সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( অরণ্যকাণ্ড পর্ব- ৪ )

ভগবান রাম এরপর গোদাবরী তীরে রম্য অরণ্যে প্রবেশ করলেন। এখানে তিনি অনেক প্রকার সাধু, সন্ন্যাসীর দর্শন পেলেন । জায়গাটিতে অনেক মৃগ, ময়ূর, বিচিত্র রঙ্গবাহারী পক্ষী অবস্থান করে মধুময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলো। এমন জায়গাতে রাম, সীতা দেবী, লক্ষণ কোথাও চার পাঁচ মাস, কোথাও আবার দশ মাস কাটালেন । সাধু, সন্ন্যাসীদের কাছে দিব্য আধ্যাত্মিক কথা শুনলেন। ভগবান সবই জানেন, কারণ তাঁকে কেন্দ্র করেই শাস্ত্র, তিনি কেবল মানব দেহে অবতার নেওয়ার সকল কর্তব্য পালন করছিলেন। মুনি, ঋষি গন আধ্যাত্মিক শাস্ত্রীয় জ্ঞান প্রদান করবার সময় ভেবেছিলেন তাঁরা সকল শাস্ত্রে বর্ণিত সেই বিরাটপুরুষ কেই জ্ঞান দিচ্ছেন, পাছে অপরাধ না হয় এই ভয়ে ভীত ছিলেন । এখানে মুনি ঋষি গণ কেউ বছর ব্যাপী উপবাসী, কেউ কেবল কুম্ভক প্রাণায়ামে বায়ু সেবন, কেউ কেবল ফলমূল সেবন, কেউ কেবল পত্র সেবন করে তপস্যা করছিলেন। কাহারো মস্তকে জটা সমগ্র সর্পিল সর্পের ন্যায় মস্তক থেকে ঝুলছে, কাহারো আবার হস্ত পদের নখ বিশালাকৃতি হয়েছে, কেউ আবার এক পায়ে ভর দিয়ে ঊর্ধ্বমুখে ভগবানকে ডাকছেন, কেউ কেবল বাকল ধারণ করে বৃক্ষের কোটরে অবস্থান করছেন। চতুর্দিকে পাখপাখালীর মধুর কলরবে কেবল বৈদিক মন্ত্রের ছন্দ মানানসই ভাবে প্রবাহিত হচ্ছিল্ল। কেবল সুখ আর শান্তি। সংসারের কুটিলতা, নগরের কোলাহল , হৈচৈ থেকে অনেক দূরে এই রম্য বণ আপন একটা ছন্দ বানিয়ে নিয়েছিলো। এই ছন্দকে বারংবার বিনষ্ট করছিলো রাবণের আশ্রিত রাক্ষসেরা। মুনি, ঋষিরা ভগবান রামচন্দ্রকে দেখে প্রীত ও প্রসন্ন হলেন। ভাবলেন তাঁহাদের তপস্যার ফল সার্থক হয়েছে। যে ভগবানের দর্শনের জন্য এত কৃচ্ছতা পালন করছিলেন- তা আজ সম্পূর্ণতা প্রাপ্তি করলো। সকল কিছুই ভগবানের চরণে সমর্পণ করলেন। এরপর রাবণের রাক্ষস কূলের অত্যাচারের বিবরণ করলেন ।

শুনে রামচন্দ্র বললেন- “এখুনি আমি এই রাক্ষস দিগের বিনাশ করবো।” সীতাদেবী বললেন- “প্রভু! এস্থানে অনেক অবলা আর নীরিহ জীব বসবাস করে, আপনি যখন রাক্ষস দিগের সাথে যুদ্ধ করবেন তখন মাঝে থেকে তাদের প্রাণ নাশ হবে। অতএব এইস্থানে আপনি রাক্ষস দিগকে যুদ্ধে আহ্বান জানাবেন না।” ভগবান রামচন্দ্র তখন সীতাদেবীর প্রস্তাব মেনে নিলেন। মুনি গণ বললেন- “হে রামচন্দ্র! এই স্থানেই মহর্ষি অগস্ত্যের শিষ্য সুতীক্ষ্ণ মুনি বসবাস করেন। সে আপনার একান্ত ভক্ত। দয়া পূর্বক আপনি তাঁর আশ্রমে অবশ্যই যাবেন।” ভগবান রামচন্দ্র, সীতাদেবী ও লক্ষণ সেই সুতীক্ষ্ণ মুনির আশ্রমে গেলেন। সুতীক্ষ্ণ মুনি যেনো নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। একবার ভাবলেন এই সকল স্বপ্ন কিনা! পড়ে ভাবলেন স্বপ্নেও রঘুপতির দর্শন অত্যন্ত উচ্চ ব্যাপার। স্বয়ং রঘুপতি কৃপা না করলে এই রকম সৌভাগ্য হবে না। রামচন্দ্রের দর্শন কি ভাবে পেলেন? তিনি তো এত ভক্তসঙ্গ, শাস্ত্রপাঠ করেন নি। এসকল কিভাবে সম্ভব হল? সাক্ষাৎ হরির দর্শন কিভাবে তিনি পেলেন? পড়ে ভাবলেন এসকল প্রভুর অহৈতুকী কৃপা। যার ফলেই এই দর্শন সম্ভব। ভগবান রাম, সীতাদেবী ও লক্ষণ এসে মুনি সুতীক্ষ্ণ কে প্রণাম জানালেন। সুতীক্ষ্ণ মুনি করজোড়ে ভগবান রামচন্দ্রকে প্রনাম জানালেন। ভক্তিভাবে তার অশ্রু জল নির্গত হল। সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে পনসের মতো হচ্ছিল্ল। ভাবে গদ গদ হয়ে মুখের বোল স্ফুরন হচ্ছিল্ল না। অনবরত ক্রন্দন করেই যাছিল্ল। তখন ভগবান রাম মৃদু হেসে খালি সেই মুনি সুতীক্ষ্ণ কে চতুর্ভুজ নারায়ণ মূর্তিতে দর্শন দিয়ে পুনঃ রাম রূপে আসলেন । মুনি ক্রন্দন করতে লাগলেন । বাক্য স্ফুরিত হল। বললেন- “হে রঘুনন্দন ! হে পুরুষোত্তম ! আপনার এই পবিত্র স্বরূপ দর্শনে আমি কৃতার্থ। হে মহাপ্রভু ! আমি কিরূপে আপনার স্তব করবো। আমার বাক্য সকল লুপ্ত হয়েছে। মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে আপনার এই দিব্য স্বরূপ দর্শন করতে চাই। হে দয়াময়, আপনার চরণেই সকল তীর্থ। আপনার চরণেই সকল শাস্ত্র। আপনি যেখানে চরণ স্থাপন করেন সেইখানেই অমরাবতী সৃষ্টি হয়। হে করুণাময় ভগবান। আপনার এই ভক্ত সদা সর্বদা হৃদয়ে কেবল আপনাকেই দর্শন করতে চায়।”

অতঃ মুনি সুতীক্ষ্ণ রাম নাম কীর্তন করে ভগবানের সম্মুখে প্রেমে মত্ত হয়ে নৃত্য করতে লাগলেন। পুস্পাদি দ্বারা অঞ্জলি প্রদান করলেন। মুনির প্রেমাশ্রুতে ভগবানের চরণ সিক্ত হল। ভগবানের বন আগমনের আর একটি কারণ ভক্তসঙ্গ। ভক্তের সঙ্গ স্বয়ং ভগবান নিজেও গ্রহণ করেন, তাই এমন শুদ্ধ ভক্তকে তিনি আপন ধাম বৈকুণ্ঠে স্থান দেন । মুনি ক্রন্দন করে ভাবাবেগে বলতে লাগলেন- “হে মহাবিষ্ণু । আপনি রামচন্দ্র । আপনি অনাদির আদি গোবিন্দ। হে মধুসূদন ! আপনিই মৎস্য অবতারে বেদ উদ্ধার করেছেন, আপনি কূর্ম অবতারে মন্দার পর্বতকে পৃষ্ঠে ধারন করেছিলেন, আপনি মোহিনী অবতারে দেবতাদিগকে অমৃত প্রদান করেছেন। আপনি বরাহ রূপে দৈত্য বধ করে ধরিত্রী দেবীকে উদ্ধার করেছেন। আপনিই স্তম্ভ থেকে নৃসিংহ রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। হে মাধব আপনিই বামন রূপে বলিকে আপনার শ্রীচরণ প্রদান করে ধন্য করেছেন। আপনিই জমদাগ্নিপুত্র পরশুরাম রূপে আবির্ভূত হয়ে ক্ষত্রিয় দিগের উৎপীড়ন হতে ব্রাহ্মণ দিগকে রক্ষা করেছেন। আপনি এখন রাম রূপে। হে শেষনাগশয্যাশায়ী ভগবান বাসুদেব! আমি অধম মূর্খ! বড় বড় যোগীগণ আপনার বন্দনা করে শেষ করতে পারেন না। আপনি সেই বেদে বর্ণিত ব্রহ্ম । হে ভগবান রাম, আপনি মাতা সীতা সহিত, ভ্রাতা লক্ষণ সহিত আমার হৃদয়ে অবস্থান করুন। হে ভগবান আমার ত্রুটি সকল মার্জনা করুন।” এইভাবে মুনি স্তবস্তুতি করলেন। ভগবান তাঁর ভক্তকে আলিঙ্গন করে আশীর্বাদ করলেন। সেই দিন তাঁরা তিন জন , ভক্তের আলয়ে কাটালেন। পরদিন সুতীক্ষ্ণ মুনি ভগবান রাম, দেবী বৈদেহী ও লক্ষণ কে গুরু অগস্ত্যের আশ্রমে নিয়ে গেলেন। পথে যেতে যেতে শোনাতে লাগলেন ইল্বল ও বাতাপি নামক দুই রাক্ষসের কথা ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger