সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা (অযোধ্যাকাণ্ড পর্ব –৭)

ভগবান রাম, লক্ষণ ও মাতা সীতাদেবী যখন রাজভবন ছেড়ে সন্ন্যাসীর বেশে বাহিরে আসলেন তখন যেনো মুহূর্তের জন্য এই পৃথিবী, বাতাস, আলো স্তব্ধ হয়ে গেলো। সকলের ওপর যেনো বজ্রাঘাত হল। কি অযোধ্যার নগরীর নাগরিক, কি সেনা, কি মুনি ঋষি ব্রাহ্মণ, কি পথের ভিখারী সকলেই অত্যন্ত শোকাচ্ছন্ন হল। অযোধ্যার গাছ গুলিও যেনো পুস্প গুলিকে অদৃশ্য করেছিলো। যে অযোধ্যা নগরীর রাজপথে বৃক্ষ গুলিতে হরেক রকম বৃহঙ্গ মধুর ডাকে ভরিয়ে তুলতো- আজ যেনো তাদের স্মর গুলি প্রকৃতিদেবী হরণ করে নিয়েছিলেন । সকলে গভীর শোকে লিপ্ত । কৈকয়ী- ভরতকে গালাগালি ছাড়া অপর কিছুই শোনা গেলো না । সকলে বলল- “হে রাম! তুমি বনে যেয়ো না। তুমি আমাদের আত্মার আত্মা। আত্মা ভিন্ন এই দেহ মূল্যহীন। তোমার বিহনে সেরূপ আমরাও কিছুই না। এই শোক আমাদের সহনীয় হচ্ছে না।” ভগবান রাম অনেক বোঝালেন। ধীরে ধীরে তিনজনে রথে উঠলেন। সকলকে বিদায়ী প্রনাম জানালেন । সুমন্ত্র সারথি রথ চালাবেন। কিন্তু রথ কিভাবে নেবেন ? কাতারে কাতারে লোক রথ ঘীরে রেখেছে। কেউ কেউ রথের চাকার তলায় শয়ন করেছে। কেউ অশ্বের লাগাম ধরে রেখেছে। কী রথের পেছনে টেনে ধরে রেখেছে। আবালবৃদ্ধ রমণী সকলেই সেখানে। লক্ষ লক্ষ লোকের ভির। এমনকি টানা রোদ্রেও তারা দাঁড়িয়ে আছে । অযোধ্যার সেনাদের এই ভীর সড়াতে আদেশ দিলে তাঁরাও নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে। বলল- “এই আদেশ মানবো না। এতে যদি পরবর্তী ভরত রাজা ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের তাঁড়িয়ে দেন, তবে ভিক্ষা করে খাবো। তবুও রামচন্দ্রকে যেতে দেবো না।” এত লোকের ভালোবাসা দেখে রাম, লক্ষণ, সীতাদেবীর চোখে জল এসে গেলো ।

তখন রামচন্দ্র উঠে বুঝিয়ে বললেন- “আমি জানি আপনারা আমাকে কত স্নেহ করেন। কিন্তু আজ যদি আমি বনে গমন না করি তবে শপথ ভঙ্গের দায়ে আমার অমর্যাদা হবে। আপনারা কি চান আপনাদের এত স্নেহের রামচন্দ্রের নাম কালিমালিপ্ত হোক? আপনারা পথ ছেড়ে দিন। কথা দিচ্ছি চতুর্দশ বৎসর সমাপনে সেই দিন আমি অযোধ্যায় এসে আপনাদের সান্নিধ্য লাভ করবো।” প্রজারা বলল- “তবে আমরাও আপনার সাথে অরণ্যে যাবো। এই পাপী ভরতের রাজ্যে আমরা আর থাকতে চাই না। বণে গিয়ে আপনার সাথে কুটিরেই থাকবো। তবুও পাপিষ্ঠা কৈকয়ীর মুখদর্শন করবো না। মা আর বেটা মিলে এখানে একাই রাজত্ব করুক।” ভগবান রাম অনেক বোঝালেন। প্রজারা শুনলো না। রথ মুক্ত করলো ঠিকই কিন্তু রথের পেছন পেছন ক্রন্দন করতে করতে চলল। এই দৃশ্য দেখলে অবাক হতে হয়। আগে আগে রামচন্দ্রের রথ যাচ্ছে, পেছনে পেছনে লক্ষ লোকের সারি । দশরথ রাজা আক্ষেপ করছেন মহলে । ক্রন্দন করে বারে বারে বলছেন- “আমি হতভাগা পিতা। যে নিজ পুত্রের কপাল থেকে সকল সুখ কেড়ে তাঁকে ঘোর দুর্দিনে প্রেরন করেছে। আমি অতি মূর্খ । আমি নিষ্ঠুর পিতা। হে রাম। তুমি বনে গমন করো না।” শোকে অস্থির হয়ে রাজা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন, জ্ঞান ফিরতেই ‘রাম’, ‘রাম’ বলে রোদন করছেন । শোকে অস্থির রাজাকে সামলানো মুস্কিল হচ্ছে । অপরদিকে রামচন্দ্র তিনদিন চলার পড়ে অযোধ্যার শেষ সীমান্তে এলেন । ওপার থেকে শৃঙ্গবেরপুর রাজ্য শুরু। ওখানে রামচন্দ্রের মিত্র গুহক নিষাদদের রাজা । রামচন্দ্র রথ থেকে নেমে অযোধ্যার মাটি তুলে বস্ত্রে বেঁধে বললেন- “মাতঃ অযোধ্যা! তুমি আমার মাতৃভূমি। তোমার কোলেই আমার জন্ম, আমার শিক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। আমি তোমার এই পবিত্র মৃত্তিকা দ্বারা রোজ তিলক রচনা করবো। আর মনে করবো আমি তোমারই স্নেহ ছায়াতলে আছি । ”

এখানে তিনি অযোধ্যার লোকদের আদেশ দিলেন – “হে অযোধ্যার নারীপুরুষ বৃন্দ। আপনারা এখন অযোধ্যা ফিরে যান ।” রামচন্দ্র কেন ‘হে অযোধ্যার নারীপুরুষ বৃন্দ’ বলে সম্বোধন করলেন অযোধ্যার নাগরিক দের তার একটি কারণ আছে। এটি পড়ে বলা হবে। যখন রামচন্দ্র অযোধ্যায় ফিরবেন- সেই প্রসঙ্গে। আপাতত সেই প্রসঙ্গে আলোচনা করছি না । রাত হয়ে যাওয়াতে সেখানেই বিশ্রাম করা হল। পরদিন রাত থাকতেই রাম, লক্ষণ, সীতা দেবী উঠে সুমন্ত্র কে ডেকে তুলে রথে চড়ে চলে গেলেন। কারন দিবসের আলোকে লোকেরা উঠে পড়লে হয়তো তারা আর যেতে দেবে না, বা তারাও চলবে বণে। সূর্যের আলো ফুটতেই সকলে উঠে হায় হায় করতে লাগলো। নিজেরা নিজেদের নিদ্রাকে গালাগালি দিয়ে বলতে লাগলো- “যমের ঘুম। আমাদের সত্যি শোক সাগরে ফেলে গেলো। যদি এই ঘুম না আসতো, বা চোখ মেলে কষ্ট করে রইতাম।” যাই হোক রামচন্দ্রের আদেশ মেনে অযোধ্যার নারী পুরুষেরা চলে গেলো অযোধ্যায় । রামচন্দ্র সস্ত্রীক, ভ্রাতা সহিত নিষাদ রাজ্যে এলেন । নিষাদ রাজ গুহক ছুটে এলেন তাঁর পরম মিত্র এসেছেন দেখে। নিষাদ আদিবাসী বন্ধুকে রামচন্দ্র প্রীতি পূর্বক আলিঙ্গন করলেন । সনাতন বৈদিক ধর্মে জাতপাত ভঙ্গ করেছিলেন স্বয়ং ভগবান । ভগবানের আবির্ভাবের মূল উদ্দেশ্য সমাজের কুসংস্কার গুলি দূরীকরণ । ছোট জাত বলে নিষাদ, আদিবাসীদের ঘেন্না করতেন উচ্চ স্তরেরা । রামচন্দ্র এমন করেন নি। আসলে এই সব যুগান্তকারী পরিবর্তন বা বিপ্লব আনতে পারেন কেবল ভগবানের অবতার । ভগবান কেবল লীলা, অসুর বধ করতেই আসেন না। চলে আসা ভঙ্গুর নিয়ম গুলিও পরিবর্তন করেন । ভগবানের প্রেরিত দূতেরাও সেই কাজ করেন । তবে সেটা কিন্তু আমি আপনি পারবো না । মহাপ্রভু, স্বামী বিবেকানন্দ যে পথ দেখিয়েছেন আমরা সেই পথে চলতে পারি। কিন্তু আমরা যদি নিজেরা নিজেদের মহাপ্রভু, স্বামী বিবেকানন্দ ভেবে সেই নিয়ম গুলি পরিবর্তন করতে চাই, তাহলে সেটা হাস্যকর ও ব্যর্থতা আসবে। আমরা কেবল তাঁদের দেখানো পথ অবলম্বন করে সেই পথে চলতে পারি ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger