সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা (অযোধ্যাকাণ্ড পর্ব – ১ )

নারায়ণং নমস্কৃত্য নরঞ্চৈব নরোত্তমম্ ।
দেবীং সরস্বতীঞ্চৈব ততোজয়মুদীরয়েৎ ।।

ভয়হর মঙ্গল দশরথ রাম ।
জয় জয় মঙ্গল সীতা রাম ।।
মঙ্গলকর জয় মঙ্গল রাম ।
সঙ্গতশুভবিভবোদয় রাম ।।
আনন্দামৃতবর্ষক রাম ।
আশ্রিতবৎসল জয় জয় রাম ।।
রঘুপতি রাঘব রাজা রাম ।
পতিতপাবন সীতা রাম ।।

রাজা দশরথের চারপুত্রের বিবাহ হয়ে গেছে। চার পুত্রেরা সুখে সস্ত্রীক সংসার ধর্ম পালন করছেন । সমগ্র অযোধ্যায় খুশীর পরিবেশ । চারপাশে শান্তি। রাজা দশরথ নিশ্চিন্ত হলেন। বয়স বৃদ্ধি পাচ্ছে রাজার । জীবনের আর ভরসা কি? পরকালের ডাক আসলেই কেউ আর এক মুহূর্ত বেঁচে থাকে না । রাজা দশরথ মন্ত্রী, সেনাপতি, উপদেষ্টার সাথে পরামর্শ করলেন। সকলেই বলল রামচন্দ্রের রাজ্যভিষেক করতে। তাঁকে অযোধ্যার রাজ আসনে বসাতে । দশরথ রাজা খুশী হলেন । ভাবলেন এটাই তো মনের ইচ্ছা। অপরদিকে মন্থরা এসকল শুনে , কৈকয়ীকে বলল- “রানী কৈকয়ী। তুমি নিজের সর্বনাশ দেখতে পেয়েও অন্ধ হয়ে আছো? রামের জন্য আনন্দ প্রকাশ করছ ? তোমার ন্যায় অবধ ত্রিলোকে নেই।” কৈকয়ী শুনে ক্ষেপে গিয়ে গেলো। বকাঝকা করে মন্থরাকে বলল- “তোর দেহের ন্যায় তোর মন কুৎসিত। জিহ্বা সংযত করো। পুনঃ আমার পুত্র রামের সম্বন্ধে অনুচিত কিছু বললে আমি তোর জিহ্বা চ্ছেদ করবো।” একদিন মহারাজ দশরথ ভরতকে মাতুলালয় কেকয় রাজ্যে পাঠালেন । ঠিক সেই সময় রামচন্দ্রের রাজ্যাভিষেকের কথা ঘোষণা করলেন রাজা দশরথ । ভরতের অনুপস্থিতিতে এই ঘোষণা হল । সারা রাজ্যে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেলো। সমগ্র অযোধ্যাবাসীর নয়নের মণি ছিলেন রামচন্দ্র। এই অবস্থায় রামচন্দ্রের রাজা হওয়ার সংবাদে সমগ্র নাগরিকেরা আনন্দ উৎসব করতে লাগলেন। সুদূঢ মিথিলাতে এই সংবাদ পৌছালে সেখানেও আনন্দ উৎসব আরম্ভ হল ।

ভরতের অনুপস্থিতিতে রামচন্দ্রের রাজা হবার সংবাদ শুনে কৈকয়ীর মোটেও ভালো লাগেনি । উপরন্তু মন্থরা আরোও কুবুদ্ধি দিয়ে বলতে লাগলো। বলল- “কৈকয়ী! তোমাকে আমি শিশু অবস্থা থেকে দেখছি। পিতার গৃহে আদর যত্নে পালিতা হয়েছো। অযোধ্যার রাণী রূপে সুখ ভোগ করছ। কিন্তু রামচন্দ্র রাজা হলে এই সব সুখ তোমার কপালে স্থায়ী হবে না। রাজা দশরথকে হাত করে কৌশল্যা এসব বুদ্ধি করেছে। সেজন্যই ভরতকে মাতুলালয়ে প্রেরণ করেছে। রাজার মনে সুবুদ্ধি থাকলে সে এমন ভরতের অনুপস্থিতিতে কেন রাজ্যাভিষেক ঘোষণা করলেন! জাগো রাণী কৈকয়ী। বুদ্ধি দিয়ে বিচার করো।” রাণী কৈকয়ী সত্যি এবার ভীত হলেন। ভাবতে লাগলেন কি করা যায় । মন্থরার কুটিল বাক্য সমানে কৈকয়ীর মনকে বিষাক্ত করে তুলতে লাগলো । কৈকয়ী ভাবল- “সত্যি তো ! ভরতের অনুপস্থিতিতে রাজ্যাভিষেক কেন?” মন্থরা সমানে কুপরামর্শ দিয়ে বলতে লাগলো- “কৈকয়ী! আপন আপনই হয় আর পর পরই হয় । ভরত তোমার গর্ভজাত, রামচন্দ্র তোমার গর্ভজাত নয়। রাম সর্বদা কৌশল্যার ভালো মন্দই দেখবে। তোমার নয়।” শুনে কৈকয়ী ভাবলেন – “সত্যি যদি এমন হয়, শেষ বয়সে হয়তো রাম তাঁকে রাজবাটি দেখে বিতারিত করবে। তখন ভরতকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াবো? ” মন্থরা বলল- “একবার রাম রাজা হয়ে সিংহাসনে বসলে কৌশল্যা হবে রাজমাতা। আর কৌশল্যা তখন তোমাকে দাসীতে পরিণত করবে। কেউ নিজের সতীনকে সহ্য করতে পারে না। কৌশল্যা এতকাল মনে ক্ষোভ সহ্য করে তোমার সাথে উত্তম ব্যবহার করেছে। তখন সে তোমাকে ঝি বানিয়ে রাখবে। আমি তোমাকে রাজার কণ্যা হিসাবে , রাজার পত্নী রূপে চিরকাল দেখে এসেছি। ঝিগিরি করতে তোমাকে আমি দেখতে পারবো না। আর ভরতকে বানাবে দাস, বা তাঁকে গোপোনে হত্যা করতেও পারে। ভাবো কৈকয়ী ভাবো। রামচন্দ্র রাজা হলে তোমার অদৃষ্টে শণির দশা আছে।”

কৈকয়ীর ভয়ে বুক হাত পা শুকিয়ে গেলো। বুক দুরুদুরু কাঁপতে লাগলো। কৈকয়ী বলল- “চুপ কর। এসব আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। আমি আমার ভরতের জন্য সব কিছু করতে রাজী। বল মন্থরা আমি কি করবো?” মন্থরা বলল- “উপায় আছে। সম্বরাসুর বধের পর রাজা দশরথ ক্ষতবিক্ষত হলে তুমি তার সেবা করে তাকে সুস্থ করেছিলে। সেই সময় রাজা দশরথ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তোমাকে দুটি বর দেবেন। রাজা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন। স্মরণ করো। এখন সেই বর দুটি চেয়ে নেবার সময় এসেছে।” কৈকয়ী বলল- “আমার সব স্মরণ আছে। বল মন্থরা আমাকে কি চাইতে হবে?” মন্থরা বলল- “প্রথম বরে তুমি রামের বদলে ভরতকে রাজা করবার দাবী জানাও, আর দ্বিতীয় বরে রামচন্দ্রের চৌদ্দ বছরের বনবাস প্রার্থনা করো।” কৈকয়ী বলল- “প্রথম বর ঠিক আছে, দ্বিতীয় বরে বনবাস কেন?” মন্থরা বলল- “তুমি অত্যন্ত নির্বোধ রাণী। রামচন্দ্রের জনপ্রিয়তা প্রজাদের মধ্যে বিপুল আছে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী নিষাদ রাজ গুহক রামচন্দ্রের মিত্র। মিথিলার মতো শক্তিশালী দেশের রাজা জনক, রামের শ্বশুর। ইচ্ছা করলেই রাম গোপোনে এদের দিয়ে আঁতাত করে ভরতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষোনা করে ভরতকে বধ করতে পারে। তারপর সে নিষ্কণ্টক অবস্থায় রাজা হতে পারবে। তাই রামের চৌদ্দ বছর বনবাস প্রয়োজন। ভরতের প্রান রক্ষার ভাবনাও তোমার।” কৈকয়ী বিষাক্ত নাগিনীর মতো বলে উঠলো- “তাই হবে মন্থরা। আমি আমার ভরতের জন্য সব করতে রাজী। আমি রামের রাজা হওয়া রোধ করবো।”

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger