সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব- ৩ )

ভস্ম রাক্ষস এর মৃত্যুর সংবাদ শুনে রাবণ খুবুই ক্রুদ্ধ হল। এত বলশালী রাক্ষস নিহত হয়েছে দেখে আশ্চর্য হল । কিন্তু মায়া মুণ্ড দেখে খুশী হল। মায়া সীতার মুণ্ড নিয়ে রাবণ পুস্পক বিমানে উঠলো । তারপর চলল লঙ্কার বাহিরে। আনন্দে ডগমগ হয়ে রাবণ ভাবছিলো এই মায়া সীতার মুণ্ড নিয়ে এক ঢিলে দুই পক্ষীর প্রান নেবে। কারণ এই দেখে রাম ভাববে আর কিসের জন্য যুদ্ধ! এই ভেবে হয় প্রান ত্যাগ করবে, নাহলে ফিরে যাবে। আর সীতা নকল রামের মুণ্ড দেখে ভাববে যে রাম , লক্ষ্মণ নিহত হয়েছে রাবণের হাতে। তার দর্পচূর্ণ হবে। এই ভেবে রাবণ আনন্দে পুস্পক বিমানে লঙ্কার বাইরে আসলো । অতি উচ্চ আকাশে রথ থাকবার জন্য রাবণকে দেখা যাছিল্ল না। রাবণ বাইরে এসে দেখলো লঙ্কার বাহিরে শত্রু সেনাদলের অসংখ্য তাঁবু। বানরেরা যুদ্ধের মহড়া নিচ্ছে । আরোও দেখলো রাম, লক্ষণ, অঙ্গদ, বিভীষণ একত্র বসে নানা আলাপ আলোচনা করছে। রাবণের পুস্পক রথের ছায়া যখন সেনা দলের ওপর পড়লো যেনো মনে হল মেঘ এসে ছায়া দিয়েছে। কিন্তু পুস্পক বিমানের অতি উজ্জ্বল দ্যুতি যখন দেখলো ভাবল ভাস্কর দেব বুঝি ধরিত্রীর অতি সন্নিকটে নেমে এসেছেন । রাবণ বলল- “ওরে রাম ! ভিক্ষুক, বনবাসী, সামান্য নর হয়ে ত্রিলোকবিজয়ী রাবণের সাথে যুদ্ধের আশা রাখিস ? ওরে সামান্য বনবাসী! তুই দশগ্রীব দশাননের শক্তি কি জানিস? তোর এই দুঃসাহসের জন্য তোকে একটি পুরস্কার দেবো।” এই বলে রাবণ মায়া দ্বারা প্রস্তুত রক্তমাখা সীতার মুণ্ড রামের সামনে ফেলে দিলো। “নে এবার যুদ্ধ কর” বলে রাবণ বিমান সমেত লঙ্কায় চলে গেলো । সীতার কাটা মুণ্ড দেখে শ্রীরাম “সীতা” বলে ভূমিতে নতজানু হয়ে বসলেন । আর তার মুখ থেকে কোন শব্দ বের হল না। শরীর প্রস্তরবৎ জড় হয়ে গেলো। চোখ স্থির হয়ে গেলো। শ্বাস- প্রশ্বাস চললেও শবের মতোই স্থির হয়ে গেলেন শ্রীরাম ।

অপরদিকে রাবণ অশোক বনে গেলো । সীতাদেবী পুনঃ আত্মরক্ষার জন্য হস্তে দূর্বা ধারন করলেন । রাবণ বলল- “হে সুমুখী সীতা! আর কি হবে তোমার সতীত্ব বজায় রেখে। এবার তোমার শাঁখা- সিঁদুর ত্যাগ করে বিধবার বেশ ধরো , অন্যত্থায় আমাকে বিবাহ করে পুনঃ সধবা হও । কারণ যুদ্ধে আমি তোমার স্বামী ও দেবর এর শিরোচ্ছেদ করেছি।” এই বলে দশানন মায়া দ্বারা নির্মিত রক্তমাখা রাম লক্ষ্মণের মুণ্ড সীতার দিকে ছুড়ে দিলো। তারপর অট্টহাস্য করতে করতে ফিরে গেলো । সীতাদেবী এই দেখে শোকে , রামচন্দ্রের ন্যায় প্রস্তরীভূত হলেন । রাম- সীতা উভয়ের অবস্থাই এক । দুজনের মুখে বোল নেই, শরীর জড়বৎ । বানরেরা ক্রন্দন করতে লাগলো। হনুমান, লক্ষ্মণ- সুগ্রীব- জাম্বুবান ক্রন্দন করতে লাগলো । কেবল বিভীষণ নিজের গুপ্তচরদের সাথে কি বিষয় নিয়ে পরামর্শ করতে লাগলো । অপরদিকে অশোক বনে রাক্ষসীরা বড় খুশীতে হাস্য- নৃত্য করতে থাকলো। কেবল ত্রিজটা ,সীতাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলো । সম্বিৎ ফিরে পেতেই শ্রীরাম , সীতার বিহনে ক্রন্দন করতে লাগলেন । বিলাপ করে বলতে লাগলেন- “হা সীতা! তোমাকে আমি রক্ষা করতে অসমর্থ ছিলাম। বনবাসে তোমাকে হারালাম, আবার তোমাকে উদ্ধার করা ত দূর, তোমার প্রান রক্ষাও করতে পারলাম না। ধিক আমাকে। কি হবে এই ধনুর্বাণ ধারণ করে- যখন স্ত্রীকে রক্ষা না করতেই পারলাম । কি হবে আর এই জীবন রেখে। স্বামীর কর্তব্য স্ত্রীকে রক্ষা করা। কিন্তু আমি সেটাও করতে পারলাম না। না তোমাকে রাজসুখ দিতে পারলাম, না তোমাকে কাছে রাখতে পারলাম, না তোমার জীবন বাঁচাতে পারলাম। এখন এই বিফল জীবন রেখে আমিই বা কি করবো ? আমিও এই মুহূর্তে প্রান ত্যাগ করবো।” এই বলে শ্রীরাম বালুকাতে গড়াগড়ি দিয়ে ক্রন্দন করতে লাগলেন । বালুকাতে তাহার শ্যামল তনু ঢাকা পড়লো । অপরদিকে সীতাদেবী স্বামী বিহনে ক্রন্দন করে বিলাপ করতে লাগলেন , আর বলতে লাগলেন- “ হে নাথ! এই জীবনে আমার আর আপনার চরণ দর্শনের সৌভাগ্য হল না। আপনি কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন ? আমি কি নিয়ে বাঁচবো? এই জীবন আমার এখন অন্ধকারময়। একে বয়ে কি লাভ। আমি অগ্নিতে ঝাঁপ দেবো।” ত্রিজটা সমানে সীতাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন ।

বিভীষণ এসে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- “প্রভু! আমাদের সাথে মস্ত ছল করা হয়েছে। সীতাদেবী জীবিত ও সুস্থ আছেন অশোক বনে। আমার গুপ্তচরেরা সংবাদ এনেছে। রাবণ সেই দেবীকে স্পর্শ অবধি করতে পারে না, আর বধ করা তো দূরে থাক। এক অগ্নি বলয় সর্বদা দেবী সীতাকে ঘীরে থাকে।” খুশীতে উজ্জীবিত হয়ে ভগবান শ্রীরাম বললেন- “সত্যি বলছ মিত্র? তবে এই কাটা মুণ্ড কাহার? এতো মাটির মুণ্ড নয়। জীবন্ত রক্তমাংসের।” বিভীষণ তখন গুপ্তচরদের কাছ থেকে প্রাপ্ত সকল খবর বৃতান্ত বলে বলল- “প্রভু! আমার ভ্রাতা দশাননের সাথে রাক্ষস বিদ্যুৎজিহ্বর কিছুদিন পূর্বে সাক্ষাৎ হয়েছে। বোধ হয় তখন আমার ভ্রাতা সেই ছল পরিকল্পনা করেছে । প্রভু! বিদ্যুৎজিহ্ব এক মায়াবী রাক্ষস। সে মায়া দ্বারা এমন সব মূর্তি নির্মাণ করে যে তাকে দেখে আসল নকলে তফাৎ অনুভূত হয় না । প্রভু! আপনি ত রাক্ষস জাতির মায়া সম্পর্কে অবগত । দুর্বল চিত্ত ব্যক্তিরাই মায়া, যাদু মন্ত্রের সহায়তা নিয়ে কাজ সাড়ে। যারা শক্তিমান ও পুরুষত্ব যাহাদের আছে – তাহারা নিজ শক্তিতেই কাজ সাড়ে, কদাপি এই যাদু মন্ত্রের সহায়তা নেয় না । হে প্রভু ! আপনি মারীচ, তাড়কা, বিরাধ, খড়- দূষণের মায়াবিদ্যা তো দেখেছেন। দেখেছেন কিভাবে মারীচ মৃগের রূপ ধরেছিল । প্রভু লঙ্কায় এমন বিচিত্র মায়াবী রাক্ষস দের বাস, যারা ভ্রম উৎপন্ন করতে সিদ্ধহস্ত। আসল দেবী সীতা অশোক বনে সুরক্ষিত আছেন। চরদের কাছে শুনলাম, আপনার ও লক্ষ্মণ ঠাকুরের মায়া মুণ্ড নির্মাণ করে রাবণ সীতাদেবীকে দেখিয়েছেন । তিনি খুবুই শোকার্ত হয়েছেন।” শ্রীরাম আদেশ দিলেন শিঙা, দুন্দুভি, ন্যাকড়া , শাঁখ ধ্বনি করতে। যাতে সীতা সকল কিছু শুনে বুঝতে পারে আমরা জীবিত। ভগবান রামের আদেশে হাজারে হাজারে কপিরা তাই করলো। এমন ভাবে যুদ্ধদামামা আর ভগবান রামের জয়ধ্বনি করলো, যা অশোক বনে সীতাদেবী শুনতে পেলেন। লঙ্কার রাক্ষস রাক্ষসীদের সেই শব্দ শুনে কানে তালা ধরল। কান চাপা দিয়ে তারা বসে থাকলো। ত্রিজটা বলল- “পুত্রী সীতা! আজ কোন যুদ্ধই হয়নি রাবণের সাথে যে তোমার স্বামী, দেবরকে রাবণ মুণ্ডচ্ছেদ করবেন। বরং আজ তোমার স্বামীর হস্তে বলশালী ভস্মরাক্ষস নিহত হয়েছে। ঐ শোনো কপি সেনারা কেমন আনন্দে জয়ধ্বনি করছেন। যদি তোমার স্বামী ও দেবর নিহত হতেন তবে তাঁরা জয়ধ্বনি ছেড়ে শোক ও ক্রন্দন করতেন। রাক্ষসরাজ রাবণ তোমাকে নকল মুণ্ড দেখিয়েছেন। তুমি তো জানো উনি কত মায়া ধরেন । সেই মায়ার ফাঁদে একবার তুমি পড়েছো। আর সেই ফাঁদে পা দিয়ো না।” এইভাবে শুনে সীতা দেবী আশ্বস্ত হলেন ।

(ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger