সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( অরণ্যকাণ্ড পর্ব- ১৩ )

রামচন্দ্র কিছুতেই জানকী দেবীর কথা উপেক্ষা করতে পারলেন না। সেই মৃগকে ধরবার মনস্থ করলেন। ধনুর্বাণ নিয়ে ধাইলেন মৃগের দিকে। মারীচ দেখলো স্বয়ং প্রভু আসছেন। অন্তরে প্রনাম জানিয়ে রাবণের বুদ্ধিমতো কাজ করা আরম্ভ করলেন । রামচন্দ্র আসতেই মারীচ দৌড়ে জঙ্গলে চললেন। কারণ রাবনের আদেশে রামচন্দ্রকে এই স্থান থেকে অনেক দূরে নিয়ে যেতে হবে। রামচন্দ্রও ধনুর্বাণ উঁচিয়ে মৃগের পিছু পিছু জঙ্গলে প্রবেশ করলেন। মারীচ কখনো বা ঝোপে আত্মগোপন করে, কখনো বা পুচ্ছ নাড়িয়ে রামচন্দ্রের মন আকর্ষিত করে আরোও গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করে। রামচন্দ্র পিছন পিছন ধাবমান হন। মারীচ জানে আজ তার বাঁচবার উপায় নেই। বরং এই দিন তার এই অভিশপ্ত রাক্ষস জীবন থেকে মুক্তির দিন । এতকাল ধরে যে ভগবানের পূজা করেছেন সেই ভগবানই তাকে মুক্তি দেবেন। তাই মৃগরূপী মারীচ আরোও ঊর্ধ্বশ্বাসে গভীর ঘন অন্ধকার জঙ্গলের দিকে দৌড়ে যেতে লাগলেন । এই পঞ্চবটী থেকে ধীরে ধীরে অনেক দূরে। রামচন্দ্র কোনোদিকেই খেয়াল রাখছেন না , তাঁর মস্তকে একটাই কথা ভাসছে- সীতাদেবীর আবেদন যে এই স্বর্ণমৃগ চাই। কোনোদিন সীতাদেবী কিছু আবদার করেন নি। আজ তাঁর এই আবদার রাখতে হবে। রামচন্দ্র বুঝলেন না যে পঞ্চবটি থেকে তিনি কতদূরে গভীরে চলে এসেছেন । কত গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করে ফেলেছেন । তাও তিনি এসব চিন্তা একদমই না করে মারীচের পেছন পেছেন দৌড়াচ্ছেন । মৃগটিকে শরবিদ্ধ করতে গিয়েও পারছেন না। মৃগ এক জায়গা তে অবস্থান করেনা । একবার ঝোপের আড়ালে, একবার অন্যদিকে, একবার তৃণবণ পার করে ছুটছে । খানিক বাদে অনেক দূরে এসে মৃগরূপী মারীচ দাঁড়িয়ে পড়লো। ভগবান রাম তখন শর নিক্ষেপ করলেন। শ্রীরামের বাণে বিদ্ধ হতে মারীচ নিজ মৃগ রূপ ছেড়ে রাক্ষস রূপে আসলেন। এরপর ভগবান রামের গলার অনুকরণ করে বললেন- “হে লক্ষণ! আমাকে বাঁচাও। কোথায় আছো লক্ষণ?”

অপরদিকে পঞ্চবটীতে সীতা মারীচের নকল কণ্ঠস্বর শুনে খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলেন। ভয়ে তাঁর হাত পা শুকিয়ে গেলো। প্রচণ্ড ভয়ে তিনি চমকে উঠলেন। তবে কি হরিণ ধরতে গিয়ে রঘুপতি কোনো বিপদে পড়লেন ? হিংস্র পশু ও ভয়ানক রাক্ষসদের এলাকায় বিপদ সাথে সাথে ঘুরে বেড়ায়। সুযোগ পেলেই থাবা বসায় । সীতাদেবী দেখলেন এই রামচন্দ্রের কণ্ঠস্বর শুনেও লক্ষণ চুপচাপ বসে। সীতাদেবী অবাক হলেন। যে লক্ষণ নিজেকে রামচন্দ্রের দাস বিবেচোনা করতো সে আজ প্রভুর বিপদে কেন যাচ্ছেন না? এই কি প্রভুভক্তি? সীতাদেবী বললেন- “দেবর লক্ষণ! বোধ হয় তোমার দাদা নিশ্চয়ই বিপদে পড়েছেন? শুনলে না কেমন ভাবে তিনি সাহায্য চাইলেন। তুমি সত্বর গমন করো।” লক্ষণ বলল- “বৌঠান! সেই শব্দ আমি শুনেছি। কিন্তু সেই স্বর কদাপি আমার জেষ্ঠ্যভ্রাতার নয়। আমার ভ্রাতা মহাবীর। তিনি মানব, রাক্ষস, দৈত্য, অসুর, পশু, নাগ, গন্ধর্ব, কিন্নর, যক্ষ, বেতাল, কুস্মাণ্ড, দেবতা, পক্ষী, পন্নগ কাহাদের দ্বারাও আক্রান্ত হতেই পারেন না। তাঁরই তেজে সকলে ভীত হয়। আপনি নিজের চোখেই দেখলেন অগ্রজ অনায়েসেই বীর রাক্ষসদের যমালয়ে প্রেরণ করেছেন। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।” সীতাদেবী ক্রোধে লক্ষণকে খুব বকাঝকা করে বললেন- “আমি আমার পতির বিপদে নিশ্চিন্ত থাকবো এমন পাপীষ্ঠি নই । তুমি নিজেকে ওনার দাস বলো - তবে ওনার বিপদে কেন এমন নিশ্চিন্ত হয়ে আছো? উনি তোমাকে অনেক স্নেহ করেন, তার প্রতিদান এইভাবে দিচ্ছো? তুমি তোমার ভ্রাতার বিপদ দেখে অগ্রসর হবে না? কেমন ভ্রাতা তুমি?” লক্ষণ, সীতাদেবীকে অনেক বোঝালেন। জানালেন ঐ স্বর নিশ্চয়ই কোন মায়াবী রাক্ষসের। তারাই মায়া দ্বারা দাদার কণ্ঠ নকল করেছে । সীতাদেবী বললেন- “বুঝেছি লক্ষণ তোমার মনে কুমতলব আছে। নিশ্চয়ই ভরতের সাথে তুমি গোপোনে আঁতাত করে রঘুপতির জীবন বিপদে ফেলতে চাইছো । সেই উদ্দেশ্যেই তুমি অরণ্যে এসেছো। কিন্তু মনে রাখো তুমি কদাপি আমাকে প্রাপ্তি করতে পারবে না। তোমার অগ্রজের কিছু হলে আমিও এই জীবন আর রাখবো না।” শুনে সৌমিত্র রোদন করতে করতে বলল- “বৌঠান! এইসকল কুচিন্তা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারবো না। আপনি কেন এইসব বলছেন? আমি আমার ভ্রাতার জন্য নিজের জীবন দিতেও রাজী। কিন্তু আপনার এই সকল কথা আমি সহ্য করতে পারবো না।” সীতাদেবী বললেন- “বেশ! তবে গিয়ে তোমার দাদাকে ফিরিয়ে আনো, আমার বুদ্ধি ভ্রষ্ট হয়েছিলো যে আমি ওনাকে সেই হরিণ ধরতে বলেছিলাম।”

লক্ষণ এই সকলের পেছেন গভীর ষড়যন্ত্র ও রাক্ষসের মায়া কিছুটা অনুমান করলেও পুরো পরিকল্পনা ধরতে পারছিলো না। সে তখন তূন থেকে একটি শর বের করে কুটিরের চারপাশে গণ্ডী কেটে বলল- “বৌঠান । আমার দিব্যি , যতক্ষণ আমি আর আমার অগ্রজ ফিরে না আসি, আপনি এই গণ্ডী অতিক্রম করবেন না। যদি প্রবল ঝড়, তাণ্ডব আসে- তবুও না।” বলে লক্ষণ চলে গেলো গভীর বণে। অপরদিকে রামচন্দ্র মারীচের এমন আচরণ দেখে অবাক হল। মারীচ বলল- “প্রভু রাম! আমি আপনার শরণাগত! আপনি আমাকে মুক্তিদান করুন। আপনার হাতে মৃত্যু প্রাপ্তির জন্যই আমি এইরকম মৃগ সেজেছিলাম এক ষড়যন্ত্রের পাত্র হয়ে। হে মহাপ্রভু! আপনাকে কুটির হতে বহুদূর আনার জন্যই আমি এত দূরে এসেছি।” রামচন্দ্র চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বললেন- “মারীচ! তুমি কার আদেশে এসব করছ?” মারীচ আর কথা বলল না। তার প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গেছে । লক্ষণ বণে গিয়ে রামচন্দ্রের চরণ চিহ্ন অনুসরণ করে গভীর বনে প্রবেশ করলো , রামচন্দ্রকে খুজবার জন্য। কুটিরের ভেতরে একলা সীতাদেবী অবস্থান করছেন। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে স্বামীর মঙ্গলের জন্য গৌরীদেবীকে ডাকছেন । এমন সময় দশানন রাবণ আসলো। কিন্তু লক্ষণের টানা গণ্ডী পার হতে পারলো না। সেই গণ্ডী থেকে প্রলয় সমান অগ্নি উৎপন্ন হচ্ছিল্ল। যতবার গণ্ডীর কাছে যাওয়া যায় ততবার সেই প্রলয়াগ্নি প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে। রাবণ ভাবল এই সময় ভিতরে গিয়ে সীতাকে তুলে আনা অসম্ভব। এমন কিছু করতে হবে যাতে সীতা স্বেচ্ছায় এই গণ্ডী অতিক্রম করে বাইরে আসে। রাবণ এক সাধুর বেশ ধরল।

এখানে আলোচনা বহির্ভূত একটি কথা বলা যাক । রাবণ এক সাধুর বেশে হরণ করেছিলো। আজকাল আমরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সাধু দেখলেই, গেরুয়া কাপড়- দণ্ড কমণ্ডলু দেখলেই গলে যাই। এমন না যে সব সাধুই অসাধু । সাধুকে সম্মান করা হিন্দুদের কর্তব্য! তবে সাধু মানেই যে ব্রহ্মচারী তপস্বী, মানুষের মঙ্গলকামী এমন ভাবার কারন নেই। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দেব এই প্রসঙ্গে একটা সুন্দর কথা বলেছিলেন- “সাধুকে দিনে দেখবি, রাত্রে দেখবি- তবেই বিশ্বাস করবি।” আজকাল অনেক ক্রিমিনাল পুলীশের থেকে বাঁচতে এই ভাবে সাধুর ছদ্দবেশ নেয়। কিছু ধরা পড়ে, কিছু হয়তো ধরা পড়ে না। হয়তো তারা মানুষের সর্বনাশ চালিয়ে যেতে থাকে। আসলে মানুষ খুব ধর্মভীরু – আর এই সুযোগটা নেয় এরা। বোধ হয় রাবণ এই পথ সেই সমস্ত ক্রিমিনালদের দেখিয়ে গেছে, যারা আজকের যুগে সাধু সেজে মানুষের ক্ষতি করে দেয় । সাধু- সন্ন্যাসীর দর্শন, সেবা অত্যন্ত পুন্যা কাজ- কিন্তু তার আগে চোখ-কান খোলা রেখে সতর্ক থাকুন ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger