সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( সুন্দরাকাণ্ড পর্ব- ১১ )

এইভাবে দধিমুখের পালিত বানরেরা পালিয়ে গিয়ে দধিমুখকে খবর দিলো । দধিমুখ প্রচণ্ড ক্রোধে সেনা সমেত মধুবনে আসতে থাকলো । অপরদিকে বানরেরা মধুবনের ফলমূল আহার করে পরম সুখে বিশ্রাম নিছিল্ল। একে অপরের সাথে নানা প্রকার হাস্য কৌতুক করছিলো । কেউ কেউ আবার একে অপরের মস্তকের আবর্জনা পরিষ্কার করে দিচ্ছিল্ল । এত ফল খাওয়া সর্তেও মনে হয় বাগানের দশভাগের এক ভাগও ফল সমাপন হয় নি। এত ফল ছিলো বাগানে । চতুর্দিকে বিখিপ্ত ফলের খোসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছিলো বানরেরা। বড় বড় বৃক্ষের ডালে ঝুলে তারা খেলা করছিলো । মধু পান করে উদর ফুলিয়ে কেউ নিশ্চিন্তে শয়ন করছিলো । হনুমান, অঙ্গদ, জাম্বুবান, নল, নীল, গবাক্ষ এরা প্রচুর ফল খেলো । দধিমুখ এসে দেখে বাগান তছনছ করে রেখেছে বানরেরা। আবার শয়ন করছে সুখে । আরোও দেখলো অঙ্গদ, হনুমান সেখানে বসে ফলমূল সেবা করছে । দধিমুখ তখন তাদের বাগান থেকে বের হতে বলল। কিন্তু কেউ বের হল না। হনুমান আর অঙ্গদের অভয় পেয়ে সকলে আরোও নিশ্চিন্তে ফলমূল খেতে লাগলো। দধিমুখের কথা কেউ শুনলোই না । দধিমুখ তখন তার আশ্রিত বানরদের পুনঃ যুদ্ধ করবার আদেশ দিলো । হৈ হৈ করে দধিমুখের আশ্রিত বানরেরা তেরেফুরে আসলো । পুনরায় দুইদল বানরের মধ্যে মারামারি, আঁচর- কামড় ইত্যাদি চলতে লাগলো । একে অপরের উপর লম্ফ দিয়ে পড়ে কিল, মুষ্ট্যাঘাত করতে থাকলো । তখন অঙ্গদ তেড়ে ফুড়ে এসে গদা দিয়ে দধিমুখের আশ্রিত বানরদের পিটিয়ে বিতারিত করলেন । দধিমুখের আশ্রিত বানরেরা পালিয়ে গেলে দধিমুখ যুদ্ধে নামলো । অঙ্গদ আর দধিমুখের মধ্যে সেই যুদ্ধ আরম্ভ হল ।

দুজনের মল্লযুদ্ধে বড় বড় বৃক্ষ গুলি পতিত হল। কত শত ডাল ভেঙ্গে পড়লো। বানরেরা যে যেদিকে পারলো ভয়ে লুকালো । দধিমুখ কিছুতেই অঙ্গদের সাথে পেরে উঠছিলো না। অঙ্গদ তাকে তুলে ভূমিতে বারংবার আছার দিতে লাগলো । দধিমুখ হেরে গিয়ে পলায়ন করলো । পুনঃ তখন বানরেরা এসে গ্রেগ্রাসে ফলমূল ভক্ষণ করতে লাগলো । দধিমুখ তখন রাম, লক্ষণ , সুগ্রীবের কাছে গিয়ে বলল- “সুগ্রীব। তোমার ভাতুস্পুত্রের আর হনুমানের সাহায্যে বানরেরা মধুবন ভঞ্জন করেছে। সেখানে অযূথ ফলমূল তারা ভক্ষণ করেছে। বাধা দিতে গেলে আমাকে আর আমার আশ্রিত বানরদের মেরে তাড়িয়েছে । একি অনাচার সুগ্রীব!” তখন সুগ্রীব বললেন- “মাতুল! আপনি শোক কেন করছেন ? অঙ্গদ আপনার নাতি। তাঁর বীরত্বে আপনি প্রসন্ন হোন। সে আপনার মতো বীরকে পরাজিত করেছে । আপনি তাহাকে আশীর্বাদ করুন । আর সে এখন কিস্কিন্ধ্যার যুবরাজ । সমগ্র বানর জাতির আগামী রাজা। সে আমার ভ্রাতা বালির ন্যায় শক্তিমান হয়ে উঠছে। এতে সমগ্র বানরদের আনন্দ হওয়ার কথা।” দধিমুখ ভেবে দেখলো তাই তো। অঙ্গদ পরাক্রমী আর বীর হয়ে উঠেছে । সে নিজেই অত গুলি শক্তিশালী বানরদের মেরে তাড়িয়েছে । তাহার ন্যায় বীর কে বিতারিত করেছে । এতে আনন্দ হওয়ার কথা । তখন দধিমুখের সমস্ত রাগ কোথায় যেন মিলিয়ে গেলো । ভগবান রাম বললেন- “সেখানে কি হনুমানকে দেখেছেন?” দধিমুখ হ্যাঁ জানালো। ভগবান রাম খুশী সহকারে বললেন- “হনুমান সফল হয়েছে। সে ঠিক লঙ্কায় গিয়ে সীতার সাথে সাক্ষাৎ করে আমার সংবাদ দিয়েছে। তবেই সে নিশ্চিত হয়ে ফলমূল ভোজন করছে। দেখি সেই রাবণ কি উত্তর দিলো। সেকি জানকীকে ফিরিয়ে দেবে, না আমার সাথে যুদ্ধ করবে।” দধিমুখ ফিরে গিয়ে অঙ্গদের কাছে ক্ষমা চাইলো । হনুমান এরপর এক ছুটে প্রভু শ্রীরামের কাছে এলো ।

প্রভু শ্রীরামকে সষ্টাঙ্গে প্রনাম করে সমুদ্র যাত্রার সকল কিছু বলল। সেই যোগিনী স্বয়মপ্রভার কথা, সম্পাতির কথা , রাক্ষসী হত্যা , নাগমাতার পরীক্ষা, মৈনাকের উদয়, চামুণ্ডার বিদায়, মাতা সীতার সাথে সাক্ষাৎ, দুমাস পর সীতা হত্যার রাবণের অভিলাষ, রাবণের পুত্র ও রাক্ষসদের হত্যা, লঙ্কা দহন করা সব কিছু বলল। এরপর হনুমান ভগবান শ্রীরামকে বললেন- “প্রভু ! আপনার অঙ্গুষ্ঠ পেয়ে মাতা সীতা খুব প্রীতা হয়েছেন। তিনি এই মণি আপনাকে দিতে বলেছেন।” এই বলে হনুমান , মাতা সীতার দেওয়া মণি , ভগবানের হস্তে দিলেন। ভগবান রাম দেখলেন এই মণি স্বয়ং বৈদেহীর। তাঁর মস্তকে শোভা পেতো এই মণি । এই মণির স্পর্শ যেনো সীতার মতো। চোখ বন্ধ করে সেই মণি বুকে চেপে ভগবান রাম “হা সীতা!” বলে বিলাপ করতে লাগলেন । ভগবান রামচন্দ্রের মনে হতে লাগলো তিনি যেনো অন্ধকার গহ্বরে – আর সীতা তাকে ছেড়ে অনেক দূরে। ঐ বিশাল সমুদ্র পাড়ে একাকী । কিভাবে সেখানে পৌছানো যায় । হনুমান সীতাদেবীর দুর্দশা ব্যক্ত করে বলল- “প্রভু। আপনি সেদিন মৃগ ছদ্দবেশে থাকা মায়াবী মারীচের পেছনে ছুটেছিলেন। মারীচ আপনার কণ্ঠ নকল করে চিৎকার করে। সেই চিৎকার শুনে মাতা সীতা লক্ষ্মণকে পাঠান আপনাকে খুঁজতে। সেই সময় রাবণ সাধুর ছদ্দবেশ ধরে তেঁনাকে অপহরণ করে। সেই পাপিষ্ঠী রাবণ মাতাকে বিবাহ করবার জন্য কত যাতনা দিচ্ছে। আপনার বিহনে মা সেখানে জলবিহীন মৎস্যর ন্যায় অবস্থান করছেন। পাপী দশানন দুমাস সময় দিয়েছে মাকে। তারপর ওঁনাকে হত্যা করবে। মাতা সীতা, লক্ষ্মণ ঠাকুরের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বলেছেন সেদিন কুবাক্য প্রয়োগের জন্য দুঃখিত তিনি।” এই সব শুনে লক্ষ্মণ শোকার্ত শ্রীরামকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন । হনুমান বললেন- “প্রভু! মাতা সীতা আপনাকে এখন নমনীয় থেকে কঠিন মূর্তি ধারন করে রাক্ষস সংহারক রূপে অবতীর্ণ হতে বলেছেন। দুমাসের মধ্যে রাবণকে হত্যা করতে অনুরোধ জানিয়েছেন।” তখন ভগবান রাম নিজের চোখের জল মুছে কঠিন কণ্ঠে গর্জে বললেন- “পাপী রাবন কি জানিয়েছে? সেকি সীতাকে ফিরিয়ে দেবে?” হনুমান বলল- “না প্রভু! সেই পাপী দশানন , মাতা সীতাকে কোনো অবস্থায় ফিরিয়ে দেবে না বলেছে। সে যুদ্ধ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।” তখন ভগবান রাম প্রচণ্ড ক্রোধে ধনুক তুলে বললেন- “তবে তাই হোক। আমি এই মুহূর্তে লঙ্কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষোনা করছি।” বানরেরা সমবেত ভাবে “জয় শ্রী রাম” ধ্বনি তুলে দিগ্বিদিক পরিপূর্ণ করলো।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger