সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-১৩)

বিভীষণ চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না তার প্রিয় ভ্রাতার মৃত্যু দেখে। কিন্তু এটা হতোই। বড় ভ্রাতা রাবণের জেদ আর দর্পের কারণে একের পর এক লঙ্কার বীর যোদ্ধা মারা যাচ্ছে । বিভীষণ গিয়ে ভ্রাতার নিথর দেহে মস্তক রেখে ক্রন্দন করতে লাগলেন । রক্তের সম্পর্ক ত অস্বীকার করা যায় না । একই মায়ের গর্ভের সন্তান । ভগবান শ্রীরামের চোখেও জল আসলো। কারণ কুম্ভকর্ণের সাথে কোন শত্রুতাই ছিলো না। উপরন্তু সে রাবণকে বুঝিয়েছে সীতাকে ফিরিয়ে দেবার জন্য । কিন্তু কুম্ভকর্ণ বধ না হলে আজ সে সমস্ত সেনা নাশ করে দিতো । ভগবান শ্রীরাম বললেন- “এই জন্যই আমি বহুবার রাবণকে শান্তি সংবাদ প্রেরণ করেছিলাম । বলেছিলাম সীতাকে ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু সেই দাম্ভিক একটা কথাও শোনেনি। যুদ্ধের এই ধ্বংসাত্মক দিকের কথাই চিন্তা করে আমি যুদ্ধ নিবৃত্তির জন্য রাবণকে অনুরোধ করেছিলাম । এই যুদ্ধে কেবল রাক্ষস আর বানরেরা নয়- উভয়কুলের পরিবার সর্বস্বান্ত হচ্ছে।” ভগবান শ্রীরাম গিয়ে বিভীষণকে সান্ত্বনা প্রদান করলেন । অপরদিকে কুম্ভকর্ণের মৃত্যু সংবাদ শুনে সমস্ত লঙ্কা নগরীতে শোকের সমুদ্র প্রবাহিত হল। রাবণ তার ভ্রাতাকে হারিয়ে ক্রন্দন করতে লাগলো । মাতা কেকসী, শূর্পনাখা, কুম্ভকর্ণের স্ত্রী- পুত্রেরা ক্রন্দন করতে লাগলেন। সমগ্র লঙ্কাতে শোক সাগর নেমে এলো। মন্দোদরী পুনঃ বলল- “স্বামী! এখনও কি আপনি বিশ্বাস করেন এই যুদ্ধে জয়ী হবেন? আপনার ভ্রাতা কুম্ভকর্ণ কি বীর ছিলো না? এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধ রোধ করুন । না জানি লঙ্কার কত বীর এই যুদ্ধে প্রান হারাবে। আপনি আজই সীতাকে মুক্ত করে শ্রীরামের কাছে প্রেরণ করুন ।” রাবণ ক্ষিপ্ত হয়ে বলল- “কদাপি নয়! তুমি লঙ্কার রাণী। কোথায় আমাকে উৎসাহ দেবে ভ্রাতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবার। উলটে আমাকে পরাজয় স্বীকার করতে বলছ ? এর শোধ আমি নেবো। এখন অবধি সে লঙ্কার বীক্রম দেখেছে কোথায় ? কাল একত্রে আমি বহু বীরকে প্রেরণ করবো ।”

রাবণ বহুবিবাহ করেছিলেন । মন্দোদরী ব্যাতিরেক আরোও স্ত্রী ছিলো। রাবণ তার স্ত্রী মালিনীর সন্তান অতিকায় কে যুদ্ধে পাঠাবে বলে স্থির করলো। সাথে ত্রিশিরা, দেবান্তক, নরান্তক নামক তিন পুত্রকে যুদ্ধে পাঠালো। সাথে মহাপাশ ও মহোদর নামক দুই অতীব শক্তিমান রাক্ষসকে যুদ্ধে দিলো। তিন কোটি সেনা, বহু রথ- গজ- অশ্ব সাথে দিলো। লঙ্কার মেদিনী কাঁপিয়ে বীরেরা চলল । ঐরাবতের বংশজ এক নীল হস্তী ছিলো। মহোদর রাক্ষস তাতে উঠে বসলো। অতি বলশালী অশ্বে দেবান্তক উঠলো। পঙ্খ ধারী অশ্বে শেল অস্ত্র নিয়ে নরান্তক উঠলো। ত্রিশিরা বিশাল মুগুর নিয়ে সুসজ্জিত রথে আরোহণ করলো । অতিকায় উঠলো আর একটি রথে শর ও ধনুক নিয়ে। মহাপাশ রাক্ষস আয়নার ন্যায় চকচকে তরবারি নিয়ে অশ্বে আরোহিত হল। তারপর সকলে চলল যুদ্ধভূমিতে । লঙ্কার দ্বার খুলতেই হৈ হৈ করে রাক্ষসেরা বেরিয়ে এলো। পুনঃ যুদ্ধ আরম্ভ হল। দেবতারা অন্তরীক্ষে অবস্থান করতঃ এই যুদ্ধ দেখতে লাগলেন। চতুর্দিকে অস্ত্রের ঝলকানি আর যেনো বৃষ্টির ন্যায় অস্ত্র বর্ষণ আরম্ভ হল। একপাশ থেকে অন্যদিকে শর, তোমর, বল্লম ছুটে গিয়ে অপরদিকে আঘাত হানলো। অপরদিকে থেকে গদা, বৃহৎ প্রস্তর, প্রকাণ্ড বৃক্ষ ছুটে গিয়ে অপরদিকে আঘাত হানলো। সুগ্রীব, অঙ্গদ দুজনে মিলে প্রবল বিক্রমে যুদ্ধ আরম্ভ করলো। রাক্ষসেরা মরে মরে পড়তে থাকলো। রাবণের পুত্র ত্রিশিরা, দেবান্তক, নরান্তক, অতিকায় প্রবল বিক্রমে যুদ্ধ চালিয়ে পালে পালে কপি বধ করতে লাগলো । হনুমান একাই লক্ষ রথ চূর্ণ করলো। চূর্ণ রথের অংশে মেদিনী ঢাকা পড়লো। হস্তীগুলি বৃহৎ প্রস্তরের তলায় চাপা পড়ে মরতে থাকলো। অশ্ব গুলি আরোহী সমেত পিষ্ট হল। আগুনের গোলা একে অপরের দিকে নিক্ষেপ করতে লাগলো। ভগ্ন রথ গুলি আগুনে জ্বলে সোনার নদীর ন্যায় গলে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে মিশল। বানর ও রাক্ষসদের উভয়ের রক্ত বৃহৎ নদীর ন্যায় প্রবাহিত হতে লাগলো। ছিন্নবিছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বাজ, ঈগল , গৃধেরা নিয়ে ভক্ষণ করতে লাগলো । নরান্তক নামক রাক্ষস প্রচুর শর সন্ধান করে কপি, ভল্লুক, মর্কট বধ করে সুগ্রীবের কটক বিনষ্ট করলো । সুগ্রীব তখন অঙ্গদকে আদেশ দিলো নরান্তককে বধ করবার জন্য ।

অঙ্গদ এসে বলল- “ওরে ভীত রাক্ষস! কেন এমন সেনা বধ করছিস? আয় আমার সাথে যুদ্ধ কর। তবে তোর বীরত্ব কত বুঝবো।” নরান্তক তখন ক্রোধে হস্তে শেল নিলো। মনে পড়ল এই বানর , দশানন রাবণের মুকুট নিয়ে গেছে । এই ভেবে সে শেল অস্ত্র নিয়ে অঙ্গদের দিকে নিক্ষেপ করলো। অঙ্গদের বুক বজ্রের সমান । হৃদয়ে ভগবান শ্রীরামের মূর্তি চিন্তন করে বুক পেতে দাঁড়ালো। সেই শেল অস্ত্র এসে অঙ্গদের বুকে লেগে দুই অর্ধেক হয়ে ভূমিতে পড়লো । নরান্তক রথথেকে নামলো । নেমে এসে অঙ্গদের সাথে যুদ্ধ আরভ করলো । দুজন দুজনকে মুষ্ট্যাঘাত আরম্ভ করলো। উভয়ের মুখ দিয়ে রক্তবমন হল। তবুও কেউ কাউকে পরাজিত করতে পারে না । এর মধ্যে অঙ্গদ আছার মেরে নরান্তক কে ভূমিতে ফেলে দিলো। তারপর তার বুকের মধ্যে সজোরে পর্বত তুল্য মুষ্ট্যাঘাত করলো। সেই আঘাতেই নরান্তক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। নরান্তকের পতন হয়েছে দেখে ত্রিশিরা , মহোদর, দেবান্তক এগিয়ে এলো। গজ, অশ্ব, রথ থেকে অঙ্গদের দিকে শর, বর্শা নিক্ষেপ করতে লাগলো। অঙ্গদের দেহে শর, বর্শা বিঁধে রক্তপাত হতে থাকলো। অঙ্গদ ও তাঁর সুরক্ষা বাহিনী একত্রে প্রস্তর, বৃক্ষ বর্ষণ করে গজ, রথ, অশ্ব গুলিকে ভূপতিত করতে থাকলো। এই দেখে হনুমান এগিয়ে এলো। লাঙ্গুলের আঘাতে শত শত রাক্ষস কে আছার দিয়ে বধ করলো। আবার ভূপতিত রাক্ষসদের ওপরে চরণ প্রহার করে তাদের ভবলীলা সাঙ্গ করলো। হনুমানের আর বীক্রম দেখে কে। এক গদার আঘাতেই শত শত রাক্ষস নানাদিকে ছিটকে পড়লো। কেউ আবার অতি উচ্চে উঠে পুনঃ ভূমিতে পড়ে গুঁড়া গুঁড়া হল । তখন দেবান্তক নাম রাবণের অপর পুত্র বৃহৎ লৌহ দণ্ড নিয়ে হনুমানের বুকে সজোরে আঘাত করলো। হনুমান ভূমিতে পড়ে উঠে দাঁড়ালো রাম নাম নিয়ে। অতি বৃহৎ লৌহ দণ্ড টি হনুমানের বুকে ধাক্কা খেয়ে চূর্ণ হয়ে ভূমিতে পড়েছিলো। তখন হনুমান এক লম্ফ দিয়ে দেবান্তক কে মাটিটে ফেলে তার ওপর পদাঘাত করলো। দেবান্তকের ইহলীলা সাঙ্গ হল। এই বীক্রম দেখে বানর সেনা বীর বীক্রমে রাক্ষস নিধন আরম্ভ করলো। সুগ্রীবকে অতি বলশালী রাক্ষসেরা ঘীরে বধ করতে চাইলে সুগ্রীব একাই সেই রাক্ষসদের বধ করলো। জাম্বুবান ও তার ভল্লুক সেনা আঁচরে কামড়ে রাক্ষসদের উদর ছিন্ন করলো। কোন কোন রাক্ষসকে আড়াআড়ি দুইভাগ করে দিলো। ফিনকি দিয়ে রক্তধারা নির্গত হয়ে যুদ্ধভূমি কর্দমাক্ত হল ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger