সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

চার বেদের মন্ত্র সংখ্যা

আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বেদ। আমরা যথেষ্ট প্রমাণ সাপেক্ষ বিশ্বাস করি যে আদিতে বেদের যত সংখ্যক মন্ত্র ছিল এখনো ততগুলো মন্ত্রই আছে। আর যুগযুগ ধরে বেদের একটি মন্ত্রের সামান্যতম পরিবর্তন না হওয়ার প্রেক্ষাপটে অনেক পাশ্চাত্য বিদ্বানরাও অভিভূত হয়েছেন। তাঁরা প্রশংসা বর্ষণ করেছেন সেসব মুনি-ঋষিদের প্রতি যারা আবিষ্কার করেছিলেন বেদ সংরক্ষণের অভূতপূর্ব সংরক্ষণ প্রণালী। সেই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা আলোচনা করব বেদের সর্বমোট মন্ত্র সংখ্যা নিয়ে।
চারবেদের মন্ত্রসংখ্যা কত?
-মহাঋষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চারবেদের সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী ২০৩৭৯
-পণ্ডিত দেবী চাঁদের অনুসারে ২০৩৮০
-আর্য সমাজ তথা মহর্ষি দয়ানন্দের হিসেবে ২০৪৩৪
এর মূল কারণে রয়েছে চারবেদের পৃথক মন্ত্র সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি। মহর্ষি বৈদিক বিশ্ববিদ্যালয় সকল প্রকার সংস্কৃত গ্রন্থের মূল পাণ্ডুলিপির বিশ্বস্থ সংরক্ষণ করে। তাঁদের পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী ঋগ, যজু, সাম ও অথর্বেদের মন্ত্রসংখ্যা যথাক্রমে ১০৫৫২, ১৯৭৫, ১৮৭৫, ৫৯৭৭ তাই মোট মন্ত্রসংখ্যা দাড়াল ২০৩৭৯।
আর্য সমাজের হিসেব মতে ঋগ, যজু, সাম ও অথর্ববেদের মন্ত্রসংখ্যা যথাক্রমে ১০৫৮৯, ১৯৭৫, ১৮৯৩ ও ৫৯৭৭; অতএব চারবেদে মোট মন্ত্রসংখ্যা দাড়াল ২০৪৩৪।
আমরা দেখতে পাচ্ছি মূলত ঋগবেদ ও সামবেদের মন্ত্রসংখ্যা নিয়েই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
এবার দেখে নেই কোনটি সঠিক? আর্য সমাজের প্রকাশিত বেদে কি মূল পাণ্ডুলিপির চেয়ে বেশী সংখ্যক মন্ত্র বিদ্যমান?
দ্বিপদ মন্ত্র ও চতুষ্পদ মন্ত্র:
ঋগবেদে বেশকিছু দ্বিপদ মন্ত্র আছে যেগুলোকে কখনো কখনো চতুষ্পদ মন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এরকম ১৫৭টি দ্বিপদ মন্ত্র আছে যার মধ্যে ১৭টি নিত্য দ্বিপদ মন্ত্র ও বাকি ১৪০ নৈমিত্তিক দ্বিপদ মন্ত্র। এই ১৪০টি দ্বিপদ মন্ত্র প্রকৃতপক্ষে ১৪০/২=৭০টি চতুষ্পদ মন্ত্র। অর্থাৎ দুটি দ্বিপদ মন্ত্র মিলে একটি চতুষ্পদ মন্ত্র।
উদাহরণস্বরূপ ঋগবেদের ১ম মণ্ডলের ৬৫-৭০ এই ছয়টি সূক্তে মূলত দ্বিপদ মন্ত্র রয়েছে যেগুলো চতুষ্পদ মন্ত্র হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। এখানে মহর্ষি বৈদিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ঋগবেদের ১ম মণ্ডলের ৬৫নং সূক্তের ছবি দিলাম, এখানে ১০টি দ্বিপদ মন্ত্র প্রকারন্তরে ৫টি চতুষ্পদ মন্ত্র রয়েছে। হলুদ রং এ হাইলাইট করা মন্ত্র নাম্বার দ্বারা চতুষ্পদ গণনা বোঝানো হল।
সায়ণাচার্য তাঁর ঋগবেদ ভাষ্যের ১.৬৫ তে লিখেছেন, “১.৬৫-৭০ সূক্তে মন্ত্রগুলো মূলত দ্বিপদ মন্ত্র। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী যখন বেদ শিক্ষা নিবে তখন সে চতুষ্পদ হিসেবে মন্ত্রগুলো শিখবে এবং যজ্ঞের ক্ষেত্রে মন্ত্রগুলো দ্বিপদ মন্ত্র হিসেবেই ব্যবহৃত হবে।”
ব্রাহ্মণ গ্রন্থে এবং নিরুক্ততে এমনটাই বলা হয়েছে।
ম্যাক্সমুলারের বেদ মুদ্রণ:
ম্যাক্সমুলার ১৮৭৩ সালে সম্পূর্ণ ঋগবেদের সংস্কৃতে প্রকাশ করেন। অসংখ্য পদ পাঠ ও পাণ্ডুলিপি থেকে সম্পূর্ণ সংস্কৃত ঋগবেদের এটিই ছিল প্রথম প্রামাণ্য সংস্করণ। পরবর্তীতে যেসব বিদ্বানরা(এমনকি মহর্ষি দয়ানন্দ) ঋগবেদ অনুবাদ বা ভাষ্য লিখেছেন তাঁরা ম্যাক্সমুলারের প্রকাশিত ঋগবেদ থেকেই কাজ করেছেন। এটি নিঃসন্দেহে ম্যাক্সমুলারের অমর কর্ম হলেও দ্বিপদ মন্ত্রগুলো ছাপানোর ক্ষেত্রে কিছু ত্রুটি ছিল। যেমন,
-ঋগবেদের ১.৬৫-৭০ সূক্তের ৬০টি মন্ত্র তিনি ৩০টি চতুষ্পদ মন্ত্র হিসেবেই প্রকাশ করেন।
-তিনি ঋগবেদের ৫ম মণ্ডলের ২৪ নং সূক্তের ৪টি দ্বিপদ মন্ত্র ২টি চতুষ্পদ মন্ত্র হিসেবে প্রকাশ করেন। যদিও গণনার সময় আবার এখানে চারটি মন্ত্রই হিসেব করেছেন।
এছাড়া বাকি ৭৬টি নৈমিত্তিক দ্বিপদ মন্ত্র তিনি ৭৬টি দ্বিপদ মন্ত্র হিসেবেই প্রকাশ করেন।

ঋগবেদ ও সামবেদের মন্ত্র সংখ্যার সমস্যা সমাধান:
মহাঋষি বিশ্ববিদ্যালয় মূলত মন্ত্র গণনার ক্ষেত্রে দ্বিপদ হিসেবেই একটি মন্ত্র গণনা করে থাকে। তাঁরা ম্যাক্সমুলারের মুদ্রণের ত্রুটি সংশোধন করে বিশুদ্ধভাবে বেদের প্রকাশ করে। ফলে তাঁদের হিসেব অনুযায়ী ঋগবেদের মন্ত্রসংখ্যা ১০৫৫২।
আমরা মহর্ষি দয়ানন্দের ঋগভাষ্যের শুরুতে পাই তিনি ঋগবেদের মন্ত্রসংখ্যা উল্লেখ করেছেন ১০৫৮৯। তিনি ভাষ্যের শুরুতে সকল মণ্ডলের মন্ত্র সংখ্যা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো যদি যোগ করি তাহলে পাই ১০৫২১ টি মন্ত্র (১৯৭৬+৪২৯+৬১৭+৫৮৯+৭২৭+৭৬৫+৮৪১+১৭২৬+১০৯৭+১৭৫৪)। এই ত্রুটির কারণ হিসেবে আমরা দেখতে পাই:
-তিনি ম্যাক্সমুলারের ছাপানো সংস্কৃত ঋগবেদ ভাষ্যের জন্য ব্যবহার করেছিলেন। ফলে ঋগবেদ ১.৬৫-৭০ সূক্তের ৬০টি দ্বিপদ মন্ত্রকে তিনি ৩০টি চতুষ্পদ মন্ত্র হিসেবে ভাষ্য করেন। তাই ১ম মণ্ডলের মন্ত্র সংখ্যা হবে ১৯৭৬+৩০=২০০৬
-তিনি ৮ম মণ্ডলের ২০নং সূক্তের মন্ত্র সংখ্যা ২৬ এর স্থলে ৩৬ লিখেছেন। সুতরাং ৮ম মণ্ডলের মন্ত্র সংখ্যা ১৭২৬ এর বদলে ১৭১৬ হবে।
-তিনি ৯ম মণ্ডলের ১০৯নং সূক্তের ২২টি দ্বিপদ মন্ত্রকে ১১টি চতুষ্পদ মন্ত্র হিসেবে যোগ করেন। তাহলে ৯ম মণ্ডলের মন্ত্র সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ১০৯৭+১১=১১০৮।
এবার সবগুলো মণ্ডলের মন্ত্রসংখ্যা যোগ করুন, যোগফল দাঁড়াচ্ছে ১০৫৫২ (২০০৬+৪২৯+৬১৭+৫৮৯+৭২৭+৭৬৫+৮৪১+১৭১৬+১১০৮+১৭৫৪)। তিনি ঋগবেদের যে মন্ত্রসংখ্যা লিখেছেন “১০৫৮৯” তা সম্ভবত ছাপার ভুল বা উনার লেখার ভুল।
আর সামবেদ ভাষ্য মহর্ষি দয়ানন্দ তৈরী করে যেতে পারেননি। তাছাড়া আর্য সমাজ বা মহাঋষি বিশ্ববিদ্যালয় সকল প্রকাশনীর প্রকাশিত সামবেদে দেখতে পাই মোট মন্ত্র সংখ্যা ১৮৭৫; ১৮৯৩ নয়।
তাহলে পরিশেষে আমরা দেখতে পাচ্ছি চারবেদের মোট মন্ত্রসংখ্যা ১০৫৫২+১৯৭৫+১৮৭৫+৫৯৭৭=২০৩৭৯

শেষ করছি ঋগবেদের সর্বশেষ মন্ত্রদ্বারা
সমানী ব আকুতিঃ সমানা হৃদয়ানি বঃ।
সমানমস্তু বো মনো য়থা বঃ সুসহাসতি।।
তোমাদের লক্ষ্য ও সিদ্ধান্ত এক হোক, তোমাদের অন্তরকরণ, অনুভূতি ও অনুরাগ এক হোক। তোমাদের মন ও চিন্তা-চেতনা ওক হোক। এইভাবে তোমরা সকলে এক হয়ে উন্নতি ও শান্তির পথে এগিয়ে যাও।
ওঁ শান্তি! শান্তি! শান্তি!
সর্বত্র শান্তি বিরাজিত হোক
VEDA, The infallible word of GOD


Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger