সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

সনাতন ধর্ম ও শ্রীলঙ্কা ( সবাই পড়ুন ও শেয়ার করুন )



ভারত মহাসাগরের একটি দ্বীপদেশ হচ্ছে শ্রীলঙ্কা যার অস্তিত্তের কথা পাওয়া যায় আমাদের রামায়নে। রামায়ণের -লঙ্কা কাণ্ডে ভারত ও শ্রী লঙ্কার মাঝে যে রাম-সেতুর কথা উল্লেখ আছে সম্প্রতি আর্কিওলজিস্টরা স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে তার অস্তিত্তের প্রমান পেয়েছেন। এই শ্রীলঙ্কাতে সর্ব-প্রথম সনাতন ধর্মের পদচিহ্ন পড়ে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০ শতকে যখন তৎকালীন ভারতবর্ষ থেকে বিজয় নামে একজন আর্য তার ৭০০ অনুসারী নিয়ে সেখানে গমন করেন। বিজয় ছিলেন শ্রীলঙ্কার প্রথম রাজা।
অনেক ঐতিহাসিকদের হতে, এই বিজয়ের আদি নিবাস ছিল আজকের পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার সিঙ্গুরে । পরবর্তীতে নানা সময়ে ভারতবর্ষ থেকে নানা সময়ে হিন্দুরা সেখানে যান এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। শ্রীলঙ্কার অদিকাংশ হিন্দুই জাতিগত ভাবে তামিল সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এবং অধিকাংশ তামিল শ্রীলংকাতে আসে উপমহাদেশের ব্রিটিশ শাসনামলে বিভিন্ন শ্রমজীবী কাজের শ্রমিক হয়ে।
শ্রীলংকার প্রধান ধর্ম বৌদ্ধ যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৭০% এবং তারা জাতিগতভাবে সিংহলি। বর্তমানে হিন্দুরা শ্রীলঙ্কার ২য় বৃহত্তম ধর্ম যাদের সংখ্যা ২০১২ সালের তথ্য অনুযায়ী ২৫ লক্ষের কিছু বেশী এবং মোট জনসংখ্যার ১৩ %। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মত শ্রীলঙ্কাতেও হিন্দু জনসংখ্যা কমছে । ১৭ শতকে পর্তুগিজ ও পরে ব্রিটিশরা শ্রীলঙ্কার জনসংখ্যার একটি অংশকেই জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করে যার মধ্যে বড় একটি অংশই ছিল হিন্দু তামিল শ্রমিকরা।
তবে প্রধান কারণ কয়েক দশক ধরে চলে আসা সিংহলি ও তামিলদের মধ্যে জাতিগত সংঘাত। এই সংঘাত এর শুরু তামিলদের উপর সিংহলিদের আগ্রাসি মনোভাবের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের থেকে। তামিলরা সংখ্যায় কম হলেও শুরু থেকেই তারা তাদের প্রখর মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তির জোরে সবসময় সিঙ্ঘলিদের থেকে এগিয়ে ছিল, যেকারনে একদিন শ্রমিক হয়ে আসা তামিল হিন্দুরা যখন দেশের বড় বড় ক্ষেত্রে অবদান রাখতে শুরু করল, তখনি সিংহলিদের জাতিয়তাবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠল । বিবিসি নিউজ এর তথ্য অনুযায়ী ১৯৫৬, ১৯৫৮ সালে বিভিন্ন তামিল বিরোধী দাঙ্গায় শত শত তামিলকে হত্যা করা হয়, নিখোঁজ হয় কয়েক হাজার তামিল , রাষ্ট্রীয়ভাবে চালু করা হয় তামিলদের প্রতি অসংখ্য বৈষম্যমূলক নীতি।
অবশেষে নির্যাতনে নিপীড়িত তামিলরা নিজেদের অস্তিত্তের জন্য বেছে নেয় পাল্টা সংঘাত এর পথ। ১৯৭৬ সালে আলাদা তামিল রাষ্ট্রের দাবিতে সংগঠিত হয় Liberation Tigers of Tamil Eelam (LTTE), সেই থেকে গৃহযুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে তামিলদের সাথে সিংহলি সরকারের সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছে অসংখ্য নিরীহ মানুষ। ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপ্রধান মহিন্দর রাজপাকসে ভারতের কংগ্রেস সরকারের সহায়তায় (নিরব সমর্থনে) LTTE এর উপর এক বড় সামরিক অভিযান শুরু করে, যাতে LTTE প্রধান প্রভাকরণ ভেলুপিল্লাই এর মৃত্যুর মাধ্যমে LTTE পরাজিত হয়। তবে LTTE না, শ্রীলংকা সরকারের আসল উদ্দেশ্য ছিল তামিলদের একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া যে সত্য উলঙ্গভাবে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ।
যুদ্ধের শেষ দিকে শ্রীলংকার সেনাবাহিনী যেভাবে হাজার হাজার নিরীহ তামিল নারী শিশুকে হত্যা করেছে তা ইহুদিদের উপর জার্মানিতে হিটলারের নারকীয় তাণ্ডবের চেয়ে কোন অংশে কম না। World Bank Population Data অনুযায়ী ২০০৯ সালের যুদ্ধের পর শ্রীলঙ্কায় ১ লাখেরও বেশী তামিল নিখোঁজ রয়েছে যাদের বেশিরভাই ধারনা করা হয় হত্যা করে গনকবর দেয়া হয়েছে । অসংখ্য তামিল শিশুকে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে, ব্রিটেনের Channel 4 এর সংবাদে শ্রীলঙ্কায় যুদ্ধাপরাধের এক প্রামাণ্যচিত্রে দেখানো হয় একটি ভিডিও ফুটেজ যেখানে দেখা যায় সিংহলি ভাষায় আলাপরত কিছু uniformed শ্রীলঙ্কান সেনাবিহিনির সদস্য হাত-পা-চোখ বাধা নিরীহ তামিলদের গুলি করে হত্যা করছে।
আমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন সহ অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান শ্রীলংকা সরকারকে এই যুদ্ধঅপরাধের সঠিক তদন্তপূর্বক শাস্তি দাবি করলেও শ্রীলঙ্কা সরকার তা অস্বীকার করে আসছে , আর আমাদের ভারতের কংগ্রেস সরকার তো মুখে একদম তালা দিয়ে রেখেছে তবে তাই বলে সত্য চাপা থাকেনি, তামিলদের উপর বুদ্ধের শান্তিপ্রিয় সৈনিকদের এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কানাডা, আমেরিকা, ব্রিটেন সহ বিভিন্ন দেশে এর প্রতিবাদ হয়েছে। উল্লেখ্য হিন্দুদের মধ্যে তামিলরা বিপুল সংখ্যায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে আর তারা ধর্মের Ethnicity রক্ষার ব্যাপারে অনেক সচেতন। আমাদের মত তথাকথিত "সেকুলার" না। যারা তামিল সিনেমা দেখেন তারা এ বিষয়টা খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই। তবুও নিকট প্রতিবেশী ভারতের নিরব সমর্থনে শ্রীলংকা সরকার সাহস পেয়েছে তামিলদের উপর এমন নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানোর।
The International Policy Digest এবছর জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কা সরকারের একটি গোপন নথি প্রকাশ করে যাতে রাজপাকসে সরকার তামিল অধ্যুষিত এলাকার সব মন্দির ও ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল এবং সে অনুযায়ী ৩৬৭ টি হিন্দু মন্দির ধ্বংস করা হয়েছে। যার মধ্যে শুধু জাফনাতেই ২০৮ টি মন্দির ধ্বংস করা হয়েছে। যাই হোক, এসবের পরেও শ্রীলাঙ্কাতে এখনও বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির রয়েছে যার মধ্যে Nainativu Nagapooshani Amman Temple ও Nallur Kandaswamy temple (৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত) উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি কলম্বতে নির্মিত হয়েছে Ponnabalvaneswarm temple নামে বড় একটি মন্দির । এছাড়া শ্রীলঙ্কাতে তামিল হিন্দুদের অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যার মধ্যে Jaffna Hindu College অন্যতম। আলোচিত হিন্দু ব্যক্তিত্বের মধ্যে রয়েছেন, বিশ্ববিখ্যাত ক্রিকেটার Muttiah Muralitharan যিনি ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী উইকেট শিকারি।
যুদ্ধবিধ্বস্ত তামিল হিন্দুদের ভবিষ্যৎ কি তা আজ সবার প্রশ্ন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে শ্রীলঙ্কা সরকার তামিলদের কল্যাণে কিছু লোক দেখানো পদক্ষেপ নিলেও, তাদের আসল অবস্থার কোন উন্নতি হবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা নেই। তাই আজ তাদের জন্য এটাই প্রার্থনা, ভগবান তাদের সহায় হন, আর ভোট ব্যাঙ্কের রাজনীতি ভুলে, ভারত সরকার তাদের কল্যাণে কিছু করুক।
## লিখেছেন শ্রী মিহির সেীরভ
----------------------------------------
লেখাটি পড়ার পর আপনার মন্তব্য আশা করছি
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger