সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ন কথা ( আদিপর্ব- পর্ব ১৮ )

রাক্ষসদের এমন অত্যাচারে গোটা ভারতই আক্রান্ত হচ্ছিল্ল। রাক্ষসদের হাতে নিপীড়িত হতে হতে মুনি, ঋষি আদি মানব সকল ভগবান বিষ্ণুকে ডাকতে লাগলেন । এমনকি দেবতারা মিলে বৈকুণ্ঠে গমন করে ভগবান শ্রী বিষ্ণুকে সকল বৃন্তান্ত জানালেন । তারা বললেন- “রাক্ষস বাহিনীর মাত্রাছাড়া তাণ্ডবে ধর্ম কর্ম বিনষ্ট হতে বসেছে। অনার্য রাক্ষস সংস্কৃতিতে লুপ্ত হতে বসেছে বৈদিক শাস্ত্র জ্ঞান। মুনি ঋষিরা যজ্ঞাদি করে দেবতাদের হব্য প্রদান করতে অসমর্থ হচ্ছেন । ধর্ম নষ্ট হয়ে অধর্মের প্রভাব সর্বত্র দেখা দিচ্ছে । যে জগদীশ আপনি কৃপা বশত পুনঃ আবির্ভূত হন । পূর্বে আপনি মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম অবতার গ্রহণ করে আসুরিক শক্তির নাশ করেছেন, পুনঃ আপনি দানবিক শক্তির সংহার করুন । ” এইভাবে দেবতারা সকলে কাকুতি মিনতি জানালেন। ভগবান মহেশ্বর বললেন- “হে নারায়ণ। আমার অবতার হনুমান মর্তে আবির্ভূত হয়েছে। এবার আপনি মর্তে অবতার গ্রহণ করুন। আপনি সৃষ্টি পালন করেন। এই কারনে আপনি অবতার গ্রহণ করেন, আগামীতেও করবেন। হে লক্ষ্মীনাথ ত্রিবিক্রম, আপনি রাক্ষস বিনাশের জন্য আবির্ভূত হন। রাবণ আপনার হাতেই বধ্য। ” বসুমতী দেবী বললেন- “হে জনার্দন । আমি সর্বংসহা বসুমতী। কিন্তু রাবণের পাপের বোঝা আমি গ্রহণে অসমর্থ । সে স্বয়ং দেবী লক্ষ্মীর অবতার বেদবতীকে অসম্মান করেছে। এই মহাপাপীর বিনাশ না হলে ধরিত্রী ধ্বংস হবে।”

সকলের প্রার্থনা শুনে ভগবান বিষ্ণু অভয় দিয়ে তাঁর অবতারের কথা ঘোষোনা করে দিলেন । বললেন- “আপনারা চিন্তিত হবেন না । আমি ইক্ষাকু বংশে অযোধ্যার সম্রাট দশরথের নন্দন রূপে কৌশল্যা দেবীর গর্ভে আবির্ভূত হব। ধর্ম রক্ষা করে দুষ্ট রাক্ষস দিগকে বধ করবো। ধর্ম সংস্থাপন করে অধর্মের বিনাশ করবো।” দেবতারা আশ্বস্ত হলেন । ভগবান বিষ্ণু বললেন- “এই অবতারে দেবী লক্ষ্মীও অবতার গ্রহণ করে রাবণের বিনাশের হেতু হবেন ।” দেবী লক্ষ্মী বলিলেন- “বসুমতী ধরিত্রীর কন্যা রূপে আবির্ভূত হয়ে আমি মিথিলা রাজ জনক ও তাঁর পত্নী সুনয়নার গৃহে প্রতিপালিত হবো।” দেবতারা আশ্বস্ত হলেন । ব্রহ্মা তখন মহর্ষি বিশ্বশ্রবা কে স্বপ্নে জানালেন- “বিশ্বশ্রবা তুমি তোমার পুত্র দশাননকে সংযত হতে বল। ভগবান হরি মর্তে আবির্ভূত হচ্ছেন তাঁর বিনাশ করবার জন্য। সে এরূপ অধর্ম আশ্রয় করে থাকলে সে ধ্বংস হবেই, তাঁর কূলেও কেউ রক্ষা পাবে না।” বিশ্বশ্রবা রাবণকে অনেক বোঝালো, রাবণ সংযত হলই না। উলটে আস্ফালন করে বলল- “যদি বিষ্ণু আমাকে বধ করতে আবির্ভূত হয়, তবে আমি বিষ্ণু বধ করবো। কিন্তু বিষ্ণুর ভয়ে আমি ভীত হবো না। ”

এখানে সবাই প্রশ্ন করতে পারেন যে ভগবান বিষ্ণু ইচ্ছা করলেই গরুড়ে আসীন হয়েই লঙ্কা আক্রমণ করে রাক্ষস বধ করতে পারতেন। এতটাও দরকার হত না , তিনি বৈকুণ্ঠ থেকেই সুদর্শন চালনা করে রাক্ষস বধ করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি মর্তে আবির্ভূত কেন হবেন ? এটা ছেড়েও বলা যায়, দেবী লক্ষ্মীর অংশ বেদবতী নিজে যজ্ঞে ঝাঁপ না দিয়ে রাবণকে ভস্ম করতে পারতেন । কিংবা রুদ্রাবতার হনুমান রাবণকে বধ করতে পারতেন, কিংবা দেবী পার্বতীকে লঙ্কায় নিয়ে যাবার কালে দেবী শাপ দিয়ে রাবণকে ভস্ম করতে পারতেন বা রাবণ যেদিন কৈলাস আক্রমণ করেছিলো সেদিনই ভগবান শিব তার বধ করতে পারতেন । কিন্তু এঁনারা এমন করলেন না। ভগবান শ্রীহরি কেন মর্তে অবতার নিতে চলেছেন ? এর কারন রূপে কেউ কেউ জয়- বিজয়ের প্রতি সনকাদি মুনিদের অভিসম্পাত , নন্দীর দেওয়া নর বানরের হাতে ধ্বংসের শাপ বা ব্রহ্মার প্রদত্ত নর বানরের হাতে বিনাশের বর প্রদান, বেদবতীর প্রদত্ত অভিশাপ বা রম্ভার অভিশাপকে মুখ্য হেতু মনে করতে পারতেন। যে ভগবান তাই মানব অবতার নিয়েছেন । হ্যা এইগুলো ঠিক । কিন্তু ভগবানের অবতারের দুটি উদ্দেশ্য – অসাধু বিনাশ ও জীবশিক্ষা প্রদান সাথে ভক্ত সঙ্গ । আমরা জানি ভগবান লাভ আমাদের কাছে মূল উদ্দেশ্য । হ্যা ঠিক, যে হরি ভক্ত সে হরিকে, যে শিব ভক্ত সে শিবকে যে দুর্গা ভক্ত সে দুর্গাদেবীর কৃপা প্রাপ্তির জন্যই অচলা ভক্তির পথে চলেন । কিন্তু আমরা কি জানি যে আমরা ভগবান প্রাপ্তির জন্য যতটা ব্যাকুল, ভগবান নিজে শুদ্ধভক্তের সঙ্গ প্রাপ্তির জন্য তাঁর অধিক ব্যাকুল। তিনি শুদ্ধ ভক্ত খুঁজে বেড়ান। তাই ভক্তের জীবনে এত কষ্ট, এই কষ্ট ঈশ্বরের পরীক্ষা। তিনি পরীক্ষা করেন ভক্ত কতটা আঘাত সহ্য করে আমাকে ডাকে, তবেই না সে শুদ্ধভক্ত। ভগবান তখন সেই ভক্তের দাসানুদাস হন। ভগবান বলেন- “যে করে আমার আশ, করি তার সর্বনাশ। যদি না ছাড়ে পাশ, হই তার দাসের অনুদাস।” ভগবান রামের জীবনে আমরা এমন ভক্তের পরিচয় পাবো। তাই তো বলা হয় ভগবানের চেয়ে ভক্ত বড়। ভগবান এমন ভক্তকেই খোঁজেন, এটি তাঁর অবতারের আর একটি উদ্দেশ্য ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger