সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-১৪)



দেবান্তক ও নরান্তক নিহত হয়েছে দেখে রাক্ষসেরা ক্ষিপ্ত হয়ে বর্শা, শর সন্ধান করে তুমুলহারে কপি নিধন আরম্ভ করলো। কপিরাও চুপ করে ছিলো না। প্রস্তর, বৃক্ষ নিক্ষেপ করে রাক্ষসদের থেঁতলে দিতে লাগলো। ভগ্ন রথের চাকায় চতুর্দিকে ভরে গেলো। আকাশে কেবল দেখা গেলো শর, বর্শা একদিক থেকে অন্যদিকে ছুটে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে এত পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে যে আকাশ অন্ধকার হয়ে আসছে । শরতের নির্মল মেঘমুক্ত গগন দেখা যাচ্ছে না । মহোদর নাম বীর রাক্ষস হস্তীতে চেপে এলো। হস্তীগুলি উন্মত্ত হয়ে পদতলে কপি, ভল্লুক, মর্কট, লাঙুরদের পিষ্ট করে মাটিটে মিশিয়ে দিলো। হস্তীগুলির চরণে যেনো সেই কপিদের ছিন্নভিন্ন নাড়িভুড়ি ও রক্তমাখা শিরায় শোভিত হয়েছিলো। এমন মনে হচ্ছিল্ল যেনো হস্তীগুলির চারপদ রক্তিম রঙে রাঙানো হয়েছে। শুধু কি এই! হস্তীগুলি বানর, মর্কট, ভল্লুক দের শুণ্ডে তুলে আছার দিলো। বানরেরা দূর হতে প্রস্তর বর্ষণ করে হস্তীগুলিকে আরোহী সহিত ভূপতিত করে বধ করতে লাগলো। ভল্লুকেরা লম্ফ দিয়ে হস্তীর ওপরে উঠে রাক্ষসদের ছিন্নবিছিন্ন করে দিলো । মহোদর রাক্ষস বাণে বাণে ঢেকে ফেলল চারপাশ। নীলের সাথে যুদ্ধ করতে লাগলো। মহাযোদ্ধা নীলের দিকে সমানে বাণ বর্ষণ করতে লাগলো। বাণ ফুটে জর্জরিত হলেও নীল যুদ্ধ চালিয়ে যেতে লাগলো । একসময় নীল একটি বিশাল পর্বত চূড়া সমান প্রস্তর উঠিয়ে এক লাফে শূন্যে উঠে হস্তীর পৃষ্ঠে থাকা মহোদরের ওপর নিক্ষেপ করলো। প্রস্তরের আঘাতে মহোদর হস্তী সহিত ভূপৃষ্ঠে পতিত হল। দেখা গেলো হস্তী সহিত মহোদরের প্রাণ চলে গেছে । এরপর মহাপাশ রাক্ষস এগিয়ে এলো। সমানে বাণ বিদ্ধ করে সুগ্রীবের সেনাদের বধ করতে লাগলো। কত শত যে বানর হতাহত হল । প্রচণ্ড অট্টহাস্য সহ এরপর মহাপাশ রাক্ষস তাঁর পর্বত প্রমান গদা নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হল। গদা প্রহারে বানরদের নষ্ট করতে থাকলো । রাক্ষসেরা প্রচণ্ড আনন্দ পেলো। শত শত বানর মহাপাশের সাথে যুদ্ধ করতে এসে হতাহত হল । তখন বরুণ দেবতার তেজজাত পুত্র সুমেরু দেশের বানর ঋষভ গদা নিয়ে তেড়ে আসলো । দুই জনে মহা যুদ্ধ শুরু আরম্ভ হল ।

উভয়ে সমান বীর । এমন যুদ্ধ হল যে কেউ কাউকে পরাজিত করতে পারলো না। উভয়ের গদার সংঘর্ষে বিকট শব্দে ধরিত্রী কেঁপে উঠলো । একে অপরের ওপর গদার আঘাত, মুষ্ট্যাঘাতপ্রহার করতে থাকলো । উভয়ের রক্তবমি হতে লাগলো । এমন সময় মহাপাশ সজোরে ঋষভের বুকে গদা দিয়ে আঘাত হানলো । ঋষভ বানর পড়ে মূর্ছা গেলো। পুনঃ চেতন পেতেই আবার যুদ্ধ শুরু হল। এবার ঋষভ তাঁর গদা দিয়ে মহাপাশের বুকে আঘাত করলো। ছিটকে মহাপাশ পড়লো ভূমিতে। তারপর ঋষভ বানর রামনাম নিয়ে সেই মহাপাশের প্রচণ্ড গদা কেড়ে নিয়ে মহাপাশেরই বুকে সজোরে আঘাত হানলো। প্রচণ্ড যন্ত্রনায় মহাপাশের চোখ যেনো ঠিকড়ে বের হল। হাত পা ছড়িয়ে রক্তবমন করতে করতে ইহলোক ত্যাগ করলো । মহাপাশ মারা যেতেই ত্রিশিরা রাক্ষস রেরে করে বিশাল খড়্গ নিয়ে তেরে এলো । বানরদের কেটে কেটে খণ্ডখণ্ড করে সমগ্র যুদ্ধভূমিতে ত্রাস সৃষ্টি করে ঘুরে বেড়াতে লাগলো । রক্তে খড়্গ খানা লাল হয়েছিলো। বানরের রক্তে ত্রিশিরার সমগ্র শরীরে লাল হয়ে গিয়েছিলো। বানর নিধন করতে করতে ত্রিশিরা অনবরত জিজ্ঞেস করছিলো- “কোথায় রাম? ডাক তাকে। দেখি সে কত বড় বীর!” হনুমান সামনে এসে বলল- “মূর্খ! ভগবান শ্রীরামের দর্শন চাইলে এইভাবে ক্রোধ করে পাইবি না। তাঁহার ভক্তি কর। তবে তাঁর দর্শন পাইবি। আর যদি যুদ্ধ করতে চাস- তাহলে যুদ্ধ কর।” হনুমানকে দেখে লঙ্কা দহনের কথা ভেবে ত্রিশিরা বিশাল খড়্গ নিয়ে তেড়ে গেলো। হনুমান গদা নিয়ে যুদ্ধে নামলো। উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ চলল। ত্রিশিরার খড়্গ আঘাতে হনুমানের কিছু জায়গায় কেটে গিয়ে রক্তধারা নির্গত হল। তখন হনুমান এক মুষ্ট্যাঘাতে ত্রিশিরাকে ভূমিতে ফেলে ত্রিশিরার খড়্গ খানা কেড়ে নিলো। এরপর হনুমান সেই খড়্গে ত্রিশিরার দেহ খণ্ডখণ্ড করে বধ করলো ।

এরপর বানরেরা লক্ষ লক্ষ রাক্ষসদের হত্যা করে সমুচিত জবাব দিলো। গদার আঘাতে অঙ্গদ, হনুমান, সুগ্রীব, নল অনেক বীর যোদ্ধাদের বধ করে ফেললেন। রাবণের রথ, গজ, অশ্ব, পদাতিক যারা যুদ্ধে এসেছিলো আজ- তারা সংখ্যায় অনেকাংশে কমে গেলো। রাবণের পুত্রেরা নিহত হয়েছে। আজ রাবণ ভালোই শিক্ষা পাবে- এই ভেবে বানরেরা জয়ধ্বনি করলো। কিন্তু রাবণ পুত্র অতিকায় এবার প্রবল যুদ্ধ আরম্ভ করলো। ময়ূরাস্ত্র, গন্ধর্ব বাণ, কালবাণ, তেজবাণ ইত্যাদি নিক্ষেপ করে বানরদের ছত্রভঙ্গ করতে লাগলো । সুগ্রীবের কটকের প্রতি শিলা বাণ নিক্ষেপ করলো। গগন থেকে শিলা পড়ে সুগ্রীবের সেনা সকল নাশ হতে লাগলো । তেজবানে বানরেরা পুড়ে মরল । কালবাণে বিষাক্ত ধোয়ায় বানেরার দম আটকে মরল। ময়ূরাস্ত্রের প্রভাবে অসংখ্য তীক্ষ্ণ শর গিয়ে বানর, ভল্লুকদের ছিন্ন বিছিন্ন করলো। গন্ধর্ব বাণে এক কোটি গন্ধর্ব উৎপন্ন হয়ে এমন মায়া রচলো, যে বানরেরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করে মরল। কালপাশ বাণ নিক্ষেপ করতেই পাশে আটকে বানরেরা মারা পড়লো। এইরূপ নানা দিব্যাস্ত্র নিক্ষেপ করতে থাকলো অতিকায় । নল- নীল উভয়ে পরাজিত হয়ে পালালো। জাম্বুবান ধরাশায়ী হয়ে পালালো। সুগ্রীব, অঙ্গদ পরাজিত হল। বাকী বানরেরা পালালো। হনুমান সেই বীরের বাণের তেজ সহ্য করতে পারলো না । ভগবান শ্রীরাম বললেন- “মিত্র বিভীষণ! এই বীর যোদ্ধা কে?” বিভীষণ বললেন- “প্রভু! এ দশাননের এক পত্নী ধনমালিনীর পুত্র অতিকায় । সে ব্রহ্মার আরাধনা করে দিব্য কবচ, রথ, অস্ত্রাদি প্রাপ্ত করেছে। ইহাকে বিজয় করা সহজ কাজ নয়।” ভগবান রাম তখন লক্ষ্মণকে আদেশ দিয়ে বললেন- “ভ্রাতা! তুমি এই রাক্ষসের অন্ত করো। প্রয়োজন বুঝে সাবধানে ব্রহ্মাস্ত্র চালনা করবে।” লক্ষ্মণ গিয়ে অতিকায়ের সামনে দাঁড়ালো । দুজনে প্রবল যুদ্ধ আরম্ভ হল। উভয়ে উভয়ের দিকে নানা প্রকার অস্ত্রাদি নিক্ষেপ আরম্ভ করলেন । দিব্যাস্ত্র সকল যখন মুখোমুখি সংঘর্ষ হল তখন ত্রিলোক কম্পিত হল। আগুনের ফুলকি রাক্ষস ও বানর সেনাদের ওপর ঝড়ে পড়তে থাকলো। অতিকায় অগ্নিবাণ, পর্বত বাণ, নাগাস্ত্র নিক্ষেপ করলে লক্ষ্মণ অনল বাণ, বায়ুবাণ, গড়ুর বাণে নিবারণ করলেন। অতিকায় পঞ্চবাণ নিক্ষেপ করলে লক্ষ্মণ ঐন্দ্রাস্ত্র চালনা করলেন। অতিকায় শেলাস্ত্র, যক্ষবাণ, চন্দ্রবাণ নিক্ষেপ করলেন। লক্ষ্মণ বজ্র অস্ত্র, চক্রাস্ত্র ও সূর্য বাণে নিবারণ করলেন। উভয়ে উভয়ের দিকে এইভাবে নানা অস্ত্র বর্ষণ আরম্ভ করলেন ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger