সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা (অযোধ্যাকাণ্ড পর্ব –৬ )

ভগবান রাম, লক্ষণ আর সীতাদেবীর এমন যোগী, যোগিনীর বেশ দেখে অযোধ্যার লোকেরা বিষাদগ্রস্ত হল। সদ্য পতিহারা রমণী যখন শাঁখা, সিঁদূর বিসর্জন দিয়ে যেরূপ একটি পাথরের ন্যায় মূর্তিতে পরিণত হয়- তেমনি অযোধ্যার লোকেরা হলেন । মনে হতে লাগলো, ধূর্ত গৃধ নয়ন উৎপাটন করে নিয়ে গেছে, কিংবা যমদূতেরা অকস্মাৎ খুশীর মুহূর্তে প্রান হরণ করতে এসেছে । এমনই একটা নাচাওয়া দুঃখ সকলের মনকে করাল গ্রাসে নিক্ষেপিত করলো । বনবাসীর ন্যায় জটা, কণ্ঠে যোগীর ন্যায় রুদ্রাক্ষের মালা আভূষণ এইভাবে দেখে সকলে বিষাদগ্রস্ত হল । সমগ্র অযোধ্যা নগরী থেকে নিষ্ঠুরা নিয়তি সকল প্রকার খুশী, আনন্দ, হাস্য, কৌতুক, শান্তি হরণ করে নিয়েছিলো মূর্তিমান কৈকয়ী রূপে । রাম, সীতা, লক্ষণ অসুস্থ শয্যাগ্রস্ত দশরথের কাছে সাক্ষাৎ করে বন গমনের অনুমতি চাইলো । দশরথ রাজা ডুকরে ক্রন্দন করে বলল- “হে রাম! আমি কদাপি চাইনি তোমাকে বনবাসে যেতে। আমি চাই না তুমি বণে যাও। আমি আমার শপথ ভঙ্গ করবো। এতে নরক কুণ্ডে পতিত হতে হলেও হব। আমার ধারনাতেই আসেনি, কৈকয়ীর রূপে এক নাগিনী আমার কাছে এরূপ কিছু চাইতে পারে।” ভগবান রাম তখন পিতাকে অনেক বুঝিয়ে বলল- “পিতা। আপনি আমার জন্মদাতা। জন্মদাতা পিতার অঙ্গীকৃত বচন আমি কিভাবে ভগ্ন করবো? এই রঘুকূলের মানসম্মান বজায় রাখতেই হবে। ইতিহাস এটা না বলে যে রঘুকূলের রামচন্দ্র শপথ ভঙ্গ করেছেন । অতএব চতুর্দশ বৎসর আমাকে বনে থাকতেই হবে। ভরত মাতুলালয় থেকে এলে আপনি তার রাজ্যাভিষেক করুন। মাতা কৈকয়ী আর ভরতের প্রতি আমার কোন দ্বেষ নেই। আমার ভ্রাতা ভরত অযোধ্যার নরেশ হলে সবচেয়ে খুশী আমিই হবো। ”

দশরথ রাজা , সীতাদেবী ও লক্ষণকে বললেন- “তোমরা কেন যাচ্ছো ? হে পুত্রী সীতা! তুমি এই কূলের বধূ, আমার মিত্র জনকের দুহিতা। তোমাকে আমি কি করে অরণ্যের কষ্টে যেতে দিতে পারি? কি উত্তর দেবো আমি তোমার মাতাপিতাকে? তুমি বরং এখানেই থাকো, আর যখন ইচ্ছা হবে তখন মিথিলা গিয়ে থাকতে পারো। কৈকয়ী তাঁর করাল গ্রাসে আমার আনন্দময় পরিবারকেই ভস্ম করে দিলো।” ভগবতী সীতাদেবী বললেন- “পিতা! আমার মাতা পিতা সর্বদা পতির অনুগামিনী হতে শিক্ষা দিয়েছেন । যেখানে উনি থাকবেন সেখানেই ছায়ার ন্যায় আমিও থাকবো। ছায়া ভিন্ন মানব হয় না, নদীর জলে দর্পণে যেরূপ প্রতিমিম্ব দেখা যায় , সেই রূপ যেখানে আপনার জেষ্ঠ্য পুত্র থাকবেন, সেখানেই আমি থাকবো । ওনার সাথে যেখানেই আমি থাকি সেই স্থানই আমার কাছে অমরাবতী ।” লক্ষণ বলল- “পিতা! আমাকে মাতা সর্বদা জেষ্ঠ্য ভ্রাতার সেবা করতে বলেছেন। বাল্যকাল থেকে তাই করে আসছি। সুতরাং বনে গিয়ে অগ্রজ ও বৌঠানের সেবা সুরক্ষা করাই হবে আমার প্রধান ধর্ম ।” দশরথ রাজা রোদন করতে লাগলেন। ভয়ানক অসুস্থায় তিনি চলন গমন শক্তি হারিয়েছেন। রামচন্দ্র এবার কৌশল্যা দেবীর কাছে গেলেন। কৌশল্যা দেবী রাম, লক্ষণ, সীতাদেবীকে বিদায় জানালেন। কৌশল্যা বললেন- “রাম। সর্বদা সীতার খেয়াল রেখো। সীতা তোমার স্ত্রী। অরণ্য মাঝে বনজ পশু ও দুষ্টদিগের থেকে সর্বদা সীতাকে রক্ষা করবে। আমার পুত্র লক্ষণ তোমার সাথে যাচ্ছে। তুমি তোমার ভ্রাতার খেয়াল রেখো। যেভাবে নিয়ে যাচ্ছো, সেইভাবেই তাহাকে এনো।” রাম, সীতা, লক্ষণ এরপর কৈকয়ীর কাছে গেলেন । কৈকয়ী বললেন- “পুত্র রাম! জানি তোমার সাথে আমি নিষ্ঠুর আচরণ করেছি। মা হয়ে পুত্রের ভাগ্যে কষ্ট লেখে দিলাম। বোধ হয় ভগবানের সৃষ্টিতে এই প্রথম হল যে মা হয়ে পুত্রের সর্বনাশ আহ্বান করলো। কিন্তু আমি নিরুপায়। সীতা আমার পুত্রবধূ আমার কন্যাসমা । লক্ষণ আমার পুত্র। কিন্তু ভরতের প্রতি অন্যায় হতে দিতে পারি না। তাই এমন করতে বাধ্য হলাম।”

রামচন্দ্র মাতা কৈকয়ীকে অনেক সম্মান করে বললেন- “মাতা! এতে অন্যায় কি? মাতা সন্তান কে লালন পালন করে বড় করে। মাতার বয়স হলে পুত্রের কর্তব্য মাতার সকল সুবিধা দেখা। মায়ের আদেশ পালন করা। দুর্ভাগা ও পাপী সেই পুত্র- যারা মাতার আদেশ পালন করে না। মাতা, তুমি কদাপি আমার আর ভরতের ভেদ করনি । আমি তোমার আদেশ মাথায় নিলাম। চতুর্দশ বৎসর অন্তে পুনঃ অযোধ্যায় ফিরে আমি তোমার বাৎসল্য প্রাপ্তি করবো। তুমি তোমার পুত্রকে বাৎসল্য , প্রেম অবশ্যই দিও মা। ভ্রাতা ভরত রাজা হোক- এই আমার ইচ্ছা। ” রামের কথা শুনে কৈকয়ীর মনকে কেমন যেনো করে তুলল। সত্যি তো, এমন মাতৃভক্ত রাম কি কখনো তার আর ভরতের সাথে অন্যায় করবে ? এতো অন্যায়। কুটিল মন্থরা যে কি যুক্তি দিলো। রামকে একাকী পেয়ে কৈকয়ী বলল- “পুত্র রাম! তুমি যেয়ো না। আমি তোমার মতোন পুত্রকে কিভাবে অবিচারে নিক্ষেপ করতে পারি? আমি এখুনি রাজাকে বলে সমস্ত ইচ্ছা তুলে নেবো।” রাম বলল- “মা! এ হয় না। পিতা শপথ করেছেন। এখন শপথ ভাঙলে আমি আপনি পিতা সকলেই সমান দোষী হব।” কৈকয়ী বলল- “সে হোক! কিন্তু তুমি তো আমার পুত্র। আমি চাইনা তোমাকে হারাতে। আমার বিশ্বাস তুমি কদাপি আমার আর ভরতের সাথে অন্যায় করবে না। আমার বুদ্ধিনাশ হয়েছিলো। আমি সব শর্ত তুলে নেবো।” রামচন্দ্র বললেন- “মা! এসব বিধিলিপি। তুমি আমি কেবল উপলক্ষ্য । মাতঃ! আমার বনে গমনের আর একটা উদ্দেশ্য রাক্ষস দিগের বিনাশ। আর সেই রাক্ষস বিনাশ সুদুর অযোধ্যা থেকে করা অসম্ভব । রাক্ষসদের বিনাশ করতে হলে তাদের মাঝে যেতে হবে। তাদের মাঝে গিয়ে তাদের ধ্বংস করতে হবে। মা। অনুভব করো সেই রাক্ষসদের হাতে নির্যাতিত মানুষের কথা। সেই রাক্ষসেরা সকল সীমা অতিক্রম করেছে। সুন্দর পৃথিবীকে নরক বানিয়েছে। এবার তাহাদিগকে আমি সংহার করবো। একজন তাড়কা, একজন সুবাহু আর তিন কোটি রাক্ষস বধ করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এই রাক্ষসদের সম্পূর্ণ ভাবে বিনাশ করতে হবে। গুরু বশিষ্ঠ, গুরু বিশ্বামিত্র এই জন্যই আমাকে শস্ত্র বিদ্যা প্রদান করেছেন । তুমি তোমার পুত্র রামকে আশীর্বাদ করো, যেনো আমি এই যুদ্ধে সফল হই। এই কুলের নাম উজ্জ্বল করতে পারি। সকলে যেনো বলতে পারে কৈকয়ীর পুত্র রাম রাক্ষসদিগের বধ করেছে। এই কথা মা তোমার আমার মধ্যেই থাকলো।” কৈকয়ী ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বিদায় দিলেন। সুমিত্রা মায়ের কাছে বিদায় নিয়ে রাম, লক্ষণ ও সীতা দেবী রাজমহলের বাইরে এলেন। সমগ্র অযোধ্যার লোক দাঁড়িয়ে ক্রন্দন করছে এরূপ দৃশ্য দেখে তিন জনেই শোকাতুর হলেন ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger