সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( সুন্দরাকাণ্ড পর্ব- ১৩ )


রাবণ কোন মতেই মানলো না সুবুদ্ধি। কেকসী এবং বিশ্বশ্রবা মুনি এসে রাবণকে অনেক বোঝালো । বলল- “পুত্র দশানন ! পুলস্ত্য ঋষির বংশজ হয়ে কেন এইরূপ কুকাজ করছ ? এতে আমি লজ্জিত বোধ করছি । তার উপর সীতা দেবী সাক্ষাৎ দেবী লক্ষ্মী। তোমাকে এর পূর্বে বহুবার সংযত হতে বলেছি । বারবার বলেছি ভগবান শ্রীহরি মর্তে আবির্ভূত হয়েছেন । ইতিপূর্বে তিঁনি তাড়কা, সুবাহু, মারীচ, বিরাধ, খড়, দূষণ , ত্রিশিরা রাক্ষস সংহার করেছেন । তুমি সেই বিষ্ণু অবতার রামচন্দ্রের স্ত্রীকে অপহরণ করে এনেছো। তুমি ভগবান বিষ্ণুর ক্রোধ সম্বন্ধে অবগত নও । সেই ক্রোধে তোমার লঙ্কা উজার হয়ে যাবে। অতএব সীতাকে ফিরিয়ে দিয়ে আসো।” রাবণ বলল- “তা হয় না। ঐ ভিক্ষুক রাম যদি বিষ্ণু হয়, তবে আমি বিষ্ণু বধ করবো। কিন্তু সীতাকে কদাপি ফেরাবো না। হয় সীতা আমার কণ্ঠের উজ্জ্বল মাল্য হয়ে ভূষিত হবে, নচেৎ তাকে দুমাস বাদে হত্যা করবো। দেখি ঐ রাম কি করতে পারে ? বনের পশু নিয়ে সে যে দল গঠন করেছে, লঙ্কার একজন রাক্ষস সেই গোটা দলকে ভক্ষণ করতে সমর্থ । এবার রাক্ষস বধ করার পরিণাম রাম হারে হারে টের পাবে। তাড়কা, সুবাহু, মারীচ, বিরাধ, খড়, দূষণ , ত্রিশিরা রাক্ষস বধের শাস্তি সে পাবে। আসুক সেই রাম। ওদের এমন শাস্তি দেবো যে ভবিষ্যৎ এ আর কেউ রাক্ষস বধ করবার কথা স্বপ্নেও চিন্তা করবে না।” বিভীষণ বলল- “অগ্রজ! পিতার কথা মেনে নিন। আপনি সীতাকে নয় লঙ্কার বিনাশকে এনে অশোক বনে পালন করছেন । ভগবান শ্রীরামের সাথে যুদ্ধ করা মানে লঙ্কার পরাজয় নিশ্চিত । ভগবান শ্রীরামের শর থেকে এই লঙ্কাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না? কেন আপনি সেই শক্তিমান রামচন্দ্রের সাথে শত্রুতা করছেন ? সীতাকে ফিরিয়ে দিন।” শুনে রাবণ ক্রোধে গর্জে বলল- “চুপ করো! তোমার মুখে কেবল ঐ ভিক্ষুক রামের প্রশংসা । পুনঃ যদি রামের প্রশংসা করে আমাকে বোঝাতে আসো তবে পদাঘাত করে লঙ্কা থেকে বিতারিত করবো।”

রাম, লক্ষণ, জাম্বুবান, হনুমান, সুগ্রীব, অঙ্গদ, নল- নীল আদি সব সেনা বিশাল সমুদ্রের পাড়ে পৌছালো । বিশাল সমুদ্র। আর বিশাল ঢেউ এসে তীরে আছরে পড়ছে। সেই উত্তাল ঢেউয়ের আওয়াজে কান ঝালাপালা হয় । তার তীরে সব বানরেরা বসে দেখছিলো । কিভাবে পাড় হবে এই সমুদ্র । এতে তো নৌকা নিয়ে পারাপার করাও অসম্ভব । সকলে কেবল মুখ চাওয়া চাওয়ি করছিলো । আর ভগবান রামের দিকে তাকিয়েছিলো । তখন লক্ষ্মণ বললেন- “ভ্রাতা! আপনি আদেশ দিলে এখুনি এই সমুদ্র শুকিয়ে যাত্রাপথ রচিত করি।” ভগবান রাম বললেন- “কদাপি নয়। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হবে। বহু জলজ জীবের প্রানহানি হবে। আমি সমুদ্র দেবের তপস্যা করে ওনাকে সন্তুষ্ট করে যাত্রাপথ চাইবো।” এই বলে ভগবান রামচন্দ্র করজোড়ে সমুদ্র দেব রত্নাকরের স্তবস্তুতি করতে লাগলেন । বললেন- “ হে রত্নাকর ! হে সমুদ্র দেবতা! রঘুনন্দন শ্রীরাম আপনাকে প্রণাম জানাচ্ছে। হে দেব! আপনি অগাধ, আপনি উত্তাল হয়েও জলজ প্রানীকে মাতৃক্রোড়ে থাকা শিশুর মতো তাদের আশ্রয় দিয়েছেন । হে সিন্ধুদেব! আপনি ঐশ্বর্য দায়িনী দেবী লক্ষ্মীর পিতা, সেই কারণে সর্বলোকে সম্মানীয় । হে সমুদ্র দেব! তোমার জলরাশি পরম পবিত্র, কারণ সমস্ত পুন্যা নদী এসে তোমাতেই বিলীন হয় । হে দেব প্রসন্ন হোন! আপনি অবগত দুষ্ট দশানন আমার পত্নীকে হরণ করে লঙ্কা নিয়ে গেছে। তাঁকে মুক্ত করতে আমাদের লঙ্কায় যেতে হবে। আপনার অগাধ জলরাশি মাঝে পথ দিন। হে সিন্ধুদেব, কৃপা করুন।” এই বলে ভগবান শ্রীরাম সমুদ্র দেবতার পূজা করে তপস্যায় বসলেন । তিনদিন কেটে গেলো। তবুও সমুদ্র দেবতা দেখা দিলেন না। কোন রকম পথ দিলেন না। বিশাল ঢেউ এসে তীরে আছরে পড়তে থাকলো। তখন দাশরথি রাম ধ্যান ভঙ্গ করে উঠে গর্জে বললেন- “হে সমুদ্র ! তুমি সাহায্য করলে না। তিনদিন ধরে নির্জলা নিরম্বু উপবাস করে তোমার তপস্যা করেছি , তবুও তুমি সহায়তা না করে কেবল গর্জন করে ঢেউ উৎপন্ন করে নিজ দর্প প্রকাশ করেছো। এতদিন এই ত্রিলোক এই রামের কোমল , নমনীয় স্বরূপ দেখেছে, এবার কঠিন রূপ দেখবে।” এই বলে ভগবান রাম ধনুকে অগ্নিবাণ আনলেন ।

শ্রীরামের শর দিয়ে প্রলয়াগ্নি নির্গত হতে লাগলো । যেনো ত্রিলোক পুড়ে ভস্ম হবে। চতুর্দিকে কেবল অগ্নির সপ্ত জিহ্বা দেখা গেলো । শ্রীরাম সেই বাণ নিক্ষেপ করতে উদ্যত হলেন । সেই সময় সমুদ্র দেব উদিত হলেন । করজোড়ে বললেন- “ক্ষান্ত হন প্রভু! আমাকে অগ্নিবাণে শুকাবেন না। হে প্রভু আপনি স্বয়ং সৃষ্টি পালন করেন। আমাকে শুকিয়ে আপনি সৃষ্টির নিয়ম উলঙ্ঘন করতে পারেন না। হে দয়াময় রঘুপতি ! আমাকে কৃপা করে ক্ষমা করুন । আমি আপনার শরণ নিচ্ছি।” তখন ভগবান রাম কোমল হয়ে বললেন- “যে আমার শরণাগত হয় তাকে আমি ক্ষমা করি। যদি রাবণ এসেও আমার শরণ নেয়, তবে আমি তাকেও ক্ষমা করবো। হে সমুদ্র! সীতা উদ্ধারের জন্য আমি এই সেনা সমেত সমুদ্র লঙ্ঘন করে শত যোজন পারে লঙ্কায় যাবো। তুমি দুভাগ হয়ে মধ্যে স্থলপথ রচনা করে আমাদের যেতে দাও।” সমুদ্র বলল- “ এ হয় না প্রভু। এতে অনেক নিরীহ প্রানী মারা যাবে। আপনি বরং আমার উপরে সেঁতু নির্মাণ করে লঙ্কায় যান। আমি কথা দিচ্ছি যতদিন না আপনি সীতা উদ্ধার করে ফিরে আসেন, ততদিন এই সেঁতু আমি রক্ষা করবো।” সকলে বলল এই সমুদ্রে কিভাবে সেতুবন্ধন সম্ভব ? সমুদ্রের যে তাণ্ডব এখানে। সমুদ্র দেব বললেন- “প্রভু ‘রাম’ নাম জপ করে ভবসমুদ্র পার হওয়া যায়। এই সমুদ্র তো অতি তুচ্ছ। আপনার নাম নিয়ে সব সম্ভব । আপনি যেখানে, সকল সমস্যার সমাধান সেখানে। আপনার দলে বিশ্বকর্মা পুত্র নল নীল আছেন। তারা ছোট বেলায় ঋষি শাপ পেয়েছিলো যে তারা যা কিছু জলে ফেলবে সব ভেসে থাকবে, কিছুই নিমজ্জিত হবে না। তাহাদিগের দিয়ে বড় পাথর, বৃক্ষ সমুদ্রে ফেলে সেতু নির্মাণ করে লঙ্কায় গমন করুন।” তখন শ্রীরাম বললেন- “বেশ তাই হবে। কিন্তু আমি যে ক্রোধ বশত অগ্নিবাণ প্রকট করেছি এর কি হবে? একে তো ফেরানো যাবে না।” তখন সমুদ্র দেব বললেন “ হে প্রভু! আমার উত্তর প্রান্তে দুরাচারী রাক্ষসেরা থাকে। আপনি সেখানে এই অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করুন। যাতে সেই রাক্ষসেরা ভস্ম হয়ে মরে।” ভগবান রাম তখন সেই দিকেই অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করলেন। সেখানে অবস্থিত রাক্ষসেরা পুড়ে ভস্ম হল।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger