সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( আদিকাণ্ড – ৩৭ )


এইভাবে বিবাহ সম্পন্ন হল। মিথিলাবাসী খুব আনন্দের সহিত এই বিয়েতে অংশ নিলেন। অবশেষে বিদায়ের সময় এলো। মিথিলাপুরীতে কান্নার রোল উঠলো। সমগ্র মিথিলাবাসীর চোখে জল। যেনো সীতা সকলের দুহিতা। কন্যাবিদায়ের সময় যেমন পিতামাতা রোদন করেন- তেমনি মিথিলার লোকজন রোদন করতে লাগলেন । পুস্প, স্বর্ণ মাল্য দ্বারা চার ভ্রাতার রথ সাজানো হয়েছিলো। বরযাত্রীরা ধ্বজ, ছত্র, বিবিধ বাজনা নিয়ে অযোধ্যা ফিরবার প্রস্তুতি নিলেন। ঠিক সেই সময় এক অঘটন ঘটলো। মহর্ষি পরশুরাম এসে হাজির হলেন । পরশুরামের ক্রোধের কথা সকলে জানতেন। তিনি ২১ বার ধরিত্রী ক্ষত্রিয়শূণ্য করেছিলেন । তিনি আসতেই সমগ্র ক্ষত্রিয়রা ভূমিতে দণ্ডবৎ হয়ে প্রনাম জানাতে লাগলেন। রাজারা ভয়ে কাঁপতে লাগলেন- কি জানি আবার ইনি ক্ষত্রিয় বধ আরম্ভ করেন কিনা । পরশুরাম ক্রোধে বললেন- “কে ভগবান শিবের ধনুক ভঙ্গ করেছে ? কে সেই বীর? সামনে আসুক সে। নচেৎ আজ একটি ক্ষত্রিয়কে আমি জীবিত রাখবো না। সব নাশ করে দেবো। আমি জমদাগ্নি পুত্র পরশুরাম । আমার নাম শুনে গর্ভস্থ ক্ষত্রিয় সন্তান অবধি থরথর করে কাঁপে।” লক্ষণ রেগে বললেন- “আপনি অত রাগছেন কেন? বাল্যকালে আমরা খেলাচ্ছল্লে কত ধনুক ভেঙ্গে ফেলেছি? এ আর এমন কি?” শুনে পরশুরাম ক্রোধে হুঙ্কার দিয়ে বললেন- “মূর্খ বালক। আমার সহিত রসিকতা? এ যে সে ধনুক নয়। রুদ্রদেবের প্রদত্ত ধনুক। একে ভঙ্গ তো দূর, তোলার শক্তি অবধি নেই। হে ক্ষত্রিয় বালক, স্তব্ধ হও, নাহলে এবার আর একবার আমি ক্ষত্রিয় নিধন করবো। তুমি কি শোনোনি যে আমি একুশবার ক্ষত্রিয় জাতির নাম বিলুপ্ত করেছি!”

লক্ষণ বললেন- “আপনিও রঘু বংশের বীরত্ব গাঁথা শোনেননি । আমরা থাকলে আপনি আর একুশ বার ক্ষত্রিয় শূন্য করতে পারতেন না। সমুচিত উত্তর দিতাম। আপনি গর্বে উন্মত্ত হয়ে আমাদিগকে ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু কদাপি আমরা ভীত হবো না।” শুনে পরশুরাম মুনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন- বললেন- “উদ্ধত বালক! আর একটি কথা বললেই ভগবান শিবের প্রদত্ত কুঠার দিয়ে তোমার বলি চড়াবো।” লক্ষণ নিজেও দমবার পাত্র নয়। অতএব তখন ভগবান রাম এসে করজোড়ে বললেন- “মহামুনি! আপনার শ্রী চরণে প্রনাম জানাই। আমি সেই, যে শিব ধনুক ভঙ্গ করেছে।” তখন ভগবান পরশুরাম কিছুটা শান্ত হয়ে বললেন- “হে রামচন্দ্র! ভগবান শিব আমাকে একটি দিব্য ধনুক দিয়েছেন। দেখি তুমি এই ধনুকে জ্যা সংযোগ করো। তবেই বুঝবো।” বলে পরশুরাম তাঁর ধনুক এগিয়ে দিলেন। ভগবান রাম জ্যা পরালেন সেই ধনুকে । পরশুরাম মুনি অবাক হলেন। এরপর একটি তাজ্জব ঘটনা ঘটে গেলো। অকস্মাৎ পরশুরাম দেখেন তাঁর সম্মুখে রামচন্দ্রের স্থানে দাঁড়িয়ে আছেন চতুর্ভুজ ভগবান নারায়ণ । তিনি মৃদু মৃদু হাসছেন । পরশুরাম মুনি করজোড়ে তখন রামচন্দ্রকে প্রনাম করলেন । স্তব স্তুতি করে বললেন- “হে রাম! আপনি আমার দর্প চূর্ণ করেছেন । ক্ষত্রিয় নিধন করতে করতে আমার মনে গর্ব উৎপন্ন হয়েছিলো। আজ আপনি তা চূর্ণ করলেন । আপনি দিব্য শর দ্বারা আমার সকল শক্তি হরণ করুন। এক যুগে একসময়ে দুটি অবতার একত্রে থাকতে পারে না। আমি প্রস্থান করবো।” তখন ভগবান রাম পরশুরামের ধনুক থেকে দিব্য বাণ নিক্ষেপ করে পরশুরামের সকল শক্তি নষ্ট করলেন। এরপর পরশুরাম সকলকে আশীর্বাদ করে প্রসন্ন চিত্তে মহেন্দ্র পর্বতে তপস্যার জন্য প্রস্থান করলেন ।

এরপর বরযাত্রী অযোধ্যায় এলেন। চারপুত্র চার বধূকে এনেছে , সমগ্র অযোধ্যা সেজে উঠলো। রাস্তাগুলি পরিষ্কার করে রংবাহারী মালা, ফুলের মালা দিয়ে সাজানো হল। গৃহগুলির সামনে কদলী বৃক্ষ, প্রদীপ, পুস্পমালা দিয়ে সাজানো হল । এছারা গৃহের আঙ্গিনায় রঙবেরঙ্গের রঙ দিয়ে রঙ্গোলি বানানো হল। বিবিধ আতসবাজিতে আকাশ ঢেকে গেলো। চতুর্দিকে আলোর রোশনাইতে ভরে গেলো। কৌশল্যা দেবী সীতাকে বরণ করে নিলেন, কৈকয়ী মাণ্ডবীকে বরণ করলেন। সুমিত্রা রানী, ঊর্মিলা আর শ্রুতকীর্তিকে বরণ করে নিলেন। বিবিধ উপঢৌকন দেওয়া হল। উপস্থিত রাজণ্য বর্গ বিবিধ অলঙ্কার, আভূষন উপহার দিলেন । দুন্দুভি, ন্যাকরা, বাঁশী, ঢাক, ঢোল, মৃদঙ্গ, কাঁসর বাজতে লাগলো । সকলেই নববধূ দেখতে রাজমহলের দিকে ধাবমান হল । রাম সীতাকে দেখে মনে মনে তাঁরা বলতে লাগলো- “সাক্ষাৎ লক্ষ্মী নারায়ণ এক আসনে বিরাজিতা হয়ে আছেন।” রাজা দশরথ খুশী হয়ে মহাভোজ এর আয়োজন করলেন । সমস্ত রাজ্যে উৎসব । খালি একজন ছিলো অখুশী, সে ছিলো কৈকয়ীর দাসী মন্থরা । সমানে সে কৈকয়ীকে কুবুদ্ধি দিতে লাগলো। কৈকয়ী এসবকে মোটেও পাত্তা দিতো না । বিবাহ কে কেন্দ্র করে রাজা অনেক দান ধ্যান করলেন। এভাবে চার ভ্রাতার বিবাহ সমাপন হল। রাম সীতা আনন্দে থাকতে লাগলেন ।

( আদিকাণ্ড সমাপ্ত )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger