সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব- ২০ )


সকলে অবাক হল হনুমান এত বৃহৎ পর্বত কেনো বা তুলে এনেছে ? পর্বতে দিব্য জড়িবুটি থেকে উৎপন্ন দিব্য আলো দেখে সকলেই বুঝলেন সে এই সেই গন্ধমাদন পর্বত । কিন্তু হনুমানকে আদেশ দেওয়া হয়েছিলো কেবল পর্বত থেকে সেই মৃতসঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সুবর্ণকরণী , সন্ধানকরণী ঔষধি আনতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু হনুমান গোটা পর্বত তুলেই এনেছে। হনুমান নিজে বলল- “প্রভু আপনার কৃপায় সেই পর্বত আনতে পেরেছি। সেখানে কালনেমি রাক্ষস বধ, গন্ধকালি নামক অপ্সরার মুক্তি প্রদান করি। পথে আসবার সময় আপনার ভ্রাতা ভরতের সাথে সাক্ষাৎ হয়।” ঔষধি নিয়ে এসেছেন দেখে ভগবান শ্রীরাম হনুমানকে ধন্যবাদ দিয়ে বলতে লাগলেন- “বেঁচে থাকো বতস্য। তোমার ঋণ আমি ইহজন্মে শোধ করতে পারবো না।” সুষেণ বৈদ্য পর্বতে উঠে মৃতসঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সুবর্ণকরণী , সন্ধানকরণী ঔষধি নিয়ে আসলেন । তারপর তাহা পিষে লক্ষ্মণের মুখে দিলেন । দেখতে দেখতে লক্ষ্মণের ক্ষতস্থান সেরে গেলো। বিষের প্রভাব সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে গেলো । লক্ষ্মণ “কোথায় সেই মেঘনাদ” বলে উঠে দাড়ালো । উঠে দাঁড়িয়ে সে সকলকে দেখে অবাক হল। আশেপাশে সকলকে দেখলো চোখের জলে ভাসছেন। খুশীতে তারা চোখের জল মুছে ফেলছেন। আরোও দেখলেন তার বড় ভ্রাতা শ্রীরাম তার সামনেই মাটিটে বসে আছেন । ভগবান শ্রীরাম তখন ভ্রাতাকে আলিঙ্গন করে বললেন- “ভ্রাতা! তুমি মেঘনাদের অস্ত্রে নিদারুন আহত হয়ে পড়েছিলে। তোমাকে বাঁচিয়েছেন আমার মিত্র বিভীষণ, লঙ্কার বৈদ্য সুষেণ আর হনুমান। ইহাদের প্রণাম করো।” লক্ষ্মণ উঠে দাঁড়িয়ে সকলকে প্রণাম করলো। ভগবান রাম বললেন- “পবনপুত্র! তুমি আমার এক ভ্রাতা। যেমন ভরত , শত্রুঘ্ন , লক্ষ্মণ আমার এক ভ্রাতা। সত্যই তুমি কনিষ্ঠ ভ্রাতার ন্যায় বিপদের সময় অগ্রজের পাশে থেকেছো। বিপদ থেকে পরিত্রাণ করেছো। সত্যই তোমার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ ।” এই বলে ভগবান শ্রীরাম তাঁর প্রিয় ভক্ত হনুমানকে আলিঙ্গন করলেন ।

তাহার পর ভগবান বললেন- “হনুমান! তোমার প্রতি রোমকূপে এত দিব্য জ্যোতি কিসের?” হনুমান বলল- “প্রভু! যখন আমি ঔষধি চিনতে না পেরে গোটা গন্ধমাদন নিয়ে আগমন করছিলাম তখন আপনার ভ্রাতা শ্রী ভরত আমাকে কোন রাক্ষস ভেবে শর সন্ধান করে ভূপতিত করেন। তারপর আপনার পরিচয় দিতে তিনি পবন বাণে আমার গতিবৃদ্ধি করেন। পথে আসবার সময় গুরুদেব সূর্যকে উদয় হতে দেখে তাঁহাকে ভক্ষণ করে সূর্য উদয় রোধ করি। না হলে আজ চরম সর্বনাশ হতো। প্রভু! আমি আপনার কুলদেবতাকে অপমান করেছি। সৃষ্টির নিয়ম পরিবর্তন করেছি। কিন্তু ইহা ভিন্ন আর উপায় ছিলো না। কৃপা করে আমাকে ক্ষমা করুন।” এই বলে হনুমান এক লম্ফ দিয়ে সৌরমণ্ডলে প্রবেশ করে সূর্য দেবকে পুনঃ উদ্গীরন করে বাহিরে এনে ক্ষমা চাইলেন । অতঃ সমুদ্র তটে আসলেন । তখন সুষেণ বৈদ্য বললেন- “পবনপুত্র আপনি আর একটি কাজ করুন। এই দিব্য ঔষধি পর্বত যথাস্থানে রেখে আসুন। কারন এই পর্বতে দেবতারা বিরাজ করেন। এখানে এই সকল ঔষধি থাকা উপযুক্ত নয়।” হনুমান তখন সুষেণ বৈদ্যকে পুনঃ লঙ্কায় রেখে এসে গন্ধমাদন পর্বত নিয়ে পুনঃ হিমালয়ে রেখে আসলেন । বানরেরা এবার নানা বাদ্য বাজনা বাজিয়ে উচ্ছাস প্রকট করলেন । সেই উচ্ছাসে রাক্ষসদের সমস্ত আনন্দে জল ঢেলে দিলো। ভগবান রামের জয়ধ্বনি একেবারে অশোক বনে পৌছালো । রাবণ সব শুনে বিমর্ষ হয়ে বসলেন। কালনেমি নিহত হয়েছে। হনুমান সূর্যকে ভক্ষণ করে সূর্য উদয় রোধ করেছে, গন্ধমাদন পর্বত নিয়ে এসে লক্ষ্মণের জীবন বাঁচিয়েছে । সীতাদেবী তখন ত্রিজটার কাছে সব শুনে আনন্দ প্রকাশ করে দেবতাদের স্তবস্তুতি করলেন । প্রভাত হতেই আজ আর লঙ্কার দ্বার খুলল না। কোন রাক্ষস যুদ্ধে আসলো না। বানরেরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল । কিন্তু কেউ বাইরে আসলো না । ভগবান শ্রীরাম বললেন- “আজ অবধি আমি ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছি। আজ এই রাক্ষসদের ওপর কোন দয়া করবো না।” এই বলে ভগবান রাম তখন হনুমান সহ অন্য রাক্ষসদের লঙ্কার দ্বার ভেঙ্গে ভেতরে অগ্নি সংযোগ ঘটাতে বললেন। বড় বৃক্ষের কাণ্ড নিয়ে বানরেরা লঙ্কার সিংহদ্বারে আঘাত করতে লাগলো। কিছুক্ষণ আঘাতে লঙ্কার সেই তোড়ন ভেঙ্গে সশব্দে পতিত হল। লক্ষ লক্ষ বানর, মর্কট, ভল্লুক মশাল নিয়ে ভেতরে ঢুকতে লাগলো। সামনে যত রাক্ষস ছিলো বানরদের পদতলে পিষ্ট হয়ে মাটিটে মিশে গেলো ।

বানরেরা উন্নত গৃহ গুলিতে আগুনের মশাল নিক্ষেপ করলো। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো । শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ চোখের নিমিষে অসংখ্য বাণ নিক্ষেপ করে অগণিত রাক্ষসদের বধ করলেন । রাক্ষসেরা , ভগবান শ্রীরামের বাণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো। ভগবান রাম উল্কাবাণে লঙ্কার গৃহ গুলি ভস্ম করলেন । চতুর্দিকে আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলে উঠলো। যত রাক্ষস ছিলো সব পলায়ন করলো। সারা রাত মদ্যপান করে যেসব রাক্ষসেরা কামিণী সহ শয়ন করছিলেন তারা পট্টিশ , বর্শা, তরোয়াল, গদা, ধনুক নিয়ে যুদ্ধে আসলেন। কিন্তু ভগবান শ্রীরামের বাণের সামণে দাঁড়াতেই তাদের হাত পা মস্তক কেটে বহু দূরে দূরে পতিত হল । ভগবান শ্রীরামের সেই ক্রোধী রূপ রাক্ষসদের তৃণবৎ ভস্ম করতে লাগলেন। যেসব রাক্ষসেরা ঘুমন্ত ছিলো তারাও অন্যত্র পলায়ন করলো । বানরেরা মশাল দ্বারা গৃহগুলি ভস্ম করতে লাগলেন ।

একেক বানর লয় দুই দুই মশাল ।
অগ্নি দিয়া পোড়ায় লঙ্কার চালে চাল ।।
অগ্নিতে পুড়িয়া পড়ে বড় বড় ঘর ।
পরিত্রাহি ডাক ছাড়ে লঙ্কার ভিতর ।।
উলঙ্গ হইয়া কেহ পলাইল ডরে ।
লাফ দিয়া পড়ে কেহ জলের ভিতরে ।।
অনেক পুড়িল ঘর আগুনের জ্বালে ।
কেহ বা পলায় যায় বাপ বাপ বলে ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )

এইভাবে লঙ্কার রাক্ষসেরা ত্রাহি ত্রাহি করতে লাগলো। রাবণ ক্রোধে সব দেখে বলতে লাগলো- “এই অপমান সহ্য করবো না। ভ্রাতা কুম্ভকর্ণের পুত্র কুম্ভ নিকুম্ভকে সংবাদ প্রেরণ করো।” মন্দোদরী বললেন- “আপনি অত্যন্ত দাম্ভিক ইহা জানতাম। কিন্তু এমন নিষ্ঠুর তাহা জানতাম না। নিজ পুত্রেরা আপনার দর্পের কারণে হত হয়েছে এখন আপনি কি ভ্রাতার বংশকেও রেহাই দেবেন না ? যদি কাউকে প্রেরণ করতে হয় তবে সীতাকে রামের কাছে প্রেরণ করুন। এতে আপনার বংশ রক্ষা পাবে।” রাবণ এই কথা শুনে মন্দোদরীকে বকাঝকা করে নিরস্ত্র করলেন।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger