সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

বেদে মানব দেহ

"India is the cradle of human race, the birthplace of human speech, the mother of history, the grandmother of legend and the great grandmother of tradition. The most valuable and most instructive materials in the history of man are treasured up in India only." — Mark Twain
মানব ইতিহাসের গৌরবের প্রতিটি শাখা ই মহান আর্য সভ্যতার সাথে জড়িত। তাই এটি অতি স্বাভাবিক যে জ্ঞানের অন্যান্য প্রতিটি শাখার মত চিকিৎসাবিদ্যাও এই গৌরবময় আর্যাবর্ত্ থেকেই উদ্ভূত হয়েছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে আর্য সভ্যতার ইতিহাস অত্যন্ত চমকপ্রদ।সার্জারি(সুশ্রুত সংহিতা) থেকে মেডিসিন(চরক সংহিতা),পেডিয়াট্রিকস( কৌমারভৃত্যম) থেকে ফরেনসিক টক্সিকোলজি(আগাদতন্ত্র),সে এক সুবিশাল পথযাত্রা।আর চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রাচীনতম একটি শাখা হল এনাটমি বা অঙ্গসংস্থানবিদ্যা।আজ আমরা আলোচনা করব তার ই ক্ষুদ্র একটি শাখার ক্ষুদ্রতম একটি অংশ নিয়ে;মানবদেহের কঙ্কালতন্ত্র।
মানবদেহের অঙ্গসংস্থান নিয়ে প্রচুর পরিমাণ তথ্যাদি প্রাচীন সংস্কৃত শাস্ত্র সমূহে পাওয়া যায়।এই সুবিশাল ভাণ্ডারের বর্ণনা দেয়া হয়ত ১০০ টি প্রবন্ধেও সম্ভব নয়।তাই আমরা এখানে শুধুমাত্র পবিত্র বেদ ও উপনিষদসমূহে পাওয়া যায় এমন কিছু মন্ত্রের উপর ই আলোকপাত করব।
মস্তক(হেড)
চিকিৎসা বিজ্ঞানে আমাদের মস্তিস্কের বাহ্যগঠনকে প্রধানত দুইভাগে ভাগ করা হয়-
১)ক্রেনিয়াল বা খুলির অস্থি এবং
২)ফেসিয়াল বা মুখমণ্ডলের অস্থি।
খুলির প্রধান অংশ গঠিত হয় চারটি বড় অস্থি দিয়ে-একটি ফ্রন্টাল,একটি অক্সিপিটাল ও দুটি প্যারাইটাল অস্থি।এছাড়া টেম্পোরাল নামক দুই পাশে দুটি ছোট অস্থি রয়েছে।
আর মুখমণ্ডলের অস্থির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল চোয়াল এর অস্থি যার নাম ম্যানডিবল।

মস্তিস্কম অস্য ললাটম ককাটিকাম প্রথমো যঃ কপালম...
(অথর্ববেদ ১০.২.৮)
অর্থাৎ মস্তক কে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে-ব্রেইন(ললাট),ককাটিকাম(ফেসিয়াল বোনস বা মুখমণ্ডলের অস্থি) এবং কপালম বা ক্রেনিয়াল বোনস বা মস্তকের অস্থি।
ঐতেরিয় আরণ্যক অনুযায়ী এই কপালম বা মস্তিস্কের অস্থি প্রধানত ৪টি(মেডিক্যাল সায়েন্স এর ভাষায় একটি ফ্রন্টাল,একটি অক্সিপিটাল ও দুটি প্যারাইটাল বোন)
এছাড়াও অথর্ববেদ ১০.২.৮ এ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফেসিয়াল বোন এর কথা বলা হয়েছে যেটির নাম হনু(ম্যানডিবল-চোয়াল এর অস্থি)।একে বলা হয়েছে হন্বো চিত্যাম অর্থাৎ এটি মুলত একাধিক অংশের মিলনের ফলে গঠিত।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ীও ম্যানডিবল গর্ভাবস্থায় রাইট ও লেফট প্রসেস নামক আলাদা দুটি অস্থি এর জোড়া লাগার ফলে গঠিত হয় যা ম্যনডিবুলার সিমফাইসিস নামক সরু একটি দাগ দিয়ে মানবদেহে চিহ্নিত থাকে!
মস্তিস্কের ফ্রন্টাল অস্থির কোটরে আমাদের চোখ অবস্থিত।সেই হিসেবে বৃহদারন্যক উপনিষদ ২.২.১ এ দেয়া মানবচক্ষুর অসাধারণ পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনাটি দেয়া হল।
এই মন্ত্রটিতে চোখকে নিম্নলিখিত অংশে ভাগ করা হয়েছে।
কনিনিকা-যাকে আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় বলে পিউপিল
মণ্ডল-আই বল
কৃষ্ণাংশ-আইরিশ
শুক্লাংশ-স্ক্লেরা
আপ-একুয়াস এন্ড ভিট্রিয়াস হিউমার
লোহিনি-রাজি-রেটিনাল ব্লাড ভেসেলস!
গ্রীবা(নেক)
অথর্ববেদ অনুযায়ী গ্রীবাকে দুটি অংশে ভাগ করা হয়েছে-সম্মুখ ও পশ্চাৎ ভাগ।
পশ্চাৎ ভাগে আছে চতুর্দশাবাইতাসাম কারুকুরানি বির্যাম... অর্থাৎ সাতটি কশেরুকা ও তাদের চোদ্দটি ল্যাটেরাল প্রসেস!
বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ীও গ্রীবা অঞ্চলে ৭টি কশেরুকা ও তাদের প্রত্যেকের দুই পাশে একটি করে অর্থাৎ মোট ১৪ টি ল্যাটেরাল প্রসেস রয়েছে!!
অপরদিকে সম্মুখঅংশে রয়েছে কণ্ঠনালী(Trachea)।
বক্ষ(Thorax)
আধুনিক এনাটমি অনুযায়ী আমাদের বক্ষের উভয়পাশে দুইভাগে বিভক্ত ১২ জোড়া রিবস বা পরশুকা এবং এক জোড়া ক্ল্যাভিকল বা কণ্ঠাস্থি রয়েছে।
শতপথ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে-
পার্শ্বে ত্রিনবঃ ত্রয়োদশন্যঃ পার্শ্বত্রয়োদশন্য।
পার্শ্বে ত্রিনবে তস্মাৎ পার্শ্বে ত্রিনবঃ।।
(শতপথ ব্রাহ্মন ৮.২.৪.১৩)
অর্থাৎ বক্ষের দুই পাশে ১৩ টি করে মোট ২৬ টি পরশুকা রয়েছে!(এখানে ক্ল্যাভিকলকে সহ ধরা হয়েছে)
আমরা বর্তমানে এও জানি যে পরশুকাসমুহ সামনেরদিকে স্টার্নাম বা বক্ষাস্থি এর সাথে কার্টিলেজ এর মাধ্যমে এবং পিছনেরদিকে কশেরুকাসমূহের(ভারটিব্রা) এর সাথে সুপিরিয়র ও ইনফেরিয়র আরটিকুলার প্রসেস নামক দুটি প্রায় গোলাকার আকৃতির খাদযুক্ত অংশ এর মাধ্যমে যুক্ত থাকে।
এছাড়া শতপথ ব্রাহ্মণের ৮.৬.২.১০ এ বলা হয়েছে
পরশুকা সমুহ একদিকে কিকাসঃ (স্টার্নাম) এর সাথে জত্রু(কারটিলেজ) এবং অপরদিকে কশেরুকা এর সাথে অণ্ডপরিশু(গোলাকার খাদযুক্ত স্থানবিশেষ) এর মাধ্যমে যুক্ত থাকে!!!
ভারটিব্রাল কলাম
আমরা জানি মানুষের ভারটিব্রাল কলামে মোট ৩৩ টি ভারটিব্রা থাকে যা পরবর্তীতে ফিউজড হয়ে ২৬ টিতে রুপান্তরিত হয়।
অনুকম ত্রয়োত্রিশটমঃ কারুকুরন্যনুকাম...
অর্থাৎ আমাদের মোট কারুকুর বা কশেরুকা তথা ভারটিব্রার সংখ্যা ৩৩ টি(ত্রয়ো-ত্রিশ)!!!
Upper Extremity (ঊর্ধ্ববাহু)
চিকিৎসা বিজ্ঞানে ঊর্ধ্ববাহুকে প্রধানত Shoulder এবং Arm এই দুই অংশে ভাগ করা হয়।Arm কে আবার তিনটি অংশে ভাগ করা হয়।যথা-
১)Arm(কাঁধ থেকে কনুই এর আগ পর্যন্ত)
২)Forearm(কনুই থেকে কব্জি পর্যন্ত) এবং
৩)Hand(বাকী অংশটুকু)
Shoulder আবার দুটি হাড় নিয়ে গঠিত।ক্ল্যাভিকল এবং স্ক্যাপুলা।
অথর্ববেদ ১০.২.৪,৫ এ কাঁধকে অংসৌ নামে অভিহিত করা হয়েছে।এই অংসৌ এর দুটি অংশ সেখানে দেয়া হয়েছে-
অক্ষ(ক্ল্যাভিকল) এবং কফোদৌ(স্ক্যাপুলা)।
১০.২.৪-৭ পর্যন্ত মন্ত্রসমূহে হাতের বর্ণনায় একে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে-
বাহু(Arm)
দোসন(Forearm)
পাণি(Hand)!!!
এখানেই শেষ নয়।আমরা জানি যে হাত অষ্টিওলজিকালি প্রধানত তিনটি অংশে বিভক্ত-
১)কার্পাল(Carpal)
২)মেটাকার্পাল(Metacarpal)
৩)ফ্যালাঞ্জেস(Phallanges)
অথর্ববেদ ১০.২.১ এ বলা হয়েছে,
“কেন আঙ্গুলি পেশানি কেন উচ্ছলঙ্খৌ মধ্যতঃ...”
অর্থাৎ কে এবং কেন হাতকে উচ্ছলঙ্খৌ(Carpal),মধ্যতঃ (মধ্য অংশ বা Metacarpal) এবং আঙ্গুলি(Phallanges) অংশে বিভক্ত করেছে?
Lower Extremity(নিম্নবাহু)
Anatomically নিম্নবাহু প্রধানত দুটি অংশে বিভক্ত-হিপ এবং ফুট।
ফুট আবার তিনটি অংশে বিভক্ত-
১)থাই(হাঁটুর আগ পর্যন্ত)
২)লেগ(হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত) এবং
৩)ফুট(বাকী অংশ)
ফুট আবার অষ্টিওলজিকালি তিনটি অংশে গঠিত-
১)টারসাল
২)মেটাটারসাল এবং
৩)ফ্যালাঞ্জেস
আবার আমাদের পায়ের গোড়ালি বলতে আমরা যা বুঝি তা ট্যালাস নামক টারসাল অস্থি দিয়ে গঠিত।যা আবার অন্যান্য টারসাল অস্থিসমূহের সাথে যুক্ত থাকে।
অথর্ববেদ ১০.২.১-৩ মন্ত্র তিনটি পর্যালোচনা করে যা পাওয়া যায় তা হল-
নিম্নাঙ্গ দুটি অংশে গঠিত- শ্রোণী(হিপবোন) এবং পা।
পাকে আবার ভাগ করা হয়েছে তিনটি অংশে-
১)উরু(থাই)
২)জঙ্ঘা(লেগ) এবং
৩)পদ(ফুট)
পদকে আবার চারটি অংশে ভাগ করা হয়েছে-
১) পার্সণি(ট্যালাস)
২) গুলফৌ(বাকী টারসাল অস্থিসমূহ)
৩)উচ্ছলঙ্খ(মেটাটারসাল)
৪) আঙ্গুলি(ফ্যালাঞ্জেস)
এছাড়া আমরা জানি যে টারসাল ও মেটাটারসাল অস্থির মাঝখানে Transverse Arch রয়েছে যা আমাদের দেহের ভারবহনে পায়ের সহায়ক হিসেবে কাজ করে।প্রখ্যাত গবেষক Dr. V.W Karamvelkar এর মতে অথর্ববেদ ২.৩৩.৬ এ উল্লিখিত ‘প্রপদা’ নামক পায়ের অংশটি ই হল এই Transverse Arch!!!
অথচ অসুরদের আক্রমনে আমরা আমাদের এই সম্পদগুলো হারিয়ে ফেলি যার ফল আমাদের এখনো ভোগ করতে হচ্ছে। ইতিহাস তাই বলে-
“চিকিৎসা বিজ্ঞানের কলাকৌশল নালন্দা,তক্ষশীলা ও বেনারসের বিখ্যাত শিক্ষাপীঠ গুলোতে পড়ানো হত।উত্তর-পূর্ব দিক থেকে মুসলিম শাসকদের আক্রমনে ভারতবর্ষের সেই সমৃদ্ধির ধ্বস নামে তবে তারও আগে ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞান তা দান করে গিয়েছিল পশ্চিমে গ্রীক,আরব ও মিশরীয়দের ও পূর্বে চীনের হাতে।“
(Davidson Gr. The dawn of Civilization- Indian Medicine. In: Medicine through the Ages. London: Methuen Co. Ltd.; 1968. p. 17-9.)
ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি
তথ্যসুত্র- History of science in India By Dr. Mira Roy
Atharvaveda&Ayurveda By Dr. V.W Karamvelkar
La Doctrine Classique de la Medicine Indienne ses origins et ses parallels By Zean Filliozat.
‪#‎অগ্নিবীর‬
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger