সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

মহাভারতেের উল্লেখিত প্রাচীন শহরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও নিদর্শনসমুহ - পর্ব ০২ ( তক্ষশীলা )

তক্ষশীলা প্রাচীন ভারতের একটি শিক্ষা-নগরী ।  পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় অবস্থিত শহর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। তক্ষশীলার অবস্থান ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। তক্ষশীলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৯ মিটার (১,৮০১ ফিট) উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতবিভাগ পরবর্তী পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এটি ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল।


এই শহরের সূচনা সেই গান্ধার যুগে এবং এখানেই রয়েছে প্রাচীন গান্ধারি শহর তক্ষশীলার পুরাতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ। প্রাচীন তক্ষশীলা শহর ছিল হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং বর্তমান সময়েও উক্ত ধর্মদুটির ঐতিহ্যে এ স্থানটির একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। ১৯৮০ সালে বেশকিছু এলাকাসহ তক্ষশীলাকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষনা করা হয়। গার্ডিয়ান পত্রিকা ২০০৬ সালে এটিকে পাকিস্তানের শীর্ষ পর্যটন স্থান হিসেবে নির্বাচিত করে।
তক্ষশীলার বৌদ্ধবিহার
তক্ষশিলায় প্রাপ্ত মূর্তি
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত খ্রিষ্টপূর্ব- ২০০-১০০ অব্দের তক্ষশীলার মুদ্রা

 হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে— দশরথের পৌত্র এবং ভরত গান্ধার দেশ জয় করে নিজের পুত্র তক্ষের নামানুসারে তক্ষশীলা ও পুষ্কলের নামানুসারে পুষ্কলাবতী নগর স্থাপন করেন । মহাভারতের মতে এই স্থান গান্ধারের অন্তর্গত। রাজা জনমেজয় এই নগরীতে সর্পযজ্ঞ করেছিলেন। এই নগরীর ভগ্নাবশেষ এখনও বর্তমান।



কিংবদন্তীতে রয়েছে, তক্ষ একটি রাজ্য শাসন করতেন যার নাম ছিল তক্ষ খন্ড এবং তিনিই তক্ষশীলা নগরের প্রতিষ্ঠা করেন। দামোদর ধর্মানন্দ কসামবি প্রবর্তিত অন্য একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, তক্ষশীল নামটি তক্ষক শব্দের সাথে সম্পর্কযুক্ত যা ছুতার বা সূত্রধর শব্দের সংস্কৃতরূপ এবং এই শব্দটি প্রাচীন ভারতের নাগা জনগোষ্ঠীর অপর একটি নাম। এই জাতির নামানুসারে এই স্থানের নামকরণ করা হয়েছিল তক্ষখণ্ড। কালক্রমে তক্ষখণ্ড নামটি তক্ষশীলা নামে পরিবর্তিত হয়।


খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫০-৪৬৫ অব্দের ভিতরে পারশ্যে রাজারা এই অঞ্চলে অনেকগুলো সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। ঐতিহাসিক প্লিনির মতে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫০-৫৩০ অব্দের ভিতরে পারশ্য সম্রাট কাইরাস ভারতে কয়েকবার আক্রমণ করেন এবং কপিশা নগরী দখল করতে সমর্থ হন। আরিয়ান নামক অপর একজন ঐতিহাসিকের মতে- কাইরাস কাবুল ও সিন্ধু নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল দখল করে নেন এবং এই অঞ্চল থেকে কর আদায় করতেন। কাইরাসের তৃতীয় উত্তরসূরী সম্রাট প্রথম দারায়ুস খ্রিষ্টপূর্ব ৫২২ অব্দ থেকে ৪৮৬ অব্দের ভিতরে গান্ধার, সিন্ধু-উপত্যাকা এবং পাঞ্জাব দখল করেন। এরপর জারেক্সিস খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৬ অব্দ পর্যন্ত এই অঞ্চলের উপরে আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হন। এই সময় এই অঞ্চলের অন্যান্য এলাকার সাথে তক্ষশিলাও পারসিকদের অধিকারে ছিল।খ্রিষ্টপূর্ব ৪০৫ অব্দের দিকে চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন তক্ষশীলা পরিদর্শন করেন এবং এই স্থানকে অত্যন্ত পবিত্র এলাকা হিসাবে উল্লেখ করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ অব্দেআলেকজান্ডার সিন্ধু নদ পার হয়ে তক্ষশিলায় প্রবেশ করেন। এই সময় তক্ষশিলার রাজা অম্ভি আলেকজান্ডারের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে তক্ষশিলায় অভ্যর্থনা করেন। এরপর অভিসার জাতির নেতাও আলেকজান্ডারের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে। এরপর আলেকজান্ডার তক্ষশিলা থেকে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে ঝিলম নদী পার হয়ে পুরুর রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন। আলেকজান্ডারের ভারত ত্যাগের আগে ঝিলম ও বিপাশা নদীর মধ্যাভাগের অঞ্চল পুরুকে এবং সিন্ধু ঝিলম নদীর মধ্যভাগের অঞ্চল অম্ভির কাছে ছেড়ে দেন। এরপর চন্দ্রগুপ্তের গুরু এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ কৌটিল্যের (চাণক্য) পৃষ্ঠপোষকতায় তক্ষশিলায় রাজত্বের পত্তন করেন চন্দ্রগুপ্ত। কালক্রমে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বিশাল রাজত্বের অধিকারী হন। চন্দ্রগুপ্ত তাঁর পুত্র বিন্দুসারে কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার পর, তক্ষশীলাবাসী রাজশক্তির অত্যাচরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বিন্দুসারে নির্দেশে তাঁর যুবরাজ অশোক তক্ষশীলার বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩ অব্দের দিকে অশোক রাজত্ব লাভ করেন। তখন মৌর্য রাজাদের রাজধানী ছিল পাটালীপুত্র। কিন্তু তক্ষশিলা বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। অশোক পাটালিপুত্র থেকে তক্ষশিলার ভিতরে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করেন।

খ্রিষ্টাপূর্ব ১৮৫ অব্দের দিকে শেষ মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথকে হত্যা করেন তাঁর সেনাপতি পুষ্যমিত্র। এই সময় মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথের আত্মীয় যজ্ঞসেন বিদর্ভের স্বাধীন রাজা হিসাবে ঘোষণা দেন। পুষ্যমিত্রের সাথে যজ্ঞসেনের বাহিনীর সাথে যুদ্ধ হলে, যজ্ঞসেন পরাজিত হন। পরে যজ্ঞসেনের দুই আত্মীয়ের ভিতর বিদর্ভরাজ্যকে ভাগ করে দেওয়া হয়। পুষ্যামিত্রের রাজত্বকালে গ্রিকরা তাঁর রাজ্য আক্রমণ করলে, গ্রিকরা পরাজিত হয়। পুষ্যামিত্র বৌদ্ধধর্ম-বিদ্বেষী ছিলেন। ফলে তাঁর সময় তক্ষশীলা গুরুত্ব হারাতে থাকে। অনেকে মনে করেন এই সময় তক্ষশীলারা বৌদ্ধ-স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছিল।

খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৯ অব্দে পুষ্যামিত্র পরলোক গমন করার পর, তাঁর পুত্র অগ্নিমিত্র বিদিশার ক্ষমতা দখল করেন এবং বিদর্ভরাজকে পরাজিত করেন। অগ্নিমিত্রের পর পর এদের উত্তরপুরুষরা রাজত্বের সমৃদ্ধিকে বজায় রাখতে ব্যর্থ হন। এই বংশের শেষ সম্রাট সুমিত, মুলাদেব নামক এক আততায়ীর হাতে নিহত হন। এরপর এই অঞ্চলে শুঙ্গবংশের রাজত্ব শুরু হয়। এই রাজবংশের রাজত্বকালে গ্রিকরা তক্ষশীল দখল করে নেয়। এরপর শকদের কাছে গ্রিকরা ক্ষমতা হারায় এবং তক্ষশিলা শকদের অধীনে চলে যায়। এপর শকদের উৎখাত করে ভারতে আধিপত্য বিস্তার করে কুষাণ রাজবংশ। কুষাণদের রাজ্য বিস্তারের সময় তক্ষশীলা ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তী সময় কুষাণ রাজবংশের শাসনমলেই তক্ষশিলা আবার তার পুরানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে থাকে। কালক্রমে তক্ষশীলা বৌদ্ধদের বিহার ও শিক্ষাকেন্দ্রে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠে। বৌদ্ধ রাজশক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে, হিন্দু রাজারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তশালী হয়ে উঠে। বৌদ্ধধর্ম-বিদ্বেষী রাজাদের দ্বারা তক্ষশীলা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এছাড়া পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-ছাত্র হীন কাঠামোতে পরিণত হয়। এবং তক্ষশীলা জন-পরিত্যাক্ত নগরীতে পরিণত হয়। ৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে তক্ষশীলায় সর্বশেষ আক্রমণটি আসে হুনদের পক্ষ থেকে। এরপর পুরো তক্ষশীলা ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়:

ব্যবেলিয়ন, গ্রীস, সিরিয়া, পারস্য, আরব, চীন সহ পৃথীবির বিভিন্ন দেশ থেকে বিদ্যা লোভী ছাত্ররা এখানে এসে ভীড় করত প্রতিকূল যোগাযোগ ব্যবস্থা,  এবড়ো থেবড়ো অমসৃন পথের দুঃসহ যন্ত্রনা ও যাত্রা পথে মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে উচ্চ শিক্ষার হিরন্ময় সাফল্য লাভের আসায়।
তক্ষশীলায় যাওয়া আসার তিনটি প্রধান পথ খোলা ছিল সেসময়-
উত্তরা পথঃ ভারত বর্ষের তৎলালীন মগধের রাজধানী পাটালিপুত্র হয়ে গান্ধারা রাজ্যে প্রবেশ করেছিল।
উত্তর-পশ্চিমা পথঃ বেকট্রিয়া, কেপিসা হয়ে পুষ্কালাভাটি। অর্থাৎ এই পথটি বর্তমানে গ্রীক, ইরান, চীন উজবেকস্থান, আফগানিস্থান হয়ে পেশোয়ারে প্রবেশ করেছিল।
সিন্ধু পথঃ কাশ্মির, শ্রীনগর, পাকিস্তানের খাইবার পাক্তুনখোয়া, হরিপুর উপত্যকা, চীন হয়ে মধ্য এশিয়ার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করত।
এই সব যাত্রা পথের বিপদ, ক্লান্তি ও দুঃস্বপ্নকে জয় করে তক্ষশীলায় দেশী বিদেশী ছাত্র সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১০,৫০০ ছাত্রদের লেখা-পড়া, থাকা-খাওয়া বাবদ প্রচুর পয়সা গুনতে হত তক্ষশীলায়। বয়স কম পক্ষে ১৬ বা তার চেয়ে বেশী বয়সের শিক্ষার্থীদের এখানে ভর্তির সুযোগ দেয়া হত। তবে শর্ত ছিল তাদের অবশ্যই নিজ নিজ এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার অধ্যায়টি শেষ করে এসে তক্ষশীলায় পড়ার উপযুক্ততা প্রমান দিতে হবে। নগদ পয়সা ছাড়াও সোনা দানা জমা দিয়েও পড়ার ব্যবস্থা ছিল। পড়াশুনার খরচ বাবদ ধনী ছাত্রদের কাছ থেকে অগ্রিম ১০০০ মুদ্রা বা কম বেশী অর্থ জমা নেওয়া হত। মেধাবী অথচ হত দরিদ্রদের বিশেষ ছাড় দেয়ার ব্যবস্থা ছিল। নিয়ম এত কঠোর ছিল রাজার ছেলে হয়েও যোগ্যতা প্রমানে ব্যর্থ হলে তক্ষশীলায় পড়ার কোন প্রকার সুযোগ দেয়া হত না। ছাত্রদের যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের পছন্দসই বিষয় পড়ার সুযোগ থাকত। ভেদাস, ভাষা, ব্যাকরন, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র, ধনু বিদ্যা, রাজনীতি, যুদ্ধ বিদ্যা, জ্যোতিঃশাস্ত্র, হিসাব বিজ্ঞান, গনিত, অর্থনীতি, গান, নাচ, হস্তশিল্প, ইত্যাদি বিষয় সহ এখানে কোর্সের সংখ্যা ছিল ৬০ ঊর্ধ। কোর্স চলাকালীন সময় শিক্ষক যদি মনে করেন তাঁর কোন ছাত্র ঐ নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়ার উপযুক্ত নয় বা কোন কারনে উপযুক্ততা হারিয়েছে সেক্ষেত্রে শিক্ষক চাইলে তাকে  বিদায় করার ক্ষমতা রাখতেন। প্রায় প্রত্যেকটা পাঠ্য বিষয়ের মেয়াদ ছিল ৮ বছর ব্যাপি। দিনের সাথে সাথে রাতের বেলায়ও শিক্ষক ছাত্রের বিদ্যা দান ও গ্রহনের অপূর্ব কোলাহলে চঞ্চল থাকত এই শিক্ষানিকেতন।
আধুনিক কালের এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা যুগের সূচনার আগে মানুষের জীবন রক্ষায় একমাত্র ভরসা ছিল গাছ-পালা, কান্ড, ফল-মূলের নির্যাস দিয়ে তৈরী ঔষধ। চিকিৎসা শাস্ত্রে যা ভেষজ বা আয়ুর্বেদ নামে পরিচিত। বর্তমানে অবশ্য তা হারবাল চিকিৎসা নামে সমগ্র পৃথিবী ব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে। তক্ষশীলা ছিল ভেষজ ও শৈল্য চিকিৎসা বিদ্যার প্রাণ কেন্দ্র। এখানে বিভিন্ন রোগের কারন ও প্রতিকার নিয়ে চলত দিন রাত গবেষনা। রোগ যন্ত্রনা নিয়ন্ত্রন ও মানুষেয় দীর্ঘ আয়ু লাভের প্রচেষ্টায় বছরে বছরে উৎপাদন করা হত প্রচুর চিকিৎসক। তাদের অনেকে নিজ সৃষ্টি কর্মের যোগ্যতা, প্রতিভা ও নিরলস প্রচেষ্টায় স্থান দখল করে উজ্জ্বল হয়ে আছেন প্রাচীন ভারতের চিকিৎসা ইতিহাসের পাতা জুড়ে।
সাফল্যের সাথে কোর্স শেষে কোন প্রকার সনদ প্রদানের ব্যবস্থা সে আমলে গড়ে না উঠলেও শিক্ষা শেষে ছাত্ররা নিজ নিজ দেশে ফিরে আসলে মর্যাদা পেত বরেণ্য পন্ডিত ব্যক্তি রূপে। কোন ছাত্র তার শিক্ষা খরচ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাকে গুরু গৃহের কৃষিকাজ, পানি আনা, আগুনের জন্য শুকনো কাঠ জোগাড় করা সহ বিভিন্ন গৃহস্থালি কাজ করে তা শোধ করার রেওয়াজ ছিল তক্ষশীলায়।
সেই সময় সম্ভবত নারীদের উচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোন অবকাঠামো তৎলালীন সমাজে গড়ে উঠেনি। তক্ষশীলায় নারী শিক্ষার কোন প্রমান এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায় নি।

তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য পণ্ডিতবর্গ:


০১. চাণক্য (অর্থনীতিবিদ):

তক্ষশীলা ও চাণক্য যেন ছাপানো মুদ্রার এপিট ওপিট। তক্ষশীলা নিয়ে কোন কথা উঠলেই যেমন চাণক্যর নাম আসে অবধারিত ভাবে তেমনি চাণক্যর জীবনী তক্ষশীলাকে বাদ দিয়ে আলোচনা করলে তা হবে অসম্পূর্ন। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, প্রখর মেধা, বাস্তববাদী ও অসাধারন পান্ডিত্যের অধিকারী এই মহা পুরুষ টির শিক্ষা-দীক্ষা ও কর্ম জীবনের প্রথম অধ্যায়টি কাটে তক্ষশীলায়।তিনি তক্ষশীলার রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে আচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন অনেক দিন।

ব্রাহ্মন পরিবারে জন্ম নেয়া মহাপুরুষটির পিতা মাতার দেয়া নাম ছিল “বিষ্ণুপদ”। “কূটিলা গোত্র” থেকে এসেছেন বলে গোত্র নামকে অক্ষয় করতে “কৌটিল্য” ছদ্ম নামে লেখেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “অর্থশাস্ত্র”। নামে “অর্থশাস্ত্র” হলেও মূলত তা ছিল রাজ্য শাসন ও কূটনৈতিক কলা কৌশল বিষয়ক সুপরামর্শ।“অর্থশাস্ত্র”র মোট ভাগ ১৫ টি। গ্রন্থে মোট শ্লোক সংখ্যা ৬০০০ রাষ্ট্র বিজ্ঞান, শত্রু দমন, রাজস্ব, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন, প্রভৃতি রাষ্ট্র ও জন কল্যান মূলক বিষয় নিয়ে এই ১৫টি ভাগ গঠিত। খ্রীষ্ট পূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে “চানকা” গ্রামে জন্ম নেওয়ায় বিষ্ণুপদ “চানক্য” নামে ব্যাপক পরিচিতি পান। আবার কোন কোন ইতিহাসবিদদের ধারনা পিতার নাম “চানক” অনুসারে তাঁর নাম হয় “চাণক্য”।

মগধ রাজা “ধনানন্দ”র রাজসভা থেকে বিতাড়িত হয়ে “চাণক্য” ও দাসী “মুরা”র গর্ভে জন্ম নেওয়া “ধনানন্দ”র সৎভাই রাজ্য থেকে বিতারিত “চন্দ্রগুপ্ত” দুজনে মিলে অপমানের প্রতিষোধ নিতে গড়ে তোলেন এক বিশাল শক্তিশালী সেনাবাহিনী। যা নন্দ বংশের রাজা “ধনানন্দ”কে শেষ পর্যন্ত পরাজিত করে গোড়াপত্তন করেন ইতিহাসখ্যাত “মৌর্যবংশ”।

০২. পাণিনি (ব্যাকরণবিদ, অষ্টাধ্যায়ী নামক ব্যাকরণের রচয়িতা):

গান্ধারা রাজ্যের “শালাতুর” বর্তমান লাহোরে জন্ম নেয়া পাণিনি তক্ষশীলা বিশ্ব বিদ্যালয়ের আরেক মহান সৃষ্টি। তাঁর জন্ম সন নিয়ে প্রচুর মতানৈক্য আছে ইতিহাসবিদদের মাঝে। তিনি “অষ্টাধ্যায়ী” নামক সংষ্কৃত ব্যাকরণ রচয়িতা হিসাবে বেশ সুপরিচিত। এই গ্রন্থে তিনি সংষ্কৃত রূপমূলতত্ত্বের ৩৯৫৯টি নতুন নিয়ম যোগ করেন। “অষ্টাধ্যায়ী” প্রাচীন সংষ্কৃত ভাষায় রচিত ব্যাকরণগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান গ্রন্থ হিসাবে স্বীকৃত। পাণিনি তাঁর ব্যাকরণে শব্দের উৎপত্তি, ধ্বনি তত্ত্ব, বর্ণমালা, উচ্চারণ, সন্ধির নিয়ম কানুন বিজ্ঞান সন্মত করে উপস্থাপন করে গেছেন অত্যন্ত সাবলীল ভাবে।
পণি বা পাণিন হল একটি গোত্রের নাম। গোত্রের নামানুসারে তাঁর নাম হয় “পাণিনি” তাঁর পিতার নাম ছিল শলঙ্ক।তাই পণিনির আরেক নাম “শালাঙ্কি”। তাঁর মা ছিলেন দক্ষ জাতির কণ্যা। তাই অনেকে আবার তাঁকে “দাক্ষিপুত্র” নামেও অভিহত করেন।
০৩. চরক (চিকিৎসক, চরক সংহিতা নামক আয়ুর্বেদ-গ্রন্থের রচয়িতা): 

২০০ খৃষ্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করা চরক চিকিৎসা শাস্ত্রে তক্ষশীলার আরেক বিস্ময়কর অবদান। যোগ সাধনা চর্চার জন্য অনেকে আবার তাকে চরক মুনি বা ঋষি হিসাবে ডেকে থাকেন। তাঁর অনেক অনুসারী ছিল। ছিলেন কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন ভেষজ চিকিৎসা শাস্ত্র “চরক সংহিতা” রচনা করে।
আয়ুর্বেদ চিকিৎসাকে এই বই এনে দিয়েছে বৈপ্লবিক ছোঁয়া। প্রাচীন ভারতের চিকিৎসা শাস্ত্রের ইতিহাসে প্রথম প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হয় এই “চরক সংহিতা”এই গ্রন্থে তিনি ৫০০ ঔষধের বর্ননা লিপি বদ্ধ করেছেন।
চরক-সংহিতায় মতে “তাকেই বলে ভেষজ যাতে হয় আরোগ্য”।
চরক ও সুশ্রম্নত সংহিতায় উল্লেখ আছে কাঁচা আমলকির রসের সাথে ২/১ কোয়া রসুন বাটা খেলে যৌবন দীর্ঘস্থায়ী হয়। অতএব আর দেরি নয়, কোন রকম পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ঘটার সম্ভাবনাও একেবারে শুন্যের কোঠায়। দীর্ঘ যৌবন প্রত্যাশীরা যৌবন ধরে রাখতে শেষ চেষ্টা চালিয়ে দেখতে পারেন একবার।
০৪. জীবক (শৈল্য চিকিৎসক, গৌতমবুদ্ধের চিকিৎসক):

তক্ষশীলার শৈল্য চিকিৎসা বিদ্যায় জীবক ছিলেন আরেক অনন্য সৃষ্টি। ইতিহাসবিদদের মতে তার জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৬ থেকে ৪৮৬ অব্দের কোন এক সময়ে। তিনি প্রায় ৭ বছর তক্ষশীলায় চিকিৎশাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন। তিনি ছিলেন মগধ রাজ্যের অধিপতি রাজা বিম্বিসার ও বুদ্ধের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। জীবক ছিলেন বুদ্ধের সমসাময়িক এবং প্রাচীন ভারতের চিকিৎসাশাস্ত্রের আরেক নক্ষত্র আত্রেয়-এর সেরা শিষ্য। তিনি শরীর ও শল্য উভয় বিদ্যায় সমানে দক্ষতা অর্জন করেন। রোগীর নাড়ী পড়ার অপূর্ব ক্ষমতা রাখতেন তিনি। ছিলেন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ। জটিল অপারেশনেও তাঁর ক্ষমতা ছিল বলে শোনা যায়। রোগ নির্ণয় এবং তার প্রতিষেধক নিয়ে জীবক লিখিছিলেন অসংখ্য গ্রন্থ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কাশ্যপ-সংহিতা।
ছাত্রবস্থায় চিকিৎসা শাস্ত্রে তাঁর প্রজ্ঞা নিয়ে একটি গল্প চালু আছে তা হলো- তক্ষশীলার জনৈক শিক্ষক তার ছাত্রদের একটি বাগানে নিয়ে বলেন সেখান থেকে গুন হীন উদ্ভিদ খুঁজে বের করতে। শুরু হল খোজা খুজির প্রতিযোগীতা কিন্তু জীবক বাদে অন্য শিষ্যরা তাদের মতে নির্গুণ উদ্ভিদ হাত বোঝাই করে এনে তুলে দেন গুরুর হাতে। কিন্তু জীবক অনেক খোজা খুজি করে ক্লান্ত হয়ে ফিরে এলেন ভগ্ন হৃদয়ে শুন্য হাতে। ফিরে এসে তাঁর শিক্ষককে জানালেন তিনি এমন কোনো উদ্ভিদ খুঁজে পাননি যার ভেতরে কোন না কোন গুণ নেই। শিক্ষক যারপরনাই খুশি হয়ে বলল্লেন একমাত্র জীবকের শিক্ষাই সম্পূর্ণ হয়েছে।
এছাড়াও রাজা প্রসেনজিত, সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত, মোহালির মত আরো অসংখ্য ইতিহাসিক ব্যক্তিত্ব রাত-দিন নীরব নিভৃতে সুনিপুন ভাবে তৈরী করে গেছে এই মহান প্রতিষ্ঠানটি।
চাণক্য, আত্রেয়, বিষ্ণু শর্মা, নাগার্জুনের মত ইতিহাস খ্যাত প্রথিযশা জ্ঞান তাপস পন্ডিত ব্যক্তিদের শিক্ষক রূপে পেয়ে তক্ষশীলার সুখ্যাতি পৌঁছে গিয়েছিল অনতিক্রম্য উচ্চতায়, দ্রুত নজর কেড়েছিল বিশ্ব দরবারে। তক্ষশীলার খ্যাতির পরশ গ্রিক সেনাপতি আলেকজেন্ডারকে এতটাই তন্ময় করেছিল তিনি তক্ষশীলা দখল করার পর সাথে করে কিছু শিক্ষক তার সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রাচীন শিল্প সভ্যতায় উন্নত গ্রীক সভ্যতাকে আরো গতিশীল করার মানসে।
ছাত্রদের সুশিক্ষা, পন্ডিত শিক্ষকদের সৎ,মানবিক, সুস্থ চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ শুধু বাক সর্বস্ব ছিল না, তার প্রয়োগিক চর্চা করতেন তাদের ব্যবহারিক জীবনে। আমারা তার ঐতিহাসিক প্রমান পাই আলেকজেন্ডারের আগ্রাসী আক্রমনে যখন গৃহ, সহায়-সম্বল, ভিটা-মাটি অর্থ-বিত্ত সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে হাজার হাজার মানুষ জীবন বাঁচতে তক্ষশীলার কোলে আশ্রয় নেয়। এই অনাকাঙ্খিত উদ্ভুত পরিস্থিতিতে কি করা উচিত তা নিয়ে তক্ষশীলার রাজা এক পরামর্শ সভার আয়োজন করে। সে সভায় তক্ষশীলার শিক্ষক মন্ডলি এই সব উদ্বাস্তু লোকদের তক্ষশীলায় ভূমি দানে তাঁদের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
হাজার বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষা, শিল্প, সভ্যতাকে প্রগতির পক্ষে পরিচালিত করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে উৎপত্তি বিলয়ের জাগতিক ব্যতয়হীন নিয়ম রক্ষার্থে বোধহয় তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে গেছে সাম্রাজ্যবাদী পারস্য, গ্রীক, রোমান, শক, কুষান, আক্রমণ। এই সব আক্রমনে সৃষ্ট অস্থির রাজনৈতিক ঘোর অন্ধকার পরিমন্ডলে আগুয়ান অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নিরাপত্তাহীনতার দুশ্চিন্তায় ক্রমে ক্রমে হ্রাস পেতে শুরু করে শিক্ষক ও ছাত্র সংখ্যা। ৪৫০ খ্রীষ্টাব্দে সর্ব শেষ আক্রমণটি আসে হুন দের পক্ষ থেকে। এভাবে বার বার সাম্রাজ্যবাদীর হিংস্র থাবার কবলে পড়ে ধীরে ধীরে মৃত্যু গ্রাস করে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ব বিদ্যালয়টিকে। স্তব্দ হয় তার পথ চলা। শোকের মাতমে যেন অব্যবহৃত ইট সুড়কির দালান কোঠা গুলোতে ধুলোর আস্তর ঢেলে স্মৃতি সমাধি তৈরী করে প্রকৃতি নিজের হাতেই।

সূত্র:
ভারতের ইতিহাস। অতুলচন্দ্র রায়/প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়।
বাংলা বিশ্বকোষ। দ্বিতীয় খণ্ড। নওরোজ কিতাবিস্তান, ঢাকা। ডিসেম্বর ১৯৭৫।
 এবং মুক্তমনা বল্গ হতে ।

ছবিঃ নিরঞ্জন হাওলাদার ও উইকিপিডিয়া হতে


Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger