সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( অরণ্যকাণ্ড পর্ব- ২১ )


ভগবান মর্তে অবতার গ্রহণ করে আসেন। একাধারে তিনি দুষ্ট দলন করেন, অপরদিকে শুদ্ধভক্তকে অন্বেষণ করেন । ভগবান রামচন্দ্রের বন গমনের পেছনে একটি উদ্দেশ্য ছিলো ভক্তসঙ্গ। ভক্তেরা আকুল প্রাণে যখন ভগবানকে ডাকেন, তখন ভগবান না এসে কি থাকতে পারেন? ভগবান রামচন্দ্রের এমনই ভক্ত ছিলো শবরী । মতঙ্গ মুনির পরিত্যক্ত আশ্রমে তিনি একাকী থাকতেন। বয়সের ভারে জর্জরিত, বার্ধক্যে পীড়িতা শবরী দেবী এখনও দেহ রাখেন নি। তাঁর আশা দুই চোখ চিরকালের জন্য বন্ধ করবার পূর্বে ভগবান রামচন্দ্রের দিব্য স্বরূপ দর্শন পেতে । জাতিতে সাঁওতাল রমণী, নীচ জাতি বিবেচোনা করে মতঙ্গ মুনির দেহত্যাগের পর এই আশ্রমে কেউ তেমন আসতোই না। মতঙ্গ মুনি দেহ রাখার পূর্বে, শিষ্যা শবরীকে বলেছিলেন- এই আশ্রমে একদিন ভগবান রামচন্দ্র আসবেন। সেই থেকে শবরীর প্রতীক্ষা শুরু। নিত্য সে ভাবতো আজই হয়তো সেই ভাগ্যবান দিন- ভগবান আজ এখানে পদার্পণ করবেন। তাঁর দিব্য স্পর্শে আশ্রম পবিত্র হয়ে উঠবে। সেই নররূপী নারায়ণকে দেখে প্রান ত্যাজিবো। প্রত্যহ এই ভেবে শবরী পুস্প দ্বারা আশ্রম প্রাঙ্গন সাজিয়ে দিতেন। আশ্রমে প্রবেশের পথ বনজ সুগন্ধি পুস্পে ছেয়ে যেতো। মৃত্তিকা ঢেকে যেতো সুগন্ধি পুস্পে। আশ্রমের দ্বারে কদলী বৃক্ষ শোভা থাকতো । শবরী নিজ হস্তে বন থেকে নানা মিষ্ট ফল সংগ্রহ করে নিয়ে আসতেন । কখনো কখনো রাক্ষসেরা এসে এই সাজানো পুস্পগুলি নষ্ট করে চলে যেতো। শবরী পুনঃ সাজাতেন । আর প্রতীক্ষা করতেন কবে ভগবান রাম আসবেন । কিন্তু ভগবান রাম আসতেন না। বৃদ্ধা ভাবতেন- ভগবান লাভ হল না। সূর্য অস্তের সাথে সাথে একটি দিন সমাপ্ত হল। পুস্প, ফলে পচন ধরে যেতো। পর দিবস বুড়ী আবার নতুন করে আশ্রমের পথ পুস্পে সাজাতেন, ফল নিয়ে আসতেন ।

যখন ঈশ্বর দর্শনের আকাঙ্খা প্রবল হয়- তখনই ঈশ্বর আসেন । বৃদ্ধা শবরীর তপস্যা সফল হোলো। রাম, লক্ষণ সেই মতঙ্গ মুনির আশ্রমে আসলেন । পুস্পে সজ্জিত পথে আশ্রমের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। এই সুগন্ধি পুস্প গুলি শবরী নিজ হাতে বিছিয়ে দিয়েছিলেন । ভগবান রামচন্দ্রের কোমল কমল স্বরূপ পুস্পসম চরণের স্পর্শ পেয়ে সেই পুস্প গুলি যে বৃক্ষ থেকে আনয়ন করা হয়েছিলো, সেই বৃক্ষ ও তাঁর মধ্যে অবস্থিত পক্ষী, পিপীলিকা অবধি ধন্য হলেন । ভগবানের চরণের তলায় পুস্পগুলি পিষ্ট না হয়ে বরং অতি শোভা ও স্বর্গীয় সুগন্ধ প্রাপ্তি করলো। বৃক্ষ গুলি তাঁদের শাখায় শাখায় প্রস্ফুটিট পুস্প গুলি শ্রীরামচন্দ্রের উপরে বর্ষণ করলেন । এইভাবে রাম ও লক্ষণ আশ্রমে প্রবেশ করলেন । শবরী মাতা তাঁহাদিগকে দেখেই বুঝতে পারলেন এমন দিব্যদেহ রূপ, জ্যোতির্ময় কান্তি- ইঁনিই ভগবান শ্রীরামচন্দ্র । হীরক মণি যেমন আপনেই জ্যোতি বিচ্ছুরিত করে, কৃত্রিম উপায়ে আলোক বিচ্ছুরণ সৃষ্টি করতে হয় না, তেমনি ভগবান শ্রীরামের তনু থেকে দিব্য জ্যোতি প্রকাশিত হচ্ছিল্ল, যা দেখে আকাশে ভাস্করদেব বোধ হয় লজ্জিত হলেন । শবরী ভগবান রামচন্দ্রের চরণে প্রনাম জানিয়ে বহুবিধ স্তুতি করলেন । শবরীর চোখ দিয়ে ভক্তিপ্রেমে অশ্রু নির্গত হচ্ছিল্ল। এই ভক্তিরসের নামই প্রেম । ঈশ্বরপ্রেমে যখন নয়ন অবিরাম ধারা বর্ষণ করে- বুঝতে হবে সেই ঈশ্বরের প্রতি প্রেম হয়েছে। একটি ছেলে একটি মেয়ের হাত ধরে পালিয়ে বিবাহ করলো, বা দৈহিক ক্ষুধা নিবারণ করলো- এটা প্রেম না। এই যে আকুতি, মিনতি, সমর্পণ, ভগবৎ দর্শনে অশ্রুজলে অভিষেক- এইগুলিই প্রেম । সেই শবরীর ভক্তি আরোও উচ্চতা প্রাপ্ত পেলো- যখন ভগবান রাম ভক্তের ভক্তি- প্রেম দেখে নিজেও অশ্রুজলে ভাসলেন । ভক্তের ভক্তি দেখে ভগবান নিজেও অভিভূত- বোধ হয় শবরীর এই ভক্তি দেখে দেবতারাও ঈর্ষা করতে লাগলেন। তারা কেবল “ত্রাহি মাম” বলে ভগবানের কাছে ছুটে যেতেন- কিন্তু এমন প্রেম- আকুতি- মিনতি ছিলো না। সেজন্য মানব জন্ম অতি সৌভাগ্যের । আমরা হস্ত দ্বারা ভগবানের সেবা করতে পারি, নয়ন দ্বারা ভগবানের দিব্য স্বরূপ দর্শন করতে পারি, কর্ণ দ্বারা ভগবানের গুন মাহাত্ম্য শ্রবন করতে পারি, নাসিকা দ্বারা ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে অর্পিত চন্দনের সুবাস গ্রহণ করতে পারি, মুখ দ্বারা ভগবানের নামকীর্তন - প্রসাদ সেবন করতে পারি, সর্বোপরি এই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় মনকে সর্বদা ভগবৎ চিন্তায় ডুবিয়ে রাখতে পারি- যেমন শবরী মাতা করেছিলেন । সুতরাং ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে এইভাবে ভগবানের সেবা কেবল মানবজাতির পক্ষেই সম্ভব । সুতরাং উচু-নীচুজাতি নয়- মানব মাত্রেই সে ভগবানের সেবা করতেই এসেছে, ভগবান তাঁর সেবার অধিকার মনুষ্য জাতিকেই দিয়েছেন- এই ভেবে আমরা নিজেরা আনন্দ বোধ পূর্বক ভগবানের সেবা করতে পারি ।

এবার ভগবান রামকে অভিষেক পূজাদি করলেন শবরী দেবী। পুষ্করিণীর সলিল কি- শবরী দেবীর নয়নের সলিল ভগবান রামচন্দ্রের চরণ অভিষেক করে দিলো। এই দেখে ভগবান রামচন্দ্রের নয়ন হতে মুক্তার ন্যায় অশ্রু ঝড়ে পড়লো। ভাবে বিভোর শবরী পুস্পাদি দ্বারা ভগবান রামচন্দ্রের পূজাদি করছিলেন। শবরী দরিদ্র- তিনি কি আর দেবেন। বন থেকে জাম ফল এনেছিলেন। সেই সামান্য ফল পদ্মপাত্রে সাজিয়ে ভগবানের সামনে রাখলেন। এবার শবরী দেবী যা করলেন- সেটা ভক্তিমার্গের চরম নিদর্শন । ভাবে বিভোর শবরী ভাবলেন- প্রভুকে কিভাবে টক জাম দেবেন ? কারণ জাম ফলগুলির কিছু টক ও কিছু মিষ্টি ছিলো। শবরী দেবী একটি করে জাম ফল তুলে একটু করে চেখে দেখলেন, যেগুলি টক সেগুলি ফেলে দিলেন- মিষ্টি জাম গুলি ভগবানের হস্তে দিয়ে বললেন- “প্রভু! এইটি বড়ই মিষ্ট। এটিই তুমি গ্রহণ করো।” ভগবান রাম সেই শবরী প্রদত্ত উচ্ছিষ্ট জাম পরম প্রীতি সহকারে ভোজন করতে লাগলেন । এইভাবে শবরী সমস্ত জাম গুলি অল্প কামড়ে খেয়ে টক ফলগুলি ফেলে দিয়ে মিস্ট গুলিই ভগবান রামের হস্তে দিলেন আর ভগবান রাম তাই আনন্দে ভোজন করলেন। লক্ষণ দেখে অবাক। মনে মনে ভাবলেন- “দাদা এমন শবরীর উচ্ছিষ্ট খাচ্ছেন!” শবরী সেই মিষ্ট জাম ফল গুলির কিছু লক্ষণের হাতেও দিয়েছিলেন। লক্ষণ নিয়ে খাওয়ার অছিলায় ফেলে দিয়েছিলেন । আমরা ভগবানের উচ্ছিষ্ট খাই- কিন্তু ভগবান আজ ধরাধামে এসে নিজে ভক্তের কাছে গিয়ে তাঁরই উচ্ছিষ্ট ফল আনন্দে সেবা নিচ্ছেন। একেই বলে ভক্তি । লক্ষণ জীবাত্মা। জীবের কিছু সংস্কার বশত ছুঁৎমার্গ থাকে- কিন্তু পরমপিতা পরমেশ্বরের সেসব থাকে না। তাই লক্ষণ ফেলে দিয়েছিলো- কিন্তু ভগবান রাম আনন্দে ভোজন করলেন । এইভাবে শবরী নিজেকে ধন্য করলো। অন্তে শ্রীরামের সাথে মতঙ্গ মুনির আশ্রম, যজ্ঞ স্থল, সাধনার স্থান ঘুরে দেখালেন। এরপর অন্তিম ক্ষণ উপস্থিত । শবরী বৃদ্ধা ভগবান শ্রীরামের সামনে দেহ ত্যাগ করে দিব্যদেহ প্রাপ্তি করে বৈকুণ্ঠে গমন করলেন । লক্ষণ জিজ্ঞাসা করেছিলেন উচ্ছিষ্ট ফল গ্রহণের হেতু? ভগবান রাম জানালেন- “আমি ভক্তের অধীন। ভক্ত আমাকে প্রেম পূর্বক যা দেয় আমি তাই গ্রহণ করি।”

( অরণ্যকাণ্ড সমাপ্ত ) 
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger