সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা (অযোধ্যাকাণ্ড পর্ব – ১২)

রাম, লক্ষণ, সীতাদেবী এসে কুটির বেঁধেছেন চিত্রকূট পর্বতে । অপূর্ব প্রাকৃতিক শোভা চারপাশে বিকশিত । বিবিধ সুগন্ধি পুস্পে ভ্রমর কূল খেলা করছে। সেই বৃক্ষ গুলি সবুজে মোরা। নিত্য তারা বনের মাটিকে সুন্দর ঘ্রানযুক্ত পুস্পে ঢেকে দিতো । সেখানে খেলা করতো বনের হরিণ আদি বিবিধ পশু । এমনই সুন্দর ছিলো চিত্রকূট । লক্ষণ বন থেকে বিবিধ মিষ্টিফল, কন্দ, মধু আহরণ করে আনত । তিন জনে মিলে তাই সেবা নিতো। চতুর্দিকে কেবল শান্তি আর পাখপাখালির কলরব । কোনরূপ হট্টগোল নেই । বনদেবী শ্রীরামচন্দ্রের স্বাগত জানানোর জন্য নানা প্রাকৃতিক শোভার ডালি বিস্তার করেছিলেন । তিন জনে প্রতীক্ষা করছিলেন কবে চতুর্দশ বছর সমাপনের দিন আসবে । এখানে মুনি ঋষি বৃন্দ দেখা করতে আসতেন রামচন্দ্রের সাথে । রাম, লক্ষণ ও জানকী দেবী এই সকল মুনি সন্তদের নিকট আধ্যাত্মিক দিব্যবাণী শ্রবন করতেন । একদিনের কথা ভরত , তিন রানী, শত্রুঘ্ন ও অযোধ্যার অনেক বাসিন্দা, বশিষ্ঠ, ভরদ্বাজ, নিষাদ সহিত গুহক অনেক অযোধ্যার সেনা, হস্তী, রথী , পদাতিক এই স্থানে আসলেন । দূর থেকে ভরত শত্রুঘ্ন ও এত সেনা দেখে লক্ষণ ক্ষিপ্ত হলেন । বললেন- “অগ্রজ! রাজ্য আর সিংহাসন দখল করেও ভরতের তৃপ্তি লাভ ঘটেনি। দেখুন কত সেনা নিয়ে এইস্থানে আসছে। উহার ন্যায় নৃশংস মানব এই ত্রিভুবনে আর নেই। তবে সে এখনও লক্ষণের বিক্রম দেখেনি। আজ তাকে বিনাশ করবো।” ভগবান রাম মৃদু হেসে বললেন- “শান্ত হও সৌমিত্র! ক্রোধ পরিত্যাগ করো ভ্রাতা। ভরত আসছে ঠিকই। কিন্তু সে কি প্রয়োজনে আসছে তা জ্ঞাত হওয়া প্রয়োজন।”

ভরত এসে উপস্থিত হয়ে সোজা রামচন্দ্রের চরণে পতিত হয়ে অনেক কান্নাকাটি করলো। বলল- “দাদা! ভরতের ওপর অভিমান করে চলে এলে। তোমার স্নেহছায়া থেকে কেন বঞ্চিত করলে? তুমি কিভাবে বিশ্বাস করলে যে রামচন্দ্র থাকতে, ভরত রাজা হবে। ধিক আমাকে। ঐ রকম চিন্তা ভাবনা স্বপ্নেও আমার আসে না। অগ্রজ। বড়ই দুঃখের সংবাদ আমাদের পিতার স্বর্গবাস হয়েছে। তিনি দেহ রেখেছেন।” দশরথ রাজার মৃত্যু সংবাদ শুনে রাম, লক্ষণ, সীতা খুবুই শোক পেলেন। রোদন করতে লাগলেন পিতৃবিয়োগের সংবাদ শুনে । চার ভ্রাতা মিলে নদীতে নেমে পিতার উদ্দেশ্যে জল তর্পণ করলেন । এই মতে সকলে মিলে একে অপরকে সান্ত্বনা দিলেন । ভরত বললেন- “অগ্রজ। তুমি শীঘ্র অযোধ্যা ফিরে চল। পিতা এখন আর নেই। তুমি আমাদিগের অভিভাবক। আমরা তোমার স্নেহছায়াতে জন্ম থেকে বড় হইয়াছি । তোমার ছায়াতলেই থাকতে চাই। তুমি মনে কোন প্রকার ক্ষোভ রেখো না। আমার মা এক কুটিল রমণী। বিষাক্ত ধূমে যেরূপ দমবন্ধ হয়ে জীবেরা মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তেমনি ডাইনী মন্থরার যুক্তিতে রাণী কৈকয়ী এক নাগিনীর মতো বিষাক্ত ছোবোলে সকল সুখ, আনন্দকে হত্যা করেছে । সেই রাণী কৈকয়ী অযোধ্যাতে থাকলে পিতার আত্মা কদাপি শান্তি পাবে না। আর আমি সিংহাসনে অধিষ্ঠান করলে পূর্বপুরুষ গণ কুপিত হবেন। আমি নিজেও নিজেকে সম্মান করতে পারবো না। অতএব তুমি বৌঠান সহিত ভ্রাতা লক্ষণকে নিয়ে অযোধ্যায় ফিরে রাজকার্য চালনা করো। অযোধ্যা এখন অভিভাবকহীন । এই অবস্থায় তোমার ছত্রছায়া অযোধ্যা নগরী কামনা করছে। ” ভরত এই প্রকার বোঝালো । ভগবান রামচন্দ্র বললেন- “ভ্রাতা ভরত। আমি চতুর্দশ বৎসর সমাপন মাত্রই অযোধ্যা গমন করবো। আমি পিতার বচন অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। রঘু বংশের কেহ কখনো শপথ ভাঙ্গেনা। এই দাশরথি রাম পিতার বচন ভঙ্গ কিরূপে করবে? মহারানী কৈকয়ী আমার তোমার মাতা। মাতা সম্বন্ধে কুবাক্য প্রয়োগ মহাপাপ। মায়ের আদেশ পালন করা পুত্রের কর্তব্য। আমি আমার মায়ের সেই ইচ্ছাই পূর্ণ করছি। সত্যি এখন অযোধ্যা রাজাহীন। রাজাহীন রাজ্য আর তালাবিহীন সিন্দুক এক সমান । অতএব তুমি রাজ্য পরিচালনা করো।”

ভরত নাছোড়বান্দা । কিছুতেই ফিরে যাবেন না। শেষে ভগবান রাম অনেক বুঝিয়ে রাজী করলেন । ভরত বললেন- “দাদা তোমার যখন এই ইচ্ছা তবে আমিও একটি প্রতিজ্ঞা করছি। চতুর্দশ বৎসর আমিও বনবাসীর বেশে রাজবাটি ছেড়ে বনবাসীর ন্যায় রাজ্য চালাবো। আর তোমার পাদুকা সিংহাসনে স্থাপন করে বনবাসীর ন্যায় ভূমিতে কুশাসনে বসে তোমার নামে রাজ্য পরিচালনা করবো। আমি এই চতুর্দশ বৎসর অযোধ্যার সন্নিকটে নন্দীগ্রামে অবস্থান করবো। তোমারই ন্যায় বনবাসীর মতো এই চতুর্দশ বৎসর কঠোর ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে কেবল ফলমূল আহার করে থাকবো। আর চতুর্দশ বৎসর অন্তে তুমি যেখানেই থাকো না কেন, অযোধ্যায় আসতে হবে। এক মুহূর্ত বিলম্ব হলে আমি অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করবো।” ভগবান রাম তাই মেনে নিলেন। এরপর রামচন্দ্র ভ্রাতা শত্রুঘ্নকে বললেন- “তুমি কনিষ্ঠ ভ্রাতা। এই চতুর্দশ বৎসর অযোধ্যার রাজপুরী ও অযোধ্যাকে রক্ষা করবে। জেষ্ঠ ভরতের আদেশ মেনে চলবে। মাতাদের খেয়াল রাখবে।” সেই রাত সকলে রামচন্দ্রের সাথে বনেই কাটালো। নিশি অন্তে সূর্য উদয় হল। ভরত স্নানাদি সেরে আসলো। দু চোখ বেয়ে অবিরত চঞ্চল স্রোতের ন্যায় অশ্রুধারা বহির্গমন হচ্ছিল্ল । বড় ভ্রাতা রামচন্দ্রকে প্রনাম করলো । অতঃ ভগবান রামের পবিত্র পাদুকা দ্বয় মস্তকে ধারন করলো। দেবতারা এই দেখে আশ্চর্য হচ্ছিল্লেন। ভরত জানতো না তাঁর জেষ্ঠ্য ভ্রাতা স্বয়ং ভগবান । কিন্তু অজান্তে সে ভ্রাতা ভেবে ভগবানের পাদুকা দ্বয় দ্বারা নিজেকে ও নিজের কুলকে পবিত্র করলো। স্বয়ং ভগবানের শ্রীচরণ পাদপদ্ম স্পর্শের জন্য যোগী মুনিরা লক্ষ লক্ষ বছর এক পায়ে দাঁড়িয়ে তপস্যা করেন । দেবতারা এই দেখে কিছুটা ঈর্ষান্বিত হচ্ছিল । অশ্রুসজল চোখে সকলে ফিরে গেলো। ভরত সেই পাদুকা নন্দীগ্রামে সিংহাসনে স্থাপন করে নিজে কুশাসনে ভূমিতে বসে রোজ পূজা করতো। রামচন্দ্রের নামে নিজেকে রামচন্দ্রের দাস বিবেচনা করে রাজ্য চালনা করতে লাগলো ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger