সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

শুধু মাত্র স্বাকার বা নিরাকার বা উভয় ধারনাতেই ধর্ম ও ঈশ্বর প্রাপ্তি হয়



জ্ঞানীর জন্যে নিরাকার সাধনা কারণ জ্ঞান সব সময় মহা শক্তি কে অনুভব করার শক্তি ধারণ করে। আবার ভক্তের জন্যে সাকার সাধনা (মূর্তি বা অবয়ব) যেমন রামকৃষ্ণ ঠাকুর। এখানে ভক্ত অবয়বে মহা শক্তি কে অনুভব করেন এবং মাটির মূর্তিতে জীবন খুঁজে পান। এটা হলো তাঁর বিশ্বাসের দ্বারা প্রাপ্ত ক্ষমতা ও আধ্যাত্মিকতা।
মজার ব্যাপার হলো ভক্ত নিজেই জ্ঞানী। কারণ জ্ঞান ছাড়া ভক্ত ভক্তি অর্জন করতে পারে না। আবার জ্ঞানী নিজেই একজন পরম ভক্ত কারণ জ্ঞানীর জ্ঞান অর্জন ভক্তি বিনে হয় না। এ অবস্থায় জ্ঞান ও ভক্তি একে অন্যের পরিপূরক। জ্ঞান ছাড়া ভক্তি হয় না আবার ভক্তি বিনে জ্ঞান হয় না।
তায় আকার, মূর্তি, নিরাকার, দেবদেবী, অবয়ব, কল্পনা, বিজ্ঞান, প্রমান, বিশ্বাস, যুক্তি, ভিত্তি, মনন, সাত্তিকতা, প্রয়োগ, প্রকাশ, যাগ যজ্ঞ, পূজা পার্বণ সব কিছুই সত্যি। জ্ঞান ও ভক্তির সনিবেশই হলো ধারণ বা ধর্ম।
তবে কেন মত ভেদ? তবে কেন ভুল বলা? তবে কেন তর্ক? আপনি আপনার মতে চলতে থাকুন মনে ঈশ্বরকে ধারণ করুন, ভক্তি ভরে নিজ কাজ করুন আপনাকে মন্দিরেই উপাশনা করতে হবে বা আহার করেই করতে হবে উপাসনা বা উপবাসে করতে হবে এমন কোন কথা নেয়। আপনার উপাসনা ঈশ্বরের দিকেই যাবে যদি আপনি মনে সাত্ত্বিক হয়ে থাকেন।
ঈশ্বর সকলের মঙ্গল করুন
গর্বের সাথে বলুন আমরা বৈদিক।

=Lincon Chakraborty=
1 comments

আপনাদের কাছে এই প্রশ্ন যে তাহলে আমরা কেন ভেদাভেদ করছি?

আমরা সবাই নিজেরা যাকে ইস্ট মানি তাকে ছাড়া অন্য দেব দেবীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় কথার প্রেক্ষিতে এবং নিজের ইষ্টকে উপরে রাখতে গিয়ে ছোট করে ফেলি। আমি মানছি আমরা যাকে ইস্ট মানছি সেই আমাদের কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ, কিন্তু তাই বলে অন্যান্য দেবদেবীকে শ্রদ্ধা করা যাবেনা , এমন টা তো কোন ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ নেই। তাহলে আমরা কার পথ প্রদর্শন করে এমন ভাবে নিজেকে আর নিজের ইস্ট কে ছোট করে তুলছি? যেখানে ঈশ্বর নিজেই ভেদাভেদ করেননি, অথচ আমরা নিজেরা বলছি তার পথ অনুসরণ করছি, আবার ভেদাভেদ ও করছি। এই নিয়ে ভাগবতে উল্লেখিত একটা কাহিনীর সংক্ষেপ আপনাদের সামনে তুলে ধরছি...।
মহাযোগী বিদ্যাধর রাজা চিত্রকেতু কোন এক সভায় প্রসঙ্গ ক্রমে শিবকে উপলক্ষ্য করে কটূক্তি করেছিলেন, তা সহ্য না করতে পেরে সতী দেবী তাকে অভিশাপ দেয়। পরে চিত্রকেতুর ভগবদ্ভক্তি জেনে সতী দেবী বিস্মিত হয়। তখন শিব পার্বতীর বিস্ময় ছাড়ানোর জন্য পার্বতীকে উদেসশ্য করে যে কথাগুলু বলেন --

""হে সুশ্রোণি , অদ্ভুতকর্মা হরির নিঃস্পৃহ মহাত্মা দাসানুদাসদের মাহাত্ন্য প্রত্যক্ষ করলে তো ! যে সকল ব্যক্তি নারায়ন পরায়ন , তারা কারো হতে ভয় পায় না, স্বর্গ , অপবর্গ ও নরক এই তিন্তি বিষয়েই তুল্য প্রয়োজন দেখে থাকেন। কারন পরমেশ্বরের লীলাদ্বারাই দেহীদের দেহসংযোগ ও তার দ্বন্দ্ব অর্থাৎ সুখদুঃখ , জন্মমৃত্যু এবং শাপ অনুগ্রহ ইত্যাদি হয়ে থাকে। ঐ সকল সুখদুখাদির মধ্যে গুন দোষের বিকল্প অর্থাৎ ইস্টনিস্ট বুদ্ধি সপ্নাবস্থায় যেমন অবিবেককৃত , তেমনি অবিবেকৃত জানবে। জারা ভগবান বাসুদেবে ভক্তি করে থাকেন, তাদের জ্ঞান, বৈরাগ্য ও বীর্য সম্বন্ধে কে বড় এইরূপ বুদ্ধি তাদের নেই। অর্থাৎ ভক্তানুসন্ধানহেতু মায়িক বস্তুর উৎকর্ষ অপকর্ষের অনুসন্ধান করেন না।
হে দেবী আমি রুদ্র, ব্রম্মা, সনতকুমার, নারদ, ব্রহ্মার পুত্র, মরীচি প্রভৃতি ঋষিগন ও প্রধান প্রধান দেবগন জার অভিপ্রায় বা লীলা যখন জানতে পারেন না, তখন তারা অংশাংশ হয়েও পৃথক পৃথক ঈশ্বর বলে নিজেকে মনে করেন, তারা তার লীলা কিরুপে জানবে? সেই হরির কোনো প্রিয় বা অপ্রিয় নেই। আত্মীয় পরও নেই। তিনি সর্বভুতের আত্মা , এইজন্য সকলের প্রিয়।
এই মহাভাগ চিত্রকেতু সেই ভগবান অনন্তের প্রিয় এবং অনুচর। সুতরাং সর্বভুতে সমদর্শী ও শান্ত। হে সতী, আমিও অচ্যুত ও নারায়নপ্রিয়। অতএব তুমি বিস্ময় করো না, যে সকল পুরুশ মহাত্মা, মহাপুরুষের ভক্ত, শান্ত ও সমদর্শী তাদের এইরূপই স্বভাব। ""

আপনাদের কাছে এই প্রশ্ন যে তাহলে আমরা কেন ভেদাভেদ করছি?

মৌনতা
1 comments

সাধুমুখে হরিকথা শ্রবণ করাই সাধকের পক্ষে মঙ্গল



সাধকের পক্ষে গুরু-বৈষ্ণবের সাক্ষাৎ সঙ্গ ও তার ফলে হরিকথা শ্রবণ মাধ্যমে যে মঙ্গল উদয় হয়, জড়বুদ্ধি হয়ে বহু জন্ম বিগ্রহ অর্চন করেও তা হয় না। শ্রীগুরু-বৈষ্ণব কথার মাধ্যমে যে ভাব প্রকাশ করেন, শ্রীবিগ্রহ কৃপা করে আমাদের দর্শন দিয়েও তা করেন না। যিনি অন্তর্যামী ভগবান, তিনিও আমাদের সঙ্গে কথা বলেন না।
শ্রদ্ধা যদি না হয়, তা হলে সাধু দর্শন বা ভগবৎ দর্শন হয় না। বরং মৎসরতা বা হিংসা এসে উপস্থিত হয়। হিংসা আসে কেন? অন্য লোক আমার উপরে উঠে যাচ্ছে, এ জন্যই হিংসা হয়। তাই শ্রীমদ্ভাগবতের গোড়ায়ই ভাগবত-ধর্মকে নির্মৎসর সাধুদের ধর্ম বলে বলা হয়েছে।
‘আমি সেবা করবো, আমি সেব্য নই’ -এই সুবুদ্ধি যদি উদিত হয়, তাহলে যেসব দুর্বুদ্ধি মাতা-পিতা বা লৌকিক আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে পেয়ে এসেছি বা শিখে এসেছি, সেগুলি কেটে যেতে পারে। তা না হলে ওই দুর্বুদ্ধিগুলি আরও পুষ্ট হতে থাকবে।
হরিকথা প্রসঙ্গ ও হরিসেবা থেকে বিমুখ হলেই সংসার ভোগ বাসনায় আবদ্ধই থাকতে হবে। কৃষ্ণসেবা বাদ দিয়ে অন্য অভিলাষ চরিতার্থ করা, পর চর্চা করা, পরস্পর কলহ প্রভৃতি কাজে দিন কেটে যাবে। বিশেষত মঠবাসীরা বৈষ্ণবসেবাকে সর্বপ্রধান মঙ্গল কাজ বলে বুঝতে না পারলে ভজন রাজ্যে দিন দিন অগ্রসর হতে পারবেন না। নিষ্কপটভাবে অকপট বৈষ্ণবগণের প্রীতির জন্য কায়-মনো বাক্যে অনুশীলন করতে হবে।

শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর

0 comments

কৃষ্ণবিস্মৃতি থেকেই দেহাত্ম অভিমান উদিত হয়

‘বৈষ্ণবের আবেদনে কৃষ্ণ দয়াময়।
এ হেন পামর প্রতি হবেন সদয়।।’
এই কথা সর্বক্ষণ স্মরণ রাখতে হবে। যিনি শ্রীভগবান ও শ্রীগুরুদেব অচলা শ্রদ্ধা-বিশিষ্ট, তাঁরই হৃদয়ে পরমার্থ বিষয়ক সত্য বাক্য প্রকাশিত হয়। কৃষ্ণসেবা ছাড়া নিত্য কৃষ্ণদাস বৈষ্ণবের অন্য কোনও চেষ্টা নেই। কৃষ্ণবিস্মৃতি থেকেই দেহাত্ম অভিমান উদিত হয়।
সতীর্থদের মধ্যে কাউকেও হরি-গুরু-বৈষ্ণবসেবা থেকে বিচ্যুত হতে দেখলে, কোন গুরুভাই অধঃপতিত হয়েছে বুঝতে পারলে তাকে সরলভাবে হরিভজনের কথা ভালোভাবে বুঝিয়ে শ্রীগুরু-গৌরাঙ্গের মঙ্গলময় বাণী তার কাছে কীর্তন করে তাকে সর্বক্ষণ হরি-গুরু-বৈষ্ণব সেবায় নিযুক্ত রাখতে হবে। হরিকথা বলে তাদেরকে কৃপা করতে হবে। তাদের অধঃপতনে কটাক্ষ করে আনন্দবোধ করা তাদের মঙ্গল কামনা নয়। এতে আমাদের নিজেদের ও অপরের মঙ্গল সাধিত হয়ে সত্য সত্যই মঠবাসের সার্থকতা সম্পাদিত হবে। পরস্পরের হরিভজনের সহায়তার জন্যই আমরা একসঙ্গে বাস করছি।
জীব যখন নিষ্কপটভাবে শ্রীভগবানের কাছে আত্ম নিবেদন জ্ঞাপন করে, তখন শ্রীভগবান মহান্ত গুরুরূপে আবির্ভূত হন।

শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর
0 comments

জয় মা দুর্গা দুর্গতিনাশিনী দুর্গা নাম মাহাত্ম্য

Photo: জয় মা দুর্গা দুর্গতিনাশিনী দুর্গা নাম মাহাত্ম্য-
দুর্গা নামের মাহাত্ম্য লিখে বোঝানো দুষ্কর
যিনি জপেন কেবল তিনিই জানেন এই নামের অপার্থিব গুণাবলী
অনাদিকাল থেকে সাধকমণ্ডলী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে এই দুর্গা নামেকে আশ্রয় করে এসেছেন। অসংখ্য লোকগাথাতেও এই নামের নানা উপকারিতা ব্যাখাত হয়েছে। "দুর্গা দুর্গা বলে যে বা যাত্রা কালে ধায়ে। শূলহস্তে শূলপাণি রক্ষা করেন তায়ে।।" আবার শাস্ত্র বলছে
"চক্রং চক্রী,শূলমাদায়শূলী, বজ্রং বজ্রী,পাশমাদায়পাশী। ধাবন্ত্যগ্রে,পার্শ্ব্য়োঃ পৃষ্ঠতশ্চ, দুর্গা- দুর্গা- বাদিনো রক্ষণায়।।"
অর্থাৎ, "যিনি দুর্গা দুর্গা উচ্চারণ করেন,তাঁর রক্ষার জন্য চক্র নিয়ে বিষ্ণু,ত্রিশূল নিয়ে শিব,বজ্র নিয়ে ইন্দ্র,বন্ধন রজ্জু নিয়ে বরুণ তাঁর সামনে,দুপাশে এবং পশ্চাতে দ্রুত গমন করেন।"
দুর্গানাম মহা শক্তিধর নাম,এই নামের শক্তিতে হেন কাজ নেই যা সম্পন্ন হয় না। ব্রহ্মা এই নাম জপ করে জগত রচনায়ে ব্যাপৃত আছেন। শিব এই নাম স্মরণ করে যোগের উচ্চ অবস্থায়ে আরূঢ় হয়ে আছেন।
"সর্বে ধ্যায়ন্তি দেবীঃ" - সবাই সেই দেবীকেই ধ্যান করে, তাঁর নাম জপে নিজ নিজ ক্ষেত্রে শক্তিমান হয়েছেন। হে বিশ্বমাতৃকা,শুধু একটিই প্রার্থনা। মৃত্যুকালে যেন জিভে তোমার ওই নাম উচ্চারণ করতে পারি, যেন একবারের তরে "দুর্গা" বলে চিৎকার করতে পারি। যে অন্তিমকালে তোমার নাম স্মরণ করতে পেরেছে,সে আজীবন পাপ রাশি সঞ্চয় করলেও মৃত্যুর পরে সে তোমার সাযুজ্য প্রাপ্ত হয়। মাগো মা ! তোমাকে কোটি কোটি প্রণাম জানাই । এই বিশ্বচরাচরের অধীশ্বরী কল্যানকারিণী।
তোমার কৃপা দৃষ্টি আমাদের উপর সর্বদা রেখ।
জয় মা দুর্গা।
দুর্গা নামের মাহাত্ম্য লিখে বোঝানো দুষ্কর
যিনি জপেন কেবল তিনিই জানেন এই নামের অপার্থিব গুণাবলী
অনাদিকাল থেকে সাধকমণ্ডলী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে এই দুর্গা নামেকে আশ্রয় করে এসেছেন। অসংখ্য লোকগাথাতেও এই নামের নানা উপকারিতা ব্যাখাত হয়েছে। "দুর্গা দুর্গা বলে যে বা যাত্রা কালে ধায়ে। শূলহস্তে শূলপাণি রক্ষা করেন তায়ে।।" আবার শাস্ত্র বলছে
"চক্রং চক্রী,শূলমাদায়শূলী, বজ্রং বজ্রী,পাশমাদায়পাশী। ধাবন্ত্যগ্রে,পার্শ্ব্য়োঃ পৃষ্ঠতশ্চ, দুর্গা- দুর্গা- বাদিনো রক্ষণায়।।"
অর্থাৎ, "যিনি দুর্গা দুর্গা উচ্চারণ করেন,তাঁর রক্ষার জন্য চক্র নিয়ে বিষ্ণু,ত্রিশূল নিয়ে শিব,বজ্র নিয়ে ইন্দ্র,বন্ধন রজ্জু নিয়ে বরুণ তাঁর সামনে,দুপাশে এবং পশ্চাতে দ্রুত গমন করেন।"
দুর্গানাম মহা শক্তিধর নাম,এই নামের শক্তিতে হেন কাজ নেই যা সম্পন্ন হয় না। ব্রহ্মা এই নাম জপ করে জগত রচনায়ে ব্যাপৃত আছেন। শিব এই নাম স্মরণ করে যোগের উচ্চ অবস্থায়ে আরূঢ় হয়ে আছেন।
"সর্বে ধ্যায়ন্তি দেবীঃ" - সবাই সেই দেবীকেই ধ্যান করে, তাঁর নাম জপে নিজ নিজ ক্ষেত্রে শক্তিমান হয়েছেন। হে বিশ্বমাতৃকা,শুধু একটিই প্রার্থনা। মৃত্যুকালে যেন জিভে তোমার ওই নাম উচ্চারণ করতে পারি, যেন একবারের তরে "দুর্গা" বলে চিৎকার করতে পারি। যে অন্তিমকালে তোমার নাম স্মরণ করতে পেরেছে,সে আজীবন পাপ রাশি সঞ্চয় করলেও মৃত্যুর পরে সে তোমার সাযুজ্য প্রাপ্ত হয়। মাগো মা ! তোমাকে কোটি কোটি প্রণাম জানাই । এই বিশ্বচরাচরের অধীশ্বরী কল্যানকারিণী।
তোমার কৃপা দৃষ্টি আমাদের উপর সর্বদা রেখ।
জয় মা দুর্গা।


=জান্হবী সাহা=
0 comments

সর্বসর্বেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপাসনা করলেই সবার উপাসনা হয়ে যাবে

হরিভজন করলে শরীর মন আত্মা-- তিনটি ভালো থাকবে, আর হরিভজন বিমুখ হলে তিনটিই প্রতিকূল হয়ে দাঁড়াবে। যে ব্যক্তি কপটতা যুক্ত হয়ে বাইরে কৃষ্ণভজনের অভিনয় দেখায়, অন্তরে কৃষ্ণের কাছে ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ-- এই কৈতবগুলি বাঞ্ছা করে, কৃষ্ণ তার অভিলষিত এই সমস্ত কৈতব দিয়ে তাকে বঞ্চনা করেন, তাঁকে কখনও প্রেমভক্তি প্রদান করেন না। কিন্তু যে ব্যক্তি নিষ্কপটভাবে কৃষ্ণের ভজন করতে করতে অজ্ঞানতাবশত কৃষ্ণের নিকট বিষয়সুখ প্রার্থনা করে থাকে, কৃষ্ণ কৃপাপরশ হয়ে সেই নিষ্কপট অজ্ঞ ব্যক্তিকে যথার্থ সাধুদের কাছে হরিকথা শ্রবণের সুযোগ দান করে অজ্ঞের তুচ্ছ বিষয়সুখ বাসনা নিরস্ত করে দেন। যেমন ধ্র“বকে কৃষ্ণ নারদের মাধ্যমে কৃপা করেছিলেন।
জড়বুদ্ধি সহজিয়াদের কপটভাবে আছে বলে তারা প্রকৃত নিষ্কপট ও অকৃত্রিম সাধুর দর্শন ও তাঁদের বাণী শ্রবণ করতে পারে না। অর্থাৎ, কৃষ্ণ কৃপা করে তাদের বিষয় বাসনা ভুলিয়ে দেন না। তারা কৃষ্ণের মায়ার চাতরে পড়ে থাকে। মোট কথা এই যে, কৃষ্ণভজনের অভিনয়কারী কপট ব্যক্তিকে কৃষ্ণ কখনও সুদুর্লভ প্রেমভক্তি প্রদান করেন না। কেবল নিষ্কপট ভজনকারী অজ্ঞ ব্যক্তিকে দয়াপরবশ হয়ে সদ্গুরুর মাধ্যমে শুদ্ধভক্তি বা প্রেমভক্তি প্রদান করেন।
যে সব মানুষ হরিভজন করে না, যারা হরি সম্বন্ধহীন, তাদের জীবিত থেকে দৌরাত্ম্য করা অপেক্ষা জীবন ধারণ না করাই ভালো। মানুষ ও দেবতা প্রভৃতি যদি শ্রীহরির উপাসনা না করেন, তবে তাঁরা কেবলমাত্র জগতে জঞ্জাল আনয়ন করেন। দেবতাদের উপাস্য যে কৃষ্ণ, মানুষেরও উপাস্য সেই কৃষ্ণ। সুতরাং অন্যান্য দেবতার উপাসনা না করে সর্বসর্বেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপাসনা করলেই সবার উপাসনা হয়ে যাবে।

শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর
0 comments

পুষ্পক রথ

রামায়ণে পড়েছি পুষ্পক রথের কথা , যা আকাশে উড়তে পারে । দশরথ নাকি দশদিকে অর্থাৎ চারদিক এবং চারদিকের কোণগুলি সমেত উপরের আকাশে এবং নীচের দিকেও রথ চালাতে পারতেন বলেই তাঁর নাম দশরথ । বিশ্বাস হতোনা ।

মনে হত আমাদের প্রাচীন ভারত যদি বিমান নির্মাণের পদ্ধতি আবিষ্কার করে থাকে তবে তার প্রমাণ কই ? প্রাচীন ভারতীয় পুঁথিপত্রেও তো এসম্পর্কিত কোনও রিসার্চপেপার কথা আছে বলে শুনিনি । কিম্বা আবিষ্কারকের নাম , আবিষ্কারের বর্ণনা কিছুই নেই । তবে হতে পারে এসব কল্পনা । জুল ভার্নের লেখায় তো ডুবোজাহাজের কথা পাওয়া যায় । কিন্তু জুল ভার্নের সময়ে ডুবোজাহাজ ছিলনা । সবটাই লেখকের কল্পনা । হতে পারে আমাদের রামায়ণে বর্ণীত পুষ্পক রথ কিম্বা আসামে দন্তবক্রের সাথে যুদ্ধ জেতার পর শ্রীকৃষ্ণের আকাশপথে প্রত্যাবর্তন এসবই নিছক কল্পনা ।

কিন্তু চিন্তাভাবনাগুলো উল্টে পাল্টে গেল একটি সদ্যপ্রকাশিত ঘটনার কথা জেনে । আফগানিস্তানের ( যা প্রাচীন ভারতের গান্ধার রাজ্য ) একটি গুহায় অন্তত পাঁচ হাজার বছরের পুরানো একটি বিমানের সন্ধান পাওয়া গেছে ।
রাশিয়ার ফরেন ইন্টেলিজেন্স দপ্তরের দাবী এই বিমানের প্রাচীনত্ব মহাভারতের কালের এবং এই বিমানের ইঞ্জিন চলতে শুরু করলে বিমানটি থেকে বিভিন্ন রকম অদ্ভুত আলো নির্গত হয় ।





খবরে আরও প্রকাশ হয়েছে যে চীন সরকার তিব্বত থেকে কিছু প্রাচীন সংস্কৃত পুঁথি উদ্ধার করেছে যেখানে ইন্টারস্টেলর স্পেসশিপ নির্মাণের পদ্ধতি বর্ণীত আছে । এই পুঁথি চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে এর অর্থ উদ্ধারের জন্যে ।
জানিনা এসবের সত্যতা কতটা । তবে এসব যে উড়িয়ে দেবার মতো ঘটনা নয় তা বেশ বুঝতে পারছি ।
প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে উড়োজাহাজের গঠনশৈলীর সুস্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া গেছে ।
টেলিভিশনের হিস্ট্রি চ্যানেল থেকে নেওয়া এই সম্পর্কিত তথ্যপ্রমাণের ভিডিও লিঙ্ক নীচে দেওয়া হল ।
এখানে তথ্য প্রমাণ ঘেঁটে বিশ্বের বিভিন্ন পণ্ডিতেরা ব্যাখ্যা করছেন প্রাচীন ভারতীয় বিমানের টেকনোলজি ।
http://www.youtube.com/watch?v=RBvYGj7zh1o


http://www.thecontroversialfiles.net/2013/06/vimana-ancient-anti-gravity-flying.html



Courtesy by: Tapas Ghosh
0 comments

ঠাকুর বলিতেছেন, ঈশ্বর ও তাঁহার ঐশ্বর্য। এই জগৎ তাঁর ঐশ্বর্য।



“কিন্তু ঐশ্বর্য দেখেই সকলে ভুলে যায়, যাঁর ঐশ্বর্য তাঁকে খোঁজে না। কামিনী-কাঞ্চন ভোগ করতে সকলে যায়; কিন্তু দুঃখ, অশান্তিই বেশি। সংসার যেন বিশালাক্ষীর দ, নৌকা দহে একবার পড়লে আর রক্ষা নাই। সেঁকুল কাঁটার মতো এক ছাড়ে তো আর একটি জড়ায়। গোলকধান্দায় একবার ঢুকলে বেরুনো মুশকিল। মানুষ যেন ঝলসা পোড়া হয়ে যায়।”

একজন ভক্ত -- এখন উপায়?

শ্রীরামকৃষ্ণ -- উপায়: সাধুসঙ্গ আর প্রার্থনা।

“বৈদ্যের কাছে না গেলে রোগ ভাল হয় না। সাধুসঙ্গ একদিন করলে হয় না, সর্বদাই দরকার; রোগ লেগেই আছে। আবার বৈদ্যের কাছে না থাকলে নাড়ীজ্ঞান হয় না, সঙ্গে সঙ্গে ঘুরতে হয়। তবে কোন্‌টি কফের নাড়ী, কোন্‌টি পিত্তের নাড়ী বোঝা যায়।”

ভক্ত -- সাধুসঙ্গে কি উপকার হয়?

শ্রীরামকৃষ্ণ -- ঈশ্বরে অনুরাগ হয়। তাঁর উপর ভালবাসা হয়। ব্যাকুলতা না এলে কিছুই হয় না। সাধুসঙ্গ করতে করতে ঈশ্বরের জন্য প্রাণ ব্যাকুল হয়। যেমন বাড়িতে কারুর অসুখ হলে সর্বদাই মন ব্যাকুল হয়ে থাকে, কিসে রোগী ভাল হয়। আবার কারুর যদি কর্ম যায়, সে ব্যক্তি যেমন আফিসে আফিসে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, ব্যাকুল হতে হয়, সেইরূপ। যদি কোন আফিসে বলে কর্ম খালি নেই, আবার তার পরদিন এসে জিজ্ঞাসা করে, আজ কি কোন কর্ম খালি হয়েছে?

“আর একটি উপায় আছে -- ব্যাকুল হয়ে প্রার্থনা। তিনি যে আপনার লোক, তাঁকে বলতে হয়, তুমি কেমন, দেখা দাও -- দেখা দিতেই হবে -- তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ কেন? শিখরা বলেছিল, ‘ঈশ্বর দয়াময়’; আমি তাঁদের বলেছিলাম, দয়াময় কেন বলব? তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে আমাদের মঙ্গল হয়, তা যদি করেন সে কি আর আশ্চর্য! মা-বাপ ছেলেকে পালন করবে, সে আবার দয়া কি? সে তো করতেই হবে, তাই তাঁকে জোর করে প্রার্থনা করতে হয়। তিনি যে আপনার মা, আপনার বাপ! ছেলে যদি খাওয়া ত্যাগ করে, বাপ-মা তিন বৎসর আগেই হিস্যা ফেলে দেয়। আবার যখন ছেলে পয়সা চায়, আর পুনঃপুনঃ বলে, ‘মা, তোর দুটি পায়ে পড়ি, আমাকে দুটি পয়সা দে’, তখন মা ব্যাজার হয়ে তার ব্যাকুলতা দেখে পয়সা ফেলে দেয়।

“সাধুসঙ্গ করলে আর একটি উপকার হয়। সদসৎ বিচার। সৎ -- নিত্য পদার্থ অর্থাৎ ঈশ্বর। অসৎ অর্থাৎ অনিত্য। অসৎপথে মন গেলেই বিচার করতে হয়। হাতি পরের কলাগাছ খেতে শুঁড় বাড়ালে সেই সময় মাহুত ডাঙস মারে।”


=জান্হবী সাহা=
0 comments

হিন্দুমাত্রেই পরম্পর পরম্পরের ভাই

স্থান—বেলুড়, ভাড়াটিয়া মঠ-বাটী কাল—ফেব্রুআরি, ১৮৯৮ বেলুড়ে গঙ্গাতীরে শ্রীযুক্ত নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাগানবাটী ভাড়া করিয়া আলমবাজার হইতে ঐ স্থানে মঠ উঠাইয়া আনা হইয়াছে। সে বার ঐ বাগানেই শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মতিথিপূজা১ হয়। স্বামীজী নীলাম্বরবাবুর বাগানেই অবস্থান করিতেছিলেন। জন্মতিথিপূজায় সে-বার বিপুল আয়োজন! স্বামীজীর আদেশমত ঠাকুরঘর পরিপাটী দ্রব্যসম্ভারে পরিপূর্ণ। স্বামীজী সেদিন স্বয়ং সকল বিষয়ের তত্ত্বা- বধান করিয়া বেড়াইতেছিলেন। পূজার তত্ত্বাবধান শেষ করিয়া স্বামীজী শিষ্যকে বলিলেন, ‘পৈতে এনেছিস্ তো?’ শিষ্য। আজ্ঞে হাঁ। আপনার আদেশমত সব প্রস্তুত। কিন্তু এত পৈতার যোগাড় কেন, বুঝিতেছি না। স্বামীজী। দ্বি-জাতিমাত্রেরই( উপনয়ন-সংস্কার অধিকার আছে। বেদ স্বয়ং তার প্রমাণস্থল। আজ ঠাকুরের জন্মদিনে যারা আসবে, তাদের সকলকে পৈতে পরিয়ে দেবো। এরা সব ব্রাত্য (পতিত)হয়ে গেছে। শাস্ত্র বলে, প্রায়শ্চিত্ত করলেই ব্রাত্য আবার উপনয়ন- সংস্কারের অধিকারী হয়। আজ ঠাকুরে শুভ জন্মতিথি, সকলেই তাঁর নাম নিয়ে শুদ্ধ হবে। তাই আজ সমাগত ভক্তমন্ডলীকে পৈতে পরাতে হবে। বুঝলি? শিষ্য। আমি আপনার আদেশমত অনেকগুলি পৈতা সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছি। পূজান্তে আপনার অনুমতি অনুসারে সমাগত ভক্তগণকে ঐগুলি পরাইয়া দিব। স্বামীজী। ব্রাহ্মণেতর ভক্তদিগকে এরূপ গায়ত্রী-মন্ত্র (এখানে শিষ্যকে ক্ষত্রিয়াদি দ্বিজাতির গায়ত্রী-মন্ত্র বলিয়া দিলেন)দিবি। ক্রমে দেশের সকলকে ব্রাহ্মণপদবীতে উঠিয়ে নিতে হবে; ঠাকুরের ভক্তদের তো কথাই নেই। হিন্দুমাত্রেই পরম্পর পরম্পরের ভাই। ‘ছোঁব না, ছোঁব না’ বলে এদের আমরাই হীন করে ফেলেছি। তাই দেশটা হীনতা, ভীরুতা, মূর্খতা ও কাপুরুষতার পরাকাষ্ঠায় গিয়েছে। এদের তুলতে হবে, অভয়বাণী শোনাতে হবে। বলতে হবে—‘তোরাও আমাদের মতো মানুষ, তোদেরও আমাদের মতো সব অধিকার আছে।’ বুঝলি? শিষ্য। আজ্ঞে হাঁ। স্বামীজী। এখন যারা পৈতে নেবে, তাদের গঙ্গাস্নান করে আসতে বল্। তারপর ঠাকুরকে প্রণাম করে সবাই পৈতে পরবে। স্বামীজীর আদেশমত সমাগত প্রায় ৪০।৫০ জন ভক্ত ক্রমে গঙ্গাস্নান করিয়া অসিয়া, শিষ্যের নিকট গায়ত্রী-মন্ত্র লইয়া পৈতা পরিতে লাগিল। মঠে হুলস্থূল। পৈতা পরিয়া ভক্তগণ আবার ঠাকুরকে প্রণাম করিল, এবং স্বামীজীর পাদপদ্মে প্রণত হইল। তাহাদিগকে দেখিয়া স্বামীজীর মুখারবিন্দ যেন শতগুণে প্রফুল্ল হইল। (স্বামি-শিষ্য-সংবাদ পৃষ্ঠা নং::৭৪)

Shree Krishna - The Supreme Personality of Godhead
0 comments

ঘট স্থাপন

যে কোন পূজার সময় ঘট স্থাপন করতে হয়। ঘট কোন দেবী বা দেবতার মূর্তি নয়। ঘট ভগবানের নিরাকার অবস্থার প্রতীক। হিন্দুরা পূজার সময় যেমন ভগবানের সাকার স্বরূপ কে পূজা করে তেমনি নিরাকার স্বরূপকেও পূজা করেন । তাই ঘট স্থাপন প্রতি পূজাতে একান্ত আবশ্যক। ঘট স্থাপন ছাড়া পূজা অসম্পূর্ণ বলে মনে করা হয়। সর্ব পূজায় ঘট লাগে। ঘট স্থাপন করতে প্রয়োজন মাটি ( গঙ্গা মাটি হলে ভালো, অভাবে কোন পবিত্র পুষ্করিণী বা কোন নদীর মাটি), ধান , ঘট ( মাটি, পিতল, তামার ঘট প্রশস্ত – অভাবে স্টিলের ঘট ), জল, পল্লব ( আম্র পল্লব প্রশস্ত অভাবে অশ্বত্থ, বট, পাকুর ও যজ্ঞডুমুর পাঁচ বা সাতটি পাতা একত্রে ), গোটা ফল ( সশীষ কচি ডাব প্রশস্ত- অভাবে কাঁঠালী কলা, হরিতকী ) , পুস্পমালা, সিন্দুর ( ঘৃত সিন্দুর বা সরিষার তৈল ও সিন্দুর গোলা ), নতুন গামছা লাগে । মূর্তি তে পূজো করলে ঘট সম্পূর্ণ আচ্ছাদনের জন্য লাল শালু কাপড়, ৪ টে তিরকাঠি ও লাল ধাগা লাগে অন্যথায় প্রয়োজন নেই । প্রথমে নরম মাটি ভিজিয়ে মাটিতে দিন। ঘটে স্বস্তিক বা পুত্তলিকা সিঁদুর দিয়ে অঙ্কন করে ঘটে জল পূর্ণ করুন। ঘটের মুখে পল্লব দিন, পল্লবের প্রতিটি পাতায় সিঁদুরের ফোটা দিন। পল্লবের উপরে ফল বসান, ফলে পুত্তলিকা অথবা পাঁচটি সিঁদুরের ফোটা দিন। এবার গামছা দিয়ে ফল ঢেকে দিন। মালা দিন ঘটে । এবার ঘট সেই মাটির ওপর অল্প ধান দূর্বা দিয়ে তার ওপর দেবতার সামনে বসান। এবার মন্ত্র বলার পালা । সাধারণত ঋক, যজু, সাম বেদ মতে ঘট স্থাপন হয়। যেহেতু উত্তরপূর্ব ভারতে সাম বেদের মত বেশী- তাই এই পদ্ধতি অনুসরণ করুন। মন্ত্র হল – ভূমিতে হাত দিয়ে বলুনঃ- ওঁ ভূমিরন্তরীক্ষং দ্যৌ র্দা ভূতায়াঃ । ধানে হাত দিয়ে বলুনঃ- ওঁ ধানাবন্তং করম্ভিণ- মপূপবন্তমুকথিনম্ । ইন্দ্র প্রাতর্জুযস্ব নঃ । জলে হাত দিয়ে বলুনঃ- ওঁ আ নো মিত্রাবরুণা ঘৃতৈর্গব্যৃতি মুক্ষতং । মধ্বা রজাংসি সুক্রুতু । পল্লব ধরে বলুনঃ- ওঁ অয়মুর্জাবতো বৃক্ষ উর্জীব ফলিনী ভব । পর্ণং বণস্পতে নুত্বা নুত্বা চ্ সূয়তাং রয়িঃ । ফল ধরে বলুনঃ- ওঁ ইন্দ্রং নরো নেমধিতা হবন্তে যৎ পার্য্যা যুনজতে ধিয়ন্তাঃ । শূরো নৃষাতা শ্রবসশ্চ কাম আগোমতি ব্রজে ভজা ত্বং নঃ । পুস্পমাল্য ধরে বলুনঃ- ওঁ পবমান বাশুহি রশ্মির্ভিবা জসাতমঃ । দধৎ স্ত্রোত্রে সুবীর্য্যাম ।। ইতি পুস্পেন । সিন্দুর ধরে বলুনঃ- ওঁ সিন্ধোরুচ্ছ্বাসে পতয়ন্তমুক্ষণং । হিরণ্যপাবাঃ পশুমপসু গৃভণতে ।। ঘট ধরে বলুনঃ- ওঁ ত্বাবতঃ পুরুবসো বয়মিন্দ্র প্রনেতঃ। স্মসি স্থাতর্হরীণাং ।। ওঁ স্থাং স্থীং স্থিরো ভব । হাত জোর করে দেবতার আহ্বানের জন্য বলুন ( পুরুষ দেবতা অর্থাৎ ভগবান)ঃ- ওঁ সর্বতীর্থোদ্ভবং বারি সর্বদেবসমন্বিতম্ । ইমং ঘটং সমারুহ্য দেবগণৈঃ সহ ।। ( মায়ের পূজোর ক্ষেত্রে )ঃ- ওঁ সর্বতীর্থোদ্ভবং বারি সর্বদেবসমন্বিতম্ । ইমং ঘটং সমারুহ্য দেবিগণৈঃ সহ ।। এরপর যে দেবতার পূজা করছেন সেই দেবতার গায়ত্রী ঘটের ওপর ১১ বার জপ করুন। চাইলে ১০৮ বার ও জপ করতে পারেন। ধরুন সরস্বতী দেবীর পূজা করছেন, তাহলে ঘটের ওপর মা সরস্বতীর গায়ত্রী জপ করবেন। ধরুন শিবের পূজো করছেন, তাহলে ঘটের ওপর শিব গায়ত্রী জপ করবেন । তারপর নিয়ম মতন ৫ মুদ্রা দ্বারা সেই দেবতার আহ্বান করতে হয়। সেটা অন্যদিন প্রকাশ করা হবে । পূজার সময় ঘট কোন কারনে পড়ে যাওয়া ঘোর অমঙ্গল। সেক্ষেত্রে ক্ষমা প্রার্থনা করে নতুন করে ঘট বসাতে হবে। আর পূজা শেষে ঘট বিসর্জন ( গৃহ লক্ষ্মী পূজায় গুরুবারে ঘট বসানো ব্যতিক্রম ) করবেন। আর যদি বিসর্জন না করেন, তাহলে সেই ভগবান বা সেই দেবী ঘটেই অবস্থান করবেন। প্রত্যহ নিয়মিত আপনাকে পূজা করতে হবে। তাই বেশীরভাগ ভক্ত পূজান্তে ঘট বিসর্জন করেন ।


Shree Krishna - The Supreme Personality of Godhead
1 comments

এই মন্দির টি কুরুক্ষেত্রের একাংশে অবস্থিত

এই সেই পবিত্র মন্দির। যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের বিগ্রহ আছে। আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য মন্দিরের ভেতরে ছবি তোলা বারন আছে । বাইরে থেকে যত ইচ্ছা তোলা যাবে । এই মন্দির টি কুরুক্ষেত্রের একাংশে অবস্থিত । এই মাটি পবিত্র । এখানেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতা বলেছিলেন। অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন। এই মাটি স্পর্শ করলে মহাপাপীও পবিত্র হয়ে যায় । ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আশীষ প্রাপ্ত হয় । মন্দিরের ভেতরে হনুমান জী আছেন । মন্দিরের বাইরে ভগবানের বাহন গড়ুর জীর বিগ্রহ আছে । এই মন্দির পরিক্রমা করলে অক্ষয় ফল প্রাপ্ত হয় । হরে কৃষ্ণ মহা মন্ত্র উচ্চারণ করে ভক্ত গন পরিক্রমা করেন ।





দ্রৌপদী কূপ। সিঁড়ি দিয়ে সুড়ঙ্গের মধ্যে নামতে হয় । কুরুক্ষেত্রের এক প্রান্তে অবস্থিত । 




=Sumon Basak=
0 comments

কলিকালে নামরূপে কৃষ্ণ অবতার


আমাদের চারটি যুগ রয়েছে যথাঃ- সত্যযুগ, ত্রেতাযুগ, দ্বাপরযুগ ও কলিযুগ। বর্তমান সময় কলিযুগের অর্ন্তভুক্ত । প্রত্যেক যুগে ভগবানকে সন্তুষ্টি বিধানের জন্য আলাদা ভাবে ধর্মানুষ্ঠান করা হত। এ সম্ভন্ধে শ্রীমদ্ভাগবতের (১২/৩/৫২ শ্লোকে) শুকদেব গোস্বামী পরিক্ষিত মহারাজকে বলেন -
“ কৃতে যদ্ধ্যায়তো বিষ্ণুং ত্রেতায়াং ঘজতো মখৈঃ।
দ্বাপরে পরিচর্যায়াং কলৌ তদ্ধরিকীর্তনাৎ ।। ”
অথাৎ, সত্যযুগে বিষ্ণুকে ধ্যান করে, ত্রেতাযুগে যজ্ঞের মাধ্যমে যজন করে এবং দ্বাপর যুগে অর্চন আদি করে যে ফল লাভ হত, কলিযুগে কেবলমাত্র “ হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র” কীর্তনে সেই সকল ফল লাভ হয়।
অথাৎ, সত্যযুগে যুগধর্ম ছিল ভগবান বিষ্ণুর ধ্যান করা। ধ্যানের মাধ্যমে ভগবানের সন্তুষ্টি বিধানের প্রয়াস করা হত। বৈদিক শাস্ত্রমতে ধর্মের চারটি স্তম্ভ যথাঃ- সত্য, দয়া, তপ ও শৌচ।
সত্যযুুগে এই চারটি স্তম্ভই বর্তমান ছিল। তখন চারভাগ ধর্ম ছিল এবং মানুষের আয়ুষ্কাল ছিল ১ (এক) লক্ষ বছর। ভগবানকে সন্তুষ্টি করার জন্য হাজার হাজার বছর ধ্যান (তপস্যা) করা হত। ভগবানকে লাভ করা খুবই কষ্ঠসাধ্য ছিল।
ত্রেতাযুগে যুগধর্ম ছিল যজ্ঞের মাধ্যমে ভগবানের সন্তুষ্টি বিধান করা। বিভিন্ন রকমের উপাদান যজ্ঞের অগ্নিতে আহুতির মাধ্যমে ভগবানকে আহবান করা হত। যজ্ঞে বিভিন্ন প্রকার বৈদিক মন্ত্র উচ্চারিত হত। এই যুগে তিন ভাগ ধর্ম এবং এক ভাগ অধর্ম ছিল। মানুষের আয়ু ছিল ১০ (দশ) হাজার বছর।
দ্বাপর যুগে যুগধর্ম ছিল অর্চন। এ যুগে দুই ভাগ ধর্ম ও দুই ভাগ অধর্ম ছিল। মানুষের আয়ুস্কাল ছিল ১ (এক) হাজার বছর। মানুষ অর্চনের মাধ্যমে ভগবানকে সন্তুষ্ট করার জন্য চেষ্টা করত।
কলিযুগের যুগধর্ম হচ্ছে নাম সংকীর্তন করা। কলিযুগে তিন ভাগ অধর্ম এবং এক ভাগ ধর্ম। মানুষ অল্প আয়ূ, অল্প মেধা,কলহ প্রিয়, এবং অধার্মিক। কিন্তু কলি যুগে সবচেয়ে বড় আশীবাদ হল খুব অল্পতেই হরিনাম সংকীর্তন করার মাধ্যমে ভগবানকে লাভ করতে পারা যায়। চৈতন্যচরিত্রামৃতে বর্ণনা হয়েছে -
“ কলিকালে নামরূপে কৃষ্ণ অবতার।
নাম হৈতে হয় সর্বজগৎ নিস্তার ।।”
এই কলিযুগে ভগবানের দিব্যনাম “ হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র ” হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের অবতার। কেবলমাত্র এই দিব্যনাম গ্রহন করার ফলে, যে কোন মানুষ সরাসরিভাবে ভগবানের সঙ্গ লাভ করতে পারেন। যিনি তা করেন তিনি অবশ্যই জড় জগত থেকে উদ্ধার লাভ করেন। এই নামের প্রভাবেই কেবল সমস্ত জগৎ নিস্তার পেতে পারে।
অন্যান্য যুগে অনেক বছর সাধনার ফলে যা লাভ হতো না, কলিযুগে শুধুমাত্র নিরন্তন হরিনামের মাধ্যমে তা অতি সহজেই লাভ হয়।

শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর
0 comments

এরূপ সংসারী জীবের কি উপায় নাই?


একজন ভক্ত -- মহাশয়, এরূপ সংসারী জীবের কি উপায় নাই?
শ্রীরামকৃষ্ণ -- অবশ্য উপায় আছে। মাঝে মাঝে সাধুসঙ্গ আর মাঝে মাঝে নির্জনে থেকে ঈশ্বরচিন্তা করতে হয়। আর বিচার করতে হয়। তাঁর কাছে প্রার্থনা করতে হয়, আমাকে ভক্তি বিশ্বাস দাও।
“বিশ্বাস হয়ে গেলেই হল। বিশ্বাসের চেয়ে আর জিনিস নাই।
(কেদারের প্রতি) -- “বিশ্বাসের কত জোর তা তো শুনেছ? পুরাণে আছে, রামচন্দ্র যিনি সাক্ষাৎ পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণ, তাঁর লঙ্কায় যেতে সেতু বাঁধতে হল। কিন্তু হনুমান রামনামে বিশ্বাস করে লাফ দিয়ে সমুদ্রের পারে গিয়ে পড়ল। তার সেতুর দরকার হয় নাই। (সকলের হাস্য)
“বিভীষণ একটি পাতায় রামনাম লিখে ওই পাতাটি একটি লোকের কাপড়ের খোঁটে বেঁধে দিছল। সে লোকটি সমুদ্রের পারে যাবে। বিভীষণ তাকে বললে, ‘তোমার ভয় নাই, তুমি বিশ্বাস করে জলের উপর দিয়ে চলে যাও, কিন্তু দেখ যেই অবিশ্বাস করবে, অমনি জলে ডুবে যাবে।’ লোকটি বেশ সমুদ্রের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল; এমন সময়ে তার ভারী ইচ্ছা হল যে, কাপড়ের খোঁটে কি বাঁধা আছে একবার দেখে! খুলে দেখে যে, কেবল ‘রামনাম’ লেখা রয়েছে! তখন সে ভাবলে, ‘এ কি! শুধু রামনাম একটি লেখা রয়েছে!’ যেই অবিশ্বাস, অমনি ডুবে গেল।
“যার ঈশ্বরে বিশ্বাস আছে, সে যদি মহাপাতক করে -- গো, ব্রাহ্মণ, স্ত্রী হত্যা করে, তবুও ভগবানে এই বিশ্বাসের বলে ভারী ভারী পাপ থেকে উদ্ধার হতে পারে। সে যদি বলে আর আমি এমন কাজ করব না, তার কিছুতেই ভয় হয় না।”
0 comments

কুরুক্ষেত্রের পবিত্র ভূমির একাংশে অবস্থিত একটি মন্দির ( কিছু ছবিসহ )

কুরুক্ষেত্রের পবিত্র ভূমির একাংশে অবস্থিত একটি মন্দির। মন্দিরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চক্রধারী মূর্তিতে আছেন। চরণে পার্থ । মন্দিরের ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ । এমন বলে এখানে ভগবানকে পরিক্রমা করলে অক্ষয় ফল লাভ হয় । মন্দিরে পরম বৈষ্ণব ভক্ত হনুমানের বিগ্রহ আছে ।

নারায়ণং নমস্কৃত্য নরঞ্চৈব নরোত্তমম্ ।
দেবীং সরস্বতীঞ্চৈব ততো জয়মুদীরয়েৎ ।।

( নারায়ন, ব্রহ্মা ও দেবী সরস্বতীকে নমস্কার করে জয়প্রদ পুরাণ মহাভারত পাঠ করিবে। )

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরবদের ১১ অক্ষৌহিণী যোদ্ধা ছিল। পাণ্ডব দের ৭ অক্ষৌহিণী যৌদ্ধা ছিল । এক অক্ষৌহিণী তে ১০৯৩৫০ পদাতি সেনা, ২১৮৭০ রথ, ২১৮৭০ হাতী, ৬৫৬১০ অশ্ব বাহিনী থাকে ।


কুরুক্ষেত্রের আরো কিছু ছবি নিচে দেয়া হলোঃ





এটি হরিয়ানা প্রদেশের কুরুক্ষে্ত্রে অবস্থিত । স্থানটির নাম জতিস্মর ।

কৌরবেরা এই চক্রবুহ্যহের ভীতরে অভিমুন্যকে হত্যা করে ।




এখানেই ভগবান কৃষ্ণ অর্জুনকে বিশ্বরূপ ও গীতা দান করেছিল। স্থানটির নাম জতিস্মর ।





Written by: Sumon Basak 
Pic Courtesy : Niranjan Howlader


0 comments

শুধু মাত্র দর্শন দিয়ে কি জীবন চলে না? ধর্মের দরকার কি?



সব জ্ঞান মানুষ অর্জন করতে পারে না। আবার সব ক্ষেত্রে অর্জিত জ্ঞান মানুষ ব্যবহার করতেও পারেনা বা অর্জিত জ্ঞান স্বার্থ চিন্তার জন্য পুর্ণাঙ্গ ভাবে ব্যবহৃত হয় না। সব মানুষের সব কিছু বুঝার ক্ষমতা বা ইচ্ছে ও থাকেনা। এ অবস্থায় শুধু মাত্র দর্শন দিয়ে কি করে সমাজকে সুন্দর রাখা যাবে বা সর্বজনের বসবাস উপযোগী করা যাবে ??
অভ্যাস ও আচার আচরণ দ্বারা জ্ঞানকে জীবন পরিচালনায় সর্বাধিক কাজে লাগানো যায়। পরম্পরার নিয়মে আমরা অভ্যস্ত হয়ে অনেক কাজ করি, যার প্রকৃত দর্শন সম্পর্কে আমাদের ধারণা থাকে না। তাই প্রতিদিনের জীবন ধারার সাথে ধর্ম ও দর্শনের নিয়ম কানুন গুলিকে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
ধর্মের অনেক গুলি সংজ্ঞা আছে এর মাঝে একটা সংজ্ঞা হলোঃ কতগুলি নিয়মের সমষ্টি যা জীবন পরিচালনায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আমার কাছে ধর্মের সংজ্ঞা হলো === প্রকৃতি, জীব ও মানবের মধ্যে সুন্দর সমন্বয় সৃষ্টির যে নিয়ম সেই নিয়মকেই ধর্ম বলে; যা সনাতন ধর্মের মুল কথা এবং যা বেদ মাতা দ্বারা প্রকাশিত হয়েছে ====
প্রতিদিনের, প্রতি ঘণ্টার অভ্যাসের মধ্যে যখন সংস্কার ও নিয়ম কানুন গুলিকে সন্নিবেশিত করা হয় তখন প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন না করেও তা পালন করা যায়। সুতরাং সুন্দর মানব জাতির প্রত্যাশায় ধর্ম ও দর্শন উভয়য়েরই প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু সর্ব সাধারণ, যারা দর্শন নিয়ে চর্চা করেননা বা দর্শনের গুরুত্ব বুঝার দরকার মনে করেননা - তাঁদের জন্য অনুশাসন দরকার। সেই অনুশাসনকে সামাজিক নিয়ম বলে, আবার এই নিয়ম গুলি ধর্মের বলেয়ে আবদ্ধ।
ঈশ্বর সকলের মঙ্গল করুন
গর্বের সাথে বলুন আমরা বৈদিক, আমরা সনাতন।

Written by: শুধু মাত্র দর্শন দিয়ে কি জীবন চলে না? ধর্মের দরকার কি?
0 comments

অর্জ্জুনকর্ত্তৃক যাদব-নরনারীরক্ষা-ব্যবস্থা, বসুদেবের মৃত্যু–দেবকী প্রভৃতির সহমরণ, বসুদেব ও রামকৃষ্ণের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, যাদবনারীগণসহ অর্জ্জুনের হস্তিনাযাত্রা, সমুদ্রের দ্বারকাপুরীগ্রাস, দস্যুগণকর্ত্তৃক দ্বারকারমণী-আক্রমণ, রমণীগণের উদ্ধারে অর্জ্জুনের অসামর্থ্য, বজ্রের হস্তে ইন্দ্রপ্রস্থের রাজ্যভার-অর্পণ

অর্জ্জুনকর্ত্তৃক যাদব-নরনারীরক্ষা-ব্যবস্থা
মহাত্মা বসুদেব এই কথা কহিলে, শত্রুতাপন মহাবীর ধনঞ্জয় একান্ত বিমনায়মান হইয়া তাঁহাকে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিলেন, “মাতুল! আমি কোন ক্রমেই এই কেশব ও অন্যান্য বীরগণপরিশূন্য রাজধানী দর্শনে সমর্থ হইতেছি না। ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, নকুল, সহদেব, দ্রৌপদী ও আমি আমরা সকলেই একাত্মা। এই যদুকুলক্ষয় শ্রবণ করিলে, আমার ন্যায় তাঁহাদেরও যাহার পর নাই ক্লেশ হইবে। এক্ষণে মহারাজ যুধিষ্ঠিরেরও মর্ত্ত্যলোক হইতে প্রস্থানসময় সমুপস্থিত হইয়াছে। অতএব আর এ স্থানে অধিক দিন অবস্থান করা আমার উচিত নহে। আমি অচিরাৎ বৃষ্ণিবংশীয় বালক ও বনিতাদিগকে লইয়া ইন্দ্রপ্রস্থে গমন করিব।”
মহাবীর ধনঞ্জয় মাতুলকে এই কথা কহিয়া দারুককে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “দারুক! আমি বৃষ্ণিবংশীয় অমাত্যদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিতে বাসনা করি, অতএব তুমি সত্বরে আমাকে তাঁহাদের নিকট লইয়া চল।” এই কথা কহিয়া তিনি দারুকের সহিত মহারথ যাদবগণের নিমিত্ত শোক করিতে করিতে তাঁহাদের সভায় সমুপস্থিত হইলেন। অনন্তর তিনি তথায় আসন পরিগ্রহ করিলে, অমাত্যগণ, প্রকৃতিমণ্ডল এবং ব্রাহ্মণগণ তাঁহাকে পরিবেষ্টন করিয়া অবস্থান করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর অর্জ্জুন সেই দীনচিত্ত মৃতকল্প ব্যক্তিদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “হে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ! আমিওঅন্ধকদিগের পরিবারদিগকে লইয়া ইন্দ্রপ্রস্থে গমন করিব। কৃষ্ণের পৌত্ত্র বজ্র ঐ নগরে রাজা হইয়া তোমাদিগকে প্রতিপালন করিবেন। এই নগর অচিরাৎ সমুদ্রজলে প্লাবিত হইবে। অতএব তোমরা অবিলম্বে যান ও রত্নসমুদায় সুসজ্জিত কর। সপ্তম দিবসে সূর্য্যোদয়সময়ে আমাদিগকে এই নগরের বহির্ভাগে অবস্থান করিতে হইবে। অতএব তোমরা আর বিলম্ব করিও না, শীঘ্র সুসজ্জিত হও।”
বসুদেবের মৃত্যু–দেবকী প্রভৃতির সহমরণ
মহাত্মা ধনঞ্জয় এই কথা কহিলে, তাঁহারা সকলেই সত্বরে সুসজ্জিত হইতে লাগিলেন। মহাবীর অর্জ্জুন শোকে একান্ত অভিভূত হইয়া কৃষ্ণের গৃহে সেই রজনী অতিবাহিত করিলেন। পরদিন প্রাতঃকালে প্রবলপ্রতাপ মহাত্মা বসুদেব যোগাবলম্বন পূর্ব্বক কলেবর পরিত্যাগ করিয়া উৎকৃষ্ট গতিলাভ করিলেন। তখন তাঁহার অন্তঃপুরমধ্যে ঘোরতর ক্রন্দনশব্দ সমুত্থিত হইয়া সমুদায় পুরী প্রতিধ্বনিত করিতে লাগিল। কামিনীগণ মাল্য ও আভরণ পরিত্যাগ পূর্ব্বক আলোলয়িতকেশে বক্ষঃস্থলে করাঘাত করিয়া রোদন করিতে লাগিলেন। তখন মহাত্মা অর্জ্জুন সেই বসুদেবের মৃতদেহ বহুমূল্য নরযানে আরোপিত করিয়া অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইলেন। দ্বারকাবাসিগণ দুঃখশোকে একান্ত অভিভূত হইয়া, তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিল। ভৃত্যগণ শ্বেতচ্ছত্র ও যাজকগণ প্রদীপ্ত পাবক লইয়া সেই শিবিকাযানের অগ্রে অগ্রে গমন করিতে আরম্ভ করিলেন। দেবকী, ভদ্রা, রোহিণী ও মদিরা নামে বসুদেবের পত্নীচতুষ্টয় তাঁহার সহমৃতা হইবার মানসে দিব্য অলঙ্কারে বিভূষিত ও অসংখ্য কামিনীগণে পরিবেষ্টিত হইয়া তাঁহার অনুগামিনী হইলেন। ঐ সময় জীবদ্দশায় যে স্থান বসুদেবের মনোরম ছিল, বান্ধবগণ সেই স্থানে তাঁহাকে উপনীত করিয়া তাঁহার প্রেতকৃত্য সম্পাদন করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন তাঁহার দেবকীপ্রভৃতি পত্নীচতুষ্টয় তাঁহাকে প্রজ্বলিত চিতাতে আরোপিত দেখিয়া তদপুরি সমারূঢ় হইলেন।
বসুদেব ও রামকৃষ্ণের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া
মহাত্মা অর্জ্জুন চন্দনাদি বিবিধ সুগন্ধ কাষ্ঠ দ্বারা পত্নীসমবেত বসুদেবের দাহকার্য্য সম্পাদন করিতে লাগিলেন। ঐ সময় সেই প্রজ্বলিত চিতানলের শব্দ, সামবেত্তাদিগের বেদাধ্যয়ন ও অন্যান্য মানবগণের রোদনধ্বনিপ্রভাবে পরিবর্দ্ধিত হইয়া সেই স্থান প্রতিধ্বনিত করিতে লাগিল। অনন্তর তিনি বজ্রপ্রভৃতি যদুবংশীয় কুমারগণ ওকামিনীগণের সহিত সমবেত হইয়া বসুদেবের উদকক্রিয়া সম্পাদন করিলেন।
এইরূপে বসুদেবের ঔর্দ্ধ্বদেহিক কার্য্য সম্পাদন হইলে, পরমধার্ম্মিক ধনঞ্জয় যে স্থলে বৃষ্ণিবংশীয়েরা বিনষ্ট হইয়াছিলেন, সেই স্থানে সমুপস্থিত হইলেন। তখন সেই ব্রহ্মশাপগ্রস্ত মুসলনিহত বৃষ্ণিগণকে নিপতিত সন্দর্শন করিয়া তাঁহার দুঃখের আর পরিসীমা রহিল না। তখন তিনি জ্যেষ্ঠতানুসারে তাহাদিগের সকলের উদকক্রিয়া সম্পাদন করিয়া অন্বেষণ দ্বারা বলদেব ও বাসুদেবের শরীরদ্বয় আহরণ পূর্ব্বক চিতানলে ভস্মসাৎ করিলেন।
যাদবনারীগণসহ অর্জ্জুনের হস্তিনাযাত্রা
মহাত্মা অর্জ্জুন এইরূপে শাস্ত্রানুসারে বৃষ্ণিবংশীয়দিগের প্রেতকার্য্য সম্পাদন করিয়া সপ্তম দিবসে রথারোহণে ইন্দ্রপ্রস্থাভিমুখে যাত্রা করিলেন। তখন বৃষ্ণিবংশীয় কামিনীগণ শোকার্ত্ত হইয়া রোদন করিতে করিতে অশ্ব, গো, গর্দ্দভ ও উষ্ট্রসমাযুক্ত রথে আরোহণ পূর্ব্বক তাঁহার অনুগমনে প্রবৃত্ত হইলেন। ভৃত্য অশ্বারোহী ও রথীগণ এবং পুরবাসী ও জনপদবাসী লোকসমুদায় অর্জ্জুনের আজ্ঞানুসারে বৃদ্ধ, বালক ও কামিনীগণকে পরিবেষ্টন করিয়া গমন করিতে লাগিল। গজারোহিগণ পর্ব্বতাকার গজসমুদায়ে আরোহণ পূর্ব্বক ধাবমান হইল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এবং বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশীয় বালকগণ, বাসুদেবের ষোড়শ সহস্র পত্নী ও পৌত্ত্র বজ্রকে অগ্রসর করিয়া গমন করিতে লাগিলেন। ঐ সময় ভোজ, বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশের যে কত অনাথা কামিনী পার্থের সহিত গমন করিয়াছিলেন, তাহার আর সংখ্যা নাই। এইরূপে মহারথ অর্জ্জুন সেই যদুবংশীয় অসংখ্য লোক সমভিব্যাহারে দ্বারকা নগর হইতে বহির্গত হইলেন।
সমুদ্রের দ্বারকাপুরীগ্রাস
দ্বারকাবাসী লোকসমুদায় নগর হইতে নির্গত হইলে পর, মহাত্মা অর্জ্জুন উঁহাদের সহিত ঐ বিবিধ রত্নপরিপূর্ণ নগরের যে অংশ অতিক্রম করিতে লাগিলেন, সেই অংশ অচিরাৎ সমুদ্রজলে প্লাবিত হইতে লাগিল। তখন দ্বারকাবাসী লোকসমুদায় সেই অদ্ভূত ব্যাপারসন্দর্শনে নিতান্ত চমৎকৃত হইয়া ‘দৈবের কি আশ্চর্য্য ঘটনা’ এই কথা বলিতে বলিতে দ্রুতপদে ধাবমান হইল। অনন্তর মহাবীর ধনঞ্জয় সেই যদুবংশীয় কামিনীগণ ও অন্যান্য যোধগণসমভিব্যাহারে ক্রমে ক্রমে নদীতীর, রমণীয় কানন ও পর্ব্বতপ্রদেশে অবস্থান করিতে লাগিলেন। কিয়দ্দিন পরে তিনি অতি সমৃদ্ধিসম্পন্ন পঞ্চনদ দেশে সমুপস্থিত হইয়া পশু ও ধান্যপরিপূর্ণ প্রদেশে অবস্থিতি করিলেন। ঐ স্থানে দস্যুগণ ধনঞ্জয় একাকী সেই অনাথা যদুকুলকামিনীগণকে লইয়া যাইতেছেন দেখিয়া, অর্থলোভে তাঁহাদিগকে আক্রমণ করিতে বাসনা করিয়া পরস্পর এইরূপ মন্ত্রণা করিল যে, “ধনঞ্জয় একাকী কতকগুলি বৃদ্ধ, বালক ও বনিতাসমভিব্যাহারে গমন করিতেছে। উহার অনুগামী যোধগণেরও তাদৃশ ক্ষমতা নাই। অতএব চল, আমরা উহাদিগকে আক্রমণ করিয়া উহাদের ধনরত্নসমুদায় অপহরণ করি।”
দস্যুগণকর্ত্তৃক দ্বারকারমণী-আক্রমণ
এইরূপ পরামর্শ করিয়া সেই দস্যুগণ লগুড়হস্তে সিংহনাদশব্দে দ্বারকাবাসী লোকদিগকে বিত্রাসিত করিয়া তথায় উপস্থিত হইল। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় অনুচরগণের সহিত তাহাদের অভিমুখীন হইয়া তাহাদিগকে কহিলেন, দস্যুগণ! যদি তোমাদিগের জীবিত থাকিবার বাসনা থাকে, তাহা হইলে অচিরাৎ প্রতিনিবৃত্ত হও, নচেৎ আমি নিশ্চয়ই শরনিকর দ্বারা তোমাদিগকে নিহত করিব। পাণ্ডুনন্দন এইরূপে তাহাদিগকে ভয়প্রদর্শন করিলেও তাহারা তাঁহার বাক্য অগ্রাহ্য করিয়া দ্বারকাবাসী লোকদিগকে আক্রমণ করিল।
রমণীগণের উদ্ধারে অর্জ্জুনের অসামর্থ্য
তখন মহাবীর ধনঞ্জয় রোষভরে স্বীয় গাণ্ডীব শরাসনে জ্যারোপণ করিতে উদ্যত হইলেন, কিন্তু তৎকালে ঐ কার্য্য তাঁহার নিতান্ত কষ্টকর বোধ হইতে লাগিল। পরিশেষে তিনি অতি কষ্টে সেই শরাসনে জ্যারোপণ করিয়া দিব্যাস্ত্রসমুদায় চিন্তা করিতে লাগিলেন, কিন্তু ঐ সময় কোন ক্রমে সেই অস্ত্রসমুদায় তাঁহার স্মৃতিপথে সমুদিত হইল না। তিনি স্বীয় ভুজবীর্য্যের হানি ও দিব্যাস্ত্রসমুদায়ের অস্মরণনিবন্ধন নিতান্ত লজ্জিত হইলেন। ঐ সময় বৃষ্ণিবংশীয়দিগের হস্তী, অশ্ব ও রথারোহী যোধগণও সেই দস্যুগণকে নিবারণ করিবার নিমিত্ত বিশেষ যত্ন করিতে লাগিল, কিন্তু কোন ক্রমেই কৃতকার্য্য হইতে সমর্থ হইল না। দস্যুগণ যে দিকে গমন করিতে লাগিল, মহাবীর অর্জ্জুন যত্ন পূর্ব্বক সেই দিক্ রক্ষা করিতে আরম্ভ করিলেন। কিন্তু কিছুতেই তাহাদিগকে নিবারণ করিতে পারিলেন না।
অনন্তর দস্যুগণ সৈন্যগণের সমক্ষেই অবলাদিগকে অপহরণ করিতে লাগিল এবং কোন কোন কামিনী ইচ্ছা পূর্ব্বক তাহাদিগের সহিত গমন করিতে আরম্ভ করিল। মহাত্মা অর্জ্জুন তদ্দর্শনে নিতান্ত উদ্বিগ্ন বৃষ্ণিবংশীয়দিগের ভৃত্যগণের সহিত মিলিত হইয়া তূণীর হইতে শরসমুদায় নিষ্কাশন পূর্ব্বক দস্যুগণের প্রতি নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তখন তাঁহার অক্ষয় তূণীরের মধ্যস্থ বাণসমুদায়ও ক্ষণকালের মধ্যে ক্ষয়প্রাপ্ত হইল। শরসমুদায় নিঃশেষ হইলে, পাণ্ডুনন্দন নিতান্ত দুঃখিত হইয়া শরাসনের অগ্রভাগ দ্বারা দস্যুগণকে প্রহার করিতে লাগিলেন। কিন্তু কিছুতেই তাহাদিগকে নিরাকৃত করিতে পারিলেন না। পরিশেষে সেই দস্যুগণ তাঁহার সম্মুখ হইতেই বৃষ্ণি ও অন্ধকদিগের অতি উৎকৃষ্ট কামিনীগণকে অপহরণ করিয়া পলায়ন করিল। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় দিব্যাস্ত্র, ভুজবীর্য্য ও তূণীরস্থ শরসমুদায়ের ক্ষয়নিবন্ধন নিতান্ত বিমনায়মান হইয়া দৈবদুর্ব্বিপাক স্মরণপূর্ব্বক প্রতিনিবৃত্ত হইলেন।
বজ্রের হস্তে ইন্দ্রপ্রস্থের রাজ্যভার-অর্পণ
অনন্তর তিনি সেই হৃতাবশিষ্ট কামিনীগণ ও রত্নরাশি সমভিব্যাহারে কুরুক্ষেত্রে সমুপস্থিত হইয়া হার্দ্দিক্যতনয় ও ভোজকুলকামিনীগণকে মার্ত্তিকাবর্ত নগরে, অবশিষ্ট বালক, বৃদ্ধ ও বনিতাগণকে ইন্দ্রপ্রস্থে এবং সাত্যকিপুত্ত্রকে সরস্বতীনগরীতে সন্নিবেশিত করিলেন। ইন্দ্রপ্রস্থের রাজ্যভার কৃষ্ণের পৌত্ত্র বজ্রের প্রতি সমর্পিত হইল। ঐ সময় অক্রূরের পত্নীগণ প্রব্রজ্যাগ্রহণে উদ্যত হইলে, বজ্র বারংবার তাঁহাদিগকে নিষেধ করিতে লাগিলেন; কিন্তু কিছুতেই তাঁহারা প্রতিনিবৃত্ত হইলেন না। রুক্মিণী, গান্ধারী, শৈব্যা, হৈমবতী ও দেবী জাম্ববতী ইঁহারা সকলে হুতাশনে প্রবেশ পূর্ব্বক প্রাণত্যাগ করিলেন। কৃষ্ণের অন্যান্য পত্নীগণ তপস্যা করিবার মানসে অরণ্যে প্রবিষ্ট হইয়া ফলমূল ভোজন পূর্ব্বক হিমালয় অতিক্রম করিয়া কলাপগ্রামে উপস্থিত হইলেন। অনন্তর মহাত্মা ধনঞ্জয় দ্বারকাবাসী লোকদিগকে যথোপযুক্ত স্থানবিভাগ প্রদান করিয়া বজ্রের হস্তে সমর্পণ করিলেন।

0 comments

অর্জ্জুনের আগমন–দ্বারকা দুর্দ্দশাদর্শনে বিলাপ । যাদবগণের দুর্দ্দশাদর্শনে অর্জ্জুনের বিলাপ, যদুবংশধ্বংসে বসুদেবের বিলাপ ,

অর্জ্জুনের আগমন–দ্বারকা দুর্দ্দশাদর্শনে বিলাপ
এ দিকে কৃষ্ণসারথি দারুক হস্তিনায় সমুপস্থিত হইয়া পাণ্ডবগণের নিকট যদুকুলের নিধনবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত কীর্ত্তন করিলে, পাণ্ডবগণ উহা শ্রবণ করিয়া নিতান্ত শোকসন্তপ্ত ও ব্যাকুলচিত্ত হইলেন। তখন বাসুদেবের প্রিয় সখা মহাবীর ধনঞ্জয় ভ্রাতৃগণকে আমন্ত্রণ পূর্ব্বক মাতুল বসুদেবের সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত দারুকের সহিত দ্বারকাভিমুখে যাত্রা করিলেন। অনন্তর তিনি দ্বারকায় সমুপস্থিত হইয়া দেখিলেন, ঐ নগরী অনাথা রমণীর ন্যায় নিতান্ত হীনদশা প্রাপ্ত হইয়াছে। ঐ সময় বাসুদেবের অন্তঃপুরস্থ রমণীগণ তাঁহার বিরহে নিতান্ত কাতর হইয়াছিলেন; তাঁহারা অর্জ্জুনকে দর্শন করিবামাত্র উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন। বাসুদেবের যে ষোড়শসহস্র মহিষী ছিলেন, তাঁহারা অর্জ্জুনকে সমাগত দেখিয়া হাহাকার করিতে আরম্ভ করিলেন। সেই পতিপুত্ত্রবিহীনা রমণীগণের আর্ত্তনাদ শ্রবণে অর্জ্জুনের নয়নযুগল বাষ্পবারিতে পরিপূর্ণ হওয়াতে, তিনি তৎকালে কিছুমাত্র দর্শন করিতে সমর্থ হইলেন না।
যাদবগণের দুর্দ্দশাদর্শনে অর্জ্জুনের বিলাপ
ঐ সময় সেই বীরশূন্য দ্বারকাপুরীকে বৈতরণী নদীর ন্যায় তাঁহার বোধ হইতে লাগিল। তিনি বৃষ্ণি ও অন্ধকগণকে উহার জল, অশ্বসমুদায়কে মৎস্য, রথসমুদায়কে উড়ুপ, বাদিত্র ও রথনির্ঘোষকে তরঙ্গ, গৃহসোপানসমুদায়কে মহাহ্রদ, রত্নসমুদায়কে শৈবাল, পথসমুদায়কে আবর্ত্ত, চত্বরসমুদায়কে স্তিমিত হ্রদ এবং বলদেব ও বাসুদেবকে মহানক্র বলিয়া বোধ করিতে লাগিলেন। অনন্তর তিনি সেই দ্বারকাপুরী ও বাসুদেবের বনিতাদিগকে হেমন্তকালীন নলিনীর ন্যায় নিতান্ত শ্রীভ্রষ্ট ও প্রভাশূন্য দর্শন করিয়া বাষ্পাকুলিত লোচনে রোদন করিতে করিতে ধরাতলে নিপতিত হইলেন। তখন বাসুদেবমহিষী সত্যভামা, রুক্মিণী ও অন্যান্য রমণীগণ অর্জ্জুনের নিকট বেগে ধাবমান হইয়া তাঁহাকে পরিবেষ্টন পূর্ব্বক কিয়ৎক্ষণ রোদন করিলেন এবং তৎপরে তাঁহাকে ধরাতল হইতে উত্থাপন পূর্ব্বক কাঞ্চনময় পীঠে উপবেশন করাইয়া তাঁহার চতুর্দ্দিকে অবস্থান করিতে লাগিলেন।

যদুবংশধ্বংসে বসুদেবের বিলাপ
বৈশম্পায়ন বলিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর মহাত্মা অর্জ্জুন মনে মনে বাসুদেবের স্তব করিয়া স্ত্রীগণকে আশ্বাস প্রদান পূর্ব্বক মাতুলের সহিত সাক্ষাৎ করিবার মানসে তাঁহার গৃহে প্রবিষ্ট হইয়া দেখিলেন, মহাত্মা বসুদেব পুত্ত্রশোকে নিতান্ত সন্তপ্ত হইয়া শয়ান রহিয়াছেন। তাঁহাকে তদবস্থ দেখিয়া ধনঞ্জয়ের দুঃখের আর পরিসীমা রহিল না। তখন তিনি বাষ্পপূর্ণনয়নে রোদন করিতে করিতে তাঁহার চরণযুগল বন্দনা করিলেন।
মহাত্মা বসুদেব ভাগিনেয় অর্জ্জুনকে সমাগত দেখিয়া নিতান্ত দৌর্ব্বল্যনিবন্ধন তাঁহার মস্তকাঘ্রাণ করিতে সমর্থ না হইয়া তাঁহাকে আলিঙ্গন পূর্ব্বক পুত্ত্র, পৌত্ত্র, দৌহিত্র ও বান্ধবগণের নিমিত্ত রোদন করিতে করিতে কহিলেন, “ধনঞ্জয়! যাহারা অসংখ্য ভূপতি ও দানবগণকে পরাজিত করিয়াছিল, আজি আমি তাহাদিগকে না দেখিয়াও জীবিত রহিয়াছি! তুমি যে প্রদ্যুম্ন ও সাত্যকিকে প্রিয়শিষ্য বলিয়া সর্ব্বদা প্রশংসা করিতে এবং যাহারা বৃষ্ণিবংশের অতিরথ বলিয়া বিখ্যাত ও বাসুদেবের নিতান্ত প্রিয়পাত্র ছিল, এক্ষণে তাহাদিগেরই দুর্নীতিনিবন্ধন এই যদুকুলের ক্ষয় হইয়াছে। অথবা উহাদের এ বিষয়ে দোষ কি? ব্রহ্মশাপই ইহার মূল কারণ।
“পূর্ব্বে যে কৃষ্ণ মহাবলপরাক্রান্ত কেশী, কংস, শিশুপাল, নিষাদরাজ একলব্য, কাশিরাজ, কালিঙ্গগণ, মাগধগণ, গান্ধারগণ এবং প্রাচ্য, দাক্ষিণাত্য ও পার্ব্বতীয় ভূপালগণকে নিহত করিয়াছিলেন, এক্ষণে তিনিও এই যদুকুল ক্ষয় হইতে দেখিয়া উপেক্ষা করিয়াছেন। তুমি, দেবর্ষি নারদ ও অন্যান্য মহর্ষিগণ তোমরা সকলেই যাঁহাকে সনাতন দেবদেব বলিয়া কীর্ত্তন করিয়া থাক, তিনি এক্ষণে স্বচক্ষে জ্ঞাতিবধ প্রত্যক্ষ করিয়া উপেক্ষা করিলেন। বোধ হয়, গান্ধারী ও ঋষিগণের বাক্য অন্যথা করিতে তাঁহার বাসনা হয় নাই।
“তোমার পৌত্র পরীক্ষিৎ অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্র দ্বারা দগ্ধ হইলে, তিনিই তাঁহার জীবন দান করিয়াছিলেন, কিন্তু এক্ষণে স্বীয় পরিজনদিগকে রক্ষা করিতে তাঁহার বাসনা হইল না। তাঁহার পুত্র, পৌত্র, সখা ও ভ্রাতৃগণ সকলে নিহত হইলে, তিনি আমার নিকট আগমন পূর্ব্বক আমাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘পিতঃ! আজি এই যদুকুল একবারে নিঃশেষিত হইল। আমার প্রিয় সখা অর্জ্জুন দ্বারকায় আগমন করিলে, আপনি তাঁহার নিকট এই কুলক্ষয়ের বিষয় আনুপূর্ব্বিক কীর্ত্তন করিবেন। আমি অর্জ্জুনের নিকট দূত প্রেরণ করিয়াছি। তিনি এই নিদারুণ সংবাদ শ্রবণ করিলে, কখনই হস্তিনায় অবস্থান করিতে পারিবেন না। অর্জ্জুনের সহিত আমার কিছুমাত্র প্রভেদ নাই। অতএব ঐ মহাত্মা এ স্থানে আগমন করিয়া যাহা কহিবেন, আপনি অবিচারিতচিত্তে তাহার অনুষ্ঠান করিবেন। তাঁহা দ্বারাই আপনার ঔর্দ্ধ্বদেহিক কার্য্যসম্পাদন এবং এই বালক ও রমণীগণের রক্ষা হইবে। তিনি এই স্থান হইতে প্রতিগমন করিবমাত্র এই অসংখ্য প্রাচীর ও অট্টালিকাসম্পন্ন দ্বারকাপুরী সমুদ্রজলে প্লাবিত হইয়া যাইবে। আমি এক্ষণে বলদেবের সহিত কোন পবিত্র স্থানে সমুপস্থিত হইয়া কাল প্রতীক্ষায় অবস্থান করিব।’
“অচিন্ত্যপরাক্রম মহাত্মা হৃষীকেশ এই বলিয়া আমাকে বালকগণের সহিত এই স্থানে রাখিয়া যে কোথায় গমন করিয়াছেন, কিছুই বলিতে পারি না। আমি নিতান্ত শোকাকুল হইয়া দিবারাত্রি বলদেব, বাসুদেব ও জ্ঞাতিগণকে স্মরণ পূর্ব্বক অনাহারে কালহরণ করিতেছি। আর আমার জীবন ধারণ ও ভোজন করিতে প্রবৃত্তি নাই। এক্ষণে সৌভাগ্যবশতঃ তোমার সহিত আমার সাক্ষাৎকার লাভ হইল। অতএব তুমি অবিলম্বে বাসুদেবের বাক্যানুরূপ কার্য্যের অনুষ্ঠান কর। এক্ষণে এই রাজ্য, স্ত্রী ও রত্নসমুদায় তোমার অধিকৃত হইল। আমি অচিরাৎ তোমার সমক্ষেই প্রাণত্যাগ করিব।”

0 comments

অর্জ্জুননিকটে কৃষ্ণের যাদবধ্বংসসংবাদ-প্রেরণ । পুরনারীরক্ষার্থ কৃষ্ণের ব্যবস্থা । বলদেবের অন্তর্দ্ধান । ব্যাধবাণে আহত কৃষ্ণের অন্তর্দ্ধান

অর্জ্জুননিকটে কৃষ্ণের যাদবধ্বংসসংবাদ-প্রেরণ
বৈশম্পায়ণ বলিলেন, মহাত্মা বভ্রু ও দারুক এই কথা কহিলে, মহামতি বাসুদেব তাঁহাদের বাক্যে সম্মত হইয়া তাঁহাদিগের সহিত অমিতপরাক্রম বলভদ্রের উদ্দেশে গমন করিয়া ইতস্ততঃ বিচরণ করিতে করিতে দেখিলেন, ঐ মহাবীর অতি নির্জ্জন প্রদেশে বৃক্ষমূলে উপবিষ্ট হইয়া চিন্তা করিতেছেন। মহাত্মা হৃষীকেশ বলভদ্রকে তদবস্থ দেখিয়া দারুককে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিলেন, “সারথে! তুমি সত্বর হস্তিনানগরে গমন করিয়া অর্জ্জুনের নিকট যাদবদিগের বিনাশবৃত্তান্ত সমুদায় নিবেদন কর। তাহা হইলে তিনি অবিলম্বে দ্বারকায় আগমন করিবেন।” বাসুদেব এইরূপ আদেশ করিলে, দারুক অবিলম্বে রথারোহণে কৌরবরাজধানীতে প্রস্থান করিলেন।
পুরনারীরক্ষার্থ কৃষ্ণের ব্যবস্থা
তখন মহাত্মা কেশব সমীপস্থিত বভ্রুকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “ভদ্র! তুমি অবিলম্বে অন্তঃপুরকামিনীগণের রক্ষার্থ গমন কর। দস্যুগণ যেন ধনলোভে তাহাদিগকে হিংসা না করে।”
মহাবীর বভ্রু ঐ সময় মদমত্ত ও জ্ঞাতিবধনিবন্ধন নিতান্ত দুঃখিত হইয়া জনার্দ্দনের নিকট উপবেশন পূর্ব্বক বিশ্রাম করিতেছিলেন। মহাত্মা মধুসূদন এই কথা কহিবামাত্র তিনি যেমন স্ত্রীগণের রক্ষণার্থ ধাবমান হইলেন, অমনি সেই ব্রহ্মশাপসম্ভূত মুষল এক ব্যাধের লৌহময় মুদ্গরে আবির্ভূত ও তাঁহার গাত্রে নিপতিত হইয়া তাঁহার প্রাণসংহার করিল। তখন মহাত্মা হৃষীকেশ বভ্রুকে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া স্বীয় অগ্রজ বলদেবকে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিলেন, “মহাত্মন্! আমি যে কালপর্য্যন্ত কাহারও প্রতি স্ত্রীগণের রক্ষণাবেক্ষণের ভার সমর্পণ করিয়া প্রত্যাগমন না করি, সেই কালপর্য্যন্ত আপনি এই স্থানে আমার প্রতীক্ষা করুন।”
এই কথা কহিয়া, বাসুদেব অচিরাৎ নগরমধ্যে প্রবেশ পূর্ব্বক পিতাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “মহাশয়! যে পর্য্যন্ত ধনঞ্জয় এখানে আগমন না করেন, সেই পর্য্যন্ত আপনি অন্তঃপুরস্থ কামিনীদিগকে রক্ষা করুন। জ্যেষ্ঠভ্রাতা বলদেব বনমধ্যে আমার নিমিত্ত প্রতীক্ষা করিতেছেন; অতএব আমি এক্ষণে তাঁহার নিকট চলিলাম। পূর্ব্বে আমি কুরুপাণ্ডবযুদ্ধে কৌরব ও অন্যান্য নরপতিগণের নিধন দর্শন করিয়াছি, এক্ষণে আবার আমাকে যদুবংশের নিধনও প্রত্যক্ষ করিতে হইল। আজি যাদবগণের বিরহে এই পুরী আমার চক্ষুর শল্যস্বরূপ বোধ হইতেছে। অতএব আমি অচিরাৎ বনগমন করিয়া, বলদেবের সহিত তীব্রতর তপোনুষ্ঠান করি।”
বলদেবের অন্তর্দ্ধান
মহামতি বাসুদেব এই কথা কহিয়া, পিতার চরণবন্দন পূর্ব্বক অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইলেন। তিনি বহির্গত হইবামাত্র অন্তঃপুরমধ্যে বালক ও বনিতাদিগের ঘোরতর আর্ত্তনাদ সমুত্থিত হইল। তখন ধীমান্ বাসুদেব অবলাগণের রোদনশব্দ শ্রবণে পুনরায় প্রতিনিবৃত্ত হইয়া তাঁহাদিগকে কহিলেন, “হে সীমন্তিনীগণ! মহাত্মা ধনঞ্জয় এই নগরে আগমন করিতেছেন, তিনি তোমাদিগের দুঃখমোচন করিবেন। অতএব তোমরা আর রোদন করিও না।”
এই কথা কহিয়া মহামতি মধুসূদন অবিলম্বে নির্জ্জন বনপ্রদেশে গমন করিয়া দেখিলেন, বলদেব যোগাসনে আসীন রহিয়াছেন এবং তাঁহার মুখমণ্ডল হইতে এক বৃহদাকার শ্বেতবর্ণ সর্প বিনির্গত হইতেছে। ঐ সর্পের মস্তক সহস্রসংখ্যক ও মুখ রক্তবর্ণ। সর্প দেখিতে দেখিতে বলদেবের মুখ হইতে বহির্গত হইয়া সমুদ্রাভিমুখে ধাবমান হইল। তখন সাগর, দিব্য নদীসমুদায়, জলাধিপতি বরুণ এবং কর্কোটক, বাসুকি, তক্ষক, পৃথ্রুশ্রবাঃ, বরুণ, কুঞ্জর, মিশ্রী, শঙ্খ, কুমুদ, পুণ্ডরীক, ধৃতরাষ্ট্র, হ্রাদ, ক্রাধ, শিতিকণ্ঠ, উগ্রতেজা, চক্রমন্দ, অতিষণ্ড, দুর্ম্মুখ ও অম্বরীষ প্রভৃতি নাগগণ সেই সর্পকে প্রত্যুদ্গমন পূর্ব্বক স্বাগতপ্রশ্ন ও পাদ্য অর্ঘ্যাদি দ্বারা অর্চ্চনা করিতে লাগিলেন। এইরূপে সেই সর্প বলদেবের মুখ হইতে বহির্গত হইলে, তাঁহার দেহ নিতান্ত নিশ্চেষ্ট হইল। তখন সর্ব্বজ্ঞ দিব্যচক্ষু ভগবান্ বাসুদেব জ্যেষ্টভ্রাতা দেহত্যাগ করিলেন বিবেচনা করিয়া চিন্তাকুলিতচিত্তে সেই বিজন পথে পরিভ্রমণ করিতে করিতে ভূতলে উপবেশন করিলেন।
ব্যাধবাণে আহত কৃষ্ণের অন্তর্দ্ধান
ঐ সময় পূর্ব্বে গান্ধারী তাঁহাকে যাহা কহিয়াছিলেন এবং তিনি উচ্ছিষ্ট পায়স পদতলে লিপ্ত না করাতে দুর্ব্বাসা যে সমুদায় বাক্য প্রয়োগ করিয়াছিলেন, সেই সমুদায় তাঁহার স্মৃতিপথে সমুদিত হইল। তখন তিনি নারদ, দুর্ব্বাসা ও কণ্বের বাক্য প্রতিপালন, তাঁহার স্বর্গগমনবিষয়ে দেবতাদিগের সন্দেহভঞ্জন ও ত্রিলোকপালন করিবার নিমিত্ত তাঁহাকে মর্ত্ত্যলোক পরিত্যাগ করিতে হইবে, বিবেচনা করিয়া ইন্দ্রিয়সংযম ও মহাযোগ অবলম্বন পূর্ব্বক ভূতলে শয়ন করিলেন। ঐ সময় জরানামক ব্যাধ মৃগবিনাশবাসনায় সেই স্থানে সমাগত হইয়া দূর হইতে যোগাসনে শয়ান কেশবকে অবলোকন পূর্ব্বক মৃগ জ্ঞান করিয়া, তাঁহার প্রতি শর নিক্ষেপ করিল। ঐ শর নিক্ষিপ্ত হইবামাত্র উহা দ্বারা হৃষীকেশের পদতল বিদ্ধ হইল। তখন সেই ব্যাধ মৃগগ্রহণবাসনায় সত্বরে তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিল, এক অনেকবাহুসম্পন্ন পীতাম্বরধারী যোগাসনে শয়ান পুরুষ তাহার শরে বিদ্ধ হইয়াছেন। লুব্ধক তাঁহাকে দর্শন করিবামাত্র আপনাকে অপরাধী বিবেচনা করিয়া, শঙ্কিতমনে তাঁহার চরণে নিপতিত হইল। তখন মহাত্মা মধুসূদন তাহাকে আশ্বাস প্রদান পূর্ব্বক অচিরাৎ আকাশমণ্ডল উদ্ভাসিত করিয়া স্বর্গে গমন করিলেন।
ঐ সময় ইন্দ্র, অশ্বিনীকুমারদ্বয় এবং রুদ্র, আদিত্য, বসু, বিশ্বদেব, মুনি, সিদ্ধ, গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরোগণ তাঁহার প্রত্যুদ্গমনার্থ নির্গত হইলেন; তখন ভগবান্ নারায়ণ তাঁহাদের কর্ত্তৃক সৎকৃত হইয়া তাঁহাদের সহিত স্বীয় অপ্রমেয় স্থানে সমুপস্থিত হইলেন। দেবতা, মহর্ষি, সিদ্ধ, চারণ, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরা ও সাধ্যগণ তাঁহার যথোচিত পূজা করিতে লাগিলেন; মুনিগণ ঋগ্বেদপাঠ ও গন্ধর্ব্বগণ সংগীত দ্বারা তাঁহার স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন এবং দেবরাজ ইন্দ্র আহ্লাদিতচিত্তে তাঁহার অভিনন্দনে প্রবৃত্ত হইলেন।
0 comments

কৃষ্ণের প্রতি শোকসন্তপ্তা গান্ধারীর অভিশাপ

কৃষ্ণের প্রতি শোকসন্তপ্তা গান্ধারীর অভিশাপ
“হে কৃষ্ণ! ঐ দেখ, বৃষভস্কন্ধ দুর্দ্ধর্ষ কাম্বোজরাজ নিহত হইয়া ধূলিশয্যায় শয়ান রহিয়াছেন। উনি পূর্ব্বে কাম্বোজ দেশীয় মহার্হ আস্তরণমণ্ডিত শয্যায় শয়ন করিতেন। ঐ দেখ, উঁহার বনিতা প্রিয়তমের চন্দনচর্চ্চিত বাহুদ্বয় শোণিতলিপ্ত দেখিয়া শোকাকুলিত চিত্তে বিলাপ বাক্যে কহিতেছে, হা নাথ! তোমার এই সুন্দর অঙ্গুলিসমন্বিত বাহুদ্বয় পরিঘ তুল্য ছিল। পূর্ব্বে যখন আমি তোমার এই ভুজদ্বয়ের মধ্যে অবস্থান করিতাম, তখন রতি আমারে এক মুহূর্ত্তও পরিত্যাগ করিত না। এক্ষণে তোমার অভাবে আমার কি গতি হইবে! কাম্বোজরাজমহিষী এই বলিয়া অনাথার ন্যায় মধুর স্বরে রোদন করত বিকম্পিত হইতেছে। ঐ দেখ, কলিঙ্গরাজের উভয় পার্শ্বে সমবস্থিত কামিনীগণ দিব্য মাল্যের ন্যায় আতপতাপিত হইয়াও শ্রীভ্রষ্ট হইতেছে না। ঐ দেখ, মগধদেশীয় রমণীগণ প্রদীপ্তাঙ্গদধারী মগধরাজ জয়ৎসেনের চতুর্দ্দিক্ পরিবেষ্টন করিয়া রোদন করিতেছে। ঐ বিশাললোচনা সুস্বর সম্পন্না রমণীগণের শ্রুতিসুখকর মধুর নিনাদে আমার অন্তঃকরণ বিমোহিতপ্রায় হইতেছে। ঐ কামিনীগণ পূর্ব্বে মহামূল্য আস্তরণমণ্ডিত শয্যায় শয়ন করিত, এক্ষণে উহারা শোকাকুলিত চিত্তে আভরণ সকল ইতস্তত নিক্ষেপ করিয়া রোদন করিতে করিতে ধরাতলে নিপতিত হইতেছে। ঐ দেখ, কোশলরাজপুত্ত্র বৃহদ্বলের নারীগণ পতিরে পরিবেষ্টন পূর্ব্বক রোদন করিতেছে এবং ব্যাকুল মনে উঁহার হৃদয়গত শরজাল উদ্ধৃত করিতে করিতে বারংবার মূর্চ্ছিত হইতেছে। আতপতাপ ও পরিশ্রমে উহাদিগের মুখমণ্ডল ম্লান হইয়া গিয়াছে। ঐ দেখ, ধৃষ্টদ্যুম্নের সুবর্ণ মাল্যধারী অঙ্গদসমলঙ্কৃত অল্পবয়স্ক আত্মজগণ নিহত হইয়া সমরাঙ্গণে শয়ান রহিয়াছে। উহারা পাবক তুল্য প্রতাপশালী দ্রোণের বাণপথে পতিত হইয়া শলভের ন্যায় নিহত হইয়াছে। ঐ দেখ, রুচিরাঙ্গদধারী কেকয় দেশীয় পাঁচ ভ্রাতা দ্রোণশরে নিহত ও সমরশয্যায় শয়ান হইয়া প্রজ্বলিত পাবকের ন্যায় শোভা পাইতেছেন। উঁহাদের তপ্ত কাঞ্চন নির্ম্মিত বর্ম্ম, বিচিত্র ধ্বজ, রথ ও মাল্যের প্রভাবে সমরাঙ্গন দেদীপ্যমান হইয়াছে। ঐ দেখ, পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ অরণ্য মধ্যে সিংহনিপাতিত মত্ত মাতঙ্গের ন্যায় দ্রোণশরে নিহত হইয়া ধরাতলে শয়ান রহিয়াছেন। উঁহার সুনির্ম্মল পাণ্ডুবর্ণ আতপত্র শরৎকালীন নিশাকরের ন্যায় শোভা পাইতেছে। ঐ পাঞ্চালরাজের পুত্ত্রবধূ ও ভার্য্যারা দুঃখিত মনে উঁহার মৃতদেহ দগ্ধ করিয়া দক্ষিণ দিক্ গমন করিতেছে।
“ঐ দেখ, চেদিদেশাধিপতি মহাবীর ধৃষ্টকেতু অসংখ্য শত্রু সংহার পূর্ব্বক স্বয়ং দ্রোণশরে নিহত হইয়া সমরাঙ্গনে শয়ান রহিয়াছেন। বিহঙ্গেরা উঁহার কলেবর ছিন্ন ভিন্ন করিয়াছে। উঁহার ভার্য্যারা রণস্থলে উপস্থিত হইয়া উঁহারে অঙ্কে আরোপণ পূর্ব্বক অনবরত রোদন করিয়া স্থানান্তরিত করিতেছে। ঐ দেখ, উঁহার চারুকুণ্ডলমণ্ডিত মহাবল পরাক্রান্ত আত্মজ দ্রোণশরে ছিন্ন ভিন্ন হইয়া রণস্থলে নিপতিত রহিয়াছে। ঐ বীর অদ্যাপি স্বীয় পিতারে পরিত্যাগ করে নাই। আমার পৌত্ত্র লক্ষ্মণও ধৃষ্টকেতুর পুত্ত্রের ন্যায় স্বীয় পিতার অনুগমন করিয়াছে। ঐ দেখ, কাঞ্চনাঙ্গদ সমলঙ্কৃত কাঞ্চন বর্ম্মধারী বিমল মাল্যসুশোভিত বৃষভলোচন অবন্তিদেশীয় বিন্দ ও অনুবিন্দ বসন্তকালে বায়ুবেগবিপাটিত কুসুমপরিশোভিত শালবৃক্ষদ্বয়ের ন্যায় ভূতলে শয়ান রহিয়াছে। হে কৃষ্ণ! পাণ্ডবেরা যখন মহাবীর ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, কৃপ, দুর্য্যোধন, অশ্বত্থামা, জয়দ্রথ, সোমদত্ত, বিকর্ণ ও কৃতবর্ম্মার হস্ত হইতে বিমুক্ত হইয়াছে, তখন উহারা ও তুমি অবধ্য। ভীষ্ম, দ্রোণ প্রভৃতি মহাবীরগণ শস্ত্রবলে দেবগণকেও বিনাশ করিতে সমর্থ ছিলেন। কিন্তু কালের কি কুটিল গতি! আজি তাঁহারাই নিহত হইয়া সমরাঙ্গনে শয়ান রহিয়াছেন। দৈবের অসাধ্য কিছুই নাই। হে বাসুদেব! তুমি যখন শান্তিস্থাপনে অকৃতকার্য্য হইয়া বিরাট নগরে প্রত্যাগমন করিয়াছিলে, তখনই আমি স্থির করিয়াছিলাম যে, আমার পুত্ত্রগণ নিহত হইয়াছে। তৎকালে মহাত্মা ভীষ্ম ও বিদুর আমারে কহিয়াছিলেন, তুমি আপনার পুত্ত্রগণের প্রতি আর স্নেহ প্রদর্শন করিও না। সেই মহাত্মাদিগের বাক্য কদাপি মিথ্যা হইবার নহে। ঐ দেখ, আমার পুত্ত্রেরা পাণ্ডবগণের রোষানলে ভস্মসাৎ হইয়া গিয়াছে।”
হে মহারাজ! গান্ধারতনয়া এই বলিয়া দুঃখশোকে একান্ত অধীর ও হতজ্ঞান হইয়া ভূতলে নিপতিত হইলেন এবং কিয়ৎক্ষণ পরে ক্রোধভরে বাসুদেবের প্রতি দোষারোপ করিয়া কহিলেন, “জনার্দ্দন! যখন কৌরব ও পাণ্ডবগণ পরস্পরের ক্রোধানলে পরস্পর দগ্ধ হয়, তৎকালে তুমি কি নিমিত্ত তদ্বিষয়ে উপেক্ষা প্রদর্শন করিলে? তোমার বহুসংখ্যক ভৃত্য ও সৈন্য বিদ্যমান আছে; তুমি শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন, বাক্যবিশারদ ও অসাধারণ বলবীর্য্যশালী, তথাপি ইচ্ছা পূর্ব্বক কৌরবগণের বিনাশে উপেক্ষা প্রদর্শন করিয়াছ। অতএব তোমারে অবশ্যই ইহার ফলভোগ করিতে হইবে। আমি পতিশুশ্রূষা দ্বারা যে কিছু তপঃসঞ্চয় করিয়াছি, সেই নিতান্ত দুর্লভ তপঃপ্রভাবে তোমারে অভিশাপ প্রদান করিতেছি যে, তুমি যেমন কৌরব ও পাণ্ডবগণের জ্ঞাতি বিনাশে উপেক্ষা প্রদর্শন করিয়াছ, তেমনি তোমার আপনার জ্ঞাতিবর্গও তোমা কর্ত্তৃক বিনষ্ট হইবে। অতঃপর ষট্‌ত্রিংশৎ বর্ষ সমুপস্থিত হইলে তুমি অমাত্য, জ্ঞাতি ও পুত্ত্রহীন এবং বনচারী হইয়া অতি কুৎসিত উপায় দ্বারা নিহত হইবে। তোমার কুলরমণীগণও ভরতবংশীয় মহিলাগণের ন্যায় পুত্ত্রহীন ও বন্ধুবান্ধব বিহীন হইয়া বিলাপ ও পরিতাপ করিবে।”
তখন মহামতি বাসুদেব গান্ধারীর মুখে এই কথা শ্রবণ করিয়া হাস্যমুখে তাঁহারে কহিলেন, “দেবি! আমা ব্যতিরেকে যদুবংশীয়দিগকে বিনাশ করে, এমন আর কেহই নাই। আমি যে যদুবংশ ধ্বংস করিব, তাহা বহুদিন অবধারণ করিয়া রাখিয়াছি। আমার যাহা অবশ্য কর্ত্তব্য, এক্ষণে আপনি তাহাই কহিলেন। যাদবেরা মনুষ্য বা দেব দানবগণের বধ্য নহে; সুতরাং তাঁহারা পরস্পর বিনষ্ট হইবেন।” বাসুদেব এই কথা কহিবামাত্র পাণ্ডবেরা ভীত ও উদ্বিগ্ন হইয়া প্রাণ ধারণ বিষয়ে এককালে হতাশ হইলেন।
0 comments

কৃষ্ণের দুর্য্যোধনগৃহে গমন–আতিথ্য প্রত্যাখ্যান । আতিথ্যপ্রত্যাখানের কারণ প্রদর্শন ।বিদুরগৃহে কৃষ্ণের অন্নভোজন


কৃষ্ণের দুর্য্যোধনগৃহে গমন–আতিথ্য প্রত্যাখ্যান
বৈশম্পায়ন কহিলেন, ভূপাল! মহাত্মা গোবিন্দ এই রূপে স্বীয় পিতৃস্বসাকে আমন্ত্রণ ও প্রদক্ষিণ করিয়া অসামান্য শ্রীসম্পন্ন, পুরন্দরগৃহসদৃশ, বিচিত্রাসনযুক্ত দুর্য্যোধনের গৃহে গমন করিলেন। তিনি দ্বারবান্ কর্ত্তৃক অনিবারিত হইয়া ক্রমে ক্রমে তিন কক্ষা অতিক্রমপূর্ব্বক গিরিশৃঙ্গের ন্যায় সমুন্নত, সুধাধবল, পরম শোভাসম্পন্ন প্রাসাদে আরোহণ করিলেন এবং দেখিলেন, মহাবাহু দুর্য্যোধন বহুল ভূপাল ও কৌরবগণে পরিবেষ্টিত হইয়া মহার্হ আসনে উপবিষ্ট আছেন; দুঃশাসন, কর্ণ ও শকুনি তাঁহার সমীপে অত্যুৎকৃষ্ট আসনে সমাসীন রহিয়াছেন। মহাযশাঃ ধৃতরাষ্ট্রতনয় গোবিন্দকে অবলোকন করিবামাত্র অমাত্যগণ সমভিব্যাহারে আসন হইতে উত্থিত হইয়া তাঁহার অভ্যর্থনা করিলেন। বৃষ্ণিবংশাবতংস বাসুদেব এই রূপে দুর্য্যোধনের সহিত মিলিত হইয়া পরিশেষে বয়ঃক্রমানুসারে সমুদায় ভূপতিগণের সহিত আলাপ করিয়া বিবিধ আস্তরণে আস্তীর্ণ জাম্বূনদময় পর্য্যঙ্কে উপবিষ্ট হইলেন। দুর্য্যোধন তাঁহাকে গো, মধুপর্ক, জল, গৃহ ও রাজ্য সমর্পণ করিলে, অন্যান্য কৌরবগণ তাঁহাকে অর্চ্চনা করিতে লাগিলেন।
অনন্তর রাজা দুর্য্যোধন কৃষ্ণকে ভোজন করিতে নিমন্ত্রণ করিলে, তিনি তাহাতে সম্মত হইলেন না। তখন দুর্য্যোধন কর্ণের সমক্ষে শঠতাপূর্ণ হৃদয়ে মৃদুবাক্যে বাসুদেবকে কহিলেন, “হে জনার্দ্দন! এই সমুদায় অন্ন, পান, বসন ও শয়ন আপনার নিমিত্তই আনীত হইয়াছে; আপনি কি নিমিত্ত ইহা গ্রহণ করিতেছেন না? আপনি আমাদের উভয় পক্ষের সাহায্যকারী ও হিতানুষ্ঠানপরায়ণ এবং আমার পিতার আত্মীয় ও দয়িত। আপনি ধর্ম্মার্থের তত্ত্ব যথার্থ রূপে অবগত আছেন; অতএব আপনার নিকট উক্ত বিষয়ের কারণ অবগত হইতে ইচ্ছা করি।”
আতিথ্যপ্রত্যাখানের কারণ প্রদর্শন
মহামতি গোবিন্দ দুর্য্যোধনের বাক্য শ্রবণান্তর তাঁহার বিপুল বাহু গ্রহণ করিয়া মেঘগম্ভীর নিঃস্বনে স্পষ্টাক্ষর, অর্থপূর্ণ, হেতুগর্ভ বাক্য কহিতে লাগিলেন, “হে দুর্য্যোধন! দূতগণ কার্য্যসমাধানান্তেই ভোজন ও পূজা গ্রহণ করিয়া থাকে; অতএব আমি কৃতকার্য্য হইলেই আপনার পূজা গ্রহণ করিব।”
(অসম্পূর্ণ)
বিদুরগৃহে কৃষ্ণের অন্নভোজন
(অসম্পূর্ণ)

0 comments

দ্রৌপদী-সত্যভামাসংবাদ পর্বাধ্যায় । সত্যভামার প্রতি দ্রৌপদীর পাতিব্রতকথন, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য, দ্রৌপদীর প্রতি সত্যভামার বিদায়-সম্ভাষণ

দ্রৌপদী-সত্যভামাসংবাদ পর্বাধ্যায়
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহাত্মা পাণ্ডবগণ ও বিপ্রসমুদায় আশ্রমমধ্যে সুখে সমাসীন হইয়াছেন; এমত সময়ে দ্রৌপদী ও সত্যভামা তথায় প্রবেশ করিলেন। পরস্পর প্রিয়বাদিনী সেই কামিনীদ্বয় বহু দিবসের পর পরস্পর সাক্ষাৎকার লাভ করিয়া পরম প্রফুল্ল চিত্তে উপবেশনপূর্ব্বক কুরু ও যদুবংশ সংক্রান্ত নানাবিধ কথোপকথন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে কৃষ্ণপ্রিয়া সত্যভামা একান্তে বসিয়া যাজ্ঞসেনীকে কহিলেন, “হে দ্রৌপদি! তুমি লোকপালসদৃশ সুদৃঢ়কলেবর মহাবীর পাণ্ডবগণের সহিত কিরূপ ব্যবহার করিয়া থাক? তাঁহারা যে কখনই তোমার প্রতি ক্রোধান্বিত হন না; প্রত্যুত ঈদৃশ বশীভূত হইয়াছেন যে, তোমা ভিন্ন আর কাহাকেও মনে করেন না; ইহার কারণ কি? সোমবারাদি ব্রতচর্য্যা, উপবাসাদিরূপ তপঃ, সঙ্গমাদিতে স্নান, মন্ত্র, ঔষধ, কামশাস্ত্রোক্ত বশীকরণ বিদ্যা, অচ্যুত তারুণ্যাদি, জপ, হোম বা অঞ্জনাদি ঔষধ, ইহার কোন্ উপায়ের প্রভাবে পাণ্ডবগণ তোমার এতাদৃশ বশীভূত হইয়াছেন? হে পাঞ্চালি! এক্ষণে তুমি আমাকে এরূপ কোন যশস্ব ও সৌভাগ্যজনক উপায় বল; যদ্দ্বারা আমি কৃষ্ণকে নিরন্তর বশীভূত করিয়া রাখিতে পারি।”
সত্যভামার প্রতি দ্রৌপদীর পাতিব্রতকথন
যশস্বিনী সত্যভামা এই কথা বলিয়া বিরত হইলে পর, পতিব্রতা দ্রৌপদী তাঁহাকে কহিতে লাগিলেন, হে সত্যভামে! তুমি আমাকে যেরূপ ব্যবহারের বিষয় জিজ্ঞাসা করিলে, অসৎ স্ত্রীগণই ঐরূপ আচার করিয়া থাকে; অতএব কিরূপে উহার উত্তর প্রদান করিব; তুমি বুদ্ধিমতী; বিশেষতঃ কৃষ্ণের মহিষী; ঈদৃশ বিষয়ে সংশয় বা প্রশ্ন করা তোমার উচিত নহে। দেখ, স্বামী পত্নীকে মন্ত্রপরায়ণ জানিতে পারিলে গৃহস্থিত সর্পের ন্যায় তাহার নিমিত্ত সতত উদ্বিগ্ন থাকেন। উদ্বিগ্ন ব্যক্তির শান্তি নাই; অশান্ত লোক কখনই সুখ লাভ করিতে সমর্থ হয় না। হে ভদ্রে! স্বামী কদাচ মন্ত্র দ্বারা বশীভূত হন না। জিঘাংসু ব্যক্তিরাই উপায় দ্বারা শত্রুর রোগোৎপাদন বা তাহাকে বিষ প্রদান করিয়া থাকে। লোকে জিহ্বা বা ত্বকদ্বারা যে সমস্ত বস্তু সেবন করে, তৎসমুদায়ে চূর্ণবিশেষ মিশ্রিত করিয়া প্রদান করিলে অবশ্যই প্রাণসংহার হয়।
অনেক পাপপরায়ণ কামিনীগণ স্বামীদিগকে বশ করিবার নিমিত্ত ঔষধ প্রদান করায় তাহাদিগের মধ্যে কেহ জলোদরগ্রস্ত, কেহ বা কুষ্ঠী, কেহ বা পলিত, কেহ বা পুরুষত্বরহিত, কেহ বা জড়, কেহ বা অন্ধ কেহ বা বধির হইয়া গিয়াছে। হে বরবর্ণিনি! কামিনীগণের কদাপি স্বামীর বিপ্রিয়াচরণ কর্ত্তব্য নহে।
(অসম্পূর্ণ)

স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য
দ্রৌপদী কহিলেন, “সখি! স্বামীর চিত্ত অনুরঞ্জন ও আকর্ষণ করিবার যে অব্যর্থ উপায় বলিতেছি; তদনুরূপ কার্য্য করিলে তোমার স্বামী আর কখন অন্য নারীর মুখাবলোকন করিবেন না। পতিই পরম দেবতা; পতির ন্যায় দেবতা আর কুত্রাপি দৃষ্টিগোচর হয় না; অতএব তাঁহার প্রসাদে সমস্ত মনোরথ সফল হয়; কোপ সমুদায় বিনষ্ট হয়; তাঁহা হইতেই অপত্য, বিবিধ বিষয়োপভোগ, উত্তম শয্যা, বিচিত্র আসন, বসন, গন্ধ, মাল্য, স্বর্গ, পুণ্য লোক ও মহতী কীর্ত্তি লাভ হইয়া থাকে। সুখের সময় সুখ লাভ হয় না; সাধ্বী স্ত্রী প্রথমতঃ দুঃখ ভোগ করিয়া পরিশেষে সুখভাগিনী হন।
“তুমি কৃষ্ণের প্রতি প্রতিদিন অকৃত্রিম প্রণয় প্রকাশপূর্ব্বক রমণীয় বেশ ভূষা, সুচারু ভোজনদ্রব্য, মনোহর গন্ধ মাল্য প্রদান দ্বারা তাঁহার আরাধনা করিলে, তিনি আপনাকে তোমার পরম প্রণয়াস্পদ বিবেচনা করিয়া অবশ্যই তোমার প্রতি অনুরক্ত হইবেন; তাহার সন্দেহ নাই। দ্বারদেশাগত স্বামীর কণ্ঠস্বর শ্রবণ করিবামাত্র গাত্রোত্থানপূর্ব্বক গৃহমধ্যে দণ্ডায়মান থাকিবে; অনন্তর তিনি গৃহপ্রবিষ্ট হইলেই পাদ্য ও আসন প্রদানপূর্ব্বক তাঁহার অভ্যর্থনা করিবে। তিনি কোন কার্য্যের নিমিত্ত দাসীকে নিয়োগ করিলে, তুমি স্বয়ং উত্থিত হইয়া সেই কার্য্য সম্পাদন করিবে। তোমার এই প্রকার সদ্ব্যবহার সন্দর্শনে কৃষ্ণ তোমাকে অবশ্যই সাতিশয় পতিপরায়ণা জ্ঞান করিবেন। পতি তোমার নিকট যাহা কহিবেন; তাহা গোপনীয় না হইলেও তুমি কদাচ প্রকাশ করিবে না; কারণ তোমার সপত্নী যদি কখন সেই কথা কৃষ্ণকে বলে, তাহা হইলে তিনি তোমার প্রতি বিরক্ত হইতে পারেন।
“যে সমস্ত ব্যক্তি স্বামীর প্রণয়পাত্র, সতত অনুরক্ত ও হিতসাধনে নিযুক্ত, বিবিধ উপায় দ্বারা তাঁহাদিগকে ভোজন করাইবে; এবং প্রযত্নাতিশয় সহকারে স্বামীকে দেষ্য, বিপক্ষ, অহিতাচারী ও কুহকীদিগের সহবাস পরিত্যাগ করাইবে। অন্য পুরুষের সমক্ষে মত্ততা ও অনাবধনতা পরিত্যাগপূর্ব্বক মৌনাবলম্বিনী হইয়া স্বীয় অভিপ্রায় সংযত করিয়া রাখিবে। প্রদ্যুম্ন ও শাম্ব তোমার পুত্ত্র হইলেও স্বামীর অসমক্ষে কদাপি তাহাদিগের সহিত একত্র বাস করিও না।
“সৎকুলজাত পুণ্যশীল পতিব্রতা স্ত্রীদিগের সহিত সখ্য করিবে; ক্রূর, কলহপ্রিয়, ঔদরিক, চৌর, দুষ্ট ও চপল অবলাদিগের সহবাস সর্ব্বতোভাবে পরিত্যাগ করিবে এবং সদ্গন্ধচর্চ্চিতকলেবর ও মহার্হ মাল্যাভরণবিভূষিত হইয়া সর্ব্বদা স্বামীর শুশ্রূষাপরতন্ত্র হইবে। এইরূপ সদাচরণে কাল হরণ করিলে, কেহ তোমার প্রতি শত্রুতাচরণ করিতে পারিবে না এবং তোমার মহতী কীর্ত্তি, পরম সৌভাগ্য ও স্বর্গ লাভ হইবে।”

দ্রৌপদীর প্রতি সত্যভামার বিদায়-সম্ভাষণ
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! ভগবান্ জনার্দ্দন মার্কণ্ডেয় প্রভৃতি মহর্ষি ও মহাত্মা পাণ্ডবগণ-সমভিব্যাহারে নানাপ্রকার অনুকূল কথাপ্রসঙ্গে কিয়ৎকাল অতিবাহিত করিয়া তাঁহাদিগের নিকট বিদায় গ্রহণপূর্ব্বক রথারোহণসময়ে সত্যভামাকে আহ্বান করিলেন। সত্যভামা অবিচলিত প্রণয়ভাবে দ্রুপদাত্মজাকে আলিঙ্গন করিয়া কহিলেন, “অয়ি প্রিয়সখি! উৎকণ্ঠিত হইও না; দুঃখ দূর কর; চিন্তিত হইয়া রজনী জাগরণ করিবার আবশ্যকতা নাই; তোমার স্বামিগণ নিজভুজবলে অনতিকালমধ্যেই পুনরায় এই বসুমতী অধিকার করিবেন। তোমার ন্যায় সুশীলা ও সুলক্ষণা কামিনীদিগের কখনই চিরকাল ক্লেশ ভোগ করিতে হয় না; আমি শুনিয়াছি; অবশ্যই তুমি ভর্ত্তৃগণের সহিত নিষ্কণ্টকে রাজ্য ভোগ করিবে।
“হে দ্রুপদনন্দিনি! পাণ্ডবেরা ধৃতরাষ্ট্রতনয়দিগের বধসাধনরূপ বৈরনির্য্যাতন করিয়া রাজ্যাধিকার প্রাপ্ত হইলে, যে সমস্ত দর্পবিমোহিত কুরুকামিনীগণ তোমাকে পদব্রজে পাণ্ডবদিগের সহিত বনে গমন করিতে দেখিয়া উপহাস করিয়াছিল, অচিরাৎ তাহাদিগের সেই গর্ব্ব খর্ব্ব ও সঙ্কল্প ব্যর্থ হইয়াছে দেখিবে। যাহারা নিতান্ত দুঃখের সময় তোমার অপ্রিয় কার্য্য করিয়াছে; তাহাদিগকে নিশ্চয়ই শমনসদনে গমন করিতে হইবে।
“প্রতিবিন্ধ্য, সুতসোম, শ্রুতকর্ম্মা, শতানীক ও শ্রুতসেনপ্রভৃতি তোমার পুত্ত্রেরা সকলেই ক্ষেমাস্পদ, মহাবীর ও কৃতাস্ত্র; ইহারা অভিমন্যুর ন্যায় দ্বারবতী নগরীতে সাতিশয় প্রীত ও অনুরক্ত হইয়া রহিয়াছে এবং সুভদ্রাও তোমার ন্যায় সেই সকল পুত্ত্রের প্রতি সমান স্নেহ করিয়া থাকেন। তিনি সন্তাপশূন্য ও নির্দ্বন্দ্ব হইয়া তোমাদিগের সুখে সুখ ও দুঃখে দুঃখ অনুভব করেন। প্রদ্যুম্নজননীও ইহাদিগের প্রতি সর্ব্বতোভাবে সেইরূপ ব্যবহার করিয়া থাকেন। এবং কৃষ্ণ, ভানুপ্রভৃতি পুত্ত্রগণ অপেক্ষা ইহাদিগকে সমধিক স্নেহ করেন। আমার শ্বশুর ইহাদিগের গ্রাসাচ্ছাদনের নিমিত্ত সর্ব্বদাই যত্নবান্ রহিয়াছেন। বলরাম প্রভৃতি অন্ধক ও বৃষ্ণিবংশীয়েরা উহাদিগের সহিত বয়স্য ভাবে কালযাপন করিতেছেন। হে ভাবিনি! প্রদ্যুম্ন ও তোমার পুত্ত্রগণের পরস্পর সদ্ভাব চিরকাল সমভাবে থাকিবে; তাহার সন্দেহ নাই।”
সত্যভামা দ্রৌপদীকে এবংবিধ নানাবিধ প্রিয় সম্ভাষণপূর্ব্বক প্রদক্ষিণ করিয়া রথে আরোহণ করিলে, কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে সান্ত্বনা করিয়া পাণ্ডবগণের নিকট বিদায় গ্রহণপূর্ব্বক স্বীয় নগরাভিমুখে যাত্রা করিলেন।

0 comments

জরাসন্ধ বধ । জরাসন্ধবন্দীকৃত রাজগণের মুক্তি । জরাসন্ধপুত্র সহদেবের রাজ্যাভিষেক । সকৃষ্ণ ভীমার্জুনের স্বপুরে আগমন

জরাসন্ধ বধ
বৈশম্পায়ন কহিলেন, তদনন্তর কৌশলাভিজ্ঞ ভীমসেন জরাসন্ধবধাভিলাষে বাসুদেবকে কহিলেন, “হে কৃষ্ণ! এই পাপাত্মার কক্ষদেশ এরূপ বসনবদ্ধ আছে যে, ইহাকে প্রাণবিযুক্ত করা সহজ ব্যাপার নহে।” পুরুষব্যাঘ্র বাসুদেব জরাসন্ধবধাভিলাষে সত্বর হইয়া রকোদরকে কহিলেন, “হে ভীম! তোমার যে দৈববল ও বাহুবল আছে, আশু তাহা জরাসন্ধকে প্রদর্শন কর।” মহাবল ভীম এই প্রকার অভিহিত হইয়া, জরাসন্ধকে উৎক্ষিপ্ত করিয়া ঘূর্ণিত করিতে লাগিলেন; শতবার ঘূর্ণিত করিয়া জানু দ্বারা আকুঞ্চনপূর্ব্বক তাঁহার পৃষ্ঠদেশ ভঙ্গ ও নিষ্পেষণপূর্ব্বক সিংহনাদসহকারে তাঁহার চরণদ্বয় করকবলিত করিয়া দ্বিধা বিভক্ত করিলেন। নিষ্পিষ্যমাণ জরাসন্ধের আর্ত্তরবে এবং ভীমসেনের গর্জ্জনে মগধবাসী সমস্ত লোক ত্রস্ত ও গর্ভিণীর গর্ভস্রাব হইয়া গেল। ভীমসেনের ভয়ঙ্কর নিনাদে মাগধেরা বোধ করিল যে, হয় হিমালয়, না হয় মহীতল বিদীর্ণ হইতেছে।
তদনন্তর অরিন্দম কৃষ্ণ, অর্জ্জুন ও ভীম গতজীবিত ও প্রসুপ্তের ন্যায় পতিত জরাসন্ধকে পরিত্যাগ করিয়া নিষ্ক্রান্ত হইলেন। কৃষ্ণ জরাসন্ধের পতাকাশালী রথ সংযোজিত এবং তাহাতে ভ্রাতৃদ্বয়কে আরোপিত করিয়া বান্ধবগণকে কারামুক্ত করিলেন। মহীপালগণ মহাভয় হইয়ে পরিত্রাণ পাইয়া কৃষ্ণের নিকট গমনপূর্ব্বক রত্ন দ্বারা তাঁহার সমুচিত সম্মান করিলেন। অক্ষত, শস্ত্রসম্পন্ন, জিতারি বাসুদেব সেই দিব্যরথে আরোহণ করিয়া রাজগণের সহিত গিরিব্রজ হইতে প্রস্থান করিলেন। ভীমার্জ্জুন দুই যোদ্ধা তাহাতে আরূঢ় এবং কৃষ্ণ তাহার সারথি হওয়াতে সেই রথ সমধিক শোভিত হইয়াছিল। যে রথ তারকাজালের ন্যায় সমুজ্জ্বল, ইন্দ্র এবং বিষ্ণু যাহাতে আরোহণ করিয়া সংগ্রাম করিতেন, যদ্দ্বারা পুরন্দর নবনবতিবার দানবগণকে নিহত করিয়াছিলেন, তপ্ত-কাঞ্চনের ন্যায় যাহার আভা, মেঘনির্ঘোষের ন্যায় যাহার শব্দ, সেই কিঙ্কিণীজালজড়িত অপূর্ব্ব রথ প্রাপ্ত হইয়া তাঁহারা সাতিশয় পরিতুষ্ট হইলেন। মাগধেরা মহাবাহু কৃষ্ণকে ভীম ও অর্জ্জুনের সহিত সেই রথে আরূঢ় দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইল। বায়ুবেগশালী সেই রথ দিব্য ঘোটকে সংযুক্ত ও কৃষ্ণ কর্ত্তৃক অধিষ্ঠিত হইয়া অতীব শোভমান হইয়াছিল। সেই দেবনির্ম্মিত রথ শক্রধনুর ন্যায় প্রভাসম্পন্ন দৃষ্ট হইতে লাগিল।
জরাসন্ধবন্দীকৃত রাজগণের মুক্তি
অনন্তর কৃষ্ণ গরুড়কে স্মরণ করিবামাত্র তিনি সমাগত হইলেন। বিস্তৃতানন, মহানাদ গরুত্মান্ সমারূঢ় হইলে সেই দিব্য রথ উন্নত চৈত্যবৃক্ষের উপমেয় হইয়া উঠিল। সহস্রকিরণাবৃত মধ্যাহ্নসহস্রাংশুর ন্যায় প্রাণিগণের দুর্নিরীক্ষ্য সেই রথ তেজোদ্বারা সমধিক দীপ্যমান হইল। তাহার দিব্য ধ্বজ বৃক্ষেও সংলগ্ন হইত না এবং বাণেও বিদ্ধ হইত না, এক্ষণে মানবের দৃশ্যমান হইতে লাগিল। যে রথ রাজা বসু বাসব হইতে, রহদ্রথ বসু হইতে, পরিশেষে জরাসন্ধ রহদ্রথ হইতে প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, পুরুষব্যাঘ্র অচ্যুত ভীম ও অর্জ্জুনের সহিত সেই মেঘনাদ রথে আরোগণ করিয়া প্রয়াণ করিলেন। তদনন্তর পুণ্ডরীকাক্ষ বাসুদেব গিরিব্রজ হইতে নির্গত হইয়া বহিঃপ্রদেশে উপস্থিত হইলেন। তখন তথায় ব্রাহ্মণ প্রভৃতি নগরবাসীরা সৎকার ও বিধিবিহিত কর্ম্ম দ্বারা তাঁহার সমীপবর্ত্তী হইলেন। বন্ধনবিমুক্ত রাজারাও স্তুতিপূর্ব্বক মধুসূদনের পূজা করিয়া কহিতে লাগিলেন, “হে মহাবাহো! ভীমার্জ্জুনের সহিত আপনি যে ধর্ম্ম রক্ষা করিলেন, অদ্য যে দুঃখরূপ পঙ্কে পঙ্কিল জরাসন্ধরূপ হ্রদে নিমগ্ন নৃপতিগণের উদ্ধারসাধন করিলেন, ইহা আশ্চর্য্যের বিষয় নহে। হে বিষ্ণো! হে যদুনন্দন! আপনি দারুণ গিরিদুর্গে অবসন্ন দুর্ভাগ্যদিগের মোচনজনিত দীপ্ত যশোরাশি প্রাপ্ত হইলেন। আপনি নৃপতিগণের দুষ্কর কর্ম্ম করিলেন, এক্ষণে এই ভৃত্যদিগকে কি করিতে হইবে, অনুমতি করুন।”
জরাসন্ধপুত্র সহদেবের রাজ্যাভিষেক
মনস্বী হৃষীকেশ তাঁহাদিগকে কহিলেন, “রাজা যুধিষ্ঠির রাজসূয়-যজ্ঞ করিতে অভিলাষ করিয়াছেন, আপনারা সেই সাম্রাজ্যচিকীর্ষু ধার্ম্মিকের সাহায্য করেন, ইহাই প্রার্থনা।” নৃপতিগণ “তাহাই করিব” বলিয়া স্বীকার করিলেন। জরাসন্ধনন্দন সহদেব অমাত্যের সহিত পুরোহিতকে অগ্রবর্ত্তী করিয়া অতি বিনীতভাবে প্রণিপাতসহকারে বহুরত্নপ্রদানপূর্ব্বক নরদেব বাসুদেবের উপাসনা করত তাঁহার শরণাপন্ন হইলেন। পুরুষোত্তম কৃষ্ণ ভয়ার্ত্ত সহদেবকে অভয় প্রদান করিয়া, তৎপ্রদত্ত মহামূল্য রত্নসমুদয় গ্রহণ করিলেন। কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জ্জুন একত্র হইয়া সানন্দে সৎকারপূর্ব্বক তাঁহাকে সেই মগধরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। মহাবাহু সহদেব মহাত্মগণ কর্ত্তৃক অভিষিক্ত হইয়া রাজধানী প্রবেশ করিলেন।
সকৃষ্ণ ভীমার্জুনের স্বপুরে আগমন
এ দিকে শ্রীমান্ পুরুষোত্তম ভুরি ভুরি রত্নজাত সংগ্রহ করিয়া ভীমার্জ্জুনের সহিত ইন্দ্রপ্রস্থে প্রস্থিত হইলেন এবং তথায় উপস্থিত হইয়া রাজা যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করিয়া আনন্দের সহিত কহিতে লাগিলেন, “মহারাজ! বৃকোদর বলবান্ জরাসন্ধকে নিপাতিত করিয়াছেন, কারারুদ্ধ ভূপতিগণও বন্ধনমুক্ত হইয়াছেন। ভাগ্যক্রমে ভীমসেন এবং ধনঞ্জয় কৃতকার্য্য হইয়া অক্ষত-শরীরে স্বনগরে আগমন করিয়াছেন।” রাজা যুধিষ্ঠির শ্রবণমাত্র অতিমাত্র আহ্লাদিত হইয়া বাসুদেবকে সমুচিত পূজা ও ভ্রাতৃদ্বয়কে আলিঙ্গন করিলেন। ভীমার্জ্জুন জরাসন্ধকে নিহত করিয়া জয়লাভ করিয়াছেন, ইহাতে সভ্রাতৃক যুধিষ্ঠিরের আর আহ্লাদের সীমা রহিল না। অনন্তর তাঁহারা বয়ঃঅনুসারে সৎকার ও পূজা করিয়া ভূপতিগণকে বিদায় করিলেন, ভূপতিগণ যুধিষ্ঠির কর্ত্তৃক অনুজ্ঞাত হইয়া প্রফুল্লচিত্তে উচ্চাবচ যানে আরোহণ করিয়া স্ব স্ব দেশে গমন করিলেন। বুদ্ধিমান্ শত্রুনিসুদন কৃষ্ণ পাণ্ডবগণ দ্বারা চিরশত্রু জরাসন্ধকে বিনষ্ট করিয়া, ধর্ম্মরাজের অনুজ্ঞা লইয়া, কুন্তী, কৃষ্ণা, সুভদ্রা, ভীমসেন, ধনঞ্জয় এবং ধৌম্যকে আমন্ত্রণ করিয়া, ধর্ম্মরাজ-প্রদত্ত মনস্তুল্যগামী সেই দিব্য রথে দশদিক্ মুখরিত করিয়া, নিজনগরে যাত্রা করিলেন। তাঁহার গমনসময়ে অজাতশত্রু যুধিষ্ঠির প্রভৃতি পাণ্ডবগণ তাঁহাকে প্রদক্ষিণ করিলেন। রাজা যুধিষ্ঠির জরাসন্ধের বধসাধন ও গিরিদুর্গ হইতে বধার্থানীত নরপতিদিগের উদ্ধার করাতে তাঁহার যশোরাশি ক্রমে চারিদিকে বিস্তৃত হইয়া উঠিল। হে ভরতবংশাবতংস জনমেজয়! এইরূপে পাণ্ডবগণ দ্রৌপদীর প্রীতিবর্দ্ধন ও তৎকালোচিত ধর্ম্মকামার্থোপেতভাবে প্রজা পালন করত পরম-সুখে বাস করিতে লাগিলেন।
জরাসন্ধবধপর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত
1 comments

গরুড়ের অমৃতহরণ, গরুড়ের জন্মরহস্য,গরুড়সহ দেবগণের যুদ্ধ,গরুড়ের অমৃতহরণ-গরুড়ের বিষ্ণুবাহনত্বলাভ,ইন্দ্রের সহিত গরুড়ের মিত্রতা | বিনতার দাস্যমুক্তি

ত্রিংশ অধ্যায়
গরুড়ের অমৃতহরণ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাবল-পরাক্রান্ত গরুড় পাদস্পর্শ মাত্রেই তরুশাখা ভগ্ন হইল দেখিয়া তৎক্ষণাৎ তাহা ধারণ করিলেন। বিহঙ্গমরাজ শাখাভঙ্গ করিয়া বিস্ময়বিস্ফারিত লোচন ইতস্ততঃ অবলোকন করিতেছেন, ইত্যবসরে দেখিতে পাইলেন, তপঃপরায়ণ বালখিল্য ঋষিগণ অধঃশিরা হইয়া বৃক্ষশাখায় লম্বমান রহিয়াছেন। গরুড় তদ্দর্শনে অতিমাত্র ভীত হইয়া মনে করিলেন, শাখা ভূতলে পতিত হইলে নিশ্চয়ই ঋষিদিগের প্রাণনাশ হইবে; অতত্রব গজ ও কচ্ছপকে নখ দ্বারা দৃঢ়রূপে ধারণ করিয়া ঋষিগণের প্রাণরক্ষার্থে ঐ অতি বিশাল বৃক্ষশাখা চঞ্চুপুট দ্বারা গ্রহণ করিলেন। মহর্ষিগণ গরুড়ের অলৌকিক কর্ম্ম দর্শনে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া কারণ নির্দ্দেশপূর্ব্বক তাঁহার এই নাম রাখিলেন, “যেহেতু, এই বিহঙ্গম অতি গুরুভার গ্রহণ করিয়া অবিচলিতচিত্তে গগনমার্গে উড্ডীন হইল, অতএব অদ্যাবধি ইহার নাম গরুড় বলিয়া প্রসিদ্ধ হইবে।” অনন্তর গরুড় পক্ষ-পবন দ্বারা পার্শ্বস্থ সমস্ত পর্ব্বত বিচালিত করিয়া বায়ুবেগে গমন করিতে লাগিলেন।
গরুড় গজ-কচ্ছপ লইয়া বালখিল্য ঋষিগণের প্রাণরক্ষার্থে এইরূপে নানাদেশ ভ্রমণ করিলেন; কিন্তু কুত্রাপি উপবেশনের উপযুক্ত স্থান পাইলেন না। পরিশেষে গন্ধমাদন পর্ব্বতে উপনীত হইয়া স্বীয় পিতা মহর্ষি কশ্যপকে তপস্যায় অভিনিবিষ্ট দেখিলেন। ভগবান্ কশ্যপ সেই বলবীর্য্যতেজঃ সম্পন্ন, মন ও বায়ুসম বেগবান্, অচিন্তনীয়, অনভিভবনীয়, সর্ব্বভূতভয়ঙ্কর, প্রদীপ্ত অগ্নিশিখার ন্যায় সমুজ্জ্বল, অধৃষ্য, দুর্জ্জয়, সর্ব্বপর্ব্বতবিদারণক্ষম, সমুদ্রশোষণে সমর্থ, সর্ব্বলোকসংহারে পটু, কৃতান্তসম ভীমদর্শন, উত্তুঙ্গ [অতূ্যচ্চ] গিরিশৃঙ্গাকার, দিব্যরূপী, বিহঙ্গমরাজ গরুড়কে অভ্যাগত দেখিয়া এবং তাঁহার অভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া কহিলেন, “হে পুৎত্র! তুমি সহসা সাহসের কর্ম্ম করিও না, তাহাতে অশেষবিধ ক্লেশ পাইবার সম্ভাবনা। সূর্য্যমরীচিমাত্রপায়ী [সূর্যকিরণমাত্রসেবী] বালখিল্যগণ রোষপরবশ হইলে তোমাকে এইদণ্ডে ভস্মসাৎ করিবেন।” এই কথা বলিয়া মহর্ষি কশ্যপ পুৎত্রবাৎসল্যপ্রযুক্ত মহাভাগ বালখিল্য ঋষিদিগকে প্রসন্ন করিতে লাগিলেন। হে মহর্ষিগণ! প্রজাদিগের হিতোদ্দেশে গরুড় এই মহৎ কর্ম্ম সাধন করিতে অধ্যবসায় করিয়াছে, তোমরা অনুজ্ঞা কর।” বালখিল্যগণ মহর্ষি কশ্যপের অভ্যর্থনায় সেই বৃক্ষশাখা পরিত্যাগপূর্ব্বক তপশ্চরণার্থ পর্ব্বতশ্রেষ্ঠ পবিত্র হিমালয়ে প্রস্থান করিলেন।
বালখিল্য গমন করিলে বিনতানন্দন নিজ পিতা কশ্যপকে নিবেদন করিলেন, “ভগবন্! আমি এখন এই বিশাল বৃক্ষশাখা কোথায় নিক্ষেপ করি, আমাকে কোন নির্ম্মানুষ দেশ নির্দ্দেশ করিয়া দিন।” তখন কশ্যপ মানুষশূন্য নিরবচ্ছিন্ন তুষাররাশিসমাকীর্ণ এক পর্ব্বত কহিয়া দিলেন। পক্ষিরাজ শাখা ও গজ-কচ্ছপ লইয়া বায়ুবেগে সেই পর্ব্বত অভিমুখে যাত্রা করিলেন। গরুড় যে শাখা লইয়া গমন করিলেন, উহা এমত স্থুল যে, শতগোচর্ম্মনির্ম্মিত রজ্জু দ্বারাও বন্ধন বা বেষ্টন করা যায় না। পতগেশ্বর গরুড় অনতিবিলম্বে শতসহস্র যোজনান্তরে স্থির সেই মহাপর্ব্বতে উপনীত হইয়া পিতার আদেশানুসারে তদুপরি প্রকাণ্ড বৃক্ষশাখা নিক্ষেপ করিলেন। তদীয় পক্ষপবনে আহত হইয়া গিরিরাজ কম্পিত হইল, তরুগণ পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিল এবং যে-সকল মণিকাঞ্চনময় শৈলশৃঙ্গ পর্ব্বতের শোভা সম্পাদন করিত, তাহারা বিশীর্ণ হইয়া ইতস্ততঃ পতিত হইতে লাগিল। বৃক্ষশ্রেণী পরস্পরের শাখাঘাতে অভিহত হইয়া সৌদামিনীমণ্ডিত নবীন নীরদের ন্যায় কাঞ্চনময় কুসুমসমূহে সুশোভিত হইল। গৈরিকরাগরঞ্জিত পাদপ-সকল অবিরল ভূতলে পতিত হইয়া অপূর্ব্ব শোভাধারণ করিল। তৎপরে গরুড় সেই গিরিশৃঙ্গে উপবিষ্ট হইয়া গজ-কচ্ছপ ভক্ষণ করিলেন। খগরাজ এইরূপে সেই কূর্ম্ম ও কুঞ্জরকে উপযোগ করিয়া তথা হইতে মহাবেগে উড্ডীন হইলেন।
অনন্তর দেবতাদিগের উপর অতি ভয়ঙ্কর উৎপাত আরম্ভ হইল। ইন্দ্রের বজ্র ভয়ে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। অন্তরীক্ষ হইতে ধূম ও অগ্নিশিখার সহিত উল্কাপাত হইতে লাগিল। বসু, রুদ্র, আদিত্য, সাধ্য, মরুৎ ও অন্যান্য দেবগণের অস্ত্র সকল পরস্পর বিক্রম প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিল। দেবাসুর-সংগ্রামেও এরূপ অভূতপূর্ব্ব দুর্ঘটনা কদাচ ঘটে নাই। বায়ু প্রবলবেগে প্রবাহিত হইতে লাগিল, শত সহস্র উল্কাপাত হইতে লাগিল এবং মেঘশূন্য নভোণ্ডল অতি গভীররবে গর্জ্জন করিতে আরম্ভ করিল। অধিক কি বলিব, যিনি দেবাদিদেব [পর্জ্জন্যদেব] তিনিও অনবরত শোণিতবর্ষণ করিতে লাগিলেন। দেবতাদিগের গলদেশের মাল্য ম্লান ও তেজোরাশি ক্রমশঃ হ্রাস হইয়া গেল। প্রলয়কালীন অতিভীষণ মেঘের ন্যায় ঘনাবলী মুষলধারে রক্তবৃষ্টি করিতে লাগিল। ধূলিজাল গগনমার্গে উড্ডীন হইয়া দেবগণের মুকুটসকল প্রভাহীন করিল।
অনন্তর দেবরাজ ইন্দ্র ও সমস্ত দেবগণ এইরূপ অতি নিদারুণ উৎপাত দর্শনে ভীত ও বিস্মিত হইয়া বৃহস্পতিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ভগবন্! যুদ্ধে আমাদিগকে আক্রমণ করে, এরূপ শত্রু ত’ লক্ষ্য হয় না। তবে কোথা হইতে এতাদৃশ ঘোরতর উৎপাত সহসা উপস্থিত হইল?” বৃহস্পতি কহিলেন, “হে দেবেন্দ্র! তোমারই অপরাধ ও প্রমাদবশতঃ মহাত্মা বালখিল্যগণের তপোবলে বিনতাগর্ভে মহর্ষি কশ্যপের পক্ষিরূপী এক পুৎত্র জন্মিয়াছে। সেই কামরূপী মহাবল বিনতানন্দন অমৃতহরণে সমর্থ। তাহাতে সকলই সম্ভব হয়। সে অনায়াসে অসাধ্য সাধন করিতে পারে।”
ইন্দ্র তদীয় বাক্য শ্রবণ করিয়া অমৃতরক্ষকদিগকে আদেশ করিলেন, “মহাবীর্য্য মহাবল এক পক্ষী অমৃতহরণে উদ্যত হইয়াছে, আমি তোমাদিগকে সতর্ক করিয়া দিতেছি, দেখিও, যেন সে বলপূর্ব্বক অমৃত হরণ করিতে না পারে। বৃহস্পতি কহিয়াছেন, সে অতুল-বলশালী” তাহা শুনিয়া দেবতারা বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া অতি সাবধানে অমৃত বেষ্টন করিয়া রহিলেন এবং ইন্দ্রও বজ্রহস্ত হইয়া তথায় অবস্থান করিলেন। বিচিত্র বসন-ভূষণে বিভূষিত, পাপস্পর্শরহিত, নিরুপম, বলবীর্য্যসম্পন্ন, অসুরপুরবিদারণে পটু সুরগণ; কাঞ্চনময়, বৈদূর্য্যমণিময় ও চর্ম্মাত্মক, মহামূল্য প্রভাভাস্বর [তেজধারা দীপ্ত], সুদৃঢ় কবচ; তীক্ষ্ণধার ভয়ঙ্কর বিবিধ অস্ত্র-শস্ত্র; ধূম অগ্নি ও স্ফুলিঙ্গ [অগ্নিকণা] সহিত চক্র; পরিঘ, ত্রিশূল, পরশু, বহুবিধ সুতীক্ষ্ণ শক্তি; নির্ম্মল করবাল [তরোয়াল] এবং উগ্রদর্শন গদা এই সমস্ত অস্ত্র-শস্ত্র লইয়া অমৃতরক্ষার্থে সেইস্থানে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তাঁহারা এইরূপে স্ব স্ব অস্ত্র-শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক যুদ্ধার্থে সুসজ্জিত হইয়া সূর্য্যকিরণ বিকাশিত বিগলিতান্ধকার আকাশমণ্ডলের ন্যায় শোভা পাইয়াছিলেন।

একত্রিংশ অধ্যায়
গরুড়ের জন্মরহস্য
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! ইন্দ্রের কি অপরাধ ও তাঁহার অনবধানতাই বা কিরূপ? বালখিলা ঋষিগণের তপঃপ্রভাবে গরুড়ের সম্ভব ও মহর্ষি কশ্যপের পক্ষিরূপী পুৎত্র, ইহারই বা কারণ কি? ঐ পক্ষিরাজ কিরূপে সর্ব্বভূতের অবধ্য, অনভিভবনীয়, কামবীর্য্য ও কামচারী হইলেন? আমার এই সকল বিষয় শ্রবণ করিতে নিতান্ত কৌতূহল জন্মিয়াছে, যদি পুরাণে বর্ণিত থাকে, কীর্ত্তন কর।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাশয়! আপনি আমাকে যাহা জিজ্ঞাসা করিতেছেন, পুরাণে এই সমস্ত বর্ণিত আছে, আমি সংক্ষেপে কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। কোন সময়ে প্রজাপতি কশ্যপ পুৎত্রবাসনায় এক মহাযজ্ঞ আরম্ভ করেন। তাঁহার যজ্ঞানুষ্ঠানকালে ঋষিগণ, দেবগণ ও গন্ধর্ব্বগণ সাহায্যদান করিবার নিমিত্ত তথায় সমাগত হইয়াছিলেন। মহর্ষিকশ্যপ দেবরাজ ইন্দ্রকে এবং বাললিখ্য মুনগণ ও অন্যান্য দেবতাদিগকে যজ্ঞীয় কাষ্ঠভার আহরণ করিতে নিয়োগ করিলেন। ইন্দ্র আপন বীর্য্যানুরূপ প্রচুর কাষ্ঠভার আনয়নকালে পথিমধ্যে দেখিলেন, অঙ্গুষ্ঠ-প্রমাণ বালখিল্যগণ সকলে সমবেত হইয়া বহুকষ্টে একটি পত্রবৃন্ত আহরণ করিতেছেন। তাঁহারা অতি খর্ব্বাকৃতি, দুর্ব্বল ও নিরাহার; সুতরাং জলপূর্ণ এক গোষ্পদে মগ্ন হইয়া ক্লেশ পাইতেছিলেন। বলদৃপ্ত পুরন্দব্রতদ্দর্শনে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া তাঁহাদিগকে উপহাস ও অবমাননা করিলেন এবং লঙ্ঘন করিয়া অতি সত্বর-পদে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। ঋষিগণ এইরূপে অবমানিত হইয়া সাতিশয় রোষাবিষ্ট হইলেন এবং ইন্দ্রের ভয়াবহ এক অতি মহৎ যজ্ঞ আরম্ভ করিলেন। তাঁহারা ঐ যজ্ঞে এই কামনায় আহুতি প্রদান করিতে লাগিলেন যে, আমাদিগের তপঃপ্রস্তাবে ইন্দ্র হইতে অধিকতর শৌর্য্যবীর্য্য-সম্পন্ন, কামরূপী, কামবীর্য্য, কামগামী, সর্ব্বদেবের অধিপতি অন্য এক দারুণ ইন্দ্র উৎপন্ন হউন।
দেবরাজ ইন্দ্র তাহা জানিতে পারিয়া প্রজাপতি কশ্যপের শরণাগত হইলেন। কশ্যপ ইন্দ্রেমুখে সমুদয় বৃত্তান্ত অবগত হইয়া বালখিল্য মুনিগণের নিকট গমন করিয়া কার্য্যসিদ্ধির প্রার্থনা করিলেন। সত্যবাদী বালখিল্য মুনিগণ তৎক্ষণাৎ “অভীষ্টসিদ্ধি হইবে” এই কথা বলিলেন। তখন প্রজাপতি কশ্যপ তাঁহাদিগকে মধুর-সম্ভাষণে পরিতৃপ্ত করিয়া সাদর বচনে কহিতে লাগিলেন, “দেখ, ব্রহ্মার নিয়োগক্রমে ইনি ত্রিভুবনের ইন্দ্র হইয়াছেন, তোমরা আবার ইন্দ্রান্তর প্রার্থনা করিতেছ, তাহা করিলে ব্রহ্মার নিয়ম অন্যথা করা হইবে, কিন্তু তোমাদিগের সঙ্কল্প মিথ্যা হয়, ইহাও আমার অভিপ্রেত নহে; অতএব তোমরা যে ইন্দ্রের নিমিত্ত কামনা করিতেছ, তিনি পতগেন্দ্র হউন। হে ঋষিগণ! দেবরাজ প্রার্থনা করিতেছেন, তোমরা তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হও।” এইরূপ অভিহিত হইয়া বালখিল্যগণ কশ্যপকে যথাবিধি পূজা করিয়া প্রত্যুত্তর করিলেন, “হে প্রজাপতে! আমরা ইন্দ্রার্থে এবং তোমার পুৎত্রার্থে এই মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছি, এক্ষণে এই কর্ম্মের ভার তোমার প্রতি অর্পিত হইল, তুমিই ইহা প্রতিগ্রহ করিয়া যাহা শ্রেয়স্কর হয়, করি।”
ঐকালে কল্যাণবতী, কীর্ত্তিমতী, ব্রতপরায়ণা, দক্ষসুতা বিনতা দীর্ঘকাল তপোনুষ্ঠান করণানন্তর ঋতুস্নান করিয়া পুৎত্র বাসনায় স্বামিসন্নিধানে আগমন করিলেন। মহর্ষি কশ্যপ বিনতাকে সন্নিহিতা দেখিয়া কহিলেন, “দেবি! অদ্য তোমার মনোরথ পূর্ণ হইবে, বালখিল্য মুনিগণের তপঃপ্রভাবে ও আমার সঙ্কল্পবলে তোমার গর্ভে মহাভাগ ও ভুবনবিজয়ী দুই বীর পুৎত্র জন্মিবে। তাহারা ত্রিভুবন-পূজিত ও ত্রিলোকীর অধীশ্বর হইবে। তুমি প্রমাদশূন্য হইয়া এই সুমহোদয় গর্ভধারণ কর। সর্ব্বলোক সৎকৃত কামরূপী ঐ দুই বিহঙ্গম সমস্ত পক্ষিজাতির উপর ইন্দ্রত্ব করিবে।” অনন্তর মহর্ষি কশ্যপ অতিপ্রীতমনে ইন্দ্রকে কহিলেন, “সেই দুই মহাবীর্য্য বিহঙ্গম তোমার ভ্রাতা ও সহায় হইবে এবং তাহারা তোমার কখন কোন অপচয় করিবে না। তোমার সকল সন্তাপ দূর হউক, তুমিই ইন্দ্র থাকিবে, কিন্তু হে বৎস! তুমি অহঙ্কারপরতন্ত্র হইয়া যেন আর কদাচ ব্রহ্মবাদী ঋষিদিগকে পরিহাস বা অবমাননা করিও না। তাঁহাদিগের বাক্য বজ্রস্বরূপ এবং তাঁহারা অতিশয় কোপনস্বভাব।”
দেবরাজ ইন্দ্র মহর্ষি কশ্যপ কর্ত্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া নিঃশঙ্কচিত্তে সুরলোকে প্রস্থান করিলেন। বিনতাও চরিতার্থ হইয়া পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন। পরে কশ্যপ-বনিতা বিনতা যথাকালে অরুণ ও গরুড় নামে দুই পুৎত্র প্রসব করিলেন। অরুণ অঙ্গবৈকল্য-প্রযুক্ত সূর্য্যের সারথি হইয়াছেন, তদীয় ভ্রাতা গরুড় পক্ষিগণের ইন্দ্রত্বপদে অভিষিক্ত হইয়াছেন। হে ভৃগুনন্দন! সেই বিনতানন্দন গরুড়ের অতি বিচিত্র চরিত্র কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।

দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
গরুড়সহ দেবগণের যুদ্ধ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে দ্বিজেন্দ্র! দেবতারা সকলে সমবেত হইয়া অতি সাবধানে অমৃত রক্ষা করিতেছেন, এই অবসরে গরুড় অতিসত্বর তাঁহাদিগের নিকট উপস্থিত হইলেন। দেবতারা সেই মহাবল গরুড়কে দেখিয়া ভীত ও কম্পিত হইলেন এবং আপনারাই পরস্পর অস্ত্রাঘাত করিতে লাগিলেন। তথায় অপ্রমেয়-বল ও অগ্নির ন্যায় উজ্জ্বল বিশ্বকর্ম্মাও অমৃতরক্ষার্থে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি মুহূর্ত্তকাল গরুড়ের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম করিয়া পরিশেষে তদীয় পক্ষ, নখ ও চঞ্চুপুট দ্বারা ক্ষত-বিক্ষত ও মূর্চ্ছিত হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইলেন। পরে গগনচারী বিহগরাজ পক্ষপবনে ধূলিপ্রবাহ উত্থাপিত করিয়া সমস্ত লোক ও দেবগণকে আচ্ছন্ন করিলেন। দেবতারা ধূলিজালে আকীর্ণ হইয়া মোহপ্রাপ্ত হইলেন এবং তৎকালে অমৃতরক্ষকেরাও অন্ধপ্রায় হইলেন। এইরূপে গরুড় দেবলোক আলোড়িত করিয়া পক্ষতাড়ন ও তুণ্ডপ্রহারে দেবগণকে বিদীর্ণকলেবর করিলেন। তখন সহস্রলোচন ইন্দ্র পবনকে আদেশ করিলেন, “দেখ পবন! তুমি এই রজোবর্ষণ নিরাকরণ [অপসারণ, দূরীকরণ] কর, ইহা তোমারই কর্ম্ম।” বায়ু তৎক্ষণাৎ তাহা অপসারিত করিলেন।
অনন্তর অন্ধকার নিরস্ত হইলে দেবগণ পক্ষিরাজ গরুড়কে প্রহার করিতে আরম্ভ করিলেন। সুরগণ বধ করিতে উদ্যত হইলে মহাবলপরাক্রান্ত গরুড় মহামেঘের ন্যায় সর্ব্বভূত-ভয়ঙ্কর ঘোরতর গর্জ্জন করিতে করিতে নভোমণ্ডলে উত্থিত হইলেন। দেবতারা গরুড়কে অন্তরীক্ষে আরূঢ় দেখিয়া পট্টিশ, পরিঘ,শূল, গদা, প্রজ্বলিত ক্ষুরপ্র ও সূর্য্যাকৃতি চক্র ইত্যাদি নানা শস্ত্র দ্বারা তাঁহাকে আকীর্ণ করিলেন।
পক্ষিরাজ গরুড় দেবগণ কর্ত্তৃক এইরূপে আহত হইয়াও তুমুল সংগ্রাম করিতে কিছুমাত্র বিচলিত বা সঙ্কুচিত হইলেন না; বরং পক্ষদ্বয়ও বক্ষঃস্থলের অধিকতর আঘাতে তাঁহাদিগকে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত করিলেন। সুরগণ এইরূপে গরুড়যুদ্ধে পরাভূত ও রুধিরাক্ত-কলেবর হইয়া পলায়ন করিতে লাগিলেন। গন্ধর্ব্ব ও সাধ্যগণ পূর্ব্বদিকে, রুদ্র ও বসুগণ দক্ষিণদিকে, আদিত্যগণ পশ্চিমদিকে এবং অশ্বিনীকুমার দুইজনে উত্তরদিকে প্রস্থান করিলেন।
অনন্তর পতগেন্দ্র গরুড় অশ্বক্রন্দ, রেণুক, ক্রথন, তপন, উলুক, শ্বসন, নিমেষ, প্ররুজ ও পুলিন এই সমস্ত যক্ষের সহিত ঘোরতর যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। প্রলয়কালে মহাদেব রোষপরবশ হইলে যেরূপ অতি ভীষণ হয়েন, বিনতানন্দনও সেইরূপ অত্যুগ্র হইয়া পক্ষ. নখ ও তুণ্ডাগ্র দ্বারা সকলকে ছিন্ন-ভিন্ন করিলেন। সেই মহাবল মহোৎসাহ বীরপুরুষেরা ক্ষত-বিক্ষত হইয়া রুধিরবর্ষী ধারাধরের [মেঘ] ন্যায় শোভমান হইলেন।
খগেশ্বর সেই সমস্ত যক্ষদিগের প্রাণ-সংহার করিয়া, যেস্থানে অমৃত রহিয়াছে, তথায় উপস্থিত হইলেন এবং দেখিলেন, অমৃতের চতুষ্পার্শ্বে অগ্নি প্রজ্বলিত হইতেছে। সেই অগ্নির শিখা অতি ভয়ঙ্কর এবং তদ্দ্বরা আকাশমণ্ডল আচ্ছন্ন হইয়াছে, দেখিলে বোধ হয় যেন, বিভাবসু বায়ু কর্ত্তৃক প্রেরিত হইয়া সূর্য্যদেবকে দগ্ধ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। অনন্তর মহাত্মা গরুড় শতাধিক অষ্টসহস্র মুখ নির্গত করিলেন এবং ঐ সকল মুখ দ্বারা নদী পান করিয়া প্রবলবেগে তথায় আগমনপূর্ব্বক নদীজলে ঐ জ্বলন্ত অনল নির্ব্বাণ করিলেন। অগ্নি নির্ব্বাণ হইলে গরুড় তাহার মধ্যে প্রবেশ করিবার নিমিত্ত অন্য এক শরীর ধারণ করিলেন।

ত্রয়স্ত্রিংশ অধ্যায়
গরুড়ের অমৃতহরণ-গরুড়ের বিষ্ণুবাহনত্বলাভ
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, পক্ষিরাজ অতি ভয়ঙ্কর স্বর্ণময় কলেবর ধারণ করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিলেন এবং দেখিলেন, অমৃতের নিকট লৌহময় ক্ষুরের ন্যায় তীক্ষ্ণধার একখানি শাণিত চক্র নিরন্তর ভ্রমণ করিতেছে। অগ্নিতুল্য প্রদীপ্ত ও সূর্য্যসম তেজস্বী ঐ ঘোররূপ যন্ত্র অমৃতহরণার্থ আগত ব্যক্তিব্যূহের [ব্যুহাকারে সুরক্ষিত লোকদিগের] কণ্ঠনালী ছেদন করিবার নিমিত্ত নিম্মিত হইয়াছে। গরুড় অঙ্গসঙ্কোচপূর্ব্বক ক্ষণমাত্রেই তাহার মধ্যাবকাশ [মধ্যের সামান্য ফাঁক] দ্বারা প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, সেই চক্রের অধঃস্থলে জ্বলন্ত অগ্নির ন্যায় উজ্জ্বল, মহাবীর্য্য, মহাঘোর, নিয়ত ক্রুদ্ধ ও নির্নিমেষনেত্র দুই সর্প অমৃত রক্ষা করিতেছে। তাহাদিগের বিদ্যুতের ন্যায় মুখ হইতে অনবরত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইতেছে এবং চক্ষুদ্বয় নিরন্তর বিষ উদ্‌গার করিতেছে। তাহাদিগের একতর যাহার প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করে, সে তৎক্ষণাৎ ভস্মসাৎ হইয়া যায়। তখন বিহঙ্গমরাজ ধূলিনিক্ষেপপূর্ব্বক ঐ উভয় সর্পের নয়নদ্বয় আচ্ছন্ন করিলেন এবং অদৃশ্যভাবে আকাশ হইতে তাহাদিগের কলেবর ছিন্ন-ভিন্ন করিয়া অমৃতগ্রহণপূর্ব্বক অতি দ্রুতবেগে গগনমণ্ডলে উত্থিত হইলেন। কিন্তু তিনি স্বয়ং অমৃতপান না করিয়া সূর্য্যপ্রভা আবরণপূর্ব্বক অপরিশ্রান্তমনে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন।
বিনতানন্দন অমৃত হরণ করিয়া আকাশপথে গমন করিতেছেন, এই অবসরে অবিনাশী দেবাদিদেব নারায়ণের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎকার হইল। নারায়ণ গরড়ের লোকাতিশায়িনী ক্রিয়া দর্শনে পরম সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, “হে বিহঙ্গরাজ! প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে অভিলষিত বর প্রদান করিব।” গরুড় কহিলেন, “আমি আপনার উপরিভাগে অবস্থান করিতে বাসনা করি।” এই বলিয়া পুনর্ব্বার নারায়ণকে কহিলেন, “আর আমি যাহাতে অমৃতপান ব্যতিরেকে অজর ও অমর হইতে পারি, এইরূপ বর প্রদান করুন।” বিষ্ণু কহিলেন, “তোমার অভীষ্ট সিদ্ধ হউক।” তখন গরুড় আপনার অভিলষিত বরলাভ করিয়া নারায়ণকে কহিলেন, “ভগবন্! প্রার্থনা কর, আমিও তোমাকে বর প্রদান করিব।” নারায়ণ মহাবল গরুড়কে কহিলেন, “তুমিও আমার বাহন হও” এবং স্বপ্রদত্ত বরের অন্যথা না হয়, এইজন্য পুনর্ব্বার কহিলেন, “তোমাকে আমার রথের ধ্বজ হইয়া থাকিতে হইবে।” পতগেশ্বর “তথাস্তু” বলিয়া বায়ুবেগে গমন করিলেন।
দেবরাজ ইন্দ্র অমৃতাপহারক পক্ষীকে অন্তরীক্ষে গমন করিতে দেখিয়া রোষভরে বজ্র প্রহার করিলেন। গরুড় বজ্রাঘাতে আহত হইয়াও হাস্যমুখে কহিলেন, “দেখ দেবরাজ! বজ্রাঘাতে আমার কিছুমাত্র ব্যথা জন্মে নাই; কিন্তু যে মুনির অস্থি হইতে এই বজ্রের উৎপত্তি হইয়াছে, তাঁহার, বজ্রাস্ত্রের ও তোমার সম্মানের নিমিত্ত আমি একটি পক্ষ পরিত্যাগ করিতেছি, এই পক্ষের অন্ত নাই।” এই বলিয়া পক্ষিরাজ একটি পক্ষ পরিত্যাগ করিলেন। দেবগণ ঐ উৎসৃষ্ট পক্ষটি অতি সুন্দর দেখিয়া হৃষ্টমনে কহিলেন. “এই পর্ণ (অর্থাৎ পক্ষ) অতি সুন্দর, অতএব অদ্যাবধি গরুড়ের নাম সুপর্ণ হইল।” সহস্রাক্ষ ইন্দ্র এইরূপ অত্যাশ্চর্য্য ব্যাপার দর্শনে বিস্মিত হইয়া মনে করিলেন, এই পক্ষী সামান্য পক্ষী নহে, ইনি অবশ্যই কোন মহাপ্রাণী হইবেন। এইরূপ কল্পনা করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, “ওহে বিহঙ্গম! আমি তোমার অলৌকিক বলবীর্য্য জানিতে এবং অনন্ত কালের নিমিত্ত তোমার সহিত মিত্রত্ব সংস্থাপন করিতে বাসনা করি।”

চতুস্ত্রিংশ অধ্যায়
ইন্দ্রের সহিত গরুড়ের মিত্রতা
গরুড় কহিলেন, “হে দেবরাজ! তোমার স্বেচ্ছাক্রমে অদ্যাবধি তোমার সহিত আমার মিত্রত্ব-সংস্থাপন হইল। আমার বল নিতান্ত দুঃসহ ও একান্ত মহৎ। যদিচ স্বকীয় গুণকীর্ত্তন ও বল-প্রশংসা করা পণ্ডিতমণ্ডলীর অনুমোদিত নহে, বিশেষতঃ অকারণে আত্মপ্রশংসা অতিশয় অন্যায়, তথাপি তুমি আমার সখা এবং আগ্রহাতিশয়সহকারে জিজ্ঞাসা করিতেছ, এই নিমিত্ত কহিতে প্রবৃত্ত হইলাম, শ্রবণ কর। আমার বলের কথা অধিক কি বলিব, আমি পর্ব্বতকাননাদিসহিতা এই সসাগরা বসুন্ধরাকে অক্লেশে একপক্ষে বহন করিতে পারি। আর যদি তুমি ঐ পক্ষ অবলম্বন কর, তবে তোমাকেও লইয়া যাইতে পারি। চরাচর বিশ্বকে বহন করিতে হইলেও আমার কিছুমাত্র পরিশ্রম বোধ হয় না।”
গরুড় এইরূপে স্বীয় বলের পরিচয় প্রদান করিলে সর্ব্বলোকহিতকারী দেবরাজ কহিলেন, “হে বিহঙ্গরাজ! তুমি যাহা কহিলে, তোমাতে সকলই সম্ভব; এক্ষণে আমার সহিত সখ্যসংস্থাপন কর এবং অমৃতে যদি প্রয়োজন না থাকে, তবে আমাকে প্রত্যর্পণ কর; এই অমৃত যাহাদিগকে অর্পণ করিবে, তাহারাই আমাদিগের উপর উপদ্রব করিবে।” গরুড় কহিলেন, “হে সহস্রলোচন! আমি কোন কারণবশতঃ এই অমৃত লইয়া যাইতেছি, প্রার্থনা করিলে ইহার বিন্দুমাত্রও কাহাকে প্রদান করিব না; কিন্তু আমি যেস্থানে ইহা রাখিব, তুমি তৎক্ষণাৎ তথা হইতে অপহরণ করিও।” ইন্দ্র কহিলেন, “হে বিহঙ্গরাজ! আমি তোমার এই কথা শ্রবণ করিয়া যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইলাম, এক্ষণে আমার নিকটে অভিলষিত বর প্রার্থনা কর।” তখন গরুড় কদ্রুপুৎত্রদিগের দৌরাত্ম্য ও মাতার ছলকৃত দাসীভাব স্মরণ করিয়া কহিলেন, “আমি সকলের ঈশ্বর হইয়াও তোমার নিকট বর প্রার্থনা করিতেছি, যেন মহাবল সর্পসকল আমার ভক্ষ্য হয়।” দানবনিসূদন ইন্দ্র “তথাস্তু” বলিয়া দেবদেব যোগীশ্বর মহাত্মা হরির নিকট গমন করিলেন। চক্রপাণি দেবরাজ-মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া গরুড়াভিলষিত বিষয়ে অনুমোদন করিলেন।
বিনতার দাস্যমুক্তি
অনন্তর ভগবান্ ত্রিদশেশ্বর গরুড়কে পুনর্ব্বার কহিলেন, “তুমি অমৃত স্থাপন করিলেই আমি তাহা অপহরণ করিব।” এই বলিয়া সাদর-সম্ভাষণে তাঁহাকে বিদায় দিলেন। গরুড় অনতিবিলম্বে স্বীয় জননী-সন্নিধানে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক হৃষ্টমনে সর্পদিগকে কহিলেন, “এই আমি অমৃত আহরণ করিয়াছি; এক্ষণে ইহা এই কুশের উপর রাখিতেছি, তোমরা শীঘ্র স্নানপূজা করিয়া পান কর। দেখ, তোমরা যাহা কহিয়াছিলে, তাহা আমি সম্পাদন করিলাম; অতএব অদ্যাবধি আমার মাতা দাস্যবৃত্তি হইতে মুক্ত হউন।” সর্পগণ “তথাস্তু” বলিয়া স্নান করিতে গমন করিল। এই অবসরে দেবরাজ ইন্দ্র অমৃত অপহরণ করিয়া স্বর্গে প্রস্থান করিলেন। সর্পেরা স্নান, পূজা ও মঙ্গলাচরণ সমাপন করিয়া প্রফুল্লমনে অমৃতপান করিতে আসিয়া দেখিল, গরুড় যে কুশাসনে অমৃত রাখিব বলিয়াছিলেন, তথায় অমৃত নাই। পরে বিবেচনা করিল, আমরা যেমন ছলক্রমে বিনতাকে দাসী করিয়াছিলাম, তেমনি ছলে অমৃত হরণ করিয়াছে। তখন নাগগণ এই স্থানে অমৃত রাখিয়াছিল, এই বিবেচনা করিয়া সেই কুশাসন অবলেহন করিতে লাগিল। তাহাতেই তাহাদিগের জিহ্বা দুই খণ্ডে বিভক্ত হইয়াছে এবং পরম পবিত্র অমৃত কুশে সংস্পৃষ্ট হইয়াছিল বলিয়া তদবধি কুশের নাম পবিত্র হইয়াছে। মহাত্মা গরুড় এইরূপে অমৃতের হরণ ও আহরণ করিয়াছিলেন এবং সর্পদিগকে দ্বিজিহ্ব [দুইটি জিহ্বাযুক্ত] করিয়াছিলেন।
অনন্তর খগরাজ পরিতুষ্ট-মনে সেই কাননে বিহার করিয়া ভুজঙ্গমগণ ভক্ষণপূর্ব্বক স্বীয় জননী বিনতাকে আনন্দিত করিলেন। যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণগণ-সন্নিধানে এই অপূর্ব্ব উপাখ্যান শ্রবণ বা পাঠ করিবে, সে মহাত্মা খগরাজ গরুড়ের চরিত-কীর্ত্তন-প্রযুক্ত পাপস্পর্শশূন্য হইয়া স্বর্গারোহণ করিবে, সন্দেহ নাই।




2 comments
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger