সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা (অযোধ্যাকাণ্ড পর্ব – ২)


মন্থরার পরামর্শ মেনে কৈকয়ী তার বুদ্ধি মতো চলল। সমগ্র রাজ্য আনন্দমগ্ন । ভগবান রামের বাল্যসখারা , রামকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন । রাজা দশরথ দেখলেন এই সময় কেবল রাণী কৈকয়ী অনুপস্থিত । তিনি রানী কৈকয়ীর কক্ষে উপস্থিত হলেন রাণীর কাছে । দেখলেন রাণী কৈকয়ীর কক্ষে সমস্ত প্রদীপ নির্বাপিত- ভাগ্যবিধাতা দশরথের ভাগ্যে বিপর্যয়ের ইঙ্গিত এভাবেই দিচ্ছিল্লেন যা রাজা বুঝতে পারেনি। রাজা বোঝেন নি এই আনন্দ আর ক্ষণস্থায়ী । এক বিশাল দুর্যোগ ধেয়ে আসছে অযোধ্যার দিকে। কক্ষে ঢুকে দশরথ দেখলেন রাণী কৈকয়ী সর্ব অলঙ্কার ত্যাগ করে , একবস্ত্রা হয়ে, নাগিনীর মতোন তাঁর কেশরাশি চতুর্দিকে ছড়িয়ে ভূমিতে অবস্থান করছে । সামান্য একটি প্রদীপের আলোয় রাণীর সেই ভয়ঙ্করী রূপ রক্তপিশাচীর ন্যায় বোধ হচ্ছিল্ল । রাজা দশরথ বললেন- “কৈকয়ী! তোমার এই হেন অবস্থা আমি পূর্বে কদাপি দর্শন করিনি । সমস্ত রাজ্য যখন রামের রাজ্যাভিষেকের কথা শুনে আনন্দিত, তখন তুমি এমন বিষাদগ্রস্তা কেন? এসো এই উৎসবে সামিল হও। তুমি তো রামকে নিজের জেষ্ঠ্যপুত্র বলে দাবী করো। পুত্রের আনন্দের দিনে তোমার এমন অবস্থা কেন? তুমি কি ব্যাধিতে পীড়িতা, তবে আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বৈদ্য এমনকি স্বর্গ থেকে অশ্বিনীকুমার দ্বয়কে বন্দী করে আনতে পারি। তোমাকে কি কেউ কটু কথা বলেছে? কেউ মনে আঘাত দিয়েছে? তাঁর পরিচয় ব্যক্ত করো, এখুনি তার শিরোচ্ছেদ করে তাহার মুণ্ড তোমার চরণে এনে দেবো।” এইভাবে দশরথ রাজা কৈকয়ীকে বোঝালো । কৈকয়ী তখন একটি প্রদীপ হাতে নিয়ে রাজার সম্মুখে এলো। প্রদীপের আলোতে কৈকয়ীর মুখ পদদলিত কালনাগিনীর ন্যায় বোধ হচ্ছিল্ল ।

কৈকয়ী বলল- “মহারাজ! সম্বর অসুর বধের সময় আপনার শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলো, আমি সেবা করে আপনার প্রান রক্ষা করেছিলাম। সেসময় আপনি আমাকে দুটি বর দিতে ইচ্ছুক ছিলেন। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন ঐ দুটি বরে আমি যা চাইবো, তাই আমাকে দেবেন! মনে আছে?” দশরথ রাজা বললেন- “হ্যা কৈকয়ী, তোমার সেই ঋণ আমি কদাপি বিস্মৃত হবো না।” কৈকয়ী বলল- “আজ আমি সেই দুটি বর প্রার্থনা করবো। আপনি শপথ গ্রহণ করুন আমি যা চাইবো তাই দেবেন। মনে রাখবেন আপনি রঘুবংশীয় নরপতি। আপনাদের কূলে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করলে কিন্তু আপনার ও এই কূলের নামে অপযশ হবে।” মহারাজ দশরথ বললেন- “আমি আমার এই সূর্যবংশীয় কূল, সাক্ষাৎ ভগবান সূর্যনারায়ণ ও পূর্বপুরুষদের নামে শপথ করে বলছি তুমি যা চাইবে আমি তাই দেবো।” কৈকয়ী নিষ্ঠুরা ডাইনীর মতো হয়ে বলল- “তবে শুনুন মহারাজ। আমার প্রথম ইচ্ছা যে রাম নয় আমার গর্ভজাত পুত্র ভরত হবে অযোধ্যার রাজা। আপনি রামচন্দ্রের রাজ্যাভিষেক বাতিল করুন। দ্বিতীয় ইচ্ছা এখুনি রামকে চৌদ্ধ বছরের জন্য বনবাসে যেতে হবে। বনবাসে গিয়ে রামচন্দ্রকে বনবাসীর ন্যায় জীবন কাটাতে হবে।” শুনে মহারাজ দশরথের যেনো পায়ের তলায় মাটি সড়ে গেলো। বুকে লক্ষ লক্ষ বজ্রপাত হতে থাকলো। চোখে মুখে অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার ছেয়ে গেলো । একি কথা বলছে কৈকয়ী ! এমন কথা কৈকয়ীর মুখে ! রাজা অজ্ঞান হয়ে ভূমিতে আহত গজের ন্যায় পতিত হলেন । কৈকয়ী চোখে মুখে জল দিয়ে চেতনা ফেরালেন রাজার। তারপর বললেন- “মহারাজ । আপনি আপনার কূল, ইষ্টদেবতা, পূর্বপুরুষদের নামে শপথ করেছেন। এবার শপথ পালন করুন।” মহারাজ দশরথ বললেন- “কৈকয়ী তোমার কি চেতনা লুপ্ত হয়েছে ? নাকি কোন অশরীরী আত্মা তোমাকে গ্রাস করেছে ? নাকি তুমি মানসিক ভারসাম্য লুপ্ত হয়েছো? নাকি তুমি কৈকয়ীর ছদ্দবেশী কোন দুষ্ট রাক্ষসী? নাকি তুমি আমার সাথে প্রহসন করছ ? এহেন বাক্য তোমার জিহ্বায় কিভাবে ফুটে ওঠে?”

কৈকয়ী বললেন- “মহারাজ । আমি সুস্থ আছি। কিন্তু যদি আপনি আমার এই দুটি ইচ্ছা পূর্ণ না করেন তবে আমি অনাহারে থেকে অসুস্থ হয়ে প্রাণত্যাগ করবো। আপনিও শপথ ভাঙবার জন্য পূর্বপুরুষদের অভিশাপ প্রাপ্তি করবেন ? ভুলে গেলেন আপনার পূর্বপুরুষদের অমর গাঁথা? অতএব আমার ইচ্ছা পূর্ণ করুন।” মহারাজ দশরথ অনেক বোঝালেন । কিন্তু কৈকয়ী নাছোড়বান্দা । তাঁর ঐ দুটি ভিন্ন অপর ইচ্ছাই নেই । রাজা দশরথ নিজেকে বিমর্ষ মনে করছিলেন । যুদ্ধে আহত সৈন্যের ন্যায় টলতে টলতে কোনো রকমে নিজ কক্ষে গেলেন । বসে রোদন করতে লাগলেন । সারা রাজ্যে যখন আনন্দ , রাজার মনে আতঙ্ক, ভয়, দুঃখ । নিজের কপালে নিজেই আঘাত করে বিলাপ করতে লাগলেন কেন তিনি কৈকয়ীকে দুটি বর দিবার অঙ্গীকারবদ্ধ হলেন ? কেন তিনি বংশ কুলদেবতার নামে শপথ করতে গেলেন? কেন না জেনে উন্মাদের ন্যায় প্রতিজ্ঞা করলেন । রামচন্দ্র কৈকয়ীকে কদাপি বিমাতা জ্ঞান করে না। বরঞ্চ নিজ গর্ভধারিণী থেকেও অধিক সম্মান, শ্রদ্ধা করে। তবে কৈকয়ী আজ সেই রামের সাথেই কেন বা এমন প্রবঞ্চনা করলো । ক্ষুধার্ত শিশুর সামনে কেমন করে মা তাঁর স্তন্যে বিষ লেপন করে যেতে পারে ? কৈকয়ী সে কর্মটাই করেছে। পুত্র রামকে আদর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেছে। বোধ হয় ভরত মাতুলালয়ে যাবার আগে মাতা কৈকয়ীকে এসব কুপরামর্শ দান করে গেছে। রাজা দশরথ “হে রাম!” বলে রোদন করতে লাগলেন । বাইরের আনন্দ, বাজনা, নৃত্য, গীতে রাজার এই ক্রন্দন চাপা পড়ে গেলো। অপরদিকে কৈকয়ী জালে বদ্ধ হরিণের অপেক্ষা করতে লাগলো ক্ষুধার্ত বাঘিনীর ন্যায় ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger