সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( অরণ্যকাণ্ড পর্ব-৬ )

অগস্ত্য মুনির আশ্রম থেকে বিদায় নিয়ে রাম লক্ষণ ও সীতাদেবী সেই দণ্ডকারণ্য ঘুরে দেখতে লাগলেন। এখানে গভীর জঙ্গল বহুদূর দুরান্ত অবধি বিস্তৃত হয়েছে । চতুর্দিকে কেবল সবুজে আচ্ছদিত বৃক্ষ । আর পবিত্র গোদাবরী নদী । কুলকুল বেগে স্বচ্ছ মিষ্টি জল প্রবাহিত হচ্ছে । নদী যেনো এখানে কথা বলে এমনই । আর দেখলেন সেখানে বহু মুনি ঋষির আশ্রম । সেই শাস্ত্রীয় বিদ্বান মুনি ঋষি সন্ন্যাসী গন এখানে ভগবান প্রাপ্তির জন্য কঠিন সাধনায় মগ্ন। ভগবান রাম, লক্ষণ ও সীতা সেই মুনিদিগকে প্রণাম পূর্বক নানা আলোচনাতে মগ্ন হলেন । এই ফুল, ফল দিয়ে সজ্জিত অরণ্য দেখলে মনে হয় বিধাতা সকল প্রকার শান্তি, আনন্দ দিয়ে এই অরণ্যের সৌন্দর্যকে গেঁথেছেন । মুনি গন বললেন- “হে রাম! এই স্থান যত সুন্দর তত ভয়ানক। হিংস্র পশুর থেকেও এখানে হিংস্র রাক্ষসেরা বাস করেন। তুমি তাড়কা, সুবাহু বধ করে মারীচকে দূর করেছো, বিরাধ বধ করেছো এই সংবাদ অবশ্যই খড় আর দূষণ পেয়েছে। তুমি এখানে জানলে সে নিশ্চুপ থাকবে না।” ভগবান রাম বললেন- “হে মহাত্মাগণ আমি চাই তারা এই সংবাদ পাক। তাদের নিধন করে এই অরণ্য থেকে চিরতরে রাক্ষসদের বিদায় করবো। আপনাদের তখন আর কোন ভয় থাকবে না।” মুনি ঋষিরা বললেন- “আমরা জানি আপনি সেই রাক্ষসদের বধের জন্যই নরদেহ অবলম্বন করেছো। সেই খড় দূষণের সাথে প্রবল শক্তিশালী মায়াবী চতুর্দশ রাক্ষস থাকে। তাদের যথেচ্ছ আক্রমণে আমরা বড়ই বিপদে। আপনি শীঘ্র সেই রাক্ষসদের অন্ত করবেন- ইহা আমরা জানি।” এইভাবে মুনি ঋষিরা রাম লক্ষণ কে দিব্যজ্ঞান এর সাথে সাথে রাক্ষসদের অত্যাচারের ঘটনা সব বর্ণনা করলো । এরপর রামচন্দ্র লক্ষণ কে আদেশ দিলেন- “ভ্রাতা! এইস্থানেই কুটির নির্মাণ করো। আমরা এই স্থানেই থাকবো। এই পঞ্চবটি গোদাবরী খুবুই রম্য অরণ্য। দেবী জানকীও এই স্থানে এসে অত্যাধিক প্রীতা হয়েছেন।”

লক্ষণ ও বনবাসীরা মিলে কুটির নির্মাণের আয়োজন করতে লাগলো। মাটি দিয়ে বেদী বানালো। চতুর্দিকে বাঁশ ও শালের কাণ্ড দ্বারা খুঁটি নির্মিত করা হল । খঁড়, বাঁশ দিয়ে ছাউনি বানিয়ে দেওয়াল ও উপরের আচ্ছাদন নির্মাণ করা হল। বাঁশ দিয়ে জানলা, দরজার কপাট নির্মিত করা হল। এইভাবে সুন্দর কুটির নির্মাণ হল। কুটিরের প্রবেশের মুখে কদলী বৃক্ষ রোপিত করা হল। তুলসী, আমলকী, বিল্ব, হরিতকী , আম্র, দাড়িম্ব ও অনান্য পুস্পের বৃক্ষ কুটিরের চারিদিকে রোপণ করা হল । ভগবান রাম মুনি ঋষিদের দ্বারা গৃহ প্রবেশের পূজাদি সম্পন্ন করলেন। যজ্ঞ করলেন মৃগনাভি, কস্তূরী দ্বারা । এই প্রকারে কুটির নির্মাণ হল । কুটিরে বাঁশ দ্বারা খাঁট, তাঁর ওপরে শুকনো তৃন বিছিয়ে শয্যা স্থাপিত হল। এইখানেই রাম, লক্ষণ, সীতাদেবী বাস করতে লাগলেন। প্রত্যহ রাম ও লক্ষণ জঙ্গলে ফলমূলাদি অন্বেষণে যেতেন । মাতা সীতাদেবী বনবালিকাদের সাথে গোদাবরীতে নাইতে যাইতেন। মৃত্তিকার কলসে জল ভরে আনতেন । বনবালিকাদের সাথে সীতাদেবী ক্রীড়া করতেন । বনবালিকারা নতুন সই পেয়ে অতীব প্রীত হয়েছিলো। তারা উত্তম সুগন্ধি পুস্প, মিষ্ট ফল এনে সীতাদেবীকে উপহার দিতেন । সকলের সাথে মিলে সীতাদেবী সেসকল গ্রহণ করতেন । গৃহে ফিরে ফল মূলাদি ভগবান রাম ও লক্ষণকে প্রদান করে নিজে সেবা নিতেন । সাধু সন্ন্যাসীরা ভিক্ষা চাইতে এলে সীতাদেবী ভিক্ষা দিতেন। সাধু সন্ন্যাসীরা প্রসন্ন চিত্তে ভিক্ষা পেয়ে গমন করতেন । প্রকৃতির সাথে সীতাদেবী একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন । যখন বনে যেতেন দেখতেন বিবিধ রংবেরঙের কারুকার্য শোভিত প্রজাপতি ডানা মেলে প্রকৃতির দেওয়া উপহার পুস্প থেকে পুস্পে উড়ে বেড়াতো। সীতাদেবীকে উজ্জ্বল পুস্প ভেবে ভ্রমে প্রজাপতি কখনো কখনো তাঁর উপর বসতো । মৃগশিশুরা সীতাদেবী যখন ক্রীড়া করতে গিয়ে বনে মাঠে বনবালিকাদের সাথে গল্প করতেন, তখন তাঁর ক্রোড়ে এসে অধিষ্ঠান করতো নিশ্চিন্তে ।

বনবালিকাদের মাঝে মাঝে মনে হতো, নিরাকারা প্রকৃতিদেবীই সাক্ষাৎ সাকারা হয়ে সীতা মূর্তি ধরে এই বনে এসে তাহাদিগের সাথে ক্রীড়া করছেন । ইনি কোন মানবী নয়। স্বর্গের কোন দেবী । নাহলে গাত্রে এত জ্যোতি কেন ? চেহড়ায় এত দ্যুতি কেন ? সমস্ত প্রকার সৌন্দর্য, মধুরিমা একত্রিত হয়ে সীতা রূপে আবির্ভূতা হয়েছে । যখন সীতাদেবী গোদাবরী নদীতে অবস্থান করতেন, মৎস্য রা নির্ভয়ে তার অঙ্গ স্পর্শ করতো নিশ্চিন্ত হয়ে। মনে হতো এই অভয়া দেবী কোন প্রকার ক্ষতি করতে পারেনই না । এঁনার থেকে ভয় কি! পক্ষী কূল মিষ্টি সুরে ক্রীড়াতে যখন ক্লান্ত হতেন জানকী দেবী তখন ছন্দে ছন্দে তারা কলরব করতেন । মিষ্টি সুর, শীতল বন, বিবিধ সুগন্ধি ফুলের ঘ্রানে আমোদিত হয়ে থাকতো দণ্ডকারণ্য । সেই স্থানে এইভাবে বাস করতে থাকলেন রাম, লক্ষণ, সীতাদেবী। ভগবান রামচন্দ্র ও সীতাদেবী নানা দিব্য কথায় রাত্রি জাগরণ করতেন। কুটিরের বাইরে অগ্নি প্রজ্বলিত করে লক্ষণ ধনুর্বাণ নিয়ে সতর্ক পাহাড়ায় থাকতেন । এই ভাবে তাহাদের মিষ্টি মধুর দিন কাটতে লাগলো। ইতিমধ্যে বেশ কয়েক বৎসর কেটে গেলো। নয়, থেকে দশ বৎসর তারা এখানেই কাটালেন । বনের পরিবেশে আনন্দ, হাসির সাথে। কিশোরী সীতাদেবী এখন যুবতী । তাঁর সৌন্দর্যে কোটি চন্দ্র একত্রিত হয়েও লজ্জা পাবে। এমনই ছিলো মাতা লক্ষ্মীর রূপ ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger