সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা (অযোধ্যাকাণ্ড পর্ব – ১১)

দশরথ রাজা দেহ রেখেছেন । কুলগুরু বশিষ্ঠের নির্দেশে রাজার দেহ তৈলে রাখা হল, ঔষধি দিয়ে রাখা হল, যাতে রাজার পবিত্র দেহ কোনোভাবে নষ্ট না হয়। রামচন্দ্র চতুর্দশ বৎসর রাজ্যে পা রাখবেন না। এই অবস্থায় রাজার অন্তিম সংস্কার তাঁর পুত্র ভরতকে দিয়েই করাতে হবে। ভরত, শত্রুঘ্ন এই সময় কেকয় রাজ্যে ছিলেন । সেখানে দূত মারফৎ তাঁদের আনা হল। ভরত, শত্রুঘ্নকে পথে, রাজার দেহত্যাগের খবর, অগ্রজ রামচন্দ্রের বনবাসে যাবার খবর কিছুই প্রদান করা হয় নি। ভরত, শত্রুঘ্ন এই ভেবে আনন্দিত ছিলো যে রাজ্যে ফিরে তাঁরা অগ্রজের রাজ্যাভিষেকের আনন্দে সামিল হবেন । ভেবেছিলেন গোটা অযোধ্যা নগরী নানাবিধ রূপে সেজে উঠেছে। কিন্তু অযোধ্যায় ঢুকতে তারা দেখলেন অন্য এক পরিবেশ । রাস্তাঘাট অপরিচ্ছন্ন, গৃহ গুলির দ্বার রুদ্ধ, বৃক্ষ গুলি পুস্প- ফল বিহীন মৃত, পক্ষীর মধুর কলরব উধাও, দীঘি গুলি শুস্ক ও পদ্মবিহীন এগুলি দেখে তারা ভাবলেন ভুল বশত অযোধ্যা ভ্রমে তাঁরা কোন অন্য রাজ্যে আসেন নি ত! একি শ্রীহীন অযোধ্যা? কোথায় সেই আনন্দ উৎসব? রাজ্যের প্রজারা এমন শোকার্ত কেন? গৃহে গৃহে কেবল শোকার্ত আর প্রতিহিংসা পরায়ণ মুখ। কেউ ভরতের দিকে চাইছে না। যে বা চাইছে সে ক্রোধযুক্ত অবস্থায় চাইছে । সমস্ত লোকেরা ফিসফাস করে কি যেনো বলছে । যে অযোধ্যায় সর্বদা আনন্দের বান বয়ে যেতো আজ সেখানে যেনো অথৈ শোক সমুদ্র । সমস্ত লোকেরা বলছে- “ঐ পাপী এলেন। এই রাজার রাজ্যে আমরা কদাপি থাকবো না। এমন হিংসুক রাজার রাজ্যে বাস করলে আমাদের নরক গমন করতে হবে।” রাজবাটি পৌছে দেখলেন সেখানে শোকের সাগরে সকলে নিমগ্ন । কুলগুরু বশিষ্ঠ জানালেন- “ভরত, শত্রুঘ্ন তোমাদের একটি বড়ই দুঃখের সংবাদ প্রদান করতে হচ্ছে। তোমাদিগের পিতা রাজা দশরথ দেহ রেখেছেন।” শুনে ভরত , শত্রুঘ্ন গভীর শোকে পেলো। পিতার মৃত্যুর খবর শুনে রোদন করতে লাগলেন ।

অতঃ তারা কৌশল্যার সাথে দেখা করতে লাগলেন । কৌশল্যা দেবী সহ বাকী দুই রানী শোকে প্রস্তর সম হয়েছিলেন । সকলে তাছিল্ল্য ভরে বললেন- “ভরত তুমি খুবুই ভাগ্যবান! তোমাকে রাজ্যভার দিয়ে তোমার জেষ্ঠ্য ভ্রাতা সস্ত্রীক বনে চলে গেছেন। রাজাও দেহ রেখেছেন। এবার মনের সুখে সিংহাসনে বসে রাজত্ব করো ।” ভরত, শত্রুঘ্ন শুনে আকাশ থেকে পড়লেন। গভীর শোক উভয়কে গ্রাস করলো। জেষ্ঠ্য ভ্রাতা রামচন্দ্র ও লক্ষণ ও বৌঠান সীতাদেবী অনুপস্থিত ? কেন? পিতার মৃত্যুর সংবাদ শুনেও কেন এলেন না? পড়ে কৈকয়ীর সকল কুবুদ্ধি শুনে ভরত অতি বিলাপ করতে লাগলেন । সেই শোকেই রাজা ধীরে ধীরে মৃত্যুমুখে চলে গেছেন । ভরত গিয়ে কৈকয়ীকে নানা প্রকারে কর্কশ বাক্য বলতে লাগলো। ভরত বলল- “মাতঃ! তোমাকে মা বলতে লজ্জা করছে। অতি দুর্ভাগ্যে আমি তোমার গর্ভে জন্ম নিয়েছি। তুমি আমার জন্য আমার জেষ্ঠ্য ভ্রাতাকে বনে দিয়ে দিলে? ঐ সিংহাসনের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আকর্ষণ নেই। তুমি মা নামে কলঙ্ক। অগ্রজ আমার থেকেও তোমাকে অতি ভক্তি করতো। বড়মা কৌশল্যা অপেক্ষাও তোমাকেই বেশী শ্রদ্ধা করতো। মাতৃভক্তির এই পরিণাম দিলে। বিমাতা সর্বদাই বিমাতাই হয়। তুমিও সেইরূপ । তোমার ন্যায় কুটিল রমণী এই জগতে বিরল । আমি স্বর্গীয় দশরথ রাজার পুত্র তথা শ্রীরামচন্দ্রের ভ্রাতা ভরত এই প্রতিজ্ঞা করছি যে, যে সিংহাসনের জন্য তুমি সর্বনাশের অগ্নি প্রজ্বলিত করেছো, সেই সিংহাসনে কদাপি আমি বসবো না। তুমি বসো, বসে সুখ ভোগ করো।” কৈকয়ী নিজ ভুল অনেক পড়ে বুঝতে পেরে অনুতপ্ত । কৈকয়ী বলল- “পুত্র তুমি ঠিক বলেছ। আমি ‘মা’ নামে কলঙ্ক। ‘মা’ শব্দের পবিত্রতা আমি ভঙ্গ করেছি। আমি নাগিনী, আমি ডাইনী। যে নিজের পুত্রদের গ্রাস করলো। শুধু তাই নয়, আমি নিজে স্বামীকে হত্যা করেছি। না আমি একজন উত্তম মাতা, না আমি একজন আদর্শ সহধর্মিণী। আমি মহাপাপীনি। বিধাতার কাছে প্রার্থনা জানাই, তিনি যেনো আমাকে কদাপি ক্ষমা না করেন। কিন্তু পুত্র এই সকল বুদ্ধি আমার মাথায় দিয়েছে ঐ কুটিল মন্থরা। সে যে বিষপাত্র আমাকে দিয়েছে আমি সেটাই বিলিয়ে সর্বজনের জন্য দুঃখ , শোক কে আমন্ত্রণ করে এনেছি। আমাকে ক্ষমা করো না। আমাকে ক্ষমা করলে ঈশ্বর তোমাকে ক্ষমা করবেন না।”

মন্থরার নাম শুনে শত্রুঘ্ন প্রচণ্ড ক্রোধিত হল। ক্রোধে তাঁর মুখমণ্ডল রক্তজবার ন্যায় ধারন হল। প্রচণ্ড হুঙ্কার দিয়ে মন্থরাকে খুঁজতে বের হল। এই সকল সর্বনাশের হোতা ঐ মন্থরা। সে দেখতে যেমন কুৎসিত, তাঁর মন তদাপেক্ষা কুৎসিত। ঈশ্বর তাঁর মনে সর্প অপেক্ষাও ভয়ানক বিষ স্থাপন করেছেন। মন্থরা কে খুঁজে বের করে, কেশ আকর্ষণ করে উত্তম মধ্যম প্রহার করতে লাগলো। আর বলতে লাগলো- “শয়তানী, পিশাচিনী। তোর নিমিত্ত আমরা পিতাকে হারালাম, ভ্রাতাদের বৌঠানকে হারালাম। তোর ন্যায় কুটিল রমণীকে সৃষ্টি করে বিধাতা নিজেও লজ্জা পাচ্ছেন। তুই সর্ব কিছুর মূলে। তুই যেখানে থাকবি সেখানে দশ ক্রোশের মধ্যেও সুখ, আনন্দ থাকবে না। আজ তোকে বধ করে আমি পৃথিবী থেকে পাপ বিদায় করবো।” শত্রুঘ্নের প্রহারে কুটিল মন্থরা রক্তময় হল। কাঁতর ভাবে ক্ষমা চাইলেও শত্রুঘ্ন ক্ষমা করলো না। তখন ভরত এসে থামালো। বলল- “ভ্রাতা নারীজাতিকে প্রহার অত্যন্ত নিন্দনীয় কর্ম। নারী বধ ঘোর নীচ কাজ। মন্থরাকে হত্যা করলে তোমার নামে কলঙ্ক রটবে। একে মুক্ত করো। নিজের মাতাই যখন অন্যায় কাজ করেছেন তখন বাহিরের লোক কে আর কি দোষ দেবো? এর শাস্তি ভগবান একে দেবেন ।” এবার রাজার দেহ, ভরত সরয়ূ নদীর তীরে দাহ করলো, অস্থি বিসর্জন করলো । রানীরা সকল সধবার চিহ্ন বিসর্জন দিয়ে বিধবার বেশ নিলো। ভরত, শত্রুঘ্ন শাস্ত্র মতে হবিষ্য আদি সকল নিয়ম পালন করে মস্তক মুণ্ডন করে শাস্ত্র মতো শ্রাদ্ধ শান্তি করলো। রাজার শ্রাদ্ধ মিটে গেলে কুলগুরু ভরতকে সেই সিংহাসনে বসতে আদেশ দিলে ভরত কিছুতেই রাজী হল না। বলল- “ঐ আসনে কেবল জেষ্ঠ্য ভ্রাতা বসবেন। বনে গিয়ে আমি অগ্রজ, ভ্রাতা লক্ষণ ও বৌঠান কে ফিরিয়ে আনবো।” কৈকয়ীর জন্য কৌশল্যা দেবী পুত্রহারা হয়েছিলেন চতুর্দশ বৎসরের জন্য। গৌরীয় বৈষ্ণব মতে কৈকয়ী দেবী কিন্তু নিজেও পুত্রহারা হয়ে থাকবার যন্ত্রনা পেয়েছিলেন। তবে কলিযুগে। কৈকয়ী দেবী কলিযুগে শচী দেবী হয়ে জন্ম নেন। ভগবান রাম জন্ম নেন “নিমাই” হয়ে। পরবর্তী কালে মহাপ্রভু সন্ন্যাস নিয়ে গৃহ ত্যাগ করলে কৈকয়ী দেবী পুত্র হারানোর যন্ত্রনা প্রাপ্ত করেন। যদিও এটা গৌড়ীয়া ব্যাখা। শাস্ত্রে বা রামায়ণে এমন কিছু লেখা নেই ।

( ক্রমশঃ)
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger