সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড পর্ব- ৩ )


সুগ্রীব ও রামচন্দ্রের মধ্যে মিত্রতা গড়ে উঠেছিলো। অপরদিকে হনুমানজী প্রভুর সান্নিধ্য লাভ করে যারপরনাই আনন্দিত হয়েছিলো। বালি ছিলো ইন্দ্রের তেজ জাত পুত্র । ইন্দ্রদেবতার বর ছিলো বালির ওপরে। বালির চোখে যখন শত্রু দৃষ্টিপাত করতো- তখন শত্রুর অর্ধেক শক্তি বালির মধ্যে প্রবেশ করতো। এতে শত্রু কমজোরি অপরদিকে বালি শক্তিশালী হতো। সুগ্রীব বুঝতে পারছিলো না যে রামচন্দ্র স্বয়ং বালিকে বধ করবেন । এতে তিনি সফল কি হবেন ? যদি না হন তবে এতে বালির ক্রোধের বলি হবেন মিত্র রাম। আর সুগ্রীব ও রুমার কপালে দুঃখ আছে। জেনেশুনে কি মিত্রকে বিপদে নিক্ষেপ করা উচিৎ? শ্রীরাম, বালিকে দেখেননি – তাই তাঁর শক্তি সম্বন্ধে ধারনা নাই। কিন্তু শ্রীরাম তাড়কা, সুবাহু, মারীচ, বিরাধ, খড়, দূষণ, ত্রিশিরা, কবন্ধ বধ করে এসেছেন। কিন্তু বালিও তো অনায়েসে রাক্ষস কূল ধ্বংস করেছেন- এমনকি রাক্ষসরাজ দশাননকে সাতবার লাঙ্গুলে জড়িয়ে জলে ডুবিয়ে আহ্নিক কর্ম সমাপ্ত করেছেন। দুয়ের মধ্যে অধিক শক্তি কার? এই নিয়ে দোচালে ছিলেন সুগ্রীব। একদিন ভগবান রামচন্দ্রকে সুগ্রীবের চিন্তা নিয়ে প্রশ্ন করলেন। সুগ্রীব বলল- “মিত্র! আপনি কি বালিকে বধ করতে সমর্থ? আমি জানি আপনি অনেক রাক্ষস তৃণসম ভস্ম করেছেন। কিন্তু বালি ইন্দ্রের বরপুত্র । আমি দোটানায় আছি। জেনেশুনে মিত্রকে বিপদে ফেলে না দেই!” সুগ্রীবের কথা শুনে লক্ষণ আর হনুমান অতীব ক্রুদ্ধ হল। লক্ষণ বললেন- “সুগ্রীব! তুমি মহাবীর শ্রীরামের বীরত্ব নিয়ে সংশয় করছ ? চাই না তোমার সহায়তা। যদি লঙ্কার অবস্থান জ্ঞাত হতাম- এখুনি এখানে বসেই আমার দাদা লঙ্কাকে সমুদ্রে তলিয়ে দিতেন। তিনি এমন শক্তি রাখেন।” পবনপুত্র হনুমান বললেন- “ওহে সুগ্রীব! তোমার কি বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়েছে। তুমি প্রভুর শক্তিতে সংশয় করো?” তখন ভগবান রাম লক্ষণ ও হনুমানকে শান্ত করে বললেন- “মিত্র! তোমার এমন উদার ভাবনায় আমি মুগ্ধ। তুমি আমার হিতের জন্যই এই সকল অনুমান করছ। শত্রুকে দুর্বল জ্ঞান মুর্খামির লক্ষণ। কহো আমি কিরূপে প্রমান দেবো যে আমি বালি বধে সমর্থ?”

সুগ্রীব অল্প ভাবল। তারপর দূরে দৃষ্টি দিতে দেখলো এক সাড়ি সাতটি তাল গাছ। প্রকাণ্ড কাণ্ড সম বৃক্ষের মস্তক যেনো আকাশ স্পর্শ করছে। সাতটি তালবৃক্ষ এক সাঁড়িতে অবস্থিত। সুগ্রীব বললেন- “মিত্র রাম! আপনি যদি এক শরে ঐ সাতটি তালবৃক্ষ খণ্ড খণ্ড করে ভূপতিত করতে পারেন, তবে প্রমান পাই।” শ্রীরামচন্দ্র মৃদু হেসে তূনীর থেকে শর বের করে নিক্ষেপ করলেন। ভগবানের রামের শর চোখের নিমিষে ছুটে গেলো। এক এক করে সাতটি তালগাছ ভেদ করে অর্ধেক করে দিলো। বিকট আওয়াজ করে সাতটি তালগাছ ভূপতিত হোলো। তালফল গুলি এদিক ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো। সাতটি তালগাছের কচি তাঁলের শাস প্রাপ্তির জন্য বানরেরা সেইপানে ছুটলো। পুনরায় সাত গাছ ভেদ করে সেই শর ভগবান রামের তূনীরে ফিরে এলো। “জয় শ্রী রাম” ধ্বনিতে চতুর্দিক আছন্ন হল। সুগ্রীব রামচন্দ্রের চরণে প্রনাম জানিয়ে বলল- “প্রভু! আমি প্রমান পেয়েছি। আপনি বালি বধ অবশ্যই করবেন। আপনার শর আমার দুর্ভাগ্যকে অবশ্যই খণ্ডন করবে।” রামচন্দ্র বললেন- “সুগ্রীব! তুমি কাল প্রভাতে গিয়ে বালিকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানাবে। তোমরা যখন যুদ্ধ করবে আমি বৃক্ষের আড়ালে অবস্থান করে বালিকে বধ করবো। জানি এভাবে আড়ালে থেকে হত্যা করা যুদ্ধ নিয়মের প্রতিকুল ও পাপ। কিন্তু ধর্ম সংস্থাপন ও অধার্মিকদের বিনাশের জন্য কিছু ছলের আশ্রয় নিলে তা পাপ বলে ধরা হয় না।” পরদিন সুগ্রীব ছুটে গেলো। বালির প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে ডাকতে লাগলো। বলল- “বালি ! তুমি অধার্মিক। তুমি আমার পত্নীকে কারাগারে বন্দী করে তাকে বিবাহের জন্য অত্যাচার করছ- এ পাপ, অধর্ম। তোমার ন্যায় পাপী শাসক সিংহাসনে থাকলে সকলের অকল্যাণ হবে। শীঘ্র আমার স্ত্রীকে মুক্তি দাও। পিতার সম্পত্তিতে আমারোও তোমার ন্যায় অধিকার আছে। তুমি একাই সব আত্মসাৎ করতে পারো না। এসো যুদ্ধ করো । হয় ধর্ম পথে থাকো- নচেৎ যুদ্ধ করো।” বালির ত মাথা গরম হয়ে গেলো। গদা হাতে দন্ত কড়মড় করতে করতে ছুটে এসে বলল- “সুগ্রীব! মরবার জন্য তৈরী হয়েই এসেছিস মনে হয়। আজ তোকে নিতে যমদেবতা অবশ্যই এসেছেন। ভালোই হল। আজ তোকে বধ করে আমার মনের সকল ক্ষোভ দূর করো। তোর মতোন লোভী ভ্রাতা থাকার থেকে না থাকাই উত্তম। তুই মরলে তোর বিধবা স্ত্রী রুমাকে বিবাহ করতে আমার কোন অসুবিধা হবে না।”

এই বলে বালি গদা নিয়ে ধেয়ে গেলো। সুগ্রীবও গদা নিয়ে ধেয়ে আসলো। উভয়ের গদার সংঘর্ষে চতুর্দিক কেঁপে উঠলো। ভয়ানক গদার আঘাতের শব্দ শুনে বানর, লেঙুর, হনুমানেরা চতুর্দিকে পলায়ন করলো। অপর কিছু বানর বৃক্ষে উঠে যুদ্ধ দেখতে লাগলো। দুই বানরের যুদ্ধে যেনো মেদিনী কাঁপতে লাগলো। গাছপালা ভেঙ্গে চুরে তছনছ করে দিলো। একে অপরের দিকে বড় বড় পাথর তুলে নিক্ষেপ করতে লাগলো। রামচন্দ্র শর সন্ধান করতে উদ্যত হলেন। কিন্তু একি! বালি ও সুগ্রীব যে যমজ ভাই। হায়রে কে বালি আর কে সুগ্রীব? কিছুই তো বোঝা যায় না। একবার একে বালি ওকে সুগ্রীব মনে হয়। আবার অপরদিকে ওকে বালি একে সুগ্রীব মনে হয়। কাকে শরবিদ্ধ করবো? কোনটা যে বালি। এইভাবে রামচন্দ্র শর সন্ধান করতে পারলেন না। অপরদিকে দুই বানর গদা ফেলে একে অপরকে আঁচর কামড় দিতে লাগলো। উভয় উভয়কে লাঙ্গুল দ্বারা আঘাত করতে লাগলো। অন্য বানরেরা ভীত হয়ে কেবল সেই যুদ্ধ দেখতে লাগলো। সুগ্রীব ভাবতে লাগলো ভগবান রাম উপস্থিত হয়েও কেন শর নিক্ষেপ করছেন না। তবে কি তিনি বালিকে দেখে ভীত হলেন? তবে তো এখন বালির হস্তে মরতে হবে। হায়রে শেষে এই কপালে লেখা ছিলো। সুগ্রীব উঠে দাঁড়িয়ে পালাতে লাগলো। বালিও পিছু পিছু ছুটলো। সুগ্রীব এক দৌড়ে ঋষমূক পর্বতে উঠলো। বালি সেখানে মুনির শাপে ঢুকতে না পেরে গজরাতে গজরাতে চলে গেলো। সুগ্রীব রাগে প্রভু রামকে বলল- “আপনি কেন বালিকে শরবিদ্ধ করলেন না? আপনি কি আমাকে যমালয়ে প্রেরন করবার জন্য বালির সাথে যুদ্ধ করতে বলেছিলেন? আপনি যদি বালি বধ নাই করতে পারতেন, তবে আমাকে বলতেন। আজ আমার কপালের ওপর দিয়ে বিশাল সঙ্কট বয়ে গেলো।” ভগবান রামচন্দ্র বললেন- “শান্ত হও মিত্র! তুমি আর বালি যমজ ভাই। আমি উভয়ের মধ্যে কে বালি আর কে সুগ্রীব অনুমান করতে পারিনি। যদি বালি ভ্রমে তোমাকে শরবিদ্ধ করতাম তবে মহা অনর্থ হোতো। আমি কিভাবে বাণ নিক্ষেপ করতাম? কাল তুমি একটি পুস্পমালা পড়ে গিয়ে বালিকে আবার যুদ্ধে আহ্বান করবে। এবার তোমার কণ্ঠে পুস্পমালা থাকায় আমি অনায়েসে তোমাকে চিনতে পারবো। তখন বালিকে বধ করবো।” পরদিন রামচন্দ্র একটি মাল্য সুগ্রীবকে পড়িয়ে বলল- “মিত্র ! এই বিজয়মাল্য আজ তোমার বিজয় ঘোষোনা করবে। আজ সেই দুষ্ট কপি বালি মরবে। রুমার সকল দুঃখ অবসান হবে। আর তুমি হবে বানরদের রাজা। তোমার সহায়তায় আমি সীতা উদ্ধার করবো।” সুগ্রীব পুস্পমালা পড়ে পুনঃ কিস্কিন্ধ্যা গিয়ে বালিকে যুদ্ধে আহ্বান করতে লাগলো।

( ক্রমশঃ )

Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger