সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( আদিকাণ্ড – ৩৩ )


রাক্ষস বধ করবার পর মুনি ঋষি গণ প্রসন্ন চিত্তে রাম লক্ষণের জয়ধ্বনি দিলেন । বিশ্বামিত্র মুনি তখন রাম লক্ষণকে নিয়ে মিথিলায় যেতে উদ্যোগ নিলেন । মিথিলার রাজা জনক , তাঁর পুত্রী সীতাদেবীর জন্য স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করেছিলেন । “স্বয়ম্বর” একটি মহাকাব্যের বিবাহ প্রথা, এখানে কোন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কন্যার জন্য পাত্র , অথবা পাত্রী স্বেচ্ছায় নিজ পছন্দের পাত্র নির্বাচন করতেন । বলা হয় প্রজাপতি ব্রহ্মা নারী স্বাধীনতা ও তাহাদিগের পছন্দের মর্যাদা দিতে এই “স্বয়ম্বর” নামক বিবাহবিধি প্রচলন করেছিলেন । জনকের কন্যা সীতাদেবীর রূপে মুগ্ধ হয়ে অনেক রাজা মিথিলা আক্রমণ করে বসতো, সে সবের থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাজা জনক শিব উপাসনা করে “হর ধনুক” প্রাপ্তি করে আক্রমণকারীদের পরাস্ত করেছিলেন । সেই ধনুক তুলবার শক্তি জনক ভিন্ন অপর কারোর ছিলো না। একদিন মহর্ষি পরশুরাম ও রাজা জনক গল্প করছিলেন। সেই সময় খেলাচ্ছলে বালিকা সীতা দেবী সেই ধনুক এক হাতে তুলে নিলেন। এই দেখে পরশুরাম ও জনক রাজা আশ্চর্য হলেন। পরশুরাম বললেন- “জনক! তুমি তোমার দুহিতার স্বয়ম্বরের ব্যবস্থা করো। শর্ত রাখবে যে পাত্র এই ধনুক তুলে গুণ পড়িয়ে ভঙ্গ করতে পারবে, তাঁরই সাথে সীতার বিবাহ দেবে।” জনক রাজা সেই মতো সীতাদেবীর স্বয়ম্বর ঘোষোনা করে দিলেন । অপরদিকে রাম লক্ষণ মুনি বিশ্বামিত্রের আশ্রমে কিছুকাল থেকে ব্রাহ্মণ দিগের কাছে শাস্ত্র কথা শ্রবন করলেন । এরপর বিশ্বামিত্র মুনি রাম লক্ষণকে নিয়ে মিথিলায় চললেন। 

পথে গৌতম মুনির পরিত্যক্ত আশ্রম পড়ে । আগাছা, জঙ্গলে সেই আশ্রম ছেয়ে গেছে। যজ্ঞবেদী, তুলসী মঞ্চ, পূজা ঘর, কুটির গুলো আগাছা জঙ্গল আর বিষাক্ত সাপের আস্তানা হয়েছে । জৌলুষ হারিয়ে সেই আশ্রম এখন জরাজীর্ণ । বিশ্বামিত্র মুনি রাম লক্ষণ কে অহল্যার ঘটনা, ইন্দ্রের ছলাকলা, গৌতম মুনির অভিশাপের কাহানী ব্যক্ত করলেন । সেই আশ্রমে বাতাসে ভেসে আসে এক নারীকণ্ঠের ‘রাম’, ‘রাম’ বোল । কোন এক যুগ থেকে চলে আসা সেই ‘রাম’ নাম এখানে গুঞ্জরিত হচ্ছে কোন অদৃশ্য উৎস থেকে । অহল্যা দেবীর পাষাণ মূর্তির কাছে রাম লক্ষণ কে নিয়ে বললেন- “রঘুবীর! এই হচ্ছেন মাতা অহল্যা দেবীর শাপিত পাষাণ মূর্তি। তুমি তোমার শ্রী চরণ দিয়ে এই মূর্তি স্পর্শ করো, তবেই অহল্যা দেবীর মুক্তি ঘটবে।” রামচন্দ্র মানা করলেন। বললেন- “ক্ষমা করবেন গুরুদেব। ইনি ব্রাহ্মণী, ইনি আমার মাতৃতুল্যা । আমি এঁনার ওপর চরণ রেখে মহাপাপ গ্রহণ করতে ইচ্ছা করি না।” মুনি বিশ্বামিত্র বললেন- “রাম। এছাড়া আর উপায় নেই। মহর্ষি গৌতম অভিশাপ দেবার সময় ঘোষোনা করেছিলেন তোমার চরণের পবিত্র স্পর্শেই মুক্তি ঘটবে। সেইজন্য তোমাকে আমি এখানে নিয়ে এসেছি। তুমি এঁর মুক্তি না দিলে, চিরকাল অহল্যা দেবী পাষাণ হয়ে কষ্ট ভোগ করবেন । তুমি এঁনার মুক্তির ব্যবস্থা কর।” ভগবান রাম তখন পাদুকা খুলে ডান চরণ মূর্তির ওপর রাখলেন । সাথে সাথে মূর্তি জীবিত হয়ে উঠলো। অহল্যা দেবী চোখ খুলে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কিন্তু সামনে ভগবান রামচন্দ্রকে দেখে প্রনাম করলেন ।

ভক্তিভাবে অহল্যার নয়ন দিয়ে অশ্রু নির্গত হচ্ছিল্ল। তিনি করজোড়ে বললেন- “হে দীনানাথ। হে ভক্তবৎসল ভগবান রাম ! আপনার জয় হোক । আমি অতি ক্ষুদ্রা সামান্যা নারী। আজ আপনার চরণ স্পর্শে আমার মুক্তি ঘটলো । হে ভবভয়নাশন, আমি আপনার শরণাগত হলাম । মুনির অভিশাপে পরম কল্যাণ নিহিত ছিলো। যাঁহাকে দর্শন করার জন্য যোগীরা কঠোর তপ সাধনা যোগ অবলম্বন করেন সেই শ্রীহরি আমার সম্মুখে । আমি অল্পবুদ্ধি । হে রঘুনাথ আমাকে কৃপা করে এই বর দিন যেনো সততঃ আপনার শ্রীপাদপদ্মে ভক্তি থাকে।” এভাবে স্তব করে গৌতমের পত্নী অহল্যা দেবী বারংবার ভগবান রামচন্দ্রের চরণে প্রনাম জানাতে লাগলেন । এরপর তিনি পতি গৌতম মুনির কাছে চলে গেলেন । এইবার বিশ্বামিত্র মুনির সাথে রাম লক্ষণ গঙ্গার ধারে পৌছালেন । বিশ্বামিত্র মুনি গঙ্গা অবতরণের কথা শোনালেন । রাম লক্ষণ এখানে মুনি ঋষিদের সাথে গঙ্গায় স্নান সেড়ে দানাদি পুন্য কর্ম করলেন। এরপর বিশ্বামিত্র মুনি রাম লক্ষণ কে নিয়ে নৌকা দিয়ে গঙ্গা পার করে মিথিলায় আসলেন । মিথিলা নগরী সুন্দর ছিলো। সমস্ত নগরী পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শ্রীযুক্ত ছিলো। গৃহগুলি সুন্দর করে সাজানো, বিবিধ কারুকার্যময় আল্পনা দ্বারা সুজ্জিত ছিলো। বৃক্ষ গুলি ফল ফুল সুন্দর বৃহঙ্গ দ্বারা সজ্জিত হয়েছিলো। উত্তম বস্তু এখানে কেনাবেচা হচ্ছিল্ল, ব্যবসায়ীরা ধনী ছিলো । ধর্মাত্মা , জ্ঞানী গণ, পণ্ডিত দের দেখতে পেলেন । রাজা জনকের বৃহৎ রাজবাটী অতি সুন্দর আর রম্য ছিলো। তাতে কোষ্ঠ গুলি হীরা মাণিকে সজ্জিত ছিলো। বিশাল সিংহদ্বারে অবস্থিত রাজ কর্মচারীরা সুবাসিত বারি, চন্দন, কুঙ্কুম, সুবাসিত পুস্প, পান সুপারী দিয়ে রাম লক্ষণ ও মহর্ষি বিশ্বামিত্রকে স্বাগত জানালেন । রাজা জনকের উদ্যান বাটি খুবুই সুন্দর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে বিশ্বামিত্র মোহিত হলেন। সেখানেই রাম লক্ষণ কে নিয়ে বিশ্রাম করতে লাগলেন । 

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger