সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( সুন্দরাকাণ্ড পর্ব- ১৪ )



নল নীল কাজের দায়িত্ব পেলো । কিন্তু ভগবান রাম ভাবলেন অন্য কথা । প্রতি শুভ কাজের আগে ইষ্ট দেবতার পূজা করা জরুরী । শ্রীরামের ইষ্টদেবতা হলেন ভগবান মহেশ্বর । সেই রুদ্রদেবতার কৃপা না নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করা ঠিক হবে না । সেই নীলকণ্ঠ , দেবাদিদেব সর্বদা মঙ্গল ফল প্রদান করেন । তাই সবার অগ্রে শিবের পূজা সেড়ে নিতে হবে । শ্রীরাম তখন সুগ্রীব, জাম্বুবান, হনুমানকে জানালেন যে , “এই শুভ কাজ আরম্ভের পূর্বে ইষ্ট দেবতা ভগবান শিবের পূজা করা একান্ত মঙ্গলের হবে। অতএব শম্ভুর পূজো আগে সেড়ে নেই।” সকলে সম্মত হল। যেহেতু রাবণ পাপীষ্ঠি হলেও শিব উপাসক । আর ইষ্টদেবতা ভক্তের সঙ্গ নিয়ে ফেলেন। যদিও সেই দুর্মতি আর কোন রূপ সহায়তা পাবে না। তবুও ভগবান শিবের আশিস নিলে যুদ্ধে সাফল্য নিশ্চিত । কিন্তু সেই বালুকা তীরে সমুদ্র তটে কোন শিবমন্দির ছিলো না। ভগবান রাম হনুমানকে বললেন- “বতস্য হনুমান ! তুমি কৈলাস থেকে শিবলিঙ্গ আনয়ন করো। সেই শিবলিঙ্গে আমি পূজা করবো। কিন্তু যথা সময়ে এনো। শুভক্ষণ যেনো অতিক্রান্ত না হয়।” যাই হোক এখানে একটি কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ভগবান রাম একটি না দুটি শিবলিঙ্গ পরপর পূজা করেন তা নিয়ে দ্বিমত আছে। ভারতবর্ষের তামিলনাড়ুতে রামেশ্বর শিবমন্দিরের পাশে “রামনাথ” নামক একটি বহু প্রাচীন শিবমন্দির আছে। বলা হয় রামেশ্বর জ্যোতিরলিঙ্গ পূজা করবার পর ভগবান রাম “রামনাথ” লিঙ্গ স্থাপন করে এখানে পূজা করেন। যেহেতু একসাথে দুটি শিবলিঙ্গ পূজা করা অশাস্ত্রীয়। কিন্তু একটি পূজা করে আর একটি পূজা করা যায় । ভগবান রাম সেই শাস্ত্র নিয়ম পালন করেছেন । সুতরাং আমরা সেই তামিল উপকথার প্রসঙ্গ নিয়েই লেখছি। শ্রীরামের কথা শুনে হনুমান এক লম্ফ দিয়ে আকাশে উড়ে গেলো । দেখতে দেখতে তার বিশাল তনু দৃষ্টির বাইরে গিয়ে গভীর আকাশে যেনো মিলিয়ে গেলো । ভারতবর্ষের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে উত্তর প্রান্তে হিমালয়ে পৌছানো খুব সহজ ব্যাপার নয় । পবনের মতো বেগ ধারন করে পবনতনয় হনুমান উড়ে চলল মেঘের রাজ্য দিয়ে ।

নীচে দেখলো কত পাহার, কত গ্রাম, কত গভীর জঙ্গল, কত নদ নদী , কত রাজ্য, কত পথ ঘাট । রাক্ষসের উৎপাত আর কোথাও নেই । সমগ্র ভারতবর্ষ থেকে রাক্ষসের আতঙ্ক দূর হয়েছে। মুনি ঋষিরা পবিত্র যজ্ঞ করছে। রাজারা ধর্ম মেনে প্রজা পালন করছে । মানুষ আনন্দে রাস্তাঘাটে বের হয়েছে । বন গুলি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে । এই সব দেখতে দেখতে হনুমান চলতে লাগলো । একসময় অনেক পর্বত পার করে হিমালয়ের উপরে উড়তে লাগলো । যেনো তুষার চাদরে সমগ্র পর্বত ছেয়ে গেছে। ঠাণ্ডা ধোয়া বরফ পিণ্ড থেকে উড়ছে । চারপাশে শীতলতা। সেখানে দেখলেন কত শত মুনি এক পায়ে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরকে ডাকছে। তাহাদের জটা, দাঁড়ি ভূমি স্পর্শ করেছে। বরফে শরীর ছেয়ে গেছে । আরোও দেখলেন গুহার মধ্যে সব সাধুরা কেবল কৌপীন পড়ে ঠাণ্ডাকে জয় করে ঈশ্বর আরাধনা করছেন । একসময় নামলেন কৈলাস পর্বতে । সেখানে শিব আর ভবানী নানা আলোচনা করছেন । রুদ্র আর রুদ্রাবতারের মুখোমুখি দেখা হল। হনুমান করজোড়ে ভব ভবানীর স্তবস্তুতাদি করলেন । বললেন- “হে ভোলেনাথ। লঙ্কা আক্রমণের পূর্বে প্রভু শ্রীরাম আপনার পূজা করতে ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। হে আশুতোষ শঙ্কর ! আমার কাছে সময় স্বল্প । এর মধ্যে আপনার জ্যোতিরলিঙ্গ নিয়ে লঙ্কায় পৌছাতে হবে। কৃপা করে প্রদান করুন।” ভগবান মহেশ্বর বললেন- “হনুমান। পাপী রাবণকে আমি আর কোন প্রকার সহায়তা করবো না। তবে সে দেবীর ভক্ত। দেবী ভবানী, ভদ্রকালী রূপে তাকে সহায়তা করেন কিনা! যাই হোক আমি তোমাকে জাগ্রত লিঙ্গ প্রদান করছি। শীঘ্র তুমি নিয়ে যাও।” এত বলি মহাদেব নিজ হৃদয় থেকে একটি জ্যোতির্ময় শিবলিঙ্গ উৎপন্ন করে হনুমানের হস্তে দিলেন । হনুমান পুনঃ হরগৌরীর বন্দনা করে দক্ষিণ প্রান্তে রওনা দিলেন। এদিকে হনুমানের আসতে অনেক দেরী। বহুক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন শ্রীরাম । বানরেরা উচু টিলায় উঠে দেখতে লাগলো হনুমান আসেন নাকি । কিন্তু হনুমান আর আসে না। অপরদিকে শুভ সময় বয়ে যাচ্ছে। তখন শ্রীরাম বললেন- “বোধ হয় হনুমানের আসতে বিলম্ব হবে। আমি বালুকা দ্বারা শিবলিঙ্গ রচনা করে পূজা করবো। তোমরা বিল্ব পত্র , বেল, ধুতুরা, আকন্দ, নীলকণ্ঠ, ভাট পুস্পের , ফলমূলাদির বন্দোবস্ত করো।” নিমিষে বানর সেনারা সব কিছু নিয়ে এলো। ভগবান রাম সমুদ্রের জল দ্বারা বালুকা মেখে একটি শিবলিঙ্গ তৈরী করতে লাগলেন । ধীরে ধীরে একটি শিবলিঙ্গ গঠন করলেন । আশে পাশে থেকে মুনি ঋষিদের এনে এরপর পূজায় বসলেন ।

হরি আর হরের লীলা কে বুঝতে পারে ? কৈলাসে মহাদেব দেখছিলেন। আর বলছিলেন – “দেবী ! নিত্য আমি যাঁকে ধ্যানে অন্বেষণ করি- আজ তিঁনি আমার পূজো করছেন।” অপরদিকে ভগবান রাম পূজায় বসলেন। এখানে সামান্য উপাচারে পূজা। মহা মন্ত্র সকল উচ্চারন করে সমুদ্রের জল দ্বারা শিবলিঙ্গের অভিষেক করলেন । সশস্ত্র অবস্থায় তিনি পূজায় বসেছিলেন । এরপর বেলপাতা , বেল, পুস্পাদি দ্বারা শিবলিঙ্গে পূজা করলেন । দীপ- ধূপ দ্বারা আরতি আদি করে বনজ ফলমূল উৎসর্গ করলেন । মহাদেব সামান্যতেই তুষ্ট। সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি শিবপূজার। কোন আড়ম্বর নেই। সামান্য গঙ্গাজল আর বেলপাতা দিয়ে ব্যোম ব্যোম শব্দ তেই প্রসন্ন হন । এইবার ভগবান রাম করজোড়ে প্রার্থনা করে বললেন- “হে আশুতোষ! হে মহাদেব! আপনি আমার প্রণাম স্বীকার করুন। হে নীলকণ্ঠ আপনার অপার করুণা । আপনি দয়ার মূর্তি। আপনি কৃপা করে এই পূজা স্বীকার করুন । হে রুদ্রদেব! আমাকে আশীর্বাদ করুন যেনো এই যুদ্ধে আমি জয়ী হয়ে রাবণ বধ করে সীতাকে উদ্ধার করে নিজ রাজ্যে ফিরে যেতে পারি। হে চন্দ্রমৌলি! হে ভগবন! হে গৌরীপতি ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা জানাই, যেনো আমার এই সহায়কেরা যুদ্ধে অনায়েসে রাক্ষসদের বধ করতে পারে, আমি এও জানি একমাত্র আপনি সহায় থাকলেই এই শুভ কর্ম সম্ভব হবে। হে নটরাজ ! হে ত্রিলোচন , আমাকে কৃপা করে বিজয়ী হবার বর প্রদান করুন। হে মহেশ! আপনি পুরাকালে অসুর সমূহকে নাশ করে যেরূপ দেবতাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন, সেইরূপ এই লঙ্কা জয়ের পথে সমগ্র বাধাকে দূর করে আমার মঙ্গল করুন । দেবাদিদেব, আপনি সকল দেবতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ! আপনার আরাধনা করেই বৃহস্পতি দেবতাদের গুরু হতে পেরেছেন, সেইরূপ আপনার আরাধনা করেই যেনো আমি রাবণের বিনাশক হতে পারি । হে চন্দ্রচূড় ! আমাকে দয়া পূর্বক আশিস প্রদান করুন।” এইভাবে ভগবান রাম লঙ্কা জয় করবার জন্য প্রার্থনা করতে লাগলো । হনুমান তখনও এসে পৌছায় নি । ভগবান শিব প্রসন্ন হলেন ।

( ক্রমশঃ ) 
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger