সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

মন্ত্র দ্রষ্টা নাকি মন্ত্র স্রষ্টা

আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বেদ। এই বেদের উৎপত্তি স্বয়ং ঈশ্বর হতে। সনাতন ধারা বিরোধীদের দাবি বেদ নাকি মানব রচিত! এসব বদ্ধমনাদের দাবি বেদ মন্ত্রের শুরুতে বা সূক্তের শুরুতে যে ঋষিদের নাম লেখা তাঁরাই নাকি সেসব মন্ত্রের লেখক। চলুন দেখে নিই তাদের দাবি কতটুকু সত্য।
প্রথম প্রশ্ন দাড়ায়, ঋষি কে?
বেদের সুবিখ্যাত ব্যাখ্যা যাস্কাচার্যকৃত নিরুক্তে লেখা হয়েছে,
ঋষয়ো মন্ত্রদ্রষ্টারঃ। ঋষির্দর্শনাৎ স্তোমান্ দদর্শেত্যৌপমন্যয়বঃ।
তদ্ য়দেনাংস্তপস্যমানান্ ব্রহ্ম স্বয়ংভ্বভ্যানর্ষৎ
তদৃষীণাম্ ঋষিত্বমিতি বিজ্ঞায়তে। নিরুক্ত ২.১১
অর্থাৎ ঋষি বেদমন্ত্রের দ্রষ্টা। ঔপমন্যব আচার্যও একইভাবে বলেন বেদের স্তুতি বা মন্ত্রসমূহের বাস্তবিক অর্থের সাক্ষাৎকারকেই ঋষি বলা হয়। তাঁরাই ঋষি হন যারা স্বয়ম্ভু ঈশ্বরের নিত্য জ্ঞান বেদের অর্থ তপস্যার মাধ্যমে জানতে পারেন। যদি বেদ মন্ত্রের রহস্য সহিত অর্থের দর্শন হয় তবেই ঋষিত্ব লাভ হয়।
ঔপমন্যব আচার্যের উক্ত মতের প্রতিফলন পাওয়া যায় তৈত্তিরীয় আরণ্যকের ২.৯.১ এ-
“অজাত্ হ বৈ পৃশ্নীংস্তপস্যমানান্ ব্রহ্ম স্বয়ম্ভ্বভ্যানর্ষত্ ত ঋষয়োঅভবন্ তদৃষীণামৃষিত্বম্”
শতপথ ব্রাহ্মণের ৬.১.১.১ এ বলা হয়েছে,
তে য়ত্ পুরাস্মাত্ সর্বস্মাদিদমিচ্ছন্তঃ শ্রমেণ তপসারিষংস্তস্মাদৃষয়ঃ।। অর্থাৎ, যে তপস্বীর, তপ বা ধ্যানের মাধ্যমে স্বয়ম্ভুর নিত্যবেদের অর্থজ্ঞান হয় তাঁকে ঋষি বলা হয়।
একই কথা ব্যক্ত হয়েছে তৈত্তিরীয় সংহিতা, ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, কাণ্ব সংহিতা, শতপথ ব্রাহ্মণ এবং সর্বানুক্রমণীর মত প্রাচীন গ্রন্থে।
ঋষিগণ যে মন্ত্র স্রষ্টা নন সে বিষয়ে কিছু আলোচনা-
১) এক মন্ত্রের একাধিক ঋষি
যদি মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি যদি মন্ত্রকর্তা হত তবে একটি মন্ত্রের কেবল একজন ঋষিই থাকত। কিন্তু সর্বানুক্রমণী ও আর্ষানুক্রমণীর মতে বেদের বিভিন্ন সূক্তের অসংখ্য মন্ত্রের একাধিক ঋষি রয়েছে। যেমন: ঋগবেদ ৫/২, ৭/১০১, ৭/১০২, ৮/২৯, ৮/৯২, ৮/৯৪, ৯/৫, ১/১০০, ৫/২৭, ৮/৬৭, ৯/১৬, ৯/৬৬
আরো বলা হয়েছে, কেবল গায়ত্রী মন্ত্রের ১০০০ ঋষি রয়েছেন। এর মানে কি দাড়ায় ১০০০জন লোক মিলে ২৪ অক্ষরের ক্ষুদ্র বাক্য রচনা করেছে? এমনকি ঋগবেদের ৮ম মণ্ডলের ৩৪ নং সূক্তের ১৬-১৮ মাত্র তিনটি মন্ত্রের ঋষি ১০০০ জন! এর মানে কি ১০০০জন মিলে এই তিনটি মন্ত্র রচনা করেছে? ঋকবেদ ৩.২৩ এ দুজন ঋষি দেবশ্রবা ও দেবরাত। এই দুজনেই ভরত ঋষির পুত্র। ঋকবেদ ৫.২৪ এ চারজন ঋষি বন্ধু, সুবন্ধু, শ্রুতবন্ধু, বিপ্রবন্ধু। ঋকবেদ ৯.৬৬ এ একশজন ঋষি আছেন, অথচ এখানে মন্ত্র আছে ৩০টি।
২) একই মন্ত্রের ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ঋষি
এমন অসংখ্য মন্ত্র আছে যে, একই মন্ত্র একস্থানে এক ঋষি অপর স্থানে অন্য ঋষির নাম লেখা। যেমন ঋকবেদের ১.২৩.২১-২৩ মন্ত্রের ঋষি মেধাতিথি কাণ্ব, এই একই মন্ত্র ঋকবেদ ১০.৯.৭-৯ এ আছে কিন্তু এই মন্ত্রের ঋষি অম্বরিষ। এই ভাবেই “অগ্নে নয় সুপথা....” মন্ত্রের ঋষি যজুর্বেদ ৫.৩৬ এ অগস্ত, যজুর্বেদ ৭.৪৩ এ অঙ্গিরস এবং যজুর্বেদ ৪০.১৬ এ দীর্ঘতমা। এমন আরো প্রমাণ আছে,
যেমন:
ঋগবেদ ১.২৩.১৬-১৮ এবং অথর্ববেদ ১.৪.১-৩
ঋগবেদ ১০.৯.১-৭ এবং অথর্ববেদ ১.৫.১-৪ ও ১.৬.১-৩
ঋগবেদ ১০.১৫২.১ এবং অথর্ববেদ ১.২০.৪
ঋগ ১০.১৫২.২-৫ এবং অথর্ব ১.২১.১-৪
ঋগ ১০.১৬৩.১,২,৪ এবং অথর্ব ২.৩৩.১,২,৫
অথর্ব ৪.১৫.১৩ এবং অথর্ব ৭.১০৩.১
ঋগ ১.২২.১৯ এবং যজু ১৩.৩৩
ঋগ ১.১১৫.১ এবং যজু ১৩.৪৬
ঋগ ১.১৩.১৯ এবং ঋগ ৫.৫.৮
ঋগ ৪.৪৮.৩ এবং যজু ১৭.১৯
এই সমস্ত জোড়াগুলোর মন্ত্র এক হলেও ঋষি ভিন্ন।
এটি একটি ছোট উদাহরণ মাত্র। এরকম অসংখ্য প্রমাণ আপনি বেদের মাঝে খুঁজে পাবেন। অর্থাৎ বোঝা যায় ঋষিগণ মন্ত্র লিখেননি। তাঁরা কেবল মন্ত্রের অর্থ দ্রষ্টা বা জ্ঞাতা।
৩) ঋষির জন্মের পূর্বেই মন্ত্রের বিদ্যমানতা
যদি আমরা ধরে নেই ঋষিগণই মন্ত্র রচনা করেছেন, তাহলে এটা কি সম্ভব ঐ ঋষির পূর্বেই তাঁর সৃষ্ট মন্ত্রের বিদ্যমান থাকা? মানে পিতার জন্মের আগেই পুত্রের জন্ম!!!
এবার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক:
ঋগবেদের ১ম মণ্ডলের ২৪নং সূক্তের দ্রষ্টা ঋষি শূনঃশেপ, যা সর্বানুক্রমণীকাতেও উল্লেখিত আছে। এই শূনঃশেপ হচ্ছেন ঋষি অজীগর্তের পুত্র। আমরা যদি ঐতরেয় ব্রাহ্মণের ৩৩.৩-৪ লক্ষ্য করি তবে আমরা দেখতে পাই শূনঃশেপ যজ্ঞের সময় এই মন্ত্র দ্বারা প্রার্থনা করছিল। আবার যদি বররুচির নিরুক্ত সমুচ্যয় পড়ি তবে দেখতে পাই এর আগে ঋষি অজীগর্ত এই মন্ত্র দ্বারা প্রার্থনা করেছিল। যদি শূনঃশেপ মন্ত্রসমূহের রচয়িতা হত তবে তাঁর পিতা কি করে একই মন্ত্র দ্বারা প্রার্থনা করল? এ থেকে এটিই বোঝা যায় যে, ঋষিগণ মন্ত্রের স্রষ্টা নন বরং দ্রষ্টা বা বিশেষজ্ঞ।
ঋগবেদের ৩য় মণ্ডলের ২২নং সূক্তের ঋষি বিশ্বামিত্র। কিন্তু সর্বানুক্রমণী ৩.২২ এবং আর্ষানুক্রমণী ৩.৪ থেকে জানতে পারি এই মন্ত্রগুলো এর আগেই তাঁর পিতা গাথি ব্যবহার করেছেন।
ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৫.১৪ ও তৈত্তিরীয় সংহিতা ৩.১.৩ এ আমরা দেখতে পাই, মনু তাঁর পুত্র নাভানেদিষ্টকে ঋগবেদের ১০.৬১-৬২ এর মন্ত্রসমূহ প্রচার করার আদেশ দেন। অর্থাৎ, নাভানেদিষ্টের আগেই তাঁর পিতা এই মন্ত্রসমূহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। আর আমরা যদি লক্ষ্য করি তবে দেখতে পাই এই মন্ত্রসমূহের ঋষি নাভানেদিষ্ট।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এটিই প্রতিপন্ন হয় যে, ঋষিগণ মন্ত্র স্রষ্টা নয়, তাঁরা উক্ত মন্ত্রের দ্রষ্টা বা বিশেষজ্ঞ।
ওঁ শান্তিঃ! শান্তিঃ! শান্তিঃ!
VEDA, The infallible word of GOD
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger