সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

বৈদিক দর্শন

ভারতবর্ষ পৃথিবীর সকল দর্শন এর মাতৃভুমি। আর নিঃসন্দেহে এই সকল দর্শনের উত্‍স পবিত্র বেদ। মানবসভ্যতার বিস্ময় এ গ্রন্থটির উপরেই গড়ে উঠেছে আস্তিক্যবাদ, নাস্তিক্যবাদ,সংশয়বাদ, অনু-বাদ সহ পৃথিবীকে নাড়িয়ে দেয়া সকল মতবাদ।
তবে মুলত বৈদিক দর্শনগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়-আস্তিক ও নাস্তিক দর্শন। আস্তিক দর্শন এর ৬টি শাখা রয়েছে। এগুলো যথাক্রমে-
১/ন্যয়
২/সাংখ্য
৩/যোগ
৪/বৈশেষিক
৫/মিমাংসা
৬/বেদান্ত
আর নাস্তিক দর্শনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বৌদ্ধ মতবাদ, জৈন মতবাদ প্রমুখ। দর্শনসমুহের উপর ধারাবাহিক পোষ্ট এর প্রথম পর্বে আজ ন্যয়(Nyaya) দর্শন এর উপর আলোকপাত করব।

ন্যয় কি?
-----------
ন্যয়(Nyaya),অপর অর্থ Recursion(যুক্তিখন্ডন বা প্রমান ছাড়া কোন কিছু বিশ্বাস করাকে অস্বীকার করা) বা Syllogism(কোন স্বিদ্ধান্তে আসতে দুই বা ততোধিক যুক্তি বা প্রমান বিবেচনা করা)।
ন্যয়বিদ্যাকে তর্কবিদ্য(Knowledge of debate) এবং বাদবিদ্যা(Knowledge of discussion) ও বলা হয়।

শাস্ত্র এবং ব্যখ্যাকারী গ্রন্থ

বেদ ঈশ্বরের অলঙ্ঘনীয় বাণী,এ তত্ত্বকে মাথায় রেখেই ন্যয় দর্শন এর পথচলা। এই দর্শনের মুলনীতি ব্যখ্যা করা হয়েছে মহর্ষি গৌতম এর ন্যয় সুত্র(Nyaya sutra) তে।ন্যয় সুত্র গ্রন্থটি মোট ৫টি খন্ডে বিভক্ত। প্রতিটি খন্ডে আবার দুটি করে বিভাগ রয়েছে। এটা আনুমানিক খ্রিষ্টপুর্ব ২য়-৩য় শতক এ লেখা হয়।এর উপর লিখিত ভাষ্যের মধ্যে বত্‍সায়ন মুনির ভাষ্য অন্যতম।

মহর্ষি গৌতম
মহর্ষি গৌতম কে অক্ষপদ গৌতম(যার দৃষ্টি সর্বদা ব্রক্ষ্মপদে নিবিষ্ট) এবং দীর্ঘতপ গৌতম(যিনি দীর্ঘসময় তপস্যা করেছেন) ও বলা হয়।
তিনি আনুমানিক খ্রিষ্টপুর্ব ৫০০-২৫০ শতকের দিকের লোক ছিলেন । প্রাচীন ভারতবর্ষের তর্কশাস্ত্রবিদদের মধ্যে তিনি উজ্জলতম।

ন্যয় সুত্রের ভিত্তিতে ন্যয় দর্শনের মুলনীতিসমুহ

১/ন্যয় সুত্রে বলা হয়েছে
"ক্রমে ক্রমে সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে,মিথ্যা বা ভুল জ্ঞান বর্জন করে,দুশ্চরিত্রতা মুক্ত হয়ে,কর্মসাধন এর মাধ্যমে মোক্ষ লাভ হয়"
[Nyaya sutra 1/1/2]
ন্যয় দর্শন বলেছে যে জ্ঞান অর্জনের ১৬টি পর্যায় রয়েছে।এগুলো হল-
প্রমান,প্রমেয়,সংশয়,
প্রয়োজন,দৃষ্টান্ত,স্বিদ্ধান্ত,
অবব্য,তর্ক,নির্ময়া,বাদ
,জল্প,বিতর্ক,হেত্বাভাষ,ছল,জতি বা খন্ডন,নিগ্রহস্থান।
ন্যয় হল একটি বিশেষ ব্যবস্থা যাকে Epistemology ও বলা হয়।Epistemology হল জ্ঞানের সেই শাখা যা জ্ঞানের প্রকৃতি সম্বন্ধে আলোচনা করে। এটি তিনটি প্রশ্ন উপস্থাপন এর মাধ্যমে জ্ঞান অন্বেষন করে।

a)জ্ঞান কি?
b)কিভাবে তা অর্জিত হবে?
c)একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বস্তু সম্বন্ধে কতটুকু জানা সম্ভব?

তাই ন্যয় শাখাকে যুক্তিসমন্বিত দর্শন ও বলা হয়।
এবার আসি কিভাবে নৈয়ায়িক রা জ্ঞান অর্জনের উপায় বর্ননা করেছেন।
ন্যয় দর্শন মতে সঠিক জ্ঞান অর্জনের চারটি উপায় রয়েছে-প্রত্যক্ষ(Perception),
অনুমান(Inference),
উপমান(Comparison),
শব্দ(Verbal testimony)

প্রত্যক্ষ(perception)
ন্যয় সুত্রে প্রত্যক্ষকে মহর্ষি গৌতম ব্যখ্যা করেছেন এভাবে,
"সংবেদী প্রত্যঙ্গের(চক্ষু,কর্ন ইত্যাদি) সাথে বস্তুর সরাসরি সংযোগ এর মাধ্যমে নির্ভুল অবধারন"
[Nyaya sutra 1/1/4]
প্রত্যক্ষ প্রমান দুই রকম-লৌকিক এবং অলৌকিক।লৌকিক উপায়ে প্রত্যক্ষ করা যায় চক্ষু,কর্ন,নাসিকা প্রভৃতির মাধ্যমে।অলৌকিক উপায়ে প্রত্যক্ষ প্রমান তিন রকম।
সামান্যলক্ষন,জ্ঞানলক্ষন(ধরুন আপনি একটা লন্কা দেখলেন। ওটা না খেয়েও আপনি বলে দিতে পারবেন যে ওটা ঝাল বা গরম ঝাঁঝযুক্ত হবে),যোগলক্ষন(এটা যোগের মাধ্যমে অতীত.বর্তমান ও ভবিষ্যত এর জ্ঞান অর্জন)।

অনুমান(Inference)
অনুমানকে সাধারনত তিন শ্রেনীতে ভাগ করা হয়।
যথা-পুর্ববত,শেষবত, সামান্যতদৃষ্ট।
পুর্ববত এর ক্ষেত্রে অজানা ফলাফল কে জানা বা পুর্বাভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত কারন দ্বারা অনুমান করা হয়(যেমন অধিক বৃষ্টি পড়লে কি হবে? যেহেতু অধিক বৃষ্টির ফলে গতবছর বন্যা হয়েছিল সেহেতু এই বছরও বন্যা হবে। তাহলে জানা কারন 'অধিক বৃষ্টি' থেকে অজানা ফলাফল বন্যা বের হল।
শেষবত এর ক্ষেত্রে জ্ঞাত ফলাফল থেক অজ্ঞাত কারন অনুমান করা হয়। (সকালের ভেজা মাটি থেকে রাতের বৃষ্টি বা শিশির নির্ধারন)
সামান্যতদৃষ্টতে অনুমান কার্যকারন এর ভিত্তিতে নয় বরং দুইটি প্রভাবক এর একসাথে উপস্থিতি এর উপর ভিত্তিতে অনুমান করা হয়। যেমন-বেদ এ জ্ঞান গ্রথিত আছে তাই এর গ্রন্থকার জ্ঞানী। আবার একইসাথে এটা নির্ভুল। কিন্তু যেহেতু মানুষ এর পক্ষে পুরোপুরি নির্ভুল হওয়া সম্ভব নয় সেহেতু এর গ্রন্থকার মানুষ নন।
তবে অনেকসময় অনুমানে ভুল হতে পারে। একে হেত্বাভাষ বলা হয়।
অনুমান এর ৫টি ধাপ। একটি উদাহরন এর মাধ্যমে তা বর্ননা করা হল-
a)একটি পাহাড়ে আগুন আছে কিনা তা নির্নয় করতে হবে।
b)পাহাড়ে ধোয়া দেখা যাচ্ছে
c)আগুন বিনা ধোয়া হয়না
d)তাহলে নিশ্চয় পাহাড়ের ধোয়ার উত্‍স হল আগুন
e)সুতরাং পাহাড়ের কোথাও আগুন আছে।

উপমান(Comparison)
এক্ষেত্রে পুর্বাভিজ্ঞতার জ্ঞান এর আলোকে বর্তমান এ সংগঠিত ঘটনা এর তুলনা করা হয়।

শব্দ(Verbal testimony)
এক্ষেত্রে বই এ লেখা তথ্যের ভিত্তিতে বা অন্য কোন জ্ঞানী ব্যক্তির দেয়া তথ্যের আলোকে জ্ঞান অর্জন করা হয়। এটি দুই প্রকারের। বৈদিক ও লৌকিক।
বৈদিক প্রমান হয় চার বেদের উপর ভিত্তি করে।যেহেতু বেদ অলঙ্ঘনীয় এবং ধ্রুবসত্য,সেহেতু কোনকিছু এতে পাওয়া গেলে একে নিশ্চিত সত্য হিসেবে ধরা হবে।
অপরদিকে লৌকিক এর ক্ষেত্রে কোন জ্ঞানী ব্যক্তির কাছ থেকে বা অন্য কোন বই থেকে জ্ঞানার্জন করা হয়। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই
ওই উত্‍সগুলোকে এমনিতে বিশ্বাস করা যাবেনা।ওগুলোকে যুক্তি এবং প্রমান পেলেই একমাত্র বিশ্বাস করা যাবে। অর্থাত্‍ আপনি যাজ্ঞবল্ক্য,চৈতন্য, রামকৃষ্ণ,পুরান,মহাভারত,গীতা যেখানেই কোন তথ্য পাননা কেন তা অবশ্যই যুক্তিখন্ডন ও প্রমানের পর বিশ্বাসযোগ্য হবে। আর এটি যদি কোন কারনে প্রমানিত না হয় এবং অধিকতর যুক্তিযুক্ত কিছু পাওয়া যায় তবে তার দ্বারা তা প্রতিস্থাপিত হয়।

পরবর্তী পর্বে ন্যয় দর্শনে কারন ও এর শ্রেনীবিভাগ,ন্যয়দর্শন এ ঈশ্বরতত্ত্ব ও মোক্ষভাবনা,এবং বৈদিক ইতিহাসে এর অবদান আলোচনা করা হবে। ধন্যবাদ সকলকে। নমস্কার।

Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger