সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা (অযোধ্যাকাণ্ড পর্ব –৯)

দশরথ রাজার অবস্থা বড়ই শোচনীয় । চক্ষু কোটরগত হয়েছে, হস্ত পদের চর্ম সঙ্কুচিত হয়ে যেনো অস্থিসার । দিবারাত্র নিদ্রাহীন হয়ে কেবল “হে রাম! হে রাম” উচ্চারন করছেন । রানী কৌশল্যা ও রানী সুমিত্রা রাজার সেবা করছেন । কৈকয়ীকে দেখলেই মহারাজ ক্ষিপ্ত হয়ে বলছেন- “নাগিনী, বিদায় হও, তোমার ছায়া অবধি আমি দর্শন করতে চাই না। যদি ভরত রাজ্যভার গ্রহণ করে তবে সে আমার পিণ্ড দেবার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।” কৈকয়ী আর কি করেন । চুপচাপ বসে আছেন । আর আক্ষেপ করছেন বিশাল ভুল তিনি করে ফেলেছেন। যার থেকে নিস্তার নেই। কুটিল মন্থরা এসবের জন্য দায়ী। কি কুক্ষণেই না সেই ডাইনীর যুক্তি শুনেছিলাম। সে কর্ণে এমন বিষ ঢেলেছে যার ফল ভোগ করছে গোটা অযোধ্যা । দুর্মতি মন্থরাকে এবার বিদায় করে দিতে হবে । দশরথ রাজা বিকারের জন্য নানা রকম প্রলাপ বকছেন । বৈদ্য, কবিরাজের দেওয়া কোনো ঔষধি আর কাজ করছে না। রাজা বমন করে সব ঔষধ ফেলে দিচ্ছেন । রাজার শরীর একেবারে ভগ্নদশা । কৌশল্যা, রাণী সুমিত্রাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছেন রাজা দশরথ । সমস্ত রাজ্য শোক মগ্ন । শ্মশানের ন্যয় নিস্তদ্ধতা চতুর্দিকে । সন্ধ্যায় কারো বাটিতে দীপ প্রজ্বলিত হল না। সমস্ত নগরী অন্ধকারময় হয়ে থাকলো। নির্জন, নিস্তদ্ধ জনপদে সকলে বিলাপ করতে লাগলো অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে। কেউ কেউ বলল ভরত রাজা হলে সাত পুরুষের ভিটে ছেড়ে অযোধ্যা ছেড়ে অন্য রাজ্যে চলে যাবে। দুর্মতি পাপী মা- বেটার নাম উচ্চারন করলেই মহাপাপ আসে, তাদের রাজ্যে থাকা আরোও বড় পাপ । সাক্ষাৎ লক্ষ্মী দেবী বনে চলে গেছেন। এই রাজ্য অলক্ষ্মী গ্রাস করেছে। এখানে উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি সম্ভব না ।

অসুস্থতার ঘোরে রাজা সমানে প্রলাপ বকছেন । তাঁর সামনে শ্রীরামচন্দ্রের বাল্যকালের সেই মূর্তি ফুটে উঠছে । সমগ্র রাজমহল অন্ধকার। মাঝে মাঝে নিস্তব্ধ বায়ু এসে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সমগ্র রাজমহল জুড়ে । দশরথ দেখছেন রামচন্দ্রের সেই বাল্যরূপ। শিশু রামচন্দ্র। কোমল তাঁর চরণ । তিনি হাঁটি হাঁটি করে বেড়াচ্ছেন । চরণের নূপুর রুনুঝুনু করে বেজে চলছে । যেখানে যেখানে পা রাখছেন সেখানে সেখানে স্তবকে স্তবকে পদ্ম ফুটে উঠছে । মধুর মনোহর রামচন্দ্রের মুখমণ্ডলে ভুবন ভোলানো হাসি শোভা পাচ্ছে, মুক্তার ন্যায় ছোট্ট সদ্য প্রকাশপ্রাপ্ত দন্ত যুগলে ঝিলিক খেলা করছে । আহা কি মনোহর রূপ ! যত সেই মধুর রূপ দেখা যায় ততই আকর্ষণ বৃদ্ধি পায় । রাজা পুত্রকে ক্রোড়ে নিয়ে আদর বাৎসল্য প্রদান করছেন । এসব দেখে রাজা বিকারের ঘোরে মৃদু মৃদু হাসছেন । রাজা বিকারের ঘোরে রামচন্দ্রকে “পুত্র” “পুত্র” বলে আদর করছেন । আবার হঠাত সেই রামচন্দ্রের শিশু রূপ তাঁর সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলো। রাজা প্রলাপ বকছেন- “হে রাম! তুমি কোথায় পুত্র? হে রাম শীঘ্র এসো। তোমার পিতার নিকটে এসো।” রানী দ্বয় নিজেরাও শোক মগ্ন। তারা বুঝতেই পারছেন কি ঘটতে চলেছে। বৈদ্য, কবিরাজেরা জবাব দিয়ে গেছেন । রাজার এরকমই অবস্থা। কৈকয়ী নিজেও শোকে নিজের গৃহে ঢুকে দ্বার রুদ্ধ করেছিলেন। সমগ্র রাজ্যে কেবল মন্থরাই খুশী হয়েছিলো । রাজা কেবল রোগের ঘোরে রামচন্দ্রকেই দেখে যাচ্ছেন । সেই ভুবন ভোলানো রূপ, সেই মনোহর রূপধারী কোটি কন্দর্পের থেকেও অতি সুন্দর রামচন্দ্র । মুনি ঋষি গণ , জ্ঞানীরা রামচন্দ্রকে ভগবান বলেন । সত্যি কি তাই! রাজা দশরথ ভাবছেন তাঁর পুত্র সত্যি ভগবান! হবেই তো। এত রূপ, গুণ, ন্যায়- নীতির বাহক মানব তো হতে পারে না । সে নিশ্চয়ই ভগবান ! আবার ভাবলেন ভগবান হলেও রাম তাঁর পুত্র । পুত্রহারা হতে কোন পিতা চায়? কাশ যদি রামের ক্রোড়ে মস্তক রেখে স্বর্গ যাত্রা করতে পেতাম ।

দশরথ রাজা দেখলেন অনেক কিছু । দেখলেন তাঁর নিক্ষেপিত শরে এক মুনি বালক শায়িত, যন্ত্রনায় কাতর । আহা! কার বা পুত্র। নিকটে জল ভরছিল । কেনই বা শর নিক্ষেপ করলাম । ফুটফুটে মুনি কুমারের নরম বুকে তীক্ষ্ণ শর বিঁধে আছে । সেই গৌর বর্ণের বালকের বুক ভেসে যাচ্ছে রুধির ধারায়। খেলার বয়স সেই মুনি কুমারের, আর সে কিনা এখন মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করছে। আমায় ক্ষমা কর মুনি কুমার! আহা কি সুন্দর কুমার। হঠাত দেখলেন সেই বালকের পিতা শাপ দিচ্ছেন- “রাজন! তুমিও এভাবে পুত্রশোকের যন্ত্রনা ভোগ করে দেহ রাখবে। দেখো আমরা কিরকম যন্ত্রনা ভোগ করেছি। দেখো এই বেদনা কতটা অসহনীয় । কত নিষ্ঠুর নিয়তি। তোমার আমার অবস্থা এক । তুমি চক্রবর্তী রাজা, আমি বনের ভিখারী। কিন্তু শোক রাজা বা ভিখারী কাউকে রেহাই দেয় না।” রাজা সেই অবস্থায় বললেন- “কৌশল্যা, বহু পূর্বে আমি মৃগ ভ্রমে শ্রবণ কুমার নামক এক মুনি পুত্রকে বধ করেছিলাম অজান্তে। তাঁর পিতা অন্ধমুনি আমাকে অভিশাপ প্রদান করেন আমারও এমন পুত্র শোকে প্রাণ যাবে। বোধ হয় সেইক্ষন উপস্থিত।” রাজার কথা শুনে রানীরা ভয় পেলো। তাঁরা ক্রন্দন করতে লাগলো । রাজা “হে রাম!” উচ্চারন করতে লাগলেন। শুনতে পেলেন সেই মুনির কঠোর অভিশাপ বানী- “তোমারও এইরূপ পুত্রশোকে প্রাণ যাবে।” রাজা অন্তিমে দেখলেন ভগবান নারায়ণের সেই অনিন্দ্যকান্তি চতুর্ভুজ রূপ। তিনি মস্তকের সামনে জ্যোতির্ময় রূপে প্রকট হয়ে রাজার মস্তকে পদ্মপুস্প দিয়ে বলছেন- “পিতা! এই তো আমি। আপনি আমাকেই ডাকছিলেন, আমি আপনার নিকটে।” দশরথ রাজা অস্ফুট স্মরে বলতে লাগলেন- “প্রভু তুমি এসেছো। কিন্তু তুমি তো ভগবান । কোথায় আমার সেই রাম ?” তখন ভগবান হরি দ্বিভুজ নবদূর্বাদলশ্যাম রাম মূর্তি ধরে বললেন- “এই তো পিতা। আমি কোথাও যাইনি। আমি আপনার পাশেই আছি।” দশরথ রাজা বললেন- “হে ভগবান। তুমি এসেছো। তবে কেন আমাকে এমন শোক দিলে। পুত্র রাম তুমি এখানেই থাকো।” হঠাত সেই মূর্তি অদৃশ্য হল। রাজা তখন “কোথায় রাম”, “কোথায় রাম” বলতে লাগলেন । অকস্মাৎ একটা দমকা হাওয়াতে প্রদীপ নির্বাপণ হল। রাজাও “রাম”, “রাম” বলতে বলতে দেহ রাখলেন । শোক সাগরে নিমজ্জিত হল সকলে।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger