সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( কিস্কিন্ধ্যাকাণ্ড পর্ব –৯)

সমুদ্রের বিশাল জলরাশি দেখে বানরেরা চিন্তায় পড়লো। এতো বিশাল সমুদ্র। এত উঁচু ঢেউ যে নৌকা নিয়ে যেতে গেলে উল্টাবে । আর হাঙর, মকরেরা আহার করবে। সাঁতার দিয়ে পার হবার কল্পনা দিবাস্বপ্নতেও আসে না। এই মহাসাগর সাঁতরে পার হওয়া অসম্ভব । বানরেরা রাক্ষস দের মতো মায়াবিদ্যা জানে না যে মন্ত্র বলে আকাশে উড়ে লঙ্কায় যাবে। সুগ্রীবের কাছে কোন পুস্পক বিমান নেই- যে তারা তাতে লঙ্কায় যাবে। দেবতারা রাবণের ভয়ে কোন রকম সাহায্য করবে না। এখন উপায় ? শত যোজন পার করেই তো লঙ্কা নামক দ্বীপ। সেখানে না গেলে মাতা সীতার কাছে প্রভু রামচন্দ্রের সংবাদ দেওয়া যাবে না । অঙ্গদ বলল- “কে এমন বীর আছে যে এই সাগর ডিঙিয়ে যেতে পারে ?” সকল বানরেরা কেবল একে অপরের মুখ দেখতে লাগলো। গয় নামক বানর বলল- “আমি দশ যোজন লম্ফ দিয়ে যেতে পারি। এর বেশী নয়।” গবাক্ষ বানর বলল- “আমি কুড়ি যোজন পারবো।” শরভ নামক বানর বলল- সে চল্লিশ যোজন পারবে। গন্ধ নামক বানর বলল সে পঞ্চাশ যোজন লম্ফ দিয়ে পার হতে পারবে। মহেন্দ্র বানর বলল- ষাট যোজন লম্ফ দিয়ে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব । দেবেন্দ্র বানর জানাল- “ভাই আমি সত্তর যোজনের বেশী যেতে পারি না।” অশিতি নামক কপি বলল- সে নব্বই যোজন পারবে। তারক বানর জানালো সে গেলেও ফিরে আসতে পারবে না। সকলে অসমর্থ । জাম্বুবান এই আলোচনা শুনে হাস্য করতে লাগলো। হনুমান চুপ করে ছিলো। বহু আগে হনুমান ঋষি শাপে তাঁর শক্তি ভুলে গিয়েছিলো। ঋষি বর দিয়েছিলো কেউ হনুমানকে তাঁর শক্তির কথা মনে করালেই তাঁর সব শক্তি স্মরণে আসবে। প্রজাপতি ব্রহ্মা এই কাজটির ভার দিয়েছিলেন তাঁর পুত্র জাম্বুবানকে । জাম্বুবান কে হাসতে দেখে সবাই অবাক হল । হাসবার কারণ জিজ্ঞাসা করলো।

জাম্বুবান বলল- “সমস্ত মুস্কিলের সমাধান যিনি করেন তিনি আমাদের সামনেই আছেন। অঞ্জনালাল হনুমান থাকতে আবার চিন্তা। সে শত যোজন পথ লম্ফ দিয়ে পার হতে পারবে।” হনুমান বলল- “আমি? আমার তেমন শক্তি কোথায়? না জানি প্রভু আমাকে কেনই এত ভরসা করলেন?” জাম্বুবান বললেন- “হে কপি গণ। হনুমান ঋষি শাপে সমস্ত শক্তি বিস্মৃত হয়েছেন। আসুন আমরা হনুমানের স্তবস্তুতি করে তাঁহাকে তাঁহার শক্তির পরিচয় বর্ণনা করি।” এই বলে জাম্বুবান বলল- “ হে মহাবীর! তুমি সামান্য কপি নও । নিজ শক্তি স্মরণ করো। তুমি রুদ্রাবতার । রাক্ষস ধ্বংস ও প্রভু শ্রীরামের সেবার জন্যই রুদ্রদেব তোমার রূপে অঞ্জনা মাতার গর্ভ হতে উৎপন্ন হয়েছেন। হে বীর হনুমান। পবন দেব সেই শিবতেজ বহন করেছিলেন। পবন দেব তোমার পালক পিতা। তুমি অসীম শক্তিমান । তুমি চার যুগে অমর। তোমার নাশ নেই । হে মারুতি স্মরণ করো তুমি কত পরাক্রম রাখো। বাল্যকালে সূর্য দেবকে গ্রাস করেছিলে । ইন্দ্রদেব সূর্য উদ্ধারের জন্য তোমাকে বজ্র দিয়ে প্রহার করেছিলেন। তবুও তোমার প্রান যায় নি। তোমার দেহে বজ্রের ন্যায় শক্তি। স্মরণ করো মারুতি। তুমি রামভক্তদের রক্ষাকর্তা । তুমি রাক্ষস দলনে সমর্থ । হে হনুমান! তুমি শক্তিমান। এই সাগর তোমার কাছে তুচ্ছ।” এই সব বলে জাম্বুবান সহ অনান্য কপিরা স্তবস্তুতি করলেন । হনুমানের ধীরে ধীরে সব মনে পড়তে লাগলো। তাঁর ওপর যে অভিশাপ ছিলো, তা ধীরে ধীরে দূর হতে লাগলো। মনে পড়লো- ছোটবেলায় তিনি দেবতাদের বর পেয়ে কেমন দুষ্টামি করে বেড়াতেন । মুনি শাপে তিনি তাঁর শক্তি অজ্ঞাত হয়েছিলেন । এখন ধীরে ধীরে মনে পড়ছে । জাম্বুবান সহ অনান্য কপিরা করজোড়ে স্তব স্তুতাদি করেই চলছেন। তারা বলছেন- “মারুতি! তুমি দেবতাদের বর প্রাপ্ত। ব্রহ্মার বরে কোন অস্ত্রের প্রভাব তোমার ওপর পড়ে না। তুমি জলে, অগ্নিতে, তুষারে নিশ্চিন্তে চলে বেড়াতে পারো। বায়ুহীন স্থানে নিঃশ্বাসে সমর্থ, অগ্নি তোমাকে দাহ করতে পারবে না, তুমি জলের তলেও অবাধে অক্লেশে গমনে সমর্থ। হে পবনপুত্র জাগো। অন্তরের শক্তিকে জাগাও। মনে করো দেবতারা তোমাকে কি আশীর্বাদ দিয়েছেন। শ্রীরামচন্দ্রের দূত হয়ে লঙ্কায় গিয়ে মাতা সীতাকে সংবাদ দিয়ে রাবণকে সাবধান করে এসো।”

হনুমানের সব স্মরণে আসলো। “জয় শ্রী রাম” ধ্বনিতে চতুর্দিকে কেঁপে উঠলো। ধীরে ধীরে হনুমানের অবয়ব বৃদ্ধি পেলো। হনুমান জানতে পেরে গেলো, তাঁর অভ্যন্তরে কতটা শক্তি নিহিত। ঋষি শাপ একেবারে কেটে গেলো। হনুমানের সকল লোম কূপ থেকে সূর্যের ন্যায় জ্যোতি বের হতে লাগলো । অঙ্গদ এক পুস্পমাল্য হনুমানের কণ্ঠে প্রদান করলো। এরপর বিশাল হয়ে হনুমান মহেন্দ্র পর্বতে উঠলো। তারপর ভগবান রামের জয়ধ্বনি করে এক লম্ফ দিয়ে আকাশে উঠে লঙ্কার দিকে দক্ষিণে গমন করতে লাগলো। হনুমান যখন লম্ফ দিয়ে উঠলো তখন মহেন্দ্র পর্বত কেঁপে উঠলো। ধস নেমে পাথর, বৃক্ষ সব গড়িয়ে নীচে পড়তে লাগলো। পর্বতের একাংশ মাটির ভেতরে প্রবেশ করলো। হনুমান দেখতে দেখতে সকলের চোখের আদৃশ্য হয়ে গেলো । এবার হনুমান সম্বন্ধে আলোচনা করা যাক। হনুমান রুদ্রাবতার । একাদশ অবতার তিনি রুদ্রের । রাক্ষস বিনাশ ও সাধুদিগের রক্ষা, প্রভু রামচন্দ্রের সেবার জন্যই তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন । কলিযুগে হনুমানের পূজা বিশেষ ফলপ্রদ। অনেকে বলেন হনুমান ব্রহ্মচারী তাই নারীরা তাঁর পূজো করতে পারে না। এটা ভুল। নারী, পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই পূজা করতে পারেন । গ্রহেরা বর দিয়েছিলেন যে কোন প্রকার গ্রহের দোষ থাকুক, মঙ্গলবারে হনুমানের পূজা ও হনুমান চালিশা পাঠে গ্রহদোষ কেটে যায়। ম্যাক্সিমাম জ্যোতিষী তাই গ্রহ সঙ্কটে পীড়িত দের হনুমানের পূজা করতে পরামর্শ দেন । মঙ্গলবার হনুমানের জন্মতিথি । বাস্তুদোষ, ভৌতিক উপদ্রব, কালাযাদুর আক্রমণ ইত্যাদি থেকে বাঁচতে মঙ্গলবারে হনুমানের পূজা বিশেষ ফলপ্রদ। শণি দেবতা বর দিয়েছিলেন হনুমানের পূজারীরা কোনদিন শণির দশায় আক্রান্ত হবে না। বরং হনুমানের পূজায় শণির দোষ খণ্ডন হয়। হনুমানজীকে লাড্ডু, কদলী , বট পত্রের মালা, মেটে সিঁদুর ( অভাবে লাল সিঁদুর ও হলুদ গুড়ো একত্রে মিশিয়ে ) লাল শালু কাপড়, লাল ফুল , কাঁচা সরিষার তৈল, ভোগে তুলসী পত্র ( হনুমানের বিগ্রহে বা ফটোতে তুলসী প্রদান নিষেধ, কেবল ভোগে অবশ্যই আবশ্যক- তুলসী পত্রের অভাবে তুলসী কাষ্ঠের চন্দন) ইত্যাদি অর্পণ করলে প্রসন্ন হন ।

মনোজাবং মারুততুল্যবেগং
জিতেন্দ্রিয়ং বুদ্ধিমতাং বরিষ্ঠম্ ।
বাতাত্মজং বানরযূতমুখ্যং
শ্রীরামদূতং শিরসা নমামি ।।

যিনি মন ও বায়ুর ন্যায় দ্রুতগামী , বুদ্ধিমান ব্যাক্তি-দিগের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও বানরবাহিণীর অধিনায়ক, সেই শ্রীরামের দূত, জিতেন্দ্রিয় পবননন্দনকে অবনতমস্তকে নমস্কার করি ।

( কিস্কিন্ধ্যাকাণ্ড সমাপ্ত ) 
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger