সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

যুগাচার্য, বিশ্ববিজয়ী, বীর-সন্ন্যাসী, স্বামী বিবেকানন্দ

"সমতা সর্বভূতেষু এতমুক্তস্য লক্ষ্যনম"-
সর্বভূতে সমদর্শন মানব মুক্তির লক্ষন
সাম্যের এই মহানবানী বিশ্বে পৌঁছুতে ১৮৬৩ সালের ১২ ই জানুয়ারী,সোমবার, মকরসঙ্ক্রান্তির দিনে, যখন লাখো ভক্তের প্রার্থনা বানীতে কম্পিত হচ্ছিল গঙ্গা সংলগ্ন বায়ু,সেইদিন সূর্যোদয়ের কিছু পূর্বে এক মানবসূর্যের আগমন।
কলকাতার সদ্য ভূমিষ্ঠ এই সন্তান এর মা অন্যান্য নিষ্ঠাবান হিন্দু মা দের মতই ব্রত করেছিলেন,উপবাস রেখেছিলেন যাতে করে তিনি এমন একজন সন্তান লাভ করেন যে তার পরিবারের জন্য সম্মান বয়ে আনবে।
বীরেশ্বর শিব এমন করে যে তার ইচ্ছা পুরন করবেন তা কে জানত!নবোজাত সেই শিশুটি যে শুধু পরিবারের সম্মান নয় বরং সারা পৃথিবীর বুকে বৈদিক সভ্যতাকে বসিয়েছিল সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মানের আসনে!!
মা ভূবনেশ্বরী দেবী বীরেশ্বর শিব এর ব্রত পালতে প্রাপ্ত সন্তান এর নাম রাখলেন বীরেশ্বর।তিনি ছিলেন ধর্মপরায়ন মহিলা,রামায়ন ও মহাভারত এ যার দক্ষতা এলাকায় সুপরিচিত ছিল,পিতা বিশ্বনাথ দত্ত কলকাতা হাইকোর্টের উকিল,ইংরেজী এবং পারস্য সাহিত্যে পন্ডিত ব্যক্তিত্ব।
পিতা-মাতা উভয়ের এই বৈশিষ্ঠ্য ই বীরেশ্বর এর ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা পালন করে,বাকীটাতো ইতিহাস।
পরবর্তীতে নরেন্দ্রনাথ দত্ত নাম পাওয়া দুরন্ত বালক যখন স্কুল এর গন্ডি পেরিয়ে কলেজে পা রাখলেন তখন ঘটনাচক্রে তার পরিচয় মহাপুরুষ শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এর সাথে।স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়ার সময় একদিন দর্শন ক্লাসে 'সমাধি' নিয়ে পড়ানোর সময় শিক্ষক বলেন,"যদি সমাধি দেখতে চাও তবে দক্ষিনেশ্বর এর রামকৃষ্ণ এর কাছে যেও"।
এই সুবাদে কয়েকজন বন্ধুসহ যান দক্ষিনেশ্বর এ।
তখন কি জানতেন প্রথম দেখায় প্রায় উন্মাদ,অর্থহীন মনে হওয়া একটা লোক তার জীবনকে এভাবে পাল্টে দেবে!
কলেজ জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ন ঘটনা-একটা সময় যখন বেদ,উপনিষদ এর অদ্বিতীয় ও অতুলনীয় জীবন দর্শন প্রায় স্তিমিত,স্বার্থান্বেষী পুরোহিত সমাজ যখন ধর্মব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রন করছে তখন বৈদিক সভ্যতার পুনরুথান এর জন্য বিপ্লবসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি ব্রাহ্ম সমাজ এ যোগ দেন তিনি,যে কারনে প্রথমদিকে সাকারবাদী রামকৃষ্ণ এর দর্শনের সাথে নিরাকারবাদী নরেন্দ্রনাথ মোটেও একমত হতে পারেন নি।
গুরু রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর সমগ্র ভারতবর্ষের করুন অবস্থা লক্ষ্য করে মানুষ গড়ার মিশনে নামেন তিনি।গুরুর নিকট নরেন্দ্রনাথ থেকে বিবেকানন্থ হয়ে ওঠা কর্মযোগী বুঝতে পারেন যে মানুষকে দেবত্বে উন্নীত করা ই হল প্রকৃত ধর্ম।
১৮৯৩ সালে আন্তর্জাতিক ধর্মীয় মহাসম্মেলন এ যোগ দিতে কপর্দকশুন্য স্বামী বিবেকানন্ত অতিশয় কষ্টে আমেরিকায় পৌছেন।শীতের নিদারুন আঘাতে কপর্দকহীন,অসহায় বিবেকানন্দ যখন মৃত্যুদশায় তখন এক সহানুভূতিশীল আমেরিকান মহিলা তার জীবন রক্ষা করেন,তাকে মহাসম্মেলন এ যোগ দেয়ার ব্যবস্থা করে দেন।
এর পরেই এল সেই মাহেন্দ্রক্ষন,১১ই সেপ্টেম্বর,দৃড় অথচ সৌহার্দ্যের ডাক-"প্রিয় ভ্রাতা ও ভগিনীগন"।
পুরো ইউরোপে আলোড়ন উঠল,রচিত হল আমেরিকার ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বক্তৃতার ইতিহাস,বৈদিক দর্শন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দর্শনের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হল।The news herald একে ভূষিত করল মানব ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাববিস্তারকারী ধর্মীয় বক্তব্য হিসেবে। বিশ্বধর্ম মহাসভায় বিখ্যাত সেই "শিকাগো বক্তৃতা" উপস্থাপন করেছিলেন বলে ১১ সেপ্টেম্বর তারিখটি "বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব দিবস" হিসেবে পালিত হয়।
ইউরোপ জয় করে দেশে ফিরে এলেন।তখনও কিন্তু তাঁর কাজ শেষ হয়নি।গুরুকে যে কথা দিয়েছিলেন,নিজের জন্য নয় বরং মানবতার মুক্তির জন্য লড়বেন!ভারতবর্ষের নিপীড়িত মানুষের অবস্থা পর্যবেক্ষনে বারানসী থেকে হরিদ্বার,অযোধ্যা থেকে হৃষিকেশ সহ পুরো ভারতবর্ষে ঘুরে বেরিয়েছেন।দেখেছেন অজ্ঞানতা এবং দারিদ্র্যের কারনে মানুষের কি দুর্ভোগ।আর এই ভাগ্যবঞ্চিত জনগনের মুক্তির লক্ষ্যে ১৮৯৭সালে প্রতিষ্ঠা করলেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন,পৃথিবীর বুকে উন্মোচিত হল এক নতুন দিগন্ত।
অক্লান্ত পরিশ্রমী বিবেকানন্দ বেদান্ত প্রচার এর সর্বশ্রেষ্ঠ মাইলফলক ছিলেন।পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পন্ডিত ব্যক্তিবর্গের চিঠি আসত তাঁর কাছে তার অসাধারন কর্মের জন্য।
আন্তর্জাতিক মহাসম্মেলন এর সভাপতি ড.ব্যরো যার স্বীকৃতি দিয়েছিলেন "গেড়ুয়া বর্নের সর্বশ্রেষ্ঠ দর্শনধারী সন্ন্যাসী" হিসেবে।
১৯০২ সালের ৪ঠা জুন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পতিত মানবতার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাওয়া এই সন্ন্যাসীর সমস্ত কর্মের স্বীকৃতি স্বরুপ ভারতে বর্তমানে তাঁর জন্মদিনটিকে 'জাতীয় যুব দিবস' হিসেবে পালন করা হয়।
বিবেকানন্দের মৃত্যুর বহু বছর পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কারবিজয়ী ফরাসি সাহিত্যিক রোম্যাঁ রোলাঁকে লিখেছিলেন, "ভারতকে জানতে চাইলে বিবেকানন্দের লেখা পড়ো। তাঁর মধ্যে সব কিছুই ইতিবাচক। নেতিবাচক কিছুই নেই।"
রোম্যাঁ রোলাঁ বলেছিলেন, "তাঁর লেখাগুলি মহান সংগীতের মতো। পংক্তিগুলি বিঠোভেনের শৈলীর মতো। চিত্তাকর্ষক ছন্দগুলি হ্যান্ডেল কোরাসের কুচকাওয়াজের মতো। আজ ত্রিশ বছর পরেও তাঁর বাণীগুলিকে স্পর্শ করলে আমার শরীরে বৈদ্যুতিক আঘাতের মতো শিহরণ জাগে। এই মহানায়কের মুখ থেকে যখন এই জ্বলন্ত শব্দগুলি উচ্চারিত হয়েছিল, তখন নিশ্চয় অনেকে এই শিহরণ অনুভব করেছিলেন!"
বিবেকানন্দ নেই কিন্তু তাঁর সেই চিরন্তন বানী চিরকাল পৃথিবীকে সন্জীবনী শক্তি যুগিয়ে যাবে। প্রাচীন ভারত তপোবনে বসিয়া একদিন যে জাগরণের মন্ত্র পাঠ করিয়াছিল তাই তিনি আমাদের আবার শুনিয়েছিলেন :
উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্‌ নিবোধত।
ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া
দুর্গং পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি।
হে বীর,উঠ, জাগো, যাহা-কিছু শ্রেষ্ঠ তাহাই প্রাপ্ত হইয়া প্রবুদ্ধ হও। সেই পথ ক্ষুরধারা, শাণিত,অতি দুর্গম!
যুগাচার্য, বিশ্ববিজয়ী, বীর-সন্ন্যাসী, স্বামী বিবেকানন্দ এর ১৫২ তম জন্মতিথির এই মাহেন্দ্রক্ষণে তাঁর প্রতি রইল শ্রদ্ধাঞ্জলি।

VEDA, The infallible word of GOD
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger