সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( অরণ্যকাণ্ড পর্ব- ৯ )

রাম ও লক্ষণ উভয়ের কাছে বিবাহের প্রস্তাব অস্বীকৃত হয়েছিলো । একে অপরের কাছে বারংবার প্রেরন করছিলো, এতে শূর্পনাখা রাক্ষসী অতীব ক্রোধী হল। হুঙ্কার দিয়ে বলল- “তোমরা উভয়ে আমার সাথে এইরূপ কৌতুক করছ, তোমরা জানো না আমি কে? এখন আমি আমার স্বরূপ ধরে ঐ সুন্দরী নারীকে ভক্ষণ করবো।” রাক্ষসী , সীতাকেই নির্দেশ করেছিলো অঙ্গুলিহেলনে ।এরপর শূর্পনাখা আসল রূপে আসলো। বিশাল, স্থূল ভয়ানক সেই রূপ। দন্ত গুলি গজদন্তের ন্যায়, মস্তকে পর্বত আকৃতির জটা থেকে বিষাক্ত সর্পের ন্যায় কেশ চতুর্দিকে দোলা খাচ্ছে, হস্তের আঙ্গুলের নখ তীক্ষ্ণ ফলা, চোখ দুটি কোটরগত । ভয়ানক হাসিতে পাখপাখালি যেযেদিকে পারছে উরে চলে যাচ্ছে। সেই রাক্ষসী বলল- “দশানন রাবনের ভগিনী আমি। আজ তোমাদের দুজনের সামনে ঐ সুমুখী নারীকে ভক্ষণ করবো। দেখি তোমরা কি করো?” শূর্পনাখার বিকট কুৎসিত রূপ দেখে ভয়ে সীতাদেবী মূর্ছা গিয়ে ভূমিতে পড়ে যাচ্ছিল্লেন, সেসময় রামচন্দ্র গিয়ে ভূমিতে পড়া থেকে বাঁচালেন। এইহেন বিকট রূপ দেখে যে জীবিত থাকে, সেই বোধ হয় যথার্থ বীর । এই রূপ দর্শন তো দূর- বর্ণনা শুনলেই ভয়ে প্রাণত্যাগ হবে । রামচন্দ্র বললেন- “ভ্রাতা সৌমিত্র! শীঘ্র এই কামাতুরা ব্যাভিচারিনী রাক্ষসীকে বিকৃত করো। যাহাতে এর মধ্যে আর কোনরূপ কাম না আসতে পারে।” লক্ষণ সেই রাক্ষসীকে বলল- “শোন দুরাচারিণী! নারীর ওপর অস্ত্র প্রয়োগ আমি করি না। যদি রক্ষা পেতে চাস, ত এই মুহূর্তে এই স্থান হতে পলায়ন কর। অন্যত্থায় তোর মতো কামাতুরা রাক্ষসীর ওপর অস্ত্র প্রয়োগ করতে আমি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবো না, আর এতে আমার কোনরূপ পাপ হবে না।” লক্ষণের বারণ শুনলো না রাক্ষসী শূর্পনাখা । সে বলল- “ওহে সুপুরুষ! তোমাদের ন্যায় মানব আমাদের আহার্য। মানবের ভয়ে ভীত হলে দশানন রাবনের নামে কলঙ্ক রটবে। এখুনি আমি ঐ নারীকে ভক্ষণ করবো।”

এই বলে শূর্পনাখা অগ্রসর হতেই লক্ষণ তখন হাতের কুঠার দিয়ে রাক্ষসীর নাক কেটে ফেলল। নাক সশব্দে ভূমিতে পতিত হল। অবিরত ধারায় রক্ত বহির্গমন হল। তবুও রাক্ষসী মানে না। তখন লক্ষণ কুঠারে রাক্ষসীর দুকান ছেদন করে দিলো। ছিন্ন কর্ণ কুণ্ডল সহিত পতিত হল ভূমিতে। এই অবস্থায় রাক্ষসীর রক্তমাখা মুখ আরোও ভয়ানক লাগছিলো।মস্তকের দুপাশ, কাটা নাসিকা নিয়ে সমানে রক্ত বের হচ্ছে। শূর্পনাখা ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে বলল- “এর শাস্তি তোমরা ভালোভাবেই পাবে। তোমাদের বিনাশ করবো।” এই বলে শূর্পনাখা কাঁদতে কাঁদতে খড় আর দূষণের কাছে গেলো। আঘাত দেখিয়ে বলল- “ভ্রাতা এই দেখো পঞ্চবটিতে অবস্থিত অযোধ্যার রাজকুমার রাম আর লক্ষণ আমার কি দশা করেছে। আমার বিচার চাই। সেই দুজনের কাটা মুণ্ডু এনে আমাকে না দেখালে আমার শোক যাবে না।” খড়, দূষণ ক্রোধে জ্বলতে লাগল। বলল- “ভগিনী! এই দুই ভ্রাতাই পূর্বে তাড়কা, সুবাহু ও তাদের আশ্রিত তিন কোটি রাক্ষস বধ করেছে। এরাই বিরাধ বধ করেছে। শক্তিশালী মায়াবী রাক্ষস মারীচকে বিতারিত করেছে। আজ তোমাকে প্রহার করলো। এখন আমি তাদের নিদারুন যমযন্ত্রনা প্রদান করবো। দশানন রাবণের রাজত্বে রাক্ষসদের আঘাত করলে কি পরিণাম হয় তা বুঝবে এবার সেই দুই বনবাসী। প্রথমে তাদের বধ করবো , তারপর তাদের সেই সুন্দরী স্ত্রীকে বন্দী বানিয়ে ভ্রাতা দশাননকে উপহার দিবো, তারপর যত মুনি ঋষি এই জঙ্গলে আছে, সব কটাকে বেছে বেছে বধ করবো।” খড় আর দূষণ এই বলে বোন শূর্পনাখাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলো । বলল- “তুমি এই স্থানেই অবস্থান করো। আমার আশ্রিত চতুর্দশ শক্তিশালী রাক্ষসকে দেবতারাও ভয় পায়। তাঁরাই গিয়ে ঐ দুই বনবাসীর শিরোচ্ছেদ করে তাদের মুণ্ড তোমাকে উপহার দেবে।” এই বলে খড় আর দূষণ চতুর্দশ রাক্ষসকে আদেশ দিলো । চতুর্দশ রাক্ষস নানা অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আসতে লাগলো । তাদের পদচালনায় দূর থেকে বারংবার ভূকম্পের মতো মেদিনী কাঁপতে লাগলো । বট, অশ্বত্থ, পনস, আম্র, তাল, শাল, সেগুন, কদম্ব বৃক্ষ গুলি তাদের পদচালনায় চূর্ণ চূর্ণ হতে লাগলো । বিকট চেহারা রাক্ষস দের নিঃশ্বাসে পশু, পক্ষী গুলো ছিটকে ছিটকে বহু দূরে দূরে নিক্ষেপিত হল । রাম বললেন- “লক্ষণ তুমি আর সীতা কুটির মাঝেই অবস্থান করো। আমি গিয়ে সেই রাক্ষস দের বধ করবো।” লক্ষণ অনেক কাকুতি মিনতি করলো যে সে একাই সব রাক্ষস বিনাশ করতে পারবে কিন্তু রামচন্দ্র আদেশ দিলো না।

বাইরে এসে অতি উচ্চ, স্থূল, বিকট দর্শন রাক্ষসদের দেখতে পেলো ভগবান রামচন্দ্র । রাক্ষসেরা দেখা মাত্রই গদা, শূল, পট্টিশ , মুগুর, তরবারি , ছোড়া, বাণ ইত্যাদি ঘাতক অস্ত্র সকল রামচন্দ্রের দিকে নিক্ষেপ করতে লাগলেন। ভগবান রাম নানা অস্ত্র প্রয়োগ করে রাক্ষসদের নিক্ষেপিত অস্ত্র সকল চূর্ণ করতে লাগলেন । নানান দিব্যাস্ত্রের প্রয়োগে রাক্ষসদের মায়া নষ্ট হতে লাগলো। রাক্ষসেরা বৃহৎ আকৃতি শিলা, বৃক্ষ তুলে রামচন্দ্রের দিকে ছুঁড়তে লাগলেন। ভগবান তখন সূচীমুখ, শিলামুখ, অর্ধচন্দ্র, ঐন্দ্রাস্ত্রের মাধ্যমে সেগুলি চূর্ণ করতে লাগলেন । চারিদিকে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে পড়ে পর্বতের আকার স্তূপাকৃতি হল। রাক্ষসদের নিঃশ্বাসে সেগুলি উড়ে অকালে কৃত্রিম ধোঁয়া কুয়াশা সৃষ্টি হল। সমগ্র জঙ্গলে বোধ হয় প্রবল আলোরন সৃষ্টি হয়েছে এইভাবে যুদ্ধ চলতে লাগলো। রাক্ষসদের সকল অস্ত্রাদি চূর্ণ করে রাক্ষসদের সমুচিত জবাব দিলেন ভগবান শ্রীরামচন্দ্র । চৌদ্দ রাক্ষসের একত্র ছায়া এইভাবে পতিত হয়েছিলো, যেন মনে হচ্ছিল্ল বিশাল পর্বতমালা সূর্যের আলো আচ্ছাদিত করে রেখেছে। তখন রাক্ষসদের বিনাশ কাল উপস্থিত । ভগবান রাম ধনুকে দিব্যাস্ত্র প্রকট করলেন । সেই বাণ চোখের নিমিষে চালনা করলেন। এক বাণ থেকে চৌদ্দ দিব্য শর প্রকট হয়ে গিয়ে চৌদ্দ রাক্ষসের শিরোচ্ছেদ করলো। বিশাল উল্কাপিণ্ডের ন্যায় চারিধারে রাক্ষসের চৌদ্দ মুণ্ড পতিত হল। ছিন্ন স্কন্ধ দিয়ে হড়পা বাণের ন্যায় তীব্র বেগে রক্তধারা নির্গত হল। চৌদ্দ রাক্ষসের নিথর দেহ এইভাবে পড়লো যে বসুমতীও কেঁপে উঠলো। দেখে মনে হল বিশাল পর্বতমালা থেকে ঝর্ণার ন্যায় রক্ত নদীর ঝর্না প্রবাহিত হয়েছে । দেবতারা, মুনি ঋষিরা ভগবান রামের জয়ধ্বনি করে স্তবস্তুতি করতে লাগলেন । শূর্পনাখাকে কেন নাক, কাণ কেটে ছাড়লেন ? কেন বধ করলেন না? এর মধ্যে কিছু তত্ত্ব কথা আছে । শূর্পনাখা কামের সাক্ষাৎ মূর্তি । সাধারন মানব কামকে সম্পূর্ণ বিনাশ করতে পারে না। ভগবান শিব মদন ভস্ম করেছিলেন, সাধারন মানব পারে না। নানাভাবে কামনা বাসনা মানবের জীবনে আসে। মহামানবদের কথা আলাদা। সাধারন মানব কেবল কামকে আয়ত্তে বা বশে রাখতে পারে, সম্পূর্ণ বধ করলে সেই মানব হন মহামানব ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger