সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা (অযোধ্যাকাণ্ড পর্ব –৪ )


সকলে শুনে কৈকয়ীকে কটু বাক্য বলতে লাগলো। কৈকয়ী নিজ জেদে অস্থির। মহারাজ দশরথ অসুস্থ হয়ে শয্যা নিলেন। খাওয়া, দাওয়া বন্ধ করে দিলেন । কেবল কৌশল্যা আর সুমিত্রা জোর করে দুবেলা সামান্য কিছু রাজাকে আহার করাতেন । কৈকয়ী কি করবে ভেবে পাচ্ছিল্ল না। একবার গিয়ে মন্থরা কে বলে- “মন্থরা। বল আমি সঠিক না ভুল করলাম?” মন্থরা বলল- “কৈকয়ী তুমি সঠিক পথে এগিয়ে যাচ্ছো। তুমি সফল হও, ভরত রাজা হোক, রাম বনে যাক- এই কামনাই করি। রাজার দুঃখে গলে যেয়ো না। ওসব শক্ত মনে দমন করো। তুমি যদি নরম হও আজকে, তাহলে কাল তোমাকে দুঃখ ভোগ করতে হবে। শান্তি, সুখ প্রাপ্তির জন্য এসব কষ্ট সহ্য করতেই হয়। একবার ভরত রাজা হোক, রাম বনে যাক- দেখবে তখন তুমি সুখে আছো। রাজাও সুস্থ হয়ে যাবেন।” রাজা কিন্তু ভালো হল না। ক্রমশঃ স্বাস্থ্যের অবনতি হতে লাগলো । রামচন্দ্র সব শুনলেন । দশরথ রাজা আক্ষেপ করে বললেন- “পুত্র রাম! প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের দায়ে আমি নরকে যেতে হলে যাবো, তবুও তোমাকে বনে প্রেরণ করতে পারবো না।” রামচন্দ্র তখন রাজা দশরথকে আশ্বাস দিতে লাগলেন । গিয়ে কৈকয়ীর সাথে কথা বললেন। কৈকয়ী বললেন- “পুত্র রাম! আমি জানি তোমার সাথে অন্যায় করছি। কিন্তু ইহা ভিন্ন আমার কাছে অপর মার্গ ছিলো না । আমি নিরুপায়। প্রত্যেক মাতা যেমন গর্ভস্থ শিশুকে সদা রক্ষা করে, ভূমিষ্ঠ হবার পর আমৃত্যু সন্তানের কুশল, মঙ্গলের চিন্তায় থাকে তেমনি আমি আমার পুত্র ভরতের সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছি। ভরতের কল্যাণ দেখা আমার কর্তব্য। অতএব তুমি ভ্রাতা ভরতকে রাজ্যভার দিয়ে নিশ্চিন্তে চৌদ্দ বৎসরের জন্য বনে থেকে বনবাসীর ন্যায় জীবন পালন করো। কথা দিচ্ছি বনে তোমার কোন কষ্ট হবে না। তোমার সহধর্মিণী সীতাকে আমি কন্যা রূপে পালন করবো। বনবাস অন্তে তুমি অযোধ্যায় এলে তোমার জন্য উত্তম জীবনযাত্রার ভার আমি নেবো। ”

শুনে রামচন্দ্র বললেন- “মা । জন্মকাল হতে তুমি আমার আর ভ্রাতা ভরতের মধ্যে কোনপ্রকার ভেদ দর্শন করিনি । মাঝে মাঝে আমি বিস্মৃত হয়েছি, আমার গর্ভধারিণী মহারাণী কৈকয়ী, নাকি মহারাণী সুমিত্রা নাকি মহারাণী কৌশল্যা! মাতঃ তোমার স্নেহে আমি লালিত পালিত হয়েছি। তোমার বাৎসল্যে আমি সর্বদা ছায়ায় থেকেছি। মা এই সামান্য কিছুর জন্য আপনি পিতার কাছে এই বর চাইলেন! আপনি আমায় আদেশ করতেন, আমি তখুনি ভ্রাতা ভরতকে রাজ্যভার দিয়ে বনে গমন করতাম । তুমি আমার মাতা। সিংহাসন অপেক্ষা মাতার আদেশ অনেক বড়। আমি আপনার ইচ্ছা যথাযোগ্যভাবে পালন করবো। ” কৈকয়ী রামের এমন ব্যবহারে সত্যি মুগ্ধ হয়ে গেলো। একবার ভাবল এমন রত্ন ছেলের জন্য তিনি এমন নরক যন্ত্রনা তৈরী করছেন ? যে পুত্র তার এক কথায় সব কিছু ছেড়ে দিতে প্রস্তুত- তাকে এমন বনবাস দেওয়া কি উচিৎ ? কিন্তু পর মুহূর্তে তার মনে ঘুরেবেড়াতে লাগলো মন্থরার কুটিল বুদ্ধি। যদি কোনদিন রামচন্দ্রের মন পরিবর্তন হয়। যদি ভরতকে সে বিতারিত করে দেয়। তাই কৈকয়ী পুনঃ জেদে অটল হয়ে থাকলো । সারা রাজ্যে কৈকয়ী সম্বন্ধে ছিছিকার পড়ে গেলো। অনেক দূরে বসে কেকয় রাজ্যে ভরত এসব কিছুই জানলো না । ভরতের নামে সকলে গালি দিতে লাগলো। বলল- এমন দুর্মতি মাতা পুত্রকে রাজ্য থেকে বহিষ্কার করা প্রয়োজন। এদের সংস্পর্শে আকাশ বাতাস দূষিত হবে। উত্তম মানবও যদি এদের সংস্পর্শে আসে তবে সেও অধম হবে । দশরথ রাজার অবস্থা শোচনীয় । চোখ কোটরগত হয়েছে। চিন্তায় মুখে একটা যেনো শোকের ছায়া। কোথায় গেলো সে আনন্দ ? গোটা অযোধ্যা নগরী যেনো অন্ধকারে ডুবল । শোকে যেনো এই নগরী মূর্ছা গিয়েছে। না জ্বলল বাতি, না কোলাহল। ধূ-ধূ মরুভূমির ন্যায় নিস্তব্ধতা ।

রাজবাড়ীতে শোকের পরিবেশ । সর্বদা দশরথ রাজা নিজেকে দোষী ভাবেন । ভাবেন কেন তিনি না বুঝে প্রতিজ্ঞা করলেন। কেন সেদিন কৈকয়ীর সেবা পেয়ে সুস্থ হলেন ? যদি সেদিন অপুত্রক অবস্থায় মৃত্যু তাকে গ্রাস করতো- তবুও এত আক্ষেপ থাকতো না । রাম নয়নের মণি, প্রদীপের আলো, দেহের প্রাণ। এগুলি ছাড়া তিনি মৃতদেহ । কৈকয়ী এক বাঘিনীর মতো তাকে ধীরে ধীরে ভক্ষণ করে খাচ্ছে । শত বোঝানো হল, অনেকে বোঝালো। তবুও কৈকয়ী মত পরিবর্তন করলো না। উলটে সকলকে সে নিজের আর ভরতের শত্রু বলে জাহির করলো । মন্থরা আরোও কুটিল বুদ্ধি দিতে লাগলো কৈকয়ীকে । মহারাজের করুণ অবস্থা দেখেও কৈকয়ীর পরিবর্তন হল না। মহারাজের শরীর অসুস্থ । রামচন্দ্র বুঝতে পেরেও মাতা কৈকয়ীর ইচ্ছা পালন করতে চলছিলেন । যে বংশে হরিশ্চন্দ্রের মতোন মহান রাজা জন্মে শপথ ভাঙ্গেন নি, সেই বংশে জন্মে তিনি কেবল করে পিতার শপথ ভাঙ্গবেন ? আর মাতার ইচ্ছা পূর্ণ করা পুত্রের ধর্ম । বিমাতা হলেও সে মা । বিমাতা অথবা নিজ গর্ভধারিণী, দুজনকেই সমদৃষ্টিতে দেখে তাঁদের সেবা করাই পুত্রের ধর্ম । হোক বিমাতা কঠোর , অত্যাচারী- কিন্তু পুত্রের কর্তব্য গর্ভধারিণী জ্ঞানে তাঁর সেবা, ইচ্ছা পূর্ণ করা । ভগবান রামচন্দ্র সেই শিক্ষাই দিয়েছেন । যাই হোক রামচন্দ্রের বন গমনের কথা সীতাদেবীও শুনেছিলেন । দশরথ রাজা দিবারাত্র “হে রাম” বলে ক্রন্দন করতে লাগলেন ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger