সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ন কথা ( সুন্দরাকাণ্ড পর্ব – ১ )


ভয়হর মঙ্গল দশরথ রাম ।
জয় জয় মঙ্গল সীতা রাম ।।
মঙ্গলকর জয় মঙ্গল রাম ।
সঙ্গতশুভবিভবোদয় রাম ।।
আনন্দামৃতবর্ষক রাম ।
আশ্রিতবৎসল জয় জয় রাম ।।
রঘুপতি রাঘব রাজা রাম ।
পতিতপাবন সীতা রাম ।।

হনুমান যখন মন্দার পর্বত থেকে আকাশে লম্ফ দিলো- তখন মন্দার পর্বতে অবস্থিত জীব জন্তু, মাতঙ্গ, মৃগেরা এদিক ওদিক বিক্ষিপ্ত ভাবে পতিত হয়েছিলো। সমুদ্রের নীল জলরাশির ওপর দিয়ে শূন্যে উড়ে যাচ্ছেন পবনপুত্র হনুমান । মেঘের রাজ্যে মেঘের মধ্য দিয়ে হনুমান উড়ছিলেন, দেখলেন সাড়িসাড়ি বক, চিল ইত্যাদি পক্ষী কূল আকাশে ভেসে চলছে । অপরদিকে দেবতারা এই দৃশ্য দেখছিলেন । নীল জলারাশি আর উথালপাতাল ঢেঊ কেবল সমুদ্রে দেখা যাচ্ছে। নীল জলরাশির মধ্যে তিমি, হাঙর, মকর আদি প্রানী বিচরণ করছে । কেবল অনন্ত নীল জলরাশি। আকাশে গমন করতে করতে হনুমান এই সকল দেখছিলেন। যতদূর দেখা যায় কেবল সমুদ্রের অগাধ সলিল। এইসময় দেবতারা ভাবলেন হনুমান কি এই কর্ম করতে পারবেন ? একাই তিনি লঙ্কায় যাচ্ছেন। এই মহা সমুদ্র অতিক্রম করবার সাধ্য কি আছে ? একটা পরীক্ষা নিয়েই দেখা যাক! এই ভেবে ইন্দ্রদেবতা নাগদেবী সুরসাকে আহ্বান করলেন । দেবতারা আদেশ দিয়ে বললেন- “দেবী আপনি হনুমানের পরীক্ষা গ্রহণ করুন। দেখাই যাক হনুমান কতটা বীর? সে আদৌ এই জলরাশি অতিক্রম করতে পারে নাকি!” সুরসা দেবী বললেন- “হে সুরগণ! হনুমান রুদ্রাবতার। সে এই অসাধ্য সাধনে সক্ষম। তবুও আপনাদের অনুরোধে আমি হনুমান কে পরীক্ষা নেবো।” এই বলে সুরসা দেবী বিশাল সর্প রূপ ধারন করে সমুদ্রে প্রবেশ করলেন। হনুমান দেখলেন সমুদ্রের মধ্যে যেনো বিশাল তরঙ্গ উঠেছে । যেনো সমুদ্রের জল বিশাল আকারে উপরে উঠে আকাশ স্পর্শ করতে চায়- এমনই তরঙ্গ। ঝড়- মেঘ হীন পরিবেশে এমন অবস্থা দেখে হনুমান অবাক হলেন । দেখলেন একটি বিশাল সর্প সমুদ্র থেকে উঠে তার সামনে ফণা তুলে দাড়িয়ে আছে। সেই সর্পের “হিস হিস” গর্জনে যেনো প্রলয় ঝড় ওঠে। এই সর্পের লাঙ্গুল যে কোথায় দেখা যায় না। মুখের জিহবার সামনে দন্ত দুটি পর্বতের চূড়ার ন্যায়, তা থেকে ঝর্না ধারার ন্যায় বিষের বিন্দু সমুদ্রে পতিত হচ্ছে।

হনুমান করজোড়ে বলল- “মাতঃ! আপনি আপনার এই পুত্রের মার্গ কেন অবরুদ্ধ করেছেন ? আমি ভগবান শ্রীরামের সেবায় এখন বদ্ধ। আপনি কৃপা করে আমার লঙ্কা যাবার মার্গ উন্মুক্ত করুন।” সুরসা দেবী বললেন- “সে হবে না ! আমি ক্ষুধায় পীড়িত। তোমাকে আমি ভক্ষণ করে ক্ষুধা শান্ত করবো। এসো আমার মুখে।” হনুমান জানালো যে ফিরবার সময় সে এসে আহার হবে। কিন্তু সুরসা নারাজ । সুরসা নাগিনী বিশ যোজন লম্বা হল- এই দেখে হনুমান নিজেকে ত্রিশ যোজন লম্বা করলো। হাস্য করে সুরসা সর্পিণী নিজেকে চল্লিশ যোজন দৈর্ঘ্য বিস্তার করে হনুমানকে ভক্ষণ করতে গেলো। হনুমান পঞ্চাশ যোজন নিজেকে বৃদ্ধি করলো। এই দেখে সুরসা ষাট যোজন লম্বা হল- হনুমান সত্তর যোজন বৃদ্ধি পেলো। সুরসা যত বড় হয়- হনুমান তার চেয়েও বড় হয় । সুরসা আশি যোজন লম্বা হলে হনুমান নব্বই যোজন হল, সুরসা তখন শত যোজন লম্বা হল- হনুমান বুঝলো ইনি তো সামান্য নাগিনী নয় । এই বলে হনুমান বলল- “মাতঃ আপনি আমাকে ভক্ষণ করতে চান- তাই হবে। আমি আপনার মুখে প্রবেশ করছি।” এই বলে হনুমান সুরসার মুখে প্রবেশ করে কর্ণ দিয়ে বাহিরে আসলো। সুরসা দেবী তখন স্বরূপে এসে আশীর্বাদ করলো। কহিল – “বতস্য হনুমান! তুমি যেমন বীর, তেমনি বুদ্ধিমান। তুমি পরীক্ষায় সফল হয়েছো। দেবতাদের আদেশে আমি তোমার পরীক্ষা গ্রহণ করছিলাম । তুমি উত্তীর্ণ হয়েছো। তুমি সফল হও- এই কামনাই করি।” এই বলে সুরসা নাগিনী প্রস্থান করলেন। দেবতারা নিশ্চিন্ত হলেন যে হনুমান যথাযোগ্য সকল দায়িত্ব নির্বাহ করতে পারবে । হনুমান আবার নীল জলরাশির ওপর ভেসে , মেঘের আস্তরণ ভেদ করে লঙ্কার দিকে উড়ে যেতে লাগলো।

সমুদ্র দেব রত্নাকর দেখছিলেন হনুমানকে । তিনি ভাবলেন রামভক্ত হনুমানের সেবা অবশ্যই করা উচিৎ । রুদ্রাবতার হনুমানের সেবা করা অতি পুণ্য কাজ। কিন্তু সমুদ্রে , কপির আহার্য কিছুই নেই। আর নোনা জল পান করার অনুপুযুক্ত । এখন কি উপায়? তিনি দেখলেন হিমালয় পুত্র মৈনাক পর্বত এই সমুদ্রেই লুকিয়ে আছে। তার মধ্যে অনেক বৃক্ষে মিষ্ট ফল ও মিষ্টি জলের ঝিল আছে। তাহাকে বললে সে হয়তো হনুমানের জন্য সমুদ্রের উপরে উঠে আসতে পারে । সমুদ্র দেব রত্নাকর গিয়ে মৈনাক পর্বতকে এই সকল বিস্তারে বর্ণনা করলো। মৈনাক পর্বত সমুদ্র থেকে উঠে আসলো। হনুমান আকাশ থেকেই দেখতে পেলো একটি বিশালাকার পর্বত সমুদ্র থেকে উঠে এসেছে। সামনে বিশাল চূড়া নিয়ে পথ রুদ্ধ করেছে। মৈণাক বলল- “হে মারুতি! দয়া করে আপনার শ্রী চরণের ধূলি আমাকে প্রদান করুন। আপনি একটু এই পর্বতে অবস্থান করে আহার, জল গ্রহণ করুন।” হনুমান বললেন- “না! আমি প্রভু শ্রীরামের কাজে আছি। এই অবস্থায় বিশ্রাম করতে পারি না। আমি বরং ফিরবার সময় আসবো।” কিন্তু মৈনাকের বারংবার কাকুতি মিনতি হনুমান ফেলতে পারলো না। সোজা নেমে এলো মৈনাকে পর্বতে । মৈনাকের প্রদত্ত বিবিধ মিষ্টি ফলমূল- কন্দ- ঝিলের মিষ্টি জল পান করলো। হনুমান বলল- “মৈনাক! তুমি এমন ভাবে সমুদ্র তলে কেন আত্মগোপন করেছো?” মৈনাক বলল- “হে মারুতি! আমি স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করিনি। সব দেবরাজ ইন্দ্রের জন্য হয়েছে। বহু পূর্বে আমাদের পর্বতদের পঙ্খ ছিলো। আমরা স্বেচ্ছায় নানা স্থানে গমন করতে পারতাম । কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র আমাদের সব পর্বতদের পঙ্খ চ্ছেদনের কাজ আরম্ভ করলেন। আমাদের জন্মগত অধিকার তিনি হরণ করে নিয়েছিলেন । তাই এই সমুদ্রে আমি আত্মগোপন করে আছি।” এইভাবে খানিকক্ষণ মৈনাকের সাথে গল্প করে পুনরায় আবার লম্ফ দিয়ে আকাশে উঠলেন। মৈনাক আবার সমুদ্রের তলে চলে গেলো। হনুমান ভেসে চললেন।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger