সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

ফিরিঙ্গি কালী

আজ থেকে পাঁচশো বছরেরও বেশি আগের কথা| বাংলার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বয়স তখন বারো| সেই আমলে গঙ্গা তখন বয়ে চলেছে আজকের বউবাজার অঞ্চলের ওপর দিয়ে| গঙ্গার পাশেই গা ছমছম করা গভীর জঙ্গল| জঙ্গলের মধ্যে শ্মশানে একটি ছোট্ট একচালা কুঁড়েঘর| সেখানে থাকতেন শ্রীমন্ত পণ্ডিত নামে এক তন্ত্রসাধক| দেবী শক্তির আরাধনা করতেন| জোব চার্নক কলকাতায় আসার পর থেকে কলকাতায় ফিরিঙ্গিদের বসবাস বাড়তে লাগল| শোনা যায় শ্রীমন্ত পণ্ডিত বসন্ত রোগের খুব ভালো চিকিৎসা করতেন| তাঁর কাছে হিন্দু-মুসলমান, খ্রিশ্চান, পর্তুগীজ, ফিরিঙ্গি সকলেই আসত| চিকিৎসার জন্য এসে তারা দেবী কালিকার পুজো-ও দিত| এই অঞ্চলে ফিরিঙ্গিরাই সবচেয়ে বেশি আনাগোনা করত| ধীরে ধীরে লোকমুখে এই কালীর নাম হয়ে গেল ফিরিঙ্গি কালী|
তবে প্রচলিত কাহিনিতে ফিরিঙ্গি কালীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কিংবদন্তী খ্রিশ্চান কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির নামই জড়িয়ে রয়েছে| পর্তুগীজ ব্যবসায়ী হেনসম্যান অ্যান্টনি এসেছিলেন চন্দননগরে| জন্মসূত্রে খ্রিশ্চান হলেও হিন্দুধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি বাংলা শিখেছিলেন, নানা হিন্দু ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেছিলেন| নিজের ধর্ম ত্যাগ না করেও তিনি সনাতন হিন্দু ধর্মের দেবদেবীর ভক্ত হয়ে পড়েন| সেই সময় বাংলা সংস্কৃতি ও বিনোদনের প্রধান উপকরণ ছিল কবির লড়াই| কবিগানের প্রতি অসীম ভালোবাসায় অ্যান্টনি গড়ে তুলেছিলেন একটি শখের কবিদল| ভোলা ময়রা, ঠাকুর সিংহ, হরু ঠাকুর প্রমুখ বিখ্যাত কবিয়ালের উপস্থিতি সত্ত্বেও দেবী সিদ্ধেশ্বরীর কৃপাবিষ্ট হয়ে অ্যান্টনি হয়ে উঠেছিলেন অত্যধিক জনপ্রিয় | এই স্ময় সৌদামিনী নামে একজন হিন্দু বিধবার প্রেমে পড়েন অ্যান্টলি কবিয়াল এবং তাঁকে স্ত্রীর মর্যাদা দেন| ধর্মভীরু এই বাঙালি বিধবা ফিরিঙ্গির ঘরণী হয়েও নিজের ধর্মকে আঁকড়ে ছিলেন ও তাঁর ইষ্টদেবতার আরাধনা করতেন| সৌদামিনীর অনুপ্রেরণায় অ্যান্টনি কবিয়াল এই কালীর প্রতিষ্ঠা করেন| অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি প্রতিষ্ঠিত সেই কালী মূর্তিই ফিরিঙ্গি কালী নামে পরিচিত| ফিরিঙ্গি কালী শুধু হিন্দু নয়, অন্যান্য ধর্মের মানুষের কাছেও জাগ্রত বলে গণ্য হন| ইংরেজ আমলে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহেবরাও এসে এখানে পুজো দিতেন|
মন্দিরের মূল বিগ্রহ ত্রিনয়নী মৃন্ময়ী সিদ্ধেশ্বরী কালী| এছাড়াও আছে শিব, দুর্গা, শীতলা, মনসা, গনেশ, রাধাকৃষ্ণ প্রভৃতি মূর্তি| এখানে অমাবস্যায় মহানিশি পুজো হয়| তখনই হয় অন্নকূট ভোগ| এখানে বলির প্রথা নেই| শোনা যায় মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির সঙ্গে ভোলা ময়রার বাকযুদ্ধ হয়| সেসব চরিত্ররা আজ অতীত| কিন্তু আজও লোকমুখে প্রচলিত তাঁদের এই তর্জা|
অ্যান্টনি : ভজন সাধন জানিনে মা জেতেতে ফিরিঙ্গি, অপাঙ্গে করুণা কর ওগো মাতঃ মাতঙ্গি| |
ভোলা : তুই জাত ফিরিঙ্গি জবরজঙ্গি, আমি পারব নাকো ত্বরাতে তোকে পারব নাকো ত্বরাতে| |
ভোলা : শোন রে ভ্রষ্ট, বলি স্পষ্ট, তুই রে নষ্ট, মহা দুষ্ট তোর কি ইষ্ট কালী-কেষ্ট, ভজগে যা তুই যিশু খ্রিষ্ট, উরের গীর্জেতে | |
অ্যান্টনি : সত্য বটে আমি জাতেতে ফিরিঙ্গি, ঐহিকে লোক ভিন্ন ভিন্ন অন্তিমে সব একাঙ্গি | |
 লেখকঃ প্রীথিশ ঘোষ
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger