সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

চৈতন্য মহাপ্রভু


জন্ম ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৪৮৬
জন্মস্থান - মায়াপুর (অধুনা নদিয়া জেলা, পশ্চিমবঙ্গ)
পূর্বাশ্রমের নাম - নিমাই মিশ্র
মৃত্যু ১ - ৫৩৪, পুরী (বর্তমান ওড়িশা)
গুরু - কেশব ভারতী
দর্শন - গৌড়ীয় বৈষ্ণব
শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণাবতার
চৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৬ – ১৫৩৪) ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী এবং ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক। তিনি অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণাবতার মনে করেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতানুসারে, ভাগবত পুরাণের শেষের দিকের শ্লোকগুলিতে রাধারানির ভাবকান্তি সংবলিত শ্রীকৃষ্ণের চৈতন্য রূপে অবতার গ্রহণের কথা বর্ণিত হয়েছে। চৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্বাশ্রমের নাম গৌরাঙ্গ বা নিমাই। তাঁর গাত্রবর্ণ স্বর্ণালি আভাযুক্ত ছিল বলে তাঁকে গৌরাঙ্গ বা গৌর নামে অভিহিত করা হত। অন্যদিকে নিম বৃক্ষের নিচে জন্ম বলে তাঁর নামকরণ হয়েছিল নিমাই। ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী সাহিত্য বাংলা সন্তজীবনী ধারায় এক নতুন যুগের সূচনা ঘটিয়েছিল। সেযুগে একাধিক কবি চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী অবলম্বনে কাব্য রচনা করে গিয়েছেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর চৈতন্য চরিতামৃত, বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের চৈতন্য ভাগবত এবং লোচন দাস ঠাকুরের চৈতন্যমঙ্গল। তাঁর পিতামাতা ছিলেন জগন্নাথ মিশ্র ও শচী দেবী। চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ওড়িশার জাজপুরের আদি বাসিন্দা। তাঁর পিতামহ মধুকর মিশ্র ওড়িশা থেকে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেন। চৈতন্যদেবের পিতৃদত্ত নাম ছিল বিশ্বম্ভর মিশ্র। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন স্বনামধন্য পণ্ডিত। তর্কশাস্ত্রে নবদ্বীপের নিমাই পণ্ডিতের খ্যাতি ছিল অবিসংবাদিত। জপ ও কৃষ্ণের নাম কীর্তনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ যে ছেলেবেলা থেকেই বজায় ছিল, তা জানা যায় তাঁর জীবনের নানা কাহিনি থেকে। কিন্তু তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল সংস্কৃত গ্রন্থাদি পাঠ ও জ্ঞানার্জন। পিতার মৃত্যুর পর গয়ায় পিণ্ডদান করতে গিয়ে নিমাই তাঁর গুরু ঈশ্বর পুরীর সাক্ষাৎ পান। ঈশ্বর পুরীর নিকট তিনি গোপাল মন্ত্রে দীক্ষিত হন। এই ঘটনা নিমাইয়ের পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। বাংলায় প্রত্যাবর্তন করার পর পণ্ডিত থেকে ভক্ত রূপে তাঁর অপ্রত্যাশিত মন পরিবর্তন দেখে অদ্বৈত আচার্যের নেতৃত্বাধীন স্থানীয় বৈষ্ণব সমাজ আশ্চর্য হয়ে যান। অনতিবিলম্বে নিমাই নদিয়ার বৈষ্ণব সমাজের এক অগ্রণী নেতায় পরিণত হন। গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের মতে, চৈতন্য মহাপ্রভু ঈশ্বরের তিনটি পৃথক পৃথক রূপের আধার: প্রথমত, তিনি কৃষ্ণের ভক্ত; দ্বিতীয়ত, তিনি কৃষ্ণভক্তির প্রবক্তা; এবং তৃতীয়ত, তিনি রাধিকার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ কৃষ্ণের স্বরূপ।
Courtesy by: Prithwish Ghosh
0 comments

ভক্তি কি ?

বিজ্ঞান হচ্ছে পরমতত্ত্ব। বিজ্ঞান হল সেই জ্ঞান যে জ্ঞানের উদয় হলে ‘আমি ব্রহ্ম’ এরূপ বিশ্বাসে মন দৃঢ় হয়। ব্রহ্ম ছাড়া আর অন্য কোন বস্তুর কথা মনেও আসে না এবং সেই বিজ্ঞানী মানুষের বুদ্ধি সর্বতোভাবে শুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সেই বিজ্ঞান দুর্লভ। জগতে সেই শুদ্ধ জ্ঞানের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ কম। সেই বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানী যা এবং যেমন তা সর্বদাই শিব স্বরূপ সাক্ষাত পরাৎপর ব্রহ্ম।
কিন্তু সেই বিজ্ঞান লাভের পথ হল বিশুদ্ধ শিব ভক্তি। এই ভক্তিই হল ওই বিজ্ঞানের মাতৃ স্বরূপ যা ভোগ ও মোক্ষ রূপ ফল প্রদানকারী। আর বাবা মহাদেবের কৃপাতেই মানুষ সেই ভক্তি লাভ করতে পারে। ভক্তি ও জ্ঞানে কোন কোনও পার্থক্য নেই। ভক্ত ও জ্ঞানী উভয়েই সর্বদা সুখদায়ক হয়ে থাকেন। যিনি ভক্তির বিরোধী তাঁর জ্ঞান লাভ হয় না।

“ভক্তৌ জ্ঞানে ন ভেদো হি তৎকর্তুঃ সর্বদা সুখম্‌ ।
বিজ্ঞানং ন ভবত্যেব সতি ভক্তি বিরোধিনঃ ।।
ভক্তাধীনঃ সদাহং বৈ তৎ প্রভাবাদ্‌ গৃহেষ্বপি।
নীচানং জাতিহীনানাং যামি দেবি ন সংশয়ঃ ।।”(শিবপুরাণ রুদ্রসংহিতা)

মহাদেব মহেশ্বর সর্বদা ভক্তের অধীন থাকেন এবং ভক্তির প্রভাবে জাতি হীন নীচ মানুষদের গৃহেও তিনি অবস্থান করেন। গুণ ভেদে ভক্তি দুই রকম – সগুণা এবং নির্গুণা। যে ভক্তি শাস্ত্রবিধি দ্বারা প্রেরিত বা বৈধী অথবা হৃদয়ের সহজ অনুরাগ দ্বারা প্রেরিত বা স্বাভাবিক সেই ভক্তিই উচ্চকোটির ভক্তি। এছাড়া যে কামনামূলক ভক্তি হয়ে থাকে তা নিম্নকোটির ভক্তি। সগুণ এবং নির্গুণ ভক্তি আবার নৈষ্ঠিকী ও অনৈষ্ঠকী ভেদে দুই ভাগে বিভক্ত। নৈষ্ঠিকী ভক্তি ছয় প্রকারের এবং অনৈষ্ঠকী ভক্তি একই প্রকারের হয়। প্রকৃত বিদ্বান ব্যক্তি বিহিতা এবং অবিহিতা ভেদে নানা প্রকারের বলে মনে করে থাকেন। সগুণা এবং নির্গুণা উভয় ভক্তির নয়টি অঙ্গ।
“শ্রবণং কীর্তনং চৈব স্মরণং সেবনং তথা।
দাস্য তথার্চনং দেবি বন্দনং মম সর্বদা।।
সখ্যমাত্মার্পণং চেতি নবাঙ্গানি বিদুর্বুধাঃ।” ---------- শিবপুরাণ রুদ্রসংহিতা

শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণ, সেবন, দাস্য, অর্চন, সর্বদা শিব বন্দনা, সখ্য এবং আত্মসমর্পণ। এছাড়াও ভক্তির বিভিন্ন উপাঙ্গও রয়েছে।

=> যে ব্যক্তি স্থির হয়ে সমগ্র মনকে শিবকেন্দ্রিক করে আসনে উপবেশন করে শরীর ও মনের দ্বারা শিবকথা শিব কীর্তনে শ্রদ্ধা ও সম্মান জ্ঞাপন করে প্রসণ্ণতাপূর্বক সেই অমৃত সমান কথা-কীর্তন রস পান করেন তার সেই সাধনাকে বলা হয়ে থাকে শ্রবণ।
=> যিনি তার হৃদাকাশে মহাদেব মহেশ্বরের দিব্য জন্ম-কর্ম-লীলা চিন্তা করে প্রেমভরে তা উদাত্তকণ্ঠে গীত করেন তার এই ভজন সাধনকে বলা হয় কীর্তন।
=> নিত্য মহাদেব পরমপুরুষ তৎপুরুষ মহেশ্বরকে সর্বদা ও সর্বত্র ব্যাপক (সকল বস্তুর মধ্যেই তিনি বিদ্যমান) জেনে যিনি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে সব সময়ে নির্ভয়ে থাকেন তার সেই ভক্তিকে বলা হয়ে থাকে স্মরণ।
=> অরুণোদয় থেকে শুরু করে সব সময়ে প্রভুর কৃপাকে বা তার অনুকূলতাকে মনে রেখে মন-বুদ্ধি-চিত্ত-হৃদয় এবং ইন্দ্রিয়াদির দ্বারা নিরন্তর মহেশ্বরের সেবা করা হয় তাকেই সেবন নামক ভক্তি বলা হয়।
=> নিজেকে প্রভুর সেবক মনে করে অন্তর থেকে সর্বদা প্রভূ ভোলানাথের প্রিয় সম্পাদন করাকে দাস্য বলা হয়।
=> নিজ ক্ষমতা অনুযায়ী শাস্ত্রীয় বিধি দ্বারা পরমাত্মারূপী আমাকে সর্বদা পাদ্য-অর্ঘ্য ইত্যাদি ষোড়শোপচারে বা পুষ্প-গন্ধ ইত্যাদি পঞ্চোপচারে পূজন করাকেই অর্চন বলা হয়ে থাকে।
=> অন্তরে ধ্যান ও বাক্য দ্বারা স্তোত্র বন্দনামূলক মন্ত্রাদির পাঠ করতে করতে শরীরের আট অঙ্গে ভূমি স্পর্শ করে ইষ্টদেবকে নমস্কার করাকে বলা হয় বন্দন।
=> প্রাণেশ্বর মহাদেব মহেশ্বর মঙ্গল-অমঙ্গল যা কিছুই সংঘটিত করেন না কেন তা ভক্তের মঙ্গল সাধনের জন্য অন্তরের এই রকম দৃঢ় ভক্তিকে বলা হয়ে থাকে সখ্য।
=> দেহ ইত্যাদি যা কিছু বস্তু নিজের বলে মনে করা হয়, সেই সমস্ত কিছু ভগবানের প্রসন্নতার জন্য তাকে সর্ব সমর্পণ করে নিজের জন্য কিছুই না রাখাকে এমনকি শরীর নির্বাহের চিন্তা রহিত হওয়াকে বলে আত্মসমর্পণ।
শিবশক্তির এই হল নয়টি অঙ্গ। এই গুলি ভোগ ও মোক্ষ প্রদানকারী। এর দ্বারা জ্ঞান প্রকাশিত হয় এবং ভক্ত বিজ্ঞানী হয়ে ওঠে।

Courtesy by: Prithwish Ghosh

0 comments

দেবী ক্ষীরভবানী

দেবী সতীর কণ্ঠদেশ এখানে পড়েছিল বলে বলা হয়। দেবীর নাম ভগবতী ভৈরবের নাম ত্রিসন্ধ্যেশ্বর। আবার কিছু পণ্ডিতদের মতে অমরনাথেই সতী অঙ্গ পতিত হয় । তন্ত্রে বলা হয় ---
.
”কাশ্মীরে কণ্ঠদেশশ্চ ত্রিসন্ধ্যেশ্বর ভৈরবঃ। ”
.
এখানে যে স্থানে সতী দেবীর অঙ্গ পতিত হয়- সেই স্থান অজ্ঞাত। ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের সময় মুসলিম বাদশা সিকান্দার এই মন্দির চূর্ণ বিচূর্ণ করে মন্দির লুঠপাঠ করেন। মন্দির বিধস্ত করা হয়। কাশ্মীরের হিন্দু রাজা প্রায় ১৯১২ খ্রীঃ এই মন্দির নতুন করে নির্মাণ করেন। শ্রীনগর থেকে ১২ মাইল দূরে এই মা ভবানীর মন্দির। বাসে ঘণ্টা খানেক এর ওপর সময় লাগে মন্দির পৌছাতে। মন্দির চত্বর বেশ বড়। পাশ দিয়ে একটি খাল গিয়ে ঝিলাম নদীতে মিশেছে। কাশ্মীর কে ভূস্বর্গ বলা হয়। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এত সুন্দর যেনো অমরাবতী ধরিত্রীর বুকে নেমে এসেছে। মিষ্ট আপেলের গাছ চারদিকে। লাল লাল থোকায় সুমিষ্ট আপেল তাতে ঝুলে আছে। যারা আপেল খেতে ভালোবাসেন- তারা কাশ্মিরে গেলে মন শান্তি করে খেয়ে আসবেন। মন্দিরের ভিতরে একটা ত্রিকোন কুণ্ড আছে। তাঁর মাঝখানে একটি নবনির্মিত ছোট্ট মন্দির দেখা যায়। পূর্বে ত্রিকোণ কুণ্ডটিই মাতৃ জ্ঞানে পূজিতা হতো। নতুন মন্দিরে দেবীর একটি মূর্তি দেখা যায়। ভক্তরা পূজার দ্রব্য সেই কুণ্ডে নিবেদন করেন। কুন্ডের সামনে একটা ছোট্ট নাট মন্দির আছে। সন্ন্যাসীরা সেখানে বসে ধ্যান জপ, পূজা পাঠ করেন। তবে এই সতী পীঠের যথার্থ স্থান নিয়ে মতভেদ আছে। এখানে অপর একটি শক্তিপীঠ দেখা যায়। সেটা হল শারদাপীঠ। অপর শারদাপীঠকেউ অনেকে আসল দেবী পীঠ বলেন। তাঁদের মতে মহামায়া সতী দেবীর কণ্ঠনালী এখানেই পতিত হয়েছিল। তবে এখানে দেবী হলেন মহামায়া আর ভৈরব হলেন ত্রিনেত্রশ্বর । বলা হয় স্বামীজি এই ক্ষীর ভবানী পীঠে এসে গো-দুগ্ধ দ্বারা মায়ের পূজো করেছিলেন।এই পীঠে এসে তিনি মায়ের দিব্য আদেশ শুনতে পেয়েছিলেন। কিছু তন্ত্র মতে কাশ্মীরের শক্তিপীঠের দেবীর নাম ভগবতী, ভৈরবের নাম অমরনাথ বলা হয়েছে। কুব্জিকা তন্ত্র ও কাশ্মীরের কবি কলহনের রচনায় শারদা পীঠের নাম পাওয়া যায়। এই পীঠ খুব দুর্গম স্থানে। মহাভারত ও কিছু পুরান মতে মহর্ষি পুলস্ত এই শারদা পীঠে বসে তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করেন। এই পীঠে চতুস্কোন সিঁদুর মাখানো একটি শিলাকে সতী অঙ্গ ধরে পূজা পাঠ করা হয়। আমরা ভগবতী ভবানী মায়ের কাছে প্রার্থনা জানাই -----
.
“হে মাতঃ। হে সিদ্ধিদাত্রী। তুমি সর্বপ্রকার মঙ্গল করো। তোমার আশীষে যেনো এই জীবন ধন্য হয়।” জয় জয় মা ভবানী ।
লেখকঃ প্রীথিশ ঘোষ
0 comments

কোন মানুষ বেদকে অস্বীকার করতে পারে কিন্তু বৈদিক কর্মের বাইরে কেউই নয়

পৃথিবীর অসংখ্য ধর্মের মধ্যে হিন্দু একটি প্রাচীনতম ধর্ম। প্রাচীনকালে এর নাম ছিল আর্য ধর্ম। কারণ ইরান থেকে আগত সেমেটিক শাখার আর্য গোত্ররা এ ধর্মের বাহক ছিল।এরা আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় পাঁচ হাজার অব্দে উপমহাদেশে আগমন করে আদি অধিবাসী তথাকথিক অনার্যদেরকে বিতাড়িত করে সপ্তসিন্ধু বিধৌত পঞ্জাব ও সিন্ধু অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। এ জন্য কালক্রমে তাদেরই উচ্চারণে 'সিন্ধু' শব্দের অপভ্রংশ 'হিন্দু' জতি নামে ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করে ও প্রাচীন 'আর্য ধর্ম' তখন থেকেই হিন্দু ধর্ম নামে পরিচিতি লাভ করে। হিন্দু ধর্ম মূলত আর্যদের বৈদিক ধর্ম। এ ধর্মের আদি ধর্মগ্রন্থের নাম 'বেদ'। এই বৈদিক ধর্ম সূচনাতে একটি একেশ্বরবাদী ধর্ম ছিল। তৎপরবরতী পৌরাণিক যুগে হিন্দু ধর্ম অবতারবাদের প্রবক্তা হয়ে ওঠে।
পরবর্তী কালে বেদের অনুশীলন করতে গিয়ে ঋষি ব্যাসদেবাে স্থান-কাল উপযোগী সংযোজন-সংবর্ধন করে ৪টি খণ্ডে বিভক্ত করেন।
হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থের মধ্যে বেদের স্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কৃত ‘বিদ’ ধাতু থেকে বেদ শব্দটি নিস্পন্ন। বিদ+ঘঙ = বেদ। বেদ অর্থ জানা (To Know)। যারা এই বেদ লিপিবদ্ধ করেছেন তাদের ঋষি বলা হয়। মহাপ্রাজ্ঞ ঋষিরা হলেন বেদের মূল আবিষ্কারক, ঋষিগণ আবিষ্কার করেছেন মানুষের অন্তর্নিহিত আধাত্মিকতা এবং গুহাবাসী মানুষের অজ্ঞানতাকে দুর করবার পদ্ধতি যা তাকে অমরত্বের পথে নিয়ে যাবে। এই গ্রন্থে মানুষের জীবনধ ধারার সাথে সাথে প্রকৃতির পূজার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বেদের সংখ্যা চারটি। যথা - ১. ঋকবেদ, ২. সামবেদ, ৩. যজুবেদ ও ৪. অথর্ববেদ।
পৃথিবীর একমাত্র ধর্মগ্রন্থ হ'ল 'বেদ', বাকী যেকোনও বা যে সমস্ত ধর্মগ্রন্থ রয়েছে তার প্রত্যেকটিরই স্ব স্ব শিক্ষা রয়েছে কিন্তু তা সবই বেদ-এর অনুসারী।হিন্দু ধর্মের বেদগ্রন্থের শিক্ষা একমাত্র কর্ম। যেহেতু কর্মই মানুষের একমাত্র 'ধর্ম' এবং ধর্মের মাধ্যমেই মানুষ তার নিজের কর্তব্য অনুধাবন করতে পারে। এ জন্য হিন্দু ধর্মে বলা হয়, মানুষ কর্মের মাধ্যমেই ঈশ্বর, স্বর্গ ও যাবতীয় কল্যাণ পেতে পারে এবং মুক্তির পথ অনুসন্ধান করতে পারে।
মূল বেদ ছাড়াও চারটি উপবেদ আছে। আয়ুর্বেদ, ধনুর্বেদ, গন্ধর্বেদ এবং স্থাপত্যর্বেদ। আয়ুর্বেদ হল ভেষজ শাস্ত্র, ধনুর্বেদ হল অস্ত্রবিদ্যা, গন্ধর্বেদ হল সঙ্গীত বিদ্যা আর স্থাপত্যর্বেদ হল কৃষিবিদ্যা। মানবকল্যাণের কথা চিন্তা করে এই বেদ ঋষিগণ রচনা করে থাকেন। উপবেদের শিক্ষা: উপবেদ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরকে চিকিৎসা, সঙ্গীত, স্থাপত্য ও অস্ত্রবিদ্যার শিক্ষা দিয়ে থাকে।
বেদের মূল ভাবকে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য বেদের সাহায্যকারী ছয়খানা অবয়বগ্রন্থ অধ্যয়ন করা আবশ্যক। আর এই অবয়বগুলোকে বলা হয় বেদান্ত। এগুলো হল - ১. শিক্ষা, ২. কল্প, ৩. ব্যাকরণ, ৪. নিরুক্ত, ৫. ছন্দ এবং ৬. জ্যোতিষ। বেদান্তের শিক্ষা: বেদান্ত যদিও বেদের ছয়খানা অবয়ব গ্রন্থ আর শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ এবং জ্যোতিষ এর মূল বিষয় তথাপি এর নিজস্ব একটা শিক্ষা রয়েছে। আর সেটা হল মানুষকে কর্মের চেয়ে শিক্ষার প্রতি অনুগামী করে তোলে।যাতে করে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি বৃদ্ধি পেয়ে স্রষ্টাকে বেশি উপলব্ধি করতে পারে।
.
বেদ কোনও একক মানুষের মতবাদ নয়।
বেদের আগে আর কোনও সভ্যতার উদাহরণ পাওয়া যায় না।
হিন্দু ধর্মই একমাত্র ধর্ম যা অন্ধকার যুগে মানুষকে আলোকবর্ত্তিকার সন্ধান দিয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশের যেকোনও ধর্মীয় মতবাদ, যা কোনও বিশেষ মানুষের সৃষ্টি, তার সব কিছুই বেদ-নির্ভর।
কোনও মানুষ বেদকে অস্বীকার করতে পারে কিন্তু বৈদিক কর্মের বাইরে কেউই নয়।
.
 লেখকঃ প্রীথিষ ঘোষ
0 comments

বাড়ি বাড়ি গিয়ে থালাবাসন মেজে গড়েছেন হাসপাতাল

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার হংসপুকুর এখন অনেকেই চেনেন৷ চেনেন সুভাসিনী মিস্ত্রী নামের অতি সাধারণ এক নারীর কারণে৷ অতি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে সুভাসিনীর বিয়ে হয়েছিল এক দিনমজুরের সঙ্গে৷ সুভাসিনীর বয়স তখন ১২৷ বাধ্য হয়ে বাল্যবিয়ে করা মেয়েটি বিধবাও হয় মাত্র ২৩ বছর বয়সে৷ প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যান স্বামী!
স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে বেশ কয়েক বছর বাড়ি বাড়ি গিয়ে থালা-বাসন মেজেছেন৷ তাতে যে আয় হতো তার পুরোটা ব্যয় করেননি, এক পয়সাও হাতে থাকলে তা জমিয়েছেন সুভাসিনী৷ জমিয়েছেন একটি স্বপ্ন পূরণের জন্য৷ স্বামীর মৃত্যুর পরই যে ভেবেছিলেন, ‘সব গরিবকে আর এভাবে মরতে দেয়া যাবে না, গরিবের জন্য একটা কিছু করতে হবে৷'

ওই ‘একটা কিছু করা' মানে, একটা হাসপাতাল গড়া৷ বাড়ি বাড়ি গিয়ে থালাবাসন মেজে, সবজি কেটেকুটে দিয়ে যেটুকু আয় হয় তা থেকে কয় পয়সাই বা বাঁচে যে হাসপাতাল গড়বেন! আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো এমন চিন্তা করলে তার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হতো না৷ কিন্তু সুভাসিনী, সুভাসিনীর স্বপ্ন, তার প্রতিজ্ঞাটা যে অনন্য সাধারণ৷ গরিবের জন্য হাসপাতাল গড়ার সেই স্বপ্নটাকে কখনো ফিকে হতে দেননি সুভাসিনী৷

স্বামীর মৃত্যুর সময় দিনে মাত্র ৫ পয়সা আয় করতেন সুভাসিনী৷ ঘরভাড়া বাবদ দু'পয়সা দিতেন বাড়িওয়ালাকে, দু'পয়সা যেত খাওয়া-দাওয়ায় আর বাকি এক পয়সা জমাতেন৷ এক সময় শাক-সবজি বিক্রি শুরু করলেন৷ আয় কিছুটা বাড়লেও বিলাসিতার জন্য কখনো একটা পয়সাও ব্যয় করেননি৷

এভাবে অল্প অল্প করেই জমে যায় এক লাখ ভারতীয় মুদ্রা৷ সেই টাকায় হংসপুকুরে এক একর জমি কিনলেন৷ নিজের মাথা গোঁজার জন্য নয়, গরিবের চিকিৎসার জন্য৷ বড় ছেলে ততদিনে স্নাতক হয়েছে৷ দুই ছেলের লেখাপড়ার খরচ দিতে পারছিলেন না বলে মেজ ছেলে অজয়কে অনাথ আশ্রমে দিয়েছিলেন সুভাসিনী৷ অজয় ততদিনে ডাক্তার হয়েছে৷ সুভাসিনী অজয়কেই বললেন, ৪০ বছর ধরে লালন করে আসা স্বপ্নটির কথা৷ শুরু হলো ছোট্ট একটা কুঁড়ে ঘরে গরিব রোগীদের চিকিৎসা৷
অজয়ের ডাক্তার বন্ধুরাও যোগ দিয়েছিলেন বিনা পারিশ্রমিকে গরিবদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার কাজে৷ প্রথম দিনে বিনা খরচে চিকিৎসা পেয়েছিল ২৫২ জন মানুষ৷ এতগুলো মানুষকে সার বেঁধে দাড়িয়ে থাকতে দেখে মৃত স্বামীর কথা মনে পড়েছিল, নিজের অজান্তেই কেঁদে ফেলেছিলেন সুভাসিনী মিস্ত্রী৷

এখন দুঃস্থ রোগীদের মুখে হাসি ফোটান সুভাসিনী৷ একজন সৎ, নিষ্ঠাবান মানুষের মানবকল্যাণের স্বপ্ন পূরণের সংকল্প এবং প্রয়াস দেখে অনেকেই এগিয়ে এসেছেন৷ ১৯৯৩ সালের সেই ছোট্ট কুঁড়ে ঘরটি তাই আজ আয়তন এবং খ্যাতিতে অনেক বড়৷ তিন একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে সুভাসিনীর স্বপ্নের সেই হাসপাতাল৷ ২৩ বছর বয়সে বৈধব্য বরণ করা সুভাসিনী, ঘরে ঘরে গিয়ে থালাবাসন মেজে, পথে পথে শাক-সবজি বিক্রি করে এক পয়সা দু'পয়সা করে জমানো সুভাসিনী তার স্বপ্নের হাসপাতালটির নাম রেখেছেন, ‘হিউম্যানিটি হসপিটাল'৷

Collected from: Rony Biswas
0 comments

মাকে আর মাথায় রাখতে হবে না মাতৃভক্ত সেই বীরেনের

মাকে আর মাথায় রাখতে হবে না বীরেনের  । মাকে পূজা করার মাধ্যমে দিন শুরু হতো বীরেনের। এরপর মাকে স্নান করিয়ে, খাইয়ে দিয়ে নিজে দিনের প্রথম আহার মুখে তুলতেন। প্রায় ৫০ বছর ধরে এভাবেই চলছিল। তবে গতকাল সোমবার প্রথম সেই নিয়মে ব্যতিক্রম হয়েছে। কারণ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে আগের  দিন সন্ধ্যায় না ফেরার দেশে চলে গেছেন মা ঊষা রানী মজুমদার। নিয়তির অমোঘ টানে ছিন্ন হলো মা-ছেলের বন্ধন। তবে মাকে হারালেও ভেঙে পড়েননি বীরেন। তাঁর বিশ্বাস, দেহত্যাগ করলেও মা তাঁর সঙ্গেই থাকবেন। মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াও নিজে হাতে সেরেছেন তিনি। মায়ের প্রতি অসীম ভালোবাসা থেকেই ঘরের সামনেই মায়ের শেষকৃত্যের আয়োজন করেন তিনি।  পরিবারের সদস্যদের দাবি, মৃত্যুর সময় উষা রানীর বয়স হয়েছিল ১১৩ বছর।

বীরেনের বড় ভাইয়ের স্ত্রী আরতী রানী গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হঠাৎ করে প্রচণ্ড জ্বর হয়েছিল শাশুড়ি মার। মোটরসাইকেলে করে শহরের ডাক্তারও নিয়ে এসেছিলেন বীরেন। কিন্তু মাকে আর বাঁচানো গেল না।’  উষা রানীর বাড়ি পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার পূর্ব চণ্ডীপুর গ্রামে। ১৯ বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই হাঁটাচলা করতে পারতেন না তিনি। আর বাবার মৃত্যুর অনেক আগে থেকেই মায়ের দেখাশোনা করতেন বীরেন। তাঁর পুরো নাম বীরেন্দ্রনাথ মজুমদার। বয়স ৫৪-তে পড়েছে। মায়ের সেবায় ত্রুটি হতে পারে—এই দুশ্চিন্তা থেকে বিয়েই করেননি তিনি।  মাকে নিয়েই সংসার পেতেছিলেন পেশায় দিনমজুর বীরেন। যা আয় হতো তা দিয়ে চলে যেত দুজনের সংসার।

তবে ইদানীং মা উষা রানীর শরীরটা আর চলছিল না। বয়সের ভারে একেবারে নুয়ে পড়েছিলেন। শরীরে ভর করেছিল বার্ধক্যজনিত নানা রোগ। মাসে একবার উপজেলা সদরে ডাক্তারের কাছে যেতে হতো। হাঁটাচলার সামর্থ্য ছিল না তাঁর। তবে এ নিয়ে তাঁকে কোনো চিন্তা করতে হয়নি। কারণ ছেলে বীরেন ছায়া হয়ে আগলে রাখতেন তাঁকে। মাকে বাঁশের ডালায় বসিয়ে সেই ডালা মাথায় তুলে হেঁটে হেঁটে সাত মাইল দূরে হাসপাতালে নিয়ে যেতেন বীরেন। এই দীর্ঘ পথে ভাঙা রাস্তা, বাঁশের সাঁকো মাড়িয়ে যেতে হতো তাঁকে। আর কোনো উপায় ছিল না। কারণ ওই পথে যানবাহন চলত না। যেতে যেতে পথে থেমে থেমে বীরেন মাকে জিজ্ঞেস করতেন, ‘ও মা, তোমার কি কষ্ট অয়? কষ্ট অইলে ডালাটা শক্ত কইরা ধরো।’  বীরেনের মাতৃভক্তি দেখে সবাই মুগ্ধ হতো। প্রতিবেশীরা জানায়, বাড়িতে বৈদ্যুতিক পাখা না থাকায় বীরেন বাইরে গিয়ে কখনো বৈদ্যুতিক পাখার হাওয়া গায়ে লাগাতেন না। কারণ তাঁর মা তো আর ওই পাখার হাওয়ায় বসতে পারবেন না। শীতের মৌসুমে কোনো বিশেষ কাজে ঘরের বাইরে থাকলে কখনোই রাতে ঘুমানোর সময় বীরেন লেপ-কাঁথা গায়ে দিতেন না। বলতেন, ‘আমি গরম কাপড় গায়ে দিয়ে আরামে ঘুমালাম, আর মায়ের গায়ে যদি কাঁথা না থাকে তাহলে আমি কী জবাব দেব?’

 গত বছর মা দিবসে বীরেন ও তাঁর মাতৃভক্তি নিয়ে কালের কণ্ঠ’র প্রথম পৃষ্ঠায় ‘মাকে মাথায় রাখেন বীরেন’ শিরোনামে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায়ই লোকজন আসত বীরন ও তাঁর মাকে দেখার জন্য। অনেকে মোবাইলে ফোন করে খোঁজখবর নিতেন। অনেকে মাসহ বীরেনকে বেড়িয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বীরেনও চেয়েছিলেন মাকে নিয়ে বেড়াতে যাবেন। তবে মা চলে যাওয়ায় সেই আশা অপূর্ণই রয়ে গেল।  গতকাল সকালে বীরনদের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, স্বজনরা আহাজারি করছে। প্রতিবেশীরা বলাবলি করছিল, এখন কী হবে বীরেনের। মাকে হারানোর পর কী নিয়ে বাঁচবেন তিনি। তবে বীরেন কাঁদেননি। তিনি শুধু বলছিলেন, ‘আমার মা মরে নাই। মায়ের কখনো মৃত্যু হয় না।’ মায়ের সত্কারের জন্য নিজ হাতে সব আয়োজন করেছেন বীরেন।

প্রতিবেশী, সাংবাদিক, গ্রামবাসী ভিড় করেছিল বীরেনদের বাড়ির আঙিনায়। বীরেন সবাইকে জানিয়ে দেন, শ্মশানে নয়, ঘরের সামনেই সত্কার করা হবে মাকে। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।  পরিবারের সদস্যরা জানায়, মৃত্যুর আগে বীরেনকে আশীর্বাদ করে গেছেন মা। বলে গেছেন, ‘চিন্তা করিস না বাবা, তোর সব কাজে জয় হবে।’ সকালে বীরেনের বড় ভাই শ্যামলাল মজুমদারকে দেখা গেল আঙিনার চারপাশে ঘুরছেন আর বিলাপ করে কাঁদছেন। মাঝে মাঝে বীরেনকে জড়িয়ে ধরে বলছিলেন, ‘ভাই, তুই একটু চিত্কার কইরা কাঁদ, মনডারে হালকা কর।’  প্রতিবেশীরা জানায়, মাকে স্নান করানো, কাপড় ধুয়ে দেওয়া, খাওয়ানো, চিরুনি দিয়ে মাথা আঁচড়ে দেওয়া, ডাক্তার দেখানো—সবই করতেন বীরেন। মায়ের প্রতি বীরেনের শ্রদ্ধার তুলনা ছিল না। কোথাও কাজে গেলে এক ফাঁকে বাড়িতে এসে মাকে দেখে যেতেন তিনি। মাকে না খাইয়ে মুখে খাবার তুলেছেন বীরেন—এ দৃশ্য কেউ কখনো দেখেনি। ভাঙা ঘর বৃষ্টির পানিতে ভেসে গেলেও মায়ের শরীরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে দিতেন না বীরেন। পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে মায়ের পাশে বসে নির্ঘুম রাত কাটাতেন তিনি।  বড় ভাই শ্যামলাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেউ বীরেনের কথা জিজ্ঞেস করলে আমরা এত দিন বলতাম, ও মায়ের সেবা করে। কিন্তু মা চলে যাওয়ার পর এখন ও কী নিয়ে বাঁচবে? আমার ভাইটার কী হবে?’

সুত্রঃ কালের কন্ঠ
0 comments

ঐতিহাসিক কান্তজির মন্দির প্রাঙ্গণে রাসমেলায় বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন আহত

দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় ঐতিহাসিক কান্তজির মন্দির প্রাঙ্গণে রাসমেলায় বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। শুক্রবাদিনাজপুরে কাহারোল উপজেলায় ঐতিহাসিক কান্তজির মন্দির প্রাঙ্গণে রাসমেলার যাত্রা প্যান্ডেলে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশ। এছাড়া এ ঘটনায় কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে কাহারোল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মজিদকে আজ শনিবার সন্ধ্যায় প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মো. রুহুল আমিন। 
 
 পুলিশ জানায়, রাসমেলার ইজারাদার মো. হারেছ আলী শাহ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে আজ কাহারোল থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ আরো জানায়, কান্তজির মন্দির প্রাঙ্গণে গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে রাসমেলার যাত্রা প্যান্ডেলে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কমপক্ষে ছয়জন আহত হয়। আহতদের দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহত ব্যক্তিরা হলেন রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার ঝাড়পাড়া গ্রামের মো. মোকাদ্দেছ হোসেন (২৩), দিনাজপুর সদর উপজেলার উত্তর শিবপুর গ্রামের মো. সাইদুল ইসলাম (৩২), একই গ্রামের সাধন রায় (৩০), নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর শহরের মো. সাঈদ মিঠু (৩২), দিনাজপুর সদর উপজেলার উত্তর শিবপুর গ্রামের মো. সিরাজুল ইসলামের ছেলে আব্দুল জব্বার (২৫) এবং বীরগঞ্জ উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের মিহির দাসের ছেলে স্থানীয় চৌধুরীহাট কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র উমা কান্ত দাস (২২)। দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ইউনিট-৩ এর দায়িত্বে থাকা সহকারী অধ্যাপক সোহেল উল্লাহ বলেন, ছয়জনই একাধিক স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হয়েছেন। সবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তবে আহত ব্যক্তিরা আশঙ্কামুক্ত।
 
 আহতদের চারজন হাসপাতালের সাধারণ সার্জারি বিভাগে এবং দুজন অর্থো-সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন আছেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দিনাজপুরের পুলিশ সুপার মো. রুহুল আমিন বলেন, ১৮ নভেম্বর সকালে শহরের মির্জাপুর এলাকার মিশনারির ফাদার ডা. পিয়েরো, ৩০ নভেম্বর রাতে চিরিরবন্দর উপজেলার রানীরবন্দরে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক বীরেন্দ্রনাথকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা এবং শুক্রবার গভীর রাতে কান্তজির মন্দিরের রাস মেলার যাত্রা প্যান্ডেলে বোমা বিস্ফোরণ ঘটনা তিনটি একই সূত্রে গাথা। জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম বলেন, আজ শনিবার বিকেলে মন্দির প্রাঙ্গণে মেলা কমিটি জরুরি সভা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয় রাসমেলা চলবে, কিন্তু যাত্রা, সার্কাস, পুতুল নাচসহ সব ধরনের বিনোদন অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
 - See more at: http://www.kalerkantho.com/online/country-news/2015/12/05/298381#sthash.T7JL2olw.dpuf

0 comments

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাত দফা দাবি পূরনের আল্টিমেটাম

বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সাংবিধানিক পদসহ প্রশাসনিক কাঠামোর সর্বস্তরে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের আয়োজনে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম-অধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশ থেকে এ দাবি জানানো হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেছেন, বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংখ্যালঘুরা আজ বঞ্চনা, বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার। রাজনীতির মাঠে তাঁরা দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন। দেশত্যাগেও বাধ্য হচ্ছেন কেউ কেউ। সংখ্যালঘু অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে তা হবে গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।
গতকাল দুপুরের পর থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষের ঢল নামে। খোল-করতাল বাজিয়ে পৃথক মিছিল নিয়ে তাঁরা সমাবেশস্থলে পৌঁছান। শিশু-নারীসহ সব বয়সী মানুষের অংশগ্রহণে সমাবেশ হয়ে ওঠে বর্ণিল ও উৎসবমুখর। আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশ শুরুর আগে থেকেই মঞ্চে পরিবেশিত হতে থাকে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের গান।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘এই দেশের সংখ্যালঘুর ওপর বহু নির্যাতন, বহু নিপীড়ন করা হচ্ছে। রাষ্ট্র জানে না, সরকার জানে না, রাজনৈতিক দল জানে না এমন নয়—আমরা সবাই জানি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এইটা কল্পনা করা যায়? বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কেবিনেটে একজন সংখ্যালঘুকে কেবিনেট মিনিস্টার করা গেল না। পৌরসভা নির্বাচনে ২৩৬ জনের মধ্যে কয়জন দিছি আমরা? নয়জন। এইটা বিচার হইল?’

সুরঞ্জিত বলেন, ‘ভেবে দেখেন, ’৪৭-এর দেশভাগের সময় দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ছিল মোট জনসংখ্যার ৩৭ ভাগ। ’৭১-এ ২১ ভাগ, এখন হইছে ১০ ভাগ। আর তিন বছর পরে এই ১০-এর শূন্য চলে যাবে। তখন এই গণতন্ত্র আফগানিস্তানের গণতন্ত্রে রূপ নেবে।’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রের কোনো জনগোষ্ঠীকে যখন ইচ্ছে হবে আমি ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করব, যখন ইচ্ছে হবে হুমকি দেব, এটা হতে পারে না। কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারবে না, এই নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে দিতে হবে।’
ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, পাকিস্তানি আমলের মতো স্বাধীন বাংলাদেশেও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব আজ বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। এ সংকট থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য সাত দফা দাবি পেশ করেন তিনি। বলেন, ‘এ দাবি পূরণ না হলে আমরা ভিন্ন চিন্তা করতে বাধ্য হব।’
দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উন্নয়নে একটি সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়সহ তাঁদের মানবাধিকার সুরক্ষায় একটি জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন।
এ সাত দফা দাবির প্রতি সহমত পোষণ করে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার পক্ষে তাঁর লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন একজন।
সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন সাংসদ ঊষাতন তালুকদার, ঐক্য পরিষদের সাবেক নেতা নিম চন্দ্র ভৌমিক, বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব নির্মল রোজারিও প্রমুখ।

Collected from: http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/703060/%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%96%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%98%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%85%E0%A6%A7%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%A4-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%BF

0 comments

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্কিমে সাড়ে ৫ টন সোনা জমা দেবে তিরুপতি মন্দির


পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সম্পদশালী মন্দির হিসেবে পরিচিত ভারতের মুম্বাইয়ের শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী মন্দির। স্থানীয়রা তিরুপতি মন্দির হিসেবেই এটিকে চেনে। বলা হয়ে থাকে, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে এই মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। এখানে পূজা করা হয় ভগবান গণেশের। মন্দিরের মূল অংশটি সোনা দিয়ে মোড়ানো।

এই মন্দিরে এসে গণেশের আশীর্বাদ পেতে উপঢৌকন হিসেবে সোনা দান করে যান পুণ্যার্থীরা। ফলে বছরের পর বছর ধরে সোনা জমতে থাকে মন্দিরে। এবার সেই সোনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সোনা জমা প্রকল্প বা গোল্ড মানিটাইজেশন স্কিমে রাখতে যাচ্ছে মন্দির কর্তৃপক্ষ। আর এর মাধ্যমে এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অঙ্কের সোনা জমার রেকর্ডটি করতে যাচ্ছে তিরুপাতি মন্দির।

ধারণা করা হচ্ছে, সাড়ে পাঁচ টনেরও বেশি পরিমাণ সোনা প্রকল্পের আওতায় জমা রাখবে তিরুপতি মন্দির কর্তৃপক্ষ।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনা ব্যবহার হয় ভারতে। বহু বছর ধরেই ভারতের মন্দিরগুলোতে আশীর্বাদ ও প্রার্থনার অনুষঙ্গ হিসেবে সোনার গয়না, বার এবং মুদ্রা দান করা হয়ে থাকে। তবে বেশির ভাগ মন্দিরই তাদের সোনার পরিমাণের বিষয়টি গোপন রাখতে চায় এবং ভূগর্ভস্থ কোনো ভল্টে সোনা লুকিয়ে রাখে।

এ বিষয়ে তিরুপতি মন্দির ট্রাস্টের নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সম্বশিভা রাওয়ের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এরই মধ্যে ১ শতাংশ সুদে মন্দিরের কিছু সোনা বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ব্যাংকে রাখা হয়েছে। যদি এই প্রকল্পের (মোদির প্রকল্প) ব্যাপারে মন্দিরের বিনিয়োগ কমিটি সন্তুষ্ট হয় তাহলে এর সব সোনাই ব্যাংকে রাখা হবে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান ড. রাও।

মোদির প্রকল্পে সোনা রাখার ক্ষেত্রে সুদ ধরা হয়েছে ২.৫ শতাংশ।

তিরুপতি মন্দিরে প্রতি বছর প্রায় এক টন সোনা জমা হয় জানিয়ে ড. রাও বলেন, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে সব সোনাই মোদির প্রকল্পে জমা রাখা হবে।
0 comments

চণ্ডী পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় লৌকিক দেবী

চণ্ডী পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় লৌকিক দেবী। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য একাধিক চণ্ডীমঙ্গল কাব্য র
চিত হয়। এর ফলে লৌকিক চণ্ডী দেবী মূলধারার হিন্দুধর্মে স্থান করে নেন। মঙ্গলকাব্য ধারার চণ্ডী দেবী কালীর সমতুল্য। তিনি শিবের স্ত্রী, গণেশ ও কার্তিকের জননী। দেবীর এই সত্ত্বাদুটি পার্বতী বা দুর্গার সমতুল্য। চণ্ডীর ধারণাটি নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসেছে। তাই চণ্ডীর পূজাও বিভিন্ন প্রকার।

চণ্ডী সৌভাগ্যের দেবী। সুখসমৃদ্ধি, সন্তান, বিজয় ইত্যাদি কামনায় তাঁর মঙ্গলচণ্ডী, সঙ্কটমঙ্গলচণ্ডী, রণচণ্ডী ইত্যাদি মূর্তিগুলি পূজা করা হয়। ওলাচণ্ডীর পূজা হয় মহামারী ও গবাদিপশুর রোগ নিবারণের উদ্দেশ্যে।


পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রামের নামের সঙ্গে দেবী চণ্ডীর নাম যুক্ত। মঙ্গলচণ্ডীর পূজা সমগ্র রাজ্যে এমনকি অসমেও প্রচলিত। এই দেবীর উৎস প্রাচীন বঙ্গদেশের শাক্ত সম্প্রদায়ের তন্ত্র সাধনায়।

প্রাচীন সংস্কৃত রচনায় চণ্ডী কথাটির অনুপস্থিতির কারণ হল এই দেবী হিন্দুধর্মের অব্রাহ্মণ্য শাখার দেবতা। ইনি প্রকৃতপক্ষে বঙ্গদেশের অনার্য আদিবাসী সমাজের দেবী। এই দেবী ছিলেন মহাশক্তি। তিনি ত্রিনয়না, তাঁর কপালে অর্ধচন্দ্র শোভিত। দেবীর বহু হাতে বহু প্রকার অস্ত্র, গাত্রে বহুমূল্য অলংকার ও মালা। সকলই দেবগণ দেবীকে উপহার দিয়েছিলেন। তাঁর সোনার অঙ্গ সহস্র সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল। এইরূপে সিংহবাহিনী দেবী চণ্ডী হয়ে উঠলেন বিশ্বশক্তির মূর্তিস্বরূপ।

অন্য একটি কাহিনি অনুযায়ী, চণ্ডী রক্তবীজ দৈত্যবধে দেবী কালীকে সহায়তা করেন। রক্তবীজের রক্ত মাটিতে পড়লে সহস্র সহস্র রক্তবীজ অসুরের সৃষ্টি হত। কালী রক্তবীজের রক্ত পান করেন। এই সময় ভূপতিত রক্ত থেকে সৃষ্ট অসুরদের ধ্বংস করেন চণ্ডী এবং শেষে তিনিই রক্তবীজকে বধ করেন। স্কন্দ পুরাণেও এই কাহিনিটি রয়েছে। এই পুরাণে আরও বলা হয়েছে যে দেবী চণ্ডিকা চণ্ড ও মুণ্ড অসুরদ্বয়কে বধ করেন।

চণ্ডী বা চণ্ডিকা দেবীমাহাত্ম্যম্ গ্রন্থের সর্বোচ্চ দেবী। তিনি দুর্গা সপ্তশতী নামেও পরিচিত। মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতী দেবীর সমন্বয়ে চণ্ডীকে উক্ত গ্রন্থে সর্বোচ্চ সত্ত্বা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রন্থের অন্তভাগে মূর্তিরহস্য অংশে তাঁকে অষ্টাদশভূজা মহালক্ষ্মী নামে অভিহিত করা হয়েছে।

চণ্ডরূপ ধারণ করে দেবশত্রুদের বধ করেন বলে তার নাম হয় চণ্ডী। চণ্ডীই যখন ভক্তের দুর্গতি বিনাশ করেন তখন তাকে বলা হয় দুর্গা। দুর্গারূপে তিনি মহিষাসুরকে বধ করেন। বহু নামে ও রূপে চণ্ডী পূজিত হন, যেমন : দেবীচণ্ডী, মঙ্গলচণ্ডী, জয়চণ্ডী, ওলাইচণ্ডী, কুলুইচণ্ডী, চেলাইচণ্ডী প্রভৃতি। জয়চণ্ডীরূপে তিনি দ্বিভুজা, ত্রিনয়না, গৌরবর্ণা, বরাভয়াহস্তা এবং পদ্মোপরি দণ্ডায়মানা। মার্কণ্ডেয়পুরাণে চণ্ডী নামে একটি অধ্যায় আছে যার শ্লোকসংখ্যা সাতশ। এখানে দেবীচণ্ডীর বিচিত্র রূপ ও মাহাত্দ্য বর্ণিত হয়েছে।

দেবীপূজা, বিশেষত দুর্গাপূজা উপলক্ষে কিংবা গৃহস্থের কল্যাণ কামনায় এক বা একাধিকবার চণ্ডীপাঠের নিয়ম আছে।

মঙ্গলচণ্ডী
======
* সকল বিশ্বের মূল স্বরূপা প্রকৃতি দেবীর মুখ হইতে মঙ্গলচণ্ডী দেবী উৎপন্না হইয়াছেন। তিনি সৃষ্টিকার্য্যে মঙ্গলরূপা এবং সংহারকার্য্যে কোপরূপিণী, এইজন্য পণ্ডিতগণ তাঁহাকে মঙ্গলচণ্ডী বলিয়া অভিহিত করেন। ---- দেবীভা-৯স্ক-১।

* দক্ষ অর্থে চণ্ডী এবং কল্যাণ অর্থে মঙ্গল। মঙ্গলকর বস্তুর মধ্যে দক্ষা বলিয়া তিনি মঙ্গলচণ্ডী নামে প্রসিদ্ধ হইয়াছেন। প্রতি মঙ্গলবারে তাঁহার পূজা বিধেয়। মনু বংশীয় মঙ্গল রাজা নিরন্তর তাঁহার পূজা করিতেন। ----- দেবীভা-৯স্ক-৪৭।

 লেখকঃ প্রথীশ ঘোষ

0 comments

সহজ সংক্ষেপ শিবপূজাপদ্ধতি

দেবের দেব মহাদেব। এমন মহাশক্তিধর, অথচ অল্পে-তুষ্ট দেবতা হিন্দু দেবমণ্ডলীতে বিরল। রামপ্রসাদের গানে আছে, ‘শিব আশুতোষ মহান দাতা’। সামান্য ফুল-বেলপাতা তাঁর মাথায় দিলে তিনি যা প্রতিদান দেন, তার তুলনা ত্রিজগতে নেই। এমন যে শিব, তাঁকে পূজা করতে কে না চায়? তাছাড়া তাঁর পূজা যে কেউ করতে পারে।

যাঁরা দৈনিক কর্মব্যস্ততার মধ্যেও তাঁদের প্রিয় দেবতা শিবকে নিত্যপূজা করতে চান, কিন্তু শিবপূজার বিধান সম্পর্কে সম্যক অবগত নন, এমন আপামর জনসাধারণের জন্য সরলভাবে এই পূজাপদ্ধতি প্রণীত হল। বাচ্চা ছেলেমেয়েরা শিবের পূজা করে থাকে। কারণ, ছেলেবেলায় শিবের পূজা করা বিশেষভাবে উপকারী। আপনার বাড়িতে এমন ছেলে বা মেয়ে থাকলে, তাদের এই পদ্ধতিতে শিবপূজা করা শিখিয়ে দিতে পারেন। প্রবাসী ধর্মপ্রাণ হিন্দুরাও এই পদ্ধতি মেনে সহজেই নিত্য শিবপূজা করতে পারেন। মন্ত্রপাঠ কেউ করতে পারেন, কেউ পারেন না। তাই মন্ত্রপাঠের সমর্থরা কেমনভাবে পূজা করবেন, অসমর্থরাই বা কেমনভাবে করবেন, তাও আলাদা আলাদাভাবে বলে দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রপাঠ প্রসঙ্গে
---------------------
মন্ত্রপাঠ প্রসঙ্গে প্রথমেই মনে রাখতে হবে যে, শিব মন্ত্র বা উপচারের বশ নন। আর যাই হোক, যিনি দেবের দেব, তাঁকে আপনি মন্ত্রে ভুলিয়ে উপচার ঘুষ দিয়ে কার্যসিদ্ধি করতে পারবেন, এমন চিন্তা মনেও স্থান দেবেন না। শিব ভক্তির বশ। ভক্তের হৃদয় তাঁর আড্ডাঘর। শুধুমাত্র ভক্তিদ্বারা পূজা করলে পূজা তাতেই সিদ্ধ হয়। একথাও শাস্ত্রেও স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু আপনার অন্তরের ভক্তি আপনাকে মন্ত্রপাঠে উদ্বুদ্ধ করলে, অবশ্যই মন্ত্র পড়ে পূজা করতে পারেন। সেক্ষেত্রে মন্ত্রপাঠ শুদ্ধ উচ্চারণে হওয়া উচিৎ এবং আপনারও মন্ত্রের অর্থ জেনে তা পাঠ করা উচিত। তা না করলে মন্ত্রপাঠ বৃথা। তাই নিচে পূজাপদ্ধতি বলার আগে ক্রিয়াকর্ম ও মন্ত্রের অর্থ বা ভাবার্থও দিয়ে দেওয়া হল। মন্ত্র পড়তে না পারলে মন খারাপ করার কোনো প্রয়োজন নেই। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, মন্ত্রপাঠে অসমর্থ ব্যক্তিরাও ঈশ্বরের কৃপা পেতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাঁদের যথাযথ ভক্তিসহকারে পূজার মূল অর্থটি হৃদয়ঙ্গম করে পূজা করতে হবে। তাঁরা কিভাবে সেই পূজা করবেন, তাও পরে বলে দেওয়া হয়েছে। তবে মনে রাখবেন, দুই পদ্ধতির মূল কথা একই।

পূজাসামগ্রী ও সাধারণ নিয়মকানুন
=========================
এই জিনিসগুলি সাজিয়ে নিয়ে পূজা করতে বসবেন —
১। একটি শিবলিঙ্গ।
২। একটি ছোটো ঘটিতে স্নান করানোর জল।
৩। একটি থালা, একটি গ্লাস ও কোশাকুশি। কোশাকুশি না থাকলে তামা বা পিতলের সাধারণ ছোটো পাত্র ব্যবহার করবেন।
৪। একটু সাদা চন্দন।
৫। একটুখানি আতপ চাল।
৬। কয়েকটি ফুল ও দুটি বেলপাতা (বেলপাতা না থাকলে দুটি তুলসীপাতা দিতে পারেন)।
৭। ধূপ, দীপ।
৮। নৈবেদ্য ও পানীয় জল (আপনার সাধ্য ও ইচ্ছামতো দেবেন। একটা বাতাসা হলেও চলবে।)
৯। প্রণামী (অন্তত একটি টাকা দেবেন। ইচ্ছা করলে বেশিও দিতে পারেন।)
১০। একটি ঘণ্টা।

উপচার সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞাতব্য হল এই যে, চন্দন, ফুল-বেলপাতা, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য এই পঞ্চোপচার পূজার ক্ষেত্রে অপরিহার্য্য। কোনো একটি উপচারের অভাব ঘটলে, সেই উপচারের নাম করে একটু জল দিলেও চলবে। আপনার প্রকৃত ভক্তিই সেই অভাব পূর্ণ করবে, এই কথা জানবেন।

শিবপূজা সর্বদা উত্তরমুখে বসে করবেন এবং শিবলিঙ্গকেও উত্তরমুখী করে রাখবেন। উত্তরদিক ব্রহ্মলোকপথ। তাই পরমব্রহ্মময় শিবের পূজা সর্বদা উত্তরমুখে বসে করাই নিয়ম। শিবলিঙ্গকে তামা বা পাথরের পাত্রে বসানো হয়ে থাকে।

পূজার সাধারণ ক্রম ও সেই সব ক্রিয়াকাণ্ডের অর্থ
==================================
মন্ত্রপাঠ ও ক্রিয়াকাণ্ড অর্থ জেনে করাই উচিত। তাই পূজাপদ্ধতি-বলার আগে তার ক্রম ও ক্রিয়াকাণ্ডের ভাবার্থ বলে দেওয়া ভাল। প্রথমেই আচমন করতে হয়। দেহ ও মন শুদ্ধ না হলে ঈশ্বরপূজার অধিকার জন্মায় না। তাই পূজার সময় প্রথমেই দেহ ও মন শুদ্ধ করতে হয়। দেহ ও মন শুদ্ধ করব কিভাবে? এর উপায় বিষ্ণুস্মরণ। আচমনের মন্ত্রের অর্থটি তাই—‘ আকাশে সূর্যের মতো বিদ্যমান ঈশ্বরকে ব্রহ্মজ্ঞরা সর্বদা দর্শন করেন, আমরাও যেন তাঁর স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারি। যে বিষ্ণু সকল অপবিত্রতা দূর করেন, সেই বিষ্ণুকে স্মরণ করে আমরাও যেন দেহে ও মনে শুদ্ধ হতে পারি।’ তারপর স্বস্তিবাচন। স্বস্তিবাচন হল পূজার সাফল্য ও অপরের কল্যাণ কামনা। অপরের কল্যাণ কামনা না করলে কোনো পূজা ফলপ্রসূ হয় না। অপরের অকল্যাণ কামনা করে পূজা করলে, নিজেরই অকল্যাণ হয়। তাই পূজার আগে বিশ্বের সকলের কল্যাণ কামনা করতে হয়।

তারপর জলশুদ্ধি করতে হয়। জলশুদ্ধি আর কিছুই না, যে জলে দেবতার পূজা হয়, সেই জলে তীর্থের আবাহন। জলশুদ্ধির মন্ত্রে সূর্যমণ্ডল থেকে গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু, কাবেরী—এই সপ্ত পবিত্র নদীদেবীকে জলে আহ্বান করে জলকে শুদ্ধ করে নেওয়া হয়। সেই জল নিজের মাথায় দিলে তীর্থস্নানের ফল হয় আর পূজাদ্রব্যের উপর দিলে সেই সব দ্রব্য শুদ্ধ হয়ে যায়। তারপরসূর্যার্ঘ্য দিতে হয়। সূর্য আমাদের প্রাণের উৎস, সে কথা আধুনিক বিজ্ঞানও মানে। তাই হিন্দুদের পূজার আগে সূর্যকে অর্ঘ্য দিয়ে প্রণাম করার নিয়ম। প্রত্যক্ষ দেবতার প্রতি এ আমাদের বিশেষ শ্রদ্ধাপ্রদর্শন। এরপর গুরুদেব, পঞ্চদেবতা, নবগ্রহ, ইন্দ্রাদি দশদিকপাল, দশমহাবিদ্যা, দশাবতার ও ইষ্টদেবতা এবং সর্বদেবদেবীর পূজা। এর মাধ্যমে অন্যান্য দেবদেবীদেরও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়। আপনার ঠাকুরের আসনে অন্যান্য ঠাকুরদেবতার ছবি বা বিগ্রহ থাকলে, তাঁদেরও এই সময় পূজা করে নেবেন।

তারপর শিবকে স্নান করানো হয়। এখান থেকেই প্রধান পূজা শুরু। স্নানের পর শিবের ধ্যান করে প্রথমে মনে মনে ও পরে উপচারগুলি নিবেদন করে পূজা করবেন। এই সব উপচারই তো ঈশ্বরের সৃষ্ট। তবে এগুলি দিয়ে কেন ঈশ্বরের পূজা করা হয় কেন? কেনই বা এই সব উপচার দেওয়ার নিয়ম। ঈশ্বর আমাদের মালিক, আমরা তাঁর দাস। আমাদের বাড়ির কাজের লোক, নিজের বাড়ি থেকে জিনিসপত্র এনে আমাদের ঘরের কাজ করে দেয়? আমাদেরই তাকে সামগ্রী জোগাতে হয়। সেই সামগ্রী দিয়ে সে আমাদেরই সেবা করে। ঈশ্বর তেমনই জগতের সব কিছু সৃষ্টি করেছেন, সেই সৃষ্টি দিয়ে যেন আমরা তাঁর সেবা করতে পারি। যে পঞ্চোপচার পূজার কথা বলা হয়েছে, সেই পঞ্চোপচার—অর্থাৎ, গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য হল আমাদের প্রাণধারণের প্রধান অবলম্বন পৃথিবী, আকাশ, বায়ু, আগুন ও জলের প্রতীক। এই সব উপচার দেওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা মনে করি, ঈশ্বরের সৃষ্টি এই সব জিনিস আমরা ঈশ্বরের প্রসাদ রূপে গ্রহণ করছি, স্বার্থপরভাবে আপনার সুখের জন্য ভোগ করছি না। উপরন্তু স্বয়ং আমাদের এইভাবেই তাঁর পূজা করতে শিখিয়েছেন। একথাও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। পূজার পর জপ করা হয়। জপমাহাত্ম্য দীক্ষিত ব্যক্তিমাত্রেই জানেন, তাই তা আর বলা হল না। জপের পর প্রণাম। প্রণাম করার আগে প্রণামী দেওয়া হয়। এটিও প্রতীকী। আমাদের অর্থাগম হয় ঈশ্বরের কৃপায়, তাই অর্থের অহংকারে আমরা যেন ঈশ্বরকে না বিস্মৃত হই এবং ঈশ্বরের দেওয়া অর্থে ঈশ্বরের সেবায় কোনো কার্পণ্য না দেখাই। অন্য মতে, ঈশ্বরকে আমরা যা দিই, তাই ঈশ্বর সহস্রগুণে আমাদের ফিরিয়ে দেন। প্রণামীর টাকা নিজের কোনো কাজে ব্যবহার করবেন না। বরং গরিবদুঃখীকে দেবেন। তাতে ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’ হবে। কিন্তু এটি সকাম ভক্তদের মত। পূজার পর স্তবপাঠাদি করা হয়। এতে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি বাড়ে। ঈশ্বরও স্তবপাঠ শুনে প্রসন্ন হন।

পূজাপদ্ধতি
----------------
প্রথমে স্নান ও গুরুনির্দেশিত উপাসনাদি সেরে আসনে বসে শিব ও দুর্গাকে প্রণাম করবেন। তারপর শ্রীগুরু ও ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করে ইষ্টমন্ত্র যথাশক্তি জপ করবেন। অদীক্ষিত ও বালকবালিকারা শুধু স্নান সেরে শিবদুর্গাকে প্রণাম করে বসবেন। পূজাস্থান আগেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ধূপদীপ জ্বালিয়ে নেবেন। তারপর নারায়ণকে মনে মনে নমস্কার করে পূজা শুরু করবেন।

মন্ত্রপাঠ সহ পূজা
-------------------------
হাতের তালুতে দু-এক ফোঁটা জল নিয়ে ‘ওঁ বিষ্ণু’ মন্ত্রে পান করবেন। মোট তিন বার এইভাবে জল পান করতে হবে। তারপর করজোড়ে বলবেন—
ওঁ তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ দিবীব চক্ষুরাততম্।
ওঁ অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সর্বাবস্থাং গতোঽপি বা।
যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তরঃ শুচিঃ।।

তারপর পবিত্র বাদ্য ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে স্বস্তিবাচন করবেন—

ওঁ কর্তব্যেঽস্মিন্ শ্রীশিবপূজাকর্মণি ওঁ পূণ্যাহং ভবন্তো ব্রুবন্তু।
ওঁ পূণ্যাহং ওঁ পূণ্যাহং ওঁ পূণ্যাহং।
ওঁ কর্তব্যেঽস্মিন্ শ্রীশিবপূজাকর্মণি ওঁ স্বস্তি ভবন্তো ব্রুবন্তু।
ওঁ স্বস্তি ওঁ স্বস্তি ওঁ স্বস্তি।
ওঁ কর্তব্যেঽস্মিন্ শ্রীশিবপূজাকর্মণি ওঁ ঋদ্ধিং ভবন্তো ব্রুবন্তু।
ওঁ ঋদ্ধতাম্ ওঁ ঋদ্ধতাম্ ওঁ ঋদ্ধতাম্।
ওঁ স্বস্তি ন ইন্দ্রো বৃদ্ধশ্রবাঃ স্বস্তি নঃ পূষা বিশ্ববেদাঃ।
স্বস্তি নস্তার্ক্ষ্যো অরিষ্টনেমিঃ স্বস্তি নো বৃহস্পতির্দধাতু।
ওঁ স্বস্তি ওঁ স্বস্তি ওঁ স্বস্তি।

এরপর হাত জোড় করে বলবেন—

ওঁ সূর্যঃ সোমো যমঃ কালঃ সন্ধ্যে ভূতান্যহঃ ক্ষপা। পবনো দিক্পতির্ভূমিরাকাশং খচরামরাঃ।
ব্রাহ্মং শাসনমাস্থায় কল্পধ্বমিহ সন্নিধিম্।।

এরপর জলশুদ্ধি করে নেবেন। জলশুদ্ধির মাধ্যমে সূর্যমণ্ডল থেকে সকল তীর্থকে জলে আহ্বান করে জলকে পবিত্র করা হয়। তারপর সেই পবিত্র জলে পূজার কাজ হয়। ঠাকুরের সামনে নিজের বাঁ হাতের কাছে কোশা রেখে তাতে জল দেবেন। সেই জলে আলতো করে ডান হাতের মধ্যমা আঙুল ঠেকিয়ে (নখ যেন না ঠেকে) বলবেন— ওঁ গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরি সরস্বতি। নর্মদে সিন্ধু-কাবেরি জলেঽস্মিন সন্নিধিং কুরু। তারপর সেই জলে একটা সচন্দনফুল দিয়ে মনে মনে তীর্থদেবতাদের পূজা করবেন। এতে সকল তীর্থের পূজা করা হয়ে যায়। তীর্থপূজা সেরে নিয়ে সেই জল নিজের মাথায় একটু দেবেন। তারপর পূজার সকল দ্রব্যে ছিটিয়ে সব কিছু শুদ্ধ করে নেবেন। তারপর সূর্যের উদ্দ্যেশ্যে একটু জল শিবলিঙ্গে দেবেন। সূর্যকে জল দিয়ে সূর্যপ্রণাম করবেন—
ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্।
ধ্বান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোঽস্মি দিবাকরম্।।

তারপর একে একে গণেশ, শ্রীগুরু, শিব, সূর্য, নারায়ণ, দুর্গা, নবগ্রহ, দশমহাবিদ্যা, দশাবতার, সর্বদেবদেবী ও আপনার ঠাকুরের আসনে অন্যান্য ঠাকুরদেবতা থাকলে তাঁদেরকে এবং আপনার ইষ্টদেবতাকে প্রত্যেককে একটি করে সচন্দন ফুল দিয়ে পূজা করবেন। অত ফুল না থাকলে প্রত্যেকে নামে জলশুদ্ধির জল একটু করে শিবলিঙ্গে দেবেন। শিবলিঙ্গে সব দেবদেবীর পূজা হয়, তাই কোনো দেবতার ছবি বা মূর্তি আপনার কাছে না থাকলে তাঁর বা তাঁদের পূজা শিবলিঙ্গেই করতে পারেন।

তারপর শিবঠাকুরকে স্নান করাবেন। একঘটি জল নেবেন। তাতে জলশুদ্ধির জল একটু মিশিয়ে নিতে পারেন বা জলশুদ্ধির পদ্ধতিতে সেই জলটিকেও শুদ্ধ করে নিতে পারেন। তারপর স্নানের মন্ত্রটি পড়ে বাঁ হাতে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে স্নান করাবেন। স্নানের মন্ত্রটি হল—

ওঁ ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্।
উর্বারুকমিব বন্ধনান্মৃত্যোর্মুক্ষীয় মাঽমৃতাত্।।

ওঁ তত্পুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহি তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াত্ ওঁ।

স্নান করিয়ে শিবের ধ্যান করবেন (ধ্যানের মন্ত্রটি বঙ্গানুবাদ সহ শেষে দেওয়া আছে) চোখ বন্ধ করে শিবের রূপটি চিন্তা করতে করতে ধ্যানমন্ত্রটি স্মরণ করে ধ্যান করতে পারেন। মন্ত্রটি মুখস্ত না থাকলে, প্রথমে একবার পাঠ করে নিয়ে চোখ বুজে শিবের রূপ ধ্যান করবেন। এইভাবে কয়েক বার করলেই মন্ত্র মুখস্ত হয়ে যাবে, তখন আর মন্ত্রপাঠ না করলেও চলবে। ধ্যানের সময় ভাববেন, আপনি চন্দন, ফুল, বেলপাতা, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য দিয়ে সাক্ষাত্ শিবের পূজা করছেন। শিবঠাকুরও প্রসন্ন হয়ে আপনার পূজা নিচ্ছেন।

এইভাবে কিছুক্ষণ ধ্যান করে পঞ্চোপচারে পূজা করবেন। প্রথমে একটি ফুলে চন্দন মাখিয়ে গন্ধদ্রব্য দেবেন। মন্ত্র—ওঁ নমো শিবায় এষ গন্ধঃ শিবায় নমঃ। তারপর আবার একটি সচন্দন ফুল দিয়ে বলবেন— ওঁ নমো শিবায় ইদং সচন্দনপুষ্পং শিবায় নমঃ। তারপর চন্দনমাখানো বেলপাতা নেবেন— ওঁ নমো শিবায় ইদং সচন্দনবিল্বপত্রং শিবায় নমঃ।—মন্ত্রে বেলপাতাটি শিবের মাথায় দেবেন। তারপর ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য ও জল দেবেন—ওঁ নমো শিবায় এষ ধূপঃ শিবায় নমঃ। ওঁ নমো শিবায় এষ দীপঃ শিবায় নমঃ।ওঁ নমো শিবায় ইদং সোপকরণনৈবেদ্যং শিবায় নিবেদয়ামি। ওঁ নমো শিবায় ইদং পানার্থোদকং শিবায় নমঃ। মালা থাকলে ‘ওঁ নমো শিবায় ইদং পুষ্পমাল্যং শিবায় নমঃ’ মন্ত্রে পরাবেন। তারপর সচন্দন ফুল ও বেলপাতা নিয়ে ১, ৩ বা ৫ বার নিম্নোক্ত মন্ত্রে পুষ্পাঞ্জলি দেবেন—ওঁ নমো শিবায় এষ সচন্দনপুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলি নমো শিবায় নমঃ। এরপর অঙ্গপূজা করতে হয়। অঙ্গপূজা হল শিবের পরিবার ও সাঙ্গোপাঙ্গোদের পূজা।—
ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ গৌর্যৈ নমঃ। ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ অষ্টমূর্তিভ্যো নমঃ। ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ ব্রাহ্ম্যাদ্যাষ্টমাতৃকাভ্যো নমঃ। ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ গণেভ্যো নমঃ। ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ বৃষভায় নমঃ।
এই পাঁচটি মন্ত্র পড়ে প্রত্যেকের নামে একটি করে ফুল বা একটু করে জলশুদ্ধির জল দেবেন।
তারপর আপনার গুরুমন্ত্র ১০৮ বার জপ করবেন। জপ করে হাতে একটু জল নিয়ে শিবকে দিয়ে বলবেন, এই নাও আমার জপের ফল, আমি তোমাকেই সমর্পণ করলাম।
তারপর ঠাকুরকে একটি টাকা (ইচ্ছা করলে বেশিও দিতে পারেন) প্রণাম করবেন—

নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয়হেতবে।
নিবেদয়ামি চাত্মানং গতিস্তং পরমেশ্বরম্।।

পূজার পর সময় পেলে শিবের স্তবস্তোত্রাদিও পাঠ করতে পারেন।

মন্ত্রপাঠে অসমর্থ ব্যক্তিদের জন্য
======================
প্রথমে মনে মনে বিষ্ণুকে স্মরণ করে বলবেন—‘হে ঈশ্বর, তোমাকে আকাশের সূর্যের মতো যেন দেখতে পাই। তুমি পতিতপাবন, আমার সব পাপ মার্জনা করে, আমাকে দেহ ও মনে শুদ্ধ করে তোমার পূজার উপযোগী করে নাও।’ তারপর সর্বান্তকরণে বিশ্বের সকলের কল্যাণ কামনা করবেন। তারপর গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু ও কাবেরী—এই সাত নদীমাতাকে পাত্রের জলে আহ্বান করবেন। মনে করবেন, তাঁরা যেন সূর্যমণ্ডল থেকে নেমে এসে সেই জলে অবস্থান করলেন। তারপর একটি চন্দন-মাখানো ফুল দিতে তাঁদের পূজা করবেন। সেই জল মাথায় নেবেন, সকল পূজাদ্রব্যের উপর ছিটিয়ে দেবেন। পানের জল ছাড়া পূজার সব কাজে যেখানে জল দেওয়ার কথা আছে, সেখানে এই জলই দেবেন। তারপর কুশীতে করে একটু জল নিয়ে সূর্যের উদ্দেশ্যে দেখিয়ে শিবলিঙ্গের উপর দেবেন। সূর্যকে প্রণাম করবেন। তারপর একে একে গণেশ, শ্রীগুরু, শিব, সূর্য, নারায়ণ, দুর্গা, নবগ্রহ, দশমহাবিদ্যা, দশাবতার, সর্বদেবদেবী ও আপনার ঠাকুরের আসনে অন্যান্য ঠাকুরদেবতা থাকলে তাঁদেরকে এবং আপনার ইষ্টদেবতাকে প্রত্যেককে একটি করে সচন্দন ফুল দিয়ে পূজা করবেন। অত ফুল না থাকলে প্রত্যেকে নামে জলশুদ্ধির জল একটু করে শিবলিঙ্গে দেবেন। এবার ঘণ্টা বাজিয়ে এক ঘটি জলে শিবঠাকুরকে স্নান করাবেন। স্নানের জলে ওই সাত নদীমাতাকে আহ্বানকরা তীর্থজল একটু মিশিয়ে নেবেন। তারপর শিবের ধ্যানমন্ত্রটির বাংলা অর্থ ধরে মনে মনে তাঁর মূর্তিচিন্তা করবেন, ভাববেন তিনি আপনার হাত থেকে চন্দন, ফুল-বেলপাতা, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য গ্রহণ করছেন। তারপর একে একে ‘ওঁ নমো শিবায়’ বলে বলে ওই সকল উপচার শিবলিঙ্গে দেবেন বা শিবকে দেখাবেন। মালা থাকলে পরাবেন। তারপর পুষ্পাঞ্জলি দেবেন। কোনো উপচার না থাকলে, সেই উপচারের নাম করে জল দেবেন। তারপর মা গৌরী ও শিবের সাঙ্গোপাঙ্গোদের নামে দুটি ফুল বা একটু জল দেবেন শিবলিঙ্গে। তারপর জপ করে হাতে একটু জল নিয়ে সেই জল শিবকে দিয়ে বলবেন, এই নাও আমার জপের ফল আমি তোমাকে দিলাম। তারপর ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ মন্ত্রেই প্রণামী দিয়ে প্রণাম করবেন। সকল কাজই ভক্তিসহকারে করবেন। ঈশ্বর আপনার পূজা অবশ্যই গ্রহণ করবেন, এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখবেন।

ধ্যানমন্ত্র
========
ওঁ ধ্যায়েন্নিত্যং মহেশং রজতগিরিনিভং চারুচন্দ্রাবতংসং
রত্নাকল্পোজ্জ্বলাঙ্গং পরশুমৃগবরাভীতিহস্তং প্রসন্নম্।
পদ্মাসীনং সমন্তাত্ স্তুতমমরগণৈর্ব্যাঘ্রকৃত্তিং বসানং
বিশ্বাদ্যং বিশ্ববীজং নিখিলভয়হরং পঞ্চবক্ত্রং ত্রিনেত্রম্।।

ওঁ তত্পুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহি তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াত্ ওঁ।

বাংলা অর্থ— রজতগিরির ন্যায় তাঁহার আভা, যিনি সুন্দর চন্দ্রকে ভূষণরূপে ধারণ করিয়াছেন, যাঁহার দেহ রত্নময় বেশভূষায় উজ্জ্বল, যিনি পদ্মাসনে উপবিষ্ট, আনন্দময় মূর্তি, চতুর্দিকে দেবতারা তাঁহার স্তব করিতেছেন, যিনি ব্যাঘ্রচর্ম- পরিহিত, যিনি জগতের আদি, জগতের কারণ, সকল প্রকার ভয় নাশক, পঞ্চবদন এবং প্রতিটি বদনে তিনটি চক্ষু, সেই মহেশকে নিত্য এইরূপ ধ্যান করতে হবে।

--------------------------------------------------------------------------
কৃতজ্ঞতা স্বীকার -- আমার পূজ্যপাদ শ্রীশ্রীগুরুদেব।
লেখকঃ প্রীথিশ ঘোষ
0 comments

সতীর একান্ন পীঠের অন্যতম পাকিস্তানের হিংলাজে অবস্থিত দেবী হিঙ্গুলা


দক্ষকন্যা সতীর কী সেই আবেদন, যা এক ইসলামি দেশের ধু-ধু মরুতেও এতকাল ধরে জাগিয়ে রাখতে পারে হিন্দুদের একটি মরূদ্যান? হাজার হাজার বছর পরেও এখনও স্বমহিমায় উজ্জ্বল তাঁর কিংবদন্তি। এমনকী, তালিবানি পাকিস্তানেও !

গল্পটি সুবিদিত। পতিনিন্দা সহ্য করতে না পেরে আত্মাহুতি দিলেন সতী। ক্রোধে, শোকে জ্বলে উঠলেন স্বামী মহেশ্বর। সৃষ্টি বুঝি রসাতলে যায়। শেষ পর্যন্ত বিষ্ণুর চাতুরিতে রক্ষা পেল চরাচর। সুদর্শন চক্র সতীর দেহকে একান্ন টুকরোয় কেটে ছড়িয়ে দিল দশ দিকে। যে সব জায়গায় সেই দেহখণ্ডগুলি পড়ল, সেগুলি হল এক-একটি ‘পীঠ’। একান্ন পীঠ-এর মধ্যে ঊনপঞ্চাশটিই ভারতের বর্তমান ভূখণ্ডে, বাইরে মাত্র দু’টি। এক, তিব্বতে মানস ও দুই, বালুচিস্তানে হিংলাজ। এয়োস্ত্রীর সিঁদুর মাখা সিঁথি সহ সতীর ব্রহ্মরন্ধ্রটি পড়েছিল হিংলাজে। পুরাকথার সেই দেহাবশেষের উপরেই, অনেকটা বৌদ্ধ স্তূপের ধারণায় গড়ে উঠেছে একটি প্রার্থনাস্থল। বালুচিস্তানের রুক্ষ মরুপ্রান্তরে নিঃসঙ্গ হিন্দু তীর্থ।

হিংলাজে এই দেবী বহু প্রাচীন কাল থেকেই পরিচিত, তবে সে পরিচিতি ছিল নিতান্তই সীমিত— যেন কোনও আঞ্চলিক দলের মতো। সতীর একান্ন পীঠের অন্যতম বলে প্রচারিত হওয়ার পরে তাঁর মহিমা প্রসারিত হয়— আঞ্চলিক দল যেন এন ডি এ-র শরিক হল! জন্মসূত্রে অনার্য হিংলাজ স্থান পেলেন মহাশক্তির মহিমময় বলয়ে, ইতিহাসে দ্রুত হারিয়ে গেল তাঁর ক্ষুদ্র অতীত।
এমন ইতিহাস নিয়েও মরুতীর্থ হিংলাজ কিন্তু ততটা খ্যাতি পায়নি, যতটা তার পাওয়ার কথা ছিল। ভয়াল মরুভূমির মধ্য দিয়ে আড়াইশো কিলোমিটার যাত্রা মানে আসলে ভক্তির চূড়ান্ত পরীক্ষা (প্রতিটি তীর্থযাত্রীকেই সাহসিকতার জন্য ভারতরত্ন দেওয়া উচিত)। গোটা রাস্তাতেই ভয়ঙ্কর ডাকাতের উপদ্রব, আগে যেমন ছিল, এখনও তেমনই। তীর্থযাত্রী বলতে মূলত সিন্ধু এলাকার কিছু হিন্দু, তাঁরা নিয়মিত ভাবেই ডাকাতের হাতে পড়েন। দেবীর টানে আর যাঁরা আসতেন, তাঁরা বেশির ভাগই রাজপুত। রাজস্থান আর গুজরাতের রাজপুত। দেশভাগের পরে তীর্থযাত্রীদের সেই ধারাটাও স্বাভাবিক ভাবেই শুকিয়ে যায়। এর বাইরে আর যে অঞ্চলের মানুষের কাছে হিংলাজ কিছুটা পরিচিত ছিল, তার নাম বাংলা। তার কৃতিত্ব এক তান্ত্রিকের। নাম (কালিকানন্দ) অবধূত। তিনি দেশভাগের আগে হিংলাজ গিয়েছিলেন এবং সেই দীর্ঘ, কষ্টকর যাত্রার এক ভয়ানক বিবরণ লিখেছিলেন। তাঁর বইটি এই তীর্থযাত্রার একমাত্র আধুনিক বিবরণ। অবধূতের বইটি জনপ্রিয় হয়েছিল, পরে তা নিয়ে একটি খুব জনপ্রিয় সিনেমাও হয়, নায়কের ভূমিকায় ছিলেন উত্তমকুমার। তাই, বাঙালি মানসে ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ প্রবেশ করেছিল নিছক রোমান্টিক কারণে।

মূলত প্রাক্-আর্য জনজাতির সংস্কৃতি, যার শরীরে আর্যায়ণের ছাপ থাকলেও সেটা গভীরে ঢোকেনি। কিন্তু যে ভক্ত নয়, তাকেও স্বীকার করতে হবে, পরিবেশটি চমকপ্রদ। সঙ্কীর্ণ একটি পাহাড়ি গিরিখাত, তার মাঝে এক গুহা— প্রাকৃতিক গুহা, দীর্ঘদিন ধরে জল আর বাতাসের নিরন্তর অভিঘাতে যার সৃষ্টি। তার ভিতরেই দেবীর অবস্থান। গুহাটি অন্তত তিরিশ ফুট উঁচু, চওড়ায় কম করে ষাট থেকে সত্তর ফুট। গিরিসংকটের নীচে মৃদু গতিতে বয়ে চলেছে একটি নদী। এর উপস্থিতি, এবং মাঝে মাঝে অনুপস্থিতি দেখলে বিভ্রান্তি জাগতে পারে। ভারী বর্ষায় স্ফীত হয়ে ওঠে স্রোতস্বিনী। তখন এই গুহায় প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে যায়।গুহার ভিতরে সে অর্থে কোনও দেবীমূর্তি নেই। উপাস্য হিসাবে আছে একটি কাপড় জড়ানো, সিঁদুর মাখা প্রস্তরখণ্ড। দেখলে সম্ভ্রম জাগে। এখানেই পুজো দেয় লোকজন। দেবীর আসনের ঠিক নীচেই একটা অর্ধবৃত্তাকার সুড়ঙ্গ। তার মধ্যে হামাগুড়ি দিয়েই সারতে হয় প্রদক্ষিণ পর্ব। তবে হিংলাজের মাহাত্ম্য ঠিক কী, সেটা বোঝার জন্য পবিত্র ভক্তির প্রয়োজন।

জয় মা হিঙ্গুলা....... জয় মা হিঙ্গুলা....... জয় মা হিঙ্গুলা
 লেখকঃ প্রীথিশ ঘোষ

0 comments

হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী নরক ও শাস্তির বিবরণ

হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী নরক হল চির অন্ধকারময় তলবিহীন এমন এক স্থান যেখানে সর্বদা মন্দ রাজত্ব করে। পূরাণ গুলির মধ্যে অগ্নি পূরাণ মাত্র ৪ টি নরকের উল্লেখ করে। (এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল এখানে নরকের ধারণা এক হলেও নরকের রূপ ভিন্ন ভিন্ন; অপরাধের প্রকার অনুযায়ী শাস্তি এবং শাস্তির প্রকার অনুযায়ী নরকেরও পৃথক পৃথক নামাঙ্কন ও বর্ণনা করা হয়েছে।) মনুস্মৃতি ২১ প্রকার নরকের উল্লেখ করে। তবে ভাগবত্ পূরাণ, দেবী-ভাগবত্ পূরাণ, বিষ্ণু পূরাণ এবং গরুড় পূরাণ এরা প্রত্যেকেই ২৮ ধরনের ভয়ঙ্কর নরকের কথা বলে। তাই এই ২৮ নরককেই মূল নরক হিসেবে গণ্য করা হয়। এই মূখ্য নরক গুলি ছাড়াও সহস্রাধিক অন্যান্য নরকের কথা স্বীকার করা হয়েছে। হিন্দু ধর্মে মনে করা হয় কোন মানুষই সম্পূর্ণরূপে পাপী বা পূণ্যবান নয় তাই প্রত্যেকেরই আত্মাকে কোন না কোন নরকে যেতে হয় তবে নরক যেহেতু চিরশাশ্বত নয় সেহেতু শাস্তির সময়কাল শেষ হলেই সেই আত্মা কে মুক্তি দেওয়া হয়।
উপরোক্ত ২৮ টি নরক ও শাস্তির বিবরণ নিচে দেওয়া হল -----

১ তমিস্রা (অন্ধকার) --- স্ত্রী, সন্তান সমেত অন্যের সম্পত্তি হাতিয়ে নিলে -- এখানে অপরাধীকে বেঁধে রেখে খাদ্য এবং জল না দিয়ে ক্ষুধায় মারা হয়। যমদূতেরা তাকে ভর্তসনা ও প্রহার করতে থাকে যতক্ষন না সে ব্যথায় কাতর হয়ে পড়ে।

২ অন্ধতমিস্রা (অন্ধত্বের অন্ধকার) -- বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ ঘটিয়ে স্ত্রীলোকটিকে ভোগ করলে -- পাপী যতক্ষণ না তার চেতনা এবং দৃষ্টিশক্তি হারায় ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে অত্যাচার করা হয় এখানে। এই শাস্তিটির ব্যখ্যা -একটি বৃক্ষ কে একেবারে তার শিকড় থেকে ছেদ করার' সমান রূপে করা হয়।

৩ রৌরব (রুরু নামক হিংস্র জন্তুর নরক) --- হিংসাপরায়ন হয়ে শুধুমাত্র নিজেকে ও পরিবারকে ভালো রেখে কিন্তু অন্যান্য সকলের ক্ষতি করলে -- নরকে রুরু নামক সর্পসম জীবেরা সেই পাপীর শরীরকে ছিন্ন ভিন্ন করে।

৪ মহারৌরব (অতি হিংস্র) -- শুধুমাত্র নিজের সুখের খাতিরে অন্যের পরিবার, আত্মীয় ও সম্পত্তির সর্বনাশ করলে -- এই নরকে ক্রাব্যদ নামক অতীব হিংস্র রুরুগণ অপরাধীর শরীরের মাংস ভক্ষণ করে।

৫ কুম্ভিপাকম্ (পাত্রে ঝলসানো) --- পশু পাখিদের হত্যা করে তাদের পুড়িয়ে আহার্য করলে
-- যমদুতেরা অপরাধীকে একটি পাত্রে ফুটন্ত তেলের মধ্যে ততগুলি বছর ঝলসায় যতবছর না সেই সকল প্রাণীর শরীরে পুনরায় লোম জন্মায়।

৬ কালসূত্র (সময়ের ধাগা/মৃত্যু) --- একজন ব্রাহ্মণকে হত্যা করলে, গুরুজনদের শ্রদ্ধা না করলে
-- এই নরকের তল সম্পূর্ণ তামার তৈরী যা সর্বদা নিচে আগুন এবং উপরে সূর্যের তাপে চরম উত্তপ্ত হয়ে থাকে। পাপী এই তলে নিজের ভেতরে যেমন ক্ষুধা, তৃষ্ণায় জ্বলতে থাকে তেমনি সে শুতে, বসতে, দাঁড়াতে বা দৌড়াতে গেলে বাইরের উত্তপ্ত আঁচ তাকে রেহাই দেয় না।

৭ অসিপত্রবন/অসিপত্রকানন (যে বন এর পাতাগুলি তলোয়ার) --- পবিত্র বেদ এর ধর্মীয় শিক্ষা কে অগ্রাহ্য বা অবহেলা করে বৈধর্মে লিপ্ত হলে -- পাপী যমদূতের কষাঘাত থেকে পালিয়ে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে এই বনের দিকে ধাবিত হয় কিন্তু এখানকার গাছের পাতায় বিদ্ধ হয়। কষাঘাত ও তলোয়ারের ক্ষতের যন্ত্রনায় সে সাহায্যের জন্য চিত্কার করে ওঠে কিন্তু তার সেই চেষ্টা বিফলে যায়।

৮ শুকরামুখা (শুয়োরের মুখে) --- এই নরক রাজা এবং সরকারি ক্ষেত্রে জড়িত থাকা বিষেশ ব্যক্তি দের জন্য সংরক্ষিত যারা নির্দোষ কে শাস্তি এবং ব্রাহ্মণের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়
-- যমদূতেরা পাপীদের থেঁতলে, নিঙরে মারে যেমন ভাবে ইক্ষুদন্ড থেকে নির্যাস বের করা হয়। পাপীরা তীব্র যন্ত্রনায় ছটফট করে চিত্কার করে কাঁদতে থাকে ঠিক যেমন নির্দোষেরা কেঁদে উঠেছিল।

৯ অন্ধকূপম্ (অন্ধকারময় কুয়ো যার মুখটি লুকান) ---- মন্দ উদ্দেশ্য নিয়ে অন্যের ক্ষতি করলে, কীট পতঙ্গ দের হানি পৌছালে -- অপরাধী এখানে পশু, পাখি, সরীসৃপ, পতঙ্গ, জোঁক, কেঁচো এবং এগুলির ন্যায় অন্যান্য প্রভৃতি জীব দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নরকের যত্র তত্র ছুটতে বাধ্য হয়।

১০ কৃমিভোজনম্/কৃমিভক্ষ (কৃমিদেরআহার্য হওয়া) --- নিজের খাবার অতিথিদের, গুরুজনদের, শিশুদের অথবা ইশ্বরের সাথে ভাগ না করে স্বার্থপরের মত শুধু নিজে খেলে এবং পঞ্চ যজ্ঞ সম্পন্ন না করে খেলে; নিজের পিতা, ব্রাহ্মণ বা দেবতাদের ঘৃণার চোখে দেখলে এবং অলংকার নষ্ট করলে -- এই নরক হাজার যোজনা সরোবর যা কৃমিতে পরিপূর্ণ। পাপী ব্যক্তিকে কৃমিতে পরিণত করা হয় যাকে অন্য কৃমিদের খেয়ে বাঁচতে হয়। যার ফলস্বরূপ তাকে নিজেই নিজের শরীরকে হাজার বছর ধরে গিলে খেতে হয়।

১১ সন্দংশন্/সন্দম্স (চিম্টার নরক) ---- কোন ব্রাহ্মণ কে সর্বস্বান্ত করলে বা চরম দারিদ্রতা অবস্থার মধ্যে না থেকেও প্রয়োজন ছাড়া মূল্যবান রত্ন বা সোনা চুরি করলে, ব্রত বা বিশেষ নিয়মের লঙঘন করলে --- এখানে অপরাধীর শরীর উত্তপ্ত লাল লোহার গোলা এবং চিম্টা দিয়ে ছিন্ন ভিন্ন করা হয়।

১২ তপ্তসুর্মি/তপ্তমূর্তি (তপ্ত লাল লৌহ মূর্তি) ---- একজন পুরুষ অথবা নারী যে অপর নারী বা পুরুষ এর সাথে অবৈধ যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয় -- তাকে কষাঘাত করা হয় এবং বিপরীত লিঙ্গের তপ্ত লালাভ একটি লৌহমূর্তি কে আলিঙ্গন করতে বাধ্য করা হয়।

১৩ বজ্রকন্টক শাল্মলী (সুতির মত মলিন বৃক্ষ যা ধারণ করে বজ্রের মত কাঁটা) --- জন্তু -জানোয়ারদের সাথে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হলে অথবা মাত্রাতিরিক্ত যৌন ক্রিয়া করে থাকলে
-- যমদূতেরা পাপী কে এই বজ্রকন্টক শাল্মলী বৃক্ষে বেঁধে তার শরীরকে হিঁচড়ে টানতে থাকে যাতে তার শরীর ক্ষত-বিক্ষত এবং ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়।

১৪ বৈতরণী (অতিক্রম) ---- বিশ্বাস করা হয় এটি একটি নদী যা নরক এবং পৃথিবীর ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। সর্বদা মল, পস্রাব, ঘাম, রক্ত, পুঁজ, চুল, হাড়, অস্থিমজ্জা, নখ, মাংস, মেদ ইত্যাদিতে পরিপুষ্ট হয়ে নরক থেকে প্রবাহিত হয়ে আসা এই নদী পৃথিবীর আগে একটি গন্ডি অবধি সীমাবদ্ধ থাকে। হিংস্র জলজ জন্তুরা এখানে অপরাধীর শরীর থেকে মাংস খুবলে খুবলে ভোজন করে। -- ভাগবৎ এবং দেবী ভাগবৎ পূরাণ অনুসারে রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করা ব্যক্তি, একজন রাজবংশজাত ক্ষত্রিয়, সরকারি পদে নিযুক্ত থাকা ব্যক্তিরা যারা তাদের কর্তব্যকে অবহেলা করে তা পালন করতে অস্বীকার করে তাদের জন্য সংরক্ষিত ঘৃণ্য এই নরক।

১৫ পুয়োদা (পুঁজ মিশ্রিত জল) ----- শুদ্র পতিগণ বা নিম্ন বর্গীয় মহিলা যৌনকর্মীর এবং বেশ্যা মহিলার যৌন সঙ্গিরা যারা পরিচ্ছন্নতা বজায় না রেখে পশুর ন্যায় জীবনযাপন করে এবং সভ্য আচরণ করতে ব্যর্থ হয় তাদের জন্য এই নরক-- পাপীরা পুঁজ, মুত্র, ঘর্ম, শ্লেষ্মা, লালা এবং অন্যান্য বর্জ্য মিশ্রিত এক সমুদ্রে পতিত হয়। সেখানে তাদের ঐ নোংরা জল গিলতে বাধ্য করা হয়।

১৬ প্রাণরোধা (জীবনের রোধ) --- যে সকল দুশ্চরিত্র ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য ব্যক্তিগণ কুকুর বা গাধাকে সঙ্গে নিয়ে আত্ম বিনোদনের জন্য জঙ্গলে পশু শিকারের খেলায় উন্মত্ত হয় -- নরকে তাদের কেই শিকার বানিয়ে যমদূতগণ তিরন্দাজীর খেলা খেলে থাকে।

১৭ বিসাশনা (হত্যাপ্রবণ) ---- ভাগবৎপূরাণ এবং দেবী ৎ পূরাণ এর উল্লেখানুযায়ী কোন ব্যক্তি নিজের পদের তুলনায় অধিক প্রতিপত্তি লাভ করে এবং নিজের সামাজিক অবস্থা বয়ান করতে গর্বে পশু উত্সর্গ করে তাকে অবশেষে হত্যা করলে -- এই নরকে ঐ পাপী ব্যক্তি কে যমদূতেরা অনবরত কষাঘাত করে মারে।




১৮ লালাভক্ষম(লালা খাদ্য রূপে) ---- ভাগবৎ ও দেবী ভাগবৎ পূরাণ অনুসারে একজন ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য স্বামী নিজের যৌন জ্বালা মেটাতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্ত্রী কে নিজের বীর্য্যরস পান করাতে বাধ্য করলে -- সেই অপরাধিকে নরকে বীর্য্যরস পরিপূর্ণ একটি নদীতে নিক্ষেপ করা হয় যেখানে সে ঐ বীর্য্য পান করতে বাধ্য হয়।

১৯ সারমেয়দানা (সরমার হিংস্র পুত্রদের নরক) ---- লুন্ঠনকারীরা যারা সম্পত্তির লোভে অন্যের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, বিষক্রিয়া ঘটায়; রাজা এবং অন্যান্য সরকারি ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকেরা যারা কৌশলে ব্যবসায়ীদের অর্থ তছরূপ করে, যারা জনহত্যা এবং সমগ্র রাষ্ট্রের ভরাডুবির মত অপরাধে অংশগ্রহণ করে তাদের জন্য এই নরক -- -- এখানে হিংস্র বন্য কুকুর (সারমেয় - সরমার পুত্র-'সরমা' হলেন সংসারের সমস্ত কুকুরদের জননী) তাদের তীক্ষ্ন, ধারালো দাঁত দিয়ে যমদূত গণের আদেশে অপরাধিদের কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।

২০ অভিশ্চি/অভিশ্চিমত (প্রবাহহীন, জলহীন) ----- কোন ব্যক্তি মিথ্যা শপথ নিলে, ব্যবসায় মিথ্যা কথা বললে -- পাপীকে এখানে একশ' যোজন উঁচু একটি পর্বত যার দেওয়াল গুলি থেকে জলপ্রবাহের পরিবর্তে পাথর নির্গত হয় সেখান থেকে নিক্ষেপ করা হয়। যার ফলে তার শরীর অনবরত ভাঙতে থাকে তবে খেয়াল রাখা হয় যে সে যেন মারা না যায়।

২১ অয়হপান (লৌহ-পান) --- কোন ব্যক্তি ব্রত পালন করা কালীন বা একজন ব্রাহ্মণ ব্যক্তি মদ্য পান করলে --- এখানে যমদূতেরা পাপীদের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে গলন্ত লোহা গিলতে বাধ্য করে।

২২ ক্ষারকর্দমা(আম্লিক, লবণাক্ত কাদা): যে ব্যক্তি মিথ্যা অহংকারের বশে অন্য এমন ব্যক্তি যে তাঁর তুলনায় জন্মে, সাধনায়, জ্ঞানে, আচরণে, জাতিতে অথবা আধ্যাত্মিক অবস্থানে অনেক বড় তাকে অসন্মান করে -- এই নরকে যমদূতেরা পাপীকে এমনভাবে নিক্ষেপ করে যাতে সে যেন সরাসরি মাথায় চোট পায় এবং তারপর তার পাপীর ওপর অত্যাচার চালায়।

২৩ রাকষগণা-ভোজনা(রাক্ষসদের খাদ্যে পরিণত): যারা জীবন্ত মানুষের আত্মাহুতি, নরমাংস ভক্ষণপ্রথা পালন করে এই নরকে বন্দী হয় তারা --- তাদের হাতে নিহতরা এখানে রাক্ষস রূপে তাদেরকে ধারালো ছুরি ও অসি দিয়ে কাটে। তাদের রক্ত-মাংস ঐ রাক্ষসেরা মহানন্দে ভোজন করে এবং উদ্দম উল্লাসে নাচ-গান করে ঠিক যেমনভাব পাপীরা তাদের হত্যা করেছিল।

২৪ শূলপ্রথাম্ (তীক্ষ্ন শূল/বাণে বিদ্ধ) ----- কিছু মানুষ নিরীহ পশু বা পক্ষীদের উদ্ধার করার ভান করে আশ্রয় প্রদান করে কিন্তু তারপর সুতো, সুঁচ ইত্যাদি ব্যবহার করে তাদের উত্যক্ত করতে শুরু করে বা তাদেরকে প্রাণহীন খেলনার ন্যায় ব্যবহার করে। একই রকম ভাবে কিছু মানুষও অন্য মানুষের সঙ্গে এমনই আচরণ করে; প্রথমে ছল করে তাদের বিশ্বাস কে জিতে নিয়ে পরে তাদের ত্রিশূল বা বল্লম দিয়ে হত্যা করে -- নরকে এই সমস্ত অপরাধকারিদের শরীরকে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় ক্লান্ত করে ধারালো, সূচাগ্র শূলে বিদ্ধ করা হয়। ক্ষিপ্র, মাংসভোজী শকুন ও সারস জাতীয় পাখিরা তাদের শরীরের মাংস ছিড়ে গলা অবধি ভোজন করে।

২৫ দন্ডসুক(সর্প) --- বিদ্বেষ এবং উন্মত্ততায় পরিপূর্ণ হয়ে কিছু মানুষ অন্যদের সাপের ন্যায় হানি করে ----নরকে এদের পঞ্চ বা সপ্ত ফণাধারি বিশাল সর্প জীবন্ত গলাধঃকরণ করে।

২৬ অবাত-নিরোধনা(গহ্বরে আবদ্ধ ---: অন্যদের অন্ধকার কূপ, ফাটল বা পাহাড়ের গুহার মত স্থানে বন্দি করে রাখলে --- পাপিদের এই নরকে একটি অন্ধকারময় কুয়োর অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়া হয় যার মধ্যে বিষাক্ত গন্ধ ও ধোঁয়া ভরে উঠে তার শ্বাসরোধ করে।

২৭ পরয়াবর্তন (ফিরে যাওয়া) ---- গৃহকর্তা যে ক্রূর দৃষ্টিতে নিজের অতিথি কে/দের স্বাগত জানায় এবং দূর্ব্যবহার করে, এই নরকে তাকে উচিত্ শিক্ষা প্রদান করা হয় --- কঠোর দৃষ্টিধারি শকুন, সারস, কাক ও এই প্রজাতির পক্ষিগণ তার দিকে তাক করে এবং অকস্মাত্ উড়ে এসে তার চোখ দুটো তুলে নিয়ে যায়।

২৮ সূচিমুখা (সূচবিদ্ধ মুখমন্ডল) --- একজন সদা সন্দেহকারী ব্যক্তি যে সর্বদা অন্যদের নিজের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার চিন্তায় সন্দেহ করে; নিজ অর্থবলের অহংকারে পাপ কার্য করে লাভ ও তা জমিয়ে রাখার মত অপরাধ করে --- এই নরকে যমদূতেরা তার সর্বাঙ্গ ধাগা বুনে সেলাই করে।

 লেখকঃ প্রীথিশ ঘোষ
0 comments

বাড়ীর রান্না-ঘরের বাস্তু সম্বন্ধে

(১)- রান্না ঘর সর্বদা বাড়ীর দক্ষিণ-পুর্ব কোণে (অগ্নি কোণ) করাটাই অতিব শুভ..
(২)- যে সব বাড়ীতে রান্না ঘরের চুল্লী কিংবা ওভেনের সামনের দিকেই রান্না ঘরের প্রবেশ পথ থাকে অর্থাত্ কেউ সেখানে রান্না করলে তার ঠিক পিছনেই যদি রান্না ঘরের প্রবেশের দরজা থাকে তাহলে সেই রান্না ঘরে যারা রান্না করবেন বিশেষ করে মহিলাদের ঘাড়,, কাঁধ কিংবা কোমরে বাতের ব্যাথা হবার সম্ভবনা প্রবল থাকে.. কারন এটা একটা বাস্তু দোষ..
(৩)- আপনাদের বাড়ীর রান্না ঘরের রং সর্বদা লাল,, কমলা ইত্যাদি রঙের করার চেষ্টা করবেন..
(৪)- রান্না ঘরের রং সাদা করবেন না,, তাহলে এতে সেই পরিবারের কিংবা পরিবারের কর্তার মানসিক দিক দিয়ে ক্ষতি কিংবা মানসিক দুশ্চিন্তা কিছুটা হলেও চলে আসতে পারে..
(৫)- রান্না ঘরের রং কখনোও হলুদ করবেন না,, তাহলে আর্থিক দিক দিয়ে দুশ্চিন্তা কিছুটা হলেও চলে আসতে পারে..
(৬)- রান্না ঘরের রং কখনোও সবুজ করবেন না,, তাহলে সেই পরিবারের কেউ কেউ হঠাত্ করে নিজের বুদ্ধিভ্রংশের জন্য কিংবা ভ্রমের জন্য ক্ষতির শিকার হতে পারেন কিংবা পড়াশুনাতে হঠাত্ করে কমজোর হয়ে যেতে পারে ছাত্র-ছাত্রীরা....
(৭)- আপনাদের বাড়ীর রান্না ঘরকে আপনারা যতটা পারবেন পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করবেন,. কারণ,, একটা কথা মনে রাখবেন যে,, একটা পরিবারের মানুষদের মধ্যে উন্নতি করার প্রবনতা কতটা থাকে, সেটা একজন বাস্তুবিদ জ্যোতিষী সেই পরিবারের রান্না ঘর দেখেই কিন্তু বিচার করে থাকেন..


বিশেষ দ্রষ্টব্য :~ আপনারা সবাই সর্বদা জেনে রাখবেন যে.........মা লক্ষী দেবী প্রথমে আপনার বাড়ির রান্না ঘরে আগমন করেন.. তারপর আপনার সেই রান্না ঘর দেখে যদি তিনি সন্তুষ্ট হন, তবেই ......... মা লক্ষী দেবী আপনার বাড়ীর ঠাকুর ঘরে আগমন করবেন
0 comments

রুদ্রাক্ষের গুণাগুণ সম্পর্কে কিছু কথা

রুদ্রাক্ষ
=====
শিবপুরাণ হতে রুদ্রাক্ষের উৎপত্তি সন্মন্ধে যা জানা যায় ---
নারদ উবাচ-
" এবং ভূতানুভাবোঽয়ং রুদ্রাক্ষ ভবতাঽনঘ ।
বর্ণিতো মহতাং পূজ্যঃ কারণং তত্র কিং বদ্ ।। "
অর্থাৎ, নারদ নারায়ণকে প্রশ্ন করলেন - হে ভগবন্ অনঘ ! রুদ্রাক্ষের এই প্রকার প্রভাব এবং মহাপুরুষদের দ্বারা এই রুদ্রাক্ষ পূজিত হওয়ার কারন কি?

নারায়ণ উবাচ-
" এবমেব পুরা পৃষ্টো ভগবান গিরীশঃ প্রভুঃ ।
ষন্মুখেন চ রুদ্রস্তং যদুবাচ শৃণুস্ব তৎ ।। "
অর্থাৎ, নারায়ণ বললেন- হে নারদ ! এই কথা পূর্বে ভগবান গিরীশ শঙ্কর -কে তার পুত্র ষণ্মুখ অর্থাৎ কার্তিকেয় জিজ্ঞাসা করেছিলেন ।

শ্রী ঈশ্বর উবাচ-
"শৃণু ষ্ণমুখ তত্ত্বেন কথয়ামি সমাসতঃ ।
ত্রিপুরো নাম দৈত্ত্যস্তু পুরাঽসীৎ সর্বদূর্জয়ঃ ।।
হতাস্তেন সুরাঃ সর্বে ব্রহ্মাবিষ্ণাদি দেবতাঃ ।
সর্বৈস্তু কথিতে তস্মিংস্তদাহং ত্রিপুরং প্রতি ।
অচিন্ত্যং মহাশস্ত্রমঘোরাখ্যাং মনোহরম্ ।।
সর্বদেবময়ং দিব্যং জ্বলন্তং ঘোররূপী যৎ ।
ত্রিপুরস্য বধার্থায় দেবানাং তারণায় চ,
সর্ববিঘ্নপশমন মঘোরাস্ত্র মচিন্তয়ম্ ।।
দিব্যবর্ষ সহস্রং তু চক্ষুরুন্মীলিতং ময়া ।
পশ্চান্মাকুলাক্ষিভ্যঃ পতিতা জলবিন্দবঃ ।।
তত্রাশ্রুবিন্দুতো জাতা মহারুদ্রাক্ষ বৃক্ষকঃ ।
মমাজ্ঞয়া মহাসেন সর্বেষাং হিতকাম্যয়া ।।

--------- অর্থাৎ, ভগবান শঙ্কর বললেন- হে ষন্মুখ বা কার্ত্তিক ! মনোযোগ সহকারে এই তত্ত্ব শ্রবণ কর, আমি সংক্ষেপে তোমাকে বলছি । ত্রিপুর নামক দৈত্য অতীব দূর্জয় হয়ে উঠেছিল ।সেই অসুর ব্রহ্মা বিষ্ণু প্রভৃতি দেবতাকে পর্যন্ত স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করেছিল। দেবতাগন স্বর্গ বিচ্যুত হয়ে তাদের দুঃখের কাহীনি আমার কাছে এসে সবিস্তারে বলে। এই কথা শ্রবণ করে আমি ঐ অসুর কে বধ করার উদ্দেশ্যে ও দেবতাগনের রক্ষার্থে সর্বপ্রকার বিঘ্ন নাশ কারী এক সর্বদেবময় দিব্য মহাঅঘোরাস্ত্রের চিন্তা করেছিলাম । এক দিব্য সহস্র বৎসর চিন্তা করার পর আমি যখন আমার চোখ উন্মীলিত করি তখন আমার চোখ থেকে জলবিন্দু ভূমিতে পতিত হয়। সেই তৃ্তীয় নেত্র হতে পরা অশ্রুবিন্দু থেকে এক দিব্য বৃক্ষের উৎপত্তি হয়। হে মহাসেন ( কার্তিকের অপর নাম) আমার আদেশেই ঐ বৃক্ষ জগতের হিতার্থে উৎপন্ন হয়েছিল।"

সাধারণত কার্তিক মাসের শেষে বা অগ্রহায়ণ (বর্তমান বাংলা মাস) মাসের শুরুতে গাছটিতে ফল ধরা শুরু হয় । ফল এর উপরে গাঢ় নীল রঙের আবরণ থাকে যা ছিললে ঐ রুদ্রাক্ষ দেখা যায় । এর মধ্যে কিছু দাগ এর মত দেখা যায় যাকে আধ্যাত্মিক ভাষায় মুখ বলা হয়।
প্রাপ্তি স্থানঃ ভারতের উত্তর প্রদেশ, উত্তর কাশীর গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রী ক্ষেত্রে পাওয়া যায়। তিব্বতেও এটি পাওয়া যায়। ইন্দোনেশিয়া, জাভা, সুমাত্রা ও চীন দেশের কিছু অংশে রুদ্রাক্ষ উৎপন্ন হয়ে থাকে। এর মধ্যে নেপালের ভোজপুর জেলায় সবচেয়ে বেশি রুদ্রাক্ষ উৎপন্ন হয়। মূলত ২১ রকমের রুদ্রাক্ষ দেখা যায় এখন। তবে ১৪ থেকে ২১ মুখী রুদ্রাক্ষ দুষ্প্রাপ্য। বাজারে ১ থেকে ১৪ মুখী অবধি রুদ্রাক্ষ পাওয়া যায়। এর মধ্যে তিন, চার, পাঁচ ও ছয়মুখি রুদ্রাক্ষ বেশি পাওয়া যায়। একই সঙ্গে দুর্লভও বটে। এর বাইরে ত্রিজুতি, গৌরী শঙ্কর ও গণেশ নামেও রুদ্রাক্ষ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে কিংবা বাজারের হিসাবে, একমুখী গোলাকার রুদ্রাক্ষ সর্বোত্কৃষ্ট। প্রতিটি রুদ্রাক্ষের আলাদা ফল। নিজের দেহতত্বের সাথে মিলিয়ে যথার্থ রুদ্রাক্ষ পড়তে পারলে নবগ্রহ মানুষকে কৃপা করে। আসলে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে রুদ্রাক্ষ একটি পবিত্র ফল। মানসিক শান্তি ও পবিত্রতা এবং ধ্যানে এটি শতকের পর শতক ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে।

আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রমতে, এটি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি শুষে নেয়। ফলে মস্তিষ্ক, হূদযন্ত্রসহ শরীর সুস্থ ও সবল থাকে। এটি রক্তের স্বাভাবিক গতি সচল রাখে। উচ্চ রক্তচাপ, হিস্টিরিয়া, ক্ষয়রোধ, স্মৃতিশক্তিহীনতা, বদহজম প্রভৃতি রোগে উপশম এনে দেয়। স্নায়ুর ওপর থেকে চাপ কমিয়ে মানসিক শান্তি আনে রুদ্রাক্ষ। জ্যোতিষ শাস্ত্রে একে বাত, কৃমি, অশুভ গ্রহ প্রভাবের বিনাশক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

রুদ্রাক্ষের ব্যবহার কখনই শুধু সাধুসন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেই প্রাচীনকাল থেকেই গোটাবিশ্বে এর প্রতি কৌতূহল রয়েছে। বিভিন্ন দেশের নামিদামি মানুষ শুভকামনা, সুস্বাস্থ্য, সফলতা, আর্থিক উন্নতি এবং অশুভ শক্তি দূরে রাখতে রুদ্রাক্ষ দিয়ে তৈরি পণ্য শরীরে ধারণ করে আসছেন। আমজনতাও পিছিয়ে নেই, তারাও চেষ্টা করেন এর সুফল ভোগ করতে।
-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
রুদ্রাক্ষের গুণাগুণ
=============
বিভিন্ন শাস্ত্রে এক থেকে চৌদ্দমুখী পর্যন্ত রুদ্রাক্ষ ব্যবহারের যে নিয়ম, আচার ও অনুষ্ঠানের উল্লেখ আছে তা এখানে বলা হচ্ছে -----
একমুখী রুদ্রাক্ষ --- রুদ্রাক্ষের মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই শ্রেণীকে ‘শিব’ নামে অভিহিত করা হয়। রুদ্রাক্ষের সব গুণাগুণ সমস্তই এ শ্রেণির রুদ্রাক্ষের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। খুবই দুর্লভ শ্রেণির রুদ্রাক্ষ এবং অত্যন্ত মূল্যবানও বটে। বলা হয়, এই রুদ্রাক্ষ ধারণে মানুষ অপরাজেয় হয়। বিশেষ আধ্যাত্মিক উন্নতিও ঘটে। রুদ্রাক্ষের উজ্জীবন করতে হয়, মন্ত্র উচ্চারণ করে ডান বাহুতে বা কণ্ঠে এ রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে লোকপ্রভাবিনী শক্তির স্ফুরণ ঘটে। রাশিচক্রে রবিগ্রহ, পাপপীড়িত,পাপগ্রহদৃষ্ট, নীচস্থ পাপযুক্ত বা যে কোনোভাবে পীড়িত হলে এ গ্রহের শান্তির জন্য উপরোক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধ সংস্কারপূর্বক জপ করে ধারণ করলে রবিগ্রহের সমস্ত কুফল নষ্ট হয়।
-
দ্বিমুখী রুদ্রাক্ষ ---- এ জাতীয় রুদ্রাক্ষকে ‘হরগৌরী’ নামে অভিহিত করা হয়। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে মনের একাগ্রতা জীবনে শান্তি এনে দেয়। অজ্ঞাতসারে গোহত্যাজনিত পাপের স্খলন হয়। কুলকুলিনী শক্তি সম্পর্কে চেতনার সঞ্চার করে। মন্ত্র উচ্চারণসহযোগে এই রুদ্রাক্ষের উজ্জীবন হয়। মন্ত্র পাঠ করে ডান হাতে বা কণ্ঠে এ রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে ত্রিজন্ম সঞ্চিত পাপরাশি দূরীভূত হয়।
রাশিচক্রে কেতুগ্রহ নীচস্থ, পাপপীড়িত বা যে কোনোভাবে অশুভ হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি সংস্কারপূর্বক ১০৮ বার জপ করে ধারণ করলে কেতুগ্রহের সমস্ত কুফল নষ্ট হয়।
-
ত্রিমুখী রুদ্রাক্ষ ---- এ জাতীয় রুদ্রাক্ষের নাম ‘অগ্নি’। অতীত পাপ বিনষ্ট করে, মানুষের সৃজনীশক্তির বিকাশ সাধন করে, চিরকর্মচঞ্চল জীবনীশক্তিকে উন্নীত করে, ম্যালেরিয়া রোগ নিবারণ করে। মন্ত্র পাঠ করে দু’বাহুতে ধারণ করলে অসাধারণ শক্তির সঞ্চার হয়। রাশিচক্রে মঙ্গল বা যে কোনোভাবে পীড়িত হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধ সংস্কারপূর্বক জপ করে ধারণ করলে মঙ্গল গ্রহের সমস্ত কুফল নষ্ট হয়।
-
চতুর্মুখী রুদ্রাক্ষ --- জ্যোতিষী নাম ‘ব্রহ্মা’। মনের ক্রিয়াকলাপের উপরে এ শ্রেণির রুদ্রাক্ষের প্রভাব চমত্কার। সে কারণে উন্মত্ততা, অনিদ্রা, বিষাদময়তা ইত্যাদি মানসিক রোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করা হয়। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি হয়। তুচ্ছ বিষয়ে মানসিক অস্থিরতার উপশম হয়, মানসিক অবসাদ দূর হয়, উদ্বেগ, ভয়, খিটখিটে স্বভাব ও আত্মহনন-চিন্তা ইত্যাদির প্রকোপ হ্রাস করে। বক্তৃতা-ক্ষমতা, কর্মতত্পরতা ও বুদ্ধি বৃদ্ধির উন্মেষকারক এ রুদ্রাক্ষ। মন্ত্র পাঠ করে কণ্ঠে ধারণ করতে হয়। রাশিচক্রে চন্দ্রগ্রহ নীচস্থ, পাপযুক্ত ও পাপপীড়িত হয়ে দ্বিতীয়ে, ষষ্ঠে, অষ্টমে দ্বাদশে অবস্থান করলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধ সংস্কার করে ১০৮ বার জপের পর ডান হাতে ধারণ করলে চন্দ্রগ্রহের সমস্ত কুফল নষ্ট করে বিভিন্ন শান্তি ও সুখ বহন করে।
-
পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষ -- সর্বাধিক পরিচিত এবং সর্বত্রই এ রুদ্রাক্ষ পাওয়া যায়। এ রুদ্রাক্ষ দুই শ্রেণীর হয়ে থাকে। এর নাম ‘কালাগি রুদ্র’। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে নিষিদ্ধ খাদ্যগ্রহণ ও নিষিদ্ধ কর্ম সম্পাদনের পাপ অপনোদন হয়, মানসিক প্রশান্তি আসে। সন্ধ্যাকালে দেহের যে কোনো অংশে ধারণ করলে অখাদ্য ভোজনজনিত পাপ নষ্ট হয়। রাশিচক্রে শনিগ্রহ, রবিযুক্ত হলে লগ্নে, দ্বিতীয়ে, ষষ্ঠে, সপ্তমে, অষ্টমে, দ্বাদশে অবস্থান করলে বা যে কোনোভাবে শনিগ্রহ পাপপীড়িত, নীচস্থ ও অশুভ গ্রহযুক্ত হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি সংস্কারপূর্বক মন্ত্র জপ করলে ও পরে বীজমন্ত্র জপ করে ধারণ করলে শনিগ্রহের সমস্ত অশুভ ফল নষ্ট হয়।
-
ষড়মুখী রুদ্রাক্ষ ---- এ জাতীয় রুদ্রাক্ষের নাম ‘কার্তিকেয়’। ছাত্রদের পক্ষে ও যারা দুরারোগ্য রোগে ভুগছেন তাদের পক্ষে এ রুদ্রাক্ষ বিশেষ উপকারী। জ্ঞানবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ রুদ্রাক্ষর চমত্কার কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যায়। মন্ত্রযোগে রুদ্রাক্ষ উজ্জীবন করা হয়। ভূত-প্রেতাদি দ্বারা অনিষ্ট সাধনের ক্ষেত্রে প্রতিকাররূপে ধারণীয়। মানসিক অবসাদ, স্বভাবের উগ্রতা ও নানা রোগের উপকারকারী এ রুদ্রাক্ষ। রাশিচক্রে শুক্র কন্যায় নীচস্থ, অশুভ গ্রহযুক্ত দ্বিতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ, অষ্টম, দ্বাদশে অবস্থান করলে বা অশুভ হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি সংস্কারপূর্বক মন্ত্র জপের পর ধারণ করলে শুক্রগ্রহের সমস্ত অশুভ ভাব নষ্ট হয়।
-
সপ্তমুখী রুদ্রাক্ষ ---- এ শ্রেণির রুদ্রাক্ষের নাম অনন্ত মাতৃকা। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে সামাজিক প্রতিষ্ঠা, অর্থ মান, যশ ও প্রতিপত্তিলাভের পথ সুগম হয়ে থাকে। রাশিচক্রে রাহুগ্রহ রবি ও চন্দ্র যুক্ত হয়ে লগ্নে দ্বিতীয়ে, চতুর্থে, পঞ্চমে, ষষ্ঠে, সপ্তমে, অষ্টমে, নবমে, দশমে এবং দ্বাদশে অবস্থান করলে বা কোনোভাবে অশুভ হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ উজ্জীবন করতে হয়। ১০৮ বার মন্ত্র জপ করে উক্ত রুদ্রাক্ষ কণ্ঠে ধারণ করলে রাহু গ্রহের সমস্ত কুফল বিনষ্ট হয়।
-
অষ্টমুখী রুদ্রাক্ষ ---- এই রুদ্রাক্ষের দুটি নাম বিনায়ক ও বটুকভৈরব। শনিগ্রহ ও রাহুর অশুভ প্রভাব খর্ব করে। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে হঠাত্ আঘাত পাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। দুষ্কৃতকারীদের হাতে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
রাশিচক্রে শনি ও রাহু অশুভ থাকলে উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি সংস্কারপূর্বক পুরুষের ডান বাহুতে এবং স্ত্রীলোকের বাম বাহুতে ধারণীয়। নির্দিষ্ট মন্ত্রে পূজা করে এবং পরে জপ করে, বীজমন্ত্র জপ করে উক্ত রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে সমস্ত অশুভ প্রভাব দূরীভূত হয়।
-
নবমুখী রুদ্রাক্ষ ---- এ রুদ্রাক্ষের নাম মহাকাল ভৈরব। ধারণে জীবনে উন্নতির সূচনা যায়, সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জয়লাভ করা হয়। দুর্ঘটনা ও হঠাত্ মৃত্যুর হাত থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। ধারণের পূর্বে মন্ত্র উচ্চারণ করে এ রুদ্রাক্ষের উজ্জীবন বা প্রাণসঞ্চার করে নিতে হয়। মন্ত্র পাঠের পর উচ্চারণ করতে হয়। বুদ্ধিবৃত্তিজনিত কাজকর্মের ক্ষেত্রে নানাভাবে প্রচুর সুফল দান করে এ রুদ্রাক্ষ। রাশিচক্রে বৃহস্পতি গ্রহ মকরে নীচস্থ, মকরস্থানে অবস্থান করলে, বা মারকস্থ হলে এবং ষষ্ঠ, অষ্টম, দ্বাদশ স্থানে অবস্থান করলে কিংবা কোনোভাবে অশুভ হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উপরোক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধ সংস্কার পূর্বক ধারণের পর মন্ত্র জপ করে বৃহস্পতয়ে’ এ বীজমন্ত্র জপের পর পুরুষের দক্ষিণ বাহুতে এবং স্ত্রীলোকের বামবাহুতে ধারণ করলে সকল অশুভ বিনাশ হয়।
-
দশমুখী রুদ্রাক্ষ ---- এ শ্রেণির রুদ্রাক্ষ দুর্লভ। এর নাম মহাবিষ্ণু। মর্যাদা, প্রতিষ্ঠা, সুনাম, খ্যাতি, সন্মান, পার্থিব সমৃদ্ধি, কর্মদক্ষতা এবং ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জনে সহায়ক এ রুদ্রাক্ষ। প্রেতাদি কর্তৃক অনিষ্টকর প্রভাব থেকেও মুক্ত হওয়া যায়।
রাশিচক্রে বুধ গ্রহ নীচস্থ শত্রুযুক্ত ও শত্রুক্ষেত্রগত, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ, অষ্টম ও দ্বাদশ স্থানে অবস্থান করলে বা কোনোভাবে পীড়িত হলে উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক সংস্কার করে ধারণ করতে হয়। মন্ত্র পাঠ ও জপ করে জপের পর উক্ত রুদ্রাক্ষ কণ্ঠে ধারণ করলে সমস্ত অশুভ দূরীভূত হয়।
-
একাদশমুখী রুদ্রাক্ষ ---- এটি একটি বিশেষ জাতের রুদ্রাক্ষ। এর নাম মহামৃত্যুঞ্জয়। মেয়েদের নানা অসুখের ক্ষেত্রে একান্তভাবেই সুফল প্রদানকারী, আত্মবিশ্বাসের অভাব ঘটলে, আত্মহনন চিন্তা এসে মনকে ও মেজাজ খিটখিটে স্বভাবের হয়ে উঠলে এ রুদ্রাক্ষ ধারণে তার উপশম হয়। মন্ত্র উচ্চারণযোগে রুদ্রাক্ষ উজ্জীবিত করে ধারণ করা প্রয়োজন। রাশিচক্রে শুক্র ও মঙ্গল অশুভ থাকলে মন্ত্রে যথাবিধি সংস্কার করে মন্ত্র জপ করে ডান হাতে ধারণ করলে সমস্ত অশুভ প্রভাব নাশ হয়।
-
দ্বাদশমুখী রুদ্রাক্ষ ---- এর নাম অর্ক বা আদিত্য। এ রুদ্রাক্ষ রবি ও রাহুর অশুভ প্রভাবকে প্রশমিত করে। রবি যখন মকরে বা কুম্ভরাশিতে অবস্থিত হয়ে অশুভদশা প্রাপ্ত হয় তখন এ রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে সকল কুফল নষ্ট হয়। ব্যবসায়িক মন্দা বা অসাফল্য নিবারণ করতে মন্ত্র সহযোগে এ রুদ্রাক্ষকে উজ্জীবন করে ধারণ করতে হয়। মন্ত্র উচ্চারণ করে ১০৮ বার জপের পর রুদ্রাক্ষটি কণ্ঠে ধারণ করলে সমস্ত অশুভ বিনষ্ট হয়।
-
ত্রয়োদশমুখী রুদ্রাক্ষ ---- এর নাম কাম। এর ধারণে সর্বভাবেই কামনীয় বিষয়ের প্রাপ্তিযোগ ঘটে। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিপূরণ হয়। চিন্তামণি মন্ত্র সহযোগে এ রুদ্রাক্ষ উজ্জীবন করতে হবে। অতঃপর মন্ত্র ১০৮ বার বীজমন্ত্র জপ করে ডান হাতে ধারণ করলে সমস্ত পাপ দূর হয় ও সকল মনোরথ সিদ্ধি হয়। এর ধারণে চন্দ্র ও শুক্রের অশুভ প্রভাব নাশ হয়ে থাকে।
-
চতুর্দশমুখী রুদ্রাক্ষ: এই রুদ্রাক্ষ শ্রীকণ্ঠ নামে পরিচিত। এই রুদ্রাক্ষ ইন্দ্রিয় সংযমে সাহায্য করে। পঞ্চমুখ হনুমানমন্ত্র সহযোগে একে উজ্জীবিত করতে হয়। মন্ত্র পাঠ করে বীজমন্ত্র জপ করে ধারণ করলে শুক্রগ্রহের সমস্ত অশুভ বিনষ্ট হয়। মন্ত্র ১০৮ বার জপ করে ধারণ করলে বৃহস্পতি ও রবির সমস্ত অশুভ প্রভাব নষ্ট হয়ে থাকে।
.
জ্যোতিষমতে রুদ্রাক্ষ ধারণের বিধি ও ফলাফল বর্ণনা করা হলো। শুদ্ধচিত্তে সঠিক মন্ত্রোচ্চারণাদিপূর্বক রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে অবশ্যই ফল লাভ হবে। যেহেতু নকল রুদ্রাক্ষ দ্বারা প্রতারিত হবার আশঙ্কা আছে, তাই বিশেষজ্ঞ দ্বারা পরীক্ষা করিয়ে অনুষ্ঠানাদির জন্য যোগ্য পুরোহিতের সাহায্য নেয়া বাঞ্ছনীয়। সংক্রান্তি, অষ্টমী তিথি, চতুর্দশী তিথি, গ্রহণ, পূর্ণিমা বা অমাবস্যা ইত্যাদি পুণ্য তিথিতেই রুদ্রাক্ষ ধারণ বিধেয়। তিথির সঙ্গে শুভ নক্ষত্র যোগ দেখে নিতে হবে। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের উপদেশ মেনে চলা উচিত। বাহুতে বা কণ্ঠে স্বর্ণসূত্রে, রৌপ্যসূত্রে বা কার্পাসসূত্রে গ্রথিত করে পঞ্চগব্য, পঞ্চামৃত দ্বারা মহাস্নান করিয়ে উল্লিখিত মন্ত্রসহযোগে রুদ্রাক্ষকে উজ্জীবিত করে ভক্তিসহকারে ধারণের কথা শাস্ত্রে বলা হয়েছে।

লিখেছেনঃ প্রীথিশ ঘোষ
0 comments

শিবসূত্র


পাণিনির জন্মকাল সম্পর্কে মতভেদ আছে। এই সকল মতভেদ অনুসারে ধরা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০-৪০০ অব্দের মধ্যে পাণিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। গান্ধার রাজ্যের শালাতুর পল্লীকে তাঁর জন্মগ্রহণ জন্মস্থান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর পিতার নাম ছিল শলঙ্ক ও পাণিনির মায়ের নাম ছিল দাক্ষী।


পাণিনির জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে মগধের রাজধানী পাটলীপুত্রে। তাই কিছু পণ্ডিতের মতে পাণিনির পূর্বপুরুষেরা শালাতুর গ্রামের হলেও পাণিনির জন্ম হয়েছিল, পাটলীপুত্রে। পাণিনি ছিলেন একজন শিষ্ট। শিষ্টেরা ছিলেন এক ধরণের ব্রাহ্মণ। শাস্ত্রের ওপর ছিল তাঁদের অসামান্য অধিকার। পার্থিব সুখ, স্বাচ্ছন্দ বিসর্জন দিয়ে তাঁরা একটি বিশেষ অঞ্চলে বসবাস করতেন। বাসস্থানের উত্তরে ছিল হিমালয়, দক্ষিণে বিন্ধ্য পর্বতমালা, পূর্বে বঙ্গভূমি এবং পশ্চিমে আরাবল্লী পাহাড়ের রেখা।

পাণিনি পারিবারিক সূত্রে বেদোত্তর সনাতন পৌরাণিক ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। মূলত তিনি ছিলেন অহিগলমালার (শিব) উপাসক। সেইজন্য তাঁকে আহিক বলা হয়েছে। তাঁর শিক্ষকের নাম ছিল উপবত্স। তাঁর রচিত ব্যাকরণের নাম– অষ্টাধ্যায়ী। কথিত আছে, পাণিনি হিমালয়ে গিয়ে ১৮ দিন ধরে শিবের তপস্যা করে শিবকে সন্তুষ্ট করেন। নৃত্যের ভঙ্গীতে শিব ১৪ বার ঢক্কা বা ঢাক বাজান।প্রতিবার ঢাক বাজানোর সাথে এক একটি নতুন শব্দের সৃস্টি হলো। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে, নটরাজ মূর্ত্তি শিবের আর একটি প্রতিরূপ। নটরাজ মূর্ত্তি পৃথিবীর ছন্দ এবং তালের রূপক। ঢাকের শব্দ ছন্দ এবং তালের সমার্থক। তালবাদ্যের বোল অথবা বাণীর মাধ্যমে সমস্ত বর্ণকে প্রকাশ করা যায়। এবার, নৃত্যের ভঙ্গীতে শিব ১৪ বার ঢক্কা বা ঢাক বাজানর পর এক একটি নতুন শব্দের সৃষ্টি হলো। প্রতিটি শব্দ বিভিন্ন বর্ণের সমষ্টি। শিবসূত্রের প্রত্যেকটির নাম সংজ্ঞা বা সংজ্ঞাসূত্র। এই ১৪টি শিবসূত্র হলো—

১. অ ই উ ণ্
২. ঋ ৯ ক্
৩. এ ও ঙ্
৪. ঐ ঔ চ্
৫. হ য ৱ র ট্
৬. ল ণ্
৭. ঞ্ ম ঙ্ ণ ন ম্
৮. ঝ ভ ঞ
৯. ঘ ঢ ধ ষ্
১০. জ ব গ ড দ শ্
১১. খ র্ফ ছ ঠ থ চ ট ত ৱ্
১২. ক প য্
১৩. শ ষ স র্
১৪. হ ল্
0 comments

মুর্খ মানুষেরাই মনে করে ঈশ্বরের এই ভিন্ন ভিন্ন গুন এক একটি ঈশ্বর

ঈশ্বর বহু গুণাবলীর অধিকারী। শুধু মাত্র মুর্খ মানুষেরাই মনে করে ঈশ্বরের এই ভিন্ন ভিন্ন গুন এক একটি ঈশ্বর।

এই সন্দেহ গুলো দূর করার জন্য বেদে কয়েকটি মন্ত্র আছে যেখানে পরিষ্কার ভাবে উল্লেখ করেছে যে ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয় এবং তার কোন সহকারী, দূত, অবতার অথবা অধীনস্ত কোন কর্মচারী নেই যার মাধ্যমে আমরা ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবো। উদাহরন স্বরূপঃ

যর্যুরবেদ ৪০.১: এই সমস্ত বিশ্ব শুধু মাত্র একজন ঈশ্বর দ্বারা সৃষ্টি ও পরিচালিত হচ্ছে।কখনই অন্যায় করো না অথবা অন্যায় ভাবে সম্পদ অর্জনের ইচ্ছা করো না।


ঋগবেদ ১০.৪৮.১: ঈশ্বর সর্বত্রই বিদ্যমান এবং বিশ্ব ব্রক্ষান্ডকে পরিচালিত করেন। পৃথিবীতে একমাত্র তিনিই জয় ও শ্বাশত কারন প্রদান কারী। প্রতিটি আত্মা অবশ্যই তাঁকেই সন্ধান করবে যেমন করে একটি শিশু তারা বাবাকে খোঁজে। শুধুমাত্র তিনি আমাদেরকে খাদ্য ও স্বর্গীয় সুখ প্রদান করেন।

ঋগবেদ ১০.৪৮.৫: ঈশ্বর সমস্ত পৃথিবীকে আলোকিত করেন। তিনি অপরাজেয় এবং মৃত্যুহীনও। তিনি এই জগত সৃষ্টিকারী। সকল আত্মার উচিত পরম সুখ সন্ধান করা জ্ঞান অন্বেষণ ও কর্মের মধ্য দিয়ে। তারা কখনই ঈশ্বরের বন্ধুত্ব থেকে নিজেকে পরিহার করবে না।

ঋগবেদ ১০.৪৯.১: ঈশ্বরই সত্যের সন্ধানীদের সত্যজ্ঞান দিয়ে থাকেন। তিনিই শুধু জ্ঞানের প্রর্বতক এবং ধার্মিক ব্যাক্তিদের পরম সুখ লাভের জন্য পবিত্র কর্ম করতে উৎসাহী করেন। তিনিই একমাত্র জগতের সৃষ্টিকারী এবং এর পরিচালক। ঙটাই ঈশ্বর ব্যাতীত অন্য কারো উপাসনা করো না।

লেখকঃ প্রীথিশ ঘোষ
0 comments

আদি শঙ্কর (৭৮৮-৮২০ খ্রিস্টাব্দ)

আচার্য শঙ্কর ছিলেন একজন ভারতীয় দার্শনিক। ভারতীয় দর্শনের অদ্বৈত বেদান্ত নামের শাখাটিকে তিনি সুসংহত রূপ দেন। তাঁর শিক্ষার মূল কথা ছিল আত্মও ব্রহ্মের সম্মিলন। তাঁর মতে ব্রহ্ম হলেন নির্গুণ। আদি শঙ্কর অধুনা কেরল রাজ্যের কালাডি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি সারা ভারত পর্যটন করে অন্যান্য দার্শনিকদের সঙ্গে আলোচনা ও বিতর্কে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজের দার্শনিক মতটি প্রচার করেন। তিনি চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। এই মঠগুলি অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের ঐতিহাসিক বিকাশ, পুনর্জাগরণ ও প্রসারের জন্য বহুলাংশে দায়ী। শঙ্কর নিজে অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের প্রধান প্রবক্তা হিসেবে খ্যাত। এছাড়া তিনি হিন্দু সন্ন্যাসীদের দশনামী সম্প্রদায় ও হিন্দুদের পূজার সন্মত নামক পদ্ধতির প্রবর্তক। সংস্কৃত ভাষায় লেখা আদি শঙ্করের রচনাবলীর প্রধান লক্ষ্য ছিল অদ্বৈত তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা। সেযুগে হিন্দু দর্শনের মীমাংসাশাখাটি অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতার উপর জোর দিত এবং সন্ন্যাসের আদর্শকে উপহাস করত। আদি শঙ্কর উপনিষদ্ ও ব্রহ্মসূত্র অবলম্বনে সন্ন্যাসের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি উপনিষদ্, ব্রহ্মসূত্র ও ভগবদ্গীতার ভাষ্যও রচনা করেন। এই সব বইতে তিনি তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ মীমাংসা শাখার পাশাপাশি হিন্দু দর্শনের সাংখ্য শাখা ও বৌদ্ধ দর্শনের মতও খণ্ডন করেন। প্রচলিত মত অনুসারে, শঙ্কর বিজয়ম নামক বইগুলিতে শঙ্করের জীবনকথা লেখা আছে। এই বইগুলি আসলে মহাকাব্যের আকারে পদ্যে লেখা ইতিহাস-সম্মত জীবনী ও প্রচলিত কিংবদন্তির মিশ্রণ। এই জাতীয় কাব্যধারায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বই হল মাধব শঙ্কর বিজয়ম (মাধবের লেখা, ১৪শ শতাব্দী), চিদবিলাস শঙ্করবিজয়ম (চিদবিলাসের লেখা, ১৫শ থেকে ১৭শ শতাব্দী) ও কেরলীয় শঙ্কর বিজয়ম (কেরল অঞ্চলে প্রচলিত, রচনাকাল ১৭শ শতাব্দী)।

আচার্য শঙ্কর এক রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বাবার নাম ছিল শিবগুরু ও মায়ের নাম আর্যাম্বা। তাঁরা অধুনা কেরল রাজ্যের অন্তর্গত কালাডি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জনশ্রুতি, শঙ্করের বাবা-মা অনেক দিন ধরেই নিঃসন্তান ছিলেন। তাই তাঁরা ত্রিশূরের বৃষভচল শিবমন্দিরে পুত্রকামনা করে পূজা দেন। এরপর আর্দ্রা নক্ষত্রের বিশেষ তিথিতে শঙ্করের জন্ম হয়। শঙ্কর যখন খুব ছোট, তখন তাঁর বাবা মারা যান। এই জন্য শঙ্করের উপনয়নে দেরি হয়। পরে তাঁর মা উপনয়ন করান। শঙ্কর ছেলেবেলা থেকেই খুব বিদ্বান ছিলেন। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি চারটি বেদআয়ত্ত্ব করে নেন। সাত বছর থেকে শঙ্কর সন্ন্যাস গ্রহণের দিকে ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু তাঁর মা তাঁকে অনুমতি দিতে চাইছিলেন না। শেষে তিনি খুব আশ্চর্যজনকভাবে মায়ের অনুমতি পান। কথিত আছে, একদিন তিনি পূর্ণা নদীতে স্নান করছিলেন। এমন সময় একটি কুমির তাঁর পা কামড়ে ধরে। শঙ্করের মাও সেই সময় পূর্ণার তীরে উপস্থিত ছিলেন। তিনি মা-কে বলেন, মা যদি সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দেন, তাহলে কুমিরটি তার পা ছেড়ে দেবে। ছেলের প্রাণ বাঁচাতে মা তাঁকে সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দিলেন। তার পর থেকে কোনোদিন পূর্ণা নদীকে কোনো কুমিরকে দেখা যায়নি। শঙ্কর কেরল ত্যাগ করে গুরুর খোঁজে উত্তর ভারতের দিকে রওনা হলেন। নর্মদা নদীর তীরে ওঙ্কারেশ্বরে তিনি গৌড়পাদের শিষ্য গোবিন্দ ভগবদপাদের দেখা পান। গোবিন্দ শঙ্করের পরিচয় জানতে চাইলে, শঙ্কর মুখে মুখে একটি শ্লোক রচনা করেন। এই শ্লোকটিই অদ্বৈত বেদান্ত তত্ত্ব প্রকাশ করে। গোবিন্দ তা শুনে খুব খুশি হন এবং শঙ্করকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। গোবিন্দ শঙ্করকে ব্রহ্মসূত্রের একটি ভাষ্য লিখতে এবং অদ্বৈত মত প্রচার করতে বলেন। শঙ্করকাশীতে আসেন। সেখানে সনন্দন নামে এক যুবকের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়ে যায়। এই যুবকটি দক্ষিণ ভারতের চোল রাজ্যের বাসিন্দা ছিল। সে-ই প্রথম শঙ্করের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। কথিত আছে, কাশীতে বিশ্বনাথ মন্দির দর্শন করতে যাওয়ার সময় এক চণ্ডালের সঙ্গে শঙ্করের দেখা হয়ে যায়। সেই চণ্ডালের সঙ্গে চারটি কুকুর ছিল। শঙ্করের শিষ্যরা চণ্ডালকে পথ ছেড়ে দাঁড়াতে বললে, চণ্ডাল উত্তর দেয়, "আপনি কী চান, আমি আমার আত্মকে সরাই না এই রক্তমাংসের শরীরটাকে সরাই?" শঙ্কর বুঝতে পারেন যে, এই চণ্ডাল স্বয়ং শিব এবং তার চারটি কুকুর আসলে চার বেদ। শঙ্কর তাঁকে প্রণাম করে পাঁচটি শ্লোকে বন্দনা করেন। এই পাঁচটি শ্লোক "মণীষা পঞ্চকম্" নামে পরিচিত।বদ্রীনাথে বসে তিনি তাঁর বিখ্যাত ভাষ্য (টীকাগ্রন্থ) ও প্রকরণগুলি (দর্শনমূলক প্রবন্ধ) রচনা করেন। আদি শঙ্করের সবচেয়ে বিখ্যাত বিতর্কসমূহের মধ্যে অন্যতম ছিল আচার-অনুষ্ঠান
কঠোরভাবে পালনকারী মন্দন মিশ্রের সঙ্গে তর্ক। মন্দন মিশ্র এ দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতেন যে গৃহস্থের জীবন একজন সন্ন্যাসীর জীবনের থেকে অনেক শ্রেয়। সে সময়ে ভারতব্যাপী এ দৃষ্টিভঙ্গিকে ব্যাপকভাবে সম্মান করা হতো।এতদনুসারে তার সাথে আদি শঙ্করের বিতর্ক করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মন্দন মিশ্রের গুরু ছিলেন বিখ্যাত মীমাংসা দার্শনিক কুমারিলা ভট্ট। শঙ্কর কুমারিলা ভট্টের সাথে একটি বিতর্ক চান এবং তার সঙ্গে প্রয়াগে দেখা করেন যেখানে তিনি তার গুরুর বিরুদ্ধে করা পাপের জন্য অনুশোচনা করার জন্য নিজেকে একটি মৃদু জ্বলন্ত চিতাতে সমাহিত করেছিলেন: কুমারিলা ভট্ট তার বৌদ্ধ গুরুর নিকট মিথ্যা ছলে বৌদ্ধ দর্শন শিখেছিলেন একে অসত্য/অমূলক বলে প্রতিপন্ন করার জন্য। বেদ অনুসারে কেউ গুরুর কর্তৃত্বের অধীন থেকে তাঁর অজ্ঞাতসারে কিছু শিখলে তা পাপ বলে বিবেচিত হয়। সুতরাং কুমারিলা ভট্ট তার পরিবর্তে আদি শঙ্করকে মহিসমতিতে (বর্তমানে বিহারের সহরসা জেলার মহিষী নামে পরিচিত) গিয়ে মন্দন মিশ্রের সাথে দেখা করে তার সঙ্গে বিতর্ক করতে বলেন। পনের দিনের অধিক বিতর্ক করার পর মন্দন মিশ্র পরাজয় স্বীকার করেন, যেখানে মন্দন মিশ্রের সহধর্মিণী উভয়া ভারতী বিচারক হিসেবে কাজ করেন। উভয়া ভারতী তখন আদি শঙ্করকে 'বিজয়' সম্পূর্ণ করার জন্য তার সঙ্গে বিতর্কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য আহ্বান জানান। পরিশেষে তিনি উভয়া ভারতীর সকল প্রশ্নের উত্তর দেন; এবং উভয়া ভারতী বিতর্কের পূর্ব-সম্মত নিয়মানুসারে মন্দন মিশ্রকে
সুরেশ্বরাচার্য সন্ন্যাসী-নাম ধারণ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করার অনুমতি দেন। আদি শঙ্কর তারপর তাঁর শিষ্যদের সাথে নিয়ে মহারাষ্ট্র ও শ্রীশৈলম ভ্রমণ করেন। শ্রীশৈলে তিনি শিবের প্রতি ভক্তিমূলক স্তোত্রগীত রচনা করেন। মাধবীয়া শঙ্করাবিজয়াম অনুসারে যখন শঙ্কর কপালিক দ্বারা বলি হতে যাচ্ছিলেন, পদ্মপদাচার্যের প্রার্থনার উত্তরস্বরুপ ভগবান নরসিংহ শঙ্করকে রক্ষা করেন। ফলস্বরুপ আদি শঙ্কর লক্ষ্মী-নরসিংহ স্তোত্র রচনা করেন। তারপর তিনি গোকর্ণ, হরি-শঙ্করের মন্দির এবং কোল্লুড়েমুকাম্বিকা মন্দির ভ্রমণ করেন। কোল্লুড়ে তিনি এক বালককে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন যে বালকটিকে তার পিতামাতা বাকশক্তিহীন বলে মনে করতেন। শঙ্কর তার নাম দেন হষ্টমালাকাচার্য ("বৈঁচি-জাতীয় ফল হাতে কেউ", অর্থাৎ যিনি নিজেকে পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করেছেন) পরবর্তীতে তিনি সারদা পীঠপ্রতিষ্ঠা করতে শৃঙ্গেরী ভ্রমণ করেন এবং তোতাকাচার্যকে তাঁর শিষ্য বানান। এরপর আদি শঙ্কর অদ্বৈত দর্শনের বিরোধিতা করা সকল দর্শন অস্বীকারের দ্বারা এর প্রচারের জন্য দিগ্বিজয় ভ্রমণ শুরু করেন। তিনি দক্ষিণ ভারত হতে কাশ্মীর অভিমুখে ভারতের সর্বত্র এবং নেপাল ভ্রমণ করেন এবং পথিমধ্যে সাধারন মানুষের মাঝে দর্শন প্রচার করেন এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য পন্ডিত ও সন্ন্যাসীদের সাথে দর্শন বিষয়ে তর্ক করেন। মালায়ালী রাজা সুধনভকে সঙ্গী হিসেবে নিয়ে শঙ্কর তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং বিদর্ভের মধ্য দিয়ে যান। এরপর তিনি কর্ণাটকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন যেখানে তিনি একদল সশস্ত্রকাপালিকার সামনে পড়েন। রাজা সুদনভ তার সঙ্গীদের নিয়ে প্রতিরোধ করেন এবং কাপালিকাদের পরাজিত করেন। তারা নিরাপদে গোকর্ণে পৌঁছান যেখানে শঙ্কর বিতর্কে শৈবপন্ডিত নীলাকান্তকে পরাজিত করেন। সৌরাষ্ট্রের (প্রাচীন খাম্বোজা) দিকে অগ্রসর হয়ে এবং গিরনার, সোমনাথ ও প্রভাসার সমাধিমন্দিরসমূহ ভ্রমণ শেষে এবং এ সকল স্থানে বেদান্তের শ্রেষ্ঠত্ব ব্যাখ্যা করে তিনি দ্বারকাপৌঁছান। উজ্জয়িনীর ভেদ-অভেদ দর্শনের প্রস্তাবক ভট্ট ভাস্কর হতগর্ব হলেন। উজ্জয়িনীর সকল পন্ডিত (অবন্তী নামেও পরিচিত) আদি শঙ্করের দর্শন গ্রহণ করলেন। এরপর তিনি বাহলিকা নামক এক জায়গায় দার্শনিক বিতর্কে জৈনদের পরাজিত করেন। তারপর তিনি কাম্বোজা (উত্তর কাশ্মীরের এলাকা), দারোদা ও মরুভূমিটিতে অবস্থিত অনেক এলাকার কয়েকজন দার্শনিক এবং তপস্বীর উপর তাঁর বিজয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রকান্ড পর্বতচূড়া অতিক্রম করে কাশ্মীরে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে তিনি কামরুপে এক তান্ত্রিক নবগুপ্তের সম্মুখীন হন। আদি শঙ্কর কাশ্মীরে (বর্তমানে পাকিস্তান-দখলকৃত কাশ্মীর)সারদা পীঠ ভ্রমণ করেন। মাধবীয়া শঙ্করাবিজয়ম অনুসারে এ মন্দিরে চারটি প্রধান দিক থেকে পন্ডিতদের জন্য চারটি দরজা ছিল। দক্ষিণ দরজা (দক্ষিণ ভারতের প্রতিনিধিত্বকারী) কখনই খোলা হয়নি যা নির্দেশ করত যে দক্ষিণ ভারত থেকে কোনো পন্ডিত সারদা পীঠে প্রবেশ করেনি। সকল জ্ঞানের শাখা যেমনমীমাংসা, বেদান্ত এবং অন্যান্য হিন্দু দর্শনের শাখাসমূহে সকল পন্ডিতকে বিতর্কে পরাজিত করে আদি শঙ্কর দক্ষিণ দরজা খোলেন; তিনি সে মন্দিরের সর্বোৎকৃষ্ট জ্ঞানের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর জীবনের শেষদিকে আদি শঙ্কর হিমালয়ের এলাকা কেদারনাথ-বদ্রীনাথে
যান এবং বিদেহ মুক্তি ("মূর্তরুপ থেকে মুক্তি") লাভ করেন। কেদারনাথ মন্দিরের পিছনে আদি শঙ্করের প্রতি উৎসর্গীকৃত সমাধি মন্দির রয়েছে। যাহোক, স্থানটিতে তাঁর শেষ দিনগুলির বিভিন্ন পরম্পরাগত মতবাদ রয়েছে। কেরালীয়া শঙ্করাবিজয়াতে ব্যাখ্যাকৃত এক পরম্পরাগত মতবাদ তাঁর মৃত্যুর স্থান হিসেবে কেরালার থ্রিসুরেরবদাক্কুন্নাথান মন্দিরকে নির্দেশ করে। কাঞ্চী কামাকোটি পীঠের অনুসারীরা দাবি করেন যে তিনি সারদা পীঠে আরোহণ করেন এবং কাঞ্চীপুরমে (তামিলনাড়ু) বিদেহ মুক্তি লাভ করেন। আদি শঙ্কর হিন্দু ধর্মের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করার জন্য চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। এগুলো দক্ষিণে কর্ণাটকের শৃঙ্গেরীতে, পশ্চিমে গুজরাটের দ্বারকায়, পূর্বে ওড়িশার পুরীতে এবং উত্তরে উত্তরখন্ডের জ্যোতির্মঠে (জোসিরমঠে)। হিন্দু পরম্পরাগত মতবাদ বিবৃত করে যে তিনি এসব মঠের দায়িত্ব দেন তাঁর চারজন শিষ্যকে যথাক্রমে: সুরেশ্বরা, হষ্টমালাকাচার্য, পদ্মপদ এবংতোতাকাচার্য। এ চারটি মঠের প্রত্যেক প্রধান প্রথম শঙ্করাচার্যের নামানুসারে শঙ্করাচার্য ("পন্ডিত শঙ্কর") উপাধি গ্রহণ করেন। সেই সময় হিন্দুধর্ম নানাভাবে পিছিয়ে পড়েছিল। শঙ্করাচার্য সেই পিছিয়ে পড়া হিন্দুধর্মকে পুনরায় জাগিয়ে তোলার ব্যাপারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাঁর প্রচারকার্যের ফলে ভারতে বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্মের প্রভাব কমতে শুরু করে। মাত্র বত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর হিন্দুধর্ম সংস্কারের কথা আজও লোকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করে।
 লেখকঃ প্রীথিশ ঘোষ
0 comments

গুরুনানকের গুরুভক্তি বিষয়ক একটি ঘটনা

একবার গুরুনানক তাঁর কয়েকজন শিষ্যসহ ভ্রমণ করছিলেন তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত লাহিনাও সেই দলে ছিলেন। হঠাৎ বনের মধ্যে একটি মৃতদেহ তাঁর চোখে পড়ল। পচা মৃতদেহ একটা কাপড় দিয়ে ঢাকা।

গুরুনানক সেই দুর্গন্ধময় শবটি দেখিয়ে শিষ্যদেরকে বললেন---তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে, যে আমার কথায় পচা গলিত শবদেহ ভক্ষণ করতে পারে? গুরুর এইকথা শুনে সবাই অবোবদনে দাঁড়িয়ে রইলেন।

কেউ কেউ ভাবতে লাগলেন, গুরুজী কি আজ অপ্রকৃতিস্থ নতুবা এমন ন্যক্কারজনক প্রস্তাব কি করে করতে পারলেন? আমরা শিখ, অঘোর পন্থী ত নই ! নানক অধিকাংশ শিষ্যদের এই রকম মনোভাব বুঝে পুনরায় ঘোষণা করলেন---'নির্দ্ধিধায় যে বিনা বিচারে গুরুবাক্য পালন করতে পারে, সেই প্রকৃত শিখ।


প্রকৃত গুরুগতপ্রাণ শিখই পরম পদ অর্থাৎ 'অলখ্নিরঞ্জনতত্ত্ব' উপলব্ধির যোগ্য আধার। যারা তা পারে না, তারা গুরুর চারধারে থেকে কেবলই ভীড় বাড়ায়'। নত মস্তক সব শিষ্য নীরবে গুরুর এই ধিক্কার শুনলেন, কিন্তু তাঁর আদেশ পালন করতে এগিয়ে এলেন না। লাহিনাকে দেখা গেল, তিনি ধীরে মৃতদেহের কাছে করজোড়ে বললেন --- গুরুজী আপনি দয়া করে বলে দিন, এই মৃতদেহের কোন অংশ থেকে আমি সর্বপ্রথম খেতে আরম্ভ করব ?

লাহিনার কথা শুনে তার গুরুভ্রাতারা স্তম্ভিত। কিন্তু নানক শান্ত কণ্ঠেই উত্তর দিলেন, 'কোমরের দিক থেকেই আরম্ভ কর'। গুরুর বাক্য শেষ হতে না হতেই নির্বিকার চিত্তে লাহিনা শবদেহ কামড় দেবার জন্য হাঁ করে ঝুকে পড়লেন। কিন্তু শবদেহ থেকে চাদরের আচ্ছাদন তুলতে দেখা গেল, সেখানে থরেথরে সুমিষ্ট ফল ও মিষ্টান্ন দ্রব্য সাজানো রয়েছে।

বিস্ময়ে হতবাক শিষ্যরা ভাবলেন, ও হল সর্বশক্তিমান গুরুজীর এক অত্যাশ্চর্য বিভূতির খেলা! গুরুনানক চেলাদের ভাব-ভাবনার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে লাহিনার মাথায় হাত দিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলতে লাগলেন---'এ আমার কোন বিভূতি নয়, তোমার গুরুভক্তির গুণেই এই অসম্ভব সম্ভব হয়েছে।' -------- ওঁ শ্রী গুরবে নমঃ।
0 comments

ভগবান বিষ্ণুর পররিয়য় , রুপ , পূজার নিয়ম ও মাহাত্ম্য

বিষ্ণুর পরিচয়
========

ঈশ্বরের সৃষ্টিকারী শক্তি যে দেবতা পালন করেন, তার নাম বিষ্ণু। বিশ্বকে প্রকাশ করে বিরাজ করেন বলে তার নাম বিষ্ণু। বেদে বিষ্ণু দেবতার উল্লেখ আছে। বেদে বলা হয়েছে, বিষ্ণু পার্থিব লোক পরিমাপ করেছেন। বিশাল তার শরীর, তিনি চিরতরুণ। পুরাণে বলা হয়েছে, বিষ্ণু সৃষ্টির পালক। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব পৌরাণিক দেবতাদের মধ্যে প্রধান। এ তিনজন প্রধান দেবতাকে একত্র ‘ত্রিমূর্তি’ বা ‘ত্রিনাথ বলা হয় সুতরাং বিষ্ণু এই ত্রিমূর্তির অন্যতম। বিষ্ণুর অনেক নাম। যেমন, নারায়ণ, কৃষ্ণ, গোবিন্দ ত্রিবিক্রম ইত্যাদী।


বিষ্ণুর রূপ
=======
পুরানে বিষ্ণুর রূপ সম্পর্কে বলা হয়েছে বিষ্ণুর গায়ের রং চাঁদের আলোর মত। তার চারটি হাত। চার হাতে চারটি দ্রব্য থাকে। ওপরের দিককার বা হাতে থাকে বিষ্ণুর শঙ্খ। এই শঙ্খকে বলা হয় ‘পাঞ্চজন্য’ বলা হয়। ওপরের দিকের ডান হাতে থাকে চক্র। বিষ্ণুর এই চক্রকে বলা হয় ‘সুদর্শন’। তার নিচের দিকে বা হাতে গদা এবং ডান হাতে পদ্ম থাকে। গরুড় পাখি বিষ্ণুর বাহন। পুরানে বলা হয়েছে বিষ্ণু বৈকুন্ঠে থাকেন।

বিষ্ণু পূজার সময়
==========
সকল দেবতার পূজা করার সময় যে পঞ্চ দেবতার পূজা করা হয় তারা হলেন শিব, বিষ্ণু, গণেশ, সূর্য ও জয়দুর্গা। সুতরাং বিষ্ণু পঞ্চ দেবতার অন্যতম। সকল দেবতার পূজা করার সময় বিষ্ণুর পূজা করা হয় বলে বিষ্ণুপূজার নির্দিষ্ট দিন নেই। যে-কোন দিন বিষ্ণুর পূজা করা যায়।

বিষ্ণুর প্রনাম মন্ত্র
==========
নমো ব্রহ্মণ্যদেবার গোব্রাহ্মণ হিতায় চ।
জগদ্ধিতায় কৃষ্ণায় গোবিন্দায় নমো নমঃ।।

সরলার্থ ---
ব্রহ্মণ্যদেবকে নমস্কার। গো-ব্রাহ্মণের হিতকারী এবং জগতের মঙ্গলকারী কৃষ্ণকে-গোবিন্দকে নমস্কার।

বিষ্ণুর মাহাত্ম্য
========
বিষ্ণু দেবতাদের মধ্যে শেষ্ঠত্ব লাভ করেছেন। পুরাণ পাঠের সময় আমরা দেখি যখনই কোন দেবতা কোন বিপদে পড়েন, তখন তিনি শ্রীবিষ্ণুর শরণ নেন।

বিষ্ণু বিভিন্ন অবতাররূপে অনেকবার পৃথিবীতে এসে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করে ধর্ম স্থাপন করেছেন। পুরাণে তার নানা অবতারের নাম বলা হয়েছে। যেমন- মৎস অবতার, কূর্ম অবতার, নৃসিংহ অবতার, পশুরাম অবতার, রাম অবতার ইত্যাদী।

বিষ্ণু মধু, কৈটভ, হিরণ্যকশিপু প্রভৃতি দৈতদের বধ করেছেন। কৃষ্ণরূপে তার কৃতিত্ব অত্যুজ্জল হয়ে রয়েছে। তিনি কৃষ্ণরূপে কংস ও শিশুপাল প্রভৃতি অত্যাচারী রাজাকে বধ করেছেন। কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধের সময় ধর্মের পক্ষে পাণ্ডবদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’য় শ্রী কৃষ্ণের উপদেশ সংকলিত হয়েছে। গীতা এ-কালেও নিত্যপাঠ্য ধর্মগ্রন্থ। এছাড়া বিষ্ণু পুরাণ, ভাগবত পুরাণ প্রভৃতি পুরাণেও বিষ্ণুর বা কৃষ্ণের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে।

বিষ্ণুর অনেক মূর্তি নির্মাণ করে সারা ভারতবর্ষে যুগ যুগ ধরে পূজা করা হচ্ছে। সারা পৃথিবীতে বিষ্ণু বা কৃষ্ণের অনেক ভক্ত রয়েছেন। বিষ্ণুর ভক্তদের বৈষ্ণব বলা হয়।
লেখকঃ প্রীথিশ ঘোষ
0 comments
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger