সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( অরণ্যকাণ্ড পর্ব- ১ )



ভয়হর মঙ্গল দশরথ রাম ।
জয় জয় মঙ্গল সীতা রাম ।।
মঙ্গলকর জয় মঙ্গল রাম ।
সঙ্গতশুভবিভবোদয় রাম ।।
আনন্দামৃতবর্ষক রাম ।
আশ্রিতবৎসল জয় জয় রাম ।।
রঘুপতি রাঘব রাজা রাম ।
পতিতপাবন সীতা রাম ।।

চিত্রকূট পর্বতে রাম, লক্ষণ, সীতা দেবী আনন্দে দিন যাপন করছিলেন । চারপাশে বনের প্রাকৃতিক শোভা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন ভগবান রামচন্দ্র ও সীতাদেবী। কিছুকাল পড়ে দেখলেন সেখান থেকে মুনি, ঋষি আর বনবাসী সকল পলায়ন করছে। সকলের মুখমণ্ডল আতঙ্কগ্রস্ত । কোন একটা ভয় তাদের তাড়া করছে। আশ্রম গুলি অধিকাংশই পরিত্যক্ত । বাকী আশ্রম গুলি ছেড়ে তপস্যা ছেড়ে মুনি, সন্ত গণ পলায়ন করছিলেন । আশ্রম গুলি জরাজীর্ণ হল। যজ্ঞবেদী নানা বুনো ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেলো। তুলসী মঞ্চে আর তুলসী দেবী শোভা পেলেন না। বুনো লতাপাতায় আচ্ছাদিত হল তুলসী মঞ্চ । একদিন ভগবান রাম, লক্ষণ সেই পলায়ন রত মুনি ঋষি বনবাসীদের জিজ্ঞাসা করলেন- “আপনারা এই সুন্দর রম্য অরণ্য কেন পরিত্যাগ করছেন ? কেনই বা আপনারা ভয়গ্রস্ত হয়েছেন? কি উদ্দেশ্যে আপনারা এই জঙ্গল ছেড়ে প্রস্থান করছেন?” ভগবান রাম অত্যন্ত বিনয় সহকারে মুনি ঋষি দিগকে প্রনাম জানিয়ে বললেন- “হে মহাত্মাজন ! আপনারা বেদান্তিক শাস্ত্রজ্ঞ। আপনাদের ধর্ম সমগ্র জাতিকে আধ্যাত্মিক দিব্য জ্ঞান প্রদান করা। বিধাতা এই কারনেই আপনা দিগকে শাস্ত্রীয় জ্ঞান প্রদান করেছেন। তথাপি আপনারা সকলে আশ্রম ছেড়ে কেনই বা পলায়ন করছেন? কে আপনাদের ভয় প্রদর্শন করলো ?” মুনি গণ বললেন- “আমরা শঙ্কিত । রাক্ষস দিগের মাত্রছাড়া তাণ্ডবে আমাদের ধর্মাচরণ লুপ্ত হতে বসেছে। দুরাচারী রাক্ষসেরা ধর্ম, পুণ্য স্বীকার করে না। যথেচ্ছ ভাবে তাণ্ডব করে বেড়ায়। আমাদের, কে রক্ষা করবে? তাই আমরা এই স্থান হতে প্রস্থান করতে বাধ্য হচ্ছি। এই রাক্ষসেরা আমাদের বিতারন করছে। রাবণের ভ্রাতা খড়, দূষণ এর রাজত্ব চলে এই স্থানে। উহাদের আদেশে রাক্ষসেরা সকল অন্যায় করে বেড়ায়।”

লক্ষণ বলল- “হে মুনিগণ ! আমার অগ্রজ দাশরথি শ্রীরামচন্দ্র পূর্বে রাক্ষস দলন করে তাড়কা, সুবাহু বধ করেছেন। মারীচকে বিতারিত করেছেন । আমরা তিন কোটি রাক্ষস নিধন করে ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্রের তপোবন রাক্ষসশূণ্য করেছি। আপনারা এভাবে পলায়ন করবেন না। কোথায় সেই খড় আর দূষণ ? আমরা তাহাদিগকে সংহার করে আপনাদের বিপদমুক্ত করবো।” মুনিগণ বললেন- “হে রামচন্দ্র! গোদাবোরী তীরে পঞ্চবটিতে বিরাধ নামক এক রাক্ষস বাস করে। অতীব শক্তিশালী সেই রাক্ষস পঞ্চবটিতে সকল ধর্মাচরণ স্তব্ধ করেছে। নরমাংসভোজী সেই রাক্ষস পূর্বে বহু মুনি, ঋষি ও বনবাসীদের হত্যা করে ভোজন করেছে। আপনি তাহাকে বধ করুন।” মুনি ঋষি বনবাসীরা চলে গেলে রামচন্দ্র লক্ষণ আর সীতাকে বললেন- “আমাদের এখান থেকে প্রস্থান করতে হবে। প্রথম উদ্দেশ্য সেই বিরাধ রাক্ষসের সংহার প্রয়োজন। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ভরত এই স্থান জ্ঞাত হয়েছে। হয়তো তার মন পরিবর্তন হলে সে কোনদিন এসে আমাদের অযোধ্যায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে ইচ্ছা ব্যক্ত করবে। সুতরাং গোদাবোরী পঞ্চবটিতে আমাদিগের যাত্রা করা প্রয়োজন ।” ভগবান রাম অগ্রে, মধ্যে জানকী দেবী অন্তে লক্ষণ চললেন । তত্ত্ব কথাতে শ্রীরাম স্বয়ং পরমব্রহ্ম, সীতাদেবী আদ্যাশক্তির অংশা মহামায়া- মায়া, লক্ষণ জীবাত্মা। মায়া এখানে ব্রহ্মকে আড়াল করে রেখেছেন। তাই মহামায়ার অংশা সীতাদেবী ব্রহ্ম ও জীবাত্মার মধ্যে অধিষ্ঠিত । যাই হোক- ভগবান রাম, লক্ষণ ও সীতাদেবী বনের গভীরে প্রবেশ করলেন। বিবিধ পুস্প বিকশিত হয়েছে। চতুর্দিকে পাখীর কলরব আর মিষ্ট মধুর গন্ধ। ঝর্ণাধারা থেকে অবিরত শীতল জল সশব্দে নদীতে ঝড়ে পড়ছে। শ্রীরামচন্দ্র তথায় বিশ্রাম নিলেন । লক্ষণ ফলমূল সংগ্রহ করতে গেলেন। সীতাদেবী ঝর্ণার জলে নিজ কেশ রাশি সিক্ত করে তা দিয়ে ভগবান রামের চরণ ধৌত করে দিলেন । বিবিধ পুস্প সংগ্রহ করে রামচন্দ্রের চরণে অঞ্জলি দিলেন ।

অতঃ লক্ষণ ফলমূল নিয়ে আসলে তিন জনে সেবা নিলেন। নদীর শীতল জল পান করে পদ্মের মৃনালের সুধা পান করলেন। হরিতকী আমলকী ফল মুখশুদ্ধি রূপে গ্রহণ করে পুনঃ আগে অগ্রসর হলেন । অত্রি মুনির আশ্রম নিকটে। অত্রি মুনির পত্নী অনুসূয়া দেবী ছিলেন মহাসতী । তিনি নিজে সতীত্ব বলে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর কে শিশু বানিয়ে পুত্রভাবে লালন পালন করেছিলেন । পড়ে ত্রিদেব একত্রে অনুসুয়া দেবীর পুত্র রূপে ভগবান দত্তাত্রেয় রূপে ( ত্রিনাথ ) আবির্ভূত হয়েছিলেন । মুনির আশ্রমে গিয়ে রাম লক্ষণ ও সীতাদেবী উপস্থিত হলে মুনি পত্নীসহিত তিনজনকে স্বাগত জানালেন। রাম, লক্ষণ অত্রি মুনির সাথে ধর্ম কথা আলোচনা করছিলেন, অপরদিকে মাতা সীতাদেবী, মুনি পত্নী অনুসূয়া দেবীর সাথে আলোচনা করছিলেন । সীতাদেবীর অলৌকিক জন্মের কথা শুনে অনুসূয়া দেবী অবাক আর আশ্চর্য হলেন । সীতা দেবী প্রশ্ন করলেন- “হে দেবী! আদর্শ নারীর কর্তব্য কি?” অনুসূয়া দেবী বললেন- “হে জানকী! শ্রবন করো। পতির সেবা পত্নীর পরম ধর্ম । পতির চরণেই স্ত্রীর তীর্থ। যে নারী কদাপি পতির সেবা না করে সেই নারী নরকে গমন করে। পতি উপার্জনহীন , রোগগ্রস্ত, রুগ্ন হলেও পত্নীর কর্তব্য স্বামীকে পরমেশ্বর জ্ঞানে সেবা করা। যে নারী স্বামীকে ভুলে পরপুরুষের চিন্তা করে সেই মহাপাতকী নারী শত বৎসর রৌরব কুণ্ডে জ্বালা যন্ত্রনা ভোগ করে। অতএব সদা সর্বদা পতি ভিন্ন অপর পুরুষের চিন্তা বিসর্জন দেওয়াই আদর্শ সহধর্মিণীর কর্তব্য। সর্বদা পতির মঙ্গল কামনা করবে, পতি কে ভোজোন করিয়ে অন্তে নিজে ভোজন করবে। পতির সকল দায়িত্ব সমান ভাগে পতি পত্নীর উভয়ে পালন করা কর্তব্য। এই রূপে যে নারী পতির সেবা করেন- তিনি জগতে মহাসতী নামে খ্যাতা হন। তাঁর সতীত্ব তেজে ত্রিলোক থর থর কম্প হয়। তাকে দেবতারা নমস্কার করেন।” এই রূপে অনুসূয়া দেবী সীতাকে আধ্যাত্মিক বার্তা জ্ঞান প্রদান করলেন। অন্তিমে সীতাদেবীকে নানা সোনার অলঙ্কার দ্বারা সুসজ্জিতা করলেন। সীতাদেবীর বারণ শুনলেন না। অনুসুয়া দেবী বললেন- “এয়োস্ত্রী নারী সর্বদা সাধ্যানুসারে অলঙ্কারাদি ধারন করে থাকবেন। নচেৎ সংসারের অমঙ্গল হয়।”

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger