সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( অরণ্যকাণ্ড পর্ব- ১৯ )



রাম, লক্ষণ জটায়ুর অন্তিম সংস্কার করে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন । চারপাশে বন জঙ্গল আর টিলা। দূরে ঋষমূক পর্বত দেখা যাচ্ছে। ভগবান রাম ও লক্ষণ জানতেন যে ঐ পর্বতে মতঙ্গ মুনির আশ্রম । যদিও মতঙ্গ মুনি এখন আর ইহলোকে নেই। তবুও তাঁর পবিত্র আশ্রম আছে। ঐদিকেই যেতে হবে। তারা দুজনে যেতে যেতে দশানন রাবণের সম্বন্ধে নানা বাক্যালাপ করতে লাগলেন । রামচন্দ্র বললেন- “যদি দশানন আমার স্ত্রীকে সম্মান সহিত ফিরিয়ে না দেয় , তাহলে দশাননের দশ মস্তক আমি ভূপতিত করবো। ত্রিলোকের কোন শক্তি তাকে রক্ষা করতে পারবে না। লঙ্কা ধ্বংস করবো।” লক্ষণ তাঁর অগ্রজকে উৎসাহ যোগাচ্ছেন। তিনি বললেন- “অবশ্যই অগ্রজ! আপনি সেই পাপী দশানন রাবণকে বিনাশ করবেন। সেই কাপুরুষ যে কিনা চুপিসারে চৌর্য বৃত্তি করে, সে কোন ভাবেই বীর হওয়ার যোগ্য নয়। ধূর্ত শৃগাল - ব্যাঘ্রের চর্ম পরিধান করলেই সে ব্যাঘ্র হয় না। সেই দশানন সেইরূপ ধূর্ত শৃগালের ন্যায়- যে ব্যাঘ্রের নকল করেছে, মনে প্রানে ব্যাঘ্রের ন্যায় সাহসী বীর হতে পারেনি।” এইরুপ আলাপ করতে করতে এগুতে থাকলেন তারা বনের মধ্য দিয়ে । বনের পশুপক্ষী সকল রাম , লক্ষণকে দেখে সকল হিংসা বিস্মিত হয়ে তাঁহাদের অতি নিকটে আসছিলো। লক্ষণ জঙ্গল থেকে মিষ্ট ফল, নদীর শীতল মিষ্টি জল সংগ্রহ করে আনলেন। কিন্তু রামচন্দ্রের মন শোকে, ক্রোধে জর্জরিত। তিনি কি আর আহার করবেন? লক্ষণ অনেক কষ্টে অগ্রজকে আহার করিয়ে নিজে যৎসামান্য আহার করলেন। দুজনেই শোকে অস্থির ছিলেন । তবে লক্ষণ এই ভেবে সান্ত্বনা পাচ্ছিল্লেন যে শ্রীরামচন্দ্র এখন শোকে ভেঙ্গে না পড়ে বরং বীরের ন্যায় সীতাদেবীকে খুঁজতে অগ্রসর হচ্ছেন। আর সেই সাথে সীতাদেবীকে কে হরণ করেছে তার পরিচয় পাওয়া গেলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেই দুরাচারী রাবণ, সীতাদেবীকে কোথায় নিয়ে গেছে তা জানা যায় নি। তবে খুঁজলে অবশ্যই এই রহস্য উন্মোচন হবে।

দুজনে বনে চলছেন। হঠাত একসময় মনে হল যেনো সহস্র হস্তী একত্রে ধেয়ে আসছে। বনের বৃক্ষগুলি উৎপাটিত হল। মুহুর্মুহু চরণ ফেলবার শব্দে চারিপাশ কম্পমান হল। কে যেনো বৃক্ষ গুলিকে সজোরে উৎপাটন করে দূরে নিক্ষেপ করে তাদের পানেই আসছে । বাঁশবণ, তাল বৃক্ষের সারি, শাল বৃক্ষ উৎপাটন করে আসছে, তাঁরই পদশব্দে মেদিনী ধুপ ধুপ করে ক্ষণে ক্ষণে কাঁপছে। রাম ও লক্ষণ উভয়ে ধনুর্বাণ উচিয়ে ধরলেন । সম্মুখে বৃক্ষ গুলি দুলিয়ে এক অদ্ভুদ দৈত্য বের হল। দৈত্য বলা ভুল তাকে পিশাচ বলতে হয় । বড়ই বিকট দর্শন চেহারা। সে একটি কবন্ধ। অতি স্থূল, পর্বতপ্রমাণ দীর্ঘ চেহারা। ধড়ে মুণ্ড নেই। বুকে বিশাল চোখ, নাকের গর্ত এক দুটি গহ্বরের মতো। রক্তবর্ণ ওষ্ঠের মধ্যে বিশাল তীক্ষ্ণ হস্তীদন্তের ন্যায় দন্তসাড়ি প্রকটিত হয়ে আছে । সেই কবন্ধ বলল- “আহা বড়দিন বাদে নর মাংস ভোজনের সুযোগ এসেছে। প্রত্যহ পশুপক্ষী ভোজন করে ক্লান্ত হয়েছি। আজ মনুষ্য মাংস আহার করিব।” রাম , লক্ষণ অনেক বোঝালেন। বললেন- “কবন্ধ! বাঁচতে চাইলে সম্মুখ থেকে পলায়ন কর। আমাদের মনে ভীষণ ক্রোধের উদ্দগীরন হচ্ছে, তুই নাতো এই ক্রোধের বলি হোস। অন্যত্র প্রস্থান কর।” কবন্ধ জানালো- সে এই মানুষের থেকে ভীত নয়। এই বলে দুই হাত দিয়ে রাম লক্ষণ কে ধরল। ভগবান রাম বললেন- “তবে তুই মর ।” এই বলে রাম ও লক্ষণ খড়্গবাণ নিক্ষেপ করলেন। রাম ও লক্ষণের শরে কবন্ধের দুই হস্ত কেটে আলাদা হয়ে গেলো। ফিনকি দিয়ে রক্তধারা ছুটলো। প্রস্তর সড়িয়ে পর্বতে নদীর পথ উন্মুক্ত করা মাত্র যেভাবে নদী প্রবল জলচ্ছাস নিয়ে প্রবাহিত হয়- সেই ভাবেই রক্তবন্যা হল। কবন্ধ ভূমিতে পতিত হল। কাট হস্তের তালু থেকে - মানুষ যে ভাবে দ্বার খুলে গৃহ থেকে বাহিরে আসে, সেই ভাবে রাম ও লক্ষণ, কবন্ধের আঙ্গুল খুলে বাইরে আসলেন ।

কবন্ধ বলল- “আপনারা কারা? আপনারা কোন সাধারন মানব নন।” রাম ও লক্ষণ নিজ পরিচয় দিয়ে বনে আগমন, রাবণ দ্বারা সীতা হরণ সকল সংবাদ দিলেন । কবন্ধ বললেন- “হে প্রভু রামচন্দ্র! আপনি সেই বৈকুণ্ঠের বিষ্ণু । আমি শাপিত হয়ে এই হেন অবস্থা প্রাপ্তি করেছিলাম । বহু পূর্বে আমি সুন্দর এক দানব ছিলাম । রূপে আমি কন্দর্প সদৃশ ছিলাম । কিন্তু রূপে যৌবনে অহঙ্কার জন্মায় আর অহঙ্কার থেকে হয় সর্বনাশ। একসময়ে আমি এইরূপ মায়াবলে বিকৃতরূপ ধরে এখানে সাধু সন্ন্যাসীদের ভয় দেখাতাম । একদিন মহর্ষি স্থূলশিরাকে ভয় দেখানোর পাপ করেছিলাম। মহর্ষি স্থূলশিরা বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে আমাকে এই বিকৃত রূপে সদা এইস্থানে থাকবার অভিশাপ দিয়েছিলেন। মহর্ষি জানিয়েছিলেন ভগবান বিষ্ণু ধরিত্রীতে অবতার ধারন করে যখন আমার হস্তদ্বয় ছিন্ন করে আমাকে কৃপা করবেন, তখনই আমার মুক্তি ঘটবে। এরপর দেবরাজ ইন্দ্রের সাথে যুদ্ধের সময় দেবরাজ ইন্দ্রের বজ্রের আঘাতে আমি এই দশা প্রাপ্ত হই আমার শির , বুকে প্রবেশ করে। হে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র , আমাকে আপনি মুক্তি দান করুন। আমাকে অগ্নিতে সমর্পণ করুন।” রামচন্দ্র এই শাপিত কবন্ধকে মুক্তি দান করলেন । এরপর লক্ষণকে অগ্নিকুণ্ড জ্বালাতে বললেন। লক্ষণ অগ্নিকুণ্ড জ্বালালে ভগবান রাম কবন্ধকে প্রশ্ন করলেন- “ওহে কবন্ধ। আমার স্ত্রী সীতাকে, রাবণ অপহরণ করে নিয়ে গেছে। তুমি জানো সে কোথায় সীতাকে নিয়ে গেছে?” কবন্ধ বলল- “প্রভু! দেবী সীতাকে রাবণ কোন স্থানে নিয়ে গেছে তাহা আমি জানি না। কিন্তু সীতাদেবীকে খুঁজে বের করার একটি উপায় আমি জানি। আমাকে পূর্বে অগ্নিতে প্রবেশ করতে দিন। বর্তমানে এই পিশাচ রূপে আমি কোন শুভ কর্ম করতে অসমর্থ।” কবন্ধ অগ্নিতে প্রবেশ করলে, তাঁর দেহ দাহ হয়ে এক সুন্দর দেবতা প্রকট হলেন। রামচন্দ্রকে বন্দনা করে বললেন- “প্রভু! সামনেই ঋষমূক পর্বতে বানররাজ বালির ভয়ে তার ভ্রাতা সুগ্রীব , হনুমান, জাম্বুবান , নল, নীল লুকিয়ে আছে। বালিকে মতঙ্গ মুনি বহু পূর্বে শাপ দিয়েছিলো। যার ফলে বালি এই পর্বতে আসতে পারে না। আপনি সুগ্রীবের সাথে মিত্রতা করুন। বানরেরা অবশ্যই মাতা সীতাকে অন্বেষণ করবে।” এই বলে কবন্ধ মুক্তি পেয়ে ভগবানের ধামে গমন করলো।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger