সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি পর্ব ০১

অউম
বানান বিশ্লেষণ : অ+উ+ম্+অ
উচ্চারণ : o.um (ও.উম্)
অ =ও। (উ ধ্বনির পূর্ববর্ণ অ, ও-তে পরিণত হয়েছে)
উম্ =ছন্। (ন রুদ্ধ ধ্বনিতে উচ্চারিত হবে)
হিন্দু মতে, অ-উ-ম এই তিনটি মূল ধ্বনির সমন্বয়ে প্রণবের উৎপত্তি। যোগীদের মতে, ধ্যানে একাগ্রতা আনার জন্য ওঁ-এর উচ্চারণের পূর্বে অ-কারের উচ্চারণ করা হয়। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহাদেব‒ এই তিন জনের গুণবাচক ধ্বনি-প্রতীক। এর প্রতীক পাশে দেখানো হলো।

কাশীতে এই নামে রক্ষিত শিবলিঙ্গ বিশেষ। শিবের (মহাদেব) প্রতীকরূপে এই শিবলিঙ্গকে পূজা করা হয়।


অওঘড়

হিন্দু ধর্মের একটি বিশেষ ভাবাদর্শে বিশ্বাসী সন্ন্যাসীদের নিয়ে গঠিত একটি সম্প্রদায়। দশনামী ব্রহ্মগিরি নামক সন্ন্যাসী গোরক্ষনাথের প্রভাবে এই শ্রেণীর সন্ন্যাসীদের উদ্ভব হয়েছিল। গুজরাট অঞ্চলে এদের গদি আছে। গদির প্রধানকে বলা হয় মোহান্ত। গদির সন্ন্যাসীদের ভিতর থেকে মোহান্ত নিয়োগ পদে আসীন হন এবং আমৃত্যু তিনি ওই পদে থাকেন। মোহান্তের মৃত্যুর পর সন্ন্যাসীদের ভিতর থেকে নতুন মোহান্ত নির্বাচিত হন।


অংশা
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মতে– কংসবধের জন্য কৃষ্ণ যখন বিষ্ণুর অবতার রূপে মর্তধামে আসেন, সে সময়ে বিষ্ণুর অনুরোধে দুর্গাও যশোদার ।

হিন্দু ধর্ম মতে- বিষ্ণুর দ্বাপর যুগ-এর একজন অবতার এবং মোট দশম অবতারের অষ্টম অবতার। বসুদেবের ঔরসে দেবকীর অষ্টম গর্ভে কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল। কংস নামক এক অত্যাচারী রাজার অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেবতারা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলে, ব্রহ্মা সকল দেবতাদের নিয়ে সমুদ্রের ধারে বসে বিষ্ণুর আরাধনা শুরু করেন। বিষ্ণু সে আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর সাদা ও কালো রঙের দুটি চুল দিয়ে বললেন যে, বসুদেবের ঔরসে দেবকীর সন্তান হিসাবে কৃষ্ণ হয়ে জন্মাবেন। কৃষ্ণের প্রতীক হলো কালো চুল। তাঁর সহযোগী হবে বলরাম, এর প্রতীক সাদা চুল। এই জন্মে তিনি কংসাসুরকে হত্যা করবেন। উল্লেখ্য বসুদেবের অপর স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে বলরাম জন্মেছিলেন।

দেবকীর পিতা দেবক ও কংসের পিতা উগ্রসেন আপন দুই ভাই ছিলেন। সেই সূত্রে কংস ছিলেন দেবকীর কাকাতো ভাই অর্থাৎ কংস ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের মামা। দেবর্ষি নারদ এসে কংসকে কৃষ্ণ-বলরাম-এর জন্মের কারণ বর্ণনা করে যান। এই সংবাদ পেয়ে কংস দেবকীর গর্ভজাত সকল সন্তানকে জন্মের পরপরই হত্যা করতে থাকলেন। কৃষ্ণ-এর জন্ম হয় দ্বাপর যুগের শেষে ভাদ্র-রোহিণী নক্ষত্রে, এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাত্রিতে। জন্মের পরপরই বসুদেব কংসের ভয়ে এই শিশুটিকে ব্রজধামে নন্দের বাড়িতে রেখে আসেন এবং তাঁর সদ্যজাতা কন্যাকে আনেন। ব্রহ্ম-বৈববর্ত পুরাণের মতে এই কন্যা ছিলেন দুর্গা। এই পুরাণে এই সদ্যজাতা কন্যাকে অংশা নামে অভিহিত করা হয়েছে। বিষ্ণুর অনুরোধে তিনি যশোদার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

[ব্রহ্ম-বৈবর্ত্ত, শ্রীকৃষ্ণ খণ্ড, সপ্তম অধ্যায়]


অংশুমান
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– ইনি ছিলেন সূর্যবংশীয় রাজা অসমঞ্জ-এর পুত্র ও সগর রাজার পৌত্র। সগর-এর অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া দেবরাজ ইন্দ্র অপহরণ করে- পাতালে ধ্যানমগ্ন কপিল মুনির আশ্রমে রেখে যান। সগরের ৬০ হাজার পুত্র ওই অপহৃত ঘোড়ার সন্ধান করতে করতে― কপিল মুনির আশ্রমে আসেন। সেখানে ওই ঘোড়াকে দেখতে পেয়ে সগরের পুত্ররা ধ্যানমগ্ন কপিল মুনিকে ঘোড়াচোর মনে করে তাঁকে নানাভাবে লাঞ্ছিত করেন। ফলে ক্ষুব্ধ কপিল মুনি যোগবলে সগর-পুত্রদের ভস্মীভূত করেন। দীর্ঘসময় অতিবাহিত হওয়ার পরও সগর-পুত্ররা ফিরে না এলে, সগর তাঁর পৌত্র অংশুমানকে অনুসন্ধানে পাঠান। অংশুমান কপিল মুনির আশ্রমে এসে, স্তব করে মুনিকে সন্তুষ্ট করেন এবং যজ্ঞের ঘোড়াকে নিয়ে আসেন। এই সময় ইনি সগর-এর ভস্মীভূত পুত্রদের উদ্ধারের উপায় মুনির কাছ থেকে জেনে নেন। উপায়টি হলো― স্বর্গের গঙ্গা নদীকে এনে তার জল ওই পুত্রদের ভস্ম স্পর্শ করালে, পুত্ররা উদ্ধার পাবে। সগর-এর মৃত্যুর পর ইনি গঙ্গাকে আনার জন্য তপস্যা করেন। কিন্তু সাফল্য লাভ করতে পারেন নি। এরপর তিনি কিছুদিন রাজত্ব করার পর, তাঁর পুত্র দিলীপের রাজ্যভার অর্পণ করে তপস্যার জন্য যান। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। উল্লেখ্য দিলীপের পুত্র ভগীরথ এই কাজ সম্পন্ন করেছিলেন।



অংহা

হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র। ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের ৬৩ সংখ্যক সূত্রের সপ্তম শ্লোকে আছে, সুদাস নামক রাজার শত্রু ছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র অংহাকে পরাজিত করে তার সকল সম্পদ ধ্বংস করেছিলেন।

অকম্পন

হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র। রাময়ণের মতে– ইনি ছিলেন রাবণের সেনাপতি ও মামা। সুমালীর ঔরসে কেতুমতীর গর্ভে ইনি জন্মগ্রহণ করেন। ইনি ছিলেন সুমালীর দ্বিতীয় পুত্র। উল্লেখ্য সুমালীর মোট ১৪টি সন্তান ছিল। দণ্ডকারণ্যে রামের হাতে খর, দূষণ ও ত্রিশিরা-সহ প্রায় ১৪ হাজার রাক্ষস সৈন্য নিহত হলে– ইনি এই সংবাদ রাবণকে দেন এবং রাবণকে জানান যে, দেবতা ও অসুরদের মধ্যে এমন কেউ নেই যিনি রামকে যুদ্ধে পরাজিত করতে পারেন। এঁরই প্ররোচনায় রাবণ সীতাকে অপহরণ করেছিলেন। লঙ্কা যুদ্ধের সময় হনুমানের নিক্ষেপ করা একটি বিশাল গাছের আঘাতে ইনি নিহত হন।


অকালবোধন

এর সরলার্থ অসময়ে আহ্বান বা অসময়ে জাগরণ। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মতে- রাবণবধের জন্য শরৎকালের আশ্বিন মাসে রামচন্দ্র, দুর্গা-দেবীকে জাগিয়েছিলেন। এই জাগরণকেই অকালবোধন বলা হয়। এই জাগরণের কারণেই বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য দুর্গা পূজার আদি সময় হিসাবে বসন্তকাল নির্ধারিত রয়েছে। এই পূজা বাসন্তী পূজা নামে খ্যাত।



অকৃতব্রণ

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে− অকৃতব্রণ ছিলেন কশ্যপ বংশীয় একজন ঋষি এবং পরশুরামের অনুচর। মহাভারতের মতে− যুধিষ্ঠির মহেন্দ্রাঞ্চলে লোমশমুনির কাছে অবস্থানকালে অকৃতব্রণ তাঁর কাছে পরশুরামের ক্ষত্রিয়বিনাশ কাহিনি বর্ণনা করেছিলেন।

অক্ষয়কুমার

ইনি রাবণের ঔরসে মন্দোদরীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। রাবণ সীতাকে অপহরণ করলে, রামের আদেশে হনুমান সীতাকে খোঁজার জন্য লঙ্কায় আসেন। হনুমান সীতার সাথে দেখা করে, তাঁর কাছ থেকে অভিজ্ঞান নিয়ে অশোক বন বিনষ্ট করেন। এই সংবাদ পেয়ে-হনুমানকে শাস্তি দেওয়ার জন্য রাবণ পাঁচজন সেনাপতির সাথে অক্ষয়কুমারকে পাঠান। এই সময় অন্যান্য সেনাপতির সাথে ইনিও হনুমানের হাতে নিহত হন।



অক্ষয় বট
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা বড় বট গাছকে অক্ষয় বট নামে অভিহিত করা হয়। সকল দেশের সনাতন ধর্মে বড় গাছের পূজা করার রীতি লক্ষ্য করা যায়। ভারতবর্ষে বটগাছ ছাড়াও তুলসি, অশ্বত্থ গাছের পূজার চল আছে।

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে, দশরথের প্রেতাত্না সীতাদেবীর হাত থেকে চালের অভাবে বালুকার পিণ্ড গ্রহণ করেছিলেন। এর সাক্ষী ছিল ফল্গুনদী, তুলসী গাছ ও অক্ষয়বট । রামচন্দ্র ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে যখন ফল্গুনদী ও তুলসী গাছকে প্রশ্ন করেন, তখন তারা মিথ্যা কথা বলে। ফলে সীতাদেবী তাদের অভিশাপ দেন। কিন্তু অক্ষয়বট সত্য কথা বলায়, সীতাদেবী তাকে আশীর্বাদ করেন ।

সনাতন হিন্দু ধর্মমতে তীর্থের বৃহৎ বটগাছে জল দিলে এবং পূজা করলে মনষ্কামনা পূর্ণ হয়। প্রাচীন কাব্যগ্রন্থে বৈতরণী নদীর তীরে অক্ষয় বটের উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সীতাকুণ্ডে একটি অক্ষয় বট আছে। সীতাকুণ্ডের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান শিবচতুদরর্শী মেলায় নানা ধরনের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সাথে অক্ষয়বটেরও পূজা করা হয়।

নিরঞ্জন নদীর পাড়ের যেখানে বুদ্ধ (গৌতম) বোধিত্ব লাভ করেছিলেন, সেখানে প্রথম বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণ করেন সম্রাট অশোক। এই মন্দিরের পাশে একটি অক্ষয়বট আছে। হিন্দু তীর্থক্ষেত্রে একটি অক্ষয়বট আছে।



অক্ষোভ্য

১. তারা দেবীর মাথায় অবস্থিত সাপ বিশেষ।
২ শিব ধ্যানমগ্ন অবস্থায় চঞ্চল হন নি বলে এই নামে খ্যাত হয়েছেন।
৩. পঞ্চতম বৌদ্ধ ধ্যানীপুরুষ। বৌদ্ধ তান্ত্রিক গ্রন্থগুলোতে এদের উল্লেখ রয়েছে। এদের বাহন হাতি এবং চিহ্ন বজ্র। এদের রঙ নীল। অক্ষোভ্যদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে দেবতার মর্যাদা দেওয়া হয়। এর ভিতরে অন্যতম দেবতা হলেন হেরুক।



অক্ষৌহিণী
প্রাচীন ভারতীয় রাজ্যসমূহে বা হিন্দু পৌরাণিক গ্রন্থে বর্ণিত সেনাশক্তি বিশেষ। যে সেনাদলে- ১,০৯,৩৫০ সংখ্যক পদাতিক সৈন্য, ৬৫,৬১০ সংখ্যক অশ্ব ও অশ্বারোহী সৈন্য, ২১,৮৭০ সংখ্যক গজ (হাতি) ও গজারোহী সৈন্য, ২১,৮৭০ রথ ও রথী থাকবে, তাকেই এক অক্ষৌহিণী বলা হবে। এক অক্ষৌহিণী সৈন্যদল গঠিত হতো বিভিন্ন একক সংখ্যক সৈন্যদল দ্বারা। নিচে এই সেনাশক্তির এককসমূহের বিবরণ তুলে ধরা হলো।

পত্তি : ১ গজ ও গজারোহী, ১ রথ ও রথী, ৩ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ৫ পদাতিক।
সেনামুখ : পত্তির তিনগুণ। অর্থাৎ ৩ গজ ও গজারোহী, ৩ রথ ও রথী, ৯ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ১৫ পদাতিক।
গুল্ম : সেনামুখের তিনগুণ। অর্থাৎ ৯ গজ ও গজারোহী, ৯ রথ ও রথী, ২৭ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ৪৫ পদাতিক।
গণ : গুল্মের তিনগুণ। অর্থাৎ ২৭ গজ ও গজারোহী, ২৭ রথ ও রথী, ৮১ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ১৩৫ পদাতিক।
বাহিনী : গণের তিনগুণ। অর্থাৎ ৮১ গজ ও গজারোহী, ৮১ রথ ও রথী, ২৪৩ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ৪০৫ পদাতিক।
পৃতনা : বাহিনীর তিনগুণ। অর্থাৎ ২৪৩ গজ ও গজারোহী, ২৪৩ রথ ও রথী, ৭২৯ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ১২১৫ পদাতিক।
চমূ : পৃতনার তিনগুণ। অর্থাৎ ৭২৯ গজ ও গজারোহী, ৭২৯ রথ ও রথী, ২১৮৭ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ৩৬৪৫ পদাতিক।
অনীকিনী : চমূর তিনগুণ। অর্থাৎ ২১৮৭ গজ ও গজারোহী, ২১৮৭ রথ ও রথী, ৬৫৬১ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ১০৯৩৫ পদাতিক।
অক্ষৌহিণী : অনীকিনীর দশগুণ। অর্থাৎ ২১৮৭০ গজ ও গজারোহী, ২১৮৭০ রথ ও রথী, ৬৫৬১০ অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং ১০৯৩৫০ পদাতিক।
[সূত্র : অক্ষৌহিণী-পরিমাণ। দ্বিতীয় অধ্যায়। আদিপর্ব। মহাভারত]



অগস্ত্য (ঋষি)

অগকে (পর্বত) স্তম্ভিত করে যে/উপপদ তৎপুরুষ সমাস।
সমার্থক শব্দাবলী : অগ্নিমারুতি, আগ্নেয়, উর্বশীয়, কলসী, কলসীসূত, কুম্ভজ, কুম্ভজন্মা, কুম্ভযোনি, কুম্ভসম্ভব, কূট, ঘটযোনি, ঘটোত্ভব, ঘটজ, বিন্ধ্যকূট, পীতাদ্ধিট, মান, মৈত্রাবরুণ, মৈত্রাবরুণি। পৌরাণিক কাহিনীতে— অগস্ত্য নামেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত।


হিন্দু পৌরাণিক ঋষি বিশেষ। বিন্ধ্যপর্বতকে স্তম্ভিত করে ইনি এই নামে অভিহিত হয়ে থাকেন। ঋকবেদের মতে— কোনো এক যজ্ঞকালে, অপ্সরী ঊর্বশী'কে দেখে যজ্ঞকুম্ভে আদিত্য ও বরুণ-এর বীর্যপাত হয়। ফলে, যজ্ঞকুম্ভ থেকে বশিষ্ঠ ও অগস্ত্য-এর জন্ম হয়। সে হিসাবে অগস্ত্যকে মিত্র (তেজময় সূর্য) ও বরুণের পুত্র বলা হয়। ভাগবতে- অগস্ত্যকে পুলস্তের পুত্র বলা হয়েছে।



লোপামুদ্রা

অগস্ত্য প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি কখনো বিবাহ করবেন না। একদিন ভ্রমণ করতে করতে তিনি একটি গুহামুখে এসে উপস্থিত হন, গুহার ভিতরে তাঁর পূর্বপুরুষদের অধোমুখে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেলেন। পূর্ব-পুরুষদের কাছে এরূপ অবস্থার কারণ জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন যে, অগস্ত্য বংশ রক্ষা করছে না বলেই, তাঁরা এই শাস্তি ভোগ করছে। এরপর অগস্ত্য তাঁর পূর্ব-পুরুষদেরকে আশ্বাস দিলেন যে, তিনি বিবাহ করে সন্তান উৎপাদন করবেন। এরপর বিবাহের উপযুক্ত কন্যা পাওয়া উদ্দেশ্যে, তিনি পৃথিবীর সকল প্রাণীর সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠ অংশ নিয়ে একটি নারী নির্মাণ করলেন। সকল প্রাণীর সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠ অংশের লোপ (অপহরণ) করে সৃষ্টি হয়েছিল বলে এই নারীর নাম রাখা হয়েছিল লোপামুদ্রা।

অগস্ত্য তাঁর সৃষ্ট লোপামুদ্রাকে প্রতিপালনের জন্য বিদর্ভরাজের উপর ভার দিলেন। এই কন্যা বিবাহযোগ্যা হলে, অগস্ত্য তাঁকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করলেন। একদিন ঋতুস্নান শেষে লোপামুদ্রা অগস্ত্যের কাছে এলে, অগস্ত্য সন্তান কামনায় তাঁকে আহ্বান করলেন। লোপামুদ্রা বললেন যে, পিতৃগৃহে (বিদর্ভরাজের গৃহে) যেরূপ তিনি যেরূপ অলঙ্কারে বিভূষিতা হয়ে শয়ন করতেন, তেমনি করে বিভূষিতা করতে হবে। নইলে তাঁকে অগস্ত্য কখনোই পাবেন না। অগস্ত্যের কাছে যথেষ্ঠ পরিমাণ সম্পদ না থাকায়, ইনি ভিক্ষায় বের হলেন। কিন্তু কোথাও যথেষ্ঠ অর্থ না পেয়ে, অনেকের পরামর্শে ইনি দানবরাজ ইল্বলের কাছে এলেন।


ইল্বল

জনৈক অসুর বিশেষ। হ্লাদের ঔরসে এবং ধমনীর গর্ভে ইনি জন্ম গ্রহণ করেন। এর অপর ভাইয়ের নাম ছিল বাতাপি। একবার এক তপস্বী ব্রাহ্মণের কাছে ইল্বল এমন একটি বর চেয়েছিলেন, যাতে তাঁর একটি ইন্দ্রের মতো পুত্র জন্মে। ব্রাহ্মণ এতে সম্মত না হলে, ইল্বল প্রথমে মায়াবলে তাঁর ভাই বাতাপি-কে মেষে রূপান্তরিত করেন। এরপর উক্ত মেষের মাংস রান্না করে ব্রাহ্মণকে খেতে দিলেন। ব্রাহ্মণের খাওয়া শেষে, ইল্বল বাতাপি'র নাম ধরে ডাকলে, বাতাপি ব্রাহ্মণের পেট ফুঁড়ে বের হয়ে আসেন। ফলে, ব্রাহ্মণের মৃত্যু হয়। এইভাবে, ইল্বল ও বাতাপি সম্মিলিতভাবে অনেক ব্রাহ্মণকে হত্যা করেছিলেন।

ইল্বল তাঁকে যথেষ্ঠ আদর আপ্যায়ন করে ভোজনের জন্য অনুরোধ করলেন। একই ভাবে ইল্বল অগস্ত্যকে হত্যা করার জন্য মেষরূপী বাতাপি'র মাংস— অগস্ত্যকে দিয়েছিলেন। অগস্ত্যের খাওয়া শেষে ইল্বল বাতাপি'কে উচ্চস্বরে ডাকতে লাগলেন। কিন্তু বাতাপি অগস্ত্যের পেট থেকে বের হলো না। তখন অগস্ত্য জানালেন যে, বাতাপি সম্পূর্ণরূপে হজম হয়ে গেছে। এতে ইল্বল ভীত হয়ে, অগস্ত্যকে তার বাঞ্ছনীয় সম্পদ দান করে বিপদমুক্ত হন। এরপর লোপামুদ্রাকে অলঙ্কারে বিভূষিতা করে তাঁর সাথে মিলিত হলেন। যথা সময়ে এঁদের একটি পুত্রের জন্ম হলো। এই পুত্রের নাম রাখলেন— দৃঢ়স্যু।

দৃঢ়স্যুর অপর নাম ছিল— ইধ্মবাহ। ইনি মহাতাপসী এবং কবি ছিলেন। এ ছাড়া ইনি বেদসহ অন্যান্য শাস্ত্রে অত্যন্ত অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। এই পুত্র তাঁর পিতৃপুরুষদের মুক্ত করেন। সন্তান জন্মাবার পর কিছুদিন তিনি আশ্রমে বাস করেছিলেন। এরপর তিনি যোগবলে দেহত্যাগ করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে, ইনি দক্ষিণাকাশে নক্ষত্ররূপে বিরাজ করছেন। ভাদ্রের ১৭ কিম্বা ১৮ তারিখে দক্ষিণাকাশে নক্ষত্ররূপে উদিত হন।


অগস্ত্যের জীবনের সাথে বহু পৌরাণিক কাহিনী জড়িত আছে। যেমন—
ক. অগস্ত্যযাত্রা : ভারতের আর্য্যাবর্ত ও দাক্ষিণাত্যের মধ্যস্থলে বিস্তৃত একটি পর্বতের নাম বিন্ধ্য। পৌরাণিক যুগে বিন্ধ্যপর্বত সমস্ত পর্বতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও মাননীয় ছিল। একদিন দেবর্ষি নারদ বিন্ধ্যের কাছে এসে বলেন যে, সুমেরু পর্বতের সমৃদ্ধি বিন্ধ্যের অপেক্ষা বেশি। সমস্ত দেবতা সুমেরুতে দিন যাপন করেন ও সূর্য সমস্ত নক্ষত্রকে নিয়ে এই পর্বত পরিভ্রমণ করেন। এ কথা শোনার পর বিন্ধ্য সূর্যকে বললেন যে, উদয়াস্তকালে সুমেরু পর্বতের মতো করে তাঁকেও প্রদক্ষিণ করতে হবে। সূর্য এতে অসম্মত হলে, বিন্ধ্য নিজ দেহকে বর্ধিত করে সূর্যের পথ রোধ করে ফেললেন। ফলে সূর্যের উত্তাপে পর্বতের একদিকে জ্বলে পুড়ে যেতে থাকলো, অন্যদিকে প্রচণ্ড শীত ও অন্ধকারে জীবন বিপন্ন হয়ে পড়লো। দেবতারা এর প্রতিকারের উপায় না দেখে অগস্ত্যের শরণাপন্ন হলেন, অগস্ত্য বিন্ধ্যপর্বতের কাছে এলেন। উল্লেখ্য অগস্ত্য ছিলেন বিন্ধ্যপর্বতের গুরু। অগস্ত্যকে দেখে বিন্ধ্য গুরুভক্তিতে তাঁর মস্তক অবনত করলে, অগস্ত্য তাঁকে বললেন যে,— যতক্ষণ তিনি প্রত্যাবর্তন না করবেন, ততক্ষণ সে (বিন্ধ্য) এরূপ অবনতমস্তকে থাকবে। বিন্ধ্যকে এই অবস্থায় রেখে অগস্ত্য ১লা ভাদ্র তারিখে দক্ষিণদিকে যাত্রা করেন এবং কখনোই আর সেখানে ফিরে আসেন নি। অগস্ত্যের এই চির-প্রস্থানের কাহিনী অনুসারে বাংলাতে অগস্ত্যযাত্রা বাগধারা প্রচলিত রয়েছে।


খ. অগস্ত্য কর্তৃক রামকে অস্ত্র দান : রাম বনবাসকালে, অগস্ত্যের আশ্রমে উপস্থিত হলে— ইনি রামকে বৈষ্ণবধনু, ব্রহ্মাস্ত্র, অক্ষয়তূণ দান করেন এবং এঁরই পরামর্শে, রাম গোদাবরী তীরে পঞ্চবটী বনে কুটির নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন।


গ. রাজা নহুষের পতন: একবার ইন্দ্র ব্রহ্মহত্যার অভিশাপে সমুদ্রের মধ্যে বসবাস করছিলেন। এই সময় রাজা নহুষকে স্বর্গের রাজা করা হয়। রাজত্ব লাভের পর, নহুষ ইন্দ্রের পত্নী শচীকে ভোগ করার জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। শচী নহুষের কামনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বৃহস্পতি-র শরণাপন্ন হন। বৃহস্পতির পরামর্শে শচী নহুষকে বলেন যে, যদি নহুষ সাতজন ঋষি দ্বারা পরিচালিত রথে আরোহণ করে তাঁর কাছে আসেন, তবেই তিনি তাঁকে (নহুষকে) গ্রহণ করবেন। নহুষ সেই ব্যবস্থামতে রথে আরোহণ করেন। ওই রথের সাতজন ঋষির মধ্যে, অগস্ত্যও ছিলেন। হঠাৎ নহুষের পা অগস্ত্যের দেহ স্পর্শ করলে, ক্রুদ্ধ অগস্ত্য রাজাকে ‘সর্প হও’ অভিশাপ দেন। অভিশাপগ্রস্থ নহুষ, অগস্ত্যের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে, অগস্ত্য বলেন,— যুধিষ্ঠির -এর স্পর্শে সে শাপ মুক্ত হবে।


ঘ. অগস্ত্যর সমুদ্র পান : ইন্দ্র কর্তৃক বৃত্রাসুর নিহত হওয়ার পর, কালকেয় এবং অন্যান্য অসুররা দেবতাদের ভয়ে সমুদ্রের মধ্যে লুকিয়ে প্রাণ রক্ষা করে। কিন্তু প্রতি রাত্রে এরা সমুদ্র থেকে উঠে এসে দেবতাদের উপর অত্যাচার চালাতো। এই অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেবতারা অগস্ত্যের শরণাপন্ন হন। দেবতাদের অনুরোধে অগস্ত্য সমুদ্রের সমস্ত পানি পান করলে, দেবতারা শুকনো সমুদ্রতলের অসুরদেরকে হত্যা করতে সমর্থ হন।





অগ্নি
হিন্দু মতে অগ্নি তিন প্রকার

ক. ভৌমাগ্নি: কাঠ বা পৃথিবীর পদার্থ থেকে উৎপন্ন আগুন।
খ. দিব্যাগ্নি: জল, বায়ু থেকে উৎপন্ন আগুন। যেমন: আকশের বিদ্যুৎ, বজ্র প্রভৃতি।
গ. জঠরাগ্নি: কোষ্ঠাগ্নি, ক্ষুধা, খাদ্যের পরিপাকের জন্য উদরের উৎপন্ন আগুন।
সমার্থক শব্দাবলি: জঠরজ্বালা, জঠরাগ্নি, জঠরানল।

এছাড়া মানব দেহ বা মনের বিভিন্ন চাহিদাকেও অগ্নিতুল্য কামনা বা অভিব্যক্তিকে রূপকার্থে 'অগ্নি' হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যেমন−

যৌবন-অগ্নি: যৌবন সম্ভোগের প্রবল ইচ্ছা, যা কামভাবকে উত্তেজিত দশায় রাখে।
প্রেমাগ্নি: ভালবাসার প্রবল ইচ্ছা, গভীর বিরহ, না পাওয়া প্রেমের জন্য প্রবল উত্তাপ ইত্যাদি।
ক্রোধাগ্নি: অগ্নিতুল্য ক্রোধ

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে – অগ্নি নামক শক্তির দেবতা। ঋগ্বেদের সূচনা হয়েছে অগ্নিকে দিয়ে। প্রথম মণ্ডলের প্রথম সূক্তের প্রথম শ্লোকে বলা হয়েছে– 'হে অগ্নি যজ্ঞের পুরোহিত এবং দীপ্তিমান; অগ্নি দেবগণের আহ্বানকারী ঋত্বিক এবং প্রভূতরত্নধারী; আমি অগ্নির স্তুতি করি। এই দেবতার উদ্দেশ্যে ঋগ্বেদে দুইশত সূক্ত পাওয়া যায়। অগ্নি ছাড়া যজ্ঞ হয় না, তাই অগ্নিকে বেদে 'পুরোহিত' বলা হয়েছে। ঋগ্বেদের ১।৩১।১ অংশে– অঙ্গিরা ঋষিদের আদি ঋষি হিসাবে অগ্নিকে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঋগ্বেদে অগ্নির উৎপত্তির ঊৎস হিসাবে বলা হয়েছে- অরণিদ্বয় থেকে জন্ম [১।৭।৪]। এই কারণে ঋগ্বেদে অগ্নিকে বলা হয়েছে–দ্বিমাতৃ [১।৩১।২]।

মহাভারতের মতে– ধর্মের ঔরসে বসুভার্যার গর্ভে অগ্নির জন্ম। ঋক্‌বেদের মতে– পরমপুরুষের মুখ থেকে অগ্নির উৎপন্ন হয়েছিল। অগ্নিকে পৃথিবীর পুত্রও বলা হয়। দুটি শুকনো কাঠের ঘর্ষণে অগ্নির উৎপন্ন হয়। এই কাঠ দুটিকে অরণি বলা হয়। সুতরাং অরণিদ্বয় অগ্নির পিতা-মাতা। জন্ম মাত্রই অগ্নি তাঁর পিতা-মাতাকে ভক্ষণ করেন। অগ্নিকে জলের গর্ভ বা ভ্রূণও বলা হয়ে থাকে। এঁর জন্মস্থান আকাশ অথবা পৃথিবী।

হরিবংশে আছে– অগ্নির অঙ্গ কালো বস্ত্রে আবৃত, সঙ্গে থাকে ধূম্রপতাকা ও জ্বলন্ত বর্শা। এঁর বাহন ছাগ। এঁর চারটি হাত। দুই বা ততোধিক অরুণ বা পিঙ্গল বর্ণের অশ্বচালিত উজ্জ্বল রথে ইনি ভ্রমণ করেন। সপ্তবসু এঁর রথের চক্র। অগ্নি পূর্ব-দক্ষিণ কোণের অধিপতি, এই কারণে, এই কোণকে অগ্নিকোণ বলা হয়। ইনি পিতৃলোকের অধিপতি, দেবতাদের জন্য যজ্ঞভাগ বহনকারী এবং দূত ও যজ্ঞের সারথী। অগ্নির সাতটি শিখা আছে। এই শিখাগুলির নাম হলো― করালী, ধামিনী, নীললোহিতা, পদ্মরাগা, লোহিতা, শ্বেতা, সুবর্ণা।

অগ্নি রাজা নহুষের মনুষ্যরূপ সেনাপতি ছিলেন। [ঋগ্বেদ ১।৩১। ১০]

অগ্নিকে নিয়ে বেশ কিছু কাহিনী প্রচলিত আছে। যেমন–
দেবতারা ব্রহ্মার কাছে খাদ্য প্রার্থনা করলে, ব্রহ্মা বিষ্ণুর কাছে পরামর্শের জন্য যান। বিষ্ণু অগ্নিকে বলেন যে, যজ্ঞ উপলক্ষে প্রদত্ত হবি দেবতাদের আহার হবে। এরপর ব্রাহ্মণেরা হবি প্রদান শুরু করেন। কিন্তু সেই হবি দেবতাদের কাছে পৌঁছুতো না। তাই দেবতারা আবার ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। ব্রহ্মা তখন দেবতাদেরকে প্রকৃতি দেবীর পূজা করতে বলেন। পরে সমবেত পূজায় প্রকৃতি দেবী সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মাকে বর প্রার্থনা করতে বলেন। ব্রহ্মা প্রার্থনা করেন, যেন প্রকৃতি দেবী অগ্নির দাহিকা শক্তি ও অগ্নির স্ত্রী হয় এবং অগ্নি তাঁর (প্রকৃতি দেবী) সাহায্য ছাড়া হোমীয় দ্রব্য ভস্ম করতে না পারে। কিন্তু প্রকৃতি দেবী (স্বাহা) তাতে রাজী না হয়ে বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণু স্বাহাকে বলেন যে, দ্বাপরে আমি যখন পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করবো তখন, তুমি নগ্নজিৎ রাজার কন্যারূপে (নাগ্নজিতী) জন্মগ্রহণ করে আমাকে স্বামী হিসাবে লাভ করবে। দ্বাপর যুগের উক্ত ঘটনার পূর্ব পর্যন্ত তুমি অগ্নির দাহিকা শক্তি রূপে কাজ করবে। উল্লেখ্য স্বাহা নগ্নজীতের কন্যা হিসাবে দ্বাপরে জন্মগ্রহণ করেন এবং পিতার নামানুসারে তাঁর নাম হয় নাগ্নজিতী। বিষ্ণু অবতার হিসাবে কৃষ্ণরূপে জন্মগ্রহণ করলে― কৃষ্ণের সাথে তাঁর বিবাহ হয়।
দক্ষের কন্যা স্বাহা অগ্নিকে কামনা করে ব্যর্থ হন। অগ্নি এই সময় সপ্তর্ষিদের স্ত্রীদের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কামার্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু এই নারীদের পাবেন না বলে তিনি দুঃখে বনে যান। স্বাহা এই সংবাদ জেনে একে একে ছয়জন ঋষির স্ত্রীর রূপ ধারণ করে অগ্নির কাছে যান। সপ্তর্ষিদের স্ত্রীদের মধ্যে বশিষ্ঠ মুনির স্ত্রী অরুন্ধতী ছিলেন তীব্র তাপসিনী। এই কারণে স্বাহা অরুন্ধতী’র রূপ ধরতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। অগ্নির সাথে স্বাহা ছদ্মবেশে মিলিত হন। প্রতিবারের মিলনের পর অগ্নির স্খলিত বীর্য স্বাহা একটি কুণ্ডে নিক্ষেপ করেন। পরে এই কুণ্ড থেকে স্কন্দ (কার্তিকেয়)-এর জন্ম হয়। এই ঘটনার পর ঋষিরা তাঁদের স্ত্রীদের দুশ্চরিত্রা জ্ঞানে ত্যাগ করেন। স্বাহা পরে সব স্বীকার করে নিলে এবং স্কন্দের অনুরোধে ঋষিরা তাঁদের স্ত্রীদের গ্রহণ করেন। স্বাহা অগ্নির সাথে বাস করার জন্য স্কন্দের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে, স্কন্দ বলেন যে, হোমাগ্নিতে আহুতি প্রদানকালে স্বাহা অগ্নির সাথে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করলেই তাঁর অগ্নির সাথে থাকা সম্ভব হবে।
মহাভারতের মতে― এক রাক্ষস, পুলোমা নামক এক নারীকে বিবাহ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলে, পুলোমার পিতা তাতে সম্মত না হয়ে, মহর্ষি ভৃগুর হাতে কন্যাকে সম্প্রদান করেন। রাক্ষস এই কথা জানতে পেরে, পুলোমার সন্ধানে ভৃগুর কুটিরে আসেন। ভৃগু তখন সেখানে না থাকায়, অগ্নির কাছ থেকে পুলোমার পরিচয় জেনে নিয়ে রাক্ষস তাকে অপহরণ করেন। এই সময় চ্যাবন ঋষি পুলোমার গর্ভে ছিলেন। ইনি গর্ভ্যচ্যুত হয়ে রাক্ষসকে দগ্ধ করেন। ভৃগু গৃহে প্রত্যাবর্তনের পর অগ্নিকে 'সর্বভুক্ হও' অভিশাপ দেন। এরপর অগ্নি নিজেকে অগ্নিহোত্র যজ্ঞ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেন। ফলে দেবতারা হব্য থেকে বঞ্চিত হতে থাকলে- ব্রহ্মা অগ্নিকে বলেন যে, কেবলমাত্র গুহ্যদেশের শিখা ও ক্রব্যাদ (মাংসভক্ষক) শরীর সর্বভুক হবে এবং মুখে যে আহুতি দেওয়া হবে, তাই দেবগণের ভাগরূপে গৃহীত হবে। [৫-৭ অধ্যায়। আদিপর্ব। মহাভারত]
অগ্নি শ্বেতকী রাজার যজ্ঞে অতিরিক্ত হবি ভক্ষণ করে কঠিন উদরাময় রোগে আক্রান্ত হন। নিরুপায় হয়ে অগ্নি, ব্রহ্মার কাছে গেলে— ব্রহ্মা তাঁকে খাণ্ডববনের সমস্ত জীবজন্তু, দৈত্যদানব, সর্প ইত্যাদি ভক্ষণ করার উপদেশ দেন। কিন্তু খাণ্ডববন দেব-রক্ষিত বলে ইন্দ্র তাতে বাধা দেন। তখন অগ্নি কৃষ্ণ ও অর্জুনের সাহায্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু তাঁরা দেবতাদের সাথে যুদ্ধ করবার উপযুক্ত অস্ত্রের অভাব জানালে― অগ্নি বরুণ দেবতার কাছ থেকে অর্জুনের জন্য কপিধ্বজ রথ, গাণ্ডীব-ধনু ও অক্ষয় তূণী এবং কৃষ্ণের জন্য সুদর্শনচক্র ও কৌমদকী গদা এনে দেন। এর পর এঁরা দুজন খাণ্ডববন দগ্ধ করতে সমর্থ হন। উক্ত বনের সমস্ত জীবজন্তু, দৈত্যদানব, সর্প ইত্যাদি ভক্ষণ করে অগ্নি রোগমুক্ত হন। [২২৩-২৪ অধ্যায়। আদিপর্ব। মহাভারত]

অগ্নির স্ত্রীগণ মহিষ্মতীর রাজা নীলের একটি সর্বাঙ্গসুন্দরী কন্যা ছিল। এই রাজকুমারী প্রতিদিন নিষ্ঠার সাথে অগ্নির পূজা করতেন। এই কন্যার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অগ্নি ব্রাহ্মণবেশে এই কন্যার সাথে বিহার করতেন এবং সকলের ঘরেই যেতেন। রাজা নীল এদের শাসন করলে- অগ্নি ক্রোধে প্রজ্জলিত হয়ে উঠলেন। এতে রাজা অত্যন্ত ভীত হয়ে- রাজকন্যার সাথে অগ্নির বিবাহ দেন। এই নগরীকে অগ্নি সব সময় রক্ষা করে চলতেন। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়যজ্ঞের সময় সহদেব মাহিষ্মতী নগরী আক্রমণের সময় অগ্নিকে স্তব দ্বারা তুষ্ট করে, রাজা নীলকে অধিকার করেছিলেন। [৩০ অধ্যায়। সভাপর্ব। মহাভারত]
অগ্নিদেবতা দক্ষের কন্যা স্বাহাকে বিবাহ করেছিলেন। স্বাহার গর্ভে তাঁর তিনটি পুত্র জন্মে। এরা ছিলেন- পাবক, পবমান ও শুচী। এ ছাড়া অগ্নিবেশ্য নামে আরও একটি পুত্রের কথা জানা যায়।


অগ্নির তিনটি রূপ। রূপ তিনটি হলো –
১. আকাশে সূর্য,
২. বায়ুময় অন্তরীক্ষে বিদ্যুৎ
৩. পৃথিবীতে আগুন।

কিন্তু বিভিন্ন অর্থে অগ্নির আরও সমার্থ রয়েছে। এই নামগুলো হলো–

ঋক্‌বেদে অগ্নিকে বিভিন্ন নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নামগুলো হলো– অর্চিষ্মান, ঘৃতপৃষ্ঠ, জ্বালাকেশ, জ্বালাময়, নীলপৃষ্ঠ, তীক্ষ্ণ দংষ্ট্রা, পিঙ্গলাশ্মশ্রু, বৈশ্বানর, মধুজিহ্বা, সপ্তজিহ্বা, হিরণাদন্ত, হিরণ্যকেশ।

অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনিতে অগ্নির অন্যান্য যে নাম পাওয়া যায়, সেগুলো– অ, অব্জহস্তু, অনল, ছাগরথ, তোমারধর, ধূমকেতু, পাবক, বহ্নি, বৈশ্বানর, ভরণা, রোহিতাশ্ব, হুতভুজ, হুতাশ, হুতাশন।

জুহু : জুহু' নামে হাতায় করে যজ্ঞে ঘৃতাহুতি দেওয়া হতো বলে এর নাম জুহু।
পুরোহিত: অগ্নি ছাড়া যজ্ঞ হয় না বলে একে পুরোহিত বলা হয়।
প্রমন্থ : দুটি কাঠের ঘর্ষণে অগ্নির উৎপত্তি বলে এর নাম প্রমন্থ।
বহুজন্মা : গৃহে গৃহে অগ্নি অধিষ্ঠিত বলে এর নাম- বহুজন্মা।
হব্যবাহক : দেবতাদের হব্য পৌঁছে দেয় বলে, এর নাম হব্যবাহক।

অগ্নিবেশ

হিন্দু পৌরাণিক কাব্য মহাভারতের মতে– তিনি ছিলেন ভরদ্বাজের শিষ্য। একে বলা হয়েছে অগ্নসম্ভূত। তিনি ভরদ্বাজের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র শিক্ষা করেন। এই অস্ত্রটি তিনি ভরদ্বাজের পুত্র দ্রোণকে দান করেন।
[মহাভারত। আদিপর্ব। ১৩০ অধ্যায়]


অঙ্গারপর্ণ

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে, অঙ্গারপর্ণ ছিলেন কুবেরের বন্ধু এবং দেবরাজ ইন্দ্রের রথের সারথী। এর উদ্যানের নামও ছিল অঙ্গারপর্ণ। এঁর একটি চিত্রময় রথ ছিল, এই কারণে এর অপর নাম ছিল চিত্ররথ।

পঞ্চপাণ্ডব একচক্রা থেকে পাঞ্চালের পথে যাওয়ার সময়, অঙ্গারপর্ণ সোমাশ্রয়ণ তীর্থে সখীদের সাথে নিয়ে জল-বিহার করছিলেন। এমন সময় পাণ্ডবরা, সেখানে উপস্থিত হলে, জল-বিহারে বিঘ্ন ঘটে। এ কারণে অঙ্গারপর্ণ রেগে যান এবং অর্জুনের সাথে তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পরেন। শেষ পর্যন্ত এই তর্ক-বিতর্ক যুদ্ধ পরিণত হয়। যুদ্ধে অর্জুন অঙ্গারপর্ণকে পরাজিত কর বন্দী করেন এবং তাঁর রথ পুড়িয়ে দেন। এর থেকে অঙ্গারপর্ণের নাম হয়- দগ্ধরথ। এরপর অঙ্গারপর্ণের স্ত্রী কুম্ভীনসী যুধিষ্ঠিরের কাছে স্বামীর মুক্তির আবেদন করেন। যুধিষ্ঠিরের আদেশে অর্জুন তাঁকে ছেড়ে দেন।

পরে অর্জুনের সাথে তাঁর সখ্য স্থাপিত হয়। তিনি পঞ্চপাণ্ডবের প্রত্যেককে গন্ধর্বদেশীয় ঘোড়া উপহার দেন এবং অর্জুনকে চাক্ষুষ বিদ্যা শিক্ষা দান করেন। এই বিদ্যার পরিবর্তে অর্জুন তাঁকে কিছু আগ্নেয়াস্ত্র দান করেন। এঁরই পরামর্শে পাণ্ডবেরা ধৌম্যকে পৌরহিত্যে বরণ করেন।

অঙ্গিরা 
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে— ব্রহ্মার মুখনিঃসৃত মানসপুত্রের একজন এবং সপ্তর্ষিদের মধ্যেও একজন। তাঁকে দশজন প্রজাপতির মধ্যে— একজন ধরা হয়। ইনি ঋগ্বেদ-এর বহু শ্লোকের রচয়িতা। ইনি কর্দম ঋষির কন্যা শ্রদ্ধাকে বিবাহ করেছিলেন। কোনো কোনো মতে ইনি দক্ষ-এর কন্যা স্মৃতিকে বিবাহ করেছিলেন। এঁর দুই পুত্রের নাম উতথ্য এবং বৃহস্পতি।
অঙ্গিরা কঠোর তপস্যা দ্বারা অগ্নির চয়েও অধিকতর তেজস্বী হয়ে ওঠলে, অগ্নিহীন অবস্থায় জলে প্রবেশ করেন এবং অগ্নির কাছে গিয়ে জগতের কল্যাণে তাঁকে প্রকাশিত হওয়ার অনুরোধ করেন। অগ্নি এর পরিবর্তে অঙ্গিরাকে অগ্নিত্ব দান করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু অঙ্গিরা তাতে সম্মত না হয়ে, অগ্নির কাছে একটি সন্তান প্রার্থনা করেন। অগ্নি তখন তাতে সম্মত হয়ে সন্তান প্রদান করেন। এই সন্তানই বৃহস্পতি নামে খ্যাতি লাভ করেন।
এই ঋষির নামানুসারে সপ্তর্ষি নক্ষত্রমণ্ডলের একটি নক্ষত্রের নামকরণ করা হয়েছে অঙ্গিরা (নক্ষত্র)।


অজিত
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– পুলহ ঋষির পুত্র।

অজিতগণ
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– প্রজাপতি ব্রহ্মা সৃষ্টির পূর্বে জয় নামক বারো জন দেবতার সৃষ্টি করেন। এঁরা সৃষ্টিতে ব্রহ্মাকে সাহায্য না করে- ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়েন। প্রজাবৃদ্ধি না হওয়াতে ব্রহ্মার অভিশাপে সপ্তমন্বন্তরে এঁরা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এ সময় এঁদের নাম ছিল- অজিতগণ, তুষিতগণ, সত্যগণ, হরিগণ, বৈকুণ্ঠগণ, সাধ্যগণ ও আদিত্যগণ।





Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger