সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( সুন্দরাকাণ্ড পর্ব- ১৫ )

ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের পূজাতে সন্তুষ্ট হলেন ভগবান শিব প্রকট হলেন তিনি সমুদ্র তটে । ভগবান শঙ্করের জ্যোতির্ময় রূপে আলো হয়ে উঠলো সমুদ্র তট । ভগবান পশুপতির গাত্র থেকে যে দিব্য জ্যোতি নির্গত হচ্ছিল্ল- তা স্বর্গ থেকে সুরবৃন্দ প্রত্যক্ষ করছিলেন । ভগবান শিবকে দেখে বানরেরা “হর হর মহাদেব” বলে দিগবিদিগ পরিপূর্ণ করলেন । পুস্পাদি উৎসর্গ করলেন ভগবান শিবের চরণে। ভগবান শিবের চরণ পুস্প বিল্ব দলে ঢাকা পড়লো । প্রসন্ন চিত্তে ভগবান শিব সকলকে আশীর্বাদ প্রদান করতে লাগলেন । ভগবান রাম বহু স্তব করে বললেন- “হে রুদ্র! আপনি আমার ইষ্ট! আমার পূজা গ্রহণ করুন । আপনি আশীর্বাদ করলেই আমি যুদ্ধে জয়ী হতে পারবো । আপনার আশিষেই রাবণ বধ করা সম্ভব হবে। হে আদিনাথ! হে যোগীশ! কৃপা করে আশীর্বাদ প্রদান করুন।” ভগবান মহেশ্বর বললেন- “হে রাঘব! আপনি সাক্ষাৎ বৈকুণ্ঠাধিপতি জনার্দন । রাবণ বধের নিমিত্তই আপনি এই মর্তলোকে রামাবতার গ্রহণ করেছেন । আপনার হস্তেই রাবণের মৃত্যু লেখা হয়ে গেছে । হে রঘুপতি ! আপনি নিজেই সব শুভ কর্ম ঘটাতে সমর্থ ! তবুও আপনি আমার পূজা করেছেন। আমি আপনাকে কিছু প্রদান করতে চাই। মনোবাঞ্ছা ব্যাক্ত করুন।” ভগবান রাম বললেন- “তবে প্রভু আপনি আমার দ্বারা নির্মিত এই বালুকা শিবলিঙ্গে অবস্থিত হউন । এখানে আপনি ‘রামের ঈশ্বর’ অর্থাৎ রামের আরাধ্য দেবতা ‘রামেশ্বর’ নামে অবস্থান করুন।” এই শুনে ভগবান মহেশ্বর বললেন- “হে রাম! এই স্থানে আপনার দ্বারা পূজিত এই শিবলিঙ্গে আমি অবস্থান করবো । আজ থেকে এই লিঙ্গ দ্বাদশ জ্যোতিরলিঙ্গের অন্যতম ‘রামেশ্বরম্’ নামে খ্যাত হবে ।” এই বলে ভগবান শিব প্রসন্ন বদনে নানা দিব্য কথা বলে অদৃশ্য হলেন । সেই শিবলিঙ্গ এখনো অবস্থিত । হনুমান তখনও এসে পৌছায়নি । এতই দূর ছিলো যাত্রাপথ ।

ভগবান রাম এরপর বললেন-

সিব দ্রোহী মম ভগত কহাবা ।
সো নর সপনেহুঁ মোহি ন পাবা ।।
সঙ্কর বিমুখ ভগতি চহ মোরী ।
সো নারকী মূঢ় মতি থোরী ।।
সঙ্করপ্রিয় মম দ্রোহী সিব দ্রোহী মম দাস ।
তে নর করহিঁ কলপ ভরি ঘোর নরক মহুঁ বাস ।।
(তুলসীদাসী রামায়ণ )

অর্থাৎ- শ্রীরাম বললেন, “আমাকে ভক্তি করেও যদি কেউ শিবদ্রোহ করে তাহলে সে স্বপ্নেও আমাকে লাভ করতে পারে না । শ্রীশংকরবিমুখ ( দ্বেষী ) ব্যক্তি যদি আমার ভক্তিতে সচেষ্ট হয়- তবে সে নরকে যাবে ; সে অতিশয় মূর্খ ও অল্পবুদ্ধি সম্পন্ন । যে ব্যক্তি ভগবান শ্রীশঙ্কর ও আমার মধ্যে একজনের উপর প্রীতি ধারণ করে অন্যজনকে অশ্রদ্ধা করে সে কল্পকাল পর্যন্ত নরকে বাস করে থাকে।”

কৈলাসে ফিরে হর গৌরী পুনঃ আলাপে মগ্ন হলেন । ভগবান শিব রামেশ্বর তীর্থের কথাই বলছিলেন । এর সাথে মহাদেব জানালেন তিনি আর দশানন কে সহায়তা করবে না। কারন সেই পাপী সর্বদা অসৎ কাজে দেবশক্তিকে ব্যবহার করে থাকে । তাই তাকে আর সহায়তা করবেন না । দেবীকেও জানালেন তুমি ভদ্রকালী রূপে রাবণের ওপর থেকে কৃপা তুলে নাও। অহীরাবণ, মহীরাবণ নামক দুই রাক্ষস পাতালে তোমাকে পাতালভৈরবী রূপে পূজা করে থাকে, তাদেরকেও আর কৃপা করো না। এই রাক্ষসেরা কদাপি শুভ কাজ করে না। এদের অন্তিম সময় উপস্থিত । দেবী বললেন সময় আসলে আমি রাবণ, অহীরাবণ, মহীরাবণ কেও পরিত্যাগ করবো । এরপর দেবী গৌরী বললেন – “দেব! তোমার এই রামেশ্বর তীর্থের মহিমা কি?” ভগবান শিব বললেন- “হে উমা! আমার এই জ্যোতিরলিঙ্গ দ্বাদশ জ্যোতিরলিঙ্গের একটি । এই তীর্থের মহিমা অনেক। বিশেষ ভাবে হর আর হরির লীলা এখানে উদ্ঘাটিত । যে ব্যক্তি পবিত্র বারিধারা দ্বারা রামেশ্বর জ্যোতিরলিঙ্গের পূজা করবে, সে মুক্তি প্রাপ্ত করে জন্মমৃত্যু চক্র থেকে চিরতরে মুক্তি থাকবে । যে ব্যক্তি ছলচাতুরী ত্যাগ করে রামেশ্বর জ্যোতিরলিঙ্গের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবে- সে হরি হার হরের কৃপা লাভ করে ধন্য হবে। হে ভবানী! আমি সত্য বলিতেছি, যে ব্যাক্তি ভগবান রামের নির্মিত সেঁতু দর্শন করবে- তাঁহাকে দেখে যম পলায়ন করবে। সেই ব্যাক্তি মুক্তি পাবে।” এইভাবে ভগবান শিব এই লিঙ্গের নানা মাহাত্ম্য বললেন।

অপরদিকে হনুমান এসে পৌছালেন । সত্যই বড় দেরী হয়ে গেছে । শিবলিঙ্গ নিয়ে নামলেন সমুদ্র তটে । দেখলেন সেখানে সবাই পাথর, কাঠের গুড়ি আনতে ব্যস্ত। হনুমানের হস্তে শিবলিঙ্গ দেখে ভগবান রাম এসে জিজ্ঞেস করলেন- “বতস্য হনুমান ! তোমার এত বিলম্ব কেন ? আমি বালুকা দ্বারা শিবলিঙ্গ স্থাপন করে পূজা সমাপন করেছি । কারন তোমার আসতে বড় বিলম্ব হয়েছিলো, অপরদিকে শুভক্ষণ অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছিল্ল দেখেই আমি বালুকার শিবলিঙ্গ গড়ে পূজো সেড়েছি।” হনুমান বলল- “তবে প্রভু এখন কি হবে? আমি যে শিবলিঙ্গ এনেছি, ইঁহার কি হবে?” ভগবান রাম বললেন- “বতস্য! তুমি যে শিবলিঙ্গ এনেছো তা আমি পূজা করবো। পুনঃ আমি এই সমুদ্র তটে পূজা করবো । এই শিবলিঙ্গ ‘রামনাথ’ নামে বিখ্যাত হবে।” এই বলে ভগবান শ্রীরাম রামেশ্বর জ্যোতিরলিঙ্গের থেকে স্বল্প দূরে হনুমানের আনিত শিবলিঙ্গ স্থাপন করে শাস্ত্র নিয়মে পূজা করলেন । পুনঃ লঙ্কা জয় ও সীতা উদ্ধারের প্রার্থনা জানালেন । ভগবান শিব আশীর্বাদ করলেন । এই দুটি শিবমন্দির ভারতবর্ষের তামিলনাড়ুতে অবস্থিত । আপনারা একবার অবশ্যই দর্শন করে আসবেন । ভারত থেকে শ্রীলঙ্কা যাবার পথে এখনো রামসেতুর ভাসমান শিলা ভঙ্গ অবস্থায় সমুদ্রে দেখা যায় । এই শিলা নিয়ে একবার রথযাত্রা হয়েছিলো । কাঁচের আক্যোরিয়ামে জলে ডোবানো ছিলো এই শিলা । আশ্চর্য এই শিলা ডোবে না। ভারতবর্ষের বেশ কিছু হনুমান মন্দিরে এই শিলার অংশ নিয়ে গিয়ে সেখানে স্থাপিত করে পূজা করা হয় । একে “রামশিলা” বলে। এর থেকে স্পষ্ট প্রমান হয়, বুদ্ধিজীবি ও সেকুলার, বিধর্মীরা যতই “রামলীলাকে” কাল্পনিক বলুক না কেন, তাতে কিছু যায় আসে না। সেই অযোধ্যা এখনো আছে উত্তরপ্রদেশে , শ্রীলঙ্কাতে এখনো রাবণের মহলের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়, অশোক বন, অশোক বনে হনুমানের পদচিহ্ন দেখা যায়। শ্রীলঙ্কা গেলে দেখে আসতে পারেন বা নেটে সার্চ করে ছবি দেখতে পারেন। শ্রীলঙ্কাতে এখনো নিকুম্ভিলা মন্দির আছে । সুতরাং ভগবান রাম সত্য, রাম- রাবণ যুদ্ধ সত্য, রামায়ণ সত্য, হিন্দু ধর্ম সত্য। আর যারা এগুলোকে বদনাম করেন বা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেন, মনে রাখবেন তারাই অসত্য।

( ক্রমশঃ ) 
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger