সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( অরণ্যকাণ্ড পর্ব- ৩ )

বিরাধ রাক্ষস বধ হতেই সেই ভয়ানক বন আবার সুন্দর হয়ে উঠলো। মুনি, ঋষিদের আশ্রম গুলিতে নিত্য যাগ, যজ্ঞ, তপ আদি ধার্মিক ক্রিয়াকাণ্ড হতে লাগলো। বনবাসীরা আনন্দে বনে বাস করতে লাগলেন। ভগবান রামের বন্দনায় চতুর্দিক ভরে গেলো । রাবণের ভ্রাতা খড় ও দূষণ এই সংবাদ পেয়েছিলো। তারা অবাক হল বিরাধের মতো শক্তিশালী রাক্ষসকে কে বধ করলো।তারা গুপ্তচর প্রেরণ করলো। রাক্ষসেরা মায়া দ্বারা মানব রূপ নিয়ে রামচন্দ্রের অন্বেষণ করতে লাগলো । একদিনের কথা এই তপোবনেই শরভঙ্গ মুনি বাস করেন । মহামুনি একদিন যখন ধার্মিক ক্রিয়ায় মগ্ন তখন দেবরাজ ইন্দ্রদেবতা প্রকট হলেন । মহর্ষি শরভঙ্গ ইন্দ্রদেবতার বন্দনা স্তবস্তুতি করলেন। মহেন্দ্র জানালেন- “হে মুনিবর ! স্বয়ং বিষ্ণুবতার ভগবান রাম সস্ত্রীক ও ভ্রাতা লক্ষণ সহিত আপনার আশ্রমে আসছেন । আপনি বিদিত হয়েছেন ভগবান বিষ্ণু রাক্ষসরাজ দশাননকে বিনাশ করবার জন্যই এই অবতার গ্রহণ করেছেন । প্রজাপতি ব্রহ্মার নির্দেশে আমি আপনাকে ভগবান বিষ্ণুর শার্ঙ্গ ধনুক ও দিব্যাস্ত্র প্রদান করতে এসেছি। আপনি এই সকল ভগবান রামচন্দ্রের হস্তে সমর্পণ করবেন।” এই বলে ইন্দ্রদেবতা শার্ঙ্গ ধনুক ও দিব্যাস্ত্র সকল মুনির হস্তে দিয়ে বিদায় হলেন । বনের প্রাকৃতিক শোভা দর্শন করতে করতে ভগবান রাম, লক্ষণ ও সীতা আসছিলেন । আকাশের মেঘগুলি প্রখড় রোদ্রকিরণ থেকে বাঁচতে তাহাদিগের ওপরে ছত্রের ন্যায় তাঁহাদের সঙ্গেই গমন করছিলো । ভগবানের যাতে কোনরূপ কষ্ট না হয় সেই কারনে প্রকৃতিদেবী বৃক্ষের কোমল পুস্প পথের ওপর বিছিয়ে দিয়েছিলেন। ফুলের মিষ্ট গন্ধ প্রবাহিত করে পবন দেবতা সেই সুবাস রাম, সীতাদেবী ও লক্ষণের নাসিকায় পৌছে দিচ্ছিল্লেন।

বনের মধ্যে সুরবৃন্দ এইভাবে স্বর্গীয় সুষমা বিস্তার করেছিলেন । এই মধুর পরিবেশ দেখে তিন জনেই প্রীত হলেন। সীতাদেবী ফুলের মাল্য রচনা করে ভগবান রামচন্দ্রের কণ্ঠে পড়িয়ে দিচ্ছিল্লেন। ভগবান রামের সেই পবিত্র তনুর স্পর্শে পুস্পগুলির সৌরভ ও সৌন্দর্য সর্বাত্মক প্রকাশিত হল । পক্ষী কুল নানান রবে সুন্দর মিষ্টি সুর উৎপন্ন করে চারপাশ ভরিয়ে দিয়েছিলেন । কণ্টক বৃক্ষ গুলি তাহাদের সকল কণ্টক সৃষ্টির নিয়ম উলঙ্ঘন করে লুক্কায়িত করেছিলো- যাতে প্রভুর শ্রীঅঙ্গে আঘাত করবার পাপ না গ্রহণ করতে হয়। শরভঙ্গ মুনি পথ চেয়েছিলেন কখন তাঁর আরাধ্যদেবতা এই পথে আসবেন । আশ্রমে আসবার পথ তিনি নিজেই সযত্নে পুস্প মাল্য দ্বারা সজ্জিত করেছিলেন। সেই পুস্পশোভিত কোমোল পথে যখন ভগবানের কমলসম চরণ পতিত হল- যেনো প্রকৃতি আনন্দের লহরী প্রবাহিত করলো। পুস্পগুলি ঝড়ে পড়তে লাগলো ভগবানের যাত্রাপথে। পদ্ম ফুটলে যেমন অলিকুল ধাবমান হয়, ঠিক তেমনি পুস্পগুলি বাতাসে ভগবান রামের দিকে ধাবমান হল। শরভঙ্গ মুনিকে ভগবান রাম, মাতা সীতা ও লক্ষণ প্রণাম জানালেন। মুনির চোখ বেয়ে অবিরত অশ্রুধারা নির্গত হচ্ছে। আহা! কি রূপ ভগবানের। এঁনারই জন্যই তো এত তপস্যা, এত জপ, এত আরাধনা, এত কৃচ্ছ সাধন, এত যাগ যজ্ঞ। সেই সকল মঙ্গল মঙ্গলের অধিনায়ক ভগবান এসেছেন। মুনির বাক রুদ্ধ হয়ে অবিরত ধারায় অশ্রুজলে সর্বাঙ্গ সিক্ত হল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল- “হে জনার্দন! হে মাধব! আপনি এসেছেন। হে দয়াময় তোমাকে কিভাবে স্তব করবো? তুমি ভক্তের প্রতি এতই প্রীত যে ভক্তের সম্মানের জন্য তুমি প্রণাম জানালে। হে ভগবান! ত্রিলোকে সকলে আপনাকে স্তবস্তুতি করে অবিরত নমস্কার প্রনাম করে। হে রঘুনাথ ! চার বেদ তোমার মহিমা বর্ণনা করেও সমাপন করতে পারে না। পঞ্চমুখে শিব ও চতুর্মুখে পদ্মযোনি ব্রহ্মা, গজারূঢ় দেবেন্দ্র তোমারই মহিমা কীর্তন করেন। আমি কি পুণ্য করেছি জানি না, তবে তোমার অশেষ দয়াতে তোমার দিব্য স্বরূপ দর্শন লাভ করেছি।”

এইভাবে মুনি ভগবান রামের স্তবস্তুতি করে ভগবতী সীতা দেবী ও লক্ষণ ঠাকুরের স্তবস্তুতি করলেন । ভগবান রামের চরণ অভিষেক করলেন । মুনির সেই ভক্তির সেবা, চন্দনের তিলক, বন পুস্প প্রদানে ভগবান রাম অতীব প্রসন্ন হলেন । মুনির বারংবার বাক রুদ্ধ হল। অবিরত অশ্রুধারা নির্গত হল। “রাম” নাম উচ্চারন করে কীর্তন নৃত্য করতে লাগলেন । নিজেকে ধন্য মনে করলেন , কারণ ভগবানের দর্শন অতীব দুর্লভ। সেই ভগবান আজ আশ্রমে। আহা! কত জন্মের তপস্যার ফল। এরপর শরভঙ্গ মুনি ভগবান রামকে দেবেন্দ্র দ্বারা প্রদত্ত শার্ঙ্গ ধনুক ও দিব্যাস্ত্র দিয়ে বললেন- “হে মহাপ্রভু! দেবেন্দ্র আপনাকে এই সকল প্রদান করতে আজ্ঞা দিয়েছেন। আপনি এই সকল গ্রহণ করুন। রাক্ষস বিনাশ সময়ে এইগুলি প্রয়োগ করবেন।” ভগবান রাম প্রসন্ন হয়ে সেই অস্ত্র সকল গ্রহণ করে বললেন- “হে মহামুনি! আপনি আমার ভক্ত। বর প্রার্থনা করুন।” ভগবান রামের মনে এই সময় ভগবৎ সত্তার পূর্ণ বিকাশ হয়েছিলো। মুনি বললেন- “হে ভগবান! আপনার দর্শন লাভ করে যে অপর কিছু প্রার্থনা করে সে নির্বোধ ও মূর্খ। আপনার দর্শনই সর্বাপেক্ষা উত্তম বর। যদি আমাকে দিতে হয় এই আশীর্বাদ করুন যেনো আমার হৃদয়ে আপনি , দেবী সীতা ও লক্ষণ সহিত বিরাজিত থাকেন।” ভগবান রাম তাই বর দিলেন। এরপর মহর্ষি শরভঙ্গ যোগাগ্নি তে আত্মাহুতি দিয়ে ভগবানের শাশ্বত ধাম প্রাপ্তি করলেন। এখানে অনেকে বলবেন যে মুনি এত জ্ঞানী হয়ে আত্মহত্যা কেন করলেন ? প্রথমতঃ যোগবলে যোগীরা যখন প্রাণত্যাগ করেন তখন সেটা আত্মহত্যা বলে না। আত্মহত্যা আর যোগের মাধ্যমে দেহ ত্যাগ এক ব্যাপার না । আত্মহত্যা যে করে সে প্রেতযোনি প্রাপ্ত করে শতবর্ষ ব্যাপী যাতনা ভোগ করে। সেই জন্য আত্মহত্যাকে মহাপাপ বলা হয়। যে ভগবানের প্রদত্ত জীবন নিজেই নষ্ট করে সে মহাপাপী। আর যোগ একধরনের সাধনা। যোগের দ্বারা কুণ্ডলিনী জাগরিত হয়, তখন যোগীরা এই শক্তির অধিকার হন। যোগীরা কদাপি রেলের তলায়, গলায় দড়ি দিয়ে কিংবা গায়ে কেরোসিন ঢেলে বা বিষ খেয়ে দেহ রাখেন না। তারা এই যোগশক্তির অবলম্বনে দেহ রাখেন । প্রয়োগ, হরিদ্বার, কাশীতে এখনও এমন যোগীর কথা শোনা যায় যারা এমন যোগের দ্বারা কাল পূর্ণ হলে দেহ রাখেন । আর ভগবান প্রাপ্তির মানব জীবনের চরম উদ্দেশ্য। সুতরাং ইষ্টদেবতার দর্শন পেয়েই মহর্ষি শরভঙ্গ যোগ বলে দেহ রেখেছিলেন।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger