সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

মনোযোগ দিয়ে পড়ুন

প্রতিটি মুহূর্ত চলাফেরা অথবা কাজ করার সময় ভগবানের নাম মনে মনে স্মরন করুন বা জপ করুন এবং মনে প্রানে বিশ্বাস করুন ভগবান আমাকে রক্ষা করবেন সমস্ত বিপদ আপদ হতে । তাহলে নিজেই দেখতে পাবেন কিভাবে কত বিপদ হতে আপনারা রক্ষা পাচ্ছেন তবে অবশ্যই সৎ থাকতে হবে । ভগবান আমাদের হাজারো বিপদে ফেলে পরীক্ষা করেন এবং সতর্ক করে দেন আর এসব পরীক্ষা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় একান্ত ভাবে ভগবান কে স্মরন করেই ।

আর চেষ্টা করুন প্রতিদিন একটি করে হলেও শ্রীমদভগবত গীতার শ্লোক পরতে এবং তা মনোযোগ দিয়ে তার অন্ত নিহিত অর্থ বুঝতে । শ্রীমদভগবত গীতা কে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মুখস্ত বা রিডিং পড়ে পূন্য অর্জন করার জন্য দেয়নি । এর মাধ্যমে দিয়েছে মানব কল্যানের পথ, দিয়েছে আত্মত্বত্ত লাভের পন্থা , দিয়েছে চির মুক্তির পন্হা , দিয়েছে কিভাবে চলতে হবে তার নির্দেশ, দিয়েছে ভগবানকে পাবার পন্হা , দিয়েছে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর , জীবনে চলার সঠিক রাস্তা । তাহলে কেন শুধু পুন্য অর্জনের জন্য মুখস্ত করছেন বা না বুঝে শুধু পড়ে যাচ্ছেন ?

আর আপনি নিজে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন মন্দিরে গিয়ে পাঠ শুনুন মন্দিরে গিয়ে এখানে সখানে বসে আড্ডা না মেরে । এবং যাদের ছেলে মেয়ে আছে তাদেরকেও নিয়মিত মন্দিরে নিয়ে যান । ধর্মীয় গ্রন্থ পড়তে উৎসাহ দিন এবং তাদের সনাতনের এই বিশাল জ্ঞানভান্ডার কে জানান এবং নিজে জানুন । তবেই বৃদ্ধ বয়সে আপনার সন্তান আপনাকে ছেড়ে যাবে না অবহেলা করবে না । আপনার সন্তানদের সংস্কার দিন ও নিজেও সংস্কার জানুন । তবেই আপনার সন্তান তা লালন করবে ও ধারন করবে । তবেই সে ধর্মান্তরিত হবে না । মনে রাখবেন সন্তান আপনার কাছে যা শিখবে তাই লালান করবে । তাই নিজে মানুষ আপনার সন্তান এমনিতেই মানুষ হবে ।

নিজের ধর্মকে জানার চেষ্টা করুন তবেই আপনাকে বিধর্মীদের প্রশ্ন শুনে বিবর্ত হতে হবে না । তখন তাদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর গুছিয়ে সুন্দর করে বোঝাতে পারবেন তখন তারাও বুঝবে ও অন্যকে বিরক্ত করবে না এবং নিজেও গর্ববোধ করবেন নিজেকে সনাতনী হিন্দু ভেবে । নিজে জানুন অন্যকে জানান ।

আর একটা কথা মনে রাখবেন সনাতন ধর্মে জাত প্রথা আছে এবং থাকবে তবে কখনই তা জম্মের ভিত্তিতে নয় তা হলো কর্মের ভিত্তিতে আর সেখানে কোন উচু জাত নিচু জাতের স্থান নেই । যার ব্রহ্ম জ্ঞান আছে বিদ্বান ও সৎ চরিত্রের অধিকারী তাকেই বলা হয় ব্রাহ্মন , এটা জম্মগত কোন অধিকার নয় । যিনি দেশ শাষন ও দেশ রক্ষার কাজে নিয়োজিত তিনি ক্ষত্রিয়, যেমনঃ সেনাবাহিনী , সরকার যা যে কেউ হতে পারে । যিনি ব্যবসা করেন তিনি বৈশ্য অর্থাৎ, টাটা আম্বানির মত ব্যবসায়ীরা । আর শুদ্র হলো যারা সেবা কাজে নিয়োজিত, যেমনঃ ডাক্তার, নার্স, আইনজীবী । সকলকেই কর্মের মাধ্যমেই ভাগ করা হয়েছে তবে কেন উচু জাত নিচু জাত এর কুসংস্কার নিয়ে বসে আছেন ? তাই বলি আগে জানুন তরে ব্যবহার করুন ।

লজ্জায় নয় ,গর্ব করে বলুন আমি হিন্দু আমি সনাতন ।

লিখেছেনঃ অমিত সরকার শুভ
1 comments

শ্মশানে কেন মা কালীর পূজা হয় ?


“শ্মশান” শব্দের অর্থ- শম স্থান । মৃত স্থান । চলতি কথায় যেখানে শবদাহ করা হয় সেই ক্ষেত্র শ্মশান ভূমি নামে পরিচিত । করালবদনী আদ্যাশক্তি মায়ের বিচরণ ক্ষেত্র এই শ্মশান । মা কালীকে ধ্বংসের দেবী বলা হয়। এই “ধ্বংস” বলতে সর্বনাশ করা নয়। এর অর্থ- “সংহরন” অর্থাৎ দেবী নিজেই এই সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড রচনা করেছেন- আবার তিনিই গুটিয়ে নেন। ঠিক যেমন মাকড়শা নিজেই জাল বোনে আবার নিজেই গুটিয়ে নেয় । জীব কর্মফল ভোগান্তে মায়ের কোলে আশ্রয় পেয়ে পায় অসীম শান্তি ও আনন্দ । এই শ্মশান তাই মাকালীর ক্রীড়া ক্ষেত্র ।
শ্মশান কে বৈরাগ্যভূমি বলা হয়। শ্মশানকে তপঃ সাধনার ভূমি বলা হয় । ১০ মিনিট শ্মশানে বসে থাকলে জড় দেহের নশ্বরতার প্রতিচ্ছবি আমাদের চোখের সামনে আসে। জীব তাঁর খাঁচা নিয়ে বড়ই অহংকার করে , কিন্তু খাঁচা থেকে পাখী মুক্ত হলে খাঁচা শ্মশানে এক মুঠো ভস্মে পরিণত হয়। জ্ঞানী গণ এই তত্ত্ব উপলব্ধি করে দেহ সুখ বিসর্জন দিয়ে সাধন ভজনে মন দেয়। শ্মশান কেই তাই তপঃ সাধনার কেন্দ্র করে বহু যুগ থেকে অনেক সাধক সাধিকারা সাধন ভজনে নিমগ্ন হয় । মৃত্যু কাউকে ছাড়ে না। এক রূপবতী অপ্সরা তুল্যা কন্যার মৃত্যুর হলে শ্মশানে তার দেহ এক মুঠো ভস্ম হয়- অপরদিকে এক কুৎসিত চেহারা বিকৃত ব্যাক্তির মৃত্যু হলে তাঁর শ্মশানে দেহের পরিণতি এক মুঠো ছাই। মৃত্যুর কাছে কোন ভেদাভেদ নেই। ধনী গরীব নির্ধন কাঙ্গাল সকলের মৃত্যুর পর দেহ ভস্মেই পরিণত হয় । সাধু গণ এই তত্ত্ব জানেন। কালের করাল গ্রাস থেকে কারোর মুক্তি নেই। তাই কালের কাল মহাকালকে গ্রাসকারীনি আদ্যাশক্তি মহামায়া কালীর উপাসনাতেই নিমগ্ন হন ।
কাম, ক্রোধ, লোভ, হিংসা, অহংকার, বাসনা গ্রস্ত এই শরীর । আত্মার এই সকল বোধ নেই। দেহান্তে এই রিপুগণের ক্রীড়া ক্ষেত্র শরীর টি জলন্ত চিতাতে ভস্ম হয়। রিপু গনের নাশ হলেই সাধকের মনে বৈরাগ্য জাগ্রত হয়। তাই এই রিপুর খেলার মাঠ শরীর টি জলন্ত চিতায় দগ্ধ হয় বলে মা কালী শ্মশানে বিরাজ করেন। মা তারা দেবী জলন্ত চিতায় অধিষ্ঠান করেন । ভগবতী ছিন্নমস্তা পদতলে মদন রতি দলিতা করেন । এই হোলো শ্মশানের পরিচয় । শ্মশান মন্দিরের মতোই পবিত্র। মন্দিরে শাস্ত্র পাঠ করে জড় দেহের পরিণামের কথা বলা হয়। শ্মশানে গেলে সেটার জীবন্ত উদাহরণ সচক্ষে দেখা যায়। তাই শ্মশান মা কালীর এত প্রিয় স্থান ।
ছবিটি আমার বন্ধু পিন্টু দাস বানিয়েছেন
0 comments

শ্রীকৃষ্ণই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু


আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের তাৎপর্য সমন্বিত ভগবদ্গীতা যথাযথ যাঁরা পাঠ করেছেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে জানতে পেরেছেন যে, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সর্ব কারণের পরম কারণ এবং লীলা পুরুষোত্তম স্বয়ং ভগবান। গীতায় বিভিন্ন শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ যে পরম পুরষ ভগবান তার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন -
মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয় (৭/৭)
অহং সর্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে (১০/৮)
পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্ (১০/১২)
আমরা দেখতে পাই অষ্টাদশ অধ্যায় যুক্ত ভগবদ্গীতার বিভিন্ন উপদেশের মাধমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পরম ভক্ত ও সখা অর্জুনের মোহ মুক্ত করার জন্য বহুভাবে চেষ্টা করেছেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে অর্জুনকে যুদ্ধ করতে বললেন, অর্থাৎ তাঁর শরণাগত হতে বললেন। কিন্তু অর্জুনের তাতে সংশয় দেখা দিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন না তাঁর প্রকৃতপক্ষে কি করা উচিত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তা বুঝতে পেরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মাঝখানে অর্জুনকে আত্মতত্ত¡-বিজ্ঞান প্রদান করলেন, যাতে অর্জুন মোহ থেকে মুক্ত হয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ পালন করেন। প্রকৃতপক্ষে অর্জুন ছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সখা অর্থাৎ নিত্য পার্ষদ, তাই অর্জুনের মায়ার দ্বারা আচ্ছাদিত হওয়ার কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। সমগ্র মায়াবদ্ধ জীবদের মায়া থেকে মুক্তির জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর নিত্যসখা অর্জুনকে নিমিত্ত করে এই ভগবদ্গীতার জ্ঞান প্রদান করেছিলেন। তিনি সর্বপ্রথমে অর্জুনের নিকট কর্মের ব্যাখ্যা করলেনÑকর্ম, বিকর্ম ও অকর্ম। তিনি ‘অকর্ম’ অর্থাৎ নিষ্কাম কর্মের উপর গুরুত্ব আরোপ করলেন। তারপর তিনি জ্ঞানযোগের কথা বললেন। অর্থাৎ, ভগবৎ-তত্ত¡বিজ্ঞান লাভের মাধ্যমে জড় ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করে কিভাবে ব্রহ্মের ধ্যান করা যায়। তারপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে অষ্টাঙ্গ যোগের ব্যাখ্যা করলেনÑকিভাবে একজন যোগী যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম এবং অন্তিমে সমাধির স্তরে উপনীত হয়ে হৃদয়ে অবস্থিত অন্তর্যামী পরমাত্মার দর্শন লাভ করতে পারেন।
সর্ব পরিশেষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কি উপদেশ দান করলেন? ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন-
সর্বধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ \
“সমস্ত রকমের ধর্ম পরিত্যাগ করে একমাত্র আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত রকম পাপকর্মের ফল থেকে মুক্ত করে উদ্ধার করব। তুমি তার জন্য চিন্তা করো না।” (গীতা ১৮/৬৬) এই শ্লোকে ভগবান কৃষ্ণ অর্জুনকে সম্পূর্ণরূপে তাঁর শরণাগত হতে বললেন। সর্বধর্মান পরিত্যজ্য বলতে কর্মফল প্রদানকারী কর্মকাণ্ডীয় কর্মই কেবল ত্যাগ নয়, এমন কি মুমুক্ষুদের জ্ঞানযোগ এবং সিদ্ধিকামীদের অষ্টাঙ্গযোগকেও ত্যাগ করতে বলেছেন। কারণ, কর্মকাণ্ডের প্রতি আসক্ত হলে স্বর্গসুখের বাসনা, জ্ঞানের প্রতি আসক্ত হলে ব্রহ্মে লীন হয়ে যাওয়ার বাসনা এবং অষ্টাঙ্গযোগের প্রতি আসক্ত হলে অনিমা, লঘিমা, ঈশিতা, বশিতা, প্রাপ্তি আদি জড়-জাগতিক সিদ্ধি লাভের প্রতি বাসনা জাগ্রত হয়, ফলে মানব জীবনের পরম প্রাপ্তি যে কৃষ্ণপ্রেম তা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। সেই সম্বন্ধে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অন্তরঙ্গ ভক্ত উদ্ধবকে বলেছেন-
ন সাধয়তি মাং যোগো ন সাংখ্যং ধর্ম উদ্ধব।
ন স্বাধ্যায়স্তপস্ত্যাগো যথা ভক্তির্মমোর্জিতা \
“হে প্রিয় উদ্ধব! অষ্টাঙ্গযোগ, সাংখ্যযোগ, বেদ অধ্যয়ন, তপশ্চর্যা অথবা ত্যাগের মাধ্যমে আমাকে লাভ করা যায় না, একমাত্র আমার প্রতি শুদ্ধ ভক্তি অর্জন করে আমার ভক্ত অতি সহজেই আমাকে লাভ করতে পারে।”
সুতরাং কর্ম, জ্ঞান ও অষ্টাঙ্গ-যোগের দ্বারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে শরণাগতি হয় না, তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সব রকমের ধর্ম পরিত্যাগ করে সম্পূর্ণরূপে তাঁর শরণাগত হতে বলেছেন। অর্থাৎ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ভক্তিযোগের মাধ্যমে তাঁর শরণাগত হতে বলেছেন। লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে কিভাবে শরণাগত হতে হবে, সেটিই হচ্ছে ভগবদ্গীতায় অর্জুনের প্রতি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের গুহ্যতম উপদেশ এবং তা হচ্ছেÑ
মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যামী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে \
“সর্বদাই আমার স্মরণ কর, আমার ভক্ত হও, আমাকে পূজা কর এবং আমাকে প্রণাম কর। যদি তুমি তা কর, তবে নিঃসন্দেহে তুমি আমার কাছে ফিরে আসবে। আমি তোমার কাছে প্রতিজ্ঞা করছি, কেন না তুমি আমার প্রিয় সখা।” (গীতা ১৮/৬৫) সমগ্র মানব সমাজের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই গুহ্যতম বাণী যথাযথভাবে পালন করা। অর্থাৎ ভক্তিযোগের আশ্রয় গ্রহণ করে চিন্ময় কৃষ্ণলোকে লীলা পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের কাছে ফিরে যাওয়া। একবার কেউ সনাতন চিন্ময় ভগবৎ ধামে ফিরে গেলে, তাকে আর জন্ম-মৃত্যুময় ভৌতিক জগতে ফিরে আসতে হয় না।
প্রথমে অর্জুনও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ পালন করতে অস্বীকৃত হয়েছিলেন। পরিশেষে শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় অর্জুন সংশয় ও মোহ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন এবং তিনি সম্পূর্ণরূপে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হয়েছিলেন। তখন অর্জুন বলেছিলেনÑ
নষ্টো মোহ স্মৃতির্লব্ধা ত্বৎপ্রসাদান্ময়াচ্যুত।
স্থিতোহস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব \
“হে প্রিয় কৃষ্ণ! হে অচ্যুত! আমার মোহ দূরীভূত হয়েছে। তোমার কৃপায় আমার স্মৃতিশক্তি আমি পুনরায় ফিরে পেয়েছি। আমি এখন সম্পূর্ণরূপে সংশয় থেকে মুক্ত এবং তোমার উপদেশ মতো কাজ করতে আমি প্রস্তুত।” (গীতা ১৮/৭৩) শেষ পর্যন্ত অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে যুদ্ধ করেছিলেন। বহু অধার্মিক রাজাদের ধ্বংস করে ধর্মরাজ্য স্থাপনে শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছাকে পূর্ণ করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের কৃপার ফলে অর্জুুন পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ও শ্রীকৃষ্ণের পরম ভক্তরূপে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। যিনি অর্জুনের পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন, তিনি এই জীবনে পরম সৌভাগ্যশালী তো হবেনই এবং পরবর্তী জীবনে চিত-জগতে কৃষ্ণলোকে ফিরে গিয়ে নিত্যকাল শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গলাভ করবেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
দ্বাপর যুগ শেষ হয়ে এখন কলিযুগ চলছে। কলির প্রভাবে মানুষ ক্রমশ অধিক থেকে অধিকতর অধঃপতনের দিকে এগিয়ে চলেছে। নেশা, মাংসাহার, জুয়া ও অবৈধ স্ত্রীসঙ্গের প্রতি মানুষের আসক্তি বৃদ্ধির ফলে ধর্মের তিনটি অঙ্গÑতপস্যা, শৌচ ও দয়া একেবারেই বিনষ্ট হয়ে যায়, অর্থাৎ একমাত্র সত্যের অস্তিত্ব রয়েছে। ভয়ংকর কলির দ্বারা এভাবেই দ্রুত করালগ্রস্ত হওয়ার দরুন মানুষ আর কেউই ধর্মের অনুশাসন গ্রহণ করতে চায় না। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরম গুহ্যতম নির্দেশ-‘আমার শরণাগত হও’ মায়ামোহাচ্ছন্ন হয়ে সকলেই তা ভুলতে বসেছে। কলির ভয়ংকর তাণ্ডব নৃত্যের প্রভাবে অল্প-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ পারমার্থিক জ্ঞানশূন্য হয়ে মানব-জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেছে। মানুষ আহার, নিদ্রা ও স্ত্রীসঙ্গে আসক্ত হয়ে তাদের শাশ্বত, চিন্ময় স্বরূপকে ভুলে গিয়ে অনিত্য, নশ্বর জড় শরীরকেই তাদের স্বরূপ বলে মনে করতে থাকে। এই নিদারুণ শৌচনীয় অবস্থা থেকে উদ্ধারের পথ তাদের কে দেখাবে ? যার তার কথা তো মানুষ শুনবে না। সুহৃদং সর্বভূতানাম্Ñভগবান শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন সমগ্র জীবকুলের একমাত্র পরম উপকারী বন্ধু। যদি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবার এই কলিযুগে অবতীর্ণ হয়ে তাঁর পাদপদ্মে শরণাগত হবার পন্থা প্রদর্শন করেন, তবেই মায়াবদ্ধ জীবেরা ভক্তিমার্গের পন্থা গ্রহণ করবে, নচেৎ আশা নেই। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের থেকেও তাঁর একান্ত শরণাগত শুদ্ধ ভক্ত অধিকতর পরদুঃখে দুঃখী। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ঠিক করলেন, ভগবৎ-ভক্তির পন্থা আচরণের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি ভক্তশ্রেষ্ঠ শ্রীমতী রাধিকার ভাব ও কান্তি অবলম্বন করে ভক্তরূপে এই কলিযুগে শচীগর্ভসিন্ধু থেকে অবতীর্ণ হবেন। তিনি হচ্ছেন কলিযুগের মহাবদান্য অবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, যিনি পাঁচশো কুড়ি বছর পূর্বে কলিযুগের যুগধর্ম হরিনাম সংকীর্তন প্রবর্তন করবার জন্য এই শ্রীধাম মায়াপুরে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সেই সম্বন্ধে বলা হয়েছেÑ
মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য রাধাকৃষ্ণ নহে অন্য,
রূপানুগজনের জীবন।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যে স্বয়ং রাধা-কৃষ্ণের মিলিত প্রকাশ, সেই সম্বন্ধে শ্রীল স্বরূপ গোস্বামীর কড়চায় বর্ণিত হয়েছে-
রাধা কৃষ্ণপ্রণয়বিকৃতির্হ্লাদিনীশক্তিরস্মা-
দেকাত্মানাবপি ভুবি পুরা দেহভেদং গতৌ তৌ।
চৈতন্যাখ্যাং প্রকটমধুনা তদ্দ্বয়ং চৈক্যমাপ্তং
রাধাভাবদ্যুতিসুবলিতং নৌমি কৃষ্ণস্বরূপম্ \
“শ্রীরাধিকা শ্রীকৃষ্ণের প্রণয়ের বিকার-স্বরূপা; সুতরাং শ্রীমতী রাধারানী শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি। এই জন্য তাঁরা (শ্রীমতি রাধারানী ও শ্রীকৃষ্ণ) একাত্মা; কিন্তু একাত্মা হলেও তাঁরা অনাদিকাল থেকে গোলোকে পৃথক দেহ ধারণ করে আছেন। এখন (কলিযুগে) সেই দুই দেহ পুনরায় একত্রে যুক্ত হয়ে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে প্রকট হয়েছেন। শ্রীমতী রাধারানীর এই ভাব ও কান্তিযুক্ত শ্রীকৃষ্ণস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে আমি আমার প্রণতি নিবেদন করি।” (চৈঃ চঃ আদি ১/৫)
ভগবান শ্রীকৃষ্ণচন্দ্রের শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে অবতরণের কারণ প্রসঙ্গে বিদগ্ধমাধবে (প্রথমাঙ্কে দ্বিতীয় শ্লোক) শ্রীল রূপ গোস্বামী উল্লেখ করেছেনÑ
অনর্পিতচরীং চিরাৎ করুণাবতীর্ণঃ কলৌ
সমর্পয়িতুমুন্নতোজ্জ্বলরসাং স্বভক্তিশ্রিয়ম্।
হরিঃ পুরটসুন্দরদ্যুতিকদম্বসন্দীপিতঃ
সদা হৃদয়কন্দরে স্ফুরতু বঃ শচীনন্দনঃ\
“পূর্বে যা অর্পিত হয়নি, সেই উন্নত ও উজ্জ্বল রসময়ী নিজের ভক্তিসম্পদ দান করার জন্য যিনি করুণাবশত কলিযুগে অবতীর্ণ হয়েছেন, স্বর্ণ থেকেও সুন্দর দ্যুতিসমূহ দ্বারা সমুদ্ভাসিত সেই শচীনন্দন শ্রীহরি সর্বদা তোমাদের হৃদয়-কন্দরে স্ফুরিত হোন।” লীলা পুরুষোত্তম ভগবান কলিযুগের যুগধর্ম হরিনাম সংকীর্তন প্রবর্তন ও প্রচারের জন্য এই কলিযুগে যে অবতীর্ণ হবেন, তা শ্রীমদ্ভাগবত, পুরাণ, উপনিষদ আদি বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রে পরিদৃষ্ট হয়। পূর্বের কোনও প্রকার যোগ্যতা ছাড়া অকাতরে, নির্বিচারে, সকলকে দুর্লভ কৃষ্ণপ্রেম প্রদানের জন্যই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাই শ্রীল রূপ গোস্বামীপাদ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে‘মহাবদান্য অবতার’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীধাম মায়াপুরে অবতীর্ণ হয়েছিলেন ফাল্গুনী পূর্ণিমায় চন্দ্রগ্রহণচ্ছলে হরিনাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই শ্রীধাম মায়াপুরে যে-মুহূর্তে আবির্ভূত হয়েছিলেন, ঠিক সে সময়ে চন্দ্রগ্রহণের পরিসমাপ্তি হওয়াতে লক্ষ লক্ষ বৈদিক ব্রাহ্মণ ও হিন্দুরা উচ্চস্বরে বৈদিক মন্ত্র পাঠ ও সংকীর্তন করে সকলে গঙ্গাস্নান করছিল। আর সেই হরিনামের চিন্ময় শব্দতরঙ্গে দশদিক আকাশ বাতাস মুখরিত হচ্ছিল। এভাবেই মহাপ্রভু অত্যন্ত সুকৌশলে কলিযুগের যুগধর্ম সংকীর্তনের সূচনা করেন। শিশুকালে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ক্রন্দনের ছলে হরিনাম কীর্তন করাতেন। শিশুকালে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু মাঝে মধ্যে হঠাৎ কেঁদে উঠতেন। তখন পাড়া-প্রতিবেশীরা বিন্নিভাবে তাঁর ক্রন্দন থামাবার চেষ্টা করতেন, কিন্ত তিনি তাতে আরও বেশি কান্না করতেন। কিন্তু যেমাত্র হাত তালি দিয়ে সকলে মিলে উচ্চস্বরে-
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে \
এই মহামন্ত্র কীর্তন করত, তৎক্ষণাৎ শিশু নিমাই তাঁর কান্না বন্ধ করে দিয়ে হাসতে হাসতে সকলের মুখের দিকে তাকাতেন।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন দিব্যলীলা-বিলাস করছিলেন, তখন নবদ্বীপের সকলে তাঁকে নিমাই পণ্ডিত বলেই জানত। কিন্তু তিনি যে লীলা পুরুষোত্তম স্বয়ং ভগবান তা কেউ বুঝতে পারত না। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু গোপিকাশ্রেষ্ঠ শ্রীমতী রাধারানীর ভাব অঙ্গীকার করে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। একদিন তিনি কৃষ্ণপ্রেমে উন্মত্ত হয়ে ‘গোপী’ ‘গোপী’ এই নাম জপ করছিলেন। হঠাৎ তাঁর পড়–য়া ছাত্রগণ মহাপ্রভুর নিকটবর্তী হয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তিনি কৃষ্ণনাম উচ্চারণ না করে গোপীনাম উচ্চারণ করছেন? মহাপ্রভু আবেশে রাগ প্রকাশ করে ঠেঙ্গা নিয়ে তাদের পিছনে তাড়া করলেন। পরিশেষে ছাত্ররা দলবদ্ধ হয়ে মহাপ্রভুকে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অন্তর্যামী ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তা জানতে পারলেন। তিনি তখন ভাবতে লাগলেন, যদি এই সব ছাত্র তাঁর পাদপদ্মে অপরাধ করে, তবে কোনও দিনই তারা কৃষ্ণপ্রেম লাভ করতে পারবে না। অথচ শ্রীকৃষ্ণই মহাপ্রভুরূপে এসেছেন নির্বিচারে কৃষ্ণপ্রেম প্রদান করার জন্য। সকলেই যাতে তাঁকে শ্রদ্ধাভক্তি করে ব্রহ্মার দুর্লভ কৃষ্ণপ্রেম লাভ করতে পারে, তাই তিনি ঠিক করলেন গৃহস্থ-আশ্রম পরিত্যাগ করে সন্ন্যাস-আশ্রম গ্রহণ করবেন। কারণ সন্ন্যাসীকে সকলেই শ্রদ্ধাভক্তি করে।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কাটোয়ায় কেশব ভারতীর কাছ থেকে সন্ন্যাস-ধর্ম গ্রহণ করে, শান্তিপুরে অদ্বৈত আচার্যের গৃহে শোকসন্তপ্তা ও বিরহবিধূরা শচীমাতা ও আপন প্রি
য় ভক্তদের সান্ত্বনা দানের পর শচীমায়ের অনুমোদন নিয়ে যখন জগন্নাথ পুরীতে জগন্নাথ মন্দিরে এসে প্রেমে বিহŸল হয়ে শ্রীজগন্নাথদেবকে আলিঙ্গন করবার জন্য বিগ্রহের দিকে ছুটে যাচ্ছিলেন, তখন গভীর ভাবের আবেগে মেঝেতে পতিত হয়ে মূর্ছাপ্রাপ্ত হলেন। নিকটেই বেদান্ত-দর্শনের ভারত বিখ্যাত দার্শনিক পণ্ডিত সার্বভৌম ভট্টাচার্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি মহাপ্রভুর সর্বাঙ্গে এই প্রকার অলৌকিক সাত্তি¡ক বিকার দর্শন করে আশ্চার্যান্বিত হলেন এবং চিন্তা করলেন, মনুষ্য-শরীরে এই প্রকার সাত্তি¡ক প্রেমের বিকার কিভাবে প্রকাশ হতে পারে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শরীরে কোন প্রকার স্পন্দন দেখতে না পাওয়ায় সার্বভৌম ভট্টাচার্য মহাপ্রভুকে তাঁর নিজের গৃহে এনে রেখেছিলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ পার্ষদ শ্রীল গোপীনাথ আচার্য সার্বভৌম ভট্টাচার্যকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে, মহাপ্রভু হচ্ছেন স্বয়ং ঈশ্বর। কিন্তু সার্বভৌম ভট্টাচার্য তা অস্বীকার করে গোপীনাথ আচার্যকে বললেন যে, তিনি কিসের ভিত্তিতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে ঈশ্বর বলে স্বীকার করছেন, তা ছাড়া কলিযুগে ভগবানের কোনও অবতার নেই। তখন গোপীনাথ আচার্য ঈশ্বরের অন্তর ও বহির লক্ষণ ব্যাখ্যা করে শাস্ত্রে যে কলিযুগে ভগবানের অবতার আছে, তা মহাভারত (দানধর্ম বিষ্ণুসহস্রনাম-স্তোত্র) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে শোনালেনÑ
সুবর্ণবর্ণো হেমাঙ্গো বরাঙ্গশ্চন্দনাঙ্গদী।
সন্ন্যাসকৃচ্ছমঃ শান্তো নিষ্ঠাশান্তিপরায়ণঃ \
“ভগবান তপ্ত কাঞ্চনের মতো অঙ্গকান্তি ধারণ করে (গৌরসুন্দর রূপে) অবতীর্ণ হবেন। তাঁর সুন্দর রূপ তপ্ত কাঞ্চনের মতো এবং চন্দনে চর্চিত। তিনি সন্ন্যাস-আশ্রম অবলম্বন করে কঠোরভাবে আত্মসংযমী হবেন এবং মায়াবাদী সন্ন্যাসীদের মতো নির্বিশেষবাদী না হয়ে তিনি ভগবৎ-ভক্তিতে নিষ্ঠাপরায়ণ হবেন এবং সংকীর্তন আন্দোলনের সূচনা করবেন।”
পরে সার্বভৌম ভট্টাচার্য মহাপ্রভুকে সাতদিন ধরে বেদান্ত-দর্শন শ্রবণ করিয়েছিলেন। মহাপ্রভু তার ভ্রান্ত নির্বিশেষপর মায়াবাদী ব্যাখ্যা খণ্ডন করে বেদান্তের নির্ভুল সবিশেষ-তত্ত¡ ব্যাখ্যা করলেন এবং পরিশেষে তাঁকে ষড়ভুজরূপে দর্শন দান করে এক মহান ভক্তরূপে পরিণত করলেন। সার্বভৌম ভট্টাচার্য মহাপ্রভুর কৃপা প্রাপ্ত হয়ে তাঁকে একশো শ্লোকদ্বারা বন্দনা করেছিলেন। সার্বভৌম ভট্টাচার্যের মতো অনেকেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুই যে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তা জানতে পারেননি। কারণ ভগবানের কৃপা ছাড়া ভগবানকে জানা যায় না। শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র যে শচীসূতরূপে অবতীর্ণ হবেন তা ভবিষ্যৎ পুরাণেও উল্লেখ আছে-
অজায়ধ্বমজায়ধ্বজয়ধ্বং ন সংশয়ঃ।
কলৌ সংকীর্তনারম্ভে ভবিষ্যামি শচীসুতঃ \
“কলিযুগে সংকীর্তন আরম্ভে আমি শচীসূতরূপে জন্মগ্রহণ করব, জন্মগ্রহণ করব, জন্মগ্রহণ করব, সেই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।” শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (আদি ৩/৪০) উল্লেখ আছেÑ
কলিযুগে যুগধর্মÑনামের প্রচার।
তথি লাগি’ পীতবর্ণ চৈতন্যাবতার \
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখনই অবতীর্ণ হন, তখনই তিনি নবদ্বীপের অন্তর্দ্বীপে অন্তর্গত এই শ্রীধাম মায়াপুরে শচীমায়ের গর্ভে অবতীর্ণ হন। তবে শ্রীকৃষ্ণের মতো তিনিও প্রতি কলিযুগে অবতীর্ণ হন না। তিনি ব্রহ্মার দিবসে অর্থাৎ এক হাজার চতুর্যুগের মধ্যে একবার মাত্র অবতীর্ণ হন। সেই সম্বন্ধে শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (আদি ৩/১০) উল্লেখ করা হয়েছে-
অষ্টাবিংশ চতুর্যুগে দ্বাপরের শেষে।
ব্রজের সহিত হয় কৃষ্ণের প্রকাশে \
“বৈবস্বত মন্বন্তরের অষ্টাবিংশ চতুর্যুগের দ্বাপরের শেষভাগে কৃষ্ণ নিজে ব্রজতত্তে¡র সমস্ত উপকরণ সহ প্রকাশ পান।” সেই প্রকার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও দ্বাপরের পরেই কলিতেই অবতীর্ণ হন। তিনি এসে কি করেন? অনর্পিত বস্তু প্রদান করেন, যা ভগবানের অন্য কোন অবতার ইতিপূর্বে প্রদান করেননি। তা হচ্ছে কৃষ্ণপ্রেম, বিশেষ করে ব্রজের পরকীয়া মাধুর্য প্রেম, যাকে উন্নতোজ্জ্বল রস বলা হয়েছে।
0 comments

প্রহ্লাদ মহারাজ কর্তৃক সহপাঠীদের উপদেশ


প্রহ্লাদ মহারাজ, যিনি ছিলেন যথার্থই মহা জ্ঞানী, তিনি তাঁর সহপাঠীদের অত্যন্ত মধুর বাক্যে সম্ভাষণ করে, হেসে জড়-জাগতিক জীবনের নিরর্থকতা সম্বন্ধে শিক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন। তাদের প্রতি অত্যন্ত কৃপাপরবশ হয়ে, তিনি তাদের নিম্নলিখিত উপদেশগুলি দিয়েছিলেন।[৭/৫/৫৫]


হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, সমস্ত বালকেরা প্রহ্লাদ মহারাজের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত এবং শ্রদ্ধাশীল ছিল। তাদের অল্প বয়সের ফলে, দ্বৈতভাব এবং দেহসুখের প্রতি আসক্ত শিক্ষকদের উপদেশের দ্বারা তাদের অন্তঃকরণ দূষিত হয়নি। তারা তাদের খেলার সমস্ত উপকরণ পরিত্যাগ করে, প্রহ্লাদ মহারাজের কথা শ্রবণ করার জন্য তাঁকে ঘিরে বসেছিল। তাদের হৃদয় এবং নেত্র তাঁর উপর নিবদ্ধ ছিল এবং গভীর নিষ্ঠা সহকারে তারা তাঁর দিকে তাকিয়ে তাঁর কথা শুনছিল। অসুরকুলে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও প্রহ্লাদ মহারাজ ছিলেন একজন মহাভাগবত, এবং তিনি তাদের মঙ্গল কামনা করেছিলেন। তার ফলে তিনি তাদের জড়-জাগতিক জীবনের নিরর্থকতা সম্বন্ধে উপদেশ দিতে শুরু করেছিলেন। [৭/৫/৫৬-৫৭]


দৈত্যবালকদের প্রতি প্রহ্লাদের উপদেশ


প্রহ্লাদ মহারাজ বললেন-প্রাজ্ঞ ব্যক্তি মনুষ্যজন্ম লাভ করে জীবনের শুরু থেকেই, অর্থ্যাৎ বাল্যকাল থেকেই, অন্য সমস্ত প্রয়াস ত্যাগ করে ভাগবত-ধর্ম অনুষ্ঠান করবেন। মনুষ্যজন্ম অত্যন্ত দূর্লভ, এবং অন্যান্য শরীরের মতো অনিত্য হলেও তা অত্যন্ত অর্থপূর্ণ, কারণ মনুষ্য-জীবনে ভগবানের সেবা সম্পাদন করা সম্ভব। নিষ্ঠাপূর্বক কিঞ্চিৎমাত্র ভগবদ্ভক্তির অনুষ্ঠান করলেও মানুষ পূর্ণসিদ্ধি লাভ করতে পারে। [৭/৬/১]


মনুষ্য-জীবন ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার সুযোগ প্রদান করে। তাই প্রতিটি মানুষের অবশ্য কর্তব্য ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শ্রীপাদপদ্মের সেবায় যুক্ত হওয়া। এই ভগবদ্ভক্তি স্বাভাবিক, কারণ ভগবান শ্রীবিষ্ণু সকলেরই পরম প্রিয়, পরমাত্মা এবং পরম সুহৃদ্। [৭/৬/২]


প্রহ্লাদ মহারাজ বললেন-হে দৈত্য-কুলোদ্ভূত বন্ধুগণ, দেহের সঙ্গে ইন্দ্রিয়-বিষয়ের সংযোগবশত যে ইন্দ্রিয় সুখ তা যে কোন যোনিতেই পূর্বকৃত কর্ম অনুসারে লাভ হয়ে থাকে। এই প্রকার সুখ আপনা থেকেই কোন রকম প্রচেষ্টা ছাড়াই লাভ হয়, ঠিক যেমন বিনা প্রয়াসে দু:খলাভ হয়।[৭/৬/৩]




ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ অথবা অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনের মাধ্যমে জড়সুখ ভোগের প্রয়াস করা উচিত নয়, কারণ তার ফলে বাস্তবিক কোন লাভ হয় না, পক্ষান্তরে কেবল সময় এবং শক্তিরই অপচয় হয়। মানুষের প্রয়াস যদি কৃষ্ণভক্তির দিকে পরিচালিত হয়, তা হলে নি:সন্দেহে আত্ম-উপলব্ধির চিন্ময় স্তর প্রাপ্ত হওয়া যায়। অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনে যুক্ত হওয়ার ফলে কোন লাভ হয় না। [৭/৬/৪]


অতএব জড় জগতে অবস্থান কালে (ভবমাশ্রিতঃ) পূর্ণরূপে সুযোগ্য ব্যক্তির কর্তব্য সৎ এবং অসতের পার্থক্য নিরূপণ করে, যে পর্যন্ত এই পরিপুষ্ট মানব-শরীরটি রয়েছে, ততক্ষণ ভীত না হয়ে জীবনের চরম উদ্দেশ্য লাভের জন্য যত্নশীল হওয়া। [৭/৬/৫]


মানুষের আয়ু বড় জোর একশ বছর। কিন্তু যে ব্যক্তি অজিতেন্দ্রিয়, তার সেই একশ বছরের অর্ধেক সময় অনর্থক অতিবাহিত হয়, কারণ অজ্ঞানের অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে, রাত্রিবেলায় সে বার ঘন্টা ঘুমিয়ে থাকে। অতএব এই প্রকার ব্যক্তির আয়ুষ্কাল মাত্র পঞ্চাশ বছর। [৭/৬/৬]


বাল্যকালে মোহগ্রস্ত অবস্থায় দশ বছর অতিবাহিত হয়। তেমনই, কৈশোরে খেলাধুলায় মগ্ন থেকে আরও দশ বছর অতিবাহিত হয়। এইভাবে কুড়ি বছর বিফলে যায়। তেমনই, বৃদ্ধ বয়সে জরাগ্রস্ত হয়ে জড়-জাগতিক কার্যকলাপ অনুষ্ঠান করতে অক্ষম হওয়ার ফলে, আরও কুড়ি বছর বৃথা অতিবাহিত হয়। [৭/৬/৭]


যার মন এবং ইন্দ্রিয় অসংযত, তার অতৃপ্ত কামনা এবং প্রবল মোহের ফলে, পারিবারিক জীবনের প্রতি সে অত্যন্ত আসক্ত হয়। এই প্রকার উন্মত্ত ব্যক্তির বাকি জীবনও বিফলে যায়, কারণ সেই কয়টি বছরেও সে ভগবদ্ভক্তিতে যুক্ত হতে পারে না। [৭/৬/৮]


গৃহস্থ-জীবনের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত কোন্ অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি মুক্ত হতে সমর্থ হয়? গৃহাসক্ত ব্যক্তি তার স্ত্রী-পুত্র এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের প্রতি স্নেহরূপ রজ্জুর দ্বারা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ। [৭/৬/৯]


ধন মানুষের এতই প্রিয় যে, সে ধনকে মধু থেকেও মধুরতর বলে মনে করে। তাই, সে ধন সংগ্রহের বাসনা কে ত্যাগ করতে পারে, বিশেষ করে গৃহস্থ-জীবনে? তস্কর, পেশাধারী ভৃত্য (সৈনিক)এবং বণিক-এরা নিজের প্রিয়তম প্রাণকে বিপন্ন করেও অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করে।[৭/৬/১০]


যে ব্যক্তি তার পরিবারের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, যার অন্তরের অন্তঃস্থল সর্বদা তাদের চিত্রে পূর্ণ, সে কিভাবে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করতে পারে? বিশেষত, স্নেহশীলা এবং সহানুভূতিশীলা পত্নীর নির্জন সঙ্গ স্মরণ করলে, কে তাকে পরিত্যাগ করতে পারে? শিশুদের মধুর আধো আধো বুলি স্মরণ করলে কোন্ স্নেহশীল পিতা তাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করতে পারে? বৃদ্ধ পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা এরা সকলেই অত্যন্ত প্রিয়। কন্যা বিশেষ করে পিতার অত্যন্ত প্রিয় হয়, এবং যখন সে তার পতিগৃহে চলে যায়, তখন তার কথা পিতার সব সময় মনে হয়। সেই সঙ্গ কে পরিত্যাগ করতে পারে? আর তা ছাড়া গৃহে নানা রকম ভোগের উপকরণ থাকে, গৃহপালিত পশু এবং ভৃত্য থাকে। সেই সুখ কে পরিত্যাগ করতে পারে? গৃহাসক্ত ব্যক্তির অবস্থা ঠিক রেশমকীটের মতো, যে কোষ সে তৈরি করে, সেই কোষে বন্দী হয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারে না। কেবল জিহ্বা এবং উপস্থ-এই দুটি ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি সাধনের জন্য মানুষ এই জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিভাবে সে তা থেকে মুক্তিলাভ করতে পারে? [৭/৬/১১-১৩]


যে ব্যক্তি অত্যন্ত আসক্ত সে বুঝতে পারে না যে, তার কুটুম্ব ভরণ-পোষণে সে তার জীবনের মূল্যবান সময়ের অপচয় করছে। সে এও বুঝতে পারে না যে, পরম সত্যকে উপলব্ধি করার অত্যন্ত অনুকূল এই মনুষ্যজীবন সে অনর্থক নষ্ট করছে। কিন্তু, সে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা এবং সাবধানতার সঙ্গে দেখে যে, একটি পয়সাও যেন অনর্থক নষ্ট না হয়। এইভাবে জড় বিষয়াসক্ত ব্যক্তি নিরন্তর ত্রিতাপ দু:খ ভোগ করা সত্ত্বেও তার জড় অস্তিত্বের প্রতি বিতৃষ্ণা বোধ করে না।[৭/৬/১৪]


যদি কোন ব্যক্তি তার কুটুম্ব ভরণ-পোষণের কর্তব্যের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়, তা হলে সে তার ইন্দ্রিয়গুলি বশীভূত করতে পারে না এবং তার মন সর্বদাই ধন সংগ্রহের চিন্তায় মগ্ন থাকে। যদিও সে জানে যে পরের ধন অপহরণ করার ফলে সে আইনের দ্বারা দণ্ডিত হবে এবং মৃত্যুর পর যমরাজের আইনে দণ্ডভোগ করবে, তবুও সে ধন সংগ্রহ করার জন্য অন্যদের প্রতারণা করতে থাকে। [৭/৬/১৫]


হে বন্ধু, দানব-নন্দনগণ! এই জড় জগতে আপাতদৃষ্টিতে বিদ্বান ব্যক্তিরাও মনে করে, “এটি আমার এবং ওটি অন্যের।” তার ফলে তারা সর্বদাই অশিক্ষিত কুকুর-বিড়ালের মতো তাদের পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য জীবনের আবশ্যকতাগুলি প্রদান করার কাজে সর্বদা ব্যস্ত থাকে। তারা আধ্যাত্মিক জ্ঞান গ্রহণ করতে পারে না। পক্ষান্তরে তারা অজ্ঞানের দ্বারা মোহাচ্ছন্ন হয়। [৭/৬/১৬]


হে আমার বন্ধু দৈত্যনন্দনগণ, কোন দেশে অথবা কোন কালে ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞান-বিহীন ব্যক্তি নিজেকে জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত করতে পারেনি। পক্ষান্তরে সেই সমস্ত ভগবদ্বিমুখ ব্যক্তিরা জড়া প্রকৃতির নিয়মে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। তারা প্রকৃতপক্ষে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের প্রতি আসক্ত, এবং তাদের একমাত্র লক্ষ্য স্ত্রীসম্ভোগ। বস্তুতপক্ষে তারা সুন্দরী রমণীর হস্তে ক্রীড়ামৃগতুল্য। এই প্রকার জীবনের শিকার হয়ে তারা পুত্র, পৌত্র এবং প্রপৌত্রদের দ্বারা পরিবোষ্টিত হয়, এবং এইভাবে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। যারা এই প্রকার জীবনের প্রতি আসক্ত, তাদের বলা হয় অসুর। অতএব, যদিও তোমরা দৈত্যনন্দন, সেই প্রকার ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাক এবং আদিদেব ভগবান শ্রীনারায়ণের শরণ গ্রহণ কর। কারণ নারায়ণের ভক্তদের চরম লক্ষ্য জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া। [৭/৬/১৭-১৮]


হে অসুর-নন্দনগণ, পরমেশ্বর ভগবান নারায়ণই সমস্ত জীবের মূল পরমাত্মা এবং পরম পিতা। তাই তাঁকে সন্তুষ্ট করতে অথবা তাঁর আরাধনা করতে বালক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে কারুরই কোন রকম প্রতিবন্ধকতা নেই। জীব এবং ভগবানের সম্পর্ক সর্বদাই বাস্তব, এবং তাই অনায়াসে ভগবানের প্রসন্নতা বিধান করা যায়। [৭/৬/১৯]


পরম ঈশ্বর ভগবান যিনি অচ্যুত এবং অব্যয়, তিনি বৃক্ষলতা আদি স্থাবর জীব থেকে শুরু করে ব্রহ্মা পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকার জীবের মধ্যে বিরাজমান। তিনি নানা প্রকার জড় সৃষ্টিতে, জড় উপাদানে, মহত্তত্ত্বে, প্রকৃতির গুণে (সত্ত্বগুণ, রজোগুণ এবং তমোগুণ), অব্যক্ত প্রকৃতিতে এবং অহংকারেও বিরাজমান। তিনি যদিও এক, তবুও তিনি সর্বত্র বিরাজমান, এবং তিনি চিন্ময় পরমাত্মা এবং সর্বকারণের পরম কারণ, যিনি সমস্ত জীবের অন্তরে সাক্ষীরূপে বিরাজ করেন। তাঁকে ব্যাপ্য এবং সর্বব্যাপ্ত পরমাত্মা বলে ইঙ্গিত করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি বর্ণনাতীত। তিনি অবিকারী এবং অবিভাজ্য। তাঁকে কেবল পরম সচ্চিদানন্দরূপে অনুভব করা যায়। নাস্তিকদের কাছে মায়ার আবরণে আচ্ছাদিত থাকার ফলে, তারা মনে করে যে তাঁর অস্তিত্ব নেই। [৭/৬/২০-২৩]


অতএব দৈত্য কুলোদ্ভুত আমার বালক বন্ধুগণ, তোমরা সকলে এমনভাবে আচরণ কর যাতে অধোক্ষজ ভগবান তোমাদের প্রতি প্রসন্ন হন। তোমাদের আসুরিক প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করে শত্রুতা এবং দ্বৈতভাব রহিত হয়ে কর্ম কর। ভগবদ্ভক্তির জ্ঞান প্রদান করে সমস্ত জীবের প্রতি তোমাদের করুণা প্রদর্শন কর, এবং এইভাবে তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী হও। [৭/৬/২৪]


সর্বকারণের পরম কারণ, সবকিছুর আদি উৎস ভগবানের প্রসন্নতা বিধান করেছেন যে সমস্ত ভক্তেরা, তাঁদের পক্ষে কিছুই অপ্রাপ্য নয়। ভগবান অন্তহীন চিন্ময় গুণের উৎস। তাই, গুণাতীত ভক্তদের কাছে ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মুক্তির প্রচেষ্টা করার কি প্রয়োজন-যা প্রকৃতির গুণের প্রভাবে আপনা থেকেই লাভ হয়? আমরা ভগবদ্ভক্তেরা সর্বদাই ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের মহিমা কীর্তন করি, এবং তাই আমাদের ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ আদির বাসনা করার কোন প্রয়োজন হয় না। [৭/৬/২৫]


ধর্ম, অর্থ এবং কাম-এই তিনটিকে বেদে ত্রিবর্গ বা মোক্ষ লাভের তিনটি উপায় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এই তিনটি বর্গের মধ্যেই আত্ম-উপলব্ধির বিদ্যা, বৈদিক নির্দেশ অনুসারে কর্ম অনুষ্ঠানের পন্থা, তর্কশাস্ত্র, দণ্ডনীতি এবং জীবিকা নির্বাহের বিভিন্ন বৃত্তি নিহিত রয়েছে। এগুলি বেদ অধ্যয়নের বাহ্য বিষয়, এবং তাই আমি এগুলিকে জড়-জাগতিক বলে মনে করি। কিন্তু, পরম পুরুষ শ্রীবিষ্ণুর শ্রীপাদপদ্মে আত্ম-নিবেদনের পন্থাকে আমি দিব্য বলে মনে করি। [৭/৬/২৬]


সমস্ত জীবের শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সুহৃদ ভগবান প্রথমে এই দিব্য জ্ঞান দেবর্ষি নারদকে উপদেশ দিয়েছিলেন। নারদ মুনির মতো মহাত্মার কৃপা ব্যতীত এই জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করা অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু যিনি শ্রীনারদ মুনির পরম্পরার শরণ গ্রহণ করেন, তিনি এই গুহ্য জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। [৭/৬/২৭]


প্রহ্লাদ মহারাজ বললেন-এই জ্ঞান আমি দেবর্ষি নারদ মুনির কাছ থেকে প্রাপ্ত হয়েছি, যিনি সর্বদা ভগবানের সেবায় যুক্ত। এই জ্ঞান, যাকে বলা হয় ভাগবত-ধর্ম, তা সর্বতোভাবে বিজ্ঞানসম্মত। তা ন্যায় এবং দর্শনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, এবং সমস্ত জড় কলুষ থেকে মুক্ত।[৭/৬/২৮]


দৈত্যনন্দনেরা বলল-হে প্রহ্লাদ, তুমি অথবা আমরা শুক্রাচার্যের পুত্র ষণ্ড এবং অমর্ক ব্যতীত অন্য কোন গুরুকে জানি না। আমরা শিশু এবং তারা আমাদের নিয়ন্তা। বিশেষ করে তোমার পক্ষে, যে সর্বদা প্রাসাদে থাকে, তার মহাত্মার সঙ্গ করা অত্যন্ত কঠিন। হে সৌম্য, দয়া করে আমাদের বল কিভাবে তুমি নারদ মুনির উপদেশ শ্রবণ করেছিলে? দয়া করে আমাদের এই সংশয় দূর কর। [৭/৬/২৯-৩০]
0 comments

আমেরিকায় মন্দির ও হিন্দুরা

১১-ই সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩ সন। শিকাগো বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনের প্রাঙ্গন। গৈরিক বসনধারী দীর্ঘকায় এক পুরুষ মঞ্চে উঠে বললেন -  “I thank you in the name of the millions of Hindu people of all classes and sects."  দূর সাগরের পারে আমেরিকায় জনসমাজের সম্মূখে তিনি হিন্দুধর্মকে পরিচিত করালেন - "I am proud to belong to a religion which has taught the world both tolerance and universal acceptance. We believe not only in universal toleration, but we accept all religion as true." গম্ভীর মন্দ্র স্বরের বলিষ্ঠ ভঙ্গীতে স্ত্রোত্র উচ্চারণের মাধ্যমে তিনি তাঁর ভগবৎ বিশ্বাসের কথা শোনালেন উপস্থিত শ্রোতৃমন্ডলীকে - “As the different streams having their sources in different places all mingle their water in the sea, O Lord, the different paths which men take through different  tendencies, various though they appear, crooked or straight, all lead to Thee." পৌত্তলিকতার বাইরে হিন্দুধর্মের মূলকথা যে পরধর্মসহিষ্ণুতা ও মনুষ্যত্বের ভজনা, সেই কথাই বিশ্ববাসীর সামনে বলে রাখলেন, - “I fervently hope that the bell that tolled this morning in honor of this convention may be the death-knell of all fanaticism, of all persecution with the sword or with the pen, and of all uncharitable feelings between persons wending their way to the same goal." এই ব্যক্তি আর কেউই নন - তিনি পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবশিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ।

যদিও বিবেকানন্দই সেই ব্যক্তি যিনি আমেরিকার বুকে হিন্দুধর্মকে সরাসরি পরিচিত করিয়েছিলেন, কিন্তু অনেকেই একথা মনে করেন যে হিন্দুধর্মের চর্চা অভিবাসীদের মাধ্যমে এদেশে ছিল প্রায় এর জন্মলগ্ন থেকেই। যদিও এই ধারণার বাস্তব ভিত্তি কতটা, সেটা তর্কসাপেক্ষ। তবে আমেরিকানদের সঙ্গে হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির পরিচয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় আরও অনেক আগে। তৎকালীন আমেরিকার বিদ্বৎসমাজের দুই প্রতিভূ - Ralph Waldo Emerson এবং Henry David Thoreau - শ্রীমৎভাগবত গীতা নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করছিলেন সেই সময়। সেই সময়কার বিভিন্ন চিঠিপত্র ও পত্রপত্রিকায় এই দুই লেখক ভবগত গীতা সম্পর্কে তাঁদের গবেষণালব্ধ চিন্তা ও সমীক্ষার অনেক নিদর্শন রেখে গেছেন। “Over Soul” নামে একটি প্রবন্ধে Ralph-এর চিন্তায় বেদিক দর্শনের প্রভাব পরিস্কার লক্ষ্যণীয়। তাঁরা দুজনেই একমত হয়ে বলেছিলেন গীতা এশীয় সংস্কৃতির এক অনবদ্য অবদান। গীতার দার্শনিক মূল্য যেমন অনস্বীকার্য্য, তেমনি আত্মোপলব্ধি, আত্মনুসন্ধান ও আত্মসংযম অভ্যাসের ক্ষেত্রেও গীতার তাৎপর্য্য অপরিসীম। শিকাগোর বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনের প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা এসব।

বিশ্ব ধর্মসম্মেলনোত্তর স্বামী বিবেকান্দের উদ্যোগই আমেরিকার বুকে হিন্দুধর্মকে পরিচিত করানোর প্রথম সংঘবদ্ধ উদ্যোগ একথা বললে অত্যুক্তি হয় না। মন্দির তখন আমেরিকাতে ছিল না। শিকাগোর মহাসম্মেলনের পর স্বামীজী আরও বছর দুই এদেশে কাটিয়েছিলেন এবং বস্টন, ডেট্রয়েট, নিউ ইয়র্ক প্রভৃতি অঞ্চলে বক্তৃতা করেছিলেন। ১৮৯৪ সালে স্বামীজী নিউ ইয়র্কে ‘বেদান্ত সোসাইটি’ স্থাপন করলেন। বলা চলে এইটি আমেরিকার বুকে হিন্দু মন্দির স্থাপনের প্রথম ধাপ। সেই সময় এদেশীও অভিবাসীদের মধ্যে বেদান্ত-দর্শনের চর্চাই ছিল এই সোসাইটির উদ্দেশ্য। এর অব্যবহিত পরেই বাবা প্রেমানন্দ সরস্বতী আমেরিকায় থেকে প্রায় বছর পাঁচেক ধরে হিন্দু ধর্মের শিক্ষা নিয়ে বক্তৃতা করলেন এবং অবশেষে ‘কৃষ্ণসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করলেন। স্বামী পরমানন্দ বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নিউ ইর্য়ক বেদান্ত সোসাইটির দায়িত্বভার নিয়ে এলেন এবং শেষ পর্য্যন্ত বস্টন এবং লস এঞ্জেলেস-এ বেদান্ত সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করলেন।

বলা হয়ে থাকে যে আমেরিকার প্রথম হিন্দু মন্দির স্থাপিত হয়েছিল ১৯০৬ সালে সান ফ্রান্সিস্কোতে। বেদান্ত সোসাইটির উদ্যোগে। তারপর আরও দুটি মন্দিরের কথা জানা যায়। ১৯৩৮ সালে হলিউড মন্দির ও ১৯৫৬ সালে সান্টা বারবারা মন্দির। যেহেতু এই সব মন্দিরগুলো স্থাপিত হয়েছিল বেদান্ত সোসাইটির তত্বাবধানে, এদের মূল লক্ষ্য ছিল বেদান্ত দর্শন এবং হিন্দু শাস্ত্র পঠন পাঠন। বেদান্তের শিক্ষার প্রধান কথা আত্মোপলব্ধি এবং মূল মন্ত্র হল মানুষই ঈশ্বর। পৌত্তলিক বিগ্রহ পূজা বেদান্তের লক্ষ্য নয়। তাই হিন্দু ধর্মবালম্বী যে সব সম্প্রদায় শিব, বিষ্ণু, নারায়ণ ইত্যাদি বহুরুপে ঈশ্বরের ভজনায় অভ্যস্ত, তাদের স্বদেশীয় মন্দিরের ধারনার সঙ্গে বেদান্তের ধারণার তফাৎ রয়েই গেল। অভাব পূরণ হল না। দেশের মত অপরূপ স্থাপত্য- ভাস্কর্য্যের মহিমামন্ডিত বিগ্রহ মন্দির গঠনের ইচ্ছা অভিবাসীদের মনে জেগে রইল তখনকার মত। সাধ থাকলেও সাধ্য ছিল না কেন না সেইরকম মন্দির গড়বার জন্য যে বিপুল অর্থ ও লোকবল দরকার, আমেরিকায় তখনও তা ছিল না। অভিবাসী হিন্দুর সংখ্যা তখনও আমেরিকায় নগন্যই বলা চলে।

১৯৬৫ সালে Immigration and Nationality Services (INS) Act চালু হওয়ার পর আমেরিকায় অভিবাসনের দরজা যেন খুলে গেল। ছাত্র, গবেষক, শিক্ষক, প্রযুক্তিবিদ এবং ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে এদেশে আসতে শুরু করলেন এবং এদেশেই পাকাপাকি ভাবে বসবাস করতে শুরু করলেন। এদের সঙ্গে সঙ্গেই সম্প্রদায়ের ধর্মপ্রচারকেরাও। আবারও বলা ভাল এই প্রচার যতটা না ছিল আমেরিকার মূল স্রোতের মধ্যে হিন্দু র্ধম ও দর্শন সম্বন্ধে উৎসাহ জাগিয়ে তোলা, ততটা ছিল এদেশীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মাচরণের প্রয়োজনীয়তা মেটানো। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিউ ইয়র্কে এসে পৌছালেন স্বামী প্রভুপাদ। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন -  ISKCON- International Society for Krishna Consciousness.

সনাতন ভারতীয় হিন্দু ভাবধারায় মূলতঃ দু’টি দিক দেখা যায়। প্রথমটি - ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণ এবং দ্বিতীয়টি, প্রতিষ্ঠানিক এবং পূজারী নির্ভর ধর্মাচরণ এবং পূজাবিধি। প্রথমটির কোন প্রতিষ্ঠানিক ভিত্তি নেই। দ্বিতীয়টির জন্য দেবস্থান বা মন্দির এবং পুরোহিত দরকার। আমেরিকাতেও হিন্দু ধর্ম-প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোটামুটি এই দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। বেদান্ত সোসাইটির মত আর যে সব প্রতিষ্ঠান এখানে যোগাভ্যাস, ধ্যান এবং হিন্দু শাস্ত্র পঠন পাঠনের ব্যবস্থা রেখেছে তারা প্রথম শ্রেণীভূক্ত।

১৯৬৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকাতে প্রধানতঃ এই ধারারই প্রচলন দেখা গেছে। ১৯৬৫ সালের পর প্রতিষ্টিত ইস্কন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাচরণের প্রথম ক্ষেত্র বলা যেতে পারে। চৈতন্য-অনুসারী কৃষ্ণ-প্রেম ও ভক্তিই এদের মূল দর্শন। কৃষ্ণই প্রধান বিগ্রহ।  এদের বেশীর ভাগ ভক্তকুলই উত্তর ভারতীয়। যদিও এদের বেশ কিছু সংখ্যক অভারতীয় ভক্ত সম্প্রদায় আছেন। ভক্তরা মন্দিরে মিলিত হয়ে ‘হরেকৃষ্ণ’ মন্ত্রোচ্চারণ, ভক্তি-সঙ্গীত গায়ন এবং আরতি ও পূজাপাঠের মাধ্যমে ঈশ্বরের আশীর্বাদ অভিলাষী। আরতি-গান -কীর্তনের পর প্রসাদ বিতরণ। বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে ধর্মীয় ও তাত্বিক অনুশাসন সম্পর্কিত বক্তৃতাও চলে।

১৯৬৫ সালের পর থেকে, বিশেষ করে গত শতকের আশির দশকের পর থেকে অসংখ্য প্রযুক্তিবিদ এবং ছাত্র ভারত থেকে এদেশে এসেছেন। তার সঙ্গে আছে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। এই বিপুল সংখ্যক হিন্দু অভিবাসীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর্থিকভাবে সচ্ছল। দেশের মাটি থেকে বহুদূরে থাকার জন্যই তারা স্বদেশের বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান ও ধর্মাচরণ বিধির জন্য আকর্ষণ বোধ করেন। মূলতঃ এই শ্রেণীর উদ্যোগেই আমেরিকায় একের পর এক মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়ে চলেছে। পরিসংখ্যান বলে যে সারা উত্তর আমেরিকা জুড়ে হিন্দু মন্দিরের সংখ্যা এখন প্রায় সাড়ে চারশো। বোর্ড অফ ট্রাষ্টি পরিচালিত এই সব মন্দিরের পূজা-বিধির ভার ন্যাস্ত থাকে দেশ থেকে আগত পূজারী বা পুরোহিতের উপর। অধিকাংশ মন্দিরের স্থাপত্য ভাস্কর্য্য ও বাহ্যিক শোভায় দেশের বিশিষ্ট মন্দিরের অনুকরন দেখা যায়। এই শ্রেণীর প্রথম মন্দির পিটসবার্গের শ্রী ভেস্কটেশ মন্দির। স্থাপিত জুন, ১৯৭৬ সালে। তার পরের বছরই নিউ ইয়র্কের ফ্লাশিং-এ প্রতিষ্ঠা হল শ্রী গণপতি দেবস্থানম। ১৯৮১-তে ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যালিব্যু হিন্দু মন্দির। এরই প্রায় সমসাময়িক লিভারমুরের (ক্যালিফোর্নিয়া) শিব-বিষ্ণু মন্দির। ১৫-ই জুন, ১৯৮৫।

মন্দির বলতে প্রথমেই ধর্মাচরণের স্থান মনে আসে। মন্দির মানে দেবস্থান, দেবতার বাসগৃহ। পূজা-অর্চনা ছাড়া আর কিছু মন্দিরের আওতায় আসে না। দেশের প্রেক্ষিতে এই ধারণা সর্বাংশে সত্য হলেও আমেরিকার হিন্দু মন্দিরে দু’টি অন্য মাত্রা যোগ হয়েছে। প্রথমতঃ মন্দিরের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও দ্বিতীয়তঃ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন। একথা বলে রাখা ভাল আমেরিকায় হিন্দু মন্দিরের  এই বিপুল সংখ্যা কিন্তু কোনভাবেই প্রমান করে না যে হিন্দু ধর্ম বা বিশ্বাস আমেরিকার মূলস্রোতে বিরাট প্রভাব ফেলেছে। বরঞ্চ বলা যেতে পারে এইসব মন্দির ও তাদের কার্য্যকলাপ বিপুল সংখ্যাক ভারতীয় হিন্দু অভিবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে যে শূন্যতা ছিল তা পূরণে সর্মথ হয়েছে। অবশ্য সারা আমেরিকা জুড়ে মন্দিরের প্রসার ও বিস্তারের ফলে আমেরিকার মূলস্রোতে হিন্দু ধর্ম যে কিছুটা হলেও পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে সেটা স্বীকার না করলে মিথ্যা ভাষণ হবে। তার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ২০০৭-এর ১২ই জুলাই আমেরিকার সিনেটে প্রথম হিন্দু শাস্ত্র থেকে প্রার্থনা ও মন্ত্রোচ্চারণ। প্রার্থনা পরিচালনা করেছিলেন  Rajan Zed, নেভাডার এক হিন্দু ধর্মযাজক। আমেরিকার ২১৮ বছরের সিনেটের ইতিহাসে এ রকম ঘটনার নজির আর নেই।

যাই হোক, আমেরিকার পটভূমিতে এই মন্দিরগুলি প্রধানত চারটি দায়িত্ব পালন করে থাকেঃ

১)  নিজেদের শেকড় ও সংস্কৃতি সম্বদ্ধে জনচেতনা গড়ে তোলার এবং সেই ভিত্তির উপর এক নতুন চিন্তা ও দর্শনের উদ্ভবের পথ সুগম করে তোলা।
২)  অপেক্ষাকৃত তরুণ সমাজের কাছে শাশ্বত হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির বিশ্বাস ও অনুশাসনগুলিকে সহজবোধ্য উপায়ে তুলে ধরা যাতে করে ভ্রান্ত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গোঁড়া ধর্মীয় প্রচেষ্ঠাকে চিনে নেওয়া যায়।
৩)  হিন্দু ধর্মের আদর্শকে আমেরিকার প্রেক্ষিতে ব্যবহার করে এখানকার জনজীবনের সমস্যার গভীর অসুসন্ধান ও সমাধানের পথনির্দেশ।
৪)  হিন্দু ধর্মের মানবিক ও দার্শনিক চিন্তাভাবনার সাথে অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসের মেলবদ্ধনের প্রচেষ্টা।

একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যাবে যে মন্দিরগুলি এখানে যতটাই ধর্মীয় উৎসব-অনুশাসনের চর্চার ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচিত হয়, ঠিক ততটাই ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়। প্রায় বেশীরভাগ মন্দির কমিটির সঙ্গে ÔCultural Center' কথাটির ব্যবহার এই ধারণাকে সমর্থন করে। প্রায়শই দেখা যায় মন্দিরের একটি নিজস্ব কম্যুনিটি হল থাকে যা কিনা মন্দিরের নিজস্ব ব্যবহারের বাইরে অন্যান্য সংস্থার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ ক্যালফোর্নিয়ার সাভিনেল হিন্দু মন্দির ও কালচারাল সেন্টার, লিভারমুর শিব-বিষ্ণু মন্দিরের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। লিভারমুর মন্দির সংস্থা-তে সংস্কৃত ভাষা ও যোগ ব্যায়াম শিক্ষার ব্যবস্থাও রেখেছে। স্যান লিয়ান্ড্রোর বদরিকাশ্রম তাদের প্রাঙ্গন উন্মুক্ত রেখেছেন নৃত্য-গীত ও অন্যান্য শিল্পকলার চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্র হিসেবে। পূজা-অর্চনা ও ধর্মীয় আলোচনার পাশাপাশি এখানে নিয়মিত সাঙ্গীতিক ও নৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। খরা-বন্যা-ভূমিকম্প ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময় এইসব মন্দিরগুলি ত্রাণের ব্যবস্থা করে সাহায্যের হাত বাড়ায়। সে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ দেশেই হোক বা ছেড়ে আসা দেশে। অনেক মন্দির ভারতের দুঃস্থ ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য স্কুল চালায় বা চালানোতে সাহায্য করে।

হিন্দু ধর্মে ধর্মীয় অনুসাশন এবং সাংস্কৃতিক-সামাজিক-দৈনন্দিন জীবন এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে একটিকে অন্যের থেকে আলাদা করাই ভার। আমেরিকার হিন্দু মন্দিরগুলি এই মেলবন্ধনের কাজটি প্রায় নিখুঁত ভারসাম্য রেখে করে চলেছে। তাই ফ্রিমন্ট মন্দির যখন রথযাত্রার আয়োজন করে, সেখানে জগন্নাথ পূজো ছাপিয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও মেলামেশার দিকটি আগে চলে আসে। লিভারমুরের দূর্গাপূজোয় বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশিষে যোগদান এবং আনুষঙ্গিক সাংস্কৃতিক চর্চা এটিকে দেবস্থানের বাইরে এক মিলন মেলায় পরিণত করে। একথা অল্পবিস্তর আমেরিকার প্রায় অধিকাংশ মন্দির সম্বন্ধেই প্রযোজ্য।

পূজা-অর্চনা ও ধর্মীয় প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি আমেরিকার মন্দিরগুলি জ্ঞান ও মুক্ত চিন্তার বিকাশে আরও সক্রিয় হবে এই আশা রাখি। স্বদেশের অনেক মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে হয় অসংখ্য গলি-ঘুঁজি ও গুহা-অন্ধকার পেরিয়ে। আমেরিকার হিন্দু মন্দিরগুলির গর্ভগৃহ তুলনায় অনেক সুগম। মন্দিরের অন্দরমহল প্রশস্ত ও অনেক উন্মুক্ত। সুপবন বয়ে যাবার সুযোগ অনেক। সেই সুপবন হিন্দু মন্দির ছাপিয়ে সমস্ত মানুষের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নকে আন্দোলিত করুক-মুক্ত চিন্তার ভূমি আমেরিকার হিন্দু মন্দিরগুলির সেটাই হবে সার্থকতার নিদর্শন।

তথ্যসূত্রঃ

১. Excerpt from Swami Vivekananda's speech in Chicago, 1893.
২. Wood, Angela, "Hindu Temple"
৩. Pechilis, Karen, "The pattern of Hinduism and Hindu Temple building in the U.S"
৪. Kolapen, Mahalingum, "Hindu Temple in North America: A Celebration of Life."


লিখেছেনঃ প্রদোষ কান্তি সরকার
প্রবাসের সংগঠন ‘সংস্কৃতি’র কর্ণধার ও প্রবাসের নাট্য আন্দোলনের পুরোধা।
ফ্রিমন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া
নভেম্বর ২, ২০০৯
1 comments
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger