সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( আদিকাণ্ড- ৩৪ )

মহর্ষি জনক রাজার সুন্দর বাগানে বিশ্রাম করছেন । মহর্ষি বিশ্বামিত্র মুনি এসেছেন শুনে একটু পর রাজা জনক সেখানে আসলেন । মুনি বিশ্বামিত্র ও অনান্য উপস্থিত ব্রাহ্মণকে প্রনাম করলেন । এরপর শ্রীরাম ও লক্ষণ , রাজা জনককে প্রনাম করলেন । রামচন্দ্রকে দেখে জনক রাজা মোহিত হলেন । মনে মনে ভাবলেন , এমন সুন্দর পাত্র আগে দেখলে স্বয়ম্বরের আয়োজন করতামই না। এই পাত্রের সাথেই সীতার বিবাহ দিতাম । নিশ্চয়ই সীতা মানা করতো না। লক্ষণ কে দেখে তিনি ভাবলেন এর সাথেই কন্যা ঊর্মিলার বিবাহ দিতাম । আহা কি অপূর্ব রাজপুত্র । জনক রাজা দুই রাজপুত্রের পরিচয় জানতে চাইলেন। তিনি বহুদিন অযোধ্যায় আসেননি তাই রাম লক্ষণকে চিনতেন না । বিশ্বামিত্র মুনি দুই বালকের রাক্ষস নিধনের খবর দিয়ে বললেন- “রাজন! এরা আপনার প্রতিবেশী রাজ্য তথা আপনার মিত্র দশরথের পুত্র রাম লক্ষণ। আপনার স্বয়ম্বর সভায় অংশ নিতে আমি শ্রীরামকে এখানে আনিয়াছি।” শুনে জনক রাজা খুব প্রীত হলেন । রাম, লক্ষণকে অনেক আদর যত্ন করলেন । খানিকবাদে রাজা জনকের সাথে মহর্ষি বিশ্বামিত্র রাজবাটির অন্দরে চলে গেলেন । রাম লক্ষণ ভাবলেন তারা মিথিলা ঘুরে দেখবেন । তারা ঘুরতে বের হলেন । অপূর্ব শোভা চারপাশে বিস্তৃত । একদিকে সুউচ্চ পর্বতমালা , চারপাশে পুস্প শোভিত বৃক্ষ, শীতল বারিধারা বহন করে বয়ে যাচ্ছে একাধিক নদী, পদ্ম- শালুক প্রস্ফুটিট দীঘিতে হংস হংসী কেলি করছে । মাছরাঙা, বক, সারস ইত্যাদি শ্বেত ধবল পক্ষী সেই দীঘির শোভা বর্ধিত করেছে। চারপাশে পাখীর মধুর কুজনে পরিবেশ মিষ্টি হয়েছে ।

যেখানে লক্ষ্মী দেবী বিরাজ করেন সেখানে এমন মধুর পরিবেশ সৃষ্টি হয় । রাম লক্ষণ কে দেখতে মুনি ঋষিরা যেমন আসলেন, তেমনি মিথিলার লোকজন আসলেন । মুনি ঋষি, ব্রাহ্মণেরা তাড়কা, মারীচ, সুবাহুর ও রাক্ষসদের নিধনের বার্তা শুনে অতীব প্রীত হয়ে রাম লক্ষণের ভূয়ষী প্রশংসা করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে লাগলেন। দিব্যাত্মা মুনি ঋষিরা অন্তরে অন্তরে রামচন্দ্রের উদ্দেশ্যে প্রনাম নিবেদন করলেন । মিথিলার লোক জন, যুবতী নারী সকলেই রামচন্দ্রকে দেখে পরম প্রীতি , সন্তোষ লাভ করলেন । তারা রামচন্দ্রকে চরণে , মস্তকে স্পর্শ করে নিজেদের ধন্য মনে করছিলেন । সোনাদানা, অর্থ দান করা আরম্ভ করলে যেমন লোকে গৃহ, বাটি, কাজ কর্ম রেখে ধাবমান হয়, তেমনি রাম লক্ষণ কে দেখতে মিথিলার লোকজন ধাবমান হলেন । যেখানে যেখানে রাম লক্ষণ গেলেন সেখানেই ভীর উপচে পড়লো । রাতে তারা জনক পুরীতে বিশ্রাম করলেন । রাজা জনক উৎকৃষ্ট ভোজন করালেন- পলান্ন, পিষ্টক, পায়সান্ন, পুরি, ক্ষীর, লাড্ডু, মোদক, মাখন ইত্যাদি সুস্বাদু ব্যাঞ্জন ভোজন করালেন । অন্তে স্বর্ণ খড়িকা, তাম্বুল, কর্পূর, সুপারী প্রদান করলেন । পর দিন স্বয়ম্বর সভা । মিথিলায় দেবী সতীর ৫১ পীঠের এক পীঠ উমাদেবী শক্তিপীঠ আছে । স্বয়ম্বর সভার দিন সীতাদেবী প্রাতেঃ উঠে স্নানাদি করতে গেলেন সখী সহিত। স্নানাদি করে সীতাদেবী পুস্প চয়ন করতে লাগলেন । এক সখী গিয়ে রাম লক্ষণ কে দেখে সীতাদেবীর কাছে এসে বললেন- “হে সখী জানকী! পুস্পদ্যাণে বিশ্বামিত্র মুনির সাথে আগত দুই রাজকুমারকে দেখলাম। কি তাহাদিগের অপূর্ব রূপ। কি তুলনা দিব? সকল মিথিলার নাগরিকেরা তাঁহাদিগের প্রশংসা করছেন । তাহাদের একজন শ্যাম অপরজন গৌর বর্ণ । এই নয়ন দিয়ে যেরূপ দেখলাম সেরূপ বর্ণনা করার শক্তি নেই।” সকলে বলিলেন- “তাহলে একবার সেই রাজকুমার দ্বয়কে দেখে আসি। দেখি আমাদের সখী জানকীর উপযুক্ত কিনা?” 

সখী গণ মিলে সীতাকে নিয়ে সেই স্থানে গেলেন । প্রথম দর্শন হল সীতাদেবী ও রামচন্দ্রের । দুজন দুজনার দিকে চেয়ে রইলেন । এই অবস্থায় উভয়ের প্রেম জন্মালো। মিষ্টি পাখীর কলরব আর সুগন্ধি ফুলের গন্ধে সমগ্র বাগান শীতল পবনে মৃদু মৃদু আলোরিত হচ্ছে- এমন সময়ে উভয়ে উভয়ের যেনো মন সমর্পণ করলেন । আর সীতাদেবীর ভগিনী ঊর্মিলা চেয়ে রইলেন লক্ষণের প্রতি । নয়নে নয়ন, মনে মন যেন একত্র হল । কিছুক্ষণ এইভাবে অবস্থান করার পর সখীদের ডাকে সীতাদেবীর চেতনা ফিরে এলো। এতক্ষণ রামচন্দ্র সীতাময় আর সীতাদেবী রামময় হয়ে গেছিলেন । সখীদের সাথে সীতাদেবী, ঊর্মিলা তখন উমাদেবীর মন্দিরে গেলেন । সীতাদেবীর মনে তখন রামচন্দ্রের মুখচ্ছবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, যেমন শিল্পী তার অপূর্ব কলা দ্বারা মনের ভাবনাকে চিত্রিত করেন । কথা, বার্তা সবই বলছেন , কিন্তু মনে পড়ে আছে ঐ রামচন্দ্রের পাণে। পূজা করবার সময় মন্ত্র পাঠ করতে করতে বারংবার উমাদেবীর কাছে প্রার্থনা করলেন- “হে মাতঃ! তুমি যেমন কঠোর উপাসনা দ্বারা শঙ্করকে পতিরূপে প্রাপ্তি করেছিলেন, তেমনি আমি যেনো তাঁকেই পতি রূপে পাই। তিনি ভিন্ন এই মনে আর কেহ নাই, আর থাকবেও না। হে মাতা গিরিজা। তুমি কৃপা কর।” কৈলাস থেকে হরগৌরী সব দেখে আনন্দে আশীর্বাদ করতে লাগলেন । 

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger