সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের প্রয়োজনীয়তা

সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের প্রয়োজনীয়তা 
বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এটি যেমন সত্যি, তেমনি সরকার প্রধানের ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক চেতনা সত্ত্বেও এ দেশের সংখ্যালঘুদের ওপর অন্যায়, অবিচার ও নিপীড়ন অব্যাহতভাবে চলছে এটিও সত্যি। ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে দেশরতœ শেখ হাসিনার সরকার কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গণ্য করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সংখ্যালঘুরা কেন সমাজের কাছ থেকে এত বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হচ্ছে? নারী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় প্রায় সব সমাজেই অধিকার বঞ্চিত। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে সরকার এসব বঞ্চনার কথা স্বীকার করে বঞ্চনার কারণগুলো দূর করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। আবার কোনো কোনো দেশে নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন স্বীকারই করা হয় না। সে সব স্থানে এ ধরনের নির্যাতন-নিপীড়ন ও বঞ্চনা নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। সেখানে সরকার এগুলো দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন পরিচালনার ক্ষেত্রে চরম উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পাকিস্তানের নাম আসে সর্বাগ্রে। ভারতে নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন হলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এগুলো স্বীকার করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। এ জন্য সে দেশে আছে নারী ও শিশু উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রণালয়। আমাদের বাংলাদেশেও নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য আছে একটি পৃথক মন্ত্রণালয়। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মের জন্য আছে পৃথক পৃথক ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট আছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আছে ‘সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’। কিন্তু বাংলাদেশে ‘সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ নেই। এ জন্য বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এখন জরুরি প্র্রয়োজন।

ভারতের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হচ্ছে, “…to ensure a more focused approach towards issues relating to the notified minority communities namely Muslim, Christian, Buddhist, Sikhs, Parsis and Jain. The mandate of the Ministry includes formulation of the overall policy and planning, coordination, evaluation and review of the regulatory framework and development programmes for the benefit of the minority communities.” ভারতের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সে দেশের সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বেশ কয়েকটি গ্রুপ ও কমিশন গঠন করেছে। এসব হচ্ছে, “Expert Groups on Diversity Index”, “Sachar Committee”, “Expert Group to examine & determine the structure and functions of an equal opportunity commission”, “Ranganath Misra Commission”। এসব গ্রুপ ও কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার বেশ কিছু কার্যক্রমও গ্রহণ করেছে। ভারতের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে অনেক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সে দেশের সংখ্যালঘুদের স্বার্থে।

১৯৪৭ সালে ধর্মীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে এ দেশে সংখ্যালঘুদের নির্যাতন ও বিতাড়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর এই বিধ্বংসী প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ার আশা করা গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক একটি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রণয়ন তারই ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দেশ পুনরায় পাস্তিানি স্টাইলের শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যায়। দীর্ঘকাল পরে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের পর এ ক্ষেত্রে বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। অর্পিত সম্পত্তি আইন বাতিল এর একটি অন্যতম উদাহরণ। কিন্তু প্রতিনিয়ত যেভাবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা হচ্ছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে এদের স্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে সেগুলো দেখাশোনার জন্য ‘সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করা একান্তভাবেই প্রয়োজন। বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি ‘ইকোয়ালিটি রাইটস কমিশন’ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। সংখ্যালঘুদের অধিকার, যা জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় অথবা ভাষাগত সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অবিভাজ্য অংশ। শিশুদের অধিকার, নারীর অধিকার এবং শরণার্থীদের অধিকারের মতো সংখ্যালঘুদের অধিকার হচ্ছে একটি আইনগত কাঠামো যার দ্বারা সমাজের ভঙ্গুর, অসুবিধায় থাকা অথবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমতা অর্জন করতে পারে এবং নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। আর এ জন্য অর্থাৎ বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্য ‘সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করা অতীব জরুরি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সমগ্র জীবন বঞ্চিত বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। ধর্মীয় উপনিবেশ পাকিস্তানের আজ্ঞাবহ খুনিদের হাতে সপরিবারে নিহত হওয়ার ৩৮ বছর পরে এবং তাঁর ডাইরি লেখার ৫৯ বছর পরে তাঁর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শিরোনামে প্রকাশিত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের ক্ষুদ্র একটি অংশ পাঠেও জানা যায় তিনি মানুষকে তাঁর ধর্মীয় পরিচিতির ভিত্তিতে না দেখে মানুষ হিসেবেই দেখার কথা বলেছেন। ফরিদপুর জেলখানায় বন্দি মৃত্যুশয্যায় শায়িত চন্দ্র বোস-এর সঙ্গে কথা বলার সময় বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘চিন্তা করবেন না, আমি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিস্টান বলে কিছু নাই। সকলেই মানুষ।’ (পৃষ্ঠা ১৯১)

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তারিখে প্রদত্ত তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু ‘এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির’ কথা বলেছিলেন। ‘মানুষ’ বলতে বঙ্গবন্ধু এ দেশে বসবাসকারী মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান প্রভৃতি সব ধর্মাবলম্বী বাঙালি-অবাঙালি সবাইকেই বুঝিয়েছেন। তাঁর জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধু এ জন্য যথোপযুক্ত পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ঘাতকের নির্মম বুলেট বঙ্গবন্ধুকে তাঁর আরাধ্য কাজ সমাধা করতে দেয়নি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এ দেশে পাকিস্তানি স্টাইলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরুত্থান ঘটে। ফলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জান-মালের ওপর আঘাত নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়।

বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা কি থাকতে পারবে? এ দেশে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচারী আচরণ ও সা¤প্রদায়িকতার দুর্বল শিকার অহিংস চেতনায় উদ্বুদ্ধ হিন্দু জনগোষ্ঠীর ‘জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির’ অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। পাশাপাশি ‘পরিচিত’ অথচ ‘অশনাক্ত’ শক্তির ক্ষমতা ও সম্পদের অপ্রতিহত লোভ-লালসা চরিতার্থ করার প্রয়োজনে হিন্দু জনসংখ্যার ক্রমহ্রাসমান প্রবণতাকে কেন্দ্র করে উত্থাপিত এ প্রশ্নটি সর্বনাশাও বটে। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচারী আচরণের’ আশঙ্কা করেছিলেন জেমস মিল এবং তাঁর পুত্র জন স্টুয়ার্ট মিল। Considerations on Representative Government শীর্ষক ধ্রæপদী কাজে জন স্টুয়ার্ট মিল ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচারকে’ প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। একটি হচ্ছে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনৈতিক স্বৈরাচার’, অপরটি হচ্ছে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের সামাজিক স্বৈরাচার’। রাজনৈতিক স্বৈরাচারের ব্যাপারটি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী রাজনৈতিক দল এবং বিরোধী দলের পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ামূলক আচরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অপরপক্ষে জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের সামাজিক স্বৈরাচার’-এর ধারণাটিতে আমরা বাংলাদেশে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের’ প্রতি ‘ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের’ স্বৈরাচারী আচরণের মিল খুঁজে পাই। যেখানে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ তাদের লোভ-লালসা চরিতার্থের নিমিত্তে আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ‘সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল’, উন্নয়নের নামে বংশানুক্রমিকভাবে সরকারি খাস জমিতে বসবাসরত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কোনোরূপ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদ, ট্যুরিস্ট রিসোর্ট নির্মাণের জন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহকে তাদের পৈতৃক ভিটা-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মেয়েদের ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি, সংখ্যালঘুদের অব্যাহত হুমকির মধ্যে রাখা, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় উপাসনালয়সমূহের পবিত্রতা নষ্ট প্রভৃতি কাজে লিপ্ত হয়। সার্বিকভাবে জন স্টুয়ার্ট মিল-এর ধারণাকৃত ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বৈরাচারের’ আগ্রাসী ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব খুবই অবহেলিত অথবা শূন্যের কোঠায় আছে।

এ দেশে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার যা সচরাচর ‘সংখ্যালঘুদের’ ওপর প্রয়োগ করা হয়ে থাকে সেগুলো চারটি প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা যায়। এগুলো হচ্ছে ১. আইনগত ও সাংবিধানিক বৈরিতা, ২. সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অব্যাহত সাম্প্রদায়িক প্রচারণা, ৩. সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধ, ৪. ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী কর্র্তৃক প্রায়শ ধর্মীয় জঙ্গিবাদী তৎপরতা। ব্রুস মজলিসের মতে জন স্টুয়ার্ট মিল-এর একটি দৃঢ় ও অপরিবর্তনীয় অভিপ্রায় ছিল আর তা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচারকে বাধাগ্রস্ত করা ও ব্যর্থ করে দেয়া এবং সভ্য ও মার্জিত ব্যক্তিবর্গ, সমাজ এবং মানবতার ‘স্বার্থসমূহের’ সম্মান রক্ষা করা। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জন্য ক্ষতিকর আইন ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা বাতিল, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান জানিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার কর্তৃক দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহন করা প্রয়োজন। এ জন্য দেশে সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করা জরুরি।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সফলতার ফলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রতি ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের আস্থা চিরকাল। পর্যবেক্ষকদের অভিমত হচ্ছে, ‘কেন্দ্রীয়ভাবে আওয়ামী লীগের গৃহীত নীতি-আদর্শ ও অবস্থান তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য সংখ্যালঘুদের কাছে, এটাই এখনো আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের সমর্থনের প্রধান কারণ।’ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করার অপরাধে ধর্মীয় সংখ্যালঘু অনেককে অকথ্য নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়ে দেশ ছাড়তে হয়েছে। ১৯৭৫, ১৯৯০, ১৯৯২, ২০০১, ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৫ সাল এভাবে পঁচাত্তর পরবর্তী প্রায় প্রতি বছরেই সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হয়েছে। সাংবাদিক কুররাতুল-আইন-তাহমিনা ‘আমরা কি করছি?’ শিরোনামে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে যেয়ে বলেছেন, ‘২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের জোট জিতেছিল। বলা হয়, সেই উপলক্ষে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষজনের ওপর হামলা হয়েছিল, তারা পরাজিত আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে বলে ধরে নিয়ে। বরিশালের গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলায় উপদ্রুত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে তখন শুনেছিলাম, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা পলাতক আর জাতীয় নেতাদের কেউ তাদের পাশে আসেননি।’ এই পরিস্থিতি প্রত্যেক নির্বাচনের সময় চলতে দেখা যায়। পাশাপাশি প্রতিদিনই প্রায় বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন বা আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। যাদের পরিচিত লোক আছে উপরের দিকে তারা দৌড়ঝাঁপ করে এর বিহিতের ব্যবস্থা করে। আর যাদের তা নেই তারা নীরবে দেশ ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু প্রতিনিয়ত এসব ঘটনা দেখভাল করার জন্য তথা সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ‘সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করা এখন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ২৮-এর উপ-অনুচ্ছেদ (১) এ বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।, উপ-অনুচ্ছেদ নং (২) এ বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ উপ-অনুচ্ছেদ নং (৩) এ বলা হয়েছে ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোনো বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোনো নাগরিককে কোনোরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।’ উপ-অনুচ্ছেদ নং (৪)-এ বলা হয়েছে, ‘নারী বা শিশুদের অনুক‚লে কিংবা নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’ ২৮ অনুচ্ছেদ-এর ৪ নং উপ-অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে ‘বিশেষ বিধান প্রণয়নের’ কথা। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এই চেতনার বহিঃপ্রকাশ তথা একটি বাস্তবসম্মত উদাহরণ হিসেবে আমরা গণ্য করতে পারি। তবে ‘নারী ও শিশু’ ছাড়াও ‘নাগরিকদের’ একটি ‘অনগ্রসর অংশের জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়নের’ প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে অনেক আগে থেকেই। এই বিশেষ বিষয়টি হচ্ছে ‘সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করা। কল্যাণকামী বাংলাদেশের সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে ‘সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করবেন বিবেকবান মানুষরা সেই আশাই করে।

অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার গোস্বামী : চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger