ, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে পৃথিবী থেকে বিলুপ্তি ঘটিয়েছিল ধর্মান্ধরা কয়েকশ বছর ধরে মানব সভ্যতাকে আলোর পথ দেখানো মানুষ গড়া্র এই কারখানাটিকে।


লেখকঃ শ্রী ইশাইমুন & Ramkrishna Bhattacharya

http://en.wikipedia.org/wiki/Nalanda
0 comments

ইতিহাসের পাতার বেশ কিছু হিন্দু বিরোধী চক্রান্ত



১. রামায়ণ, মহাভারত পৌরাণিক গল্প, অথচ ইলিয়া়ড, ওডিসিকে এমনভাবে প্রস্তুত করা যেন সত্য।

২. আর্য ও দ্রাবিড় দুই জাতির সৃষ্টি- কোন প্রমান ছাড়াই এবং যে সব প্রমান তৈরী করা হয়েছে তা পুরোপুরি কাল্পনিক, ভিত্তিহীন।

৩. হিন্দু সম্রাটদের বহু সময়ে সম্রাট আক্ষা দিতে কার্পণ্য অথচ অন্য ধর্মের একটি শহর দখল করে বসে থাকা চরিত্রকেও সম্রাট আক্ষা দিতে দ্বিধা করে না (যেমন বাহাদুর শাহ্ জাফর- “শেষ মোগল সম্রাট” ইত্যাদি।

৪. বৌদ্ধ ধর্মের শেষ হয়ে যাওয়াকে উল্লেখ করা যদিও আজও বৌদ্ধ ধর্ম জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বে চতুর্থ।

৫. ভারত আক্রমণের ফলে আলেকজান্ডারের হেরে ধ্বংস ও বিপর্যস্ত হয়ে ফিরে যাওয়াকে লুকিয়ে রেখে অন্য কিছু ভুল তথ্য দেখানো।

৬. কখনই চাণক্য ও সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর অখন্ড ভারতকে বেশি প্রাধান্য না দেওয়া, তার থেকে বেশি সম্রাট অশোকের অহিংস নীতিকে বেশি করে দেখানো- মৌর্য সাম্রাজ্যের ধ্বংসের সাথে অখন্ড ভারতের ধ্বংসকে কখনই ব্যাখ্যা করা হয় না, দেশাত্ববোধ থেকে সরিয়ে রাখার চক্রান্ত।

৭. তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় বিলুপ্ত, তার সঙ্গে বিলুপ্ত অতি উন্নত প্রাচীন হিন্দু শিক্ষা বিধি।

৮. বহু সময় একমাত্র সত্য প্রমাণকে গোপন করে অজথা মিথ্যা দ্বিতীয় প্রমাণকে সকলের সামনে এনে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা- যেমন সম্রাট বিক্রমাদিত্ব।

৯. হর্ষবর্ধনকে শেষ হিন্দু সম্রাট বলা- তারপর অনেক হিন্দু সম্রাট ভারতে রাজত্ব করেছেন।

১০. বাপ্পা রাওয়ালের ইতিহাস প্রায় ইতিহাস বই থেকে বিলুপ্ত- যার মৃত্যুর পরেও তার ভয়ে ২০০ বছর আরব, তুর্করা আক্রমণ করতে সাহস পায়নি।

১১. পাল বংশ, সেন বংশকে বাদ দিয়ে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখানো এবং তার ধ্বংস নিয়ে বেশি কথা বলা, অন্যদিকে তার বিশালত্বকে লুকিয়ে রাখা।

১২. সম্রাট পৃথ্বিরাজ চৌহানের সাথে মহঃ ঘোরির মোট ১৭ বার যুদ্ধকে লুকিয়ে ২ বার দেখানো এবং সম্রাট পৃথ্বিরাজ চৌহানের হারের কারণ হিসাবে তার বৈদিক সভ্য যুদ্ধ নীতিকে না তুলে ধরে তাকে দেখানো হয় তিনি তার দেশের প্রতি অবহেলা করে শুধু তাঁর স্ত্রীর প্রেমে লিপ্ত থাকার কারণে তিনি হেরেছিলেন।

১৩. ১৮১ বছরের মোগল শাসন বড় করে দেখানো, প্রায় ৩০০ বছরের বিজয়নগর সাম্রাজ্য প্রায় না থাকার মতো।

১৪. ১৪৪ বছরের মারাঠা সাম্রাজ্যকে প্রায় না জানতে দেওয়া। তেমনই ৫০ বছরের শিখ সাম্রাজ্য।

১৫. অহিংস আন্দোলনকে অহেতুক বেশি করে প্রচার করে স্বশস্ত্র আন্দোলনকে প্রায় কোন মূল্যই না দেওয়া।

হিন্দু শক্তি বৃদ্ধি হেতুই এই সব তথ্য। দয়া করে SHARE করুন।

https://www.facebook.com/HinduEkataShaktiShibir
0 comments

চিতোরের রানী পদ্মিনী



মেবারের রাজধানী চিতোরের রানা রাওয়াল রতন সিং -এর রানী পদ্মিনী অসম্ভব রূপবতী ছিলেন |তাঁর রূপের কথা শুনে দিল্লীর সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি ১৩০৩ সালের ২৮ জানুয়ারি রাজপুতদের সবচেয়ে শক্ত ঘাঁটি মেবারের উদ্দেশে সসৈন্যে রওনা করেন | কিন্তু মেবারে পৌঁছে তিনি হতাশ হলেন | মেবারের দুর্গটি অতীব সুরক্ষিত | তিনি রতন সিং কে খবর পাঠালেন যে তিনি তাঁর রানী পদ্মিনী কে একটিবার দেখতে চান | রতন সিং সুলতানের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই প্রস্তাবে রাজি হলেন |

রানী পদ্মিনী রাজি হলেন সুলতানকে দেখা দিতে আয়নায় প্রতিবিম্বের মাধ্যমে | সুলতান তাঁর কিছু ধূর্ত সৈনিকদের সঙ্গে দুর্গে এলেন এবং তাঁদের নির্দেশ দিলেন প্রাসাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা বিশদভাবে লক্ষ্য করতে | পদ্মিনীকে দেখে সুলতান ঠিক করলেন তাঁকে যেভাবেই হোক তাঁর চাই | তিনি রতন সিংকে কারারুদ্ধ করে পদ্মিনীকে রতন সিং - এর কাছে দাবি করলেন |

এ খবর রাজপুতদের কাছে পৌঁছার পর রাজপুত সেনাপতিরা কূটকৌশলে সুলতানকে পরাজিত করার ফন্দি আঁটেন | তাঁরা সুলতানকে জানালেন, পরদিন সকালে পদ্মিনীকে তার কাছে হস্তান্তর করা হবে | নির্দিষ্ট সকালে রাজপুতদের দেড়শ’ পাল্কি আলাউদ্দিনের তাঁবুর দিকে যাত্রা করল | পাল্কিগুলো তাঁবুর কাছে এমন জায়গায় থামল যেখানে পদ্মিনীর স্বামী রাজা রতন সিং বন্দি আছেন | আকস্মিকভাবে পাল্কি থেকে রানী পদ্মিনী ও তার পরিচারিকাদের পরিবর্তে নেমে এল সশস্ত্র সৈন্যবাহিনী | তারা রতন সিংকে মুক্ত করে নিয়ে যান আলাউদ্দিন কিছু বুঝে ওঠার আগে |

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ সুলতান চিতোর গড় তছনছ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন | তিনি চিতোর দুর্গ অবরোধ করে রইলেন | এ অবস্থায় রাজা রতন সিং দুর্গের ফটক খুলে দিয়ে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়ার জন্য রাজপুতদের নির্দেশ দিলেন | রাজার এই নির্দেশে রানী পদ্মিনী হতচকিত হয়ে পড়লেন | তিন বুঝতে পারলেন যে সুলতানের শক্তিশালী বাহিনীর সঙ্গে তাঁদের লড়াই করে জেতা সম্ভব নয় | এ অবস্থায় তাঁর সামনে দুটো পথ খোলা ছিল | হয় জহরপানে আত্মহত্যা, নয়তো রাজপুত রমণীসহ নিজেকে সুলতানের কাছে সমর্পণ করা | এদিকে প্রাসাদের বাইরে লড়াইয়ে রাজপুতদের পরাজয় ঘনিয়ে আসছিল | আলাউদ্দিন সদলবলে চিতোর দুর্গে ঢুকে পড়লেন |

নগর রক্ষার্থে রাজপুতগণ প্রাণপণে যুদ্ধ করে নিহত হলেন | দুর্গের অভ্যন্তরে রানী পদ্মিনীর সঙ্গে তেরো হাজার রাজপুত রমণী ‘জহরব্রতের’ অনুষ্ঠান করে প্রাণ বিসর্জন করলেন | তাঁরা জীবন্ত অগ্নিকুণ্ডে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করলেন |

আত্মহত্যা করা সৈন্য ও রানীদের ছাইভস্ম দেখে আলাউদ্দিন হতাশ হয়ে পড়েন | চিতোর গড় দখল করলেও রানীকে না পাওয়ার বেদনা তাকে প্রচণ্ড আহত করে |তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হন হিন্দু নারীদের কাছে সম্মান জীবনের চাইতেও বড় |

এই আত্মমর্যাদাপুর্ণ পরম সাহসী রানীকে এস আমরা সবাই প্রনাম জানাই |




ক্ষত্রিয়-নন্দন || অতএব রণভূমে চল ত্বরা যাই হে, চল ত্বরা যাই | দেশহিতে মরে যেই তুল্য তার নাই হে, তুল্য তার নাই || যদিও যবনে মারি চিতোর না পাই হে, চিতোর না পাই | স্বর্গসুখে সুখী হব, এস সব ভাই হে, এসো সব ভাই || *********************** ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’ কাব্য থেকে নেওয়া।

আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের ইতিহাস আমরা ঠিক ভাবে জানি না বা কেউ আমাদের শেখায় না। আমাদের শিখতে হয় হিন্দুরাজারা ছিল অত্যাচারী আর আরব তুর্কি থেকে আক্রমণকারী বহিরাগত দস্যুরা আমাদের উদ্ধারকর্তা। আমরা শিখি সোমনাথ মন্দির লুটকারী গজনি অধিপতি মাহমুদ নাকি প্রকৃত রাজা। তাজমহল প্রেমের প্রতিক। অথচ শাহজাহান মমতাজের স্বামীকে হত্যা করেছিলেন মমতাজকে বিয়ে করার জন্য। মমতাজ ছিলেন শাহজাহানের সাতবিবির চার নম্বর। তিনি ১৪তম প্রসবের সময় মারা যান এবং তারপর শাহজাহান তার বোনকে বিয়ে করেন।

পৃথ্বীরাজ চৌহানকে পরাজিত দেখানো হয়। কিন্তু ঘোরিকে ১১৯১ সালে তরাইনের প্রথম যুদ্ধে পরাজিত করার পর পর তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। অসুরদের ক্ষমা করার ফল তিনি পেয়েছিলেন যখন ১১৯২ সালে আবার ঘোরি অন্যায়যুদ্ধে তাঁকে পরাজিত এবং হত্যা করেন। কিন্তু পৃথ্বীরাজ চৌহান অন্যায়ের কাছে কখনও চোখ নামান নাই।


@bangali hindu post.
0 comments

কোনটি ধর্ম, আর কোনটি অধর্ম

এই পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই ধর্ম নিয়ে নানা সংশয়ে ভোগে। কোনটা ধর্ম, কোনটা অধর্ম; সেই ধর্ম কোথা থেকে এলো- এই সব নিয়ে আমাদের মধ্য কৌতূহলে শেষ নেই।

যদি আপনাকে প্রশ্ন করে হয় যে, আপনার কাছে ধর্মের প্রকৃত সংজ্ঞা কি? তবে আপনার উত্তর কি হবে, সেটা বিবেচনা করে দেখুন।

মূলত, আমাদের যা নেই; তাই আমরা ঈশ্বরের কাছে চাই। ভয়, বিপদ, বাধা কাটিয়ে ওঠার জন্য ঈশ্বরই আমাদের আশ্রয় হয়ে ওঠে। আর, এটাও ঠিক যে- অভীষ্ট লাভের জন্য দেবতার আশ্রয় নিতে গেলে তার জন্য কিছু ত্যাগ স্বীকার, কিছু ব্রত, নিয়ম, সংযম আর কিছু বস্তু উপহারের মাধ্যমে ঈশ্বরকে তুষ্ট করার চেষ্টাটা একটা প্রক্রিয়ার মধ্য পড়ে। আমাদের বৈদিক সনাতন ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে প্রধানত এই ভাবনা থেকেই। বেদে দেবতা অনেক, মানুষের চাওয়াও অনেক। তাকেই একটা সংযত রূপ দেবার জন্য যাগ-যজ্ঞ, নিয়ম- সংযমের প্রক্রিয়া। অথ্যাৎ, অস্তিত্বের বহু ঊর্ধ্বে উঠে স্রষ্টাকে একটু নেড়েচেড়ে দেখার প্রচেষ্টা। নিজের চাওয়া পাওয়ার জন্য সেই যে বিশাল নিয়ম-আচার বা কর্মের প্রথা তৈরি হয়েছিল- তা আজও শেষ হয়নি। কিন্তু, মানুষের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিমুহূর্তে সেই আচার অনুষ্ঠান পরিবর্তন হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে নতুন নতুন ধর্মের, নতুন নতুন মতের।

শুধুমাত্র ভারতবর্ষেই ধর্ম ব্যাপারটা ভীষণ রকমের পরিবর্তনশীল এবং বৈচিত্র্যর জায়গা। সত্যিকার অর্থে ধর্মের তত্ত্ব আমাদের মধ্যে অনেকেই জানে; কিন্তু ধর্মের মর্ম কতজন জানতে পেরেছে? আর সেইজন্যই আমাদের এই ভারতবর্ষে 'ধর্ম' এক শ্রেণীর মানুষকে বানিয়েছে 'অসহায়' এবং আরেক শ্রেণীর মানুষকে বানিয়েছে 'terrorist অথ্যাৎ জঙ্গি'।

প্রতিদিনই পত্রিকার পাতা উল্টালেই আমাদের চোখে পড়ে ধর্মের নামে গুজব ছড়িয়ে তথাকথিত “ধর্ম রক্ষাকারী”দের নিপীড়ন আর ধ্বংস যজ্ঞ। ধর্মের নামে মুহূর্তেই তারা পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে অন্যের উপাসনালয় ও সাজানো ঘর। বাংলা ভাষায় যাকে বলে “সংখ্যালঘু নির্যাতন”। এগুলো কি আদ্যও কোন ধর্মের নমুনা???

অথচ, আমাদের সনাতন ধর্ম শিক্ষা দিচ্ছে- “তোমার কাছে যে অন্যায়টা অন্য করলে তোমার খারাপ লাগে, কষ্ট লাগে, সেই অন্যায়টা তুমি অন্য কোন মানুষের ওপর করো না। যে মানুষ নিজে বেঁচে থাকতে চায়, সে যেন কখনোই অন্যের জীবন নষ্ট না করে।” আমাদের ধর্মের সংক্ষিপ্ত উপদেশ এটাই- “তোমার নিজের যেটা ভালো লাগছে না, সেটা তুমি অন্যের উপর প্রয়োগ করো না।”

তাহলে, আজ আমাদের চারিদিকে কোনটি ধর্ম, আর কোনটি অধর্ম- আপনারাই তার সঠিক মূল্যায়ন করে দেখুন......

# শ্রী জয় রায়
0 comments

রানি লক্ষ্মীবাঈ

অন্যায়-অবিচার আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক হিন্দু নারীর অসাধারণ প্রতীক হয়ে আছেন ঐতিহাসিক নারী চরিত্র ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ।

লক্ষ্মীবাঈয়ের ছোটবেলার নাম ছিল মানু।ভারতের উত্তর প্রদেশে বারানসির এক ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে মানু ছোটবেলা থেকেই কিছুটা প্রতিবাদী, যুদ্ধংদেহি মনোভাবের। স্বামীর মৃত্যুর পর কম বয়সেই তাকে ঝাঁসির রাজত্বভার গ্রহণ করতে হয়।

শাসনকাজ পরিচালনা করতে গিয়ে লক্ষ্মীবাঈ উপলব্ধি করেন এ দেশে ব্রিটিশদের অন্যায়মূলক ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের কঠিন চাপ। প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন তিনি। একজন অতি সাধারণ মেয়ে মানু থেকে হয়ে ওঠেন রানি লক্ষ্মীবাঈ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান তিনি, লড়াই ঘোষণা করেন, নিজের হাতে অস্ত্র তুলে নেন। অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করেন তাঁর মতো লড়াইয়ে অংশ নিতে......
রাণী লক্ষ্মী বাঈ ভারতীয় তথা হিন্দু মেয়েদের সাহসীকার প্রতীক। সুভাষ চন্দ্র বসু'র নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম নারী দলের নামকরণ করেন রাণী লক্ষ্মী বাঈকে স্মরণ করেই।

একটি তথ্য আমাদের অনেকেরই অজানা যে, “২১ জুলাই, ২০১১ তারিখে লক্ষ্মী বাঈকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ জন ডানপিটে রমণীদের একজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা তাদের স্বামীদের কাছ থেকে সক্রিয় সহযোগিতা পেয়েছিলেন। টাইম ম্যাগাজিনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়; যে তালিকায় ঝাঁসীর রাণীর অবস্থান ছিল ৮ম (http://content.time.com/.../0,28804,2084354_2084355...)


#Joy Ray

1 comments

ঈশ্বর ও দেবতাঃ



প্রথমেই বলে রাখা দরকার সনাতন দর্শনে বহু ঈশ্বরবাদের স্থান নাই বরং আমরা একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী।হিন্দু শাস্ত্র মতে , ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়।সনাতন দর্শন বলে, ঈশ্বর স্বয়ম্ভূ অর্থাৎ ঈশ্বর নিজে থেকে উৎপন্ন, তার কোন স্রষ্টা নাই, তিনি নিজেই নিজের স্রষ্টা।আমাদের প্রাচীন ঋষিগন বলে গিয়েছেন, ঈশ্বরের কোন নির্দিষ্ট রূপ নেই(নিরাকার ব্রহ্ম) তাই তিনি অরূপ, তবে তিনি যে কোন রূপ ধারন করতে পারেন কারণ তিনিই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।ঋকবেদে বলা আছে, ঈশ্বর ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’- ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়।ঈশ্বর বা ব্রহ্ম (ব্রহ্মা নন) সম্পর্কে আরও বলা হয়, ‘অবাংমনসগোচর’ অর্থাৎ ঈশ্বরকে কথা(বাক), মন বা চোখ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, তিনি বাহ্য জগতের অতীত।ঈশ্বর সম্পর্কে ঋকবেদে বলা আছে-‘একং সদ বিপ্রা বহুধা বদন্তি (ঋক-১/৬৪/৪৬) অর্থাৎ সেই এক ঈশ্বরকে পণ্ডিতগণ বহু নামে বলে থাকেন।‘একং সন্তং বহুধন কল্পায়ন্তি’ (ঋক-১/১১৪/৫) অর্থাৎ সেই এক ঈশ্বরকে বহুরূপে কল্পনা করা হয়েছে।‘দেবানাং পূর্বে যুগে হসতঃ সদাজায়ত’ (ঋক-১০/৭২/৭) অর্থাৎ দেবতারও পূর্বে সেই অব্যাক্ত(ঈশ্বর) হতে
ব্যক্ত জগত উৎপন্ন হয়েছে।

ঈশ্বর এক কিন্তু দেবদেবী অনেক। মনে রাখতে হবে দেব দেবীগণ ঈশ্বর নন। ঈশ্বরকে বলা হয় নির্গুণ অর্থাৎ জগতের সব গুনের আধার তিনি। আবার ঈশ্বর সগুনও কারণ সর্ব শক্তিমান ঈশ্বর চাইলেই যে কোন গুনের অধিকারী হতে পারেন এবং সেই গুনের প্রকাশ তিনি ঘটাতে পারেন। দেব দেবীগন ঈশ্বরের এই সগুনের প্রকাশ।অর্থাৎ ঈশ্বরের এক একটি গুনের সাকার প্রকাশই দেবতা। ঈশ্বর নিরাকার কিন্তু তিনি যে কোন রূপে সাকার হতে পারেন আমাদের সামনে কারণ তিনি সর্ব ক্ষমতার অধিকারী। যদি আমরা বিশ্বাস করি ঈশ্বর সর্বশক্তিমান তাহলে নিরাকার ঈশ্বরের সাকার গুনের প্রকাশ খুবই স্বাভাবিক।তাই ঈশ্বরের শক্তির সগুন রূপ দুর্গা, কালী, পার্বতী;বিদ্যার সগুন রূপ সরস্বতী; ঐশ্বর্যের সগুন রূপ লক্ষ্মী, মৃত্যুর রূপ যম। তেমনি ঈশ্বর যখন সৃষ্টি করেন তখন ব্রহ্মা ( ব্রহ্ম নয়), যখন পালন করেন তখন বিষ্ণু আর প্রলয়রূপে শিব।এজন্য বলা হয়ে থাকে ঈশ্বরই ব্রহ্মা,তিনিই বিষ্ণু, তিনিই শিব। তাহলে আমারা এখন বুঝতে পারছি দেব দেবী অনেক হতে পারে কিন্তু ঈশ্বর এক এবং দেবতাগণ এই পরম ব্রহ্মেরই বিভিন্ন রূপ।তাই আমরা বহু দেবোপাসক(বস্তুত দেবোপাসনা ঈশ্বর উপাসনাই) হতে পারি তবে বহু ঈশ্বরবাদী নই।

লিখেছেনঃ মুক্তা_দে
তথ্যসূত্রঃ Shree Krishna - The Supreme Personality of Godhead ∫fαcєвook vєяsίon∫••
0 comments

মহাভারতের মহানায়ক কে এবং কেন তিনি মহানায়ক?



মহাভারতের আমার দৃষ্টিতে ৬ জন আছেন যাঁদের কাজ, জ্ঞান, গুন ও শক্তি অন্যদের থেকে অনেক অনেক বেশি। এই ছয় জন হলেন পিতামহ ভীষ্ম, শ্রী কৃষ্ণ, অর্জুন, কর্ণ, যুধিষ্ঠির, অভিমন্যু। পিতামহ ভীষ্ম ও শ্রী কৃষ্ণ বাদে বাকিরা নিজে গুন নিয়ে বীর হতে পারেনি বা তাঁদের পদক্ষেপ গুলি নির্ভুল বা ধর্ম প্রতিষ্ঠায় সর্বাধিক উপযোগী ছিলো না। নিচে একটি বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করছি।

অর্জুনঃ
নিসন্দেহে বড় বীর এবং ঐ যুগের সর্ব শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ। যুদ্ধ বিদ্যায় সর্বাধিক পারদর্শী নির্ভীক এক জন বীর। বীরত্বের সব পরীক্ষায় সব সময় প্রথম। কিন্তু কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ পরিচালনায় বা ধর্ম প্রতিষ্ঠায় একক ভাবে জয়লাভ করার মত সর্ব গুণী ছিলেন না। তিনি সর্ব গুণীর সহায়কদের মধ্যে সর্ব শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তাই তাঁকে সর্ব শ্রেষ্ঠ বলার উপায় নেয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিজ্ঞা করেছেন কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা পালন করতে গিয়ে ধর্ম প্রতিষ্ঠা বিলম্বিত হয়েছে এবং অপ্রয়োজনে অন্য বীরকে প্রাণ দান করতে হয়েছে।

কর্ণঃ
মাতৃ স্নেহ বঞ্চিত হয়ে সূর্য পুত্র কুরু বংশে বেড়ে উঠেন কিন্তু জন্ম সুত্রে পাণ্ডব ছিলেন। সূর্য দেবার কৃপায় মৃত্যুঞ্জয় কবজ লাভ করেন। দান ধর্মে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। অর্জুনের কাছাকাছি কোন বীরের নাম উচ্চারণ করতে হলে কর্ণের নামই উচ্চারণ করতে হয়। কিন্তু ধর্ম যুদ্ধে তিনি বিভিন্ন কারনে কুরু বংশের হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তাই ধর্ম প্রতিষ্ঠায় তিনি বিপরীত শ্রোতের পক্ষে ছিলেন (যদিও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কুরু বংশের পক্ষ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন বলতে হবে) -- দান ধর্ম মেনে চলতে গিয়ে নিজের রক্ষা কবজ (মৃত্যুঞ্জয় কবজ) পর্যন্ত দান করে দিতে দ্বিধা করেননি তিনি। এই কারণে তাঁকে দাতা কর্ণ নামে ডাকা হয়। চক্রব্যূহ রচনা করে বালক অভিমন্যু কে অন্নায় যুদ্ধে হত্যায় ভূমিকা রেখে যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছিলেন তিনি।

যুধিষ্ঠিরঃ
পাণ্ডবদের জৈষ্ট ভ্রাতা ধর্ম পুত্র যুধিষ্ঠির। সত্যবাদী, ন্যায় পরায়ণ, জ্ঞানী এমন গুনে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। ধর্ম প্রতিষ্ঠায় সত্য নিষ্ঠ এক বিরল চরিত্র। ধর্ম জ্ঞানে তিনি অতুলনীয় ছিলেন। প্রয়োজনে যুদ্ধ বিদ্যায় ও নিপুন ছিলেন। কিন্তু ধর্ম যুদ্ধ একক ভাবে পরিচালনায় যে গুন প্রয়োজন সেই গুন তার মধ্যে সর্বাধিক ছিলোনা।

অভিমন্যুঃ
অর্জুন পুত্র। বালক বয়সেই তিনি ছিলেন মহা বীর। চক্রব্যূহ ভেঙ্গে যুদ্ধ করতে পারেন এমন সামর্থ্য ছিলো শুধু মাত্র ২ জনের। এক জন অর্জুন অন্য জন অভিমন্যু। অর্জুন চক্রব্যূহ ভেদ করে বের হতে পারতেন কিন্তু অভিমন্যু বের হবার উপায় জান্তেন না। ধর্ম যুদ্ধে যখন অর্জুন অন্য কুরু মহারথীদের এক এক করে বিনাশ করছিলেন তখন কুরুরা চক্রব্যূহ আহ্বান করেন। সেই চক্রব্যূহ ভেদ করার আর কেউ ছিলনা বলে নির্ভীক বালক বীর অভিমন্যু নিজে প্রবেশ করেন চক্রব্যূহে। প্রবল পরাক্রম শালী এই বীর চক্রব্যূহের সাত মহারথী কে এক এক করে সাতবার পরজিত করেন। পরাজিত কুরুরা শকুনি মামার কুপরামর্শে দুর্যোধনের নেতৃত্বে অন্যায় ভাবে সাত জনে মিলে এক সাথে আক্রমণ করলে বীর অভিমন্যু ঐ সাত মহারথীকে ও একক ভাবে পরাজিত করেন। কিন্তু দুষ্ট দুর্যোধন ও কুচক্রী শকুনি পেছন থেকে আক্রমণ করে বীর বালককে হত্যা করে। তিনি যে বীরত্বের সাক্ষর রাখেন তা শুধু মাত্র কুরুক্ষেত্র কেন সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর যুগের সব বীরদের বীরত্বকে ও মলীন করে দেয়। তিনি বীর কিন্তু ধর্ম প্রতিষ্ঠায় যে সব গুণাবলী থাকা প্রয়োজন সেই গুণাবলীর সর্বাধিক ধারক নন।

বাকি থাকছে পিতামহ ভীষ্ম ও শ্রী কৃষ্ণ। এই দুই নায়কের বিশ্লেষণ পড়ের পোষ্ট এ করছি। যেহেতু এই পোষ্ট বেশি দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে।


ঈশ্বর সকলের মঙ্গল করুন
গর্বের সাথে বলুন আমরা বৈদিক, আমরা সনাতন, আমরা হিন্দু।

# লিঙ্কন #
----------------------------
লেখাটি পড়ে আপনার মন্তব্য জানান
0 comments

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কবে হইয়াছিল ?



প্রথমে দেশী মতেরই সমালোচনা আবশ্যক। ৪,৯৯২ বৎসর পূর্বে যে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হইয়াছিল, এ কথাটা সত্য নহে, ইহা আমি দেশী গ্রন্থ অবলম্বন করিয়াই প্রমাণ করিব। রাজতরঙ্গিণীকার বলেন, কলির ৬৫৩ বৎসর গতে গোর্নদ্দ কাশ্মীরে রাজা হইয়াছিলেন। আরও বলেন, গোর্নদ্দ যুধিষ্ঠিরের সমকালবর্তী রাজা। তিনি ৩৫ বৎসর রাজত্ব করেন। অতএব প্রায় সাত শত বৎসর আরও বাদ দিতে হয়। তাহা হইলে ২৪০০ খ্রীষ্ট-পূর্বাব্দ পাওয়া যায়।
কিন্তু বিষ্ণুপুরাণে আছে—
সপ্তর্ষীণাঞ্চ যৌ পূর্বৌ দৃশ্যেতে উদিতৌ দিবি।
তয়োস্তু মধ্যনক্ষত্রং দৃশ্যতে যৎ সমৎ নিশি ||
তেন সপ্তর্ষয়ো যুক্তাস্তিষ্ঠন্ত্যব্দশতং নৃণাম।
তে তু পারিক্ষিত কালে মঘাস্বাসন্ দ্বিজোত্তম ||
তদা প্রবৃত্তশ্চ কলির্দ্বাদশাব্দশতাত্মকঃ।
—৪ অংশঃ, ২৪ অ, ৩৩-৩৪
অর্থ। সপ্তর্ষিমণ্ডলের মধ্যে যে দুইটি তারা আকাশে পূর্বদিকে উদিত দেখা যায়, ইঁহাদের সমসূত্রে যে মঘানক্ষত্র দেখা যায়, সেই নক্ষত্রে সপ্তর্ষি শত বৎসর অবস্থান করেন।[1] সপ্তর্ষি পরীক্ষিতের সময়ে মঘা নক্ষত্রে ছিলেন, তখন কলির দ্বাদশ শত বৎসর প্রবৃত্ত হইয়াছিল।
অতএব এই কথা মতে কলির দ্বাদশ শত বর্ষের পর পরীক্ষিতের সময়; তাহা হইলে উপরি উদ্ধৃত ৩৪ শ্লোক অনুসারে ১৯০০ খ্রীষ্ট-পূর্বাব্দে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হইয়াছিল।
কিন্তু ৩৩ শ্লোকে যাহা পাওয়া যায়, তাহার সঙ্গে এ গণনা মিলে না। ঐ ৩৩ শ্লোকের তাৎপর্য অতি দুর্গম—সবিস্তারে বুঝাইতে হইল। সপ্তর্ষিমণ্ডল কতকগুলি স্থিরনক্ষত্র, উহার বিলাতী নাম Great Bear বা Ursa Major. মঘা নক্ষত্রও কতকগুলি স্থিরতারা। সকলেই জানেন, স্থিরতারার গতি নাই। তবে বিষুবের একটু সামান্য গতি আছে—ইংরেজ জ্যোতির্বিদেরা তাহাকে বলেন “Precession of the Equinoxes.” এই গতি হিন্দুমতে প্রতি বৎসর ৫৪ বিকলা। এক এক নক্ষত্রে ১৩১/৩ অংশ। এ হিসাবে কোন স্থিরতারার এক নক্ষত্র—পরিভ্রমণ করিতে সহস্র বৎসর লাগে—শত বৎসর নয়। তাহা ছাড়া, সপ্তর্ষিমণ্ডল কখনও মঘা নক্ষত্রে থাকিতে পারে না। কারণ মঘা নক্ষত্র সিংহরাশিতে। দ্বাদশ রাশি রাশিচক্রের ভিতর। সপ্তর্ষিমণ্ডল রাশিচক্রের বাহিরে। যেমন ইংলণ্ড ভারতবর্ষে কখনও থাকিতে পারে না, তেমনি সপ্তর্ষিমণ্ডল মঘা নক্ষত্রে থাকিতে পারে না।
পাঠক জিজ্ঞাসা করিতে পারেন, তবে পুরাণকার ঋষি কি গাঁজা খাইয়া এই সকল কথা লিখিয়াছিলেন? এমন কথা আমরা বলিতেছি না, আমরা কেবল ইহাই বলিতেছি যে, এই প্রাচীন উক্তির তাৎপর্য আমাদের বোধগম্য নহে। কি ভাবিয়া পুরাণকার লিখিয়াছিলেন তাহা আমরা বুঝিতে পারি না। পাশ্চাত্য পণ্ডিত বেণ্ট্‌লি সাহেব তাহা এইরূপ বুঝিয়াছেনঃ—
“The notion originated in a contrivance of the astronomers to show the quantity of the precession of the equinoxes: This was by assuming an imaginary line, or great circle, passing through the poles of the ecliptic and the beginning of the fixed Magha, which circle was supposed to cut some of the stars in Great Bear.*** The seven stars in the Great Bear being called the Rishis, the circle so assumed was called the line of the Rishis; and being invariably fixed to the beginning of lunar asterism Magha, the precession would be noted by stating the degree &c. of any moveable lunar mansion cut by that fixed line or circle as an index.”
Historical View of the Hindu Astronomy, p. 65.
এইরূপ গণনা করিয়া বেণ্ট্‌লি যুধিষ্ঠিরকে ৫৭৫ খ্রীষ্ট-পূর্বাব্দে আনিয়া ফেলিয়াছেন। অর্থাৎ তাঁহার মতে যুধিষ্ঠির শাক্যসিংহের অল্প পূর্ববর্তী। আমেরিকার পণ্ডিত Whitney সাহেব বলেন, হিন্দুদিগের জ্যোতিষিক গণনা এত অশুদ্ধ যে, তাহা হইতে কোন কালাবধারণ-চেষ্টা বৃথা। কিন্তু যে কোন প্রকারে হউক, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কালাবধারণ হইতে পারে, দেখাইতেছি।
প্রথমতঃ পুরাণকার ঋষির অভিপ্রায় অনুসারেই গণনা করা যাউক। তিনি বলেন যে, যুধিষ্ঠিরের সময়ে সপ্তর্ষি মঘায় ছিলেন, নন্দ মহাপদ্মের সময় পূর্বাষাঢ়ায়।
প্রযাস্যন্তি যদা চৈতে পূর্বাষাঢ়াং মহর্ষয়ঃ।
তদা নন্দাৎ প্রভৃত্যেষ কলির্বৃদ্ধিং গমিষ্যতি || ৪।২৪। ৩৯
তার পরে, শ্রীমদ্ভাগবতেও ঐ কথা আছে—
যদা মঘাভ্যো যাস্যন্তি পূর্বাষাঢ়াং মহর্ষয়ঃ।
তদা নন্দাৎ প্রভৃত্যেষ কলির্বৃদ্ধিং গমিষ্যতি || ১২।২। ৩২
মঘা হইতে পূর্বাষাঢ়া দশম নক্ষত্র; যথা—মঘা, পূর্বফল্গুনী, উত্তরফল্গুনী, হস্তা, চিত্রা, স্বাতী, বিশাখা, অনুরাধা, জ্যেষ্ঠা, মূলা, পূর্বাষাঢ়া। অতএব যুধিষ্ঠির হইতে নন্দ ১০ x ১০০ = সহস্র বৎসর অন্তর।
এখন, আর এক প্রকার গণনা যাহা সকলেই বুঝিতে পারে, তাহা দেখা যাউক। বিষ্ণু পুরাণের যে শ্লোক উদ্ধৃত করিয়াছি, তাহার পূর্বশ্লোক এইঃ—
যাবৎ পরিক্ষিতো জন্ম যাবন্নন্দাভিষেচনম্।
এতদ্‌বর্ষসহস্রন্তু জ্ঞেয়ং পঞ্চদশোত্তরম্ || ৪।২৪। ৩২
নন্দের পুরা নাম নন্দ মহাপদ্ম। বিষ্ণুপুরাণে ঐ ৪ অংশের ২৪ অধ্যায়েই আছে—
“মহাপদ্মঃ তৎপুত্রাশ্চ একবর্ষশতমবনীপতয়ো ভবিষ্যন্তি। নবৈব তান্ নন্দান্ কোটিল্যো ব্রাহ্মণঃ সমুদ্ধরিষ্যতি। তেষামভাবে মৌর্যাশ্চ পৃথিবীং ভোক্ষ্যন্তি। কৌটিল্য এব চন্দ্রগুপ্তং রাজ্যেহভিষেক্ষ্যতি।”
ইহার অর্থ—মহাপদ্ম এবং তাঁহার পুত্রগণ একশতবর্ষ পৃথিবীপতি হইবেন। কৌটিল্য[2] নামে ব্রাহ্মণ নন্দবংশীয়গণকে উন্মূলিত করিবেন। তাঁহাদের অভাবে মৌর্যগণ পৃথিবী ভোগ করিবেন। কৌটিল্য চন্দ্রগুপ্তকে রাজ্যাভিষিক্ত করিবেন।
তবেই যুধিষ্ঠির হইতে চন্দ্রগুপ্ত ১১১৫ বৎসর। চন্দ্রগুপ্ত অতি বিখ্যাত সম্রাট্—ইনিই মাকিদনীয় যবন আলেক্‌জন্দর ও সিলিউকস্ নৈকটরের সমসাময়িক। ইনি বাহুবলে মাকিদনীয় যবনদিগকে ভারতবর্ষ হইতে দূরীকৃত করিয়াছিলেন, এবং প্রবলপ্রতাপ সিলিউকস্‌কে পরাভূত করিয়া তাঁহার কন্যা বিবাহ করিয়াছিলেন। তাঁহার মত দোর্দণ্ডপ্রতাপ তখন কেহই পৃথিবীতে ছিলেন না। কথিত আছে তিনি অকুতোভয়ে আলেক্‌জন্দরের শিবিরমধ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন। আলেক্‌জন্দর ৩২৫ খ্রীঃ পূর্বাব্দে ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন।
চন্দ্রগুপ্ত ৩১৫ খ্রীঃ পূর্বাব্দে রাজ্যপ্রাপ্ত হয়েন। অতএব ঐ ৩‍১৫ অঙ্কের সহিত উপরিলিখিত ১১১৫ যোগ করিলেই যুধিষ্ঠিরের সময় পাওয়া যাইবে। ৩‍১৫ + ১১১৫ = ১৪৩০ খ্রীঃ পূঃ তবে মহাভারতের যুদ্ধের সময়।
অন্যান্য পুরাণেও ঐরূপ কথা আছে। তবে মৎস্য ও বায়ু পুরাণে ১১১৫ স্থানে ১১৫০ লিখিত আছে। তাহা হইলে ১৪৬৫ পাওয়া যায়।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যে ইহার বড় বেশি পূর্বে হয় নাই, বরং কিছু পরেই হইয়াছিল, তাহার এক অখণ্ডনীয় প্রমাণ পাওয়া যায়। সকল প্রমাণ খণ্ডন করা যায়—গণিত জ্যোতিষের প্রমাণ খণ্ডন করা যায় না— “চন্দার্কৌ যত্র সাক্ষিণৌ।”
সকলেই জানে যে, বৎসরের দুইটি দিনে দিবারাত্র সমান হয়। সেই দুইটি দিন একের ছয় মাস পরে আর একটি উপস্থিত হয়। উহাকে বিষুব বলে। আকাশের যে যে স্থানে ঐ দুই দিনে সূর্য থাকেন, সেইস্থান দুইটিকে ক্রান্তিপাতবিন্দু (Equinoctial point) বলে। উহার প্রত্যেকটির ঠিক ৯০ অংশ (90 degrees) পরে অয়ন পরিবর্তন হয় (Solstice) । ঐ ৯০ অংশে উপস্থিত হইলে সূর্য দক্ষিণায়ন হইতে উত্তরায়ণে বা উত্তরায়ণ হইতে দক্ষিণায়নে যান।
মহাভারতে আছে, ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যু। তিনি শরশয্যাশায়ী হইলে বলিয়াছিলেন যে, আমি দক্ষিণায়নে মরিব না, (তাহা হইলে সদ্গতির হানি হয়); অতএব শরশয্যায় শুইয়া উত্তরায়ণের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। মাঘ মাসে উত্তরায়ণ হইলে তিনি প্রাণত্যাগ করিলেন। প্রাণত্যাগের পূর্বে ভীষ্ম বলিতেছেন,—
“মাঘোহয়ং সমনুপ্রাপ্তো মাসঃ সৌম্যো যুধিষ্ঠির।”
তবে, তখন মাঘ মাসেই উত্তরায়ণ হইয়াছিল। অনেকে মনে করেন, এখনও মাঘ মাসেই উত্তরায়ণ হয়, কেন না, ১লা মাঘকে উত্তরায়ণ দিন এবং তৎপূর্বদিনকে মকর-সংক্রান্তি বলে। কিন্তু তাহা আর হয় না। যখন অশ্বিনী নক্ষত্রের প্রথম অংশে ক্রান্তিপাত হইয়াছিল, তখন অশ্বিনী প্রথম নক্ষত্র বলিয়া গণিত হইয়াছিল; তখন আশ্বিন মাসে বৎসর আরম্ভ করা হইত, এবং তখনই ১লা মাঘে উত্তরায়ণ হইত। এখনও গণনা সেইরূপ চলিয়া আসিতেছে, এখন ফসলী সন ১লা আশ্বিনে আরম্ভ হয়, কিন্তু এখন আর অশ্বিনী নক্ষত্রে ক্রান্তিপাত হয় না; এবং ১লা মাঘে পূর্বের মত উত্তরায়ণ হয় না। এখন ৭ই পৌষ বা ৮ই পৌষ (২১শে ডিসেম্বর) উত্তরায়ণ হয়। এখনও গণনা সেইরূপ চলিয়া আসিতেছে, এখন ফসলী সন ১লা মাঘে পূর্বের মত উত্তরায়ণ হয় না। এখন ৭ই পৌষ বা ৮ই পৌষ (২১শে ডিসেম্বর) উত্তরায়ণ হয়। ইহার কারণ এই যে, ক্রান্তিপাত—বিন্দুর একটা গতি আছে, ঐ গতিতে ক্রান্তিপাত, সুতরাং আয়নপরিবর্তনস্থানও, বৎসর বৎসর পিছাইয়া যায়। ইহাই পূর্বকথিত Precession of the Equinoxes—হিন্দুনাম “অয়নচলন”। কত পিছাইয়া যায়, তাহারও পরিমাণ স্থির আছে। হিন্দুরা বলেন, বৎসরে ৫৪ বিকলা, ইহাও পূর্বে কথিত হইয়াছে। কিন্তু ইহাতে সামান্য ভুল আছে। ১৭২ খ্রীঃ-পূর্বাব্দে হিপার্কস্‌নামা গ্রীক জ্যোতির্বিদ্ ক্রান্তিপাত হইতে ১৭৪ অংশে চিত্রা নক্ষত্রকে দেখিয়াছিলেন। মাক্সেলাইন্ ১৮০২ খ্রীঃ অব্দে চিত্রাকে ২০১ অংশে ৪ কলা ৪ বিকলায় দেখিয়াছিলেন। ইহা হইতে হিসাব করিয়া পাওয়া যায়, ক্রান্তিপাতের বার্ষিক গতি সাড়ে পঞ্চাশ বিকলা। বিখ্যাত ফরাশী জ্যোতির্বিদ্ Leverrier ঐ গতি অন্য কারণ হইতে ৫০.২৪ বিকলা স্থির করিয়াছেন, এবং সর্বশেষে Stockwell গণিয়া ৫০.৪৩৮ বিকলা পাইয়াছেন। এই গণনা প্রথম গণনার সঙ্গে মিলে। অতএব ইহাই গ্রহণ করা যাউক।
ভীষ্মের মৃত্যুকালেও মাঘ মাসে উত্তরায়ণ হইয়াছিল, কিন্তু সৌর মাঘের[3] কোন্ দিনে, তাহা লিখিত নাই। পৌষ মাঘে সচরাচর ২৮ কি ২৯ দিন দেখা যায়। এই দুই মাসে ৫৭ দিনের বেশী প্রায় দেখা যায় না। কিন্তু এমন হইতে পারে না যে, তখন মাঘ মাসের শেষ দিনেই উত্তরায়ণ হইয়াছিল। কেন না, তাহা হইলে “মাঘেহয়ং সমনুপ্রাপ্তঃ” কথাটি বলা হইত না। ২৮শে মাঘে উত্তরায়ণ ধরিলেও এখন হইতে ৪৮ দিন তফাৎ। ৪৮ দিনে রবির গতি মোটামুটি ৪৮ অংশ ধরা যাইতে পারে; কিন্তু ইহা ঠিক বলা যায় না, কেন না, রবির শীঘ্রগতি ও মন্দগতি আছে। ৭ই পৌষ হইতে ২৯শে মাঘ পর্যন্ত রবিস্ফুট বাঙ্গালা পঞ্জিকা ধরিয়া গণিলে ৪৪ অংশ ৪ কলা মাত্র গতি পাওয়া যায়। ঐ ৪৪ অংশ ৪ কলা হইলে খ্রীঃ পূঃ ১২৬৩ বৎসর পাওয়া যায়। ৪৮ অংশ পূরা লইলে খ্রীঃ পূঃ ১৫৩০ বৎসর পাওয়া যায়। ইহা কোন মতেই হইতে পারে না যে, ইহার পূর্বে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হইয়াছিল। বিষ্ণুপুরাণ হইতে যে খ্রীঃ পূঃ ১৪৩০ পাওয়া গিয়াছে, তাহাই ঠিক বোধ হয়। ভরসা করি, এই সকল প্রমাণের পর আর কেহই বলিবেন না যে, মহাভারতের যুদ্ধ দ্বাপরের শেষে, পাঁচ হাজার বৎসর পূর্বে হইয়াছিল। তাহা যদি হইত, তবে সৌর চৈত্রে উত্তরায়ণ হইত। চান্দ্র মাঘও কখনও সৌর চৈত্রে হইতে পারে না।

————————
1 নক্ষত্র এখানে অশ্বিন্যাদি।
2 বিখ্যাত চাণক্য।
3 সে কালেও সৌর মাসের নামই প্রচলিত ছিল, ইহা আমি প্রমাণ করিতে পারি। ছয় ঋতুর কথা মহাভারতেই আছে। বার মাস নহিলে ছয় ঋতু হয় না।

লিখেছেন: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কৃষ্ণচরিত
0 comments
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger