সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতিতে আপনাদের স্বাগতম। সনাতন ধর্মের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের কিছুটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র । আশাকরি ভগবানের কৃপায় আপনাদের ভালো লাগবে । আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

রামায়ণ কথা ( লঙ্কাকাণ্ড পর্ব-৫)


রাম ও লক্ষ্মণ সর্পের বিষাক্ত ছোবোলে ও প্রবল বাঁধনে মূর্ছা হয়ে আছেন । বানরেরা সকলে হায় হায় করে রোদন করছিলো । সুগ্রীব, বিভীষণ সকলে কপালে হাত দিয়ে বসেছিলেন । হনুমান এসে সর্প গুলিকে প্রবল বেগে আকর্ষণ করে ছিন্ন করতে চাইলেন , কিন্তু সর্পের বাঁধন এত প্রবল ছিলো যে ছিন্ন হল না। হনুমান যাত আকর্ষণ করে, সর্প গুলি প্রবল বেগে রাম, লক্ষ্মণ কে চেপে প্যাঁচ দিতে থাকে । কিছু সর্প ফণা তুলে হনুমানকে দংশন করতে এলো । হনুমান পারলো না। গদা দিয়ে আঘাত করলে পাছে প্রভুর অঙ্গে আঘাত হয়- এই ভেবে হনুমান গদা চালনা করতে অসমর্থ হল। সর্পের বিষাক্ত দর্শনে প্রভু ও লক্ষ্মণের শরীর ক্রমশঃ নীল হয়ে আসছে । এখন কি করা যায় ? জাম্বুবান এর কারন জানতে চাইলে বিভীষণ বলল- “এই অস্ত্রের গুণ নষ্ট করতে পারে একমাত্র গড়ুর । কিন্তু তিনি এখন বৈকুণ্ঠে আছেন। কে ওনাকে খবর দেবে?” তবে কি লঙ্কার জয় হয়ে গেলো ? কপিরা এই ভেবে দুঃখে নিপতিত হলেন । প্রভু কি তবে ধরিত্রী ধাম ছেড়ে যাবেন! এই ভেবে সকলে আশাঙ্কিত হল। অপরদিকে লঙ্কায় যেনো বিজয় উৎসব আরম্ভ হল। বিবিধ পটকা , আতসবাজি পুড়িয়ে বিজয় উৎসব, হৈহুল্লা করে রাক্ষসেরা আনন্দ করতে লাগলো । নানা প্রকার বিজয় সূচক বাদ্যবাজনা বাজাতে লাগলো । রাবণ তখন নিজ পুত্রকে আশীর্বাদ ও স্নেহ করে বলল- “পুত্র! তুমিই এই সঙ্কট থেকে লঙ্কাকে রক্ষা করেছো । এই সুখবর একবার সেই অতি দর্পিণী নারী সীতাকে দিয়ে আসি।” সীতা সকল কিছু শুনে বিলাপ করতে লাগলো । রাবণ অট্টহাস্য করে বলল- “সামান্য কটা রাক্ষস বধ করে কি আর লঙ্কা জয় করা যায় ? এই নাগপাশ বহু আগে নিক্ষেপ করলে হয়তো আজ এত কিছু দেখতে হত না। হে সীতা । জেনে রাখো! রাবণকে কেউ পরাজিত করতে পারে না। সে স্বর্গের দেবতাই হোক আর বৈকুণ্ঠের বিষ্ণুই হোক। অতএব এখন আর রামের চিন্তা করো না। কিছুক্ষণ বাদে তার অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া সুসম্পন্ন হবে। তুমি বরং নিজের সুখ সমৃদ্ধির কথা চিন্তা করে আমাকে বিবাহ করে ত্রিলোকের ঐশ্বর্য ভোগ করো।”

এই বলে রাবণ অতি আনন্দ প্রকাশ করে প্রস্থান করলো । সীতা দেবী ত্রিজটার কাছে বিলাপ করে বলতে লাগলো – “মাতঃ! কেনই বা বিধাতা আমার ললাটে এমন সব অনাচার লিপিবদ্ধ করেছেন ? কেনই বা আমাকে এইহেন দুঃখ যন্ত্রনা ভোগ করতে হচ্ছে।” ত্রিজটা সান্ত্বনা দিয়ে সীতাকে বুঝিয়ে বলল- “পুত্রী! তুমি সতী সাধ্বী স্ত্রী । তোমার প্রার্থনায় এখনই আকাশ ভেঙ্গে পড়তে পারে, ধরিত্রী রসাতলে যেতে পারে, সমুদ্র এসে লঙ্কাকে নিমজ্জিত করতে পারে। তুমি দেবতাদিগের কাছে প্রার্থনা করো। তোমার সিঁথির সিঁদুর মুছে দেবার সাহস যমরাজেরও নেই।” অপরদিকে স্বর্গের দেবতাবৃন্দ এই নিয়ে চিন্তিত। তবে কি লঙ্কার জয় হবে! রাবণ জিতবে!

নাগপাশে কাতর হইলা রঘুবীর ।
ব্রহ্মাদি দেবতা ভেবে হইল অস্থির ।।
ইন্দ্র আদি করিয়া যতেক দেবগণ ।
ডাক দিয়া আনিলেন দেবতা পবন ।।
...
নাগপাশে অচৈতন্য দুই সহোদর ।
বল বুদ্ধি হারায়েছে সকল বানর ।।
রঘুনাথের স্থানে যাহ আমার বচনে ।
কহ রামে মুক্ত হবে গরুড় – স্মরণে ।।
বিষ্ণুর বাহন গরুড় ধরে বিষ্ণু- তেজ ।
নাগপাশ ঘুচাইতে সেই মহা বেজ ।।
( কৃত্তিবাসী রামায়ণ )

ইন্দ্রের আদেশে পবন দেবতা সমুদ্র তটে লঙ্কায় আসলেন চুপিচাপে। যাতে রাবণ টের না পায়। কারণ টের পেলেই বন্দী বানাবে। হনুমান তখন পিতাকে প্রনাম করে এই সকল অবস্থার বর্ণনা করে বললেন- “পিতা! এই ধর্মযুদ্ধে কেন প্রভু মূর্ছা গেলেন ? তবে কি অধার্মিকদেরই জয় হবে?” পবন বললেন- “পুত্র! প্রভু কেবল নাগপাশ অস্ত্রের মান রাখতেই স্বেচ্ছায় সেই অস্ত্রের প্রভাব গ্রহণ করেছেন। নচেৎ এখনও এমন বাণ সৃষ্টি হয়নি যা দিয়ে কিনা শ্রীরামের বিনাশ হয়। ভুলে গেলে পুত্র তুমি নিজেই ব্রহ্মাস্ত্রের মান রাখতে মেঘনাদের বাণে বদ্ধ হয়েছিলে? পুত্র! তোমরা বিষ্ণু বাহন শ্রীগরুড় দেবকে স্মরণ করো। তিনি নাগেদের ভক্ষণ করেন। তাঁর নাম শুনলেই নাগেরা পলায়ন করে। তিঁনি আসলেই সব সমস্যা দূর হবে।” এই বলে পবন দেব অদৃশ্য হলেন। সকলে খগরাজ গরুড়ের স্মরণ করতে লাগলেন । অপরদিকে গরুড় পুত্র সম্পাতি পক্ষী সব দেখতে পেয়েছিলেন । তিনি গিয়ে পিতা গরুড়কে বললেন- “পিতা! আপনি যাঁহাকে স্কন্ধে বহন করেন, তিঁনিই এখন শ্রীরাম রূপে ধরাধামে লীলা করছেন। বর্তমানে তিনি রাবণ পুত্র মেঘনাদের নাগপাশে অচেতন। আপনি সত্বর সেস্থানে চলুন। সকলে আপনাকে স্মরণ করছে।”

পুত্রের মুখে সব শুনলেন । তারপর সম্পাতির সহিত ডানা মেলে খগ্রেন্দ্র শ্রীগরুড় অতি বৃহৎ পঙ্খ মেলে আসতে লাগলেন । একেবারে উড়তে উড়তে অন্তরীক্ষ থেকে ধারাধামে সমুদ্র তটে আসলেন । গড়ুর কে আসতে দেখে প্রথমে আগে ক্ষুদ্র সর্পেরা ভয়ে যে যেদিকে পারলো পালালো । গড়ুর পক্ষী নামলেন । বানর সেনারা তখন গরুড়কে নানা স্তবস্তুতি করলেন । কশ্যপ মুনি ছিলেন গরুড়ের পিতা। মাতার নাম বিনতা । বিনতা দক্ষ প্রজাপতির কণ্যা ছিলেন । গড়ুর নির্লোভী । অমৃত প্রহরা দিলেও, অমৃতের প্রতি বিন্দুমাত্র লোভ ছিলো না তাঁর । এমনই নির্লোভী চরিত্রই তো ভগবানের অতি প্রিয়। তাই তিঁনি ভগবানের বাহন । গড়ুরের মাতৃভক্তির কথাও সুপ্রচলিত । যাই হোক, গরুড় কে আসতে দেখে যেসব নাগেরা পলায়ন করলো না, গরুড় তাহাদিগকে ভক্ষণ করলেন । ভগবান বিষ্ণু অনন্ত নাগ শয্যায় শয়ন করেন। নাগ হল গরুড়ের আহার। আবার ভগবান বিষ্ণুর চরণেই গরুড় থাকেন। গরুড় ও নাগ একে অপরের শত্রু। তবুও ভগবানের কাছে সকল শত্রুতা ভুলে একসাথে বিরাজ করেন। গড়ুর সর্প আহার করেন । এইভাবে গড়ুর সমস্ত সর্প ভক্ষণ করলে, রাম লক্ষ্মণের ওপর আর কোন বাঁধন থাকলো না। এরপর গড়ুর তাঁর হস্ত রাম লক্ষ্মণের ললাটে রাখতেই , রাম- লক্ষ্মণ সুস্থ হয়ে উঠে সব শুনে গড়ুরের প্রশংসা করলেন। গরুড় প্রনাম করে বললেন- “প্রভু! আমি তো আপনার সেবক। আপনি স্বেচ্ছায় এই বাণ গ্রহণ করে আমাকে সেবা করার সুযোগ দিয়েছেন। কারণ এই অবতারে এখনও অবধি আমি আপনার সেবা করার সুযোগ লাভ করতে পারিনি । তাই কৃপা করে আমাকে এই সুযোগ দিয়েছেন। হে মহাপ্রভু! আপনাকে প্রণাম জানাই। আমি কথা দিচ্ছি যাঁরা আপনার এই ‘রাম’ রূপের উপাসক হবেন, তাঁদের সর্প ভয় থাকবে না। আমি তাহাদিগকে রক্ষা করবো।” এই বলে গরুড় প্রস্থান করলেন । কপিরা আনন্দে জয়ধ্বনি ও নানা বাদ্য বাজাতে থাকলো ।

( ক্রমশঃ )
Share this article :
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger