২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৬

রামায়ন কথা - আদিকাণ্ড- ৫

ইক্ষাকু ক্ষত্রিয় কূলে ভগবান শ্রীরাম আবির্ভূত হয়েছিলেন । ইক্ষাকু কূলের মহান দাতা রাজা হরিশ্চন্দ্রের উপাখ্যান রামায়নে আছে । ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্র মুনির ফুলে ফলে শোভিত বাগানে প্রত্যহ স্বর্গ থেকে দেবকন্যারা এসে ফুল, ফল নিয়ে যেতো। বিশ্বামিত্র মুনি, তাঁর শিষ্যদের চৌকিদারীতে রেখেও সুফল পেলেন না, দেবতাদের মায়ায় শিষ্যরা নিদ্রামগ্ন হতেই দেবকন্যারা ফুল, ফল নিয়ে গেলো। একদিন মুনি বিশ্বামিত্র তপঃ তেজে নিজে এক মায়া রচলেন। যেই মায়াতে দেবকন্যারা ফুল নিতে আসলে লতাপাতার বেস্টনীতে জড়িয়ে চিৎকার করতে লাগলো। রাজা হরিশ্চন্দ্র সেখান দিয়ে যাবার সময়, সেই দেবকন্যাদের মুক্ত করলেন। বিশ্বামিত্র মুনি যোগবলে সব জেনে ক্ষিপ্ত হয়ে রাজা হরিশ্চন্দ্রকে বললেন- “হে সম্রাট। তুমি কেন সেই দেবকন্যাদের মুক্তি করেছো?” রাজা বললেন- “হে মহর্ষি সেই দেবকন্যারা আমার নিকট মুক্তি ভিক্ষা চেয়েছিলো। আমি দাতাকে তাঁর ইস্পিত সম্পদ দান করি। ইহা আমার জীবনের প্রতিজ্ঞা।” বিশ্বামিত্র শুনে বললেন- “তাই যদি হয়, তবে তুমি তোমার রাজ্য সম্পদ এখুনি আমাকে দান করে এক বস্ত্রে বিদায় হও। আমি তোমার কাছে তোমার রাজ্য দান চাইছি। ” রাজা হরিশ্চন্দ্র তাই দান করে এক বস্ত্রে বেরিয়ে গেলেন। সাথে থাকলো মহারানী শৈব্যা, পুত্র রোহিতাশ্ব ।
রাজা সসাগড়া রাজ্য মুনিকে দান করেছেন, তাই পৃথিবীতে আর কোথাও যাওয়া যাবে না। কিন্তু কাশীধাম কোনো রাজার রাজত্বে নয়। কাশীধাম ভগবান শিবের ত্রিশূলে অবস্থিত। এই স্থানের রাজা ভগবান শিব । রাজা হরিশ্চন্দ্র স্ত্রী, পুত্র নিয়ে কাশীধামে আসতেই বিশ্বামিত্র পুনঃ এসে বলল- “রাজা দান তো দিলে, কিন্তু দক্ষিণা কই ?” রাজা হরিশ্চন্দ্র তখন নিজ স্ত্রী শৈব্যা আর পুত্র রোহিতাশ্ব কে কাজের ঝি হিসাবে বিক্রি করে দিলেন। নিজেও চণ্ডালের কাছে বিক্রিত হয়ে মহর্ষি বিশ্বামিত্র কে দান দিলেন। তবুও মুখের প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গলেন না । মহারানী শৈব্যা আর রাজপুত্র রোহিতাশ্ব ঝিগিরি করে বহু কষ্টে দিন যাপন করতে লাগলো । অপরদিকে হরিশ্চন্দ্র কাশীর শ্মশানে ডোম হয়ে জীবন কাটাতে লাগলেন । একদিনের কথা, রোহিতাশ্বকে সর্পে দংশন করলো। ছটফট করতে করতে মায়ের কোলেই মারা গেলো। রানী শৈব্যা কাশীর শ্মশানে পুত্রকে দাহ করতে গেলেন । অন্ধকার রাত্রিতে সেখানে ডোম রূপে হরিশ্চন্দ্রের দেখা পেলেও একে অপরকে চিনলো না। শৈব্যা তখন ডোম হরিশ্চন্দ্রকে দাহ করতে বললে, হরিশ্চন্দ্র বলল- “মূল্য ছাড়া দাহ হবে না। এ আমাদের সর্দারের আদেশ। যাও মূল্য নিয়ে এসো। ” শৈব্যা কাঁদতে কাঁদতে জানালো- মূল্য নেই। সে নিজেই পড়ের বাড়ীর ঝি। অবশেষে শৈব্যা নিজের মলিন ছিন্ন বস্ত্র থেকে সামান্য বস্ত্র ছিড়ে হরিশ্চন্দ্র কে দিয়ে বলল- “এই নিন। আমার কাছে আর কিছুই নেই।”
রাজা হরিশ্চন্দ্র চিতা সাজিয়ে মৃত রোহিতাশ্বকে রেখে মশাল আনতে গেলো। মশাল নিয়ে এসে চিতায় শায়িত নিজ পুত্রকে দেখে ক্রন্দন করতে লাগলেন। শৈব্যা আর হরিশ্চন্দ্রের মিলন হোলো। মৃত পুত্রকে জড়িয়ে হরিশ্চন্দ্র আর শৈব্যা খুব কাঁদলেন । তারপর হরিশ্চন্দ্র তিনটে চিতা সাজালেন, ঠিক করলেন পুত্রের চিতায় আগুন দিয়ে তারাও চিতেতে উঠে অগ্নিতে নিজেদের ভস্ম করবেন । ঠিক এই সময় শ্মশান আলো করে কাশীর রাজা ভগবান শিব ও কাশীর রাণী মাতা গৌরী আবির্ভূত হলেন। ভগবান শিব মহারাজ হরিশ্চন্দ্র আর রানী শৈব্যার প্রশংসা করে রোহিতাশ্বকে প্রাণদান করলেন । রোহিতাশ্ব তার পিতামাতাকে ফিরে পেলো। অপরদিকে মহর্ষি বিশ্বামিত্র মুনি সেখানে উপস্থিত হলেন। বললেন- “হে রাজন। আমি তোমার পরীক্ষা নিচ্ছিলাম। তুমি সত্যি মহান দাতা। সত্যবাদীর সাক্ষাৎ রূপ। যাও তোমাকে তোমার রাজ্য ফিরিয়ে দিলাম। আজ থেকে তুমি সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র রূপে খ্যাত হবে।” রাজা হরিশ্চন্দ্র তখন রানী শৈব্যা ও রোহিতাশ্বকে নিয়ে অযোধ্যায় ফিরলেন। রাজা আবার রাজাসনে বসলেন। মহারানী শৈব্যা পুত্র রোহিতাশ্বকে ক্রোড়ে নিয়ে রাজার বামে বসলেন। ত্রিলোকে রাজার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো ।
রামায়ন কথা অপূর্ব সঙ্গীত ।
পাঁচালী প্রবন্ধে কহে কৃত্তিবাস পণ্ডিত ।।
মহারাজ হরিশ্চন্দ্রের অপূর্ব আখ্যান ।
ত্রিলোকে গাহে রাজার কীর্তি ব্যাখান ।।
( ক্রমশঃ )
Share:

Total Pageviews

বিভাগ সমুহ

অন্যান্য (91) অবতারবাদ (7) অর্জুন (4) আদ্যশক্তি (68) আর্য (1) ইতিহাস (30) উপনিষদ (5) ঋগ্বেদ সংহিতা (10) একাদশী (10) একেশ্বরবাদ (1) কল্কি অবতার (3) কৃষ্ণভক্তগণ (11) ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু (21) ক্ষুদিরাম (1) গায়ত্রী মন্ত্র (2) গীতার বানী (14) গুরু তত্ত্ব (6) গোমাতা (1) গোহত্যা (1) চাণক্য নীতি (3) জগন্নাথ (23) জয় শ্রী রাম (7) জানা-অজানা (7) জীবন দর্শন (68) জীবনাচরন (56) জ্ঞ (1) জ্যোতিষ শ্রাস্ত্র (4) তন্ত্রসাধনা (2) তীর্থস্থান (18) দেব দেবী (60) নারী (8) নিজেকে জানার জন্য সনাতন ধর্ম চর্চাক্ষেত্র (9) নীতিশিক্ষা (14) পরমেশ্বর ভগবান (25) পূজা পার্বন (43) পৌরানিক কাহিনী (8) প্রশ্নোত্তর (39) প্রাচীন শহর (19) বর্ন ভেদ (14) বাবা লোকনাথ (1) বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্ম (39) বিভিন্ন দেশে সনাতন ধর্ম (11) বেদ (35) বেদের বানী (14) বৈদিক দর্শন (3) ভক্ত (4) ভক্তিবাদ (43) ভাগবত (14) ভোলানাথ (6) মনুসংহিতা (1) মন্দির (38) মহাদেব (7) মহাভারত (39) মূর্তি পুজা (5) যোগসাধনা (3) যোগাসন (3) যৌক্তিক ব্যাখ্যা (26) রহস্য ও সনাতন (1) রাধা রানি (8) রামকৃষ্ণ দেবের বানী (7) রামায়ন (14) রামায়ন কথা (211) লাভ জিহাদ (2) শঙ্করাচার্য (3) শিব (36) শিব লিঙ্গ (15) শ্রীকৃষ্ণ (67) শ্রীকৃষ্ণ চরিত (42) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (9) শ্রীমদ্ভগবদগীতা (40) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (4) শ্রীমদ্ভাগব‌ত (1) সংস্কৃত ভাষা (4) সনাতন ধর্ম (13) সনাতন ধর্মের হাজারো প্রশ্নের উত্তর (3) সফটওয়্যার (1) সাধু - মনীষীবৃন্দ (2) সামবেদ সংহিতা (9) সাম্প্রতিক খবর (21) সৃষ্টি তত্ত্ব (15) স্বামী বিবেকানন্দ (37) স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (14) স্মরনীয় যারা (67) হরিরাম কীর্ত্তন (6) হিন্দু নির্যাতনের চিত্র (23) হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অন্যান্য অর্থের পরিচিতি (8) হিন্দুত্ববাদ. (83) shiv (4) shiv lingo (4)

আর্টিকেল সমুহ

অনুসরণকারী

" সনাতন সন্দেশ " ফেসবুক পেজ সম্পর্কে কিছু কথা

  • “সনাতন সন্দেশ-sanatan swandesh" এমন একটি পেজ যা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা ও সনাতন সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য নিজের ধর্মকে সঠিক ভাবে জানা, পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য সনাতন ধর্মের বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সনাতনের চেতনা ও নেতৃত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কুসংষ্কারমুক্ত একটি বৈদিক সনাতন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ পথচলায় আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সনাতন ধর্মের যে কেউ লাইক দিয়ে এর সদস্য হতে পারে।