সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ন কথা ( আদিকাণ্ড- ৩৫ )

জনক রাজার সভায় রাজারা উপস্থিত । তুলসীদাসী রামায়ণে লিখিত আছে এই সভায় ১০ সহস্র রাজা এসেছিলো। বাণাসুরও এসেছিলো । রাজা জনক সভামাঝে সকল রাজণ্য বর্গকে সম্মান জানিয়ে স্বাগত জানালেন । রেশমি স্বর্ণ খচিত বস্ত্রে ও বিবিধ অলঙ্কারে সুসজ্জিতা হয়ে জনক দুহিতা সীতাদেবী সভায় উপস্থিত হয়ে পর্দার আড়ালে বরমাল্য নিয়ে কেবল লজ্জিত দৃষ্টিতে শ্রীরামকে প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন । দেবীর অলঙ্কার গুলি থেকে এমন দ্যুতি নির্গত হচ্ছিল্ল, মনে হচ্ছিল্ল আকাশের নক্ষত্র মণ্ডল দিয়ে জানকী দেবীর অলঙ্কার গুলি নির্মিত হয়েছে । অলঙ্কারের দ্যুতিতে সীতাদেবীর মধুময় মুখমণ্ডল অতীব সুন্দর দেখাচ্ছিল্ল । মনে হচ্ছিল্ল পরমপিতা ব্রহ্মা ত্রিলোকের সকল সৌন্দর্য একত্রিত করে সীতাদেবীকে গঠন করেছেন । সীতাদেবীর মা সুনয়না দেবী রামকে দেখা মাত্রই মনে বাৎসল্য ভাবের উদয় হল। তিনি মনে মনে প্রার্থনা করলেন- “এই কিশোর যেন অবশ্যই আজ ধনুক তুলে তা ভঙ্গ করতে পারে। এই পাত্রই সীতার জন্য উপযুক্ত।” এই ভেবে সুনয়না দেবী মনে মনে ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করতে লাগলেন । উপস্থিত মিথিলার নাগরিকেরা নিজ নিজ ইষ্টের কাছে প্রার্থনা জানালো- ঐ সুদর্শন অযোধ্যার রাজকুমার রামের সাথেই যেন সীতার বিবাহ হয় । সভামাঝে বিশাল হরধনু এনে স্থাপিত করলেন রাজা জনক । কুলগুরু মহর্ষি শতানন্দ ও উপস্থিত সাধু সন্ন্যাসী , ব্রাহ্মণ দিগের প্রনাম করে রাজা জনক প্রতিযোগিতার সূত্রপাত করলেন ।
কত রাজা এলো- কিন্তু ধনুক ভঙ্গ করা তো দূর, একচুল নড়াতে অবধি পারলো না । সকল রাজা, রাজকুমার আস্ফালন করে এলেন, আবার লজ্জিত হয়ে চলে গেলেন । কেউ একচুল নড়াতে পারলো না সেই দিব্য ধনুক । হঠাত সভামাঝে বাণাসুর এলো। ভয়ে সীতাদেবী মনে মনে মাতা উমার কাছে জানালেন- যেনো এই অসুর ব্যর্থ হয় । প্রবল পরাক্রম অসুর ব্যর্থ হয়ে লজ্জিত হয়ে চলে গেলো । এরপর আরোও রাজা, রাজকুমার এলেন – কিন্তু সকলেই অসফল হয়ে লজ্জিত হয়ে হেট বদনে চলে গেলেন । হঠাত সভামাঝে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি হল । যেনো বিশাল ঝড় সভাতে প্রবেশ করেছে এমন অবস্থা। ভয়ানক অট্টহাস্য করে দশানন রাবণ সভায় উপস্থিত হল। রাজা জনক বললেন- “হে দশানন আপনাকে নিমন্ত্রণ করা হয়নি, আপনি কেন এসেছেন?” রাবণ দশমুখ দিয়ে অট্টহাস্য করে বলল- “এর ফল তুমি ভোগ করবে রাজা জনক। আজ আমি এই ধনুক ভঙ্গ করে তোমার কণ্যাকে বিবাহ করে লঙ্কায় নিয়ে যাবো। আমি এই হস্তে কৈলাস পর্বত উত্তোলন করেছি- ঐ ধনুক তো কোন ছাড়!” রাবণ যখন ধনুক তুলতে অগ্রসর হল , তখন ভয়ে সীতা দেবীর মুখ শুকিয়ে গেলো। তিনি মনে মনে মাতা উমাকে স্মরণ করে বললেন- “মাতঃ ! এই পাপী যেনো কোনমতে সমর্থ না হয়। নচেৎ এই মুহূর্তে আমি এই দেহ ত্যাগ করবো। হে শঙ্করী, ভবানী! তুমিই ভরসা । আমাকে এইহেন বিপদ থেকে রক্ষা কর।” জনক রাজা , রানী সুনয়না, উপস্থিত মুনি ঋষি ও লোকেরা প্রার্থনা করতে লাগলেন ভগবানের কাছে। এই পাপীর হস্তে সীতাদেবীকে তুলে দেওয়া মানে অগ্নিতে কন্যা সমর্পণ করা। সকলে ইষ্টদেবতার কাছে রাবণের অসফলতা কামনা করতে লাগলো। রাবণ বহু চেষ্টা করে সেই ধনুক তুলতে পারলো না। পরাজিত হয়ে রাবনের ঘাম নির্গত হল । সকলে হাসতে লাগলো। রাবণ বলল- “এর শোধ আমি নেবোই। একদিন সীতাকে আমি আমার রাজ্যে নিয়ে যাবোই।” বলে রাবন গর্জন করতে করতে মিথিলা থেকে চলে গেল।
কোনো রাজা, রাজকুমার সফল হল না দেখে জনক রাজা আক্ষেপ করে বলল- “এই ধরণী তে কি বীরের অভাব হয়েছে ? এমন কি কোন বীর নেই যে এই ধনুক ভঙ্গ করে আমার কন্যাকে বিবাহ করে? তবে আমার কণ্যা কুমারী থাক।” শুনে লক্ষণ রেগে গিয়ে বলল- “ক্ষমা করবেন মহারাজ! আপনি এখনও রঘুকুলের বীরত্ব দেখেন নি, তাই এমন বলছেন। রঘুকুলের বীরত্ব দেখলে এমন কদাপি উচ্চারন করতেন না।” তখন বিশ্বামিত্র মুনির আদেশে রামচন্দ্র উঠলেন । তিনি সভামাঝে উপস্থিত বিশ্বামিত্র গুরু , মুনি, ঋষি , ব্রাহ্মণ, জনক- সুনয়না দেবী ও উপস্থিত সকলকে প্রনাম জানিয়ে হর ধনুর সম্মুখে গেলেন। সেই পবিত্র শিব প্রদত্ত ধনুককে পূজা, প্রণাম, প্রদক্ষিণ করে এক হস্তে ধনুক তুলে নিলেন । সকলে দেখে তাজ্জব হল। রাজা জনক, সুণয়না, মিথিলা বাসী ও সীতাদেবীর মুখে হাসি ফুটলো । তারপর রামচন্দ্র ধনুকে জ্যা পড়ালেন। তারপর জ্যা আকর্ষণ করতেই ধনুক দ্বিখণ্ডিত হল। ধনুক যখন দ্বিখণ্ডিত হল তখন ভয়ানক বজ্রপাত হল । সকলের মুখে হাসি ফুটলো। বিশ্বামিত্র, মুনি , ঋষিরা উঠে দাঁড়িয়ে ‘সাধু’, ‘সাধু’ বলে প্রশংসা করতে লাগলেন । রামচন্দ্র সকলকে প্রনাম জানালেন। আনন্দিতা হয়ে সীতাদেবী মনে মনে গিরিজা দেবীকে প্রনাম ধন্যবাদ জানিয়ে বরমাল্য নিয়ে এগিয়ে গেলেন। সেই বরমাল্য রামচন্দ্রের কন্ঠে পড়িয়ে চরণে প্রনাম করলেন । রাজা জনক বললেন- “পুত্র রাম! তুমিই আমার কন্যা সীতার স্বামী হবে। আমি তোমার সাথেই সীতার বিবাহ দেবো।” ভগবান রাম বললেন- “রাজণ! আমার একটি অনুরোধ আছে। আমরা চার ভ্রাতা একত্রে তিন মায়ের স্নেহে লালিত পালিত হয়েছি। মাঝে মাঝে আমরা বিস্মৃত হই যে আমাদের আসল গর্ভধারিণী জননী কে? তিন মাতাই আমাদিগকে সমান আদর বাৎসল্য দিয়ে লালন পালন করেছেন। আমরা চার ভাই একত্রে বিদ্যা শিক্ষা নিয়েছি। আপনি আরোও তিনটি কন্যার ব্যবস্থা করুন। আমরা চার ভ্রাতা একই দিনে বিবাহ করবো।” মহর্ষি শতানন্দ বললেন – “তাই হবে। রামচন্দ্রের সাথে সীতার আর জনকের অপর কন্যা ঊর্মিলার সাথে লক্ষণের বিবাহ হবে। আর জনকের ভ্রাতা কুশধ্বজের কন্যা মাণ্ডবীর সাথে ভরতের আর শ্রুতকীর্তির সাথে শত্রুঘ্নের বিবাহ হবে।” রাজা জনক ও কুশধ্বজ উভয়ে খুশী হলেন। বিশ্বামিত্র মুনিকে রাজা অনুরোধ জানালেন অযোধ্যায় গিয়ে রাজা দশরথ, ভরত, শত্রুঘ্নকে ও আত্মীয় স্বজনদের নিমন্ত্রণ করে আসুন।
( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger