সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-১২)


কুম্ভকর্ণ বীরভাবে যুদ্ধ করতে লাগলো। বানরেরা কোটি সংখ্যায় জড় হয়ে বৃহৎ প্রস্তর, শিলা, বৃক্ষ কুম্ভকর্ণের পাণে নিক্ষেপ করতে আরম্ভ করলো। কুম্ভকর্ণের সাথে আগত রাক্ষস সেনারা কেবল এইসকল দেখে উল্লাস করতে লাগলো। প্রলয়ঝড় যেভাবে গোটা গ্রাম ধ্বংস করে তেমনই কুম্ভকর্ণ গোটা যুদ্ধভূমি জুড়ে বানরদের ভক্ষণ করতে লাগলো। কোটি কোটি বানর তুলে চিবিয়ে ভক্ষণ করতে লাগলো । পালে পালে বানর হাতে তুলে ভক্ষণ করলো। যেনো বানরেরা কুম্ভকর্ণের বিশাল গহ্বরে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেলো, যেমন ছোট্ট শিশু অন্ধকার গুহামুখে ঢুকে গায়েব হয়ে যায় । কুম্ভকর্ণের দন্তে পিষ্ট হয়ে কিছু কপিদের ছিন্নবিছিন্ন মুণ্ড, হাত, পা, লেজ মাটিটে পড়লো। কুম্ভকর্ণের দন্তগুলি লাল হয়ে গেলো। মুখ কপিদের রক্তে লাল হয়ে গেলো । যেই কপি তার সাথে লড়তে চায়, সেই কপিই মারা যায়। রাক্ষসেরা অট্টহাস্য করছিলো । বিশাল পর্বতের দিকে ক্ষুদ্র ঢিল ছুড়লে যেমন হয়- কপিদের নিক্ষেপিত প্রস্তরে কুম্ভকর্ণের সেইরূপ বোধ হচ্ছিল্ল । কপি, মর্কট বাহিনী যেসব বৃহৎ প্রস্তর, বৃক্ষ কুম্ভকর্ণের দিকে নিক্ষেপ করছিলো, সেব কুম্ভকর্ণের শরীরে আঘাত পেয়ে চূর্ণ হল। কুম্ভকর্ণের কিছুই হল না। কপিরা বর্শা, গদা ইত্যাদি অস্ত্র নিক্ষেপ করলেও, কুম্ভকর্ণের কোন ক্ষতি হল না। কুম্ভকর্ণের দেহে সেইসব বর্শা, গদা এসে লাগতেই- অস্ত্রগুলি চূর্ণ হল। কুম্ভকর্ণ তাঁর বিশাল মুগুর দিয়ে কপিবাহিনী কে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত করে দিলো। মনুষ্য যেভাবে পিঁপড়ের বাসা ভাঙ্গে, ঠিক সেইভাবে কুম্ভকর্ণ বানরদের দল গুলি ভেঙ্গে দিচ্ছিল্লেন । সেই রাক্ষস বৃহৎ পর্বত তুল্য প্রস্তর কপি বাহিনীর ওপর নিক্ষেপ করছিলেন। কোটি কোটি কপি, মর্কট, ভল্লুক মারা পড়লো । কুম্ভকর্ণের পদপিষ্ট হয়ে মাটিটে রক্ত মাংস মিশে গেলো কপিদের । কাউকে তুলে সমুদ্রে ফেলে দিলো । এভাবে তাণ্ডব চালালো কুম্ভকর্ণ । এইসময় হনুমান আকাশে লম্ফ দিয়ে গিয়ে কুম্ভকর্ণকে একটি সজোরে মুষ্ট্যাঘাত করলেন। এই জোরে আঘাতে কুম্ভকর্ণ ভূমিতে বসে পুনঃ উঠে দাঁড়ালো। হনুমানকে পালটা একটি আঘাত হানলো। হনুমান পড়ে গেলো। এই সুযোগে কুম্ভকর্ণ – নল আর নীলকে ভূমিতে আছার দিলো। অনান্য বানরদের নানাদিকে ছুড়ে ফেললো। নল- নীল পলায়ন করলো। ভয়ে কেউ আর কুম্ভকর্ণের সামনে যেতে সাহস পেলো না । শরভঙ্গ , কুমুদ, গয়, গবাক্ষ, অঙ্গদ আদি বীর একসাথে বিশালাকার প্রস্তর তুলে কুম্ভকর্ণের দিকে নিক্ষেপ করলো। সেই রাক্ষস মুগুর দিয়ে সেই প্রস্তর ধ্বংস করলো।

তারপর কুম্ভকর্ণ লাথ মেরে এই পাঁচ জন কে দূরে সড়িয়ে দিলো। অঙ্গদ আবার যুদ্ধ করতে এলে কুম্ভকর্ণ তাকে দূরে ফেলে দিলো। মূর্ছিত হল অঙ্গদ । শতাবলী , মুকুন্দ, মৈন্দ, শরণ, কেশরী ইত্যাদি বানরেরা একে একে পরাজিত হল কুম্ভকর্ণের বীক্রমের কাছে । কুম্ভকর্ণ অট্টহাস্য করে শত শত পলায়মান বানরদের ধরে মুখে তুলে চিবিয়ে খেতে লাগলো। পা দিয়ে পিষ্ট করে দিলো। মুগুরের আঘাতে ধ্বংস করে দিলো পালকে পাল বানরদের । হনুমান পুনঃ যুদ্ধ করতে এলে কুম্ভকর্ণ তাকে তুকে গগনে ছুড়ে দিলো। সেখান থেকে হনুমান প্রস্তর, বৃক্ষ বর্ষণ করতে লাগলো। তখন কুম্ভকর্ণ হস্তের মুগুর হনুমানের দিকে নিক্ষেপ করলো। হনুমান স্বীয় গদার আঘাতে সেই মুগুর চূর্ণ করলো। কুম্ভকর্ণ একবার ভাবল তার অস্ত্র ত ধ্বংস- কিন্তু পরেই হাস্য করে বিশাল পর্বতের চূড়া সুবেল পর্বত থেকে এনে বানরদের দিকে নিক্ষেপ করে বানর বধ করতে লাগলো। বানরেরা রণে ভঙ্গ দিলো। শত কোটি বানর নিয়ে শতাবলী, আশি কোটি বানর নিয়ে শরভঙ্গ , হিঙ্গুল বানরেরা, মলয় পর্বতের সোনার বর্ণের বানরেরা, ছত্রিশ কোটি মর্কট নিয়ে কেশরী, গয়- গবাক্ষ আশি কোটি বানর নিয়ে , জাম্বুবান তার ভল্লুক সেনা নিয়ে পালাতে লাগলো। রাক্ষসেরা এইদেখে অট্টহাস্য করলো। এই সময় কুম্ভকর্ণ সুগ্রীবকে হস্তে তুলে নিলো। বলল- “চল! তোকে লঙ্কায় বন্দী করবো। তুই বানরদের রাজা। রাজার পরাজয় হলে সেনারাও আর থাকবে না। তখন একা রাম লক্ষ্মণ আর কি লড়াই করবে?” এই বলে কুম্ভকর্ণ সুগ্রীবকে নিয়ে লঙ্কায় যাবার উদ্যোগ নিলো। সুগ্রীব সহায়তার জন্য সাহায্য চাইলো। কে আর সহায়তা করে! নল, নীল, গবাক্ষ বানর “ত্রাহিমাম” বলে প্রভু শ্রীরামের কাছে গেলো। সুগ্রীব তখন ভাবল একবার প্রভু শ্রীরামের নাম নিয়ে নিজেই যুদ্ধ করি। মরতে হলে বীরের মতো মরবো । এই বলে সুগ্রীব “জয় শ্রীরাম” বলে তরবারি দিয়ে কুম্ভকর্ণের নাক ও দুকান কাটলেন । প্রচণ্ড ব্যাথায় কুম্ভকর্ণ হাতের মুঠো আলগা করে সুগ্রীবকে ভূমির দিকে নিক্ষেপ করলেন। হনুমান লম্ফ দিয়ে সুগ্রীবকে ভূমিতে পতিত হবার আগেই লুফে নিলো। কুম্ভকর্ণের কাটা কর্ণদ্বয় ও নাসিকা বিশাল পর্বত চূড়ার ন্যায় ভূমিতে পড়লো । বানরেরা বলল- “ভগিনী ও ভ্রাতার উভয়ের নাসিকা কর্ণ হারিয়েছে। দুজনে খুব মানাবে।” কুম্ভকর্ণের মস্তকের দুপাশ ও মুখের ওপর থেকে উচ্চ জলপ্রপাতের ন্যায় রক্তধারা নামতে লাগলো। যেনো বিশাল পর্বত থেকে রক্ত ঝর্ণা পতিত হচ্ছে এমন মনে হল। এই অবস্থায় কুম্ভকর্ণকে আরোও বীভৎস লাগছিলো। ঐ অবস্থায় সে অতি বৃহৎ প্রস্তর নিক্ষেপ করে বানরদলকে বধ আরম্ভ করলো।

সকলে গিয়ে প্রভু শ্রীরামকে বললেন- “প্রভু! আপনি চলুন। নচেৎ রাবণের ভ্রাতা আজ সমস্ত সেনা বধ করবে।” প্রভু শ্রীরাম রণ মূর্তি ধরে যুদ্ধে আসলেন। দেখলেন কুম্ভকর্ণ প্রলয় সমান হয়ে বানর নিধন করছে । এরপর প্রভু ভগবান রঘুনাথ ধনুকে টঙ্কার দিলেন । যেনো সহস্র বজ্রপাতের ন্যায় শব্দে চতুর্দিকে কেঁপে উঠলো। শার্ঙ্গ ধনুকে তিনি দিব্যাস্ত্র জুড়লেন । মন্ত্র পড়ে শর চালনা করলেন । এই এক শর লক্ষ লক্ষ শরে রূপান্তরিত হয়ে রাবণের সেনাবাহিনীর দিকে গেলো। প্রভু শ্রীরামের শরে যেনো সূর্য ঢাকা পড়লো। চতুর্দিকে অন্ধকার নেমে আসলো। সেই লক্ষ শরে কুম্ভকর্ণের সাথে আগত রাবণের বীর রাক্ষসেরা সব ছিন্ন বিছিন্ন হল। চতুর্দিকে গজ, অশ্ব, রথ, রাক্ষসদের ছিন্নিবিচ্ছিন্ন অংশ পতিত হল । রাক্ষসেরা কবন্ধ হয়ে ছোটাছুটি করছিলো । কাটা মুণ্ডের পর্বত জমল । কুম্ভকর্ণ অন্তরে প্রভু শ্রীরামকে প্রণাম বন্দনা করলো । তারপর নিহত রাক্ষসদের শব দেখে ক্রোধে বিশালাকার প্রস্তর দশানন রাবণের জয়ধ্বনি করে নিক্ষেপ করলো। সেই বৃহৎ প্রস্তর আসতে দেখেই রামচন্দ্র মহাশিরা অস্ত্রে ধ্বংস করলেন সেটি। এরপর ভগবান শ্রীরাম বহু দিব্যাস্ত্র সকল কুম্ভকর্ণের দিকে নিক্ষেপ করলেন। কিন্তু কুম্ভকর্ণের শরীরে সেসব লাগলোই না। অস্ত্রগুলি চূর্ণ হল। ভগবান রঘুবীর তখন ভাবলেন বালিকে যে অস্ত্রে বধ করেছি সেই অস্ত্রই নিক্ষেপ করি। এত বলে ঐষিক বাণ নিক্ষেপ করলেন, কিন্তু কিছুই হল না কুম্ভকর্ণের। কুম্ভকর্ণ তখন বিশাল প্রস্তর তুলে ভগবান শ্রীরামের দিকে নিক্ষেপ করতে উদ্যত হলে, ভগবান শ্রীরাম বায়ব্য অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। সেই অস্ত্রে কুম্ভকর্ণের এক হস্ত ছিন্ন হয়ে পর্বত চূড়ার ন্যায় ভূমিতে পড়লো। অপর হাত দিয়ে প্রস্তর নিক্ষেপ করতে গেলে ভগবান তখন ঐন্দ্রাস্ত্রে ঐ হাত ছিন্ন করলেন। ভুজ যুগল হারিয়ে কুম্ভকর্ণ আসতে লাগলো শ্রীরামের দিকে। তখন ভগবান রঘুপতি অর্ধচন্দ্র বাণ নিক্ষেপ করে দুই পদ কেটে ফেললেন। ভূমিতে পতিত হয়েও কুম্ভকর্ণ বিশাল হা করে এগিয়ে আসতে থাকলে- ভগবান শ্রীরাম বজ্রাস্ত্র মন্ত্র বলে নিক্ষেপ করলেন । সেই অস্ত্রে কুম্ভকর্ণের মস্তক কাটা পড়লো। সেই কাটা মস্তক লঙ্কায় এক গিরিশিখরের ন্যায় পতিত হয়ে বহু গৃহ চূর্ণ হল । মস্তক হীন কুম্ভকর্ণের নিথর দেহ লঙ্কার পাঁচিলে পড়লো। লঙ্কার পাঁচিল ভেঙ্গে পড়লো । কুম্ভকর্ণ নিহত হলেন । দেবতারা ভগবান শ্রীরামের উপর পুস্প বর্ষণ করলেন ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger